ডিজিটাল পড়াশোনার সহায়কের উত্থান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি থেকে জাপানের কিশোর-কিশোরীদের দৈনন্দিন শিক্ষার সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে। গাক্কেন রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর লার্নিং অ্যান্ড এডুকেশনের প্রকাশিত এক বিস্তৃত সমীক্ষা অনুযায়ী, জাপানের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ৭৩.৭ শতাংশ বর্তমানে ChatGPT-এর মতো কথোপকথনভিত্তিক এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। ব্যবহারের এই হার ইঙ্গিত দেয়, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে জেনারেটিভ এআই ক্যালকুলেটর বা পাঠ্যবইয়ের মতোই সাধারণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাজ, গবেষণা ও সৃজনশীল প্রকল্প যেভাবে করে, তাতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।
সূচিপত্র
২০২৫ সালের নভেম্বরে অনলাইনে পরিচালিত এই সমীক্ষায় জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্বকারী ২,৪০০ শিক্ষার্থীর মতামত নেওয়া হয়। গবেষকেরা প্রতিটি শ্রেণি থেকে ১০০ জন ছেলে ও ১০০ জন মেয়ের তথ্য সংগ্রহ করেন; প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিকের তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি হলেও নিম্ন শ্রেণিগুলোতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার ছড়িয়েছে। নিম্নমাধ্যমিকের ৪৩.২ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং প্রাথমিকের ৩৬.৬ শতাংশ শিক্ষার্থীও এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে এই ফলাফল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য এআই সরঞ্জাম সহজলভ্য হওয়ার তিন বছরও হয়নি। এত দ্রুত এর প্রসার ইঙ্গিত দেয়, শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত কিছু চাহিদা পূরণ করেছে জেনারেটিভ এআই। ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনায় সহায়তা, তথ্যপ্রাপ্তি ও সৃজনশীল প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রচলিত উপায়গুলো যেসব ঘাটতি ধারাবাহিকভাবে মেটাতে পারেনি, এআই সেগুলো পূরণ করছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো, শিক্ষার সহায়ক হিসেবে এসব সরঞ্জামের কার্যকর ব্যবহার এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন অতিনির্ভরতার মধ্যে পার্থক্য করা। তথ্য বলছে, সব বয়সের শিক্ষার্থীরা এআইয়ের সহায়তা নিয়ে ইতিমধ্যে নিজস্ব অভ্যাস ও পছন্দ গড়ে তুলেছে। তাই নীতিগত পদক্ষেপ এখনই জরুরি, কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়।
বিভিন্ন সমীক্ষার পরিসংখ্যানের তুলনা
গাক্কেনের ফলাফল সাম্প্রতিক অন্যান্য গবেষণার সঙ্গে মেলে, যদিও পদ্ধতি ও সময়ের ভিন্নতার কারণে পরিসংখ্যানে পার্থক্য রয়েছে। স্কুলের পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কানকো গাকুসেইফুকুর আরেকটি সমীক্ষায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নিম্নমাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ১,২০০ শিক্ষার্থীর মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ঘন ঘন অথবা মাঝেমধ্যে এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে। প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য ও সাংস্কৃতিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বাড়তে পারে, এই পরিসংখ্যান সে ইঙ্গিত দেয়।
তবে শিশু ও পরিবারবিষয়ক সংস্থার তথ্য কিছুটা সংযত চিত্র তুলে ধরে। ২০০৯ সালে ইন্টারনেটবিষয়ক সমীক্ষা শুরু করার পর এআই ব্যবহার নিয়ে তাদের প্রথম সমীক্ষায় জানানো হয়, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ৪৬.২ শতাংশ অনলাইনে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে। সমীক্ষার সময়, নমুনা নির্বাচন, অথবা ব্যবহারের ঘনত্ব ও প্ল্যাটফর্মের ধরন নিয়ে প্রশ্নের ভাষায় পার্থক্যের কারণে এই ব্যবধান হতে পারে। তবে সব গবেষণাতেই একটি বিষয় স্পষ্ট: সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য সহজলভ্য হওয়ার প্রায় দুই বছরের মধ্যে এআই প্রান্তিক প্রযুক্তি থেকে শিক্ষার মূলধারার সহায়কে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষার স্তরভেদে ব্যবহারের ধরন
বয়স ও পড়াশোনার প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা এআই সরঞ্জাম ভিন্নভাবে ব্যবহার করে। কথোপকথনভিত্তিক এআই ব্যবহারকারী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪২.৩ শতাংশ পড়াশোনা ও বাড়ির কাজে সহায়তাকে ব্যবহারের প্রধান কারণ বলেছে; অন্যদিকে ২৬.০ শতাংশ মূলত তথ্য খুঁজতে এটি ব্যবহার করে। এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, বয়সে বড় শিক্ষার্থীরা এআইকে সরাসরি শিক্ষাসহায়ক হিসেবে দেখে। জটিল ধারণা পরিষ্কার করা, নিজেদের কাজ যাচাই করা কিংবা অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ভাবনা তৈরি করতে তারা এটি ব্যবহার করে।
নিম্নমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকারে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। এই বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৭.৮ শতাংশ তথ্য খুঁজতে এবং ১৭.৭ শতাংশ পড়াশোনা ও বাড়ির কাজে এআই ব্যবহার করে। এ বয়সীদের মধ্যে সামগ্রিক ব্যবহার কম হওয়ায় এই হারও কম। তবে গবেষণা ও পড়াশোনায় সহায়তার হার প্রায় সমান হওয়া ইঙ্গিত দেয়, তারা শুধু পাঠ্যক্রমের কাজে সহায়তা নেওয়ার বদলে বিভিন্ন ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের ব্যবহারের ধরন সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। ৪৪.০ শতাংশ তথ্য খুঁজতে এবং ৩২.৬ শতাংশ পড়াশোনায় এআই ব্যবহার করলেও উল্লেখযোগ্য ২৩.৭ শতাংশ চিত্র ও ছবি তৈরিতে এসব সরঞ্জাম কাজে লাগায়। সৃজনশীল এই ব্যবহার থেকে বোঝা যায়, ছোট শিশুরা এআইকে জ্ঞানের উৎস এবং শৈল্পিক প্রকাশের মাধ্যম—দুই হিসেবেই দেখে। ছবি তৈরির সুবিধা তারা ব্যবহার করে, যা পাঠ্যভিত্তিক শিক্ষাসহায়তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া বয়সে বড় শিক্ষার্থীরা হয়তো উপেক্ষা করে।
এআই ব্যবহারে লিঙ্গভেদ
কানকো গাকুসেইফুকুর সমীক্ষায় জাপানি কিশোর-কিশোরীদের এআই ব্যবহারে লিঙ্গভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। ছাত্রীদের মধ্যে ৪৬.৮ শতাংশ জানিয়েছে, তারা নিয়মিত এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে। ছাত্রদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৬.০ শতাংশ। ১০ শতাংশের বেশি এই ব্যবধান ইঙ্গিত দেয়, মেয়েরা প্রযুক্তিটি দ্রুত গ্রহণ করেছে অথবা এর ব্যবহার থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বেশি উপকার পেয়েছে।
আবেগগত ও সামাজিক ব্যবহারে লিঙ্গভেদ সবচেয়ে স্পষ্ট। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক মেয়ে (৪৯.৯ শতাংশ) পরামর্শ নেওয়া বা কথোপকথনের জন্য এআই ব্যবহার করে; তারা পরামর্শ চায় অথবা চ্যাটবটকে এমন একজন মনে করে যার কাছে মনের কথা বলা যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার (২৩.০ শতাংশ) এর অর্ধেকেরও কম। কিছু শিক্ষার্থীর জন্য, বিশেষ করে কিশোরীদের কাছে, এআই কেবল পড়াশোনার সরঞ্জাম নয়; এটি ভাবনা গুছিয়ে নেওয়া ও বিচার-সমালোচনার ভয় ছাড়া উদ্বেগ নিয়ে কথা বলার জায়গাও। এই প্রবণতা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রযুক্তির ভূমিকা এবং এআইয়ের সঙ্গ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার পরিপূরক, নাকি তার বিকল্প—এমন নানা প্রশ্ন তুলেছে।
চিন্তনক্ষমতার ওপর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক
নিয়মিত এআই ব্যবহারে নিজেদের চিন্তাশক্তির কী পরিবর্তন হচ্ছে, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা নিয়ে পাওয়া ফলাফলগুলোই সম্ভবত সবচেয়ে ভাবনার উদ্রেক করে। জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের পর চিন্তাশক্তি বেড়েছে না কমেছে—এ প্রশ্নে সব বয়সী শিক্ষার্থীর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত উত্তর ছিল, বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রাথমিকের ৪২.১ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিকের ৪৯.৮ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকের ৪২.১ শতাংশ শিক্ষার্থী এই নিরপেক্ষ উত্তর বেছে নিয়েছে।
তবে বয়সভেদে তুলনা করলে তথ্য থেকে উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা দেখা যায়। প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা নিজেদের সক্ষমতা বেড়েছে বলেছে, তাদের সংখ্যা কমেছে বলার চেয়ে বেশি। ছোট শিশুরা এআইয়ের সহায়তায় নিজেদের আরও সক্ষম মনে করছে। হয়তো তারা এটিকে নিজেদের সামর্থ্যের সম্প্রসারণ বা বিষয়বস্তু দ্রুত বুঝতে সাহায্যকারী একটি সরঞ্জাম হিসেবে দেখে।
অন্যদিকে, উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রবণতা উল্টো। চিন্তাশক্তি কমেছে বলেছে এমন উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বলার চেয়ে বেশি। পড়াশোনার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং এআইয়ের ব্যবহার আরও ব্যাপক হওয়ার পর বয়সে বড় শিক্ষার্থীরা হয়তো নিজেদের মধ্যে নির্ভরতা তৈরি হতে দেখছে। অথবা তাদের মনে হচ্ছে, এআইয়ের সহায়তায় চিন্তার প্রক্রিয়ায় শর্টকাট নেওয়া নিজেদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশে বাধা দিচ্ছে।
আওয়ামা গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানীয় বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিরোইউকি মাসুকাওয়া উদ্বেগের সঙ্গে এই ফলাফল বিশ্লেষণ করেছেন। এআই ব্যবহারের বর্তমান ধরন সত্যিই শিক্ষার বিকাশে সহায়তা করছে, নাকি কেবল দক্ষতার ভ্রম তৈরি করছে—জনসাধারণকে তা সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হবে বলে তিনি জোর দিয়েছেন।
এআই সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং শিশুরা যাতে নিজেদের চিন্তাশক্তি বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
মাসুকাওয়ার বক্তব্য এআইকে শেখার উন্নতিতে ব্যবহার করা এবং চিন্তার কঠিন কাজ এড়াতে ব্যবহার করার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি তুলে ধরে। নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে ছোট ও বয়সে বড় শিক্ষার্থীদের ধারণার এই ভিন্নতা হয়তো প্রতিফলিত করে যে, উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছে তাদের চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়ায় এই সরঞ্জামগুলো অতিরিক্ত গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি
তথ্য বলছে, উল্লেখযোগ্য একটি সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এআই ইতিমধ্যে সহায়ক থেকে প্রধান সমস্যা সমাধানকারীতে পরিণত হয়েছে। কানকো গাকুসেইফুকুর সমীক্ষা অনুযায়ী, উত্তরদাতাদের প্রায় ২০ শতাংশ নিজেদের যুক্তি প্রয়োগ না করেই উত্তর পাওয়া বা হিসাব করানোর জন্য সম্পূর্ণভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভর করে। এই নির্ভরতা শিক্ষাচর্চায় মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করে; এর ফলে মূল চিন্তনমূলক কাজগুলো কার্যত অ্যালগরিদমের কাছে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
চিবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ওপর বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা উচ্চশিক্ষায় ব্যবহারের ধরন সম্পর্কে আরও তথ্য দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পরিচালিত ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ৮৪.৭ শতাংশ জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে। তাদের প্রধান ব্যবহার ভাষা শেখা (৪৪.৯ শতাংশ) ও তথ্য অনুসন্ধান (৩৯.০ শতাংশ)। ব্যবহার বেশি হলেও অ্যাসাইনমেন্টে এআই ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মনোভাব নিরপেক্ষ ছিল। এতে বোঝা যায়, মাধ্যমিকের কিছু শিক্ষার্থীকে যেভাবে দেখা গেছে, তার তুলনায় তারা শিক্ষাগত সততা নিয়ে বেশি সতর্ক।
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের এই গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাত্র ৪৯.২ শতাংশ এআই নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছে; অধিকাংশই ইন্টারনেট ঘেঁটে বা সহপাঠীদের কাছ থেকে শিখেছে। কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষার্থীরা এআইয়ের উত্তরে সম্ভাব্য পক্ষপাত সম্পর্কে বেশি সচেতন ছিল এবং তথ্য সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করার দক্ষতাও তাদের বেশি উন্নত ছিল। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, প্রযুক্তির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক পরিচয় থেকেই এআই সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয় না। তাই পরিকল্পিত শিক্ষাক্রমের বিষয়ে মাসুকাওয়ার আহ্বারের যথার্থতা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া ও নীতির পরিবর্তন
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাপানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিষেধাজ্ঞা থেকে দ্রুত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণের পথে এগিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সের পাঠ্যসূচি বিশ্লেষণে প্রযুক্তিটি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের মনোভাবের নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৩ সালে ৭০৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার পাঠ্যসূচি পরীক্ষা করে গবেষকেরা জেনারেটিভ এআইয়ের উল্লেখ পেয়েছিলেন মাত্র ৫২৮টি স্থানে। অধিকাংশ কোর্সে এর ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ ছিল।
২০২৪ সালে ৬৭৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ লাখ ৪০ হাজার পাঠ্যসূচি পরীক্ষা করে জেনারেটিভ এআইয়ের ৭,৪৪২টি উল্লেখ পাওয়া যায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ গুণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব উল্লেখের ধরনও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। কিছু কোর্সে এখনও কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অন্যগুলোতে জেনারেটিভ এআইকে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, অথবা এআই-তৈরি তথ্য সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করতে শেখানো হচ্ছে। এই পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তিটি নিষিদ্ধ করা আর বাস্তবসম্মত নয়। বরং শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীলভাবে এটি ব্যবহার করতে শেখাতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে নীতিমালা এখনও একরকম নয়। কানকো গাকুসেইফুকুর সমীক্ষায় ১০ শতাংশের কিছু কম শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা স্কুলের কাজে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে না, অথবা স্কুলে নিষিদ্ধ হওয়ায় করতে পারে না। নিয়মকানুনের এই অসামঞ্জস্যের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অভিজ্ঞতায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। কেউ এআই-সহায়তায় গবেষণার কৌশল শিখছে, আবার কেউ কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় বা পেশাগত জীবনের জন্য তারা প্রস্তুত নাও হতে পারে, যেখানে এআই সম্পর্কে সচেতনতা প্রত্যাশিত।
ভবিষ্যতের জন্য এআই-সচেতনতা গড়ে তোলা
ব্যাপক ব্যবহার, উদ্বেগজনক নির্ভরতার প্রবণতা এবং শিক্ষার প্রস্তুতিতে অসামঞ্জস্য—সব মিলিয়ে কাঠামোবদ্ধ এআই-সচেতনতা কর্মসূচির প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এআই ব্যবহার করা যাবে কি যাবে না, কেবল এই আচরণকে অনুমোদন বা নিষেধ করার বিষয় হিসেবে না দেখে শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের সমালোচনামূলক মূল্যায়নের দক্ষতা, নৈতিক বিবেচনাবোধ এবং ব্যবহারিক সক্ষমতা গড়ে তোলায় মনোযোগ দিতে হবে।
চিবা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ওপর গবেষণায় দেখা যায়, এআই নিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়া শিক্ষার্থীরা এর সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাত চিনতে পারে এবং একই সঙ্গে যুক্তিসংগত সংশয় বজায় রেখে আরও পরিণতভাবে এটি ব্যবহার করে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগের পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এই মডেল মাধ্যমিক শিক্ষার জন্যও অনুসরণযোগ্য। এআইয়ের তৈরি তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হয়, অ্যালগরিদমের পক্ষপাত কীভাবে শনাক্ত করতে হয় এবং মানুষের যুক্তিবোধকে প্রতিস্থাপন না করে কীভাবে তা আরও কার্যকর করতে এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়—স্কুলের পাঠ্যক্রমে তা স্পষ্টভাবে শেখানো জরুরি। নিষেধাজ্ঞা অথবা অবাধ ব্যবহারের দ্বৈত নীতির গণ্ডি পেরিয়ে এগোতে হবে।
জাপানসহ অন্যান্য দেশ এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় জাপানের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। ব্যবহারের উচ্চ হার দেখায়, প্রতিষ্ঠানগত বিধিনিষেধ থাকলেও শিক্ষার্থীরা এআই গ্রহণ করবে; সামনে এগোনোর কার্যকর পথ তাই শিক্ষা। শিক্ষার্থীদের নিজেদের ধারণা অনুযায়ী চিন্তাশক্তির ওপর প্রভাবের তথ্য ইঙ্গিত দেয়, যথাযথ দিকনির্দেশনা ছাড়া এই সরঞ্জামগুলো যে চিন্তাশক্তিকে সহায়তা করার কথা, সেটিই দুর্বল করে দিতে পারে। শিক্ষকদের সামনে চ্যালেঞ্জ শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নয়। বরং শিক্ষার্থীরা যখন অনিবার্যভাবেই এটি ব্যবহার করবে, তখন তারা যেন অ্যালগরিদমের তৈরি তথ্যের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা না হয়ে সক্রিয় শিক্ষার্থী হিসেবে ব্যবহার করে, তা নিশ্চিত করা।
এক নজরে
- জাপানের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ৭৩.৭ শতাংশ নিয়মিত ChatGPT-এর মতো কথোপকথনভিত্তিক এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে
- নিম্নমাধ্যমিকে ব্যবহারের হার ৪৩.২ শতাংশ এবং প্রাথমিকের শিশুদের মধ্যে ৩৬.৬ শতাংশ
- প্রধান ব্যবহারগুলোর মধ্যে রয়েছে বাড়ির কাজে সহায়তা (উচ্চমাধ্যমিকের ৪২.৩ শতাংশ), তথ্য সংগ্রহ (২৬ শতাংশ) এবং সৃজনশীল ছবি তৈরি (প্রাথমিকের ২৩.৭ শতাংশ)
- ছাত্রীদের ব্যবহারের হার ছাত্রদের চেয়ে বেশি। পরামর্শ বা কথোপকথনের জন্য এআই ব্যবহার করে মেয়েদের ৪৯.৯ শতাংশ, ছেলেদের ক্ষেত্রে যা ২৩ শতাংশ
- উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি বলেছে, এআই ব্যবহারে তাদের চিন্তাশক্তি দুর্বল হচ্ছে। ছোট শিক্ষার্থীরা সাধারণত মনে করে, এতে তাদের সক্ষমতা বাড়ছে
- কিশোর এআই ব্যবহারকারীদের প্রায় ২০ শতাংশ নিজেরা যুক্তি প্রয়োগ না করে উত্তর বা হিসাবের জন্য সম্পূর্ণভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভর করে
- বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এআইয়ের উল্লেখ ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৪ গুণ বেড়েছে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার প্রতিফলন
- প্রযুক্তিকে চিন্তাশক্তির বিকল্প নয়, সহায়ক হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা কাঠামোবদ্ধ এআই-সচেতনতা শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন






