চেক-ইন কাউন্টারে ভাড়ার ধাক্কা
ফোনের পর্দার দিকে অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে ছিলেন জেনিফার। জাকার্তাভিত্তিক বেসরকারি খাতের এই কর্মী কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই মেদানে যান। শেষ মুহূর্তে দেশের ভেতরের ফ্লাইট বুক করেও সাধ্যের মধ্যে থাকা ভাড়ায় যাতায়াত করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। গত সপ্তাহে সেই অভ্যাসে ছেদ পড়ে। উত্তর সুমাত্রার কুয়ালানামু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঙ্গেরাংয়ের সোয়েকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দরের ইকোনমি শ্রেণির টিকিটের দাম প্রায় ১৬ লাখ রুপিয়া থেকে বেড়ে ১৯ লাখ রুপিয়া (৯৩ থেকে ১১১ মার্কিন ডলার) হয়েছিল, পরে তা দাঁড়ায় ২৫ লাখ রুপিয়ায়। বিজনেস ক্লাসের ভাড়া বেড়ে হয় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ রুপিয়া।
সূচিপত্র
“ব্যস্ত মৌসুম না হলে সাধারণত একই দিনেও টিকিট কেনা যায়,” বলেন জেনিফার। নিয়োগকর্তার কাছ থেকে গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তিনি নিজের আসল নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু এবার কোনো আসনই জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে, ফলে ফেরার যাত্রা দুই দিন পিছিয়ে দিতে হয়। তাঁর অভিজ্ঞতা দেশজুড়ে ক্ষোভের প্রতিফলন। ইন্দোনেশিয়ার যাত্রীরা বিমানভাড়া ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখছেন, যা সরকারের পূর্বাভাস দেওয়া ৯ থেকে ১৩ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি।
এর পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক সংঘাত, মুদ্রার অস্থিরতা এবং নিয়ন্ত্রক নীতির পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব। ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ জ্বালানি সারচার্জের সর্বোচ্চ সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। জেট ও প্রপেলার—দুই ধরনের উড়োজাহাজের জন্যই তা ৩৮ শতাংশ করা হয়। আগে জেট উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এই সীমা ছিল ১০ শতাংশ, আর টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং বিশ্বজ্বালানি বাজারে তার প্রভাবের কারণে এক মাসে জেট জ্বালানির দাম ৭০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত আসে।
ভাড়া বাড়ার পেছনের হিসাব
টিকিটের দাম এত দ্রুত কেন বেড়েছে, তা বুঝতে হলে ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিমানভাড়া নির্ধারণের জটিল কাঠামো দেখতে হবে। সরকার রুটের দূরত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়—বিমান সংস্থাগুলো ওই সীমার বেশি ভাড়া নিতে পারে না। এই কাঠামোর মধ্যে বিমান সংস্থাগুলো জ্বালানি সারচার্জ যোগ করতে পারে। বিমান টারবাইন জ্বালানি (অ্যাভটার) দামের ওঠানামার প্রভাব সামাল দিতেই এই অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয়। সারচার্জটি ইচ্ছেমতো নির্ধারিত হয় না; পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী এর হিসাব করা হয়।
জেট জ্বালানি সাধারণত ফ্লাইট পরিচালনার মোট ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পারতামিনা ১ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল সময়ের জন্য দাম বাড়ালে তার প্রভাব পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই, এবং তা ছিল ব্যাপক। সোয়েকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জেট জ্বালানির দাম মার্চে প্রতি লিটার ১৩,৬৫৬.৫১ রুপিয়া থেকে এপ্রিলে বেড়ে ২৩,৫৫১.০৮ রুপিয়া হয়—বৃদ্ধি ৭২ শতাংশের বেশি। আন্তর্জাতিক রুটে দাম আরও বেশি, ৮০.৩২ শতাংশ বেড়ে প্রতি লিটার প্রায় ১.৩৪ ডলারে পৌঁছায়।
অর্থনৈতিক বিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হার্তার্থো ৬ এপ্রিল ৩৮ শতাংশ সারচার্জের সর্বোচ্চ সীমা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, জেট ও প্রপেলার উড়োজাহাজের জন্য আগে আলাদা যে সীমা ছিল, তা এক করে দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আগে জেট উড়োজাহাজের জন্য সারচার্জের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ১০ শতাংশ, আর প্রপেলার উড়োজাহাজের জন্য ২৫ শতাংশ। এখন সবার জন্য তা এক করে ৩৮ শতাংশ করা হয়েছে।” ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনাল এয়ার ক্যারিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইনাকা) শুরুতে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির অনুরোধ করেছিল। তবে বিমান সংস্থাগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর অস্বাভাবিক চাপের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার আরও বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।
বিমান চলাচল বিশ্লেষক আলভিন লি হিসাব করে দেখিয়েছেন, সারচার্জ ১০ শতাংশ থেকে ৩৮ শতাংশে বাড়লে যৌক্তিকভাবেই টিকিটের দাম অন্তত ২৮ শতাংশ বাড়বে। সরকারের অতিরিক্ত সহায়তামূলক পদক্ষেপ থাকলেও উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি ছাড়া চূড়ান্ত মূল্যবৃদ্ধি ১৩ শতাংশের মধ্যে রাখা গাণিতিকভাবে অসম্ভব ছিল।
নীতির প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক
সরকার কয়েকটি আর্থিক পদক্ষেপ নিয়ে ভাড়াবৃদ্ধির ধাক্কা কমানোর চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো দুই মাসের জন্য ইকোনমি শ্রেণির টিকিটে ১১ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সরকার বহন করবে—স্থানীয়ভাবে যা পিপিএন ডিটিপি (সরকারের বহন করা ভ্যাট) নামে পরিচিত। এতে মাসে সরকারের রাজস্ব ছাড়ের পরিমাণ প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়া। এ ছাড়া উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক তুলে দেওয়া হয়েছে, এতে বছরে রাষ্ট্রের ব্যয় হবে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন রুপিয়া।
এসব পদক্ষেপের পর এয়ারলাঙ্গা বলেন, সরকার আশা করছে “টিকিটের দাম ৯ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে বাড়বে।” কিন্তু জেনিফারের মতো যাত্রীরা ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি বৃদ্ধি দেখছেন। এই ব্যবধানের একটি বড় কারণ বাস্তবায়নে গুরুতর বিলম্ব। পরিবহন মন্ত্রণালয় ৩৮ শতাংশ জ্বালানি সারচার্জের অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রণালয়ের ৮৩/২০২৬ নম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করলেও, বিমান সংস্থাগুলো ভাড়া সমন্বয় শুরু করার সময় অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতিশ্রুত ভ্যাট ভর্তুকি ছাড়েনি।
এ পর্যন্ত কার্যকর একমাত্র বিধান হলো মন্ত্রণালয়ের ৮৩/২০২৬ নম্বর প্রজ্ঞাপনের অধীনে ৩৮ শতাংশ জ্বালানি সারচার্জ। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এখনো নতুন কোনো লিখিত বিধান জারি হয়নি,
ইনাকার মহাসচিব বায়ু সুতান্তো সাংবাদিকদের এই ঘাটতির কথা জানান। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় সাময়িক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, আর বিমান সংস্থাগুলো করছাড়ের সুবিধা না দিয়েই সারচার্জ আরোপ করেছে। বিশ্লেষক লি ব্যাখ্যা করেন, ১১ শতাংশ ভ্যাট ভর্তুকি চালু হলেও হিসাব মেলানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, “ভোক্তাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন একমাত্র পদক্ষেপ হলো টিকিট থেকে ১১ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেওয়া। ২৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি থেকে তা বাদ দিলেও দাম ১৭ শতাংশ বাড়ছে।”
খুচরা যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক তুলে দিলে দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি মিলবে; রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। তবে লি সতর্ক করে বলেন, এই সুবিধা প্রথমে রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও) সেবা প্রদানকারীদের কাছে পৌঁছাবে। সেখান থেকে সাশ্রয়ের সুফল টিকিটের দামে আসতে দুই থেকে তিন মাস লাগতে পারে।
লোকসান বাড়ায় রুট কমাচ্ছে বিমান সংস্থাগুলো
জ্বালানির খরচের বাইরেও ইন্দোনেশিয়ার বিমান সংস্থাগুলো আর্থিক চাপে রয়েছে। ২০১৯ সালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপিয়ার দর ছিল প্রায় ১৪,১০০; ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তা দুর্বল হয়ে প্রায় ১৭,০০০-এ নেমেছে। এতে বিমান সংস্থাগুলোর ব্যয়ে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে: তাদের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ডলারে, অথচ আয় মূলত স্থানীয় মুদ্রায়। সর্বশেষ জ্বালানি সংকটের আগেই ২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা গারুদা ইন্দোনেশিয়ার নিট লোকসান ছিল ৫.৪ ট্রিলিয়ন রুপিয়া, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা কমাচ্ছে। এয়ারএশিয়া জানিয়েছে, তারা “বেশ কয়েকটি রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা সমন্বয় করেছে”; তবে কোন রুটগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা জানায়নি। অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে যেসব কার্যক্রমের ফল সবচেয়ে ভালো, সেগুলোকে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর আচমাদ সাদিকিন এই পরিবর্তনকে প্রয়োজনীয় অভিযোজন হিসেবে তুলে ধরেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বিমান চলাচল খাত বর্তমানে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি—আমরা তা বুঝি। তাই কার্যক্রম সুস্থ ও অভিযোজনক্ষম রাখা এবং জনসাধারণকে সর্বোত্তম সেবা দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে পরিচালনাগত সমন্বয় করছি।”
ইনাকার বায়ু বলেন, মে মাস পর্যন্ত সময়টি সাধারণত ভ্রমণের নিম্ন মৌসুম এবং চাহিদাও কম থাকে। তাই বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা কমাতে বা নির্দিষ্ট কিছু রুট সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের ৩০ দিনের মধ্যে বিনা মূল্যে তারিখ পরিবর্তন, ভ্রমণ ক্রেডিট অথবা টাকা ফেরতের মতো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, বৃহত্তর আর্থিক মন্দার মধ্যেও গারুদা ইন্দোনেশিয়া আসন্ন হজ মৌসুমের মতো বেশি যাত্রী চলাচলের রুটে মনোযোগ দিচ্ছে। ২১ এপ্রিল থেকে ১ লাখ ২ হাজারের বেশি হজযাত্রী পরিবহনে তারা ১৫টি বড় উড়োজাহাজ নিয়োজিত করছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, পরিস্থিতিটি “ক্ষতি ভাগাভাগি”র কৌশল তুলে ধরে, যেখানে বিমান সংস্থা, যাত্রী ও রাষ্ট্র—সবার ওপরই চাপের কিছুটা অংশ পড়ে। লি বলেন, “বিমান সংস্থা ও যাত্রীরা যাতে পুরো চাপের মুখে না পড়ে, সে জন্য সরকার ১১ শতাংশ ভ্যাট তুলে দিয়েছে। এতে মাসে টিকিট থেকে প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়া রাজস্ব ছাড় দিতে হচ্ছে।” সমন্বয়মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা স্বীকার করেছেন, “সব সমস্যার একক কোনো সমাধান নেই”; তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়াই একমাত্র দেশ নয়, যারা এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিকল্প ভাবছেন যাত্রীরা
ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দ্বীপপুঞ্জজুড়ে ভ্রমণের ধরন বদলে যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা অভিযোগে ভরিয়ে তুলেছেন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম; কেউ কেউ ভ্রমণ বাতিল করছেন বা পিছিয়ে দিচ্ছেন। থ্রেডস ব্যবহারকারী দিয়ন হারিয়াদি ৭ এপ্রিল লিখেছেন, বাতাম থেকে জাকার্তায় বাতিক এয়ারের টিকিটের দাম স্বাভাবিক ১৫ লাখ রুপিয়া থেকে বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ রুপিয়া হয়েছে। আবার অনেকে দেখছেন, দেশের ভেতরে ভ্রমণের চেয়ে বিদেশে যাওয়া এখন সস্তা হতে পারে।
জেনিফার দেখেছেন, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর হয়ে মেদান থেকে জাকার্তা যাওয়ার খরচ, পাদাং হয়ে যাওয়া অভ্যন্তরীণ রুটের চেয়ে কম। পাদাং হয়ে গেলে ভাড়া ৩০ লাখ রুপিয়ার বেশি। তিনি বলেন, “তখন জাকার্তায় যাওয়ার সরাসরি কোনো অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ছিল না, কিন্তু কুয়ালালামপুর হয়ে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট সঙ্গে ছিল না।” ভাড়ার এই উল্টো চিত্রের অযৌক্তিকতাই তাঁর কথায় ফুটে ওঠে।
ত্রিসক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন বিশেষজ্ঞ আজরিল আজাহারি সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশের গন্তব্যের তুলনায় ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ পর্যটনকেন্দ্রগুলো ক্রমেই কম সাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, “সিঙ্গাপুরে উড়ে যাওয়া রাজা আমপাত, কোমোডো দ্বীপ, এমনকি বালিতে যাওয়ার চেয়েও সস্তা হতে পারে।” ভাড়া প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে না ফিরলে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন আকর্ষণ কমে যেতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ান ট্রান্সপোর্টেশন সোসাইটির (এমটিআই) পরিবহন বিশ্লেষক রেভি পেত্রাগ্রাদিয়া ধারণা করছেন, যাত্রীরা আরও বাছবিচার করে ভ্রমণ করবেন। এর ফলে আকাশপথে যাত্রীর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমতে পারে। তিনি বলেন, “ব্যবসায়িক সফর হয়তো আগের মতো চলবে, কিন্তু ইকোনমি শ্রেণির যাত্রী এবং স্বল্প দূরত্বে যাঁরা ভ্রমণ করেন, তাঁরা অবশ্যই দুবার ভাববেন। স্বল্প দূরত্বের রুটে আকাশপথ থেকে স্থল বা নৌপথে যাতায়াতের প্রবণতা বাড়তে পারে।”
চাহিদা কমার এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সরকারি কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে বিমান সংস্থাগুলো আগে থেকেই চাপে রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকারি সফরে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া গত সপ্তাহে জানান, চলতি বছরে সরকার ১২১.২ ট্রিলিয়ন থেকে ১৩০.২ ট্রিলিয়ন রুপিয়া সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়েছে। এ জন্য সরকারি সফরসহ অনাবশ্যক ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতার পেছনে বৈশ্বিক চাপ
ইন্দোনেশিয়ার বিমান চলাচল সংকটকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষত ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে এর প্রভাব বিশ্বজ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্বের দৈনিক ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়; এর ৮০ শতাংশের বেশি যায় এশিয়ায়।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির অংশ প্ল্যাটসের মূল্যায়নে, ৬ এপ্রিল সিঙ্গাপুরে জেট জ্বালানি বা কেরোসিনের বেঞ্চমার্ক এফওবি মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ২২৮.৭৬ ডলার। টানা ষষ্ঠ বাণিজ্যিক সেশনেও দাম ২০০ ডলারের ওপরে ছিল। অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানির দামের ব্যবধান ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে ছিল, যা পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের চরম সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এই দাম বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন সরকার ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফিলিপাইন জ্বালানি সারচার্জ বাড়িয়ে অষ্টম স্তরে নিয়েছে। দূরত্ব অনুযায়ী এতে ২৫৩ থেকে ৬,২০৮.৯৮ ফিলিপাইন পেসো পর্যন্ত ফি নেওয়া যাবে; একই সঙ্গে দেশটিতে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ভিয়েতনামে ৬০ শতাংশের বেশি বিমান সংস্থা ভাড়া বাড়িয়েছে বা ৫ থেকে ২০ শতাংশ জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করেছে। থাইল্যান্ড নির্দিষ্ট কিছু রুটে বিশেষ জ্বালানি সারচার্জ বসিয়েছে। অন্যদিকে, ব্যয়ের চাপ সামলাতে সিঙ্গাপুর টেকসই বিমান জ্বালানির ওপর শুল্ক আরোপের কাঠামো ছয় মাস পিছিয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সতর্ক করেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত দাম বাড়তে থাকলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১.৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) মহাপরিচালক উইলি ওয়ালশ সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও জেট জ্বালানির সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস লাগবে। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা হবে।”
ইন্দোনেশিয়ায় ফিরে এলে, ভ্যাট ভর্তুকি কত দিন চলবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিমান সংস্থাগুলোর ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। এমটিআইয়ের রেভি বলেন, ভবিষ্যৎ ব্যয় নিয়ে রক্ষণশীল হিসাব করতে বাধ্য হচ্ছে বিমান সংস্থাগুলো। তাঁর পরামর্শ, পর্যটন ও সৃজনশীল অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বে ফ্লাইট, আবাসন ও পর্যটন কার্যক্রম মিলিয়ে সমন্বিত ভ্রমণ প্যাকেজ তৈরি করে সরকার এই খাতকে সহায়তা করতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- ইন্দোনেশিয়া সব ধরনের উড়োজাহাজের জন্য জ্বালানি সারচার্জের সর্বোচ্চ সীমা ৩৮ শতাংশ করেছে; আগে জেট উড়োজাহাজের জন্য তা ছিল ১০ শতাংশ, আর টার্বোপ্রপের জন্য ২৫ শতাংশ।
- সোয়েকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দরে এক মাসে জেট জ্বালানির দাম ৭২.৪৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি লিটার ১৩,৬৫৬.৫১ রুপিয়া থেকে ২৩,৫৫১.০৮ রুপিয়ায় পৌঁছেছে।
- যাত্রীরা দেশের ভেতরের বিমানভাড়া ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার কথা জানাচ্ছেন, যা সরকারের পূর্বাভাস দেওয়া ৯ থেকে ১৩ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি।
- সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতার ব্যবধানের একটি কারণ হলো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিশ্রুত ভ্যাট ভর্তুকি ছাড়ে বিলম্ব।
- বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা কমাচ্ছে এবং রুট স্থগিত করছে; এয়ারএশিয়া দেশের ভেতরের ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি রুটে পরিচালনাগত সমন্বয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
- মুদ্রার চাপ সংকটকে আরও বাড়িয়েছে: বিমান সংস্থার পরিচালন ব্যয়ের ৭০ শতাংশ ডলারে, আর আয় রুপিয়ায়। ২০১৯ সাল থেকে ডলারের বিপরীতে রুপিয়ার দর ১৪,১০০ থেকে কমে প্রায় ১৭,০০০-এ দাঁড়িয়েছে।
- রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা গারুদা ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে ৫.৪ ট্রিলিয়ন রুপিয়া নিট লোকসান করেছে, যা আগের বছরের লোকসানের প্রায় পাঁচ গুণ।
- বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বল্প দূরত্বে যাত্রীরা স্থল বা নৌপথে যাওয়ায় আকাশপথে যাত্রীর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমতে পারে।
- সংকটের পেছনে বৈশ্বিক চাপও রয়েছে: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে জেট জ্বালানির দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।
- সরকারি সহায়তার পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে মাসে ১.৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়া ভ্যাট বহন করা এবং উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে বছরে ৫০০ বিলিয়ন রুপিয়ার শুল্ক তুলে দেওয়া।






