উন্নত বিশ্বে নজিরবিহীন প্রজন্মগত কর্মশক্তি ত্যাগ
দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মশক্তির এমন এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা দেশটিকে অন্য সব উন্নত অর্থনীতি থেকে আলাদা করেছে। ২০২৫ সালে ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৮২.৩ শতাংশে। ২০০০ সালের পর থেকে এ হার ৭.৬ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে, যা নাটকীয় পতন। এই পরিবর্তনের ব্যাপ্তি বুঝতে হলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ৩৮টি সদস্যদেশে একই সময়ে গড় পতন ছিল মাত্র ২.৬ শতাংশ পয়েন্ট; অংশগ্রহণের হার ৯৩.২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৯০.৬ শতাংশ। গত ২৫ বছরে কোরিয়ায় সামগ্রিক কর্মশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বরং ৬১.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৪.৫ শতাংশ হয়েছে। এর পেছনে মূলত নারীদের কর্মশক্তিতে যোগ দেওয়া এবং বয়স্ক কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে থেকে যাওয়ার ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তরুণ পুরুষেরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন, যা সাময়িক ওঠানামার বদলে কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর থেকে এ পতন অব্যাহত রয়েছে। একসময় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ওইসিডির হার থেকে কোরিয়ার হার ক্রমাগত দূরে সরে গেছে।
সূচিপত্র
- উন্নত বিশ্বে নজিরবিহীন প্রজন্মগত কর্মশক্তি ত্যাগ
- শ্বেতপোশাকের চাকরির প্রতিযোগিতায় লিঙ্গগত পালাবদল
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি
- সনদনির্ভর যোগ্যতার ফাঁদ
- প্রজন্মগত প্রভাব: সরে যাওয়া যখন স্থায়ী হয়
- জনমিতিক বাস্তবতার মুখোমুখি একটি দেশ
- শ্রমবাজারের দ্বৈততা ও প্রবেশপথে জট
- নীতিগত সমাধানের খোঁজ
- মূল কথা
এই বিচ্ছিন্নতার ধরন মন্দার সময় দেখা প্রচলিত বেকারত্বের চিত্র থেকে আলাদা। অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় তরুণ পুরুষদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় অংশটি নিজেদের “বিশ্রামে” থাকা বলে শ্রেণিবদ্ধ করে। ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ৪.৮ শতাংশ, আর ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩.৭ শতাংশ। চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া তরুণদের অনুপাতের তুলনায় এই হার অনেক বেশি। এ শ্রেণিবিন্যাস থেকে বোঝা যায়, তাঁরা সাময়িকভাবে চাকরি খোঁজা বন্ধ করেননি; বরং পুরোপুরি শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন। এ প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের কম অংশগ্রহণের হার প্রায়ই পরবর্তী জীবনে শ্রম সরবরাহ বৃদ্ধির আগে দেখা যায়—কর্মীরা সেখানে উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোরিয়ায় কর্মশক্তি ছেড়ে যাওয়া তরুণ পুরুষদের ফিরে আসার প্রবণতা সামান্যই। এই স্থায়ীভাবে সরে যাওয়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন দেশটি বিশ্বের দ্রুততম জনসংখ্যা বার্ধক্য এবং ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন জন্মহারের মুখোমুখি।
শ্বেতপোশাকের চাকরির প্রতিযোগিতায় লিঙ্গগত পালাবদল
পুরুষদের এই কর্মশক্তি ত্যাগের আড়ালে রয়েছে এক নাটকীয় জনমিতিক পালাবদল, যা কোরিয়ার চাকরির প্রতিযোগিতার চিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। তরুণ পুরুষেরা যখন কর্মশক্তি থেকে সরে যাচ্ছেন, তখন ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারীরা অভূতপূর্ব গতিতে এতে যোগ দিচ্ছেন। ২০২৫ সালে এই বয়সী নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৫.১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭.৫ শতাংশে; ফলে এক প্রজন্ম ধরে থাকা ব্যবধান কার্যত ঘুচে গেছে। উচ্চশিক্ষিত কর্মশক্তির গঠনও পুরুষপ্রধান অবস্থা থেকে প্রায় সমতায় পৌঁছেছে। ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় মানুষের মধ্যে নারীদের অনুপাত ছিল পুরুষদের অর্ধেক; ২০২৫ সালে তা প্রায় সমান হয়েছে।
একসময় পুরুষদের নির্ভরযোগ্য কর্মসংস্থানের পথ হিসেবে বিবেচিত পেশাগত ক্ষেত্রগুলোতেও এ পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। কেরানি পেশায় এখন পুরুষদের তুলনায় নারীদের কর্মসংস্থানের হার ১১৪ শতাংশ; অর্থাৎ ঐতিহ্যগতভাবে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ থাকা এসব পদে এখন নারীর সংখ্যা বেশি। পেশাজীবী পদে নারীরা পুরুষদের কর্মসংস্থানের ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছেন, অর্থাৎ প্রায় সমতা অর্জন করেছেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া চার বছর মেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি বা তার বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তুলনামূলক প্রজন্মের চেয়ে ১৫.৭ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে তাঁদের নারী সমবয়সীদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বেড়েছে ১০.১ শতাংশ পয়েন্ট। পুরুষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত উৎপাদনশিল্পের সংকোচনের পাশাপাশি বেড়েছে সেবা খাত। এ খাতে নারীরা তাঁদের শিক্ষা ও দক্ষতার কারণে এগিয়ে রয়েছেন।
“পেশাজীবী ও কেরানি পদে তরুণীদের সংখ্যা পুরুষদের কাছাকাছি পৌঁছেছে,” বলেছেন ব্যাংক অব কোরিয়ার এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, ভালো চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি
জনমিতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার ধারাবাহিকভাবে সেই প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিগুলো বিলুপ্ত করছে, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে তরুণ পুরুষদের স্থিতিশীল কর্মজীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সোপান হিসেবে কাজ করত। গত চার বছরে তরুণদের চাকরি হারানোর ঘটনা বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব বেশি—এমন পেশায়। বিশেষ করে একঘেয়ে কেরানি ও প্রশাসনিক পদগুলোতে, যেখানে একসময় বহু পুরুষ স্নাতক প্রথম পেশাগত কাজের সুযোগ পেতেন। প্রযুক্তিটি ঠিক সেই নিয়মিত জ্ঞানভিত্তিক কাজগুলো প্রতিস্থাপন করছে, যেগুলো তরুণ কর্মীদের প্রাথমিক কর্ম-অভিজ্ঞতা ও আয়ের স্থিতিশীলতা দিত।
প্রযুক্তির কারণে কাজ হারানোর প্রভাব তরুণ পুরুষদের ওপর বিশেষভাবে গুরুতর, কারণ একই সময়ে উচ্চশিক্ষিত নারীদের কর্মশক্তিতে যোগ দেওয়ার হার বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে উভয় লিঙ্গের মানুষের চাকরি গেলেও পুরুষেরা দ্বিমুখী চাপে পড়ছেন: পুরুষপ্রধান প্রচলিত কর্মসংস্থানের পথগুলো বিলুপ্ত হচ্ছে, আর অবশিষ্ট পদগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে আরও বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন নারী প্রার্থীর সঙ্গে। ফলে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, যেখানে ওপরের স্তরের পদগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় বিলুপ্ত হচ্ছে, আর নিচের স্তর থেকে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। পেশাগত পদ পেতে সমস্যায় পড়া পুরুষ স্নাতকদের জন্য একসময় নির্ভরযোগ্য বিকল্প ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের কেরানির কাজ। এখন বিকল্প পদের জন্য প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়ার ঠিক সময়েই সেই চাকরিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।
সনদনির্ভর যোগ্যতার ফাঁদ
কোরিয়ার কুখ্যাত শিক্ষাগত প্রতিযোগিতা এ সংকটকে আরও গভীর করেছে। কারিগরি প্রশিক্ষণের চেয়ে উচ্চশিক্ষায় কয়েক দশকের জাতীয় মনোযোগ স্নাতকদের দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদার মধ্যে অসংগতি তৈরি করেছে। ওইসিডির ২০২২ সালের একটি কার্যপত্রে বলা হয়েছে, উৎপাদনশিল্পের পতন—যা ঐতিহাসিকভাবে তরুণ পুরুষদের কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস ছিল—এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক পুরুষ স্নাতক উপলভ্য চাকরির তুলনায় অতিরিক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে পড়েছেন। অথচ উদীয়মান প্রযুক্তি ও সেবা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা তাঁদের নেই। শিক্ষাগত সনদের দৌড় এমন এক প্রজন্মের তরুণ পুরুষদের শ্রমবাজারে সাফল্য এনে দিতে পারেনি, যাঁদের নির্দিষ্ট যোগ্যতার আর কদর নেই এবং যাঁদের সাধারণ দক্ষতাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে।
প্রজন্মগত প্রভাব: সরে যাওয়া যখন স্থায়ী হয়
ব্যাংক অব কোরিয়ার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা নয়; বরং পুরো প্রজন্মজুড়ে বিস্তৃত এক প্রজন্মগত প্রভাব। এর অর্থ, তরুণ পুরুষদের শ্রমবাজারে প্রবেশ কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে, অথবা তাঁরা স্থায়ীভাবে তা থেকে সরে যাচ্ছেন। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর থেকে অংশগ্রহণের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং একসময় কোরিয়ার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ওইসিডির গড় থেকে ক্রমে দূরে সরে গেছে। ওই সংকটের আগে কোরিয়ার তরুণ পুরুষদের অংশগ্রহণের হার অন্যান্য উন্নত দেশের কাছাকাছি ছিল; এরপর থেকে তা ক্রমাগত কমে এখন আন্তর্জাতিক মানের অনেক নিচে। এ স্থায়িত্ব ইঙ্গিত দেয়, এই প্রবণতা অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই গেঁথে গেছে; অর্থনৈতিক চক্রের উন্নতি বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রণোদনায় এর পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
নিষ্ক্রিয় তরুণ পুরুষদের শ্রেণিবিন্যাস থেকে কাঠামোগত বেকারত্বের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ মেলে, যা সাময়িক বাধাজনিত বেকারত্ব থেকে আলাদা। চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের থেকে পৃথক “বিশ্রামে” থাকা শ্রেণিটি ইঙ্গিত দেয়, একটি প্রজন্ম পুরোপুরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে এ প্রবণতা মৌলিকভাবে আলাদা। সেখানে তরুণেরা প্রায়ই উচ্চশিক্ষার জন্য কর্মজীবনে প্রবেশ পিছিয়ে দেন, পরে বেশি আয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ফিরে আসেন। কোরিয়ায় অল্প বয়সে কর্মশক্তি ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে নিয়মিত কর্মসংস্থানের পথ থেকে স্থায়ীভাবে বাদ পড়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে এমন এক প্রজন্মের পুরুষ তৈরি হচ্ছে, যাঁরা হয়তো কখনোই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবেন না বা পরিবার গড়তে পারবেন না। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এ বিচ্ছিন্নতা শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কাটার সম্ভাবনা কম।
“তরুণ পুরুষদের অংশগ্রহণের হার দ্রুত কমে যাওয়া এবং কাজ খুঁজছেন না—এমন মানুষের অনুপাত বেড়ে যাওয়া উদ্বেগজনক,” বলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা।
জনমিতিক বাস্তবতার মুখোমুখি একটি দেশ
এই কর্মশক্তি সংকটের সময় এর চেয়ে খারাপ হতে পারত না; দেশটি নজিরবিহীন জনমিতিক সংকোচনের মুখোমুখি। বিশ্বের সর্বনিম্ন ০.৭ জন্মহারের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ২.১ প্রতিস্থাপন হারের অনেক নিচে। ২০২১ সালে দেশটির জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ছয় দশকে জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে; ২০৮০ সাল নাগাদ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৮ শতাংশ হবে বয়স্ক মানুষ। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের তুলনায় অবসরপ্রাপ্তদের অনুপাত নির্দেশকারী বার্ধক্য নির্ভরতার হার বর্তমানে ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫৫ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব ওইসিডি দেশের মধ্যে এ বৃদ্ধিই হবে সবচেয়ে বেশি।
এ পরিস্থিতিতে প্রতিটি তরুণ কর্মী হারানো মানে কয়েক দশক ধরে বহুগুণে ছড়িয়ে পড়া অর্থনৈতিক ক্ষতি। বয়স্ক কর্মীদের স্থলাভিষিক্ত করার মতো শিশুর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, আর তরুণ পুরুষেরা স্বেচ্ছায় কর্মশক্তি ছেড়ে দিচ্ছেন। ফলে প্রজন্মগত কাঠামোর প্রবেশ ও প্রস্থান—দুই প্রান্তেই শ্রম সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পেনশনের আর্থিক বোঝা ২০৬০ সাল নাগাদ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে জিডিপির ১৭.৪ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা চলতে থাকলে এ বোঝা বহনের মতো উৎপাদনশীল কর্মশক্তি আদৌ তৈরি না-ও হতে পারে। কিছু পৌরসভায় ইতিমধ্যে কিন্ডারগার্টেনকে নার্সিং হোমে এবং বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলকে শেষকৃত্যের কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে দেখা যাচ্ছে। এটি এমন এক অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের আভাস দেয়, যেখানে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মতো উৎপাদনশীল মানুষের ভিত্তি খুবই সংকীর্ণ।
শ্রমবাজারের দ্বৈততা ও প্রবেশপথে জট
কোরিয়ার শ্রমবাজারের কাঠামোগত অনমনীয়তা প্রবেশের পথে বাধা তৈরি করে এ চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দেশটির কুখ্যাত শ্রমবাজারের দ্বৈততায় নিয়মিত ও অনিয়মিত কর্মসংস্থানের মধ্যে গভীর ব্যবধান রয়েছে। নিয়মিত চাকরিতে স্থিতিশীলতা, সুযোগ-সুবিধা ও জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক বেতন থাকলেও অনিয়মিত চাকরিতে কাজের পরিবেশ অনিশ্চিত এবং পদোন্নতির সুযোগ সীমিত। তরুণ কর্মীরা ক্রমেই অনিয়মিত পদে আটকে পড়ছেন, যেখান থেকে নিয়মিত চাকরিতে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে, বয়স্ক ও উচ্চশিক্ষিত কর্মীরা আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি দিন নিজ নিজ পদে থাকছেন। ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বয়স্ক কর্মীদের কর্মসংস্থানের হার যতটা বেড়েছে, তার ১০৪ শতাংশের পেছনে তাঁদের এই দীর্ঘদিন পদে থেকে যাওয়ার ভূমিকা ছিল। ফলে তরুণ প্রতিভাকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে পারত—এমন পদোন্নতির পথ ও নতুন নিয়োগের পদ কার্যত আটকে গেছে।
প্রবেশপথে এই জট স্বাভাবিক কর্মী আবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা তরুণ পুরুষদের কর্মজীবনের ধাপে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারত। ওইসিডির ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, জনসংখ্যা বার্ধক্যের মুখে কর্মজীবন দীর্ঘায়িত করা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা বজায় রাখার পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্যও এ দ্বৈততা মোকাবিলা করা জরুরি। সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, মজুরি নির্ধারণে জ্যেষ্ঠতার গুরুত্ব কমানো এবং আইনগত অবসরের বয়স বাড়ানো তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও নতুনদের জন্য সুযোগ তৈরিতে প্রয়োজনীয়।
নীতিগত সমাধানের খোঁজ
প্রযুক্তির কারণে কাজ হারানো, লিঙ্গভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং জনসংখ্যা সংকোচনের এই সম্মিলিত সংকটের মুখে ব্যাংক অব কোরিয়া তরুণ পুরুষদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে জরুরি সুপারিশ দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাডেমিক সনদনির্ভরতা থেকে সরে এসে কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণের পক্ষে মত দিয়েছে, যাতে শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে তাল মেলানো যায়। নতুন নিয়োগের সুযোগ বাড়াতে নিয়মিত কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত কঠোর সুরক্ষা শিথিল করার পাশাপাশি অনিয়মিত কর্মীদের স্থিতিশীল ও সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পদে যাওয়ার পথ শক্তিশালী করারও আহ্বান জানিয়েছে।
ওইসিডির বৃহত্তর সুপারিশগুলোও এসব ব্যবস্থার পরিপূরক। এতে বলা হয়েছে, কোরিয়াকে শ্রমবাজারের দ্বৈততা সামগ্রিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে, উচ্চ ও নিম্ন—দুই ধরনের দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকের সরবরাহ বাড়াতে অভিবাসন নীতি সংস্কার করতে হবে এবং তরুণ কর্মীদের পরিবার গঠনে নিরুৎসাহিত করা উচ্চ সুযোগব্যয় মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায়, কর্মীর সংখ্যা কমতে থাকবে অথচ বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে; আর তরুণ পুরুষদের একটি পুরো প্রজন্ম অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকবে, বছরের পর বছর কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে তাদের দক্ষতা কমবে এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের প্রেক্ষাপটে, তরুণদের শ্রমবাজারে প্রবেশে সহায়তার জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ জোরদার করা জরুরি হবে।
মূল কথা
- দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৭.৬ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৮২.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ওইসিডির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় পতন; গড় পতন ছিল মাত্র ২.৬ পয়েন্ট
- একই বয়সী নারীদের অংশগ্রহণের হার ২৫.১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৭৭.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। পেশাজীবী ও কেরানি পদে নজিরবিহীন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যেখানে নারীরা এখন পুরুষদের সমান বা বেশি কর্মসংস্থানের হার অর্জন করেছেন
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত প্রাথমিক পর্যায়ের কেরানির চাকরি বিলুপ্ত করছে। এতে পুরুষদের প্রচলিত কর্মসংস্থানের পথগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, আর বয়স্ক কর্মীরা পদে বেশি দিন থাকায় নতুন নিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে
- নিষ্ক্রিয় তরুণ পুরুষদের ক্রমবর্ধমান অংশ কাজ খোঁজার বদলে নিজেদের “বিশ্রামে” থাকা বলে শ্রেণিবদ্ধ করছেন। এতে শ্রমবাজার থেকে স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত মেলে, যা বয়স বাড়লে কাটার সম্ভাবনা কম
- বিশ্বের সর্বনিম্ন ০.৭ জন্মহার এবং ওইসিডির মধ্যে দ্রুততম বার্ধক্যের প্রেক্ষাপটে ২০৮০ সাল নাগাদ জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তরুণ কর্মীদের বিচ্ছিন্নতা চলতে থাকলে কোরিয়া আর্থিক সংকটে পড়বে
- নীতিগত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সংস্কার, নিয়মিত ও অনিয়মিত কর্মসংস্থানের মধ্যকার শ্রমবাজারের অনমনীয়তা কমানো এবং অভ্যন্তরীণ শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় অভিবাসন সম্প্রসারণ






