স্বপ্নের শহর যখন বসবাসের অযোগ্য
শনিবার সকাল ৯টায় দিল্লির আনন্দ বিহার রেলস্টেশনকে ২০২০ সালের কোনো দৃশ্য বলে মনে হয়। পরিবারগুলো কাঁধে তোশক, স্টিলের হাঁড়ি আর কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে ভারসাম্য রেখে এগোচ্ছে; পেছনে শিশুরা, যতটা পারে নিজেদের জিনিসপত্র আঁকড়ে ধরে। ৩৫ বছর বয়সী রাজু প্রসাদ ভিড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী, কোলে ছোট মেয়ে, হাতে সাদা প্লাস্টিকের বালতি। পেছনে আরও তিন সন্তান, তাদের একজন টেনে নিচ্ছে চাকার ব্যাগ। সাত সদস্যের পরিবারটি, প্রসাদের ভাইসহ, উত্তর প্রদেশের গোরখপুরে ফিরে যাচ্ছে। নয় মাসের মরিয়া লড়াইয়ের পর তারা রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছে।
সূচিপত্র
প্রসাদ পরিবার ভারতের নগরজীবন বদলে দেওয়া উল্টো অভিবাসনের ক্রমবর্ধমান ঢেউয়ের প্রতীক। দৈনিক মজুরি ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগের আশায় একসময় তারা দিল্লিতে এসেছিল; এখন এমন এক সংকট থেকে পালাচ্ছে, যা মৌলিকভাবে বেঁচে থাকাকেও অসম্ভব করে তুলেছে। তাদের শেষ গ্যাস সিলিন্ডারটি শেষ হয়েছে পনেরো দিন আগে। জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে সাময়িক স্বস্তি মিলেছিল, কিন্তু সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কালোবাজারি দাম স্বাভাবিক দামের চার-পাঁচ গুণে পৌঁছেছে। ফলে পরিবারটির সামনে কঠিন এক সিদ্ধান্ত।
হাজারো মানুষকে একই রকম সিদ্ধান্তে ঠেলে দেওয়া মরিয়া অবস্থার কথা জানালেন প্রসাদ।
আমরা এখানে আর কয়েক দিন থাকলেও আমাদের সন্তানরা না খেয়ে মারা যেতে পারে। এই সংকট কী, তা তারা বোঝে না। আমরা শুধু দেখি, তারা খাবারের জন্য কাঁদছে।
নয়াদিল্লি রেলস্টেশনেও একই রকম দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মগুলো বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও রাজস্থানের শ্রমিকে ভরে উঠছে; তাঁদের পিঠে স্যুটকেসের চেয়েও বড় ফোলা রুকস্যাক। কেউ কেউ পরিবারের অনুষ্ঠানের কথা বানিয়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি আড়াল করছেন। ২৯ বছর বয়সী সুমন ভার্মা যেমন বলেছিলেন, তিনি বিয়েতে যাচ্ছেন। তাঁর ছোট ছেলে অংশু পরিণত বুদ্ধিতে সত্যিটা প্রকাশ করে দেয়।
আমরা সবাই আসল কারণ জানি। শিগগিরই লকডাউন হবে। বাবা বলেছেন, সব দোকান বন্ধ হয়ে যাবে, পরে আর ফিরতে পারব না। আমাদের গ্যাস আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, আর মা অস্থায়ী চুলায় রান্না করছিলেন।
বেঁচে থাকার হিসাব: রান্না যখন বিলাসিতা
ভারতের লাখো অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর জন্য শহুরে দারিদ্র্যের হিসাব সব সময়ই নির্মম। দৈনিক ৫০০ থেকে ৮০০ রুপি আয় করা শ্রমিকদের এখন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে এক বেলার খাবারেই দিনের অর্ধেক মজুরি খরচ হয়ে যেতে পারে। পঁচিশ বছর বয়সী সারফরাজ আনন্দ বিহারে ব্যাগের পাশে বসে আছেন। বিহারে বাড়ি ফেরার টিকিট কিনতে পরিবারের কাছ থেকে ৩০০ রুপি পাঠানোর অপেক্ষায়। তিনি বলেন, "পরিবারকে সহায়তা করতে এখানে এসেছিলাম, অথচ এখন ফেরার জন্য তাদের কাছেই টাকা চাইছি।" আঠারো বছর বয়সে বিয়ে করে চার সন্তানের বাবা হওয়া সারফরাজ জেওয়ার নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণকাজে যোগ দিতে দিল্লিতে এসেছিলেন। দৈনিক মজুরি ৫৫০ রুপি। বিশ দিন ধরে তাঁর গ্যাস শেষ। কালোবাজারে সিলিন্ডারের দাম ৯০০ থেকে বেড়ে এখন ৪,৫০০ রুপি, আর খাবারের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র নেই—এমন মানুষের ওপর সংকটের আঘাত সবচেয়ে বেশি। ভারতে বৈধ এলপিজি সংযোগ পেতে পরিবারগুলোকে অনুমোদিত পরিবেশকের মাধ্যমে পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণ দিয়ে আগাম সিলিন্ডার বুক করতে হয়। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা অভিবাসীদের কাছে প্রায়ই স্থানীয় কাগজপত্র থাকে না, কারণ বাড়িওয়ালারা অনেক সময় ঠিকানা যাচাইয়ের কাগজ দিতে অস্বীকার করেন। দিল্লির ট্রেড ইউনিয়নকর্মী রাজেশ কুমার এই কাঠামোগত বাধার ব্যাখ্যা দেন।
অভিবাসী শ্রমিকেরা ঘন ঘন বাসা বদলান, তাই কাগজপত্র নিয়মিত হালনাগাদ করে রাখা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কিছু বাড়িওয়ালা ঠিকানার প্রমাণ দিতেও অস্বীকার করেন। ফলে তাঁরা যে শহরে অভিবাসন করেন, সেখানে আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে অনেকেই ছোট সিলিন্ডার ভরার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেন। সাধারণত ৫ কেজির এসব সিলিন্ডারের জন্য স্থায়ী সংযোগের প্রয়োজন হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বৈশ্বিক নৌপথ ব্যাহত হওয়ার পর এসব কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে, অথবা দাম চার গুণ বাড়িয়েছে। দিল্লির একটি বস্তির প্রতিবেশী শকুন্তলা দেবী ও শাকিবা বিবি গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং মাসে ১৫ হাজার রুপি আয় করেন। তিন সপ্তাহ ধরে তাঁরা গ্যাস খুঁজছেন। শকুন্তলা বলেন, "এভাবে আরও কয়েক দিন চললে আমাদের রান্নাঘরের গ্যাস শেষ হয়ে যাবে, আর গ্রামে ফিরে যেতে হবে।"
বিহারের দিনমজুর ললিতা দেবী পরিবারের সঙ্গে দিল্লিতে কাজ করেন। পরিবারের মাসিক আয় ১০ হাজার রুপি। স্থানীয় খুচরা বাজারে এলপিজির দাম কেজিতে ৪০০-৫০০ রুপিতে ওঠায় এখন তিনি কাঁচা ছোলা খেয়ে বেঁচে আছেন। ট্রেনের টিকিট কেনার সামর্থ্যও তাঁর নেই। বিহারের নির্মাণশ্রমিক উদয় কুমার দৈনিক ৮০০ রুপি আয় করেন। লাখো মানুষের মনে ঘুরতে থাকা প্রশ্নটি তিনি তোলেন।
দিনে ৮০০ রুপি আয় করা কাউকে যদি একটি গ্যাস সিলিন্ডার ভরতেই ৪০০ থেকে ৫০০ রুপি খরচ করতে হয়, তাহলে সে সন্তানদের ভরণপোষণ করবে কীভাবে? আমাকে ঘরভাড়া দিতে হয়, ডাল, চাল ও সবজি কিনতে হয়, সন্তানদের স্কুলের ফিও দিতে হয়। এসব সামলানো কীভাবে সম্ভব?
শিক্ষার্থীরাও একই অনিশ্চয়তার মুখে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহিন নাজ আরও পঞ্চাশ নারীর সঙ্গে একটি আবাসনে থাকেন। তিনি বলেন, "গত ১০ দিন ধরে আমার গ্যাস নেই, আর এখন বেশির ভাগ সময় নাশতা বাদ দিই।" তিনি বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ক্যানটিন বন্ধ হয়ে গেছে, আর যে খাবার পাওয়া যাচ্ছে তার দাম বেড়েছে। আমরা নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে এসেছি, এটা আমাদের সাধ্যের বাইরে। এতে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।" গাজিয়াবাদে থাকা কানপুরের বিটেক শিক্ষার্থী সাঈদ খুরশিদ জানান, তাঁর হোস্টেলের খাবারে এখন শুধু ডাল-ভাত দেওয়া হচ্ছে; রুটি ও সবজি বাদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছেন।
রান্নাঘর থেকে বাজার: বন্ধের পর বন্ধ
রান্নার জ্বালানি উধাও হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত পরিবার ছাড়িয়ে অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সাশ্রয়ী খাবার সরবরাহকারী ধাবা, পথের খাবারের দোকান ও ছোট রেস্তোরাঁর ঘন নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দিল্লির খাদ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে। গ্যাস নেই, খাবারের দাম বাড়ছে—এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো খাবারের তালিকা ছোট করছে, দাম বাড়াচ্ছে, কর্মী ছাঁটাই করছে, নয়তো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অনিল নেহরু প্লেসে ত্রিশ বছর ধরে একটি রেস্তোরাঁ চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, "জীবনে এই প্রথম কালোবাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৪,৫০০ রুপিতে পৌঁছেছে।" তিনি বলেন, "আমরা আবার চুলায় খোলা আগুনে রান্না শুরু করেছি। এতে বেশি সময় লাগে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আমার কর্মীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাঁর দশ কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
এশিয়ার বৃহত্তম তৈরি পোশাকের বাজার গান্ধীনগরে এর প্রভাব ভয়াবহ। রেডিমেড গার্মেন্টস মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শ্রীকিষাণ গোয়েল জানান, শ্রমিকের অভাবে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দোকান ও ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গোয়েল বলেন, "এখানকার উৎপাদন ইউনিটগুলোতে উৎপাদন ৩০ শতাংশের বেশি ব্যাহত হয়েছে, আর কিছু ব্যবসা ৫০-৬০ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে।" ছোট একটি দর্জির কারখানার মালিক মোহাম্মদ সেলিম আখতারের পাঁচ কর্মীই গ্রামে ফিরে গেছেন। এখন তিনি একাই কাজ করছেন, প্রতিদিন ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার রুপি ক্ষতি হচ্ছে। গ্যাস কেনাও পুরোপুরি বন্ধ করেছেন; এখন হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
শাকুর বস্তিতে বিরিয়ানির দোকান চালান তাজদার আহমেদ। তিনি প্রতি কেজির দাম ২৪০ থেকে বাড়িয়ে ২৮০ রুপি করেছেন এবং খরচ কমাতে বিকেল ৫টার মধ্যে দোকান বন্ধ করেন। বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে। কাছেই চা ও মিষ্টির দোকান চালানো হাজি সাহেব বাণিজ্যিক সিলিন্ডার জোগাড়ে হিমশিম খেয়ে নিজের পকেট থেকে তিন কর্মীকে বেতন দিচ্ছেন। তিনি বলেন, "প্রতিদিন আমাদের একটি সিলিন্ডার লাগে, কিন্তু সরবরাহ অনিয়মিত।" তিনি আরও বলেন, "এক মাস পেরিয়ে গেলেও সরকার কোনো সমাধান খুঁজে পায়নি।"
কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থাও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। লুধিয়ানার সবজি মান্ডিতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যবসা ৩০ শতাংশ কমেছে। গুদাম থেকে পথের বিক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া অভিবাসী শ্রমিকেরা চলে গেছেন। টমেটোর পাইকারি বিক্রেতা দমনপ্রীত সিং বলেন, "পণ্য রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার বিক্রেতা কমে যাওয়ায় শহরের ভেতরের সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।" ফসল তোলার মৌসুমে শ্রমিকদের চলে যাওয়া এবং জ্বালানি সংকট—এই দুই আঘাতে বাজারটি শ্রমশক্তি ও বিতরণ নেটওয়ার্ক দুটোই হারিয়েছে।
বৈশ্বিক সংঘাত, স্থানীয় বিপর্যয়
এই অভ্যন্তরীণ সংকটের শিকড় আট হাজার কিলোমিটার দূরে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের সামরিক সংঘাতে। আমদানি করা এলপিজির ওপর ভারতের নির্ভরতা, যার প্রায় ৬০ শতাংশ বিদেশ থেকে আসে এবং সেই আমদানির ৯০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে দেশটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। হামলার জবাবে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়।
এখন ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও অনেক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে; তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি। সরু এই পথ দিয়ে আসা এলপিজি আমদানির ওপর ভারত ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরানি কর্তৃপক্ষ আপাতত ভারতীয় জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিলেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে; কয়েকটি জাহাজ প্রণালির কাছে অপেক্ষা করছে।
সরকারের দাবি, সরবরাহ স্থিতিশীল। তাদের হিসাবে, ১ মার্চ থেকে ১৮ কোটির বেশি সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছে, দৈনিক গড়ে ৫০ লাখ। এখন বুকিংয়ের ৯৭ শতাংশই অনলাইনে হচ্ছে। অভিবাসী শ্রমিকদের লক্ষ্য করে বাজারদরের ৫ কেজির সিলিন্ডারের দৈনিক বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছে কর্তৃপক্ষ এবং কালোবাজারি মজুতের জায়গায় অভিযান চালিয়েছে। বিজেপির দিল্লি মুখপাত্র প্রবীণ শঙ্কর কাপুর সমস্যার কথা স্বীকার করে সমাধানের আশ্বাস দেন।
গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহব্যবস্থায় যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তা মেটাতে আমরা সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছি। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে ৫ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে সংকট বেশি তীব্র, বিশেষ করে অভিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে, যাঁরা প্রতিদিন রান্নার জন্য এর ওপর নির্ভর করেন। আমরা আশাবাদী, এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।
রাজনৈতিক বিভাজন ও সরকারি অস্বীকার
সরকারি আশ্বাসের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বিস্তর ফারাক। দিল্লি বিজেপি ব্যাপক অভিবাসনের খবরকে "বিভ্রান্তিকর" ও "কাল্পনিক" বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দলের সহসভাপতি দীনেশ প্রতাপ সিং ও পূর্বাঞ্চল মোর্চার সভাপতি সন্তোষ ওঝার দাবি, খুব সামান্যসংখ্যক মানুষই চলে গেছেন। তাঁদের অভিযোগ, আম আদমি পার্টির (এএপি) বিধায়ক সঞ্জীব ঝা জনমত বিভ্রান্ত করতে গল্প বানাচ্ছেন। তাঁরা কোভিড-১৯ সময়ের কথা উল্লেখ করে দাবি করেছেন, তখন দিল্লি সরকারের ঘোষণায় অভিবাসীরা আগেও ফিরে গিয়েছিলেন।
জ্বালানি সংকটের পেছনে বিজেপির কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত ভূমিকার অভিযোগ তুলে জ্বালাময় পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন ঝা। তাঁর দাবি, দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ নিজ রাজ্যে ফিরিয়ে দিতে এই সংকট তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাঁদের ভোট প্রভাবিত করা যায়। ঝা বলেন, "সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কালোবাজারি চলছে; গ্যাস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ১,০০০ রুপিতে। এতে অভিবাসী শ্রমিকেরা জ্বালানি ও কাজ—দুটিই হারাচ্ছেন, আর শহর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।"
২৩ মার্চ সংসদে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মহামারির স্মৃতি টেনে তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "বিশ্বের কঠিন পরিস্থিতি চলতে পারে।" তাঁর বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, এক্সে "ভারতে আবার লকডাউন" ট্রেন্ড করে। শ্রমিক অধিকারকর্মীরা সংকটের সময় কমিউনিটি রান্নাঘর বা রেশন সরবরাহের ব্যবস্থা না করায় সরকারের সমালোচনা করেছেন। বন্ডেড লেবার বিলোপের জাতীয় প্রচার কমিটির আহ্বায়ক নির্মল গোরানা পরিস্থিতিকে "চরম অবিচার" বলে অভিহিত করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের আন্তঃরাজ্য অভিবাসী শ্রমিক আইন অনুযায়ী অসংগঠিত শ্রমিকদের নিবন্ধনে ব্যর্থতার কথাও উল্লেখ করেন।কোভিডের সময় আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এমন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি, আর এখন আমাদের আবার প্রস্তুত থাকতে হবে।
দারিদ্র্যের অদৃশ্য অবকাঠামো
জ্বালানির তাৎক্ষণিক সংকট ছাড়াও এই পরিস্থিতি ভারতের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তিকে জর্জরিত করা কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ আন্তঃরাজ্য অভিবাসী দেশের শহরগুলোকে সচল রেখেছিলেন; তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমানে এই সংখ্যা অনেক বেশি। প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যান তাঁদের অনেকে। কাগজপত্রের বাধায় ভর্তুকিযুক্ত পরিষেবা বা সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা তাঁরা পান না।
ভারতীয় শিল্প কনফেডারেশনের শিল্পসম্পর্ক কমিটির সহসভাপতি অরবিন্দ গোয়েল অর্থনীতিতে ধারাবাহিক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
এই উল্টো অভিবাসন চলতে থাকলে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পে; বিশেষত নির্মাণ, বস্ত্র ও উৎপাদনের মতো শ্রমনির্ভর খাতে।
সমাজবিজ্ঞানী পুষ্পেন্দ্র কুমারের যুক্তি, দুর্যোগ সামাল দেওয়ার সামর্থ্য অভিবাসীদের খুবই সীমিত; তাঁদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরও নেই, নীতিনির্ধারকদের মনোযোগও নেই। কুমার বলেন, "অভিবাসীদের, বিশেষ করে দরিদ্র অভিবাসীদের, কোনো রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নেই। ক্ষমতাসীনদের ওপর এই জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানো বা তাদের সমস্যার সমাধানে কোনো চাপ নেই।"
শহুরে দরিদ্রদের জন্য বিকল্প সমাধানগুলোও বাস্তবসম্মত নয়। ১,৩০০ রুপির ইন্ডাকশন কুকটপের দাম এখন ৫,০০০ রুপি। পাইপের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস (পিএনজি) সংযোগ বসাতে প্রায় ৭,০০০ রুপি লাগে; এর জন্য বাড়িওয়ালার সহযোগিতা দরকার, যা দিল্লির এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বসবাস করেন এমন অননুমোদিত কলোনির ভাড়াটিয়ারা পান না। ঘিঞ্জি বস্তির ঘরে কাঠের চুলায় রান্না করা অসম্ভব; ঘনবসতিপূর্ণ ভাড়াবাড়ির এলাকাতেও তা বিপজ্জনক, কারণ বাড়িওয়ালারা খোলা আগুন নিষিদ্ধ করেন। বিহার থেকে আসা ৪৩ বছর বয়সী জারিনা খাতুন পালাম কলোনিতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। সাধারণত ট্রাকে গ্যাস পৌঁছে দেওয়া এক এজেন্সির মালিক সাইকেলে এসে তাঁকে মাত্র ১০ কেজি গ্যাস দিয়েছেন। তাঁর সন্দেহ, এতে এক মাস চলবে না।
স্বাভাবিক অবস্থার অপেক্ষায়
রাজধানীর বিভিন্ন রেলস্টেশনে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্তের পেছনের ভাবনা একেকজনের একেক রকম। ঝাড়খণ্ডের অ্যামাজন গুদামকর্মী ব্রিজ কুমারের মতো কেউ কেউ মনে করেন, সংঘাতের সমাধান হয়ে বাজার স্থিতিশীল হলে তাঁরা ফিরবেন। অন্যদিকে, কোভিডের পর দ্বিতীয়বার বাধ্য হয়ে শহর ছাড়তে থাকা নির্মাণশ্রমিক লাখে চৌহানের মতো কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, শহরে টিকে থাকা আদৌ সম্ভব কি না। চৌহান বলেন, "এখানে গ্যাস নেই, কাজ নেই, আশাও নেই। না খেয়ে এখানে মরতে চাই না, কারণ প্রতিদিন বাইরের খাবার কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই।"
উত্তর প্রদেশের বিথুরে ফিরছেন ৩৮ বছর বয়সী গিগকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষী রাধে শ্যাম। তাঁর হিসাবটা পুরোপুরি অর্থনৈতিক। তিনি বলেন, "একাধিক কাজ করেও আমার আয় ২০ হাজার রুপির বেশি হয় না। স্ত্রী আশপাশের বাড়িতে কাজ করে আরও ৫ হাজার রুপি পান। দেখাশোনার জন্য আমার দুই প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান আছে। এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য ৩,০০০ রুপি কীভাবে দেব? গ্রামে এখনও চুলায় রান্না করতে পারি। আশা করি, এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, আর আমি ফিরে আসব।"
এটি সাময়িক সরে যাওয়া, নাকি শহরগুলো থেকে স্থায়ীভাবে জনসংখ্যা কমে যাওয়া—তা নির্ভর করছে সংকট সমাধানের সময়সীমার ওপর, যা ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলার সময় লাখো শ্রমিক গ্রামের উঠানে বসে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের ফেরার বিষয়টি নির্ভর করছে এমন দামে সিলিন্ডার আবার ভরা যাবে কি না, যা তাঁদের মজুরিতে সামাল দেওয়া সম্ভব। তত দিন দিল্লি থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো শুধু যাত্রী বহন করবে না; বহন করবে এক শ্রমশক্তির থমকে যাওয়া স্বপ্ন, যারা বুঝেছে—যে দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে তারা শহরে এসেছিল, শহরও তেমনই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- হরমুজ প্রণালির নৌপথে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবের কারণে এলপিজির তীব্র সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে; এর জেরে হাজারো অভিবাসী শ্রমিক দিল্লি ও অন্যান্য বড় শহর ছেড়ে যাচ্ছেন।
- কালোবাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯০০ রুপি থেকে বেড়ে ৩,০০০-৪,৫০০ রুপিতে পৌঁছেছে; অনানুষ্ঠানিকভাবে গ্যাস ভরতে কেজিপ্রতি ৩০০-১,০০০ রুপি লাগছে। দৈনিক ২০০-৮০০ রুপি মজুরির অর্ধেক বা তারও বেশি এতে খরচ হচ্ছে।
- বিহার, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের শ্রমিকেরা বলছেন, রান্নার জ্বালানি কেনা আর খাবার কেনার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হচ্ছে। অনেকে গ্রামে ফিরছেন, যেখানে প্রচলিত কাঠের চুলায় রান্নার বিকল্প আছে।
- শ্রমিকদের চলে যাওয়া ও জ্বালানির খরচে ছোট ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, বস্ত্রবাজার ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত। কিছু বাজারে ৩০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত বন্ধের খবর পাওয়া গেছে।
- রেলস্টেশনে যাত্রীসংখ্যার তথ্য দেখিয়ে এবং এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহের দাবি করে সরকারি কর্মকর্তারা ব্যাপক অভিবাসনের কথা অস্বীকার করছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ সংকট তৈরি করেছে অথবা কালোবাজারি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।
- স্থায়ী স্থানীয় ঠিকানা নেই—এমন অভিবাসী শ্রমিকেরা বিশেষভাবে দুর্ভোগে পড়েছেন। তাঁরা সরকারি ভর্তুকির এলপিজি সংযোগ পান না এবং এমন অনানুষ্ঠানিক বাজারের ওপর নির্ভর করেন, যেখানে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে অথবা দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে।






