সমন্বিত ইউরেশীয় হুমকি: চীন-রাশিয়া অংশীদারত্ব যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তার চিত্র বদলে দিচ্ছে

পড়তে 10 মিনিট
সমন্বিত ইউরেশীয় হুমকি: চীন-রাশিয়া অংশীদারত্ব যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তার চিত্র বদলে দিচ্ছে

সীমাহীন অংশীদারত্বের উত্থান

চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে তাদের অংশীদারত্ব সুসংহত করায় কয়েক দশকের মধ্যে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তর ঘটছে। স্নায়ুযুদ্ধের পর যে সহযোগিতার সূচনা হয়েছিল সতর্কভাবে, তা এখন পূর্ণাঙ্গ সমন্বয়ে রূপ নিয়েছে। অস্ট্রেলীয় কৌশলগত পরিকল্পনাবিদেরা একে সমন্বিত আন্তঃইউরেশীয় হুমকি হিসেবে দেখছেন, যার নজির অন্তত অর্ধশতাব্দীতে দেখা যায়নি।

সূচিপত্র
  1. সীমাহীন অংশীদারত্বের উত্থান
  2. সামরিক সন্নিকটতা ও আধুনিকায়ন
  3. অর্থনৈতিক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানো
  4. অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার তাৎপর্য
  5. আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও কৌশলগত টানাপোড়েন
  6. বৈশ্বিক তথ্যযুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী সমন্বয়
  7. মূল কথা

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনে প্রবেশের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও শি জিনপিং আনুষ্ঠানিকভাবে সীমাহীন অংশীদারত্বের ঘোষণা দেন। এতে এমন বন্ধুত্বের কথা বলা হয়, যার কোনো সীমা নেই, এবং এমন সহযোগিতার কথা বলা হয়, যেখানে কোনো ক্ষেত্র নিষিদ্ধ নয়। এই ঘোষণায় কেবল গত তিন দশকে গড়ে ওঠা সম্পর্কেরই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমা দেশগুলো যখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে মনোযোগ দিয়েছে এবং স্নায়ুযুদ্ধের পর শান্তির সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা করেছে, তখন মস্কো ও বেইজিং অনুভূত উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের হুমকি থেকে নিজেদের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা রক্ষায় ঐতিহাসিক মতপার্থক্যগুলো ধারাবাহিকভাবে পাশে সরিয়ে রেখেছে।

এই অংশীদারত্ব একই সঙ্গে একাধিক মাত্রায় কাজ করে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় রাশিয়াকে সহায়তা করা অর্থনৈতিক অবলম্বন জুগিয়েছে বেইজিং। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা চীনের সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচিকে ত্বরান্বিত করেছে। এ সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার বাইরেও বিস্তৃত; এর মধ্যে রয়েছে যৌথ প্রচার কার্যক্রম, জাতিসংঘে সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান এবং ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা সামরিক মহড়া, যেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক কার্যক্ষমতা যাচাই করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সামরিক সন্নিকটতা ও আধুনিকায়ন

চীন-রাশিয়া সামরিক সহযোগিতা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে এমন সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, যা আসন্ন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রস্তুতি নেওয়া অস্ট্রেলীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদদের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর যৌথ মহড়া ২০০০-এর দশকের গোড়ায় বছরে এক বা দুটি থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৪টি পৃথক আয়োজনে পৌঁছেছে, যদিও রাশিয়া তখনও ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে একাধিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার এই সক্ষমতা পশ্চিমা মিত্রদের সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত মোকাবিলা করা সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মহড়া, জাপান সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত সমন্বিত নৌ টহল এবং উন্নত সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। ২০২৫ সালের আগস্টে মস্কো ও বেইজিং আর্টিলারি, সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা অভিযান নিয়ে বিস্তৃত যৌথ নৌমহড়া চালায়। এগুলো কেবল কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার কাজ নয়; বরং সক্ষমতার কাঠামোবদ্ধ পরীক্ষা এবং সমন্বিত অভিযান চালানোর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ।

প্রযুক্তি বিনিমারে বেইজিং উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাচ্ছে। ১৯৯৫ সালে চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট ৭.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে আনুমানিক ২৫০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও, দেশটির সর্বশেষ বড় সামরিক সংঘাত হয়েছিল ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে, যেখানে ফলাফল ছিল আশানুরূপ নয়। ধারাবাহিক যুদ্ধ অভিযানের মধ্য দিয়ে অর্জিত আধুনিক যুদ্ধকৌশলে রাশিয়ার দক্ষতা চীনকে এমন শিক্ষা দিচ্ছে, যা অনুকরণমূলক মহড়ায় পাওয়া সম্ভব নয়। মস্কো বেইজিংকে উন্নত এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সু-৩৫ যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টার্বোফ্যান ইঞ্জিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে, যেগুলো চীনা নির্মাতাদের নিজেদের দেশে তৈরি করতে এখনো অসুবিধা হয়।

এএসপিআইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সামরিক সন্নিকটতা পশ্চিমা সামরিক জোটগুলোর একটি বাস্তব বিকল্পের ভিত্তি তৈরি করছে। দুই দেশ ধীরে ধীরে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, তথ্য বিনিময়ের মডেল এবং রিয়েল-টাইম ক্ষেপণাস্ত্র অনুসরণব্যবস্থা মানসম্মত করছে। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস সতর্ক করে বলেছেন, এর আগে কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে চার মিত্র প্রতিপক্ষের (রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরান) মোকাবিলা করতে হয়নি; তাদের সম্মিলিত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভাণ্ডারের দ্বিগুণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানো

চীন ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০২৩ সালে রেকর্ড ২৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬.৩ শতাংশ বেশি। এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক সাধারণ পণ্য বিনিময় থেকে এমন এক জটিল ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। আগে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া পণ্যের বিকল্প হিসেবে এখন রাশিয়ায় চীনা রপ্তানি যাচ্ছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে বেইজিং রাশিয়ার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

সংবেদনশীল যন্ত্রাংশের বাণিজ্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুল্ক-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে করা হিসাব অনুযায়ী, চীন প্রতি মাসে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানি করে, যেগুলোকে পশ্চিমা সরকারগুলো অস্ত্র উৎপাদনের জন্য উচ্চ-অগ্রাধিকার পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত মেশিন টুল, সামরিক অপটিকসে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর এবং রুশ চালকবিহীন আকাশযানে শক্তি জোগানো ড্রোন ইঞ্জিন। রাশিয়ার মাইক্রোইলেকট্রনিকস আমদানির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত এখন চীন থেকে আসছে; এসব যন্ত্রাংশ ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও উড়োজাহাজে ব্যবহৃত হয়।

আর্থিক সহযোগিতাও একইভাবে গভীর হয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ২০২৪ সালের এপ্রিলে জানান, দুই দেশ জাতীয় মুদ্রা ব্যবহার করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ব্যবহার প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করেছে। রাশিয়ার আমানতে রেনমিনবি এখন শীর্ষ বিদেশি মুদ্রা। ২০২৩ সালে নগদ রেনমিনবি মজুতের সমপরিমাণ মূল্য দ্বিগুণ হয়ে ৬৮.৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এই আর্থিক সংহতি মস্কোকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করছে; পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় মার্কিন আর্থিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পরিশোধব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বেইজিংয়ের লক্ষ্যও এগিয়ে নিচ্ছে।

ইউরোপীয় নীতিবিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের সহায়তা চীনকে নিছক অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে এমন এক নিরাপত্তা হুমকিতে রূপান্তরিত করেছে, যাকে মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি জুগিয়ে চীন ইউরোপের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে নির্ধারক ভূমিকা পালন করছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনসহ পশ্চিমা নেতাদের বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও এই সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। তাঁরা বলেছেন, এ ধরনের সহায়তা মৌলিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার তাৎপর্য

প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদেরা জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার সময় চীন-রাশিয়া অংশীদারত্ব সরাসরি ক্যানবেরার কৌশলগত চিন্তাকে প্রভাবিত করছে। এই সমন্বয় ১৯৪৫-পরবর্তী বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যে ব্যবস্থার ওপর অস্ট্রেলিয়ার সমৃদ্ধি ও সার্বভৌমত্ব নির্ভর করেছে। ফলে এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা অবস্থান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দাবি করে। দুই শক্তির অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও যৌথ তথ্য অভিযান মোকাবিলায় প্রচলিত চার বছরের বাজেট প্রাক্কলনের বাইরেও অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জোটের ওপর নির্ভর না করে নিরাপত্তা অংশীদারত্বের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে অস্ট্রেলিয়া। সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া-ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব এই বৈচিত্র্য আনার উদাহরণ। একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলছে এই উদ্যোগ। তবে বিশ্লেষকদের জোরালো বক্তব্য, এই অতিরিক্ত সম্পর্কগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে না। ওয়াশিংটনের কৌশলগত সক্ষমতা ও অঙ্গীকারের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা মিত্র।

হুমকির পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলীয় নীতিনির্ধারকদের একই সঙ্গে একাধিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। চীন একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি এবং কৌশলগত প্রতিপক্ষ। কর্তৃত্ববাদী সমন্বয় ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক—উভয় অঞ্চলেই প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও আদর্শের ক্ষেত্রজুড়ে কাজ করছে। মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টা সচল রাখতে বেইজিং প্রধান সহায়ক; একই সঙ্গে দুই সরকারই তথ্য অভিযান ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

সংঘাতের পরিস্থিতিতে চীন-রাশিয়া অক্ষটি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক সামরিক সমন্বয়ে বিস্তৃত হতে পারে—প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদদের এই সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বর্তমানে সহযোগিতা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি পর্যন্ত পৌঁছায়নি, তবে এর গতিপথে যৌথ অভিযান, সমন্বিত রসদব্যবস্থা এবং পারস্পরিক কৌশলগত বার্তা দেওয়ার মাধ্যমে আরও গভীর সংহতির ইঙ্গিত রয়েছে। এই অংশীদারত্ব ইরান ও উত্তর কোরিয়াসহ বৃহত্তর কর্তৃত্ববাদী জোটেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এতে চীন সবচেয়ে শক্তিশালী এবং রাশিয়া সবচেয়ে অস্থিতিশীলতাসৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে থাকা একটি বহুপারমাণবিক জোট তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও কৌশলগত টানাপোড়েন

চীন-রাশিয়া অংশীদারত্ব সমন্বিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও, ইন্দো-প্যাসিফিকের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি কৌশলগত টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে, যা ঘনিষ্ঠতর সমন্বয়কে জটিল করে তোলে। মস্কোর সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি বজায় রেখেছে, যা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতায় বাধা দেয়। কোয়াড নিরাপত্তা সংলাপে নয়াদিল্লির অংশগ্রহণ এবং জোটভিত্তিক রাজনীতিতে তার অনীহা আঞ্চলিক কৌশল সমন্বয়ে বেইজিং ও মস্কোর কতটা ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব, তার ওপর সীমা আরোপ করে।

ইন্দোনেশিয়া তার bebas dan aktif (স্বাধীন ও সক্রিয়) পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখে; দুই শক্তির সঙ্গেই সম্পর্ক রাখে, কিন্তু জড়িয়ে পড়া এড়ায়। পাপুয়ায় দূরপাল্লার উড়োজাহাজের ঘাঁটি স্থাপনের রুশ অনুরোধ সম্প্রতি প্রত্যাখ্যান করেছে জাকার্তা, যা আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার পক্ষে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। একইভাবে, দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূলবর্তী দেশ ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশ আইনি পদ্ধতি এবং বৈচিত্র্যময় প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। এতে বিরোধপূর্ণ জলসীমায় বৃহৎ শক্তিগুলোর সমন্বিত অবস্থান খণ্ডিত হচ্ছে।

উত্তর ও পশ্চিম—দুই দিক থেকে একই সঙ্গে জাপানের ওপর বিশেষ তীব্র চাপ তৈরি হচ্ছে। জাপানের আকাশসীমায় রুশ সামরিক উড়োজাহাজের অনুপ্রবেশ এবং অমীমাংসিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জ বিরোধের পাশাপাশি টোকিওকে চীনের সামুদ্রিক সম্প্রসারণ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সীমাহীন জোটের কারণে চীন-রাশিয়ার ঐতিহাসিক অবিশ্বাস থেকে জাপান যে কৌশলগত সুবিধা পেত, তা আর থাকছে না। ফলে টোকিওকে তার শান্তিবাদী সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা পুনর্বিবেচনা এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কথা ভাবতে হচ্ছে। জাপানের তিন দিকের কৌশলের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট জোরদার করা, কোয়াড কাঠামোর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এবং বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ চালানো।

আঞ্চলিক এই গতিশীলতা ইঙ্গিত দেয়, দূর থেকে চীন-রাশিয়া অংশীদারত্বকে অপ্রতিরোধ্য মনে হলেও স্থানীয় পক্ষগুলোর ভূমিকার মধ্যে দিয়ে বাস্তবায়িত হতে গেলে তা খণ্ডিত হয়। আঞ্চলিক দেশগুলো এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যার মধ্যে বাইরের শক্তিগুলোকে কাজ করতে হয়। এতে সমন্বিত অবস্থানের ব্যয় বাড়ে এবং সংহতি কমে। এই টানাপোড়েন আইনি সক্ষমতা গড়ে তোলা, সমুদ্র পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি এবং নির্ভরতার বদলে বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করে এমন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিরোধকে আরও জোরদার করার কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে অস্ট্রেলিয়ার জন্য।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক তথ্যযুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী সমন্বয়

প্রচলিত সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বাইরে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও পশ্চিমা সংহতি দুর্বল করতে চীন-রাশিয়া অংশীদারত্ব তথ্যক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে কাজ করছে। দুই সরকার রাশিয়ার আগ্রাসনের জন্য ন্যাটোর সম্প্রসারণকে দায়ী করা, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ধারণা তুলে ধরা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণে ঔপনিবেশিকতা নিয়ে ক্ষোভ উসকে দেওয়ার মতো বয়ান সমন্বয় করছে। এই সমন্বিত প্রচারের ফলে পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের বহু দেশ রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা মস্কোকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার প্রচেষ্টাকে উল্লেখযোগ্যভাবে জটিল করে তুলেছে।

বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে সাইবার ও গোয়েন্দা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। দুই দেশই অস্ট্রেলীয় নেটওয়ার্কসহ পশ্চিমা লক্ষ্যবস্তুতে শিল্প গুপ্তচরবৃত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযান এবং সাইবার হামলা চালায়। ইউরোপে চীনা ও রুশ গোয়েন্দা তৎপরতা পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়। সেখানে গণতন্ত্র নিয়ে সন্দেহ ছড়াতে এবং সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে তারা উগ্র ডান ও উগ্র বাম—উভয় ধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে অনুপ্রবেশ করেছে। ফিনল্যান্ডের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে, দুই দেশের লক্ষ্য অভিন্ন এবং নিজেদের স্বার্থে এ ধরনের প্রচার কাজে লাগলে তারা যৌথভাবে তা এগিয়ে নেয়।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রগুলোকেও এ কর্তৃত্ববাদী সমন্বয় সহায়তা করে। মস্কো ও বেইজিং—দুই দেশই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কূটনীতিকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। অথচ নিরাপত্তা পরিষদে তারাই যেসব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করেছিল, এখন প্রকাশ্যেই সেগুলো লঙ্ঘন করছে। রাশিয়া পিয়ংইয়ংকে হাইড্রোকার্বন এবং সম্ভাব্য দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দিচ্ছে; অন্যদিকে চীন দিচ্ছে কূটনৈতিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহায়তা। এই সহযোগিতা কোরীয় সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা কমিয়েছে এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ঘিরে থাকা হুমকি বাড়িয়েছে।

হুভার ইনস্টিটিউশনের স্টিফেন কটকিনের মতে, এই অংশীদারত্ব একটি মৌলিক বাস্তবতার প্রতিফলন: রাশিয়া ও চীন নিজেদের পক্ষে কী—তা নিয়ে একমত না-ও হতে পারে, কিন্তু তারা কীসের বিরুদ্ধে—সে প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। তাদের বিরোধের লক্ষ্য পশ্চিমা উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, সর্বজনীন মানবাধিকারের ওপর তার জোর এবং সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। কর্তৃত্ববাদী সরকারের কাছে উদার গণতান্ত্রিক ধারণার হুমকি সামরিক শক্তির হুমকির মতোই গুরুতর। তাই নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করে—এমন তথ্য নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট পরিচালনা এবং প্রচার কৌশলে তারা সহযোগিতা করছে।

বিজ্ঞাপন

মূল কথা

চীন-রাশিয়ার সীমাহীন অংশীদারত্ব বৈশ্বিক রাজনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন নির্দেশ করে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে জরুরি মনোযোগ দেওয়া দরকার। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সতর্ক সম্পর্কোন্নয়ন থেকে এই সমন্বয় এখন নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য পূর্ণাঙ্গ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

  • এই অংশীদারত্ব রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সহায়তা এবং চীনকে সামরিক আধুনিকায়নের সুযোগ দেয়। এতে এমন এক পারস্পরিক জোরদারকরণ চক্র তৈরি হয়েছে, যা পশ্চিমা চাপের মুখে দুই কর্তৃত্ববাদী সরকারকেই শক্তিশালী করছে।
  • বিক্ষিপ্ত মহড়া থেকে যৌথ সামরিক কার্যক্রমের সংখ্যা বেড়ে বছরে ১৪টিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মহড়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিকজুড়ে নৌ টহল।
  • পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সাঁজোয়া যান উৎপাদন চালিয়ে যেতে রাশিয়াকে সক্ষম করে প্রতি মাসে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানি করছে চীন।
  • ইরান ও উত্তর কোরিয়াসহ বৃহত্তর জোটের কেন্দ্রবিন্দু এই কর্তৃত্ববাদী অক্ষ। এতে এমন এক বহুপারমাণবিক হুমকি তৈরি হয়েছে, যা অস্ট্রেলিয়া ও তার মিত্রদের প্রতিরোধ-সংক্রান্ত হিসাবকে জটিল করে তোলে।
  • ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো কৌশলগত টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে, যা চীন-রাশিয়া সমন্বয়ের সংহতি সীমিত করে এবং অস্ট্রেলিয়ার অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করে।
  • আসন্ন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে বাড়তি অর্থায়ন, বৈচিত্র্যময় অংশীদারত্ব এবং ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ একই সঙ্গে মোকাবিলার সক্ষমতার মাধ্যমে এই আন্তঃইউরেশীয় হুমকি বিবেচনায় নিতে হবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে