সবুজ উন্নয়নের নামে হারানো স্বর্গ
দশকের পর দশক সমুদ্রে কাটানোর পর শান্তির খোঁজে এক দশক আগে হালমাহেরা দ্বীপের লেলিলেফ সাওয়াই গ্রামে ফিরে আসেন আবদুল্লাহ আমবার। ৬৪ বছর বয়সী এই জেলে তিনটি নৌকা তৈরি করেন এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রত্যন্ত উত্তর মালুকু প্রদেশের সমৃদ্ধ জলরাশিতে সচ্ছলতা খুঁজে পান। "তীর থেকে মাত্র ১০ মিটার দূরেই মাছ পাওয়া যায়," স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন। "মানুষের খাবারের অভাব হলে ছোট ডিঙি নিয়ে এক-দুই ঘণ্টার জন্য বেরিয়ে পড়ত, বাড়ি ফিরে এসে খেতে পারত।"
সূচিপত্র
২০১৮ সালে ওয়েদা উপসাগরের অপর পারে শিল্পায়ন শুরু হলে সেই শান্তি উধাও হয়ে যায়। ছয় গিগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানিতে চলতে শুরু করে একটি নিকেল প্রক্রিয়াকরণ কারখানা। কয়েক বছরের মধ্যেই বদলে যায় ভূদৃশ্য; সবুজ পাহাড় পরিণত হয় অনুর্বর লাল মাটিতে, যা বৃষ্টির সময় গড়িয়ে সমুদ্রে মেশে। কয়লা ও নিকেল আকরিক পরিবহনের সময় পণ্যবাহী জাহাজ প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস করে। ওয়েদা উপসাগরের তীরবর্তী চারটি গ্রামে এখন ৮০ হাজার শ্রমিকের বাস; যেখানে একসময় তারা দেখতেন তারাভরা আকাশ, সেখানে এখন শ্রমিকদের আবাসন আর শিল্পকারখানার ধোঁয়াশা।
বিদ্রূপের বিষয়, এই ধ্বংসযজ্ঞই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বিশ্বকে সরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ব্যাটারির প্রধান উপাদান নিকেল; এর উচ্চ শক্তি-ঘনত্ব গাড়ির চলার দূরত্ব বাড়ায়। ইন্দোনেশিয়ায় বছরে প্রায় ২২ লাখ টন নিকেল উৎপাদিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশ। দেশগুলো নিট-শূন্য নির্গমনের লক্ষ্যে এগোতে থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস, ২০৫০ সালের মধ্যে নিকেলের চাহিদা দ্বিগুণ হবে।
পরিচ্ছন্ন পরিবহনের কার্বন-বৈপরীত্য
ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামসের পর্যবেক্ষণ, "নিকেলসহ বৃহৎ প্রকল্পগুলো প্রায়ই সবুজ উন্নয়নের নামে চালু করা হয়, কিন্তু পেছনে রেখে যায় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির চিহ্ন।" বৈপরীত্যটি স্পষ্ট: ধনী শহরগুলোতে নির্গমন কমানোর ফলে ইন্দোনেশিয়ার খনির এলাকায় দূষণের কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। ব্যাটারির উপযোগী নিকেল প্রক্রিয়াজাত করতে বিপুল পরিমাণ শক্তি লাগে। ইন্দোনেশিয়ার শোধনাগারগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল; এতে কার্বন নিঃসরণের এমন বোঝা তৈরি হয়, যা সরবরাহ করা ইভিগুলোর জলবায়ু-সুবিধাকে ম্লান করে দেয়।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের (বাপেনাস) তথ্য অনুযায়ী, নিকেল প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৯৭ শতাংশ আসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। শুধু ২০২৩ সালেই এ খাতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়েছে, যা দিয়ে বছরে ১ কোটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। ব্যাটারির উপযোগী প্রতি টন নিকেল প্রক্রিয়াজাত করলে আনুমানিক ৯৩ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড-সমতুল্য গ্যাস নির্গত হয়। তুলনায়, একটি সাধারণ যাত্রীবাহী যান বছরে ৪.৬ টন নির্গমন করে।
ইন্দোনেশিয়ার নিকেল খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য। জাকার্তা ২০১৪ ও ২০২০ সালে কাঁচা আকরিক রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে তারা এ খাতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এসব নীতির ফলে ইন্দোনেশিয়ার বিপুল মজুত ব্যবহারের সুযোগ পেতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশেই শোধনাগার নির্মাণ করতে হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ান মাইনিং ইনস্টিটিউটের ইরওয়ান্দি আরিফের ব্যাখ্যা, সরকারি সমর্থন নিয়ে চীনা কোম্পানিগুলো দ্রুত ও কম খরচে শোধনাগার নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। তিনি বলেন, "[ইন্দোনেশিয়ার] শুধু বসে আরাম করতে হয়, চোখের পলকে দেখা যায়, গলনাগার চালু হয়ে গেছে।"
বিশ্বের বৃহত্তম নিকেল উৎপাদনকেন্দ্রে পরিবেশবিপর্যয়
গ্রহের বৃহত্তম নিকেল উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ওয়েদা উপসাগর। হালমাহেরায় ২,৫৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত খনির ইজারাভুক্ত জমিতে রয়েছে ১৮টি শোধনাগার ও ১১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। চীনা শিল্পগোষ্ঠী সিংশান হোল্ডিং গ্রুপ, হুয়ায়ো কোবাল্ট এবং ঝেনশি হোল্ডিং গ্রুপ পরিচালিত ইন্দোনেশিয়া ওয়েদা বে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক (আইডব্লিউআইপি) এই শিল্প কমপ্লেক্সের কেন্দ্র। কর্মকর্তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উদ্যাপন করলেও বাসিন্দাদের সইতে হচ্ছে পরিবেশবিপর্যয়।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে এবং ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনালের গবেষণায় হালমাহেরায় নিকেল খনির ইজারাভুক্ত এলাকার অন্তত ৫,৩৩১ হেক্টর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন উজাড়ের তথ্য উঠে এসেছে। এতে ওই বনগুলোতে আগে সঞ্চিত প্রায় ২০ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছে। বনভূমি সাফ করার ফলে জলনির্গমন এলাকা বদলে গেছে এবং গোটা অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে।
কোবে গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী বাসিন্দা আদ্রিয়ান পাটাপাটা জানান, বন্যা কীভাবে ছোটখাটো দুর্ভোগ থেকে প্রাণঘাতী ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বুকের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, "এখন পানি এখানে পর্যন্ত উঠে আসে।" এরপর ছাদের কড়িকাঠের দিকে দেখিয়ে বলেন, "এমন হলে আমরা ওখানে ঘুমাই," যেখানে তাঁর পরিবার অস্থায়ী মাচা তৈরি করে। ২০২৫ সালের আগস্টে বন্যার পানি তাঁর এলাকায় ছয় দিন ধরে জমে ছিল। খনির কাজ থেকে আসা লাল ও কমলা রঙের কাদাপানি তাঁর কৃষিজমি ধ্বংস করে দেয়। তিনি বলেন, "মাটির আর আগের মতো উর্বরতা নেই। আমি যা কিছু লাগিয়েছি, তার প্রায় সবই রোগা ও অনুৎপাদনশীল হয়ে গেছে।"
উচ্ছেদ ও দূষণের বিরুদ্ধে লড়ছে জনপদ
অবকাঠামোর ক্ষতির পাশাপাশি নিকেলের উত্থান ইন্দোনেশিয়ার খনিপ্রধান এলাকাজুড়ে আদিবাসীদের জীবনযাত্রার জন্য হুমকি তৈরি করছে। দক্ষিণ-পূর্ব সুলাওয়েসির কাবায়েনা দ্বীপে ‘সমুদ্রের যাযাবর’ নামে পরিচিত, অসাধারণ ডুব দেওয়ার দক্ষতার অধিকারী বাজাউ জনগোষ্ঠী অস্তিত্বের সংকটে। দ্বীপের তিন-চতুর্থাংশ এলাকাজুড়ে খনির কাজ চলছে। মাইটি আর্থের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বালিয়ারা গ্রামের কাছে নিকেলদূষিত ঘোলা পানিতে তিন শিশু ডুবে মারা যায়। অন্যরা লালচে সমুদ্রের পানির কারণে ত্বকের সংক্রমণে ভুগছে। এক বাসিন্দা বলেন, "আমরা আর আমাদের শিশুদের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে দিতে পারি না; তাদের শৈশব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।"
অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমগুলোর হাতে আসা ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ নথিতে ওবি দ্বীপে পরিকল্পিত দূষণের চিত্র উঠে এসেছে; সেখানে হারিতা গ্রুপের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালে। ২০১২ সালের প্রথম দিকেই কোম্পানির ইমেইলে তুগারাচি নদীতে হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম দূষণের কথা ওঠে। এই উপাদানটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত; পানীয় জলে এর সীমা প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম নির্ধারিত। ২০২২ সালের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় দেখা যায়, কাওয়াসি গ্রামের বাসিন্দাদের ব্যবহৃত ঝরনাগুলোতে এর মাত্রা আইনি সীমার ১৯ গুণ। বাসিন্দারা বলছেন, পানির একমাত্র উৎস থেকে পানি পান করে তাঁদের পেটের সমস্যা হচ্ছে। দূষণের উৎস জানা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা তথ্যটি শুধু অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার জন্য চিহ্নিত করেন এবং পানির মান নির্ধারিত সীমার মধ্যে আছে দাবি করে ৬৬ কোটি ডলারের শেয়ার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন।
হালমাহেরায় সাওয়াই জনগোষ্ঠীও একই ধরনের চাপে রয়েছে। ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল আইডব্লিউআইপির কার্যক্রমের কাছে বসবাসকারী ৪৫ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে নথিবদ্ধ করেছে, কীভাবে কোম্পানিগুলো জমির মালিকদের কম দামে জমি বিক্রিতে চাপ দিতে ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেছে। আইনগত মালিকানার দলিল থাকা ৩৮ হেক্টর জমির আদিবাসী সাওয়াই কৃষক মাকলন লোবে তাঁর চাওয়া দামের মাত্র ১৫ শতাংশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তদন্তে বলা হয়েছে, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ জানতে পুলিশ বারবার তাঁর কাছে গিয়েছে। কোম্পানিগুলো তাঁর জমিতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে এবং অনুমতি ছাড়াই গাছ কেটে দেওয়ার পর, শেষ পর্যন্ত পুলিশ স্টেশনে এক বৈঠকে চাপে পড়ে তিনি জমি বিক্রি করেন। ৩৮ হেক্টরের মধ্যে মাত্র ৮ হেক্টরের দাম পান, তাও চুক্তির চেয়ে কম দামে।
জেলেদেরও একই ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। গেমাফ গ্রামের ৫১ বছর বয়সী জেলে ম্যাক্স সিগোরো স্থানীয় জলরাশির পরিবর্তনের কথা বলেন। "খনির কাজ শুরুর আগে মাছের প্রাচুর্য ছিল, সমুদ্রের পানি ছিল স্বচ্ছ। এখন [আইডব্লিউআইপির] কাছে মাছ ধরতে পারি না। পানি নোংরা, আর নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের তাড়িয়ে দেয়। খনির কারণেই পানি দূষিত হচ্ছে। যন্ত্রপাতি থেকে তেলে পানি দূষিত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের গরম পানিও সমুদ্র দূষিত করছে।"
বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও করপোরেট দায়বদ্ধতা
হালমাহেরা ও সুলাওয়েসি থেকে উত্তোলিত নিকেল বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় ঢুকে বিশ্বের বড় গাড়ি নির্মাতাদের কাছে পৌঁছায়। ইন্দোনেশিয়ার খনিগুলোর সঙ্গে টেসলা, ফোর্ড, ভক্সওয়াগেন, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, টয়োটা ও হুন্দাইয়ের চুক্তি রয়েছে। এসব কোম্পানি নৈতিকভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের অঙ্গীকার করলেও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় বিভিন্ন উৎসের উপাদান মিশে যাওয়ায় নির্দিষ্ট নিকেলের চালান শনাক্ত করা কঠিন।
ন্যাশনাল ব্যাটারি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা এভি কার্তিনি বিদেশি বিনিয়োগের সুফল কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, "আমরা বলতে পারি যে আমরাই সবচেয়ে বড় উৎপাদক, কিন্তু সবকিছুর মালিক চীন। [উৎপাদন] শুধু আমাদের জমিতেই হয়েছে। নিকেলে সমৃদ্ধ মাটি আমরা তাদের কাছে বিক্রি করেছি।" তাঁর জোর দিয়ে বলা, প্রযুক্তি হস্তান্তর না হলে প্রকৃত শিল্প সক্ষমতা গড়ে তোলার বদলে ইন্দোনেশিয়া শুধু কাঁচামালের উৎস হয়েই থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। "জমি আছে, কিন্তু প্রযুক্তি নেই—এমন হলে আমরা হারব। বিনিয়োগ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ কার হচ্ছে, তা আমাদের প্রশ্ন করতে হবে। স্থানীয় মানুষের কী হবে?"
পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো গাড়ি নির্মাতাদের নির্দিষ্ট খনি পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার নিরীক্ষা করার দাবি জানাচ্ছে। ২০২২ সালের যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইন অনুযায়ী, কর ছাড় পেতে গাড়ির ক্ষেত্রে এ ধরনের উৎস শনাক্তকরণ প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাটারি বিধিতেও বন ধ্বংস বা জলপথের ক্ষতি করে এমন খনি শনাক্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কর্মীদের যুক্তি, আইডব্লিউআইপির মতো কার্যক্রম থেকে নিকেল কেনা বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপণনে দেওয়া পরিবেশগত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
সমালোচনা বাড়তে থাকায় ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা স্বীকার করতে শুরু করেছেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের ডাউনস্ট্রিমিং-বিষয়ক উপদেষ্টা রাদেন সুকিয়ার স্বীকার করেন, কিছু শিল্পপ্রক্রিয়ায় "যথাযথ শাসনব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে" এবং পরিবেশগত উদ্বেগগুলো "এখনো করণীয় কাজের তালিকায় রয়েছে"।
২০২৫ সালের জুনে বাপেনাস জলবিদ্যুৎ, সৌর ও বায়ুশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ২০৪৫ সালের মধ্যে নিকেল শিল্পের নির্গমন ৮১ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে একটি কার্বনমুক্তকরণ রূপরেখা চালু করে। আইডব্লিউআইপি দুই গিগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৫০০ মেগাওয়াট বায়ুশক্তি উৎপাদন সক্ষমতা গড়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যদিও এগুলো কবে চালু হবে তা স্পষ্ট নয়। কোম্পানিটি ৪০ হাজার হেক্টরজুড়ে পুনঃবনায়ন এবং বৈদ্যুতিক ট্রাক চালুর অঙ্গীকারও করেছে।
তবে ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, হালমাহেরায় বিদ্যুৎ গ্রিডের অবকাঠামো এবং জলবিদ্যুতের উপযোগী নদীর অভাব রয়েছে। ফলে জমির প্রাপ্যতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে শুধু সৌর ও বায়ুশক্তির বিকল্পই থাকে। এদিকে, মজুত সংরক্ষণ ও পরিবেশগত মান কার্যকর করতে ইন্দোনেশিয়া সরকার ২০২৫ সালের জন্য জাতীয় নিকেল খনন কোটা ১২ কোটি টন কমিয়েছে; উৎপাদনের অনুমোদিত পরিমাণ ২৭ কোটি ২০ লাখ টন থেকে কমে ১৫ কোটি টনে নেমেছে।
সাম্প্রতিক প্রয়োগমূলক পদক্ষেপে পরিবর্তনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। ২০২৫ সালের জুনে অনুমোদিত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের বাইরে ১,৮০০ হেক্টর জমিতে কার্যক্রম চালানো এবং বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হওয়ায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় সুলাওয়েসির ইন্দোনেশিয়া মোরোওয়ালি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (আইএমআইপি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। পরিবেশগত লঙ্ঘনের তথ্য গ্রিনপিসের নথিতে উঠে আসার পর প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো রাজা আম্পাতের চারটি নিকেল খনন কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেন। তবে মাইনিং অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্কের জুলফিকার সানগাজির মতো কর্মীরা এসব পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন; যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্প স্থগিতের দাবি জানান তাঁরা। তিনি বলেন, "এসব প্রকল্প কার দরকার? আমাদের নয়।" তিনি আরও বলেন, "এটা যেন আমাদের জীবনের ওপর ঘনিয়ে আসা এক মহাপ্রলয়।"
মূল কথা
- ইন্দোনেশিয়া বৈশ্বিক নিকেল সরবরাহের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন করে। ইভি ব্যাটারির জন্য অপরিহার্য এই ধাতু উত্তোলনে হালমাহেরা ও সুলাওয়েসির মতো জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকায় বন উজাড় ও দূষণ বাড়ছে।
- প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাটারির উপযোগী প্রতি টন নিকেল প্রক্রিয়াজাত করলে ৯৩ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড-সমতুল্য গ্যাস নির্গত হয়। ফলে সবুজ প্রযুক্তি উৎপাদনের কারণে স্থানীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কার্বন-বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে।
- বিশ্বের গাড়ি নির্মাতারা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পরিবেশগত বিধি ভাঙার অভিযোগে অভিযুক্ত শিল্পপার্ক থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করছে; অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ, বন্যা ও দূষিত পানির মুখে পড়ছে।
- ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পর চীনা বিনিয়োগ এ খাতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এলেও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থানীয় মানুষের সুফল পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
- সরকার ২০২৫ সালের খনন কোটা ৪৪ শতাংশ কমিয়েছে এবং পরিবেশগত লঙ্ঘনের দায়ে বড় শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে কর্মীদের মতে, অপূরণীয় পরিবেশগত ক্ষতি ঠেকাতে আইন প্রয়োগ এখনো যথেষ্ট নয়।






