ক্লদ কোওয়ার্কের ধাক্কায় কেঁপে উঠল বৈশ্বিক বাজার
২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির ভিত নড়ে যায়। এক দিনের লেনদেনেই দেশটির বেঞ্চমার্ক নিফটি আইটি সূচক প্রায় ৬% ধসে পড়ে। এটি ছিল আরও বিস্তৃত দরপতনের অংশ, যার ফলে এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতীয় সফটওয়্যার রপ্তানিকারকদের বাজারমূল্য থেকে আনুমানিক ২২.৫ বিলিয়ন ডলার মুছে যায়। এর কারণ কোনো ভূরাজনৈতিক সংকট বা মুদ্রার ওঠানামা ছিল না; বরং সান ফ্রান্সিসকোতে হাজার হাজার মাইল দূরে উন্মোচিত একটি সফটওয়্যার প্লাগইন। অ্যামাজন ও গুগলের সমর্থনপুষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি অ্যানথ্রপিক তাদের ক্লদ কোওয়ার্ক এজেন্টিক সিস্টেমের নতুন সক্ষমতা প্রকাশ করে। কয়েক দশক ধরে ভারতের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আউটসোর্সিং শিল্পকে টিকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণের, পুনরাবৃত্তিমূলক জ্ঞানভিত্তিক কাজ স্বয়ংক্রিয় করার জন্যই এসব সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে।
সূচিপত্র
- ক্লদ কোওয়ার্কের ধাক্কায় কেঁপে উঠল বৈশ্বিক বাজার
- অস্তিত্বের সংকট, নাকি বিবর্তনের চাপ?
- বিলযোগ্য কর্মঘণ্টার অবসান
- অভূতপূর্ব মাত্রায় কর্মশক্তিতে বিঘ্ন
- প্রযুক্তির বাইরেও ভূরাজনৈতিক প্রতিকূলতা
- কৌশলগত পরিবর্তন: পরিষেবা প্রদানকারী থেকে এআই কেন্দ্রে
- এআই ও শ্রম সম্পর্কে তথ্য-উপাত্তের ইঙ্গিত
- অভিযোজন, নাকি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া
- মূল কথা
নতুন প্লাগইনগুলো এমন সব কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেগুলোর জন্য আগে সাধারণত মানবকর্মীদের দল লাগত—চুক্তি পর্যালোচনা, নিয়ন্ত্রক পরিপালন পর্যবেক্ষণ, বিক্রির পূর্বাভাস এবং তথ্য বিশ্লেষণ। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাম্রাজ্য গড়েছে শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষায় "কর্মদিবসের হিসাবে বিল" (কর্মীরা কত ঘণ্টা কাজ করেছেন, তার ভিত্তিতে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া) মডেলের ওপর। তাদের জন্য এর তাৎপর্য ছিল তাৎক্ষণিক ও স্পষ্ট। কোনো মার্কিন ব্যাংক যদি ক্লদ কোওয়ার্ক দিয়ে নিজেদের ভেতরেই আইনি চুক্তি পর্যালোচনা করতে পারে, তাহলে একই কাজ করার জন্য বেঙ্গালুরুর পঞ্চাশজনের একটি দলকে তারা কেন অর্থ দেবে?
এই বিক্রির চাপ ছিল এমন একটি শিল্পের জন্য এআইয়ের দীর্ঘদিনের আশঙ্কার প্রথম বাস্তব ইঙ্গিত, যা ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ৮% অবদান রাখে এবং সরাসরি ৫০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করে। গত সাড়ে তিন দশকে এ খাত লাখ লাখ শ্বেতপোশাকের চাকরি তৈরি করেছে। এর ফলে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও গুরুগ্রামের মতো প্রযুক্তিকেন্দ্রগুলোতে অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি ও রেস্তোরাঁর চাহিদা বাড়িয়েছে। এখন ১৯৯০-এর দশকে যাত্রা শুরু করা এই শিল্পের অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
অস্তিত্বের সংকট, নাকি বিবর্তনের চাপ?
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিঘ্নের গতি নিয়ে সতর্ক করায় বাজারের আতঙ্ক আরও বেড়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বিনোদ খোসলা সতর্ক করে বলেন, ভারতের আইটি পরিষেবা ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ বছরের মধ্যে "প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন" হয়ে যেতে পারে; ২০৩০ সালের মধ্যে খাতটি হয়তো "থাকবেই না"। তাঁর যুক্তি, ভারতে অনেকেই এখনো হুমকির গভীরতা বুঝতে পারছেন না। তাঁর পূর্বাভাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি শ্বেতপোশাকের চাকরির বড় একটি অংশ পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে পারে।
তবে সব পর্যবেক্ষকই এমন সর্বনাশের পূর্বাভাসে একমত নন। বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপিমরগ্যান চেজ ভারতীয় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে "প্রযুক্তি বিশ্বের প্লাম্বার" বলে বর্ণনা করেছে। তাদের বক্তব্য, এআই জটিল কাজ দ্রুত করবে এবং আরও সফটওয়্যার কোড তৈরি করবে ঠিকই, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত পরিষেবা প্রদানকারীদের মতো একই মাত্রার কাস্টমাইজেশন ও সমন্বয় এআই সরঞ্জাম দিতে পারবে বলে "সরলভাবে ধরে নেওয়া" ঠিক নয়। একইভাবে, এইচএসবিসি তাদের সাম্প্রতিক "সফটওয়্যার এআইকে গ্রাস করবে" শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, বৃহৎ পরিসরের এআই ব্যবস্থা "মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ" এবং কয়েক দশকে প্রায় ত্রুটিমুক্ত হয়ে ওঠা বড় এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মকে পুরোপুরি "প্রতিস্থাপন" করার উপযোগী নয়।
মধ্যপন্থী অবস্থান তুলে ধরে ইনফোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা কৃষ গোপালকৃষ্ণন বলেন, এই রূপান্তর আকস্মিক পরিবর্তনের বদলে পাঁচ থেকে দশ বছরে ধীরে ধীরে ঘটবে। সাম্প্রতিক এক শিল্প সম্মেলনে তিনি বাজারের অস্থিরতায় অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখানোর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, আগের পরিবর্তনগুলোতেও (যেমন ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে রূপান্তর) ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে প্রথমে একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু পরে সেগুলো নতুন চাহিদা সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, "এর প্রভাব অবশ্যই পড়বে, তবে পরিবর্তন হবে ধীর ও স্থির।" তিনি আরও বলেন, "আমি নিশ্চিত, ভারতীয় আইটি শিল্প ইতিবাচকভাবে সাড়া দেবে।"
বিলযোগ্য কর্মঘণ্টার অবসান
ভারতের বড় আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে থাকা মৌলিক চ্যালেঞ্জটি তাদের ব্যবসায়িক মডেলের কাঠামোতে। কয়েক দশক ধরে টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিস ও উইপ্রোর মতো প্রতিষ্ঠান শ্রমব্যয়ের পার্থক্য কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করেছে। তারা উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের তুলনায় ৬০% থেকে ৮০% কম বেতনের শহরগুলোতে শিক্ষিত ইংরেজিভাষী কর্মী নিয়োগ করে বৈশ্বিক করপোরেশনগুলোর ব্যাক-অফিসের কাজ করায়। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত কাজ করা ঘণ্টার ভিত্তিতে ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে অর্থ নেয়। ফলে বড় কর্মীসংখ্যা বজায় রাখা এবং প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানোর সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা তৈরি হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই মডেলকে ভেঙে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে। জেফারিজের এক নোট অনুযায়ী, ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের ধরন সম্ভবত "কাঠামোগতভাবে পরামর্শ ও বাস্তবায়নের দিকে" সরে যাবে; অন্যদিকে অ্যাপ্লিকেশন পরিচালিত পরিষেবা (যা বর্তমান আয়ের ২২% থেকে ৪৫%) "তীব্র রাজস্ব সংকোচনের" মুখে পড়বে। সহজ করে বললে, সফটওয়্যার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি ঠিক করা এবং হালনাগাদের কাজ থেকে ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলোর আয় কমবে, কারণ এসব নিয়মিত কাজ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা করবে। জেফারিজের পূর্বাভাস, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে আগামী পাঁচ বছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ৩% কম হবে, এরপর ২০৩১ সালের পর আর কোনো প্রবৃদ্ধিই থাকবে না।
বিল করার পদ্ধতিটিও বদলাচ্ছে। ভারতের সফটওয়্যার শিল্পের লবিং গ্রুপ ন্যাসকম জানিয়েছে, খাতটি ঘণ্টা ও উপকরণভিত্তিক বিলিং থেকে ফলাফলভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের দিকে যেতে শুরু করেছে। এই পদ্ধতিতে কোম্পানিগুলো ঘণ্টার বদলে ফলাফলের জন্য অর্থ দেয়। শেষ পর্যন্ত এটি আরও কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে, তবে নুভামা ইনস্টিটিউশনাল ইকুইটিজের বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে "এই ধাক্কা এড়ানোর উপায় নেই"। প্রথমে রাজস্ব কমবে; সুফল দেখা যাবে কেবল মাঝারি মেয়াদে।
অভূতপূর্ব মাত্রায় কর্মশক্তিতে বিঘ্ন
প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনের মানবিক মূল্য উল্লেখযোগ্য হতে পারে। কয়েকজন প্রধান নির্বাহী সতর্ক করেছেন, এআই প্রাথমিক পর্যায়ের শ্বেতপোশাকের ৫০% চাকরি বিলুপ্ত করতে পারে। লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে ঠিক সেই নিয়মিত কোডিং, পরীক্ষা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও নথিপত্র তৈরির কাজ, যেগুলো বহু প্রজন্মের ভারতীয় প্রকৌশল স্নাতকদের কর্মজীবনে প্রবেশের পথ তৈরি করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২০ কোটি তরুণের কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছানোর কথা। তাই পরিষেবা খাতে যেকোনো সংকোচনের সামাজিক পরিণতি হবে গুরুতর।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণায় এই কর্মচ্যুতির পরিমাণগত প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভারতের বৃহত্তম চাকরির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে আইএমএফের অর্থনীতিবিদেরা দেখেছেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এআই গ্রহণ করলে মাঝারি মেয়াদে এআই-সংশ্লিষ্ট নয় এমন শূন্যপদের প্রবৃদ্ধি ৩.৬১ শতাংশ পয়েন্ট কমে যায়। লক্ষণীয় বিষয়, আগের প্রযুক্তির ঢেউগুলোতে মূলত নিয়মিত কায়িক শ্রমের চাকরি হারালেও, এআই করপোরেট ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশল পেশাজীবীদের মতো উচ্চদক্ষতার পেশার চাহিদাও কমাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিবরণে পূর্বাভাস, বিশ্লেষণ ও জটিল যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত ক্রিয়াপদের ব্যবহার কমেছে।
তবে তথ্য-উপাত্তে শ্রমবাজারের বিভাজনও স্পষ্ট। এআই-সংশ্লিষ্ট পদে বেতন ১৩% থেকে ১৭% বেশি এবং সাধারণত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চাওয়া হয়। কিন্তু এসব পদ এখনো বেঙ্গালুরু, মুম্বাই ও হায়দরাবাদের মতো নির্দিষ্ট প্রযুক্তিকেন্দ্র এবং বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীভূত। ইনফোসিসের পূর্বাভাস, জেনারেটিভ এআই সামনের সারির ডেভেলপার ও পরীক্ষকের মতো ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি সরিয়ে দিতে পারে, তবে তথ্য ট্যাগকারী, এআই প্রকৌশলী ও এআই নেতৃত্বের জন্য প্রায় ১৭ কোটি নতুন পদ তৈরি করবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এসব নতুন পদে কাজ করার জন্য ভারতের বর্তমান কর্মশক্তি যথেষ্ট দ্রুত রূপান্তরিত হতে পারবে কি না।
২০২৬ সালে কর্মীর নিট সংখ্যা মাত্র ২.৩% বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা আগের দশকগুলোর অতিদ্রুত প্রবৃদ্ধির পর্যায় থেকে নিয়োগ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। শিল্পটি ব্যাপকভাবে নতুন দক্ষতা শেখানোর উদ্যোগ শুরু করেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ভারতের শীর্ষ পাঁচ আইটি কোম্পানি আড়াই লাখের বেশি কর্মীকে এআই প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান টিসিএস প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তাদের এআই পরিষেবা থেকে বার্ষিক আয় ১.৮ বিলিয়ন ডলার, যা প্রান্তিকভিত্তিক সমন্বিত আয়ের প্রায় ৫%।
প্রযুক্তির বাইরেও ভূরাজনৈতিক প্রতিকূলতা
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই ভারতীয় আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। এসব কোম্পানির বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংরক্ষণবাদী নীতিও তাদের সংকট বাড়ানোর হুমকি তৈরি করছে। সিনেটর বার্নি মোরেনোর প্রস্তাবিত হায়ার অ্যাক্টে (হল্টিং ইন্টারন্যাশনাল রিলোকেশন অব এমপ্লয়মেন্ট অ্যাক্ট) মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিদেশি পরিষেবা প্রদানকারীদের দেওয়া অর্থের ওপর ২৫% কর আরোপের পাশাপাশি বিদেশে আউটসোর্সিংয়ের ব্যয়ের জন্য করছাড় বাতিলের প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকির মাত্রা উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ অর্থবছরে ভারতের আইটি ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনা খাত ২২৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যার ৫০%-এর বেশি এসেছে মার্কিন ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে। নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্ভরতা আরও বেশি: ইনফোসিসের আয়ের ৫৭.৯% আসে উত্তর আমেরিকা থেকে, আর টেক মাহিন্দ্রার মোট ব্যবসার প্রায় অর্ধেকই আমেরিকা মহাদেশে। এ ছাড়া, নতুন মার্কিন ভিসা ফিতে ভারতের শীর্ষ আইটি কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। মুডি’স অ্যানালিটিকসের হিসাবে, যা তাদের আয়ের প্রায় ১%।
এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয়করণের কারণে মুনাফার মার্জিন কমে যাওয়ায় শিল্পটি যখন আগে থেকেই চাপে, তখনই এসব নীতিগত বাধা সামনে এসেছে। সিংহানিয়া অ্যান্ড কোংয়ের রোহিত জৈন টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, "নতুন চুক্তি পাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে, মুনাফার মার্জিন কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ব্যবসা বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠবে।"
কৌশলগত পরিবর্তন: পরিষেবা প্রদানকারী থেকে এআই কেন্দ্রে
এই দুই ধরনের চাপের মুখে ভারতীয় শিল্প ও সরকার কৌশলগত অবস্থান বদলাচ্ছে। প্রচলিত আউটসোর্সিং মডেলকে শুধু রক্ষা করার বদলে অনেক প্রতিষ্ঠান ভারতকে এআই অবকাঠামো ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করার চেষ্টা করছে। নয়াদিল্লিতে এআই ইমপ্যাক্ট সামিট চলাকালে ভারতের বড় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকসহ মার্কিন হাইপারস্কেলার এবং নতুন এআই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি ঘোষণা করে। এতে প্রতিযোগিতা থেকে অংশীদারত্বের দিকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত মেলে।
সরকারের কৌশলের মূল লক্ষ্য কম্পিউটিং অবকাঠামো। বৈশ্বিক এআই বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ভারত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর অবকাশ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে—ভারতীয় ডেটা সেন্টার ব্যবহার করে বৈশ্বিক ক্লায়েন্টদের ক্লাউড পরিষেবা দিলে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত শূন্য কর। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো বিশাল বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে: রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এআই ও তথ্য অবকাঠামোর জন্য ১০৯.৮ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা জানিয়েছে, আর আদানি গ্রুপ ২০৩৫ সালের মধ্যে এআই ডেটা সেন্টারে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে গুগল, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনসহ বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে এআই ও ক্লাউড অবকাঠামোতে সম্মিলিতভাবে ৬৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এটি একটি হিসাব-নিকাশ করে নেওয়া অবস্থান পরিবর্তন। এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত যেন "এক পরিষেবা মডেলের বদলে আরেকটি নিচ্ছে"—শ্রমব্যয়ের পার্থক্য কাজে লাগানোর মডেল থেকে অবকাঠামো ধারণক্ষমতা সরবরাহের দিকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক আইটি আউটসোর্সিং বাজারের প্রায় ৫৫% ভারতের দখলে। তবে গার্টনারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে গ্রাহকদের ৮০% প্রশ্নের উত্তর এআই এজেন্ট দেবে। তাই অবস্থান ধরে রাখতে হলে কর্মীর সংখ্যা ধরে বিল করার মডেলের বাইরে এগোতে হবে।
এআই ও শ্রম সম্পর্কে তথ্য-উপাত্তের ইঙ্গিত
এআইয়ের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক কেবল তাত্ত্বিক নয়। ভারতের বৃহত্তম চাকরির তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে করা অভিজ্ঞতাভিত্তিক গবেষণায় শ্বেতপোশাকের কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তন আনার সুস্পষ্ট ধরন উঠে এসেছে। আইএমএফের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালের পর এআই-সংশ্লিষ্ট দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বেড়েছে; চাহিদাটি মূলত আইটি, অর্থায়ন ও পেশাদার পরিষেবা খাতে কেন্দ্রীভূত। এসব পদ প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তিকেন্দ্রগুলোতে কেন্দ্রীভূত। ফলে স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব তৈরি হচ্ছে: কোনো অঞ্চলের একটি প্রতিষ্ঠান এআই গ্রহণ করলে আশপাশের প্রতিষ্ঠানগুলোরও তা গ্রহণের সম্ভাবনা বাড়ে।
গবেষণায় কর্মচ্যুতির উদ্বেগজনক একটি ধরনও উঠে এসেছে। এআই গ্রহণের তিন বছর পর প্রতিষ্ঠানগুলোতে এআই ব্যবহার করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এআই-বহির্ভূত শূন্যপদের বিজ্ঞাপন প্রায় ১% কম দেখা যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানের মোট শূন্যপদের প্রবৃদ্ধি ৩.৫৭ শতাংশ পয়েন্ট কমে যায়। এতে বোঝা যায়, বিশেষায়িত এআই পদ যত বাড়ে, প্রচলিত পদ কমার পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। এটি সেই আগের ধারণার বিপরীত, যেখানে মনে করা হতো এআই মূলত নিয়মিত কায়িক শ্রমের কাজ স্বয়ংক্রিয় করবে। বরং মনে হচ্ছে, এটি অনিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের চাকরিও সরিয়ে দিচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, বেশি এআই গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বেতনের প্রস্তাব বাড়ানোর বদলে বেতনস্তর কমায়। এতে ইঙ্গিত মেলে, কর্মচ্যুতি শ্রমিকের সরবরাহ কম থাকার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং শ্রমের প্রকৃত প্রতিস্থাপন। গবেষণার ফল বলছে, এআই গ্রহণের ফলে চাকরির বিজ্ঞাপনে "তদন্ত করা", "পূর্বাভাস দেওয়া", "প্রক্ষেপণ করা" ও "বর্ণনা করা"র মতো বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ক্রিয়াপদের আপেক্ষিক ব্যবহার কমে যায়। অর্থাৎ এসব বিশ্লেষণমূলক কাজের জন্য কম কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে।
অভিযোজন, নাকি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া
ভারতের আউটসোর্সিং শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করতে পারে তারা কত দ্রুত মূল্যশৃঙ্খলের উচ্চতর ধাপে উঠতে পারে, তার ওপর। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান এ১৬জেডের বিশ্লেষকদের যুক্তি, এআই-ভিত্তিক পণ্য তৈরি করা এবং প্রচলিত ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান চালানোর মধ্যে "ব্যবসায়িক মডেলের মৌলিক অসামঞ্জস্য" রয়েছে। অধিকাংশ বিপিও প্রতিষ্ঠান শ্রমব্যয়ের ওপর ২০% থেকে ৩০% বাড়তি মূল্য ধরে। পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এআই ব্যবসায় রূপান্তরিত হলে মুনাফার মার্জিন কমবে, বড় আয়ের উৎসগুলো বন্ধ হবে এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দরকার হবে—যা সফলভাবে সামলানো পাবলিক কোম্পানির জন্য বিরল।
তবে উদ্ভাবনের সুযোগ রয়ে গেছে। গাড়ির ঋণ, স্বাস্থ্যসেবায় রাজস্বচক্র ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন সরবরাহব্যবস্থার মতো বিপিওর মূল কাজগুলোকে খাতভিত্তিক এআই এজেন্ট ইতিমধ্যে সফলভাবে পণ্যে রূপ দিচ্ছে। ডেকাগনের মতো কোম্পানি এআই সহায়তা এজেন্ট তৈরি করেছে, যেগুলো ৮০%-এর বেশি ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান করছে এবং একই সঙ্গে গ্রাহক সন্তুষ্টির স্কোরও বাড়াচ্ছে। এসব বিশেষায়িত খাতে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে জটিল সমন্বয় এবং নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাগে, যা সর্বজনীন এআই সমাধানের বিরুদ্ধে সুরক্ষার বাধা তৈরি করে।
ভারতের জন্য নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ হলো, ওয়াই-টু-কে উত্থানের ধারা যেন আবার না ঘটে। তখন দেশটি প্রযুক্তি খাতের শ্রমব্যয়-সাশ্রয়ী স্তরটি দখল করেছিল, কিন্তু তার ওপর মেধাস্বত্বের স্তর গড়ে তুলতে পারেনি। বর্তমানে কোনো ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বৈশ্বিক অপারেটিং সিস্টেম, হাইপারস্কেলার ক্লাউড বা প্রভাবশালী এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার প্যাকেজ নেই। বর্তমান ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটিং অবকাঠামো সরবরাহের কৌশলও একই যুক্তি অনুসরণ করে: বাস্তবায়নের স্তরে প্রবেশ, কম খরচ ও সক্ষমতার জোরে সম্প্রসারণ, আর প্রযুক্তির স্তরবিন্যাসে আরও ওপরে গিয়ে উন্নততর এআই মডেল তৈরি করা উচিত কি না—সেই কঠিন প্রশ্নটি পরে বিবেচনা করা।
এই কৌশল যথেষ্ট প্রমাণিত হবে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের শিল্পটি বিকশিত হবে, নাকি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে সতর্কতামূলক দৃষ্টান্তে পরিণত হবে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর রঘুরাম রাজন সম্প্রতি বলেছেন, ভারতের পরিষেবা খাতের সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা হলো "বিঘ্নিত হওয়া, কিন্তু লাইনচ্যুত না হওয়া"।
মূল কথা
- ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যানথ্রপিকের ক্লদ কোওয়ার্ক প্রকাশের পর এ বছর ভারতের নিফটি আইটি সূচক ২০% কমেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের কয়েক দশ বিলিয়ন ডলারের মূল্য মুছে গেছে এবং শ্রমনির্ভর আউটসোর্সিং মডেলের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে
- ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় আইটি ও আউটসোর্সিং শিল্প, যা জিডিপির প্রায় ৮% এবং ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত, কাঠামোগত রূপান্তরের মুখে। এআই চুক্তি পর্যালোচনা, পরিপালন পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত কোডিং ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ স্বয়ংক্রিয় করছে
- শিল্প বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, ঘণ্টা ও উপকরণভিত্তিক বিলিং থেকে ফলাফলভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে পরিবর্তন আসবে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পাঁচ বছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ৩% কমতে পারে, এরপর ২০৩১ সালের পর স্থবিরতা দেখা দিতে পারে
- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণায় দেখা গেছে, এআই গ্রহণের ফলে এআই-বহির্ভূত শূন্যপদের প্রবৃদ্ধি ৩.৬১ শতাংশ পয়েন্ট কমে যায়। ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশল পেশাজীবীদের মতো উচ্চদক্ষতার পেশায় এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি
- এআই গবেষণাগারের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব, আড়াই লাখের বেশি কর্মীকে নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষণ এবং ২০৪৭ সাল পর্যন্ত কর প্রণোদনাসহ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবকাঠামো বিনিয়োগের অঙ্গীকারের মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দেশকে বৈশ্বিক এআই কম্পিউটিং কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে






