যুদ্ধোত্তর প্রতিরক্ষা নীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন
২০২৬ সালের ৩১ মার্চ সামরিক রূপান্তরের এক মাইলফলক অর্জন করবে জাপান। সেদিন দেশটি প্রথমবারের মতো নিজস্বভাবে তৈরি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে, যেগুলো দেশের আশপাশের সীমানার বাইরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। জাপান স্থল আত্মরক্ষা বাহিনী (JGSDF) পৃথক দুটি ঘাঁটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অত্যাধুনিক দুটি অস্ত্রব্যবস্থা চালু করবে। এর মধ্য দিয়ে তিন বছর আগে গৃহীত টোকিওর বিতর্কিত শত্রুর ওপর পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতার নীতির কার্যকর প্রয়োগ শুরু হবে। শিজুওকা প্রিফেকচারের ফুজি ক্যাম্পে হাইপার ভেলোসিটি গ্লাইডিং প্রজেক্টাইল (HVGP) এবং কুমামোতো প্রিফেকচারের কেনগুন ক্যাম্পে উন্নত টাইপ-১২ ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র একই সময়ে মোতায়েন করা হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জাপান যে একান্ত প্রতিরক্ষামুখী অবস্থান বজায় রেখেছিল, তা থেকে সরে আসার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট প্রকাশ এখন পর্যন্ত এই মোতায়েন। ১৯৪৫ সালে পরাজয়ের পর সাত দশক ধরে জাপান তার সামরিক কার্যক্রমকে নিকটবর্তী এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে সীমিত রেখেছিল এবং আক্রমণাত্মক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এমন শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা এড়িয়ে চলেছিল। এই সংযমের ভিত্তি ছিল জাপানের সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেখানে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় হিসেবে যুদ্ধ পরিত্যাগ করা হয়েছে, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর শান্তিবাদের পক্ষে জনমনে গভীর সমর্থন।
সূচিপত্র
- যুদ্ধোত্তর প্রতিরক্ষা নীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন
- নতুন অস্ত্রভাণ্ডার: HVGP ও উন্নত টাইপ-১২
- হাইপার ভেলোসিটি গ্লাইডিং প্রজেক্টাইল
- উন্নত টাইপ-১২ ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র
- কৌশলগত প্রেক্ষাপট: একান্ত প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা আঘাত
- মোতায়েন পরিকল্পনা ও স্থানীয় উদ্বেগ
- ভবিষ্যৎ সক্ষমতা ও মিত্রদের সহায়তা
- আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য
- মূল বিষয়গুলো
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন এই রূপান্তর; জাপানি নীতিনির্ধারকদের চোখে যা প্রচলিত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানকে অপর্যাপ্ত করে তুলেছে। উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির অগ্রগতি অব্যাহত রেখেছে এবং এমন ক্রমবর্ধমান অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে, যা জাপানের সব অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। অন্যদিকে, চীন দ্রুত সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পূর্ব চীন সাগর, তাইওয়ান ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে তৎপরতা জোরদার করেছে। ক্রমবর্ধমান এসব হুমকির জবাবে জাপানি নীতিনির্ধারকেরা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দেশের তিনটি প্রধান নিরাপত্তা নথি সংশোধন করেন। এতে আনুষ্ঠানিকভাবে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতার ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা জাপান আক্রমণের শিকার হলে বা আসন্ন হুমকির মুখে পড়লে বাহিনীকে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল কিংবা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সুযোগ দেয়। কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, এ সক্ষমতা প্রতিরক্ষামূলকই থাকবে এবং কেবল সশস্ত্র হামলার পরই সক্রিয় করা হবে। তা সত্ত্বেও, এই পরিবর্তন কয়েক দশকের মধ্যে জাপানের প্রতিরক্ষা নীতিতে অন্যতম বড় রূপান্তর এবং ১৯৫৪ সাল থেকে জাপানের সামরিক চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে আসা একান্ত প্রতিরক্ষার কঠোর ব্যাখ্যা কার্যত পরিত্যাগের শামিল।
নতুন অস্ত্রভাণ্ডার: HVGP ও উন্নত টাইপ-১২
৩১ মার্চের মোতায়েনে ভিন্ন কৌশলগত চাহিদা পূরণের জন্য তৈরি দুটি স্বতন্ত্র অস্ত্রব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। তবে দুটিরই অভিন্ন লক্ষ্য জাপানের প্রতিরক্ষার পাল্লা বাড়ানো। উভয় ব্যবস্থাই জাপানের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বড় প্রযুক্তিগত সাফল্য। যুদ্ধোত্তর সাংবিধানিক বিধিনিষেধের কারণে এ শিল্প ঐতিহাসিকভাবে স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। বিদেশি দূরপাল্লার অস্ত্র কেনার পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে, দেশে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো টোকিওর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর লক্ষ্য হলো, আগের চেয়ে বেশি দূরত্ব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার হুমকি দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করা।
হাইপার ভেলোসিটি গ্লাইডিং প্রজেক্টাইল
HVGP-এর মাধ্যমে হাইপারসনিক অস্ত্র প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করছে জাপান। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির অন্তত পাঁচ গুণ বেগে চলে এবং অননুমেয় গতিপথে দিক পরিবর্তন করতে পারে। পূর্বানুমেয় পরাবৃত্তাকার পথে চলা প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিপরীতে, হাইপারসনিক গ্লাইড যান উৎক্ষেপক রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বায়ুমণ্ডলের প্রান্ত বরাবর চলাচল করে। ফলে বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে এগুলোকে প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। ফুজি ক্যাম্পে মোতায়েন করা হচ্ছে ব্লক-১ সংস্করণটি। এতে কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট বুস্টার রয়েছে, যা গ্লাইড যানটিকে ঘণ্টায় শব্দের গতির পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেগে (ম্যাক ৫) পৌঁছে দিতে পারে।
প্রাথমিক সংস্করণটির পাল্লা প্রায় ৫০০ থেকে ৯০০ কিলোমিটার, যা তাইওয়ানের কাছাকাছি অঞ্চলসহ বিরোধপূর্ণ রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের পুরো এলাকায় পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট। দুটি কনটেইনারে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী আট চাকার কৌশলগত ট্রাকে বসানো এই ব্যবস্থাকে সড়কপথে সরিয়ে নেওয়া যায়, যা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য জরুরি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথম ইউনিটগুলো ফুজি ক্যাম্পের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ দলে দিয়েছে। সেখানে কর্মীরা এই সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অস্ত্রের জন্য কার্যকর কৌশল ও নীতিমালা তৈরি করবেন। HVGP জাপান স্থল আত্মরক্ষা বাহিনীর জন্য অভূতপূর্ব সক্ষমতা নিয়ে আসছে বলে, তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার বদলে প্রাথমিক মোতায়েনের মূল লক্ষ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রশিক্ষণপদ্ধতি তৈরি। মার্কিন স্থাপনার সহায়তায় ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়। দেশীয় পরীক্ষায় আকাশপথে ও সমুদ্রপথে পরিবহন এবং শীতল আবহাওয়ায় পরিচালনার সক্ষমতাও নিশ্চিত করা হয়েছে।
উন্নত টাইপ-১২ ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র
HVGP হাইপারসনিক গতি দিলেও উন্নত টাইপ-১২ গোপনীয়তা ও নির্ভুলতার মাধ্যমে পাল্লা বাড়ায়। এই অস্ত্রটি বিদ্যমান টাইপ-১২ উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মৌলিক পুনর্নকশা। এতে পাল্লা প্রায় ২০০ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার করা হয়েছে এবং রাডারে শনাক্ত হওয়া এড়াতে কম দৃশ্যমানতার বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছে। মূলত শুধু জাহাজবিধ্বংসী অভিযানের জন্য তৈরি হলেও, উন্নত সংস্করণটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ও কমান্ড সেন্টারসহ স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। উন্নত টাইপ-১২ এবং HVGP, উভয়েরই প্রধান ঠিকাদার মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ। জাপানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তিতে কোম্পানিটির কেন্দ্রীয় ভূমিকারই প্রতিফলন এটি।
দক্ষিণের কিউশু দ্বীপে কুমামোতো প্রিফেকচারের কেনগুন ক্যাম্প থেকে উন্নত টাইপ-১২ উত্তর কোরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং চীনের পূর্ব উপকূলের বড় অংশে পৌঁছাতে পারে। জাপানের গড়ে ওঠা পাল্টা আঘাত হানার সামরিক কাঠামোর মূল উপাদান হিসেবে কাজ করবে ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থাটি। এর ফলে স্থলবাহিনী শত্রুর বহু অস্ত্রের পাল্লার বাইরে থেকেই তাদের উৎক্ষেপণস্থলে আঘাত হানতে পারবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকায় প্রতিরোধক্ষমতা জোরদারের জরুরি প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মোতায়েনের সময়সূচি প্রায় এক বছর এগিয়ে এনেছে। ২০২৭ অর্থবছরে প্রশিক্ষণের জন্য ফুজি ক্যাম্পে আরও ইউনিট মোতায়েন করা হবে। জাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য সংস্করণটি ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটিতে ডেস্ট্রয়ার JS Teruzuki-তে এবং আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য সংস্করণটি হিয়াকুরি বিমানঘাঁটিতে F-2 যুদ্ধবিমানে যুক্ত করা হবে।
কৌশলগত প্রেক্ষাপট: একান্ত প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা আঘাত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে জাপান একান্ত প্রতিরক্ষামুখী নিরাপত্তা অবস্থান বজায় রেখেছিল। এতে আত্মরক্ষা বাহিনীর ভূমিকা মূলত জাপানের ভূখণ্ডে হামলা প্রতিহত করার মধ্যে সীমিত ছিল। এই নীতিতে আসন্ন হুমকির বিরুদ্ধে আগাম পদক্ষেপ হিসেবেও বিদেশি ঘাঁটি বা ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে এমন অস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ ছিল। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি নীতিনির্ধারকদের এই দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে; তাঁরা আরও সক্রিয় প্রতিরোধমূলক অবস্থানের দিকে ঝুঁকছেন।
এই পরিবর্তনের প্রধান অনুঘটক চীনের সামরিক সম্প্রসারণ। বেইজিং এখন একাধিক বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করছে, আরও জাহাজ নির্মাণাধীন রয়েছে, জাহাজের সংখ্যার হিসাবে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী বজায় রেখেছে এবং তাইওয়ান ও সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। তাইওয়ান প্রণালি জাপানের পশ্চিমতম ভূখণ্ড ইয়োনাগুনি দ্বীপ থেকে মাত্র ৬৯ মাইল দূরে। ফলে সম্ভাব্য সংঘাতের কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে জাপানি বাহিনী। এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া বহু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের কয়েকটি জাপানের কাছাকাছি জলসীমায় পড়েছে, আবার কয়েকটি জাপানের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে জাপানের শহরগুলোতে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে দেশটি।
একই সময়ে, HVGP-কে দ্বীপ প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি বলে প্রচার করা হলেও, কার্যত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে এগুলোর শত্রুর ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে, যা উত্তেজনা বাড়াতে পারে। প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার এবং সংকটকালীন স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জাপানের সামগ্রিক কৌশলে HVGP কীভাবে যুক্ত হতে পারে, তা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
টোকিওর আওয়ামা গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তাকুয়া মাতসুদা USNI News-কে এই মূল্যায়ন জানান। প্রতিরক্ষামূলকভাবে দ্বীপ সুরক্ষা এবং আক্রমণাত্মকভাবে শত্রুর ঘাঁটিতে হামলা, দুই ধরনের সক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থার কৌশলগত অস্পষ্টতার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন। ২০২২ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এই অস্পষ্টতার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে জোর দিয়ে বলা হয়, পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা মৌলিকভাবে প্রতিরক্ষামূলক এবং এর উদ্দেশ্য কেবল দীর্ঘ দূরত্ব থেকে আক্রমণকারী বাহিনীর কার্যক্রম ব্যাহত ও পরাজিত করা। তবু চীনের মূল ভূখণ্ড বা উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র সংগ্রহ আগের নীতি থেকে সুনির্দিষ্ট বিচ্যুতি। আগের নীতি মূলত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও মিত্রদের প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
মোতায়েন পরিকল্পনা ও স্থানীয় উদ্বেগ
৩১ মার্চের মোতায়েন ২০২৭ অর্থবছর পর্যন্ত পরিকল্পিত বৃহত্তর অস্ত্র মোতায়েন কৌশলের প্রাথমিক পর্যায় মাত্র। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৬ অর্থবছরের মধ্যে হোক্কাইডোর কামিফুরানো ক্যাম্প এবং মিয়াজাকি প্রিফেকচারের এবিনো ক্যাম্পে HVGP কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে জাপানের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথজুড়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এসব অবস্থান থেকে রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চল এবং কোরীয় উপদ্বীপের কিছু অংশ ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় আসবে। তবে এতে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ওকিনাওয়া প্রিফেকচার এড়িয়ে যাওয়া হবে। জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সামরিক বাহিনী এ প্রিফেকচারেই অবস্থান করছে এবং সামরিক সম্প্রসারণ নিয়ে স্থানীয়দের বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে।
কৌশলগত যুক্তি থাকা সত্ত্বেও, মোতায়েনকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ৯ মার্চ ভোররাতে ক্ষেপণাস্ত্র-সম্পর্কিত সরঞ্জাম কেনগুন ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর কুমামোতোতে বাসিন্দা ও নাগরিক গোষ্ঠীগুলো ঘাঁটির বাইরে বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীদের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন বন্ধ করুন’। সংঘাতের সময় এসব অস্ত্রের কারণে এলাকাটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলেও তাঁরা সতর্ক করেন। কোনো আগাম জনবিজ্ঞপ্তি ছাড়াই মধ্যরাতের পর গোপনে সরঞ্জাম পরিবহন করায় স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
প্রিফেকচারকে কখনোই এ বিষয়ে জানানো হয়নি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা বিষয়টি জেনেছি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
কুমামোতো গভর্নর তাকাশি কিমুরা সাংবাদিকদের কাছে এই ক্ষোভের কথা জানান এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতার অভাবের সমালোচনা করেন। কুমামোতো মেয়র কাজুফুমি ওনিশিও একইভাবে বলেন, প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয়ের যেভাবে পরিচালনা করেছে, তাতে জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং বাসিন্দাদের উদ্বেগ বেড়েছে। ১৭ মার্চ কেনগুন ক্যাম্পে স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটির প্রতিনিধিদের জন্য ব্রিফিং এবং সরঞ্জাম প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে মন্ত্রণালয়। তবে ফুজি ক্যাম্পে HVGP মোতায়েন নিয়ে একই ধরনের কোনো ব্যাখ্যামূলক সভার পরিকল্পনা এখনো নেই। স্থানীয় এই উত্তেজনা দেখায়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সম্মতির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে টোকিওকে কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে, দেশের যুদ্ধোত্তর প্রতিরক্ষামুখী অবস্থান থেকে আমূল ভিন্ন অস্ত্রব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট।
ভবিষ্যৎ সক্ষমতা ও মিত্রদের সহায়তা
বর্তমান মোতায়েন জাপানের পরিকল্পিত দীর্ঘপাল্লার আঘাত হানার সামরিক কাঠামোর ভিত্তি মাত্র। HVGP ব্লক-১-এর ধারাবাহিক উৎপাদনের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০৭ কোটি ডলার বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। উন্নত সংস্করণ তৈরিতে বরাদ্দ করা হয়েছে আরও ৫০৩ কোটি ডলার। ২০২৭ সালের মধ্যে আসার কথা ব্লক-২এ সংস্করণটির, যার পাল্লা বেড়ে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার হবে। ২০৩০ সালের জন্য পরিকল্পিত ব্লক-২বি সংস্করণটি ৩,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা জাপানের ভূখণ্ড থেকে এশিয়া মহাদেশের বড় অংশে আঘাত হানার সম্ভাবনা তৈরি করবে। পাল্লা বাড়লে উৎক্ষেপককে সামনের দিকে মোতায়েন না করেও চীন বা উত্তর কোরিয়ার গভীর অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব হবে।
দেশীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি, পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতায় বিদেশি অস্ত্রও যুক্ত করছে জাপান। জাপান সামুদ্রিক আত্মরক্ষা বাহিনী ৪০০টি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ২০০টি ব্লক-৪ এবং ২০০টি ব্লক-৫ সংস্করণের ক্ষেপণাস্ত্র থাকবে, যা ২০২৬ সালের মার্চ থেকে পরিবর্তিত এজিস ডেস্ট্রয়ারে বসানো হবে। সম্প্রতি ডেস্ট্রয়ার JS Chokai সমন্বয় প্রশিক্ষণের জন্য সান ডিয়েগো পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের মার্চের শেষ নাগাদ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা। এ ছাড়া F-35 ও F-15 যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপের জন্য জয়েন্ট স্ট্রাইক মিসাইল সংগ্রহ করছে টোকিও। মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে চুক্তির আওতায় টমাহকের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নতুন ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করছে। কাওয়াসাকি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজও ২,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার নতুন ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে শত্রু জাহাজের কাঠামোগত দুর্বল স্থান শনাক্ত করা হবে।
এই অস্ত্রগুলোর কার্যকর ব্যবহার করতে হলে উন্নত গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও অনুসন্ধান সক্ষমতা প্রয়োজন, যা বর্তমানে জাপানের নেই। আত্মরক্ষা বাহিনীর নিজস্ব মাত্র নয়টি গোয়েন্দা, নজরদারি ও অনুসন্ধান (ISR) উপগ্রহ রয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিস্তৃত পাল্লাজুড়ে চলমান লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। এই ঘাটতি পূরণে জাপানি প্রতিষ্ঠান IHI ২০২৫ সালের অক্টোবরে ফিনল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান ICEYE-এর সঙ্গে অংশীদারত্ব করে, যাতে সব আবহাওয়ায় লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম সিনথেটিক-অ্যাপারচার রাডার উপগ্রহের একটি নক্ষত্রমণ্ডল মোতায়েন করা যায়। প্রাথমিকভাবে নেটওয়ার্কটিতে চারটি উপগ্রহ থাকবে। পাশাপাশি আরও ২০টি পর্যন্ত উপগ্রহ যুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। ২০২৯ অর্থবছরের মধ্যে এর পূর্ণ কার্যক্ষমতা অর্জনের কথা। দেশীয় এই সক্ষমতাগুলো পূর্ণতা না পাওয়া পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু শনাক্তের তথ্যের জন্য জাপান সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করবে। এতে এমন নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে, যা সংকটের সময় সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলবে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য
এই মোতায়েনের তীব্র সমালোচনা করেছে বেইজিং। চীনা সামরিক বাহিনীর মুখপত্র পিএলএ ডেইলিতে প্রকাশিত এক ভাষ্যে জাপানের বিরুদ্ধে শান্তিবাদী সংবিধান লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। চীনা সামরিক বাহিনীর দাবি, দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়িয়ে জাপান শান্তিবাদী সংবিধানের বিধিনিষেধ ভাঙছে, যে সংবিধানের আওতায় জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর আক্রমণাত্মক অস্ত্র রাখার কথা নয়। বেইজিং বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, মোতায়েনের জন্য ওকিনাওয়ার বদলে কিউশু ও হোক্কাইডো বেছে নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো প্রথম দ্বীপমালাজুড়ে কৌশলগত আওতা বজায় রেখেও আন্তর্জাতিক সমালোচনা কমানো।
জাপানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের মার্চে অনুমোদিত ২০ কোটি ডলারের বৈদেশিক সামরিক বিক্রয় চুক্তি, যার আওতায় HVGP কর্মসূচির পরীক্ষা-প্রস্তুতি, পরিবহন সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম রয়েছে। জাপানি হাইপারসনিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার স্থাপনাও ব্যবহার করতে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দুই মিত্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। মিত্রদের সক্ষমতা বাড়িয়ে চীনের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিরোধ শক্তিশালী করার বৃহত্তর মার্কিন কৌশলের সঙ্গে এই সহায়তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাপানকে রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্রসহ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার পূর্ণ পরিসর ব্যবহারের প্রতিশ্রুতিও এর অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেশী দেশগুলো এসব উন্নয়নকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় দেখছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে নিজেদেরও ভূখণ্ডগত বিরোধ থাকায় ফিলিপাইন বেইজিংয়ের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিপরীতে ভারসাম্য তৈরির সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে জাপানের অস্ত্রসজ্জার দিকে নজর রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে জাপানের মিত্র হলেও, জাপানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে দেশটির ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা রয়েছে, যা সতর্ক কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা দাবি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সোভিয়েত বাহিনীর কাছে দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জ হারানো রাশিয়াও ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এ পাল্লার মধ্যে ভ্লাদিভস্তক ও সাখালিনে তাদের সুদূর পূর্বাঞ্চলের সামরিক স্থাপনাগুলো পড়তে পারে। টোকিওর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে পরিবর্তনশীল সামরিক অবস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখা, যাতে বর্ধিত প্রতিরোধক্ষমতা অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই সংঘাতের সূত্রপাত না ঘটায়, যা ঠেকানোই এর উদ্দেশ্য।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ প্রথমবারের মতো নিজস্বভাবে তৈরি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে জাপান। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধোত্তর একান্ত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটবে।
- হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হাইপার ভেলোসিটি গ্লাইডিং প্রজেক্টাইল (HVGP) প্রশিক্ষণের জন্য ফুজি ক্যাম্পে মোতায়েন হবে। অন্যদিকে, ১,০০০ কিলোমিটার পাল্লার উন্নত টাইপ-১২ ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কুমামোতোর কেনগুন ক্যাম্পে মোতায়েন হবে।
- ২০২২ সালের ডিসেম্বরে গৃহীত পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতার নীতির কার্যকর ভিত্তি এই অস্ত্রগুলো। সশস্ত্র হামলার পর শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে আঘাত হানার সুযোগ দেবে এগুলো।
- ভবিষ্যৎ সংস্করণগুলোর পাল্লা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ২০২৭ সালের মধ্যে HVGP ব্লক-২এ-এর পাল্লা হবে ২,০০০ কিলোমিটার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ব্লক-২বি-এর পাল্লা ৩,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
- মোতায়েনের বিরুদ্ধে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো বিক্ষোভ করেছে। বিশেষ করে কুমামোতোতে বাসিন্দারা আগাম বিজ্ঞপ্তি না দেওয়ার সমালোচনা করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে সংঘাতের সময় ঘাঁটিটি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
- চীন জাপানের বিরুদ্ধে শান্তিবাদী সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, HVGP কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্র ২০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে এবং মার্কিন স্থাপনায় পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে।
- ২০৩০ সালের মধ্যে স্তরভিত্তিক দীর্ঘপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা গড়ে তুলতে জাপান ৪০০টি মার্কিন টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে এবং আরও দেশীয় অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি করছে।






