উপশমমূলক সেবার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, বার্ধক্যজনিত সংকটের মুখোমুখি চীন

পড়তে 11 মিনিট
উপশমমূলক সেবার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, বার্ধক্যজনিত সংকটের মুখোমুখি চীন

হতাশা ও নতুন পথের সন্ধানের এক ব্যক্তিগত গল্প

ঝৌ জিয়াইয়ের বাবার অ্যাড্রিনোকর্টিক্যাল কার্সিনোমা—অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিতে হওয়া বিরল ও আক্রমণাত্মক ক্যানসার—ধরা পড়ার পর ৬৭ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শুধু রোগের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, এমন এক পরিচর্যা-সংকটেরও মুখোমুখি হতে হয়, যা তাঁর পরিবারের সামর্থ্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয়। ঝৌ ছিলেন বাবার প্রধান পরিচর্যাকারী। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঝৌ বুঝতে পারেন, নিজের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাওয়া দায়িত্বে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সাহায্যের খোঁজ তাঁকে নিয়ে যায় সেরেনিটার্ন প্যালিয়েটিভ কেয়ারে। হেবেই প্রদেশের এই বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্রে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা তত্ত্বাবধান ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দেওয়া হয়। তাঁর বাবার পটভূমি ও পরিবারের প্রয়োজন বুঝতেন এমন সমাজকর্মীদের সঙ্গে আগেভাগে কথা বলায় ঝৌ এমন সহায়তা পান, যা একা তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি স্মরণ করেন, “কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, এমন বিষয়গুলোতেও তাঁরা সহায়তা করেছিলেন। সমাজকর্মীদের সমর্থন ছাড়া আমি এটা করতে পারতাম বলে মনে হয় না।”

সূচিপত্র
  1. হতাশা ও নতুন পথের সন্ধানের এক ব্যক্তিগত গল্প
  2. জনমিতিক পরিবর্তনের ব্যাপকতা
  3. উপশমমূলক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র ঘাটতি
  4. সাংস্কৃতিক বাধা ও মৃত্যু নিয়ে নীরবতা
  5. নীতির পরিবর্তন ও পরীক্ষামূলক কর্মসূচি
  6. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়
  7. অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিদেশি বিনিয়োগ
  8. মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের পথে
  9. মূল বিষয়গুলো

ঝৌয়ের অভিজ্ঞতা চীনের লাখো পরিবারের ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার প্রতিফলন। দেশটির স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো জনমিতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, আর পরিবারগুলোকে সামলাতে হচ্ছে বার্ধক্য ও মরণাপন্ন অসুস্থতার জটিলতা। তাঁর বাবার ঘটনা একদিকে পেশাদার উপশমমূলক সেবার জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরে, অন্যদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল দেশে এ ধরনের সেবার অভাবও দেখায়।

বিজ্ঞাপন

জনমিতিক পরিবর্তনের ব্যাপকতা

চীনের জনসংখ্যা এমন গতিতে বয়স্ক হচ্ছে, যা খুব কম দেশই দেখেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সীরা এখন মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ। ২০৩৫ সাল নাগাদ এই হার বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ। আয়ু বাড়ার পাশাপাশি জন্মহার দ্রুত কমে যাওয়ায় এই জনমিতিক পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে টানা তৃতীয় বছরের মতো চীনের জনসংখ্যা কমেছে; ১৩ লাখ ৯০ হাজার কমে দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি ৮০ লাখে। নবজাতকের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের চেয়ে বেশি রয়েছে।

এর প্রভাব শুধু মোট জনসংখ্যার হিসাবেই সীমিত নয়। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় প্রবীণদের অনুপাত নির্দেশক বার্ধক্য-নির্ভরতার হার ২০২৪ সালে ২১ শতাংশের কিছু বেশি ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস, ২০৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে এই হার দ্বিগুণ হবে। এতে সামাজিক কল্যাণের প্রতিটি খাতে আর্থিক চাপ তৈরি হবে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ২০ কোটিরও বেশি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে ৬৫ বছর ও তার বেশি বয়সীর সংখ্যা ২২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে, যা মোট জনসংখ্যার ১৫.৬ শতাংশ।

এই বার্ধক্যের ঢেউয়ের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রোগের বোঝাও বাড়ছে। হৃদ্‌রোগের পাশাপাশি ক্যানসার মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে নতুন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৮ লাখ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। শেষ পর্যায়ের ক্যানসার রোগীদের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ তীব্র ব্যথায় ভোগেন। এতে জটিল পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, যা চীনের বর্তমান চিকিৎসা অবকাঠামো মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

উপশমমূলক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র ঘাটতি

স্পষ্ট ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা থাকা সত্ত্বেও চীনের উপশমমূলক সেবা ব্যবস্থা এখনো অনুন্নত। শিল্পখাতের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব রোগীর উপশমমূলক সেবা প্রয়োজন, তাঁদের ৩ শতাংশেরও কম বাস্তবে তা পান। চিকিৎসাব্যবস্থার এই ঘাটতির পেছনে কয়েক দশক ধরে জমে ওঠা নানা কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। চিকিৎসা উন্নয়নে এত দিন মূলত রোগ সারানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, আর স্বস্তি ও জীবনমান নিশ্চিত করার সেবা থেকেছে তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত।

চীনের মূল ভূখণ্ডে উপশমমূলক সেবা এখনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা-বিশেষত্ব হিসেবে স্বীকৃত নয়। ফলে এ বিষয়ে দেশীয়ভাবে পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণের পথও নেই। বেইজিং হাইদিয়ান হাসপাতালের উপশমমূলক সেবা বিভাগের পরিচালক ছিন ইউয়ান এই পরিবর্তন কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি বলেন, “সময়ের সঙ্গে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, আরও পেশাদার হওয়া এবং রোগীদের সত্যিকারভাবে সহায়তা করার সক্ষমতা বাড়ানো কতটা জরুরি।” তবে আনুষ্ঠানিক বিশেষত্বের স্বীকৃতি না থাকায় এ ক্ষেত্রের অগ্রগতি কঠিন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চিকিৎসাশিক্ষা ব্যবস্থার নানা স্তরে প্রশিক্ষণের ঘাটতি গভীর। ২০১৫ সালে ২০১ জন চিকিৎসককে নিয়ে করা এক জরিপে দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ চিকিৎসক মরফিনের মাত্রা নির্ধারণের নিয়ম পুরোপুরি বোঝেন না। ফলে ওপিওয়েড ব্যথানাশক, যা বিশ্বজুড়ে উপশমমূলক ব্যথা কমাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওষুধ, তার ব্যবহার অত্যন্ত কম। জীবনের শেষ পর্যায়ের পরিচর্যা নিয়ে যোগাযোগের দক্ষতাও একইভাবে অনুন্নত। ঐতিহাসিকভাবে চিকিৎসাশিক্ষায় শারীরিক অসুস্থতা সারানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, মরণাপন্ন অবস্থায় সামগ্রিক পরিচর্যার ওপর নয়।

বিশেষায়িত সেবা দেওয়ার উপযোগী প্রতিষ্ঠানেরও ঘাটতি রয়েছে। চীনের ১০ লাখ নিবন্ধিত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র প্রায় ৩৬ হাজারকে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়ার অনুমতি রয়েছে, আর ১৮ হাজারেরও কম প্রতিষ্ঠানে শিরায় দেওয়ার ব্যথানাশক মজুত থাকে। দেশজুড়ে ৫ হাজারেরও কম প্রতিষ্ঠানে উপশমমূলক সেবার জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বেইজিং সিংহুয়া ছাংগং হাসপাতালে উপশমমূলক সেবা ওয়ার্ডে মাত্র আটটি শয্যা রয়েছে, যা পুরো ব্যবস্থায় সক্ষমতার তীব্র সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।

বিজ্ঞাপন

সাংস্কৃতিক বাধা ও মৃত্যু নিয়ে নীরবতা

অবকাঠামোগত ঘাটতির বাইরেও গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উপশমমূলক সেবার বিস্তারকে জটিল করে তুলেছে। চীনা সমাজে মৃত্যু নিয়ে আলোচনা এখনো অনেকাংশে নিষিদ্ধ বিষয়। এতে হসপিস সেবা নিয়ে মানসিক বাধা তৈরি হয়; অনেক পরিবার এ সেবাকে আশা ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। ঐতিহ্যগত বিশ্বাসে পরিবারের সদস্যদের সব ধরনের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর প্রতিফলন দেখা যায় এই কথায়: “ভালো মৃত্যু পাওয়ার চেয়ে দুর্দশার জীবন কাটানো ভালো।” এই মানসিকতার কারণে মরণাপন্ন রোগীদের প্রায়ই আক্রমণাত্মক চিকিৎসা দেওয়া হয়। জীবন দীর্ঘায়িত করার চেষ্টায় তাঁদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়, যেখানে শরীর নল ও যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত থাকে।

বেইজিং সিংহুয়া ছাংগং হাসপাতালের ব্যথা ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক লু গুইজুন উপশমমূলক সেবায় ২৭ বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব ধারণা বদলাতে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, “জীবন কখন শুরু হবে, তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না; তবে মৃত্যু নিয়ে কীভাবে ভাবব, তা বেছে নিতে পারি।” ২০১৯ সাল থেকে তাঁর ওয়ার্ডে ৩০০ জনের বেশি রোগীর পরিচর্যা হয়েছে। তাঁদের শেষ ইচ্ছা পূরণে সহায়তা করা হয়েছে—ব্যক্তিগত আলোকচিত্র প্রদর্শনী থেকে বিদায়-অনুষ্ঠান, এমনকি পছন্দের পানীয়ের শেষ চুমুক পর্যন্ত। লু জোর দিয়ে বলেন, “জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা মানুষের শুধু ওষুধের চেয়েও বেশি কিছু দরকার। তাঁদের দরকার শান্ত, অকৃত্রিম ও ভালোবাসায় ভরা জীবন।”

মৃত্যু নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার উদ্যোগ অপ্রচলিত নানা মাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে। বেইজিংয়ের মাকা আর্ট সেন্টারে “ব্রিংগিং ডেথ ব্যাক টু লাইফ” শীর্ষক শিল্পপ্রদর্শনীতে হাজারো দর্শক শিল্পস্থাপনা, চিত্রকর্ম ও ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনীর মাধ্যমে জীবনের শেষ পর্যায়ের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে এসেছেন। একটি প্রদর্শনীতে মৃত প্রিয়জনের পোশাক দিয়ে তৈরি “স্মৃতির ভালুক” দেখানো হয়। অন্যটিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ব্যবহৃত ভেন্টিলেটরের শব্দের অনুকরণ করে দেখানো হয়, আধুনিক চিকিৎসা কীভাবে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের মানবিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জিং জুনের মতে, এসব সাংস্কৃতিক উদ্যোগে সমাজে এক ধরনের সচেতনতার সূচনা হয়েছে। তিনি বলেন, “যখন প্রতিটি পরিবারকে প্রবীণদের পরিচর্যা ও জীবনের শেষ পর্যায়ের ব্যবস্থা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়, তখন মর্যাদাপূর্ণ বিদায় বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়। এটি ভালো লক্ষণ নয়। এর মধ্য দিয়ে মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের শিক্ষার অভাব প্রকাশ পায়।”

বিজ্ঞাপন

নীতির পরিবর্তন ও পরীক্ষামূলক কর্মসূচি

হসপিস অবকাঠামো গড়ে তোলার জরুরি প্রয়োজন স্বীকার করে চীনা সরকার গত আট বছরে পদ্ধতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৭ সালে জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন হসপিস সেবা কেন্দ্রের মৌলিক মানদণ্ড, পরিচালনাবিধি ও সেবার নির্দেশিকা নির্ধারণ করে ভিত্তিমূলক নথি প্রকাশ করে। একই বছর বেইজিংয়ের হাইদিয়ান জেলা ও সাংহাইয়ের পুতুও জেলা-সহ পাঁচটি শহরকে জাতীয় পরীক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, যাতে সেবার এমন মডেল তৈরি করা যায় যা সারা দেশে অনুসরণ করা সম্ভব।

এই পরীক্ষামূলক কর্মসূচি দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৩ সাল নাগাদ একাধিক প্রদেশের ১৮৫টি শহর ও জেলায় এ উদ্যোগ চালু হয়। এর আওতায় হাসপাতাল, কমিউনিটি ও বাড়িভিত্তিক পরিচর্যাসহ নানা ধরনের সেবা-মডেল এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বেইজিং পৌর সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিটি জেলায় অন্তত ৫০টি শয্যাসহ একটি করে হসপিস সেবা কেন্দ্র রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পুরো শহরে মোট ১,৮০০ শয্যার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোগীর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোরও পরিবর্তন হচ্ছে। ২০২২ সালে শেনঝেন চীনের প্রথম শহর হিসেবে এমন আইন পাস করে, যার মাধ্যমে মরণাপন্ন রোগীরা জীবন বাঁচানোর নামে অতিরিক্ত চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এতে মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর অধিকার স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি পায়। নিয়ম অনুযায়ী, পুনরুজ্জীবন, জীবনধারণে সহায়ক যন্ত্রপাতি ও জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রধান রোগের চিকিৎসা নিয়ে রোগীর আগাম ইচ্ছাপত্র চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে মানতে হবে। এই আইনগত মাইলফলক ঐতিহ্যগত পরিবারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে রোগীর ব্যক্তিগত অধিকারের দিকে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর্মসূচিও গড়ে উঠেছে। ২০১৭ সালে বেইজিং শিশু হাসপাতালে চালু হওয়া “ডেইজি হোম” শিশু হসপিস উদ্যোগে দেশের প্রথম পরিবারসদৃশ শিশু হসপিস ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। একাধিক প্রদেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ে পরিচালিত এই কর্মসূচি ৯০০ শিশুকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী, সমাজকর্মী, মনোবিজ্ঞানী, সংগীত-থেরাপিস্ট ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গঠিত বহুমাত্রিক দল এসব শিশুকে সহায়তা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়

দেশীয় সক্ষমতা চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাওয়ায় পেশাগত উন্নয়নে গতি আনতে চীন ক্রমেই আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছে। চলতি মাসের শুরুতে বেইজিং হাইদিয়ান হাসপাতালের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের ট্যান টক সেং হাসপাতাল (টিটিএসএইচ) এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান লিয়েন ফাউন্ডেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা শুরু হয়েছে। লিয়েন কোলাবরেটিভ ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ার উদ্যোগের আওতায় অন্তত ১৮টি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের ১,০০০-এর বেশি চীনা স্বাস্থ্যকর্মী তিন বছরে প্রশিক্ষণ পাবেন।

পাঠ্যক্রমে উপসর্গ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসাপদ্ধতি ও যোগাযোগের দক্ষতা রয়েছে। সরাসরি অভিজ্ঞতা বিনিময় ও অনলাইন কর্মশালার মাধ্যমে এসব শেখানো হবে। টিটিএসএইচের উপশমমূলক চিকিৎসা বিভাগের প্রধান নিও হান ই সহযোগিতার ধরন ব্যাখ্যা করে বলেন, “তাঁরা আমাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়কে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে তাঁরা আঞ্চলিক মানদণ্ড এবং সিঙ্গাপুরে আমরা কীভাবে উপশমমূলক সেবা দিই, তা জানতে পারবেন। এরপর তাঁরা নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, আইন, নৈতিকতা ও অর্থায়ন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যা গ্রহণ করতে পারবেন, তা কাজে লাগাবেন।”

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্তর্জাতিক জ্ঞান বিনিময়ের অন্য কর্মসূচিও চালু হয়েছে। বেইজিং অ্যাডভান্স কেয়ার প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন যুক্তরাজ্যের সেন্ট ক্রিস্টোফার’স হসপিসের তৈরি “কোয়ালিটি এন্ড অব লাইফ কেয়ার ফর অল” কর্মসূচি চালু করেছে। দেশজুড়ে এ কর্মসূচি দশবার পরিচালিত হয়েছে। প্রজেক্ট হোপ হুবেই প্রাদেশিক নার্সিং মান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সঙ্গে মিলে ২০১৭ সাল থেকে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে ১৮১ জন প্রশিক্ষক তৈরি করেছে। পরে তাঁরা সহকর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত শিক্ষা কর্মসূচিতে ১৮ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে প্রশিক্ষণ পৌঁছে দিয়েছেন।

দেশের ভেতরেও শিক্ষার উপকরণ বদলাচ্ছে। স্নাতক পর্যায়ের জাতীয় নার্সিং পাঠ্যবইয়ে হসপিস সেবা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হসপিস ও উপশমমূলক সেবায় বিশেষায়িত বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। চীনা নার্সিং অ্যাসোসিয়েশন চার সপ্তাহের পাঠ্যক্রম ও চার সপ্তাহের ক্লিনিক্যাল অনুশীলন নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ১,৪৪৩ জন নার্সকে সনদ দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিদেশি বিনিয়োগ

জনমিতিক পরিবর্তনের গভীর অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবার গণ্ডি ছাড়িয়ে সরকারি অর্থের টেকসই ব্যবস্থাপনাতেও বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান পেনশনবিধি অপরিবর্তিত থাকলে সরকারি পেনশন ব্যয় ২০২৪ সালে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৫০ সালে ১৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। কর্মশক্তি সংকুচিত হওয়ায় বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। অবসরপ্রাপ্তরা সঞ্চিত সম্পদ ব্যবহার করতে থাকায় জাতীয় সঞ্চয়ের হারও কমতে পারে।

চীনের ২০২৪ সালের অবসর বয়স সংস্কারে পুরুষদের অবসর বয়স ধাপে ধাপে ৬৩ বছরে উন্নীত করা হবে এবং নারীদের অবসর বয়সও বাড়ানো হবে। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব, এই সংস্কারে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশ পয়েন্ট বাড়বে এবং ২০৫০ সালে পেনশন ব্যয় জিডিপির ১১.৯ শতাংশে নেমে আসবে। সংস্কার না হলে তা ১৫.৩ শতাংশ হতে পারে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অবসর বয়স আরও বাড়ানো এবং আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুবিধার হিসাব হালনাগাদ করাসহ অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও প্রবীণদের ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের বড় সুযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে চীনে মাথাপিছু স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ছিল প্রায় ২,৫০০ ইউয়ান (৩৬৫ মার্কিন ডলার)। ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতে এ ব্যয় প্রায় ৬,০০০ মার্কিন ডলার। এই ব্যবধান চিকিৎসাসেবা, প্রবীণ পরিচর্যা কেন্দ্র ও বিশেষায়িত সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সুযোগ নির্দেশ করে। চীনা কর্মকর্তারা স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে প্রবীণ পরিচর্যা, পুনর্বাসন ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় বিদেশি বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। জনমিতিক চাহিদার “বিস্ফোরক বৃদ্ধি” সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের স্বীকৃতিও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এথিকসের পরিচালক লিউ বাওছেং সম্ভাবনার ব্যাপকতা তুলে ধরে বলেন, “প্রবীণ নিবাস থেকে সমাধিস্থল পর্যন্ত, এমন বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে যা আরও কাজে লাগানো দরকার।” বার্ষিক দুই অধিবেশনের রাজনৈতিক বৈঠকে প্রতিনিধিরা যখন একত্র হন, তখন টেলিযোগাযোগ ও শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নও নীতিগত অগ্রাধিকারের তালিকায় গুরুত্ব পায়।

বিজ্ঞাপন

মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের পথে

দ্রুত বার্ধক্য, দীর্ঘস্থায়ী রোগের বাড়তি বোঝা ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব চীনকে মৃত্যু ও জীবনের শেষ পর্যায় নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। স্বাস্থ্যকর্মী, নীতিনির্ধারক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা উপশমমূলক সেবাকে রোগীকে পরিত্যাগ করা হিসেবে না দেখে মর্যাদার সঙ্গে বিদায়ের পথে সহমর্মিতাপূর্ণ সহায়তা হিসেবে তুলে ধরতে কাজ করছেন। ফুঝৌ ফার্স্ট হাসপাতালের উপশমমূলক সেবা বিভাগের চিকিৎসক ছেন ইয়ান বলেন, “উপশমমূলক সেবার অর্থ রোগীর ওপর আশা ছেড়ে দেওয়া নয়। এর অর্থ জীবনের দৈর্ঘ্য ও গুণগত মানের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। রোগীকে প্রাধান্য দেওয়া, তাঁর ইচ্ছা বিবেচনা করা এবং প্রয়োজন মেটানোই এর লক্ষ্য।”

চীনে প্রতিবছর ১ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের উপশমমূলক সেবা প্রয়োজন হতে পারে। চাহিদা ও সেবার প্রাপ্যতার ব্যবধান এখনো বিশাল। তবু পরিস্থিতির গতিপথ বদলাচ্ছে। শেনঝেনের আইনগত উদ্যোগ থেকে বেইজিংয়ের শিল্পপ্রদর্শনী, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে প্রশিক্ষণ অংশীদারিত্ব থেকে কমিউনিটিভিত্তিক পরীক্ষামূলক কর্মসূচি—একটি পূর্ণাঙ্গ উপশমমূলক সেবা ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে উঠছে। আগামী দশকে কোটি কোটি বয়স্ক নাগরিকের কাছে এসব উদ্যোগ যথেষ্ট পরিসরে পৌঁছাতে পারবে কি না, তার ওপর শুধু স্বাস্থ্যসেবার ফলাফলই নয়, মানবজাতির উল্লেখযোগ্য অংশের জীবনের শেষ অধ্যায়ের মানও নির্ভর করবে।

মূল বিষয়গুলো

  • চীনের ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সীরা এখন মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ; ২০৩৫ সালের মধ্যে এই হার ৩০ শতাংশে (৪০ কোটিরও বেশি মানুষ) পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে
  • চীনে উপশমমূলক সেবার প্রয়োজন এমন রোগীদের ৩ শতাংশেরও কম বর্তমানে এ সেবা পান; ৫ হাজারেরও কম চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে এ সেবার জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে
  • চীনে উপশমমূলক সেবা এখনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা-বিশেষত্ব হিসেবে স্বীকৃত নয়, ফলে পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সনদের পথেও ঘাটতি রয়েছে
  • মরণাপন্ন রোগীদের জীবন বাঁচানোর নামে অতিরিক্ত চিকিৎসা প্রত্যাখ্যানের অনুমতি দিয়ে ২০২২ সালে শেনঝেন চীনের প্রথম শহর হিসেবে আইন পাস করে
  • সিঙ্গাপুরের ট্যান টক সেং হাসপাতালের সঙ্গে তিন বছরের অংশীদারিত্বসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার লক্ষ্য, উপশমমূলক সেবার চর্চা বিষয়ে ১,০০০-এর বেশি চীনা স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া
  • সংস্কার না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে পেনশন ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে; বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে
  • মৃত্যু ও জীবনের শেষ পর্যায়ের পরিচর্যা নিয়ে সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা ভাঙতে শিল্পপ্রদর্শনী ও মৃত্যু-বিষয়ক শিক্ষা উদ্যোগ গড়ে উঠছে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে