আর্থিক তহবিল পুনরুদ্ধারে একটি মাইলফলক
১৯৯৭-১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময়কার দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক দায় মেটানোর দীর্ঘ যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল করতে বিনিয়োগ করা সরকারি তহবিলের ৭২.৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার প্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক কোরীয় ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সময়ে সংকটাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে ব্যয় করা ১৬৮.৭ ট্রিলিয়ন ওনের (৮৩.৪ বিলিয়ন ডলার) মধ্যে ১২২.১ ট্রিলিয়ন ওন (৮৩.৪ বিলিয়ন ডলার) পুনরুদ্ধার করেছে সিউল।
সূচিপত্র
পুনরুদ্ধারের এই হার আগের বছরের তুলনায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। প্রায় তিন দশক আগে অর্থনীতির সম্পূর্ণ পতন ঠেকাতে নেওয়া বিশাল সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে ক্রমান্বয়ে সরে আসার ক্ষেত্রে এটি ধারাবাহিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে সার্বভৌম ঋণখেলাপির দ্বারপ্রান্ত থেকে এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি কত দূর এগিয়েছে, তার পরিমাপযোগ্য নির্দেশক এই অর্জন। সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিঃশেষ হয়ে আসা এবং একের পর এক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পতনের মুখে ইতিহাসের বৃহত্তম বেইলআউট প্যাকেজের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে যেতে বাধ্য হয়েছিল সিউল।
তহবিল পুনরুদ্ধারের ধারাবাহিক অগ্রগতি ২০১৪ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে ভিন্ন, যখন সরকার বিতরণ করা অর্থের মাত্র ৬৫.২ শতাংশ পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিল। গত এক দশকে আরও ৭.৩ শতাংশ পয়েন্ট পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে সম্পদ বিক্রি, পুনঃমূলধনীকরণ করা ব্যাংকের বেসরকারীকরণ এবং সংকটের সময় কেনা খেলাপি ঋণ আদায়ে অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে। আর্থিক নিয়ন্ত্রকেরা অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, জরুরি সময়ে নেওয়া স্থিতিশীলতামূলক পদক্ষেপগুলো দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ছিল, এই পুনরুদ্ধার তারই প্রমাণ।
১৯৯৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের শেষ পর্যন্ত বিতরণ করা বেইলআউট তহবিল আসন্ন বিপর্যয়ের মুখে থাকা অর্থনীতির জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করেছিল। তখন দক্ষিণ কোরিয়া শুধু তারল্য সংকটেই ছিল না; বরং দ্রুত শিল্পায়নের আগের তিন দশকে গড়ে ওঠা পুরো আর্থিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলা ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার সংকটেও পড়েছিল। বর্তমান পুনরুদ্ধারের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে করদাতাদের অর্থ ব্যবহারের নীতিনির্ধারকদের কঠিন সিদ্ধান্তের যথার্থতা তুলে ধরে। একই সঙ্গে তহবিল আদায়ের চলমান প্রচেষ্টা জাতীয় কোষাগারে অর্থ ফেরত দিচ্ছে।
১৯৯৭ সালের সংকট ও আইএমএফের হস্তক্ষেপ
বর্তমান পুনরুদ্ধারের পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বুঝতে হলে এমন অসাধারণ সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন তৈরি করা সংকটের ভয়াবহতা স্মরণ করতে হবে। ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে শিল্পশক্তিতে রূপান্তরের জন্য ‘হান নদীর তীরের অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে প্রশংসিত দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ভয়াবহ পতনের মুখে পড়ে। ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে থাইল্যান্ডে বাতের অবমূল্যায়নের মধ্য দিয়ে সংকটের সূত্রপাত হয়। তবে সংক্রমণের প্রভাবে তা দ্রুত দক্ষিণ কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং কোরীয় অর্থনৈতিক মডেলের মৌলিক দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে আসে।
বড় বড় চেবোল (শিল্পগোষ্ঠী) একের পর এক দেউলিয়া হতে থাকায় এবং পূর্ব এশিয়াজুড়ে আর্থিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোরীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারান। বিদেশি ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি ঋণসীমা নবায়নে অস্বীকৃতি জানায় এবং পুঁজি প্রত্যাহার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দক্ষিণ কোরিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, আর বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৫৩ বিলিয়ন ডলারে। ডলারের বিপরীতে সংকীর্ণ সীমার মধ্যে রাখা কোরীয় ওনের মান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অর্ধেকে নেমে আসে; বড়দিনের আগের দিন প্রতি ডলারের বিপরীতে ২,০০০ ওনের সীমাও ছাড়িয়ে যায়।
১৯৯৭ সালের ৩ ডিসেম্বর সিউল আইএমএফের সঙ্গে ৫৮ বিলিয়ন ডলারের তিন বছর মেয়াদি স্ট্যান্ড-বাই চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে আইএমএফ থেকে ২১ বিলিয়ন ডলার, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় অবদান থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার আসার কথা ছিল। এই উদ্ধার প্যাকেজ ১৯৯৪ সালের ‘টাকিলা সংকটের’ সময় মেক্সিকোকে দেওয়া ৫০ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বড় ছিল, যা তখন পর্যন্ত আইএমএফের বৃহত্তম হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
বেইলআউটের সঙ্গে ছিল কঠোর শর্ত, যা কোরীয় সমাজের কাঠামো বদলে দেয়। আইএমএফ উচ্চ সুদের হার, সরকারি ব্যয় হ্রাস, বাণিজ্য উদারীকরণ এবং আর্থিক ও করপোরেট খাতের ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারসহ কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করে। শ্রমবাজার সংস্কারের ফলে কোম্পানিগুলোর জন্য কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা সহজ হয়, ভেঙে পড়ে কোরীয় কর্মসংস্কৃতিতে আগে প্রচলিত আজীবন চাকরির নিশ্চয়তা।
জাতীয় অপমান থেকে আগাম মুক্তি
বেইলআউটের পরপরই শুরু হয় এমন এক সময়, যা কোরীয়রা ‘আইএমএফের দিনগুলো’ বলে মনে রাখে—গভীর জাতীয় লজ্জা ও অর্থনৈতিক দুর্দশার সময়। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতি ৬.৭ শতাংশ সংকুচিত হয়, যা কোরীয় যুদ্ধের পর সবচেয়ে খারাপ ফল। বেকারত্বের হার ২.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬.৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৯৯৭ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৯৮ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি কোরীয় চাকরি হারান। কিয়া ও দেউয়ের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী ধসে পড়ে বা ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয়। আর দ্বাদশ বৃহত্তম চেবোল হাল্লা গ্রুপ ৫.৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণের চাপে ভেঙে পড়ে।
তবে সংকট নাগরিকদের মধ্যে অসাধারণ সংহতির প্রকাশও ঘটায়। ১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে দেশজুড়ে স্বর্ণ সংগ্রহ অভিযানে ৩৫ লাখ ১০ হাজার নাগরিক বিয়ের আংটি ও পারিবারিক স্মৃতিচিহ্নসহ ২২৭ মেট্রিক টন স্বর্ণালংকার দান বা বিক্রি করেন, যাতে জাতীয় রিজার্ভ বাড়ানো যায়। এই সম্মিলিত ত্যাগ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ হয় এবং তা জাতীয় পুনরুদ্ধারের প্রতি জনগণের অঙ্গীকারের প্রতীক হয়ে ওঠে। সে সময় একটি এতিমখানার পরিচালক পরিস্থিতির পরিবর্তনে আক্ষেপ করে জানান, দাতব্য অনুদান বন্ধ হয়ে গেছে।
শিশুদের উপহার দিতে কোনো প্রতিষ্ঠানই এগিয়ে আসেনি।
সব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে নির্ধারিত সময়ের আগেই আইএমএফের ঋণ পরিশোধ করে দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ সহায়তা তহবিলের ঋণ শোধ করে। এরপর ২০০১ সালের ২৩ আগস্ট বাকি ৬ বিলিয়ন ডলারের স্ট্যান্ড-বাই ঋণও পরিশোধ করা হয়। দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার ও রপ্তানিনির্ভর পুনরুদ্ধারের ফলে আগাম ঋণ পরিশোধ সম্ভব হয়, এবং নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই আইএমএফ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসে দক্ষিণ কোরিয়া। চূড়ান্ত কিস্তি পরিশোধের অনুষ্ঠানে ব্যাংক অব কোরিয়ার গভর্নর চন চোল-হোয়ান নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, তবে স্বীকার করেন যে দেশটি তখনো গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত দুর্বলতার চ্যালেঞ্জে রয়েছে।
তহবিল পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি
সংকট মোকাবিলায় শুরুতে ব্যবহৃত ১৬৮.৭ ট্রিলিয়ন ওনের সরকারি তহবিলের ছিল একাধিক উদ্দেশ্য। সরকার দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোতে মূলধন জোগায়, খেলাপি ঋণ কেনে এবং বাজারের সম্পূর্ণ বিপর্যয় ঠেকাতে তারল্য সহায়তা দেয়। পুনর্গঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি, লাভে ফেরা পুনঃমূলধনীকরণ করা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ এবং ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে জব্দ করা সম্পদ বিক্রিসহ বিভিন্ন উপায়ে এই অর্থ পুনরুদ্ধার হয়েছে।
বর্তমান ৭২.৫ শতাংশ পুনরুদ্ধারের হারে পৌঁছানোর অগ্রগতি ধীর হলেও ধারাবাহিক। ২০১৪ সালের তথ্যে তখন পুনরুদ্ধারের হার ছিল ৬৫.২ শতাংশ। অর্থাৎ পরবর্তী দশকে সরকার আরও ৭.৩ শতাংশ পয়েন্ট পুনরুদ্ধার করেছে। ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিশন জানিয়েছে, সর্বশেষ প্রতিবেদনকালীন সময়ের শুধু চতুর্থ প্রান্তিকেই সরকার ২.৪ ট্রিলিয়ন ওন পুনরুদ্ধার করেছে, যা সম্পদ নিষ্পত্তিতে অব্যাহত গতির প্রমাণ।
আর্থিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাকি ২৭.৫ শতাংশ পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিছু সম্পদ তারল্যহীন বাজারে আটকে গেছে, আবার দীর্ঘ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় কিছু সম্পদের মূল্য কমে গেছে। ব্যর্থ মার্চেন্ট ব্যাংকের হাতে থাকা স্থাবর সম্পত্তির জামানত এবং পরে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া চেবোলগুলোর ইস্যু করা করপোরেট বন্ড পুরোপুরি নগদায়ন করা কঠিন। তবু বর্তমান প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়, আর্থিক খাত স্থিতিশীল করতে করদাতাদের দেওয়া তহবিল প্রায় পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া। আর্থিক খাতে ব্যাপক বেইলআউট দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে এটি হবে বিরল এক সাফল্য।
কাঠামোগত রূপান্তর ও অর্থনীতি উন্মুক্তকরণ
সংকট ও পরবর্তী আইএমএফ কর্মসূচি দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পুনর্গঠনে বাধ্য করে। থাইল্যান্ডের সংকটের পর সরকার ৫৬টি দেউলিয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে এবং দেশের ভেতরেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়। ঝুঁকিপূর্ণ স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ নেওয়া অলাভজনক মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর্থিক খাতের সংস্কারের ফলে সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা বিলুপ্ত হয়, বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয় এবং সতর্কতামূলক তদারকি জোরদার হয়।
কোরীয় শিল্পায়নের চালিকাশক্তি হলেও বিপজ্জনক মাত্রায় ঋণ জমিয়ে ফেলা চেবোল ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে করপোরেট পুনর্গঠন করা হয়। ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণের চাপে টালমাটাল এক শিল্পগোষ্ঠীর একটি কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থাটিতে ব্যাপক দুর্নীতির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
সমস্যাটা সবাই জানত। কিন্তু ব্যাংকাররা খুব দুর্বল ছিলেন; সরকারি কর্মকর্তাদের সুপারিশে ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতেন। ব্যবসায়ীরা পাল্টা ওই কর্মকর্তাদের সুবিধা দিতেন।
আইএমএফ কর্মসূচিতে হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতা, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঋণের নিশ্চয়তা বিলোপ এবং ঋণ-ইকুইটি অনুপাত কমানোর দাবি জানানো হয়। এসব সংস্কারের ফলে আগে বন্ধ থাকা খাতগুলো বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোকে কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কোরীয় করপোরেশনে অংশীদারত্ব কেনার সুযোগ দেওয়া হয়।
এই পরিবর্তনের ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০.৪ বিলিয়ন ডলার থাকা সংকটপীড়িত অর্থনীতি থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এখন বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে; দেশটির রিজার্ভ ৩৮৪.৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বে নবম বৃহত্তম। ১৯৯৭ সালে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের অনুপাত ছিল ২৮৬.১ শতাংশ, ২০১৭ সালের মধ্যে তা কমে ৩০.৮ শতাংশে নেমে আসে। সংকটের সময় সার্বভৌম ঋণমান বি+ বা বি- থেকে বেড়ে বর্তমানে এএ বা এএ২ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সামাজিক মূল্য ও প্রজন্মগত বিভাজন
সামষ্টিক অর্থনীতিতে সাফল্যের গল্পের আড়ালে ১৯৯৭ সালের সংকট দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছে, যা এখনো কোরীয় সমাজকে প্রভাবিত করছে। আইএমএফের শর্তে বাস্তবায়িত শ্রমবাজার সংস্কারের ফলে ব্যাপকভাবে অনিয়মিত কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এর ফলে দুই স্তরের একটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে: একদিকে নিরাপদ ও ভালো বেতনের স্থায়ী কর্মী, অন্যদিকে কম বেতন ও কম সুযোগ-সুবিধা পাওয়া অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কর্মী।
এই রূপান্তরের ফলে কোরীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষায় ‘সাতটি আশা ছেড়ে দেওয়া প্রজন্ম’-এর জন্ম হয়েছে। এই তরুণেরা প্রেম, বিয়ে, সন্তান, বাড়ির মালিকানা, ব্যক্তিগত স্বপ্ন, স্থিতিশীল মানবিক সম্পর্ক ও আশা—সবই ছেড়ে দিয়েছেন। তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ৯.৯ শতাংশ, যা সামগ্রিক হারের তিন গুণেরও বেশি। বর্তমানে বিশের কোঠায় থাকা ৪ লাখ ১০ হাজার কোরীয় বেকার। প্রথম চাকরিতে গড় কর্মকাল কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক বছরের কিছু বেশি। আর ১৫-২৯ বছর বয়সীদের ৫৮ শতাংশের বেতনভুক্ত কাজ নেই।
সংকটের পর থেকে আয়বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোরিয়া ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, সংকটের সময় সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের আয় ২০ শতাংশের বেশি কমে যায়, আর সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের আয় ১০ শতাংশ বাড়ে। প্রথম বাজেট প্রস্তাবের সময় প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন কোরীয়দের জীবন ওলটপালট করে দেওয়া অন্ধকার দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের ফলে তৈরি কাঠামোগত বৈষম্য মোকাবিলার অঙ্গীকার করেন।
সংকট সব কোরীয়ের জীবন ওলটপালট করে দিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে বদলে যাওয়া আর্থসামাজিক কাঠামো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বুননকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অনেক কোরীয় এখনো এই সময়কে জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক আঘাত বলে মনে করেন। জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন সংকট তাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ৮০ শতাংশের বেশি মনে করেন, কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সমস্যা এখনো সমাধান করা জরুরি। স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মীদের মধ্যে বিভাজন কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে আছে। একের পর এক সরকার ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষুণ্ন না করে অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে।
সংকট ব্যবস্থাপনার শিক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে সমন্বিতভাবে ঋণ নবায়নের ব্যবস্থা, শুরুতে উচ্চ সুদের হার এবং পরে কৌশলগতভাবে তা কমানো—এসব পদক্ষেপ বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে ও বাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সফল হয়। কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করাও, তা যত কষ্টদায়কই হোক, সংকটে আক্রান্ত অন্য দেশগুলোর তুলনায় দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
তবে কোরীয় অর্থনীতিবিদসহ সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, উচ্চ সুদের নীতি করপোরেট দেউলিয়াত্ব ত্বরান্বিত করে সংকট সমাধানের বদলে শুরুতে তা আরও গভীর করেছিল কি না। ব্যাংককেন্দ্রিক পুনর্গঠন কৌশলে প্রথমে বিনিয়োগ ট্রাস্ট কোম্পানিগুলো উপেক্ষিত হয়েছিল। এর ফলে দেউয়ের মতো দুর্বল চেবোলগুলো কম তদারকির এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করপোরেট বন্ড ইস্যু করতে পারে। পরে এসব বন্ডের মেয়াদপূর্তির সময় আরও ঋণসংকট তৈরি হয়।
কোরীয় অভিজ্ঞতা দেখায়, দ্রুত সংকট নিরসনে শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, করপোরেট ও আর্থিক খাতের মৌলিক পুনর্গঠনও জরুরি। ১৯৯৭ সালের দুর্বলতার অভিজ্ঞতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার প্রতিফলন রয়েছে পরবর্তী সময়ে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তোলা এবং চীন ও কানাডাসহ বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তিতে, যেগুলো সম্প্রতি নবায়ন করা হয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- ১৯৯৭-১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেইলআউট দিতে ব্যবহৃত ১৬৮.৭ ট্রিলিয়ন ওনের সরকারি তহবিলের ৭২.৫ শতাংশ (১২২.১ ট্রিলিয়ন ওন বা ৮৩.৪ বিলিয়ন ডলার) পুনরুদ্ধার করেছে দক্ষিণ কোরিয়া।
- ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় পুনরুদ্ধারের হার ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
- ওনের পতন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিঃশেষ হয়ে আসার পর ১৯৯৭ সালের সংকটে দক্ষিণ কোরিয়া ৫৮ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ উদ্ধার প্যাকেজ নিতে বাধ্য হয়। সে সময় এটিই ছিল তহবিলটির ইতিহাসে বৃহত্তম প্যাকেজ।
- নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগে, ২০০১ সালের আগস্টের মধ্যে আইএমএফের সব ঋণ পরিশোধ করে দক্ষিণ কোরিয়া। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এটি ছিল দ্রুততম সংকট পুনরুদ্ধারের অন্যতম ঘটনা।
- বৈদেশিক রিজার্ভ ২০.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৮৪.৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে নাটকীয় উন্নতি হলেও সংকট দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বৈষম্য এবং স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মীদের বিভক্ত করে রাখা দ্বৈত শ্রমবাজার তৈরি করেছে।
- ‘সাতটি আশা ছেড়ে দেওয়া প্রজন্ম’-এর বাস্তবতা সংকটকালীন শ্রম সংস্কারের ফলে চলমান তরুণ বেকারত্ব ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি তুলে ধরে।






