ভারতের নগর খনন বিপ্লবের অন্তরালে
উত্তর ভারতের এক প্রত্যন্ত কারখানায় শত শত ফেলে দেওয়া ব্যাটারি কনভেয়র বেল্ট বেয়ে গড়িয়ে ক্রাশারে ঢুকছে। এগুলো এমন এক বহু-বিলিয়ন ডলারের শিল্পকে জ্বালানি জোগাচ্ছে, যা দেশের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করছে। হরিয়ানা রাজ্যে এক্সিগো রিসাইক্লিংয়ের বিস্তৃত কারখানায় একটি যন্ত্র ই-স্কুটারের ব্যাটারি গুঁড়িয়ে কালো গুঁড়ো তৈরি করে। এরপর উপাদানটি গাঢ় লাল তরলে দ্রবীভূত করা হয়, ছেঁকে নেওয়া হয়, বাষ্পীভূত করা হয় এবং সবশেষে সূক্ষ্ম সাদা গুঁড়োয় রূপান্তরিত হয়। কারখানার বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘সাদা সোনা’। পদার্থটি লিথিয়াম কার্বোনেট—একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, যার জন্য ভারত বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
সূচিপত্র
স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান ও বৈদ্যুতিক গাড়ি—সবকিছু তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায়, কৌশলগত সমাধান হিসেবে নয়াদিল্লি ক্রমেই দেশের নিজস্ব বিপুল ইলেকট্রনিক বর্জ্যের স্তূপের দিকে ঝুঁকছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভারতে প্রায় ১৫ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছে, যদিও বিশেষজ্ঞদের ধারণা প্রকৃত পরিমাণ এর দ্বিগুণও হতে পারে। এই বর্জ্যে মূল্যবান ধাতুর ঘনত্ব প্রায়ই বাণিজ্যিক খনিতে পাওয়া ঘনত্বের চেয়ে বেশি। এক টন কম্পিউটার বর্জ্যে ১৭ টন স্বর্ণ আকরিকের চেয়ে বেশি সোনা থাকে, আর মোবাইল ফোনে প্রচলিত আকরিকের তুলনায় পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি সোনা থাকে। সার্কিট বোর্ডে থাকে প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়াম; এলইডি পর্দায় জার্মেনিয়াম; আর হার্ডডিস্কে থাকে বিরল মৃত্তিকা। শিল্প খাতের হিসাব বলছে, ফেলে দেওয়া ইলেকট্রনিকস থেকে খনিজ পুনরুদ্ধার—অর্থাৎ নগর খনন—বছরে ৬০০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে।
ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন ও কোয়াড জোট
ই-বর্জ্য নিয়ে ভারতের তৎপরতার পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুতর দুর্বলতা। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিশোধনে বর্তমানে চীনের আধিপত্য রয়েছে। ব্যাটারির প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং উপাদান পুনরুদ্ধার সক্ষমতার ৭০ শতাংশ দেশটির নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ২০৪০ সালের মধ্যে লিথিয়াম, কোবাল্ট ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের চাহিদা চার গুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশগুলো সবুজ প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক করছে বলেই এই চাহিদা বাড়বে।
এর জবাবে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোয়াড নিরাপত্তা সংলাপ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কোয়াড গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উদ্যোগ চালু করে। ওয়াশিংটনে কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দশম বৈঠকের পর জোটটি ই-বর্জ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে সুনির্দিষ্ট সহযোগিতার ঘোষণা দেয়। সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত ও বহুমুখী করা এবং অল্প কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানো এই উদ্যোগের লক্ষ্য। সরবরাহ শৃঙ্খলের সহনশীলতা বাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করবে এই অংশীদারত্ব।
এই জোটে ভারতের অংশগ্রহণের পাশাপাশি রয়েছে দেশের নিজস্ব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মিশন, যা ২০২৩ সালে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের বরাদ্দ নিয়ে চালু হয়। এই মিশনের লক্ষ্য বিদেশে চুক্তি করা, দেশে নতুন খনি চালু করা এবং আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার বাড়ানো। এর আওতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার গত বছর ১,৫০০ কোটি রুপির একটি প্রণোদনা প্রকল্প অনুমোদন করে। ই-বর্জ্য, ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং বাতিল যানবাহনের ক্যাটালিটিক কনভার্টারসহ দ্বিতীয় উৎস থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার বাড়ানোই এই প্রকল্পের বিশেষ লক্ষ্য।
আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিভাজন
নীতিগত উদ্যোগ জোরদার হলেও ভারতের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো নিয়ন্ত্রিত কারখানা ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মশালায় স্পষ্টভাবে বিভক্ত। দিল্লিভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা টক্সিকস লিংকের হিসাব অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক বর্জ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সংগ্রহ ও প্রাথমিকভাবে খুলে ফেলার কাজ এখনো অনানুষ্ঠানিক কর্মশালায় হয়। সেখানে শ্রমিকেরা প্রায়ই কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই দৈনিক গড়ে প্রায় ৩০০ রুপি মজুরিতে কাজ করেন। ভারতের অন্যতম বৃহত্তম অনানুষ্ঠানিক ই-বর্জ্য কেন্দ্র থাকা দিল্লির দরিদ্র এলাকা সিলামপুরে সরু গলিগুলো জট পাকানো তার ও ভাঙা যন্ত্রে ভরে থাকে। উত্তর ভারতের বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করেন সেখানে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাব্বির খান অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে উপকরণের অব্যাহত প্রবাহের কথা বলেন।
নতুন কোম্পানিগুলো সনদপত্র পাওয়ার জন্য যতটুকু দরকার, শুধু ততটুকুই রেখে দেয়; বাকিটা এখনো আমাদের কাছে আসে। ব্যবসা কমেনি, বরং বেড়েছে।
তার পর্যবেক্ষণ জটিল এক বাস্তবতার প্রতিফলন: শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছানো উপাদানেরও অনেকটাই প্রথমে অনানুষ্ঠানিক খাতের হাত ঘুরে আসে। ফলে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর্যায়েই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হারিয়ে যায়। সাসটেইনেবল ইলেকট্রনিকস রিসাইক্লিং ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সন্দীপ চ্যাটার্জি বলেন, ভারতের অনানুষ্ঠানিক খাত এখনো বর্জ্য সংগ্রহের মেরুদণ্ড। তবে অনুসরণযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে একীভূত করা গেলে খনিজের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। শ্রমিকেরা খোলা জায়গায় পোড়ানো, অ্যাসিডের দ্রবণে ডোবানো এবং সুরক্ষা ছাড়া যন্ত্রাংশ খুলে ফেলার কাজ করেন। এতে তারা সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও ডাইঅক্সিনসহ বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসেন, পাশাপাশি মাটি ও পানিদূষণ ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহারে সাধারণত মূল্যবান ধাতুর মাত্র ২০ থেকে ৪০ শতাংশ উদ্ধার করা যায়। আর যন্ত্রাংশের ক্ষতি ও রাসায়নিক দূষণের কারণে বিরল মৃত্তিকার চুম্বক ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের উপাদান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
ভারতের একমাত্র অনুমোদিত অলাভজনক ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারকারী সংস্থা ইকোওয়ার্ক প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কর্মস্থলের মাধ্যমে এই ব্যবধান ঘোচানোর চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ব্যবস্থাপক দেবেশ তিওয়ারি তাদের প্রশিক্ষণপদ্ধতির কথা বলেন।
অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য আমাদের প্রশিক্ষণে যন্ত্রাংশ খোলা থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াই অন্তর্ভুক্ত। আমরা তাদের ঝুঁকি, মূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং সঠিক পদ্ধতিতে কাজ করলে কীভাবে উপাদানের মূল্য ধরে রাখা যায়, সে সম্পর্কে জানাই।
এই কারখানায় ২০ বছর বয়সী রিজওয়ান সাইফির মতো শ্রমিকেরা এখন হার্ডড্রাইভ থেকে স্থায়ী চুম্বক বের করেন। আগে এসব ফেলে দেওয়া হতো, কারণ স্ক্র্যাপের বাজারে শুধু তামা ও অ্যালুমিনিয়ামকেই মূল্যবান মনে করা হতো। এসব চুম্বকে রয়েছে ডিসপ্রোসিয়াম, যা আধুনিক ইলেকট্রনিকসের জন্য অপরিহার্য একটি বিরল মৃত্তিকা ধাতু।
পুনর্ব্যবহার বাধ্যবাধকতা নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জ
ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার ভারতের উদ্যোগে বড় ইলেকট্রনিকস নির্মাতাদের উল্লেখযোগ্য আইনি বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে। স্যামসাং, এলজি, ডাইকিন, ক্যারিয়ার, হিটাচি ও হ্যাভেলস ভারত সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা বিধিতে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে তাদের ৮০ শতাংশ ইলেকট্রনিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং অনুমোদিত পুনর্ব্যবহারকারীদের প্রতি কিলোগ্রামে ন্যূনতম ২২ রুপি নির্ধারিত মূল্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কোম্পানিগুলোর দাবি, এই মূল্য খামখেয়ালি ও প্রতিযোগিতাবিরোধী; আগের হারের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। বড় শহরের বাইরে লাইসেন্সধারী পুনর্ব্যবহারকারীর সংখ্যা সীমিত হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রাও অবাস্তব বলে তাদের যুক্তি। আগে নির্মাতারা অন্য কোম্পানির সঙ্গে ইপিআর সনদ লেনদেন করে বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারত, ফলে বাজারে নমনীয়তা ছিল। নতুন বিধিতে এই নমনীয়তা তুলে নেওয়ায় কোম্পানিগুলোর আশঙ্কা, নিয়ম মানার খরচ তাদের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। মামলাটি একত্র করে একটি মামলা হিসেবে শুনানির জন্য রাখা হয়েছে; পরবর্তী শুনানির অপেক্ষা চলছে।
আদালতের রায় ভারতের ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে খনিজ আহরণের কৌশলে বড় প্রভাব ফেলবে। সরকারের বক্তব্য, ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের ফলে পুনর্ব্যবহারকারীরা ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবেন, নিয়ম মেনে চলা কারখানার সংখ্যা বাড়বে এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মশালার ওপর নির্ভরতা কমবে। তবে টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথ রূপান্তরব্যবস্থা ছাড়া আনুষ্ঠানিকীকরণে লাখ লাখ অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক বাদ পড়তে পারেন। এতে সামাজিক ন্যায্যতা এবং বর্তমানে দেশের অধিকাংশ বর্জ্য সামলানো কার্যকর সংগ্রহ নেটওয়ার্ক—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
উন্নত পুনরুদ্ধার প্রযুক্তি ও অনুসরণযোগ্যতা ব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ করা চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় ভারতের আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার সক্ষমতা এখনো সীমিত। লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো ধাতুসমৃদ্ধ ‘ব্ল্যাক মাস’ নামের গুঁড়োর বড় অংশ বর্তমানে বিদেশে রপ্তানি হয়, কারণ দেশে তা প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। ভারতে এখন অল্প কয়েকটি কোম্পানিই ব্যাটারির স্ক্র্যাপকে পরিশোধিত ধাতুতে রূপান্তর করতে সক্ষম, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা পরিচালনা করে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে ভারত উপলভ্য ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের কাঁচামালের মাত্র ১০ শতাংশ সংগ্রহ করতে পারবে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এই হার ৩০ শতাংশ। চীন সম্প্রতি চায়না রিসোর্সেস রিসাইক্লিং গ্রুপ লিমিটেড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। জীবনকাল শেষ হওয়া ব্যাটারি ও ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দেশটির প্রভাবশালী অবস্থান আরও সুসংহত করবে। বিশ্বজুড়ে পুনর্ব্যবহার সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে চীন। ২০২৩ সালে নতুন প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উপাদান পুনরুদ্ধার সক্ষমতার ৮০ শতাংশই ছিল দেশটির।
এই ঘাটতি পূরণে খনি মন্ত্রণালয় আইআইটি ও সিএসআইআর গবেষণাগারসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান ধাতু পুনরুদ্ধার ও পরিশোধনের জন্য দেশীয় জলধাতুবিদ্যাভিত্তিক প্রক্রিয়া তৈরি করেছে। তারা খনিজ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। ২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির স্ক্র্যাপের ওপর শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে এ ধরনের উপকরণ আমদানি সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে পুনর্ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে, একই সঙ্গে দেশের সক্ষমতাও বিস্তৃত হবে।
বাজেটের দাবি ও কৌশলগত লক্ষ্য
২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে শিল্প সংগঠনগুলো লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক প্রণোদনা দাবি করছে। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ‘ইন্ডিয়া ক্রিটিক্যাল মিনারেলস টেইলিংস রিকভারি প্রোগ্রাম’ নামে একটি বিশেষ কর্মসূচি চালুর সুপারিশ করেছে। খনির বর্জ্য থেকে খনিজ পুনরুদ্ধারকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এই কর্মসূচিতে দুই ধরনের অর্থায়ন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে: চালু খনিতে দ্রুত পরীক্ষামূলক প্রকল্প এবং জলধাতুবিদ্যা ও উন্নত পৃথকীকরণ প্রযুক্তির প্রদর্শনী প্রকল্প।
পুনর্ব্যবহারকারীরা বিশেষভাবে ব্যাটারির স্ক্র্যাপ ও খনিজসমৃদ্ধ বর্জ্যের ওপর জিএসটি বর্তমান হার থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, দেশে উৎপাদন সক্ষমতার অব্যবহার ঠেকাতে নিকেল ও কোবাল্ট সালফেটের মতো মধ্যবর্তী পণ্যে মৌলিক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন। অন্তত ২২টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা অ্যাটেরো রিসাইক্লিংয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী নিতিন গুপ্ত কৌশলগত গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
আজ পুনর্ব্যবহার শুধু টেকসই উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি উপকরণের নিরাপত্তারও বিষয়।
এর গুরুত্ব অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭০-এর দশকের তেলের সংকট ভারতকে শিখিয়েছিল যে পরিমাপ ছাড়া ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা তৈরি করে। আজ তেলের মতোই কাঠামোগত গুরুত্ব খনিজের, তবে তা আরও বেশি খাতে বিস্তৃত এবং এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। ২০৩০ সালের মধ্যে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ৫০ লাখ টনে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। ভারতের স্ক্র্যাপকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরের সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে, দেশটি তার ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বৃহত্তর পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের ভিত্তি নিশ্চিত করতে পারবে কি না—আর তা করতে গিয়ে লাখ লাখ অনানুষ্ঠানিক শ্রমিককে পেছনে ফেলে যাবে কি না।
মূল বিষয়গুলো
- ভারতে বছরে ১৫ লাখ থেকে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়। নগর খননের মাধ্যমে লিথিয়াম, কোবাল্ট, বিরল মৃত্তিকা ও মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করে ৬০০ কোটি ডলার পর্যন্ত মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে
- চীনা সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা কমাতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া কোয়াড গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উদ্যোগে ই-বর্জ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধারে সহযোগিতাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে
- স্যামসাং ও এলজিসহ বড় ইলেকট্রনিকস নির্মাতারা ৮০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এবং প্রতি কিলোগ্রামে নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্য নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে
- ই-বর্জ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সংগ্রহ ও খুলে ফেলার কাজ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে হয়। সেখানে শ্রমিকেরা কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম বা নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই দৈনিক প্রায় ৩.৩৮ ডলার আয় করেন
- আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার বাড়াতে ভারত ১,৫০০ কোটি রুপির প্রণোদনা প্রকল্প অনুমোদন করেছে। বড় পুনর্ব্যবহারকারীদের জন্য অনুদানের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ কোটি রুপি এবং ছোট কার্যক্রমের জন্য ২৫ কোটি রুপি
- আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস বলছে, ২০৪০ সালের মধ্যে ভারতে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের আওতায় আসবে মাত্র ১০ শতাংশ, যা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম
- ২০২৬ সালের বাজেট নিয়ে শিল্প খাতের দাবির মধ্যে রয়েছে ব্যাটারির স্ক্র্যাপের ওপর জিএসটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করা এবং খনির বর্জ্য থেকে খনিজ উদ্ধারে একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করা






