দোরগোড়ায় তাজা কৃষিপণ্য: আড়ালে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন
বেইজিংয়ে স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে গ্রামীণ খামার থেকে আপেল বা ভ্যাকুয়াম-সিল করা ভুট্টা অর্ডার করলে তা পৌঁছাতে মাত্র কয়েক দিন লাগে। ফলের স্বাদ হয় যেমন হওয়ার কথা, তেমনই—মচমচে ও স্বাভাবিক; শহরের সুপারমার্কেটে পাওয়া কৃত্রিম জাতের মতো নয়। এই সুবিধার পেছনে উন্নত সরবরাহব্যবস্থার চেয়ে অনেক বড় পরিবর্তন রয়েছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির খাদ্য জোগানোর ব্যবস্থায় মৌলিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত, যার পেছনে ভোক্তার পছন্দের চেয়ে বাণিজ্যযুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ বেশি কাজ করেছে।
সূচিপত্র
- দোরগোড়ায় তাজা কৃষিপণ্য: আড়ালে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন
- অতীতের দুর্ভিক্ষের স্মৃতি আজকের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে
- পরিকল্পনা থেকে খামার: ২০৩৫ সালের মহাপরিকল্পনা
- স্বনির্ভরতার বীজ: জৈবপ্রযুক্তির বিপ্লব
- সয়াবিনের সংকট: পশুখাদ্যে সংস্কার কি কাজে আসবে?
- মরুভূমিকে শস্যভাণ্ডারে রূপান্তর
- বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতি: অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে মার্কিন কৃষকেরা
- যা জানা জরুরি
বিশ্বের আবাদযোগ্য জমির মাত্র ১০ শতাংশ চীনের হাতে, অথচ দেশটিকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে হয়। কয়েক দশক ধরে এই কৃষিব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশের জোগান দিয়েছেন মার্কিন কৃষকেরা। এর মধ্যে ছিল সয়াবিন, যা দিয়ে চীনের বিপুল শূকরের মাংসের চাহিদা মেটাতে শূকর মোটা-তাজা করা হয়। সেই দিন ফুরিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৃষি-নির্ভরতা ছিন্ন করতে বেইজিং পরিকল্পিত অভিযান শুরু করেছে। ড্রোন, জিন সম্পাদিত বীজ ও বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প কাজে লাগিয়ে কর্মকর্তাদের ভাষায় জাতীয় নিরাপত্তার ‘ভিত্তিপ্রস্তর’—সম্পূর্ণ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা—অর্জনের চেষ্টা চলছে।
এই রূপান্তরের প্রভাব পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে। চীনা গবেষকেরা এখন বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ ভুট্টা ফলাচ্ছেন, যা পশুখাদ্যে আমদানি করা সয়াবিনের বিকল্প হিসেবে বিশেষভাবে তৈরি। জেডি ডটকম ও পিনদুওদুওর মতো ই-কমার্স জায়ান্ট প্রত্যন্ত পাহাড়ি খামারের সঙ্গে শহরের খাবার টেবিলের ডিজিটাল সংযোগ তৈরি করেছে। ইনার মঙ্গোলিয়ায় প্রকৌশলীরা পুনরুদ্ধার করা মরুভূমির জমিতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল ফলাচ্ছেন। বিচ্ছিন্ন এসব উদ্ভাবন মিলে একটি সুসংহত জাতীয় কৌশলের রূপ নিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে ২০২২ সালের প্রায় ৩ কোটি মেট্রিক টন থেকে ২০২৫ সালে ভুট্টা আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে।
এই উদ্যোগের বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহে গভীর প্রভাব রয়েছে। চীনের সয়াবিনের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে ব্রাজিল ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলেছে। বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি দখল করেছে দেশটি, আর মার্কিন কৃষকেরা দেখছেন তাদের সাবেক ক্রেতা সরে যাচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে মার্কিন ফসলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কাটানোর লক্ষ্য নিয়েছে বেইজিং। এতে আইওয়া থেকে ইলিনয় পর্যন্ত কৃষি উৎপাদকদের স্থায়ীভাবে বাজার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের দুই বৃহত্তম পরাশক্তির অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা মাটির গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
অতীতের দুর্ভিক্ষের স্মৃতি আজকের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে চীনের এই তীব্র উদ্বেগের উৎস দেশটির বেদনাদায়ক ইতিহাস। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে মাও সেতুংয়ের ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’ কর্মসূচিতে কৃষিশ্রমিকদের উঠোনে ইস্পাত তৈরির কাজে লাগিয়ে দ্রুত শিল্পায়নের চেষ্টা হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা ফসলের উৎপাদনের পরিসংখ্যান বাড়িয়ে দেখান, অথচ বাস্তবে ফসল পচে নষ্ট হচ্ছিল। এর ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ মারা যায়, যা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং খাদ্যনিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের শীর্ষে তুলেছেন। তিনি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেছেন, চীনের মানুষের ভাতের থালা ভরতে ব্যর্থ হলে কমিউনিস্ট পার্টির বৈধতা হুমকির মুখে পড়বে। ২০১৩ সালের কেন্দ্রীয় গ্রামীণ কর্ম সম্মেলনে তিনি ইতিহাসের আত্মতুষ্টি নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দেন।
শস্য উৎপাদনে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক যে অগ্রগতি আমরা অর্জন করেছি, তা যেন আমাদের মিথ্যা নিরাপত্তাবোধে আচ্ছন্ন না করে। আগের দুর্ভিক্ষের কষ্ট থেকে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি বলে সেই দুর্ভোগের কথা ভুলে যাওয়া চলবে না।
রাষ্ট্রীয় পরিষদ এই জরুরি বিষয়কে আইনে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বেইজিংয়ের বছরের প্রথম নীতিবিবৃতি ২০২৫ সালের ১ নম্বর কেন্দ্রীয় নথিতে ছয়টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শস্য সরবরাহের স্থিতিশীলতা ও গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন। ২০২৩ সালে পেশ করা নতুন খাদ্যনিরাপত্তা আইনে কৃষিজমি, মজুত ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত সুরক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই আইনে কৃষিতে স্বনির্ভরতাকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টিকে থাকার বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
পরিকল্পনা থেকে খামার: ২০৩৫ সালের মহাপরিকল্পনা
বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। সম্প্রতি ঘোষিত ১০ বছর মেয়াদি উদ্যোগে ২০৩৫ সালের মধ্যে কৃষিতে পরাশক্তি হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আর অন্তর্বর্তী লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০২৭ সালের জন্য। পরিকল্পনায় দুই বছরের মধ্যে বছরে ৭০ কোটি মেট্রিক টন শস্য উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি বীজ প্রযুক্তি ও কৃষিযন্ত্রে অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে।
নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষার চিত্র স্পষ্ট। শস্য চাষের জন্য ১৭৫ কোটি মু (প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ হেক্টর) কৃষিজমি ধরে রাখতে চায় চীন। ২০২৪ সালে দেশটি রেকর্ড ৭০ কোটি ৬৫ লাখ মেট্রিক টন শস্য উৎপাদন করেছে, তবে পরিকল্পনাকারীরা ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৫ কোটি মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছেন। এ জন্য নীতিনির্ধারকেরা নির্দিষ্ট ফসলের জন্য বিশেষ এলাকা নির্ধারণ করেছেন: ইয়াংজি নদী অর্থনৈতিক অঞ্চলে বছরে দুই মৌসুমের ধান, উত্তরের সমভূমিতে উচ্চমানের গম এবং বিশেষায়িত তৈলবীজ অঞ্চল।
কেন্দ্রীয় গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তরের পরিচালক হান ওয়েনশিউ সম্প্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অবিরাম সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
শস্য উৎপাদন জোরদার করতে হবে, শিথিল করা চলবে না। দামের সাময়িক ওঠানামা যেন খাদ্যনিরাপত্তা এখনো নাজুক—এই সত্য থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে না দেয়।
কৃষকদের মনোবল ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় সরকার একটি নীতিগত সহায়তা প্যাকেজ চালুর পরিকল্পনা করছে। এতে ধান ও গমের ন্যূনতম ক্রয়মূল্য থাকবে। বিভিন্ন প্রদেশে বাজারদর সহায়তায় ফসল কেনার পাশাপাশি শস্য সংরক্ষণাগার বাড়ানো হবে। সম্প্রতি কৃষকদের আয় বাড়াতে কর্মকর্তারা সরাসরি ১০০০ কোটি ইউয়ান (১৩৮ কোটি ডলার) ভর্তুকি বরাদ্দ করেছেন।
স্বনির্ভরতার বীজ: জৈবপ্রযুক্তির বিপ্লব
প্রযুক্তিই এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক পথ। শেনঝেনের প্রযুক্তি করিডরে কিছাইহংয়ের মতো কোম্পানি দূরবর্তী ইউনান প্রদেশে ভুট্টা উৎপাদন উন্নত করতে ডিপসিকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান শিজিং অ্যাগ্রিকালচার টেকনোলজি ছোট পাহাড়ি খামারে এমন সেন্সর বসাচ্ছে, যা মানসম্মত উৎপাদন সমন্বয় করে। ফলে কৃষকেরা অস্থির বাজারে একা দরকষাকষির বদলে নিশ্চিত দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন।
এসব ডিজিটাল উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এখন ৫০ কোটি গ্রামীণ বাসিন্দাকে শহরের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে। ড্রোন নির্মাতা ডিজেআই কৃষিতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য পুরো একটি বিভাগ গড়ে তুলেছে। বেইজিং ও সাংহাইয়ের মধ্যে দ্রুতগতির ট্রেনে যাত্রার সময় যাত্রীরা ধাপ-ধাপ পাহাড়ি জমিতে স্বয়ংক্রিয় ড্রোনকে ফসলে কীটনাশক ছিটাতে দেখতে পারেন। ২০১৫ সালে চালু হওয়া জাতীয় কৃষিপ্রযুক্তি ও শিক্ষা ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে কৃষকেরা ক্ষতিকর পোকামাকড়ের ছবি তুলে সঙ্গে সঙ্গেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি কীটনাশকের পরামর্শ পেতে পারেন।
জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতি আরও গভীর পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। চীনা গবেষকেরা জিন সম্পাদিত বীজ বাণিজ্যিকভাবে বাজারে এনেছেন, যা ভুট্টার ফলন ১০ শতাংশ বাড়ায়। চীনা বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির বিজ্ঞানীরা উচ্চ তেলসমৃদ্ধ সয়াবিনের প্রজনন কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছেন, যা মার্কিন খামারের সঙ্গে ফলনের ব্যবধান কমাতে পারে। ২০২১ সালে দেশটির সরকারি খাত কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে প্রায় ৬৬০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বিনিয়োগের দ্বিগুণ।
রাষ্ট্রায়ত্ত কেমচায়না অধিগ্রহণ করা কৃষিপ্রযুক্তি জায়ান্ট সিনজেনটা গ্রুপ এই কৌশলের প্রতীক। সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডে হলেও কোম্পানিটি ২০২৪ সালের শেষ দিকে ১১১টি নতুন বীজের জাতের অনুমোদন পেয়েছে এবং আরও গবেষণার অর্থায়নে এখন হংকংয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনার উদ্যোগ নিচ্ছে। বেইজিংকে বৈশ্বিক মেধাস্বত্ব ও বিতরণ নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় বীজ উন্নয়নেও কাজ করছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ ও নিজস্ব উদ্ভাবনের এই সমন্বয়ের লক্ষ্য পশ্চিমা জিনগত সম্পদের ওপর নির্ভরতা দূর করা।
সয়াবিনের সংকট: পশুখাদ্যে সংস্কার কি কাজে আসবে?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো সয়াবিন। চীন বছরে প্রায় ১০ কোটি মেট্রিক টন সয়াবিন আমদানি করে, যার বেশির ভাগই বিশাল শূকরশিল্পের পশুখাদ্যের জন্য। ২০৩০ সালের মধ্যে পশুখাদ্যে সয়ামিলের ব্যবহার ১৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামাতে চায় বেইজিং। এ জন্য কম প্রোটিনযুক্ত, অ্যামিনো অ্যাসিডের ভারসাম্য রাখা খাবারের সঙ্গে কৃত্রিম লাইসিন ও মেথিওনিন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাধীন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই লক্ষ্য এখনো অনেক দূরে। সরকারি পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালে পশুখাদ্যে সয়ামিলের ব্যবহার ১৩ শতাংশের নিচে নেমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ও তৃতীয় পক্ষের সরবরাহকারীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত হার প্রায় ১৬ শতাংশ, আর বছরভেদে এতে বড় ওঠানামা রয়েছে। সয়াবিন আমদানি এখনো ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে, যা ইঙ্গিত করে বিকল্প ব্যবহারের উদ্যোগ মোট চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেনি।
প্রযুক্তিগত সাফল্য যা-ই হোক, বাণিজ্যপ্রবাহে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। এখন চীনের সয়াবিন আমদানির ৭০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় ব্রাজিল, আর মার্কিন অংশ কমে প্রায় ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কযুদ্ধের সময় এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয় এবং পরবর্তী উত্তেজনার মধ্যেও তা অব্যাহত থাকে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়লে চীনা শুল্ক কর্মকর্তারা সহজেই বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পান, যা উৎস বৈচিত্র্যময় করার কৌশলকে স্পষ্ট করে।
অর্থনৈতিক হিসাব এই পরিবর্তনের পক্ষে। বিপুল জমি, অনুকূল বিনিময় হার এবং চীনা বিনিয়োগে আংশিক অর্থায়ন করা রেলপথ ও বন্দরের অবকাঠামো থাকায় ব্রাজিলে উৎপাদন খরচ কম। বেইজিং ব্রাসিলিয়ার সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তিও করেছে, যার ফলে ডলারভিত্তিক লেনদেন এড়িয়ে মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আর্থিক নির্ভরতা কমানো যায়। এসব ব্যবস্থায় ব্রাজিলের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখার কাঠামোগত প্রণোদনা তৈরি হয়েছে, আর মার্কিন কৃষকদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
মরুভূমিকে শস্যভাণ্ডারে রূপান্তর
জমির সীমাবদ্ধতা সৃজনশীল সমাধানের তাগিদ দিচ্ছে। ১৯৭৮ সালে শুরু হয়ে ২০৫০ সাল পর্যন্ত চলার কথা থাকা ‘থ্রি নর্থ শেল্টারবেল্ট’ কর্মসূচি ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ পরিবেশ পুনরুদ্ধার উদ্যোগ। উত্তর চীনের ১৩টি প্রদেশজুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যোগের লক্ষ্য ৪০ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে থাকা মরুভূমিকে স্থিতিশীল করা।
ইনার মঙ্গোলিয়ার কুবুচি মরুভূমিতে প্রযুক্তিবিদেরা এখন সৌরশক্তিচালিত গ্রিনহাউসে কলা, পেঁপে ও ড্রাগন ফল ফলাচ্ছেন; যেখানে একসময় তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে নেমে যেত। এঙ্গেবেই পরিবেশগত প্রদর্শনী অঞ্চল থেকে হংকং ও শেনঝেনে কৃষিপণ্য পাঠানো হয়। এভাবে অনাবাদি জমি উৎপাদনশীল কৃষিজমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কর্মীরা হাতে খড়ের বেড়া বসিয়ে বালিয়াড়ি স্থিতিশীল করেন, তারপর খরা-সহনশীল ঝোপঝাড় রোপণ করেন। কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এখন এসব গাছের বেঁচে থাকার হার ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই উদ্যোগগুলো একটি গুরুতর দুর্বলতা মোকাবিলা করছে। ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে চীন তার ৫ শতাংশের বেশি আবাদযোগ্য জমি হারিয়েছে। কৃষিকাজের জন্য অন্তত ১২ কোটি হেক্টর জমি সংরক্ষণে বেইজিং একটি ‘রেড লাইন’ নির্ধারণ করেছে। এ জন্য কৃষিজমি পুনরুদ্ধার এবং ফসল পর্যায়ক্রমে চাষের কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কর্তৃপক্ষ শিল্পাঞ্চলকে আবার চাষের জমিতে ফিরিয়ে দিয়ে ১ লাখ ৭০ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পুনরুদ্ধার করেছে, যদিও মাটির গুণমান ফেরাতে প্রায়ই কয়েক বছর লাগে।
দক্ষিণ-উত্তর পানি স্থানান্তর প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে পানিসম্পদ ও কৃষিজমির ভৌগোলিক অসামঞ্জস্য দূর করার চেষ্টা চলছে। কিছু কৃষি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে নেমে যাচ্ছে, আবার অন্যগুলোতে মৌসুমি বন্যা দেখা দিচ্ছে। বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে অববাহিকাজুড়ে পানিসম্পদ পুনর্বণ্টন করা হচ্ছে, যদিও পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রদেশগুলোর মধ্যকার বিরোধ বাস্তবায়ন জটিল করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে এই চাপ আরও বাড়ছে; বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী শস্য উৎপাদন অঞ্চল হুমকিতে পড়ছে।
বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতি: অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে মার্কিন কৃষকেরা
কৃষিতে এই বিচ্ছিন্নতার ক্ষতি দুই পক্ষের জন্য সমান নয়। মার্কিন উৎপাদকেরা তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বড় ক্রেতাকে হারিয়েছেন। গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিতে চীনের অংশ কমে প্রায় ৭.৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০০১ সালে চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর দুই দশকে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, তা মুছে গেছে। মিসৌরির কৃষকেরা এখন চীনা মালিকানাধীন গোষ্ঠী ডব্লিউএইচ গ্রুপের মুখোমুখি। গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শূকরের মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান স্মিথফিল্ড ফুডস নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে ব্রাজিলের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে রপ্তানি বাজার হারাচ্ছেন মার্কিন কৃষকেরা।
এখন দুই পক্ষের কৃষিনীতি জুড়েই জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। হোয়াইটম্যান বিমানঘাঁটির মতো সামরিক স্থাপনার কাছে চীনা জমি কেনার ওপর ওয়াশিংটন বিধিনিষেধ আরোপ করছে, আর বেইজিং ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় মার্কিন খাদ্য রপ্তানিকে সম্ভাব্য চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে দেখে। চীনা কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেই বলছেন, শস্যের মজুত ও বৈচিত্র্যময় সরবরাহকারী থাকলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্যের আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হলেও দেশের অভ্যন্তরে খাদ্যঘাটতি হবে না।
শুল্ক এড়াতে কিছু মার্কিন উৎপাদক যন্ত্রাংশের উৎপাদন দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কৃষিপণ্য স্থানান্তর করা যায় না। ভুট্টা ও সয়াবিন যেখানে জলবায়ু ও মাটি অনুকূল, সেখানেই জন্মায়। চীন ২০৩৫ সালের স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যের দিকে এগোতে থাকায় মার্কিন মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে উৎপাদন কাঠামোগতভাবে চাহিদার চেয়ে বেশি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি উৎপাদন একসময় জৈবজ্বালানি কর্মসূচি বা বিকল্প রপ্তানি বাজারে যেতে পারে। তবে চীনা বাজার যখন তুঙ্গে ছিল, তখনকার বাজারের আকার বা দর-কষাকষির ক্ষমতা—কোনোটিই এসব বিকল্প দিতে পারবে না।
এই বিচ্ছিন্নতা শুল্ক ছাড়িয়ে প্রযুক্তিগত বিভাজনেও বিস্তৃত হচ্ছে। বেইজিং কৃষিপণ্যের তথ্য প্ল্যাটফর্ম ও বীজপ্রযুক্তিতে বিদেশি মালিকানায় বিধিনিষেধ আরোপ করছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন মার্কিন কৃষিজমি ও কৃষিব্যবসা চীনের অধিগ্রহণের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। দুই দেশই খাদ্য উৎপাদনকে সহযোগিতামূলক বিনিময়ের বদলে এক পক্ষ জিতলে অন্য পক্ষের হার—এমন কৌশলগত প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে।
যা জানা জরুরি
- জৈবপ্রযুক্তি ও ফলন বৃদ্ধির মাধ্যমে চীন ২০২২ সালের ৩ কোটি মেট্রিক টন থেকে ২০২৫ সালে ভুট্টা আমদানি কমিয়ে ২৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে এনেছে
- অ্যামিনো অ্যাসিড সম্পূরক ও বিকল্প প্রোটিন ব্যবহার করে ২০৩০ সালের মধ্যে পশুখাদ্যে সয়ামিলের পরিমাণ ১৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামাতে চায় বেইজিং
- চীনের সয়াবিনের ৭০ শতাংশের বেশি এখন ব্রাজিল সরবরাহ করে; আগে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করা মার্কিন কৃষকেরা পিছিয়ে পড়েছেন
- ‘থ্রি নর্থ শেল্টারবেল্ট’ কর্মসূচিতে মরুভূমির জমি কৃষিকাজের উপযোগী করা হয়েছে; কিছু এলাকায় রোপণ করা গাছপালার বেঁচে থাকার হার ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে
- বাণিজ্য বিঘ্নের বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে চীনের কৌশলগত শস্যভাণ্ডারে রয়েছে বিশ্বের ভুট্টার মজুতের ৬৯ শতাংশ এবং চালের মজুতের ৬০ শতাংশ
- জিন সম্পাদিত বীজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত কৃষি ও অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে মার্কিন আমদানির ওপর সম্পূর্ণ কৃষি-নির্ভরতা কাটানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকারের নতুন ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা






