৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দের মন্দির নির্মাতারা
৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে কঙ্গো শিগেমিৎসু কোরীয় রাজ্য বেকজে থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জাপানে আসেন। তখন জাপানি দ্বীপপুঞ্জে বৌদ্ধধর্মের প্রচলন হয়েছিল বেশি দিন হয়নি। যুবরাজ শোতোকুর অনুরোধে শিতেন্নোজি নির্মাণ করতে এসেছিলেন এই দক্ষ কাঠমিস্ত্রি। সেই কাজের মধ্য দিয়েই ভিত্তি গড়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন, নিরবচ্ছিন্নভাবে কার্যক্রম চালানো কোম্পানি বলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের। কঙ্গো গুমি প্রায় ১ হাজার ৪৫০ বছর ধরে টিকে আছে। এই সময়ে ৪০ প্রজন্ম পেরিয়েছে, আর প্রতিষ্ঠানটি যুদ্ধ, মহামারি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং জাপানি সমাজের আমূল রূপান্তরের মধ্য দিয়েও টিকে গেছে।
সূচিপত্র
আজ ওসাকাভিত্তিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি তাকামাতসু করপোরেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। ২০০৬ সালে আর্থিক সংকটে পড়ার পর বৃহত্তর এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত হতে হয়েছিল তাদের। তবে ধারাবাহিকতা বজায় আছে। কোম্পানির নির্বাহী চেয়ারম্যান তোশিহিকো তাদা বলেন, ষষ্ঠ শতকের স্পষ্ট নথিপত্র অপ্রতুল হলেও শিতেন্নোজির অস্তিত্বই কোম্পানিটির প্রাচীন উৎসের প্রমাণ।
দক্ষিণ ওসাকার তেন্নোজি স্টেশন থেকে প্রায় ১২ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত মন্দির কমপ্লেক্সটি প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। অগ্নিকাণ্ড ও দুর্যোগে অসংখ্যবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিবারই কঙ্গো গুমি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জটিল কাঠের জোড়ার কৌশল ব্যবহার করে নির্মাণকাজ করেছে। ১৮৬৮ সালে এদো যুগের অবসান পর্যন্ত মন্দিরের আবাসিক মিয়াদাইকু—ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষজ্ঞ প্রধান কাঠমিস্ত্রি—হিসেবে কাজ করার জন্য কঙ্গো পরিবারকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট ভাতা দেওয়া হতো।
মেইজি পুনর্গঠন ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এতে এই পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয় এবং বৌদ্ধধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ভেঙে ফেলার হাইবুতসু কিশাকু অভিযান শুরু হয়। শিতেন্নোজি আর্থিক সংকটে পড়ে, আর কঙ্গো গুমি তাদের নিশ্চিত আয় হারায়। ফলে এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে যে মন্দির তাদের টিকিয়ে রেখেছিল, তার বাইরেও কাজ খুঁজতে হয় কোম্পানিটিকে। আধুনিক যুগে এই রূপান্তর কোম্পানিটির কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি টিকে থাকার সক্ষমতারও পরীক্ষা নেয়।
১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় কোম্পানির ৩৭তম প্রধান—তাদার ভাষ্যে, আপসহীন এক কারিগর—বিক্রির চেষ্টা করতে বা নিজের অপছন্দের কাজ নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর এই অবস্থানের ফলে প্রতিষ্ঠানটি চরম সংকটে পড়ে। ১৯৩২ সালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পূর্বপুরুষদের গড়ে তোলা ব্যবসার পতন আসন্ন দেখে তিনি পারিবারিক সমাধিতে তাঁদের কাছে ক্ষমা চান এবং আত্মহত্যা করেন।
এরপর তাঁর স্ত্রী ইয়োশিয়ে নারী হওয়া সত্ত্বেও প্রধান কাঠমিস্ত্রি বা তোরিও হিসেবে স্বীকৃতি দিতে শিতেন্নোজির কাছে প্রতিদিন আবেদন জানান। শেষ পর্যন্ত মন্দির কর্তৃপক্ষ রাজি হয়। কাজ জোগাড় করে কোম্পানিকে স্থিতিশীল করতে ইয়োশিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যান। ১৯৩৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মুরোতো টাইফুন ওসাকায় আঘাত হানার পর তাঁর বড় সাফল্য আসে। ঝড়ে শিতেন্নোজির পাঁচতলা প্যাগোডাটি ধসে পড়েছিল। পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব পেয়ে তিনি কাজটি শেষ করেন এবং মন্দিরের পাশাপাশি কোম্পানির ভাগ্যও পুনরুদ্ধার করেন।
সরাইখানা, ফুল ও প্রাচীন ঐতিহ্য
প্রাচীন ইতিহাসের অধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কঙ্গো গুমি একা নয়। জাপানে প্রায় এক ডজন প্রতিষ্ঠান এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না—এমন দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠানের অনন্য ঘনত্ব তৈরি হয়েছে সেখানে। তেইকোকু ডেটাব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছে এমন কোম্পানি ছিল ৪৫ হাজার ২৮৪টি। এ সংখ্যা বিশ্বজুড়ে এ ধরনের কোম্পানির অর্ধেকেরও বেশি। এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি।
ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের পাহাড়ে ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত নিশিয়ামা ওনসেন কেইউনকান বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকা হোটেল হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের স্বীকৃতি পেয়েছে। কঙ্গো গুমির মতো, ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় এটি একই পরিবারের ৫০টিরও বেশি প্রজন্ম পরিচালনা করেছে। হায়াকাওয়া নদীর তীরে নির্মিত সরাইখানাটি ১৯৯৭ সালে পুরোপুরি সংস্কার করা হয়। তবে স্থানীয় উৎস থেকে আনা খনিজসমৃদ্ধ উষ্ণ প্রস্রবণের পানিতে ভরা স্নানাগারগুলো আগের মতোই রাখা হয়েছে।
সরাইখানাটির প্রশাসন বিভাগের প্রধান জুনপেই মোরিতা বলেন, স্থানীয় নথি থেকে জানা যায়, অভিজাত ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ফুজিওয়ারা নো মাহিতোর যমজ পুত্র উষ্ণ প্রস্রবণ আবিষ্কার করার পর কেইউনকানের সূচনা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সরাইখানাটিতে রাজদরবারের অভিজাত ব্যক্তি, কবি ও সামরিক নেতারা থেকেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সামন্ত শাসক তাকেদা শিঙ্গেন ও তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু। মেইজি যুগের শেষ দিক থেকে শোওয়া যুগ পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় তিনবার সরাইখানার অংশবিশেষ ভেসে গেলেও, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সভাপতি—এর নেতৃত্বদানকারী ৫৩তম প্রজন্মের প্রতিনিধি—দীর্ঘদিনের একটি নীতি মেনে চলছেন: শুধু সরাইখানার দিকেই মনোযোগ দেওয়া এবং অন্য ব্যবসায় না জড়ানো।
প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে লড়াই করেই আমাদের চলতে হয়েছে।
মোরিতা জানান, বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে মোট অতিথির প্রায় ২০ শতাংশ হলেও মূল অভিজ্ঞতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। অতিথিরা তাতামি মাদুরের ওপর বিছানো ফুতনে ঘুমান, আর খাবার তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী রীতি মেনে; বিদেশি রুচির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তা বদলে দেওয়া হয় না।
এখন একটি ফাউন্ডেশন হিসেবে কাজ করায় তেইকোকু ডেটাব্যাংকের সহস্রাব্দপ্রাচীন প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ইকেনোবোর নাম নেই। তবে ইকেনোবো হলো ইকেবানার—জাপানি ফুল সাজানোর শিল্প—সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম বিদ্যালয়। এর শিকড়ের সন্ধান মেলে যুবরাজ শোতোকু এবং প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর আগে কিয়োতোতে রোক্কাকুদো মন্দির প্রতিষ্ঠার সময়ে। এই ধারার প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৪৬২ সালে। তখন ইকেনোবো সেনকেইকে ফুল সাজানোর ওস্তাদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
ইকেনোবো ফ্লোরাল আর্ট সোসাইটির ব্যবসা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক তাকুয়া তোচিমোচি বলেন, মেইজি পুনর্গঠনের অস্থিরতা ফুল সাজানোর জগতকে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। কারণ অনেক বিদ্যালয় সামন্ত প্রদেশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। মেইজি সরকার মেয়েদের শিক্ষায় ফুল সাজানো অন্তর্ভুক্ত করলে ইকেনোবো নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এর ফলে আগে মূলত পুরুষদের চর্চার এই শিল্প এখন বহুলভাবে নারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে জাপানে ইকেনোবো রীতি শেখানোর প্রায় ৪০০টি শাখা আছে। বিদেশে আছে প্রায় ১২০টি।
দীর্ঘস্থায়িত্বের সাংস্কৃতিক শিকড়
অন্যান্য দেশ থেকে আলাদা সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কিছু কারণের ফলে জাপানে প্রাচীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য ঘনত্ব তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে কোম্পানির গড় আয়ুষ্কাল যেখানে প্রায় ৩০ বছর, আর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কোম্পানির গড় টিকে থাকার মেয়াদ ৬০ বছর থেকে কমে ২০ বছরের নিচে নেমেছে, সেখানে বিশ্বের ২০০ বছরের বেশি বয়সী ৫ হাজার ৬০০ কোম্পানির মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ১০০টিই জাপানে। শিনিসে বা “পুরোনো দোকান” নামে পরিচিত এসব দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান দ্রুত মুনাফা বাড়ানোর চেয়ে স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দেয়।
২০২৪ সালের প্রতিবেদনটির তত্ত্বাবধানকারী তেইকোকু ডেটাব্যাংকের গবেষক কাইতারো আসাহি বলেন, এক হাজার বছরের বেশি টিকে থাকা কোম্পানিগুলোর শিকড় প্রায়ই দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক চর্চায় প্রোথিত। এর মধ্যে আছে মন্দির ও মঠ নির্মাণে বিশেষজ্ঞ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, জাপানের আগ্নেয় ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উষ্ণ প্রস্রবণের সরাইখানা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসা—যেমন আচার-অনুষ্ঠানের সরঞ্জাম তৈরি।
স্পষ্ট লিখিত নথি টিকে নেই, তবে আমি মনে করি শিতেন্নোজির অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে কঙ্গো গুমি এত দীর্ঘকাল ধরে টিকে আছে।
জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক এইজি ইয়ামাদা বলেন, এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানই আঞ্চলিক এলাকায় অবস্থিত পারিবারিক ব্যবসা। সেখানে প্রভাবশালী স্থানীয় পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবসা চালিয়ে আসছে। কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ডিন ইয়োশিনোরি হারার মতে, স্বল্পমেয়াদি শেয়ারহোল্ডার মুনাফা সর্বাধিক করার বদলে উত্তরসূরিদের হাতে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে দেওয়ার ওপর জাপানি কোম্পানিগুলোর জোর দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়িত্বে ভূমিকা রাখে। এই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার সাংস্কৃতিক চর্চা যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে অন্য দেশের সঙ্গে জাপানের ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক সীমিত যোগাযোগও এমন পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংরক্ষিত থাকে।
দত্তক উত্তরসূরি ও পারিবারিক ধারাবাহিকতা
জাপানি পারিবারিক ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক একটি স্বতন্ত্র চর্চা হলো প্রাপ্তবয়স্কদের দত্তক নেওয়া। পশ্চিমা দেশগুলোতে দত্তক নেওয়া অধিকাংশ মানুষ শিশু হলেও জাপানে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশই ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী পুরুষ। উপযুক্ত জৈবিক উত্তরাধিকারী না থাকলেও এই প্রথায় ব্যবসার মালিকেরা যোগ্য উত্তরসূরি বেছে নিতে পারেন, ফলে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। জাপানের একটি প্রবাদে বলা হয়, “ছেলে বেছে নেওয়া যায় না, কিন্তু জামাই বেছে নেওয়া যায়।”
‘সেঞ্চুরিজ অব সাকসেস’ বইয়ের লেখক উইলিয়াম ও’হারা প্রাচীনতম পারিবারিক ব্যবসাগুলোর মধ্যে একটি ধারা চিহ্নিত করেছেন: সেগুলো প্রায়ই পানীয়, নৌপরিবহন, নির্মাণ, খাদ্য ও অস্ত্রের মতো মানুষের মৌলিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। জাপানি ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যগতভাবে পুরো কোম্পানি বড় ছেলেকে দিয়ে যেতেন। তবে প্রাপ্তবয়স্ক কর্মীদের পরিবারে দত্তক নিয়ে পারিবারিক বংশধারায় যুক্ত করার সুযোগ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেছে। সুজুকি মোটর ও প্যানাসনিকের মতো বড় কোম্পানিও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই প্রথা কাজে লাগিয়েছে।
২০১১ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, দত্তক নেওয়া উত্তরসূরিদের পরিচালিত ব্যবসা রক্তের সম্পর্কযুক্ত উত্তরসূরিদের পরিচালিত ব্যবসার চেয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো করেছে। এতে বোঝা যায়, জাপানের প্রাচীনতম কোম্পানিগুলোকে পারিবারিক ব্যবসা মনে করা হলেও তারা প্রায়ই কাল্পনিক আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। কঙ্গো গুমিও রক্তের সম্পর্কের বদলে যোগ্যতার ভিত্তিতে উত্তরসূরি বেছে নিয়ে নিজেদের বংশধারা বজায় রেখেছে। উপযুক্ত পারিবারিক উত্তরসূরি না থাকলে কখনো কখনো কাউকে দত্তক নেওয়া হয়েছে।
তোশিহিকো তাদা বলেন, শিতেন্নোজির সঙ্গে সম্পর্ক এবং দক্ষ মন্দির কাঠমিস্ত্রিদের দল—এই দুইয়ের পাশাপাশি উত্তরসূরি বাছাইয়ের নমনীয়তাই কঙ্গো গুমির টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি। এই তিনটি বিষয় একত্রে এমন স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করেছে, যা ৩৭তম প্রধানের আত্মহত্যা এবং পরবর্তী প্রায়-ধসের পরও প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
আধুনিক সংকট মোকাবিলা
উল্লেখযোগ্য ইতিহাস সত্ত্বেও জাপানের প্রাচীন কোম্পানিগুলো নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা ১১০টিতে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের সর্বোচ্চ সংখ্যার সমান। ক্রমবর্ধমান ব্যয়, উত্তরসূরির অভাব এবং ঋণ পরিশোধে ছাড় পাওয়ার পরও ঘুরে দাঁড়াতে না পারার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে দুর্বল ইয়েন, নিয়মকানুন লঙ্ঘন ও বকেয়া করের বিষয়ও জড়িত।
জাপানে জন্মহার কমে যাওয়া এবং উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়ার ক্রমবর্ধমান জটিলতা শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও হুমকির মুখে ফেলছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ কমছে; বিয়ে ও উত্তরাধিকার নিয়ে সাংস্কৃতিক রীতিনীতিও বদলাচ্ছে। ফলে ছোট প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলে মালিকের মেয়েকে বিয়ে করতে হবে—এমন ধারণার ভিত্তিতে তরুণদের নিয়োগ করা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। ভোক্তার পছন্দ বদলে যাওয়ায় বয়স্ক ক্রেতারা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী পণ্যের চাহিদাও কমছে।
আর্থিক দিক থেকে এসব কোম্পানি আধুনিক করপোরেশনের চেয়ে ভিন্ন যুক্তিতে চলে। ইয়ামাদা বলেন, অনেক দীর্ঘস্থায়ী কোম্পানি পুঁজিবাজারের যুক্তিতে নয়, বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই টিকে আছে। ফলে সাধারণ প্রাইভেট ইক্যুইটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার মডেলে তাদের খাপ খাওয়ানো কঠিন। ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠলে স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে, অথবা একই খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের অধিগ্রহণ করলে, এসব প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য সংরক্ষণের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
২০০৬ সালে কঙ্গো গুমি নিজেই দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়েছিল। যুদ্ধোত্তর নির্মাণ বুমের সময় কোম্পানিটি চাঙ্গা কংক্রিট ও পশ্চিমা ধাঁচের নির্মাণকাজে সম্প্রসারণ ঘটায়। কিন্তু অনভিজ্ঞতার কারণে লোকসানি চুক্তি ও ক্রমবর্ধমান ক্ষতির মুখে পড়ে। ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে তাকামাতসু করপোরেশন। তারা কঙ্গো গুমিকে সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অধিগ্রহণ করে, তবে কোম্পানিটির নাম ও কারিগরি ঐতিহ্য ধরে রাখতে দেয়।
এই তিনটি বিষয় একত্রেই কোম্পানিটির দীর্ঘস্থায়িত্বের ব্যাখ্যা দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের নীতি
জাপানের প্রাচীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশল থেকে আধুনিক ব্যবসার জন্য এমন কিছু শিক্ষা মেলে, যা ত্রৈমাসিক ফলাফল ও দ্রুত সম্প্রসারণে আচ্ছন্ন প্রতিষ্ঠানের ধারণার বিপরীত। টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ধারাবাহিক যে বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তা হলো উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবসম্মত অভিযোজনের সমন্বয়। ঐতিহ্যবাহী কাঠের মন্দির নির্মাণে বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও কঙ্গো গুমি জাপানি স্থাপত্যের ঐতিহ্যবাহী ধরন নির্মাণে কংক্রিট ব্যবহারকারী প্রথম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল এবং কম্পিউটার-সহায়ক নকশাও শুরুতেই গ্রহণ করেছিল।
আমরা শুধু আমাদের মূল ব্যবসাতেই মনোযোগ দিয়েছি। সহজভাবে বললে, মৌলিক বিষয়গুলোতে লেগে থাকাই আসল।
২০০৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে কোম্পানির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাসাকাজু কঙ্গোর বলা এই কথাগুলোই প্রতিষ্ঠানটির দর্শনের সারমর্ম তুলে ধরে। হোশি রিওকানের ৪৬তম প্রজন্মের মালিক জেনগোরো হোশি তাঁদের সরাইখানার সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে সাফল্যকে পানির সঙ্গে তুলনা করেছেন। পানির মতো ব্যবসাটিও তার মৌলিক চরিত্র না হারিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়; সারবস্তু অটুট রেখে বাধা এড়িয়ে নিজের পথ খুঁজে নেয়।
পারিবারিক ব্যবসার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে গবেষণা করা রিৎসুমেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শাওজি দৌ ব্যবস্থাপনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চিহ্নিত করেছেন: উদ্ভাবন ও সংকটে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বজায় রেখে ব্যবসায়িক নীতি মেনে করপোরেট ব্যবস্থাপনা; নীতিবাক্য ও শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দিয়ে উত্তরসূরি গড়ে তোলার পারিবারিক ব্যবস্থাপনা; এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম সম্পদ সংরক্ষণের সম্পদ ব্যবস্থাপনা। ৩০০ বছরের পুরোনো ধূপ প্রস্তুতকারক শোয়েইদোর মতো কোম্পানি দেখিয়েছে, প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিতে কঠোরভাবে অটল থাকার পাশাপাশি মোড়ক ও বিতরণে সাহসী উদ্ভাবন আনলে পরিবর্তনশীল সময়েও ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা টিকে থাকতে পারে।
কঙ্গো গুমির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে আছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক প্রকল্প ও ঐতিহ্যবাহী বাড়ি পুনরুদ্ধারের কাজ বাড়ানো এবং কর্মী প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা। ২০২০ সালে ইউনেসকো জাপানের ঐতিহ্যবাহী কাঠের নির্মাণকৌশলকে বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোম্পানিতে বর্তমানে প্রায় ১০০ জন মিয়াদাইকু এবং কঙ্গো পরিবারের একজন সদস্য কাজ করেন। তিনি ৪০তম প্রজন্মের প্রধানের বংশধর এবং পরিবারের ৪১তম প্রজন্মের উত্তরসূরি।
আধুনিক স্টার্টআপ সংস্কৃতি দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও প্রচলিত ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোকে উদ্যাপন করে। এর বিপরীতে জাপানের প্রাচীন কোম্পানিগুলো দেখায়, দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে দীর্ঘ পথের কথা ভেবে চলতে হয়। এমন কিছু গড়ে তুলতে হয়, যা এতটাই মজবুত এবং নিজের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে যেকোনো ঝড় সামলে নিতে পারে। বিশ্বজুড়ে কোম্পানির গড় আয়ুষ্কাল যখন ক্রমেই কমছে, তখন এসব প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করছে, টিকে থাকা মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়; বরং মূল মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থেকে মর্যাদার সঙ্গে বিবর্তিত হওয়া।
মূল বিষয়গুলো
- ৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কঙ্গো গুমি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকা কোম্পানি হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। ১ হাজার ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণে বিশেষজ্ঞ।
- জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি ইতিহাস রয়েছে এমন ৪৫ হাজারেরও বেশি কোম্পানি আছে। বিশ্বজুড়ে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশি জাপানে, আর প্রায় এক ডজন প্রতিষ্ঠান এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে চালু আছে।
- ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত নিশিয়ামা ওনসেন কেইউনকান বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো হোটেল হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের স্বীকৃতি পেয়েছে। অন্যদিকে, জাপানি ফুল সাজানোর প্রাচীনতম বিদ্যালয় ইকেনোবোর শিকড় ষষ্ঠ শতকে।
- প্রাপ্তবয়স্কদের দত্তক নেওয়ার প্রথায় জাপানি পারিবারিক ব্যবসা রক্তের সম্পর্ক নির্বিশেষে যোগ্য উত্তরসূরি বেছে নিতে পারে। দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশই ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ।
- এসব প্রাচীন প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদি মুনাফা সর্বাধিক করার বদলে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা প্রায়ই নিজেদের মূল দক্ষতার ক্ষেত্রে মনোযোগ ধরে রেখে আধুনিক চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
- বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জনসংখ্যাগত সংকট, উত্তরসূরির অভাব, ভোক্তার পছন্দের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক চাপ। এসব কারণে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেউলিয়া হওয়ার হার এক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।






