ফাঁসের ব্যাপকতা
দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞান ও আইসিটি মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছে, দেশটির প্রধান ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং নাসডাকে তালিকাভুক্ত কোম্পানি কুপাংয়ের বড় ধরনের তথ্য ফাঁসে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার ব্যবহারকারীর রেকর্ড বেহাত হয়েছে। এই সংখ্যা দক্ষিণ কোরিয়ার ৫ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এটি দেশটির ইতিহাসে ভোক্তাদের তথ্য ফাঁসের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি এবং ডিজিটালি সক্রিয় জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সূচিপত্র
তদন্তে জানা গেছে, কোম্পানির সাবেক এক কর্মী পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে লাখো ব্যবহারকারীর নাম ও ইমেইল ঠিকানায় প্রবেশ করেন। প্রাথমিক অ্যাকাউন্টের তথ্যের বাইরে হামলাকারী ডেলিভারি ঠিকানার তালিকার পৃষ্ঠা ১৪ কোটি ৮০ লাখ বার দেখেছেন। এতে নাম, ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা, এমনকি পরিচয় গোপন রাখা অ্যাপার্টমেন্টের প্রবেশদ্বারের পাসওয়ার্ডও প্রকাশ হয়ে থাকতে পারে। কুপাংয়ের একজন ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্টে সর্বোচ্চ ২০টি ডেলিভারি ঠিকানা সংরক্ষণ করতে পারেন। তাই বেহাত হওয়া অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের প্রকৃত পরিমাণ অ্যাকাউন্টের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে; এতে মূল অ্যাকাউন্টধারীদের পরিবারের সদস্য ও পরিচিতজনেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন।
মন্ত্রণালয়ের সাইবার নিরাপত্তা ও নেটওয়ার্ক নীতিবিষয়ক দপ্তরের প্রধান চোই উ-হিউক সিউলে এক সরকারি ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান। কুপাং ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর প্রথম অনুপ্রবেশ শনাক্ত করার প্রায় তিন মাস পর এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হলো। কোম্পানির প্রাথমিক প্রকাশ্য বক্তব্যের তুলনায় এটি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি নির্দেশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক চাপের উদ্বেগ এবং দক্ষিণ কোরিয়া সরকার মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতি বৈষম্য করছে বলে মার্কিন রাজনীতিকদের অভিযোগের কারণে ঘোষণাটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে তদন্ত দল এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে।
তদন্ত দল জোর দিয়ে বলেছে, তারা কখনো আইনি নীতি থেকে বিচ্যুত হয়নি বা কোনো কোম্পানির সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করেনি। ফলাফল পাওয়া যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে তা প্রকাশের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। কূটনৈতিক বিবেচনার বদলে নিয়ন্ত্রক বিধিবিধানের ভিত্তিতে মামলাটি পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের জবাবে এ বক্তব্য দেওয়া হয়।
যেভাবে হামলা চালানো হয়
তথ্য ফাঁসের সূত্রপাত হয়েছিল প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে। তদন্তকারীরা হামলাকারীকে কুপাংয়ের সাবেক কর্মী হিসেবে শনাক্ত করেন, যিনি সেখানে কাজ করার সময় ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাইয়ের সফটওয়্যার তৈরি করেছিলেন। সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি একটি পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার সাইনিং কী চুরি করেন, ২০২৫ সালের ৫ থেকে ২০ জানুয়ারির মধ্যে হামলার প্রাথমিক পরীক্ষা চালান এবং পরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তথ্য সংগ্রহের জন্য ওয়েব ক্রলিং টুল ব্যবহার করেন।
হামলার সময়কাল ছিল ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে অপরাধী প্রায় সাত মাস ধরে শনাক্ত না হয়ে কাজ করতে পেরেছেন। চুরি করা সাইনিং কী ব্যবহার করে সাবেক কর্মীটি কর্মকর্তাদের ভাষায় একটি ইলেকট্রনিক প্রবেশপাস জাল করেন, যার মাধ্যমে প্রচলিত লগইন প্রক্রিয়া পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। কোম্পানি ছাড়ার পরও এ পদ্ধতিতে তিনি কুপাংয়ের সেবাগুলোতে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।
কোরিয়া ইন্টারনেট অ্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্সির ডিজিটাল হুমকি মোকাবিলা বিভাগের প্রধান লি ডং-গুন জানান, তদন্তকারীরা দেখেছেন, কুপাংয়ের বর্তমান ডেভেলপাররা ব্যক্তিগত ল্যাপটপে সাইনিং কী সংরক্ষণ করতেন। অথচ অভ্যন্তরীণ নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার মধ্যেই রাখার কথা। এই চর্চাই তথ্য ফাঁসের সুযোগ তৈরি করেছিল।
হামলাকারী ‘আমার তথ্য সম্পাদনা’ পৃষ্ঠায় প্রবেশ করে নাম ও ইমেইল ঠিকানাসহ ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার ৮১৭টি রেকর্ড সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া ডেলিভারি ঠিকানার তালিকার পৃষ্ঠা ১৪ কোটি ৮০ লাখ ৫ হাজার বার দেখা হয় এবং অর্ডার তালিকার পৃষ্ঠা প্রায় ১ লাখ বার অননুমোদিতভাবে দেখা হয়। তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেছেন, হামলাকারীর কাছে বিদেশের ক্লাউড সার্ভারে তথ্য পাঠানোর মতো ব্যবস্থা ছিল। তবে এ ধরনের তথ্য স্থানান্তর সত্যিই হয়েছিল কি না, তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি।
সরকারি তদন্তের রায়
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ কুপাংয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কঠোর মূল্যায়ন দিয়েছে। চোই উ-হিউক ঘটনাটিকে জটিল কোনো বহিরাগত হামলা নয়, বরং স্পষ্ট ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তদন্ত দল পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা পরিচালনা এবং সাইনিং কী নিয়ন্ত্রণে গুরুতর ঘাটতি শনাক্ত করেছে।
এটি কুপাংয়ের স্পষ্ট ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা, কোনো জটিল হামলা নয়। পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা ও সাইনিং কী পরিচালনায় ঘাটতি শনাক্ত করেছে তদন্ত দল।
তদন্তে বিধি লঙ্ঘনের একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে। বাধ্যতামূলক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তথ্য ফাঁসের কথা জানায়নি কুপাং; ১৮ নভেম্বরের মধ্যে জানানোর কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় ১৯ নভেম্বর। আরও গুরুতর বিষয় হলো, কোম্পানিটি ১৯ নভেম্বর জারি করা তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কুপাং স্বয়ংক্রিয় লগ সংরক্ষণের নীতি পরিবর্তন করেনি। ফলে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ওয়েব অ্যাকসেস লগ এবং ২০২৫ সালের ২৩ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত অ্যাপ অ্যাকসেস লগ মুছে যায়।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেরিতে তথ্য জানানোর ঘটনায় প্রশাসনিক জরিমানা করা হবে, যার পরিমাণ ৩ কোটি ওন পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া প্রমাণ নষ্ট করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য বাধাদানের ঘটনা তদন্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ করেছেন কর্মকর্তারা। কুপাংকে চলতি মাসের শেষ নাগাদ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে সেগুলো বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এরপর জুন ও জুলাইয়ে সরকারি পরিদর্শন হবে।
কুপাংয়ের দাবি বনাম বাস্তবতা
তদন্ত চলাকালে কুপাংয়ের বক্তব্য ছিল, প্রযুক্তিগতভাবে ৩ কোটি ৩৭ লাখ অ্যাকাউন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রকৃত ক্ষতি সীমিত। কোম্পানির দাবি, হামলাকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার হার্ড ড্রাইভে মাত্র প্রায় ৩ হাজার রেকর্ড সংরক্ষিত ছিল এবং পরে সেগুলো মুছে ফেলা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও গোপনীয়তা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা এ অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ ও সুনামের ক্ষতি কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা এটি।
ব্রিফিংয়ে চোই উ-হিউক সরাসরি এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য সুরক্ষা মানদণ্ড অনুযায়ী, ব্যক্তিগত তথ্যের পৃষ্ঠায় অননুমোদিত প্রবেশই তথ্য ফাঁস—তথ্য স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, নাকি অন্য কোথাও পাঠানো হয়েছিল, তা এতে বিবেচ্য নয়।
এটিকে প্রবেশ বলা হলে দায় কমে যায় না। ৩ হাজার রেকর্ডের সংখ্যাটি কেবল কোম্পানির দাবি, এটি শুধু একটি সূত্র হিসেবে বিবেচ্য। আমরা সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করেছি। বহিরাগত হামলাকারীরা কতটা তথ্য দেখেছে এবং কতটা ফাঁস হয়েছে, তা নির্ধারণ করতে কুপাংয়ের সার্ভার পরীক্ষা করেছি।
সরকারি তদন্তের ফলাফলের জবাবে কুপাংয়ের এক প্রতিনিধি বলেন, ডেলিভারি ঠিকানার তালিকার পৃষ্ঠায় ১৪ কোটি ৮০ লাখবার প্রবেশের অর্থ তথ্য ফাঁসের ব্যাপকতা নয়। মুখপাত্রের ভাষ্য, এগুলো ছিল ৩ কোটি ৩৭ লাখ অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগত তথ্য আলাদাভাবে সংগ্রহের চেষ্টা, ১৪ কোটি ৮০ লাখ পৃথক তথ্য ফাঁসের প্রমাণ নয়। তবে সরকারি কর্মকর্তারা পাল্টা বলেছেন, এত বিপুল সংখ্যক প্রবেশের অনুরোধ প্রমাণ করে, হামলাকারীর কাছে ব্যবহারকারীদের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল সংগ্রহের সক্ষমতা ছিল।
এই মতপার্থক্য থেকে বোঝা যায়, কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য ফাঁসের সংজ্ঞায় মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কুপাং হামলাকারীর কাছে তথ্য সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগত তথ্যের যেকোনো অননুমোদিত দেখাকেই ফাঁস হিসেবে বিবেচনা করছে, বিশেষ করে যখন বিদেশে তথ্য পাঠানোর উপযোগী ব্যবস্থার প্রমাণও রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও যুক্তরাষ্ট্রের আইনি চাপ
তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি অভ্যন্তরীণ সাইবার নিরাপত্তা সংকট থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন পাওয়া কুপাংয়ের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার কঠোর নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপকে বৈষম্যমূলকভাবে একটি মার্কিন কোম্পানিকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা হিসেবে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা।
অন্তর্বর্তী প্রধান নির্বাহী হ্যারল্ড রজার্স একাধিক দিক থেকে বাড়তে থাকা আইনি চাপের মুখে রয়েছেন। তথ্য ফাঁস নিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মিথ্যা বলার অভিযোগে দক্ষিণ কোরীয় পুলিশ তাঁকে প্রায় ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একই সময়ে, ঘটনাটি নিয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সাক্ষ্য দিতে রজার্সকে তলব করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটি। কোরীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর অন্যায্য বোঝা চাপাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কংগ্রেসের তদন্ত।
নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা একটি সমষ্টিগত মামলায় কুপাংয়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ, কোম্পানিটি পর্যাপ্ত তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করেনি এবং তথ্য ফাঁসের ব্যাপ্তি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করেছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং পরে ঘটনাটিকে ছোট করে দেখানোর কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা বিনিয়োগকারী ও ব্যবহারকারীদের পক্ষে মামলাটি করা হয়েছে।
সিউলে কার্যক্রম চালানো কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছে, নয়টি সংস্থা ও শত শত কর্মকর্তাকে নিয়ে একাধিক সরকারি সংস্থার এই পদক্ষেপ দেশীয় কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এর পক্ষে তারা ২০২৫ সালে এসকে টেলিকমে ২ কোটি ৭০ লাখ রেকর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাটির কথা বলেছে, যেখানে তুলনীয় তদন্ত হয়নি। তবে বিজ্ঞান ও আইসিটি মন্ত্রণালয় আইনি নীতি থেকে বিচ্যুতির অভিযোগ দৃঢ়ভাবে নাকচ করেছে। তাদের বক্তব্য, একই ধরনের লঙ্ঘনের মুখে পড়া যেকোনো কোম্পানির মতো কুপাংয়ের সঙ্গেও একই আচরণ করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বের সেরা বিনিয়োগের গন্তব্যে পরিণত করার অঙ্গীকার প্রকাশ্যে করেছেন প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং। এতে তথ্য সুরক্ষার কঠোর প্রয়োগ দেখানো এবং বিদেশি পুঁজির জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ভোক্তাদের গোপনীয়তা রক্ষার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখে সিউল, তার পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে কুপাংয়ের ঘটনা।
নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি
দেরিতে তথ্য জানানোর জন্য তাৎক্ষণিক জরিমানার বাইরেও কুপাং গুরুতর নিয়ন্ত্রক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ব্যবসা স্থগিত করার সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেছে ফেয়ার ট্রেড কমিশন। এটি কঠোর ব্যবস্থা, যাতে কোম্পানির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কমিশন কর নিরীক্ষাও চালাচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠাতা বম কিম ও সাবেক নির্বাহীদের বিরুদ্ধে সংসদে করা একটি অভিযোগ পেয়েছে।
২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত পৃথক এক তথ্যেও আরও ১ লাখ ৬৫ হাজার ব্যবহারকারীর রেকর্ড বেহাত হওয়ার কথা জানা গেছে। এই দ্বিতীয় ঘোষণায় জনরোষ আরও বেড়েছে এবং কোম্পানির প্রাথমিক মূল্যায়নে ক্ষয়ক্ষতি কম করে দেখানো হয়েছিল—এমন ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।
শিল্প খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ার ভোক্তামুখী প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য নতুন পরিপালন মানদণ্ড স্থাপন করছে। হামলার পুনর্গঠন, প্রবেশের নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং সময়রেখা বিশ্লেষণের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে সরকার ব্যক্তিগত তথ্যের বিপুল পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত করে এমন অন্যান্য কোম্পানির জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণবিধি তৈরির অভিপ্রায় দেখিয়েছে।
কুপাং ব্যবহারকারীদের জন্য বেহাত হওয়া তথ্য বাস্তব নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে। ডেলিভারি ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং ভবনের প্রবেশদ্বারের পাসওয়ার্ডের কারণে গ্রাহকেরা পিছু নেওয়া, লক্ষ্যভিত্তিক প্রতারণা এবং শারীরিক নিরাপত্তার হুমকির মুখে পড়তে পারেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাতিল ও নজরদারির মাধ্যমে পেমেন্ট কার্ডের তথ্য ফাঁসের ক্ষতি কমাতে পারলেও ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য স্থায়ীভাবেই সংবেদনশীল থেকে যায়। ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের ঠিকানাও ফাঁস হওয়ায় সরাসরি কুপাং ব্যবহারকারীদের বাইরেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।
মূল তথ্য
- কুপাংয়ের ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট থেকে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ
- সাবেক এক কর্মী পরিচয় যাচাইয়ের সাইনিং কী চুরি করে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বরের মধ্যে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করেন
- হামলাকারী ডেলিভারি ঠিকানার তালিকার পৃষ্ঠা ১৪ কোটি ৮০ লাখবার দেখেছেন; এতে ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ভবনের প্রবেশকোড প্রকাশ হয়ে থাকতে পারে
- বিজ্ঞান ও আইসিটি মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে স্পষ্ট ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং দেরিতে তথ্য জানানো ও প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ এনেছে
- অন্তর্বর্তী প্রধান নির্বাহী হ্যারল্ড রজার্সকে কোরীয় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে তলব করা হয়েছে
- নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা একটি সমষ্টিগত মামলায় শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে
- ফেয়ার ট্রেড কমিশন ব্যবসা স্থগিত করার সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করেছে এবং কর নিরীক্ষা চালাচ্ছে
- মূল তথ্য ফাঁসের ঘটনা থেকে পৃথকভাবে ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আরও ১ লাখ ৬৫ হাজার রেকর্ড ফাঁসের কথা প্রকাশ করা হয়
- কুপাংকে মাসের শেষ নাগাদ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জমা দিতে হবে; জুন ও জুলাইয়ে সরকারি পরিদর্শনের কথা রয়েছে






