সভ্যতার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য তৈরি শক্তির উৎস
এমন একটি যন্ত্রের কথা ভাবুন, যেটিকে কখনো চার্জ দিতে হয় না। আপনার জীবনেও একবার নয়। আপনার সন্তানদের জীবদ্দশায় নয়, নাতি-নাতনিদের জীবনেও নয়, এমনকি প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীদের জীবনেও নয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাজ্যের পরমাণু শক্তি কর্তৃপক্ষের (UKAEA) গবেষকেরা এমন একটি প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেন, যা শক্তি সঞ্চয় সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এর মধ্য দিয়ে এই কল্পনা কল্পবিজ্ঞান থেকে গবেষণাগারের বাস্তবে রূপ নেয়।
সূচিপত্র
কার্বন-১৪ ডায়মন্ড ব্যাটারি তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে; এর অর্ধায়ু ৫,৭০০ বছর। অর্থাৎ, প্রায় ছয় সহস্রাব্দ পরও যন্ত্রটি তার প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার অর্ধেক ধরে রাখে—প্রাচীন সভ্যতা ও আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যকার ব্যবধান পেরিয়ে যাওয়ার জন্য যা যথেষ্ট দীর্ঘ সময়। কয়েক বছরের মধ্যেই ক্ষমতা হারানো লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কিংবা সূর্যালোক প্রয়োজন এমন সৌর প্যানেলের বিপরীতে, এই শক্তির উৎস পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রাকৃতিক পদার্থের ভেতরে সিল করা অবস্থায় একটানা কাজ করে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটেরিয়ালস বিভাগের অধ্যাপক টম স্কট এই উদ্ভাবনের পেছনে থাকা দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তেজস্ক্রিয় পদার্থকে ব্যবহারযোগ্য শক্তির উৎসে রূপান্তরের পদ্ধতি উদ্ভাবনে তাঁর গবেষক দল বহু বছর ধরে কাজ করেছে। সেই প্রচেষ্টার ফল এই ধারণার কার্যকারিতা-প্রমাণকারী যন্ত্র, যা দুর্গম পরিবেশে শক্তি সরবরাহের ধারণাকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। এ ঘোষণা পারমাণবিক উপকরণ গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা দেখিয়েছে, ফিশন চুল্লির বর্জ্য পদার্থ দায় না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে।
এই ব্যাটারির আয়ুষ্কাল শক্তি সঞ্চয় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বাইরে। আধুনিক রিচার্জেবল ব্যাটারি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় হওয়ার আগে সাধারণত ৫০০ থেকে ১,০০০ বার চার্জ করা যায়। অথচ এই ডায়মন্ডভিত্তিক যন্ত্রটি তখনও ব্যবহারযোগ্য শক্তি দেবে, যখন আজকের ঐতিহাসিক নথিগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক কৌতূহলের বস্তুতে পরিণত হবে। কার্বন-১৪ ক্ষয়ের অন্তর্নিহিত পদার্থবিদ্যা ঘড়ির মতো নির্ভরযোগ্যতা দেয়, যা রাসায়নিক ব্যাটারিতে পাওয়া যায় না।
এই স্থিতিশীলতার কারণে এমন কাজে প্রযুক্তিটি বিশেষ মূল্যবান, যেখানে ব্যর্থতার সুযোগ নেই এবং রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব। প্রোটোটাইপটি কেবল ব্যাটারির রসায়নে সামান্য উন্নতি নয়; ঘণ্টার বদলে শতাব্দীর হিসাবে মাপা সময়জুড়ে যন্ত্র চালানোর পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগও তৈরি করেছে।
তেজস্ক্রিয় ক্ষয় কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করে
এই ব্যাটারি কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে সৌর প্যানেলের নীতির কথা ভাবুন। প্রচলিত ফটোভোলটাইক সেল ফোটন নামের আলোককণা থেকে শক্তি ধরে তা বিদ্যুতে রূপান্তর করে। ডায়মন্ড ব্যাটারি বিটাভোলটাইকস নামের একই ধরনের একটি নীতিতে কাজ করে। তবে সূর্যালোক থেকে শক্তি নেওয়ার বদলে এটি ক্ষয় হতে থাকা কার্বন-১৪ পরমাণু থেকে নির্গত দ্রুতগতির ইলেকট্রন ধরে।
কার্বন-১৪ একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ, যা প্রত্নতত্ত্বে পরিচিত। এর পূর্বানুমানযোগ্য ক্ষয়ের হার ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন জৈব পদার্থের বয়স নির্ধারণ করেন। ক্ষয়ের সময় এই আইসোটোপ স্বল্প-পাল্লার বিটা বিকিরণ নির্গত করে, যার ফলে উচ্চশক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রন বের হয়। ডায়মন্ড ব্যাটারিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি হীরার স্তরের মধ্যে কার্বন-১৪ বসানো থাকে। আইসোটোপটি ক্ষয় হওয়ার সময় বিটা কণা নির্গত করে, যা হীরার অর্ধপরিবাহী বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক প্রবাহে রূপান্তরিত হয়।
হীরার কাঠামো দ্বৈত ভূমিকা পালন করে: এটি শক্তি উৎপন্ন করে এবং একই সঙ্গে দুর্ভেদ্য বিকিরণ-ঢাল হিসেবে কাজ করে। কার্বন-১৪ কেবল স্বল্প-পাল্লার বিকিরণ নির্গত করায় হীরার আবরণ সম্ভাব্য সব ক্ষতিকর বিকিরণ ভেতরেই শোষণ করে নেয়। স্বাভাবিক ব্যবহারে যন্ত্রটি থেকে কোনো বিকিরণ বাইরে বের হয় না, ফলে এটি চিকিৎসায় দেহে প্রতিস্থাপিত যন্ত্র ও ভোক্তাপণ্য—দুই ক্ষেত্রেই নিরাপদ।
UKAEA-র ট্রিটিয়াম ফুয়েল সাইকেল বিভাগের পরিচালক সারাহ ক্লার্ক প্রযুক্তিটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যাখ্যা করেছেন।
ডায়মন্ড ব্যাটারি একটানা মাইক্রোওয়াট মাত্রার শক্তি সরবরাহের একটি নিরাপদ ও টেকসই উপায়। এটি উদীয়মান প্রযুক্তি, যেখানে অল্প পরিমাণ কার্বন-১৪ নিরাপদে আবদ্ধ রাখতে কৃত্রিমভাবে তৈরি হীরা ব্যবহার করা হয়।
প্রোটোটাইপ ব্যাটারিগুলোর মাপ প্রায় ১০ মিলিমিটার বাই ১০ মিলিমিটার, আর পুরুত্ব সর্বোচ্চ ০.৫ মিলিমিটার। এই ছোট আকারের ব্যাটারি একটানা মাইক্রোওয়াট মাত্রার শক্তি দেয়—কম শক্তি লাগে এমন যন্ত্রের জন্য যথেষ্ট, তবে স্মার্টফোন বা বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
পারমাণবিক বর্জ্যকে শক্তিতে রূপান্তর
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো এর কাঁচামালের উৎস। এসব ব্যাটারিতে ব্যবহৃত কার্বন-১৪ আসে পারমাণবিক ফিশন চুল্লি থেকে সরানো গ্রাফাইটের ব্লক থেকে। অন্যথায় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য হিসেবে এসব উপাদান দীর্ঘদিন সংরক্ষণে ব্যয়বহুল ব্যবস্থা নিতে হতো। শুধু যুক্তরাজ্যেই প্রায় ৯৫ হাজার টন এমন গ্রাফাইট ব্লক রয়েছে; এগুলো সংরক্ষণ যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি অনাবিষ্কৃত সম্পদও।
চুল্লির গ্রাফাইট থেকে কার্বন-১৪ আহরণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা একদিকে পারমাণবিক বর্জ্যের পরিমাণ কমান, অন্যদিকে তৈরি করেন মূল্যবান শক্তির সম্পদ। এই প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় পদার্থকে প্লাজমা-উন্নত রাসায়নিক বাষ্প অধঃক্ষেপণ পদ্ধতিতে তৈরি কৃত্রিম হীরার ভেতরে স্থাপন করা হয়। UKAEA-র কালহ্যাম ক্যাম্পাসের প্রকৌশলীরা নির্ভুলভাবে হীরার স্তর তৈরির জন্য বিশেষায়িত প্লাজমা অধঃক্ষেপণ যন্ত্র নির্মাণ করেছেন। এতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিরাপদে আবদ্ধ থাকে এবং শক্তি আহরণও সর্বোচ্চ করা যায়।
এই উৎপাদন কৌশল সরাসরি ফিউশন শক্তি গবেষণা থেকে এসেছে। টোকামাক চুল্লির জন্য মূলত তৈরি তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবস্থাপনা, প্লাজমা অধঃক্ষেপণ ও বিশেষায়িত অর্ধপরিবাহী উৎপাদনে UKAEA-র দক্ষতা ডায়মন্ড ব্যাটারি প্রকল্পেও কাজে লেগেছে। এই সহযোগিতা দেখায়, মৌলিক পদার্থবিদ্যা গবেষণায় বিনিয়োগ থেকে কীভাবে অপ্রত্যাশিত ব্যবহারিক প্রয়োগ তৈরি হতে পারে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি ম্যাটেরিয়ালস বিভাগের অধ্যাপক নিল ফক্স হীরার আবরণের সুরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
হীরা মানুষের জানা সবচেয়ে কঠিন পদার্থ; এর চেয়ে বেশি সুরক্ষা দিতে পারে এমন কিছু ব্যবহার করার সুযোগ আক্ষরিক অর্থেই নেই।
ব্যাটারির কার্যকর আয়ু শেষ হলে নিয়ন্ত্রিত পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তির জন্য এটি প্রস্তুতকারকের কাছে ফেরত দেওয়া যাবে। পুরো জীবনচক্রজুড়েই কার্বন-১৪ নিরাপদে আবদ্ধ থাকবে, ফলে শক্তির চাহিদা ও পরিবেশগত উদ্বেগ—দুটিই বিবেচনায় থাকে। এক গ্রাম কার্বন-১৪ প্রতিদিন ১৫ জুল বিদ্যুৎ দিতে পারে এবং প্রচলিত ব্যাটারির চেয়ে শত শত বছর বেশি টিকে থাকে।
যেসব ক্ষেত্রে শক্তির চেয়ে দীর্ঘস্থায়িত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ডায়মন্ড ব্যাটারি মাইক্রোওয়াট মাত্রার শক্তি দেয়, যা স্মার্টফোন বা বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতাই সুবিধা হয়ে ওঠে, যেখানে কাঁচা বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে দীর্ঘস্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাটারি বদলানো বিপজ্জনক, ব্যয়বহুল বা অসম্ভব—এমন পরিবেশে এই প্রযুক্তি বিশেষ কার্যকর।
চিকিৎসায় দেহে প্রতিস্থাপিত যন্ত্র এই প্রযুক্তির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রয়োগক্ষেত্রগুলোর একটি। বর্তমানে পেসমেকার, শ্রবণযন্ত্র ও চোখে ব্যবহৃত যন্ত্রে প্রচলিত ব্যাটারি থাকে, যেগুলো প্রতি পাঁচ থেকে দশ বছর অন্তর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বদলাতে হয়। প্রতিবার ব্যাটারি বদলানোর প্রক্রিয়ায় সংক্রমণ, জটিলতা ও সুস্থ হতে সময় লাগার ঝুঁকি থাকে। ডায়মন্ড ব্যাটারি রোগীর পুরো জীবনকাল এসব যন্ত্র চালাতে পারে, ফলে বারবার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমবে। চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াতের সুযোগ সীমিত এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের জন্য এই দীর্ঘস্থায়িত্ব জীবন বদলে দিতে পারে।
মহাকাশ অনুসন্ধানও এই প্রযুক্তির উপযোগী ক্ষেত্র। সৌর প্যানেলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পৌঁছালে বা প্রচলিত ব্যাটারির শক্তি ফুরিয়ে গেলে গভীর মহাকাশের অনুসন্ধানযান ও স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা মানবনির্মিত বস্তু ভয়েজার ১ সীমিত আয়ুষ্কালের প্রচলিত পারমাণবিক ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। কার্বন-১৪ শক্তির উৎস কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে যন্ত্রপাতি ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে পারে, যা বর্তমান প্রযুক্তিগত সীমার অনেক বাইরে বিস্তৃত অভিযান সম্ভব করবে।
মহাকাশযান বা এর বহন করা সরঞ্জামে লাগানো রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ট্যাগ হাজার হাজার বছর ধরে শনাক্তযোগ্য থাকতে পারে। এতে পরিচালন ব্যয় কমবে এবং অভিযানের আয়ু বাড়বে। ব্যাটারিটি স্ব-চার্জ ক্ষয় ছাড়াই মাইনাস ৬০ ডিগ্রি থেকে প্লাস ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত চরম তাপমাত্রায় কার্যকরভাবে কাজ করে, ফলে কঠিন পরিবেশের জন্য এটি আদর্শ।
পৃথিবীতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর প্রয়োগের মধ্যে রয়েছে আর্কটিক অঞ্চলের পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, তেল-গ্যাস অবকাঠামোর জন্য সমুদ্রতলের সেন্সর এবং দুর্গম স্থানের নিরাপত্তা যন্ত্র। কয়েক দশক ধরে কাউকে ছাড়াই কাজ করতে হবে—এমন যেকোনো ব্যবস্থা এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারক্ষেত্র। সক্রিয় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ট্যাগ পৃথিবী বা মহাকাশে থাকা যন্ত্রকে একটানা কয়েক দশক শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে; এতে খরচ কমে এবং কার্যকর আয়ু বাড়ে।
পারমাণবিক ব্যাটারি নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
কার্বন-১৪ ব্যাটারির প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি করে ব্রিস্টল ও UKAEA শিরোনামে এলেও, পারমাণবিক ব্যাটারি তৈরিতে তারাই একমাত্র নয়। এই প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গবেষক দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে একই ধরনের যন্ত্র বাজারজাত করার দৌড়ে নেমেছে।
চীনের বেইজিং বেটাভোল্ট নিউ এনার্জি টেকনোলজি কার্বন-১৪-এর বদলে নিকেল-৬৩ ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী নকশার ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৪ সালের গোড়ায় উন্মোচিত তাদের BV100 ব্যাটারির মাপ ১৫ মিলিমিটার বাই ১৫ মিলিমিটার বাই ৫ মিলিমিটার; এটি ৩ ভোল্টে ১০০ মাইক্রোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। নিকেল-৬৩-ভিত্তিক এই পদ্ধতিতে ৫০ বছর আয়ু পাওয়া যায়, যা কার্বন-১৪-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তবে সিরিজ সংযোগের মাধ্যমে ভোক্তাপণ্য চালাতে পারে এমন এক ওয়াটের সংস্করণ চলতি বছরের শেষ দিকে বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বেটাভোল্টের।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ইনফিনিটি পাওয়ারও ২০২৪ সালে এই প্রতিযোগিতায় যোগ দেয়। তারাও বেটাভোল্টের মতো নিকেল-৬৩-ভিত্তিক কয়েন-সেল তৈরি করছে। এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার দেগু গিয়ংবুক ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকেরা কার্বন ও হাইড্রোজেনের আইসোটোপসহ বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে বিটাভোলটাইক সেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
নির্দিষ্ট প্রয়োগক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়িত্বের দিক থেকে ব্রিস্টল দলের স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে। নিকেল-৬৩ ব্যাটারি ভোক্তাপণ্যের উপযোগী কয়েক দশক সেবা দিতে পারে, কিন্তু কার্বন-১৪-এর ৫,৭০০ বছরের অর্ধায়ু এমন অতিদীর্ঘস্থায়ী প্রয়োগের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মূল্য প্রস্তাব করে, যেখানে রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব। কার্বন-১৪ প্রযুক্তির বাজার সম্ভাবনা যাচাই ও শিল্প খাতে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে অধ্যাপক স্কট বাণিজ্যিক উদ্যোগ আর্কেনলাইট প্রতিষ্ঠা করেছেন।
চীনের লক্ষ্য মহাকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম এবং ক্ষুদ্র রোবটের জন্য নিকট ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক উৎপাদন; অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের দলটি চিকিৎসাযন্ত্র ও গভীর মহাকাশে প্রয়োগের ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় ব্যাটারির রক্ষণাবেক্ষণ ও বদলানো দূর করাই দুই উদ্যোগের অভিন্ন লক্ষ্য।
বাজারে পৌঁছানোর পথে চ্যালেঞ্জ
ডায়মন্ড ব্যাটারি চিকিৎসাযন্ত্র বা মহাকাশযানে ব্যবহার শুরু হওয়ার আগে উল্লেখযোগ্য বাধা পেরোতে হবে। বিশুদ্ধ কার্বন-১৪ ডায়মন্ড তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসীয় কাঁচামালের দাম প্রতি লিটারে প্রায় ৪৬ হাজার ডলার, ফলে উৎপাদন বাড়ানো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। উৎপাদনের জন্য সক্রিয়ভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবস্থাপনার সুবিধাকেন্দ্রে স্থাপিত বিশেষায়িত স্থির-প্রবাহ রাসায়নিক বাষ্প অধঃক্ষেপণ চুল্লি প্রয়োজন, যা উৎপাদনক্ষমতা সীমিত করে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনও আরেকটি জটিল বাধা। হীরার আবরণে উপাদানটি আবদ্ধ থাকায় অন্য পারমাণবিক প্রযুক্তির তুলনায় নিরাপত্তা সনদ পাওয়া সহজ হলেও, তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকা যেকোনো যন্ত্রের জন্য বিস্তৃত পরীক্ষা ও তদারকি প্রয়োজন। চিকিৎসায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েক দশক ধরে যন্ত্রটি দেহে থাকলেও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে।
জনমতও এই প্রযুক্তি গ্রহণের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে। আবদ্ধ কার্বন-১৪ প্রযুক্তিগতভাবে নিরাপদ হলেও, "তেজস্ক্রিয়" শব্দটির নেতিবাচক ধারণা ভোক্তাবাজারে গ্রহণযোগ্যতার পথে বাধা হতে পারে। আবদ্ধ রাখার পদ্ধতি ও বিকিরণ-নিরাপত্তা সম্পর্কে স্বচ্ছভাবে জানানো ব্যাপক ব্যবহারের জন্য অপরিহার্য হবে।
অব্যাহত গবেষণার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অধ্যাপক স্কট আশাবাদী। আগামী দশকের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন:
আমাদের মাইক্রোপাওয়ার প্রযুক্তি মহাকাশ প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা যন্ত্র থেকে শুরু করে চিকিৎসায় দেহে প্রতিস্থাপিত যন্ত্র পর্যন্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা করতে পারে। শিল্প ও গবেষণা খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে আগামী কয়েক বছরে এসব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে পেরে আমরা রোমাঞ্চিত। মানবজাতির অগ্রগতিতে এই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে চাই আমরা।
সামনের দশকে উৎপাদন বাড়ানো এবং শক্তি উৎপাদনক্ষমতা উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া হবে। উৎপাদন বাড়ানো সফল হলে ব্যয় কমতে পারে এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা ও মহাকাশ খাতের বাইরেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার বিস্তৃত হতে পারে।
মূল তথ্য
- ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাজ্যের পরমাণু শক্তি কর্তৃপক্ষের গবেষকেরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বের প্রথম কার্বন-১৪ ডায়মন্ড ব্যাটারি তৈরি করেন
- ব্যাটারিটি ৫,৭০০ বছরের অর্ধায়ুবিশিষ্ট কার্বন-১৪-এর তেজস্ক্রিয় ক্ষয় কাজে লাগিয়ে সহস্রাব্দ ধরে একটানা মাইক্রোওয়াট মাত্রার শক্তি দেয়
- পারমাণবিক চুল্লির গ্রাফাইট ব্লক থেকে কার্বন-১৪ আহরণ করে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যকে সিল করা শক্তির উৎসে রূপান্তর করা হয়
- কৃত্রিম হীরা অর্ধপরিবাহী ও বিকিরণ-ঢাল—দুই ভূমিকা পালন করে; বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নির্গত সব কণা শোষণ করে
- প্রয়োগের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসায় দেহে প্রতিস্থাপিত যন্ত্র (পেসমেকার, শ্রবণযন্ত্র), গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানযান, দূরবর্তী সেন্সর ও আরএফ ট্র্যাকিং ট্যাগ
- চীন (বেটাভোল্ট) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তিতে নিকেল-৬৩ ব্যবহার করা হয়; এগুলোর আয়ু কম হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদন কাছাকাছি সময়ে শুরু হতে পারে
- বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য উৎপাদনপ্রক্রিয়া বড় করা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন; বর্তমানে কাঁচামাল গ্যাসের দাম প্রতি লিটারে ৪৬ হাজার ডলার






