মালয়ান বাঘের জন্য শেষ আশার আলো রাজকুমারের রয়্যাল রিজার্ভ

পড়তে 11 মিনিট
মালয়ান বাঘের জন্য শেষ আশার আলো রাজকুমারের রয়্যাল রিজার্ভ

এক রাজকুমারের অঙ্গীকার: রাজকীয় সংরক্ষণ-অভিভাবক

মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্যের ৩০ বছর বয়সী যুবরাজ তেংকু হাসানাল ইব্রাহিম আলম শাহ যখন রাজ্যের ঘন বৃষ্টিবনের দিকে তাকান, তখন তিনি শুধু সুউচ্চ গাছ আর আঁকাবাঁকা নদী দেখেন না; এশিয়ার অন্যতম পরিচিত শিকারি প্রাণীর জন্য শেষ আশার আলোও দেখেন। বৈজ্ঞানিকভাবে Panthera tigris jacksoni নামে পরিচিত মালয়ান বাঘ একসময় এসব জঙ্গলে রাজত্ব করত। ১৯৫০-এর দশকে এদের সংখ্যা আনুমানিক ৩ হাজার ছিল। বর্তমানে বনে টিকে আছে ১৫০টিরও কম। ফলে প্রজাতিটি মহাবিপন্নের তালিকায় রয়েছে এবং বিলুপ্তির বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি পৌঁছেছে।

সূচিপত্র
  1. এক রাজকুমারের অঙ্গীকার: রাজকীয় সংরক্ষণ-অভিভাবক
  2. শেষ আশ্রয়স্থল: বাঘ সংরক্ষণাগারের কাঠামো
  3. বনের অভিভাবক: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দক্ষতা
  4. বন্য পরিবেশে প্রযুক্তি: পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগ
  5. বৈশ্বিক জোট: ভবিষ্যতের অর্থায়ন
  6. বাঘের ডোরার বাইরে: জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য
  7. টিকে থাকার লড়াই: হুমকি ও সাফল্য
  8. মূল বিষয়গুলো

১৯০০-এর দশকের শুরুর দিকে তাঁর প্রপিতামহের প্রপিতামহ জোহরের সুলতান ইব্রাহিম শখ করে বাঘ শিকার করতেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে, যা প্রকাশিত হয়েছিল দ্য ওয়াইড ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনে। তাঁর পথ অনুসরণ না করে তেংকু হাসানাল বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। পূর্বপুরুষ যে প্রাণীদের শিকার করতেন, তিনি এখন তাদেরই সংরক্ষণের অভিভাবক হয়ে উঠেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম রাজকীয় বাঘ সংরক্ষণাগার প্রতিষ্ঠা করে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতায় পরিণত হয়েছেন। ২০২৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আল-সুলতান আবদুল্লাহ রয়্যাল টাইগার রিজার্ভ (ASARTR)। এই অভয়ারণ্য প্রজাতিটির চিরতরে বিলুপ্তি ঠেকাতে রাজপরিবার, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতার ধারণাকে আমূল নতুনভাবে তুলে ধরে।

রাজকুমারের অঙ্গীকার আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সংরক্ষণ কৌশলে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলেন এবং সংরক্ষণাগারের কার্যক্রমে বৈজ্ঞানিক দক্ষতার প্রয়োগ নিশ্চিত করেন। তাঁর পদ্ধতিতে ঐতিহ্যগত পরিবেশবিষয়ক জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক সংরক্ষণবিজ্ঞানকে মিলিয়ে এমন একটি মডেল তৈরি করা হয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বাঘ সংরক্ষণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণাগারটি ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও অর্থায়ন পেয়েছে। ফলে সংকটাপন্ন পরিস্থিতি মালয়ান বাঘের পুনরুদ্ধারের আশার আলোয় রূপ নিচ্ছে এবং দেখাচ্ছে, লক্ষ্যভিত্তিক নেতৃত্ব কীভাবে সংরক্ষণ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে পারে।

তাঁর অভিযানের জরুরিতা মালয়েশিয়ার প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিফলন। কয়েক দশকের বন উজাড় ও কৃষি সম্প্রসারণের ফলে আবাসস্থল খণ্ডিত হয়ে বাঘের বিচ্ছিন্ন জনবসতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, চোরাশিকারি চক্র বনের সীমানায় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষিত হলেও তামান নেগারায় অনুপ্রবেশ ঠেকানোর মতো বাফার জোন ছিল না। তেংকু হাসানাল বুঝতে পেরেছিলেন, অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে মালয়ান বাঘও বিলুপ্ত আত্মীয়দের মতো ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে। এতে মালয়েশিয়ার বাস্তুতন্ত্র থেকে মুছে যাবে একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শিকারি প্রাণী।

বিজ্ঞাপন

শেষ আশ্রয়স্থল: বাঘ সংরক্ষণাগারের কাঠামো

ASARTR উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়ায় সংরক্ষিত আবাসস্থলের পরিসর আমূল বাড়ানোর এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। প্রায় ১ হাজার ৩৪০ বর্গকিলোমিটার (১ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর) জুড়ে বিস্তৃত সংরক্ষণাগারটি গুনুং আইস ও তেকাই-তেমবেলিং বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত এবং দেশের বৃহত্তম জাতীয় উদ্যান তামান নেগারার পাশে অবস্থিত। কৌশলগত এই অবস্থানের ফলে সংরক্ষিত এলাকার মোট আয়তন ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। তৈরি হয়েছে সংলগ্ন ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ হেক্টরের (১৪ লাখ একর) অভয়ারণ্য, যেখানে বিচ্ছিন্ন আবাসস্থলের সীমাবদ্ধতা ছাড়াই বাঘের সংখ্যা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।

সংরক্ষণাগারটির পরিবেশগত গুরুত্ব এর আয়তনের চেয়েও অনেক বেশি। সরকারি নথি অনুযায়ী, উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়ার যেকোনো বনের মধ্যে ASARTR-এ মাটির ওপরের অংশে জীবভরের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এতে কার্বন শোষণের অসাধারণ সক্ষমতা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তেমবেলিং নদীর প্রধান জলাধার হিসেবে সংরক্ষণাগারটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও আশপাশের জনপদে মিঠাপানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানববসতির জন্য বৃষ্টিবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সুবিধা এটিই।

পাহাং স্টেট পার্কস করপোরেশন (PTNP) সংরক্ষণাগারটি পরিচালনা করে এবং এর কার্যক্রম চালায় এংগাং ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস (EMS)। এ ক্ষেত্রে কঠোর আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হয়। ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে কনজারভেশন অ্যাশিউরড টাইগার স্ট্যান্ডার্ডস (CA|TS) এবং সংরক্ষিত ও সংরক্ষণ-পরিচালিত এলাকার জন্য IUCN-এর মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়, যাতে সংরক্ষণ কার্যক্রমে বিশ্বের সর্বোত্তম চর্চা নিশ্চিত হয়। এই সুসংগঠিত পদ্ধতির আওতায় রয়েছে বন্যপ্রাণী টহল, আবাসস্থল সুরক্ষা, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং ভূদৃশ্য সমৃদ্ধ করার কার্যক্রম, যা শুধু বাঘ নয়, তাদের আবাসস্থলের গোটা বাস্তুতন্ত্রকে সহায়তা করার জন্য তৈরি।

জিনগত বৈচিত্র্যের জন্য ভৌগোলিক অবস্থানটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিকার খুঁজতে, নিজস্ব এলাকা গড়ে তুলতে এবং মানুষ ও অন্য বাঘের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে বাঘ এখন জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষণাগারের মধ্যে অবাধে চলাচল করতে পারে। ছোট জনবসতির অন্যতম প্রধান হুমকি—নিকটাত্মীয়ের মধ্যে প্রজননের ফলে জিনগত অবক্ষয়—মোকাবিলায় এই সংযোগ কার্যকর। প্যানথেরার বন্যপ্রাণী বিশ্লেষক চিন ওয়েং ইউয়েনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জনসংখ্যা স্থিতিশীল হলেও জিনগত সংকীর্ণতার কারণে প্রজাতিটি বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে। তা ঠেকাতে বিভিন্ন জনবসতির মধ্যে জিনের আদান-প্রদান জরুরি।

বিজ্ঞাপন

বনের অভিভাবক: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দক্ষতা

ASARTR-এর সুরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছেন মালয়েশিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী ওরাং আসলি থেকে আসা বনরক্ষীরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা এসব বনে বসবাস করছেন। বর্তমানে আদিবাসী ওরাং আসলি সম্প্রদায়ের প্রায় ২৬ জন বনরক্ষী সংরক্ষণাগারে কাজ করছেন। ঘন বৃষ্টিবনের পরিবেশে তাঁদের অনুসরণ ও বন্য পরিবেশে টিকে থাকার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে প্রায়ই বাদ রাখে এমন প্রচলিত সংরক্ষণ মডেলের বিপরীতে, তেংকু হাসানালের উদ্যোগে তাঁদের প্রজন্মান্তরের জ্ঞানকে আনুষ্ঠানিক সুরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

প্যানথেরার সহকারী প্রকল্প সমন্বয়ক অ্যাড্রিয়ান চিয়া চোর ইউ এই অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। শহর থেকে আসা সংরক্ষণকর্মীদের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, আদিবাসী বনরক্ষীদের দক্ষতা আলাদা।

সংরক্ষণাগার সম্পর্কে তাঁদের অনেক জ্ঞান আছে। আমরা (শহরের মানুষ) পথ চিনে চলতে পারি, কিন্তু বন সম্পর্কে আমাদের তেমন কিছু জানা নেই।

এই দক্ষতা সরাসরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও অবদান রেখেছে। গভীর বনে চোরাশিকারবিরোধী কৌশল অনুযায়ী টহল দেওয়ার ফলে ASARTR-এ চোরাশিকারের তিনটি ঘটনা প্রতিহত করা গেছে। সংরক্ষণবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে সংরক্ষণাগারটি ফাঁদমুক্ত মর্যাদা অর্জন করেছে।

এই সহযোগিতা শুধু কর্মসংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রকৃত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। অন্যত্র সংরক্ষণ প্রকল্পে যেমন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখানে তা করা হয়নি। বরং সংরক্ষণাগারটি জাহাই জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য ওরাং আসলি সম্প্রদায়কে অংশীজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংরক্ষণাগারের পরিচালন কাঠামো প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারী EMS-এর সাবেক প্রধান নির্বাহী শাহ রেদজা হুসেইন এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেন, যেখানে বনরক্ষীদের বেতন পুরো গ্রামকে সহায়তা করে। প্রতিটি বনরক্ষীর আয়ের একটি অংশ তাঁদের সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে যায়। এতে সংরক্ষণে সবার অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হয় এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সংরক্ষণ উদ্যোগের সমর্থকে পরিণত হন। তাঁরা এই সুরক্ষাকে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেন।

বিজ্ঞাপন

বন্য পরিবেশে প্রযুক্তি: পর্যবেক্ষণ ও যোগাযোগ

ASARTR-এ আধুনিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য প্রত্যন্ত বৃষ্টিবনের পরিবেশে উপযোগী অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সংরক্ষণাগারটিতে ৩৪০টিরও বেশি ক্যামেরা ট্র্যাপের নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা অবিরাম বন্যপ্রাণীর চলাচল পর্যবেক্ষণ করে। এগুলো থেকে বাঘের ঘনত্ব, শিকারের বিস্তার ও আবাসস্থলের ব্যবহার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। প্যানথেরার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই নজরদারি ব্যবস্থায় বিরল ঘটনাও ধরা পড়ে। যেমন, সংরক্ষণাগারের ভেতরে প্রজননের প্রথম নথিবদ্ধ ঘটনা: গত বছর দুটি শাবকসহ একটি বাঘিনীকে দেখা যায়। সংরক্ষিত এলাকায় সফল প্রজননের এটি ছিল প্রথম লক্ষণ।

২০২৫ সালের নভেম্বরে এজপয়েন্ট টাওয়ার্সের সঙ্গে অংশীদারত্বে সংরক্ষণাগারটি যোগাযোগব্যবস্থার এক যুগান্তকারী সমাধান চালু করে। প্রতিষ্ঠানটি কর্মীসহ পাহারাচৌকি ও ক্যাম্পে লো আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইট প্রযুক্তি স্থাপন করে। এর ফলে বনের গভীরে কাজ করা বনরক্ষী ও গবেষণাকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় ও যোগাযোগ করতে পারেন। স্বতন্ত্র সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি ব্যবস্থায় চালিত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনা জানানো, পথনির্দেশনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যা এমন দুর্গম এলাকায় আগে সম্ভব ছিল না।

এজপয়েন্ট টাওয়ার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিফ কামারউদ্দিন বলেন, সীমিত জ্বালানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎপ্রাপ্তির মতো কার্যক্রম পরিচালনার বাধা মোকাবিলায় এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

স্বতন্ত্র সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি ব্যবস্থা যুক্ত হলে এসব স্থাপনা বনরক্ষী ও গবেষকদের কাজের দক্ষতা বাড়াবে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া যাবে এবং বাঘ দেখার খবর ও চোরাশিকারবিরোধী অভিযানে দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হবে।

এই প্রযুক্তি স্যাটেলাইট ফোনের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। এতে টহলদারদের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, উদ্যান ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও উন্নত হয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষায় ডিজিটাল অবকাঠামোর ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক জোট: ভবিষ্যতের অর্থায়ন

ASARTR-এ প্রয়োজনীয় ব্যাপক সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ দরকার। উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে সংরক্ষণাগারটি সফলভাবে সেই অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত মোহাম্মদ বিন জায়েদ প্রজাতি সংরক্ষণ তহবিল (MBZF)-এর মাধ্যমে পাঁচ বছরে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার (প্রায় ৯ কোটি ৯৮ লাখ মালয়েশীয় রিঙ্গিত) দেওয়ার অঙ্গীকার করে। আবুধাবি সাসটেইনেবিলিটি সপ্তাহে তেংকু হাসানালের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। এতে এই সহযোগিতার কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।

MBZF-এর নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাযান খলিফা আল মুবারক এই উদ্যোগের অস্তিত্বগত গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বাঘের সংখ্যা এ হারে কমতে থাকলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কয়েক বছরের মধ্যেই তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আল-সুলতান আবদুল্লাহ রয়্যাল টাইগার রিজার্ভকে সহায়তা করার এই উদ্যোগ মালয়ান বাঘের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এই অর্থায়নে চোরাশিকারবিরোধী টহল, প্রজনন কর্মসূচি, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং উন্নত জিনতত্ত্বের প্রয়োগ ও বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা নিয়ে কাজ করা একটি গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের নামে একটি রিওয়াইল্ডিং সেন্টার এসব উদ্যোগের কেন্দ্র হবে। প্রজাতির পুনরুদ্ধারের এই কেন্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে সংরক্ষণ কৌশল নির্ধারণেও কাজে লাগতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই বিনিয়োগের পাশাপাশি ইউরোপ থেকেও সহায়তা এসেছে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০ লাখ ইউরো (১১ লাখ ৮০ হাজার ডলার) অনুদান দেয়, যা সংরক্ষণাগারটির গুরুত্বের বিষয়ে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ। মালয়েশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে কমিউনিটির অংশগ্রহণ ও টেকসই পর্যটন প্রকল্প তদারক করে দ্য হ্যাবিট্যাট ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার বন্যপ্রাণীবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা BORA বিশেষভাবে সাম্বার হরিণ ও বুনো শূকরের মতো বাঘের শিকারের প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানোর কাজে মনোযোগী।

বিজ্ঞাপন

বাঘের ডোরার বাইরে: জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য

বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণকারী প্রধান প্রজাতি মালয়ান বাঘ হলেও ASARTR অসংখ্য বিপন্ন প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করে। প্যানথেরা বৃহত্তর তামান নেগারা ভূদৃশ্যকে ‘ক্যাটস্কেপ’ বলে বর্ণনা করে। সেখানে সাত প্রজাতির বন্য বিড়াল রয়েছে: বাঘ, চিতাবাঘ, মেঘচিতাবাঘ, বনবিড়াল, চ্যাপ্টামাথা বিড়াল, মার্বেল বিড়াল ও এশীয় সোনালি বিড়াল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিড়ালজাতীয় প্রাণীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ সমাবেশগুলোর একটি এটি।

এ ছাড়া সংরক্ষণাগারটি এশীয় হাতি, মালয়ান টাপির, এশীয় বুনো কুকুর, মালয়ান গাউর, সাদা হাতের গিবন, লেজওয়ালা মাকাক এবং ডাস্কি লিফ মাঙ্কির মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল। এখানে প্রায় ৩৮০ প্রজাতির পাখি রয়েছে এবং মোট স্তন্যপায়ী প্রজাতির সংখ্যা ১৫০। এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য সংলগ্ন বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। বাঘের মতো খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা শিকারিদের বিশাল এলাকা প্রয়োজন, আর তা সুরক্ষিত হলে একই বাস্তুতন্ত্রে বসবাসকারী অগণিত অন্য প্রজাতিও সুরক্ষা পায়।

সংরক্ষণাগারের সীমানার বাইরেও পরিবেশগত সংযোগ বজায় রাখা অগ্রাধিকার। ৫৩ লাখ হেক্টর আয়তনের উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত মালয়েশিয়ার সেন্ট্রাল ফরেস্ট স্পাইন পুনরায় সংযুক্ত করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ ASARTR। কয়েক দশকের বন উজাড়ে এই বৃষ্টিবন খণ্ডিত হয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে মালয়েশিয়ার প্রাথমিক বনাঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়ে গেছে। তবে সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ফলে আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে প্রাথমিক বনাঞ্চল হারানোর হার ১৩ শতাংশ কমেছে। ৩৭টি পরিবেশগত করিডর তৈরির পরিকল্পনা বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনতে এবং ভূদৃশ্যজুড়ে জিনের আদান-প্রদান পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

বিজ্ঞাপন

টিকে থাকার লড়াই: হুমকি ও সাফল্য

সংরক্ষণে অগ্রগতি হলেও মালয়ান বাঘ এখনো অব্যাহত হুমকির মুখে, যা মোকাবিলায় নিরন্তর সতর্কতা দরকার। বিপন্ন প্রজাতিটিকে লক্ষ্য করে অবৈধ শিকারের হটস্পট হিসেবে পাহাংয়ের পাশাপাশি কেলান্তান ও তেরেঙ্গানুকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৪৬৬টি ফাঁদ ধ্বংস করেছে। কাঠুরেদের ব্যবহৃত সড়ক ও নদীপথ কাজে লাগিয়ে সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে পড়া চোরাশিকারিদের অধিকাংশই ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার নাগরিক। কালোবাজারে প্রতিটি বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দাম ২ লাখ থেকে ৩ লাখ মালয়েশীয় রিঙ্গিত পর্যন্ত ওঠে, যা অপরাধীদের আগ্রহ জিইয়ে রাখে।

সরাসরি চোরাশিকারের বাইরেও পরিবেশগত বিপর্যয় হুমকি তৈরি করছে। আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারে বুনো শূকরের সংখ্যা বিপর্যয়করভাবে কমেছে। বাঘের প্রধান শিকার এই প্রাণী কমে যাওয়ায় বাঘ বিকল্প খাবার খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে কখনো কখনো মানুষের বসতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং সাম্বার হরিণসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির সংখ্যা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলার চেষ্টা করছে BORA-র নেতৃত্বাধীন শিকার-প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির কর্মসূচি।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ক্যামেরা ট্র্যাপে দুটি শাবকসহ একটি বাঘিনী ধরা পড়েছে, যা সংরক্ষণাগারের ভেতরে প্রজননের প্রথম নিশ্চিত ঘটনা। এতে বোঝা যায়, সুরক্ষা, পর্যাপ্ত জায়গা ও শিকারের প্রাণীর প্রাপ্যতার সমন্বয়ে জনসংখ্যা পুনরুদ্ধারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলো আশাবাদের কারণ বলে মনে করেন চিন ওয়েং ইউয়েন।

এটি সত্যিই বেশ রোমাঞ্চকর এবং যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।

২০২৫ সালে সংরক্ষণাগারটি ফাঁদমুক্ত মর্যাদা অর্জন করেছে এবং পাঁচ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। তাই সংরক্ষণকর্মীরা আশাবাদী, বিলুপ্ত জাভান ও বালি বাঘের পরিণতি মালয়ান বাঘের হবে না। বন্যপ্রাণী ও জাতীয় উদ্যান বিভাগ (Perhilitan) ২০৩০ সালের মধ্যে মালয়ান বাঘের সংখ্যা ১৫০ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৪০০ করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ASARTR-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল বজায় রাখা, পরিবেশগত করিডর—ইকো-ভায়াডাক্ট ও আন্ডারপাসসহ—বাড়িয়ে সংযোগ বিস্তৃত করা এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা, আদিবাসী জ্ঞান, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সমন্বিত মডেল ধরে রাখা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • যুবরাজ তেংকু হাসানাল ইব্রাহিম আলম শাহ ২০২৩ সালে আল-সুলতান আবদুল্লাহ রয়্যাল টাইগার রিজার্ভ (ASARTR) প্রতিষ্ঠা করেন। মহাবিপন্ন মালয়ান বাঘ সুরক্ষায় এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম রাজকীয় বাঘ সংরক্ষণাগার।
  • ১৯৫০-এর দশকে মালয়ান বাঘের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার। বর্তমানে তা কমে ১৫০টিরও নিচে নেমেছে। চোরাশিকার, আবাসস্থল ধ্বংস ও শিকারের প্রাণী কমে যাওয়ায় তারা হুমকির মুখে।
  • তামান নেগারার পাশে অবস্থিত ASARTR-এর আয়তন ১ হাজার ৩৪০ বর্গকিলোমিটার। এর ফলে সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ হেক্টরের অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে, যেখানে জিনগত বৈচিত্র্যের জন্য জরুরি বনাঞ্চলের সংযোগ রয়েছে।
  • সংরক্ষণাগারটি ঐতিহ্যগত অনুসরণ-দক্ষতাসম্পন্ন আদিবাসী ওরাং আসলি বনরক্ষীদের সঙ্গে ৩৪০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ এবং চোরাশিকারবিরোধী কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য লো আর্থ অরবিট স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে যুক্ত করেছে।
  • আন্তর্জাতিক অর্থায়নের মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোহাম্মদ বিন জায়েদ প্রজাতি সংরক্ষণ তহবিলের ২ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১০ লাখ ইউরো। এসব অর্থ গবেষণা, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার ও কমিউনিটির উন্নয়নে সহায়তা করবে।
  • সংরক্ষণে প্রাথমিক সাফল্যের মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালে ফাঁদমুক্ত মর্যাদা অর্জন এবং সংরক্ষণাগারের ভেতরে শাবকসহ বাঘের প্রথম প্রজননের ঘটনা নথিবদ্ধ করা, যা বাঘের সংখ্যা পুনরুদ্ধারের আশা জাগায়।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে