বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে সবুজ জ্বালানি
চীনের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাত দেশটির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। নতুন তথ্য বলছে, গত বছর বিনিয়োগ বৃদ্ধির ৯০ শতাংশেরও বেশি এসেছে সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি প্রযুক্তি থেকে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের গবেষণা এবং কার্বন ব্রিফে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এসব শিল্পে রেকর্ড ১৫.৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (২.১ ট্রিলিয়ন ডলার) ব্যবসা হয়েছে, যা চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১.৪ শতাংশ।
সূচিপত্র
- বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে সবুজ জ্বালানি
- পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সব খাতেই রেকর্ড প্রবৃদ্ধি
- কয়লার বৈপরীত্য: চীন কেন এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাচ্ছে
- বিশ্বজুড়ে প্রভাব: চীনা প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে জ্বালানি খাত
- অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ: উৎপাদন-উত্থান থেকে অবকাঠামোয় বিনিয়োগ
- বিভক্ত জলবায়ু পরিস্থিতিতে ভূরাজনৈতিক প্রভাব
- মূল তথ্য
পরিমাণটি বোঝার জন্য বলা যায়, চীনের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অর্থনীতি এখন ব্রাজিল বা কানাডার পুরো অর্থনীতির সমান। একে স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে ধরলে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম অর্থনীতি হতো, যার আকার ভারতের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক। ২০২২ সাল থেকে এই খাতের মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সে বছর জিডিপিতে এর অবদান ছিল মাত্র ৭.৩ শতাংশ। আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে শিল্পের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণগুলোর একটি এটি।
কাঁচা হিসাবের বাইরেও রয়েছে এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উত্থান না হলে ২০২৫ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি হতো মাত্র ৩.৫ শতাংশ, যা সরকারের প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এর বদলে, তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো এসব শিল্প দেশের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জুগিয়েছে। মহামারির পর চীনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের ভূমিকা আরও পোক্ত হয়েছে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সব খাতেই রেকর্ড প্রবৃদ্ধি
একসঙ্গে একাধিক প্রযুক্তিতে এই রূপান্তর ঘটছে। এম্বারের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৬৩৫ গিগাওয়াট থেকে ১,৪০৮ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রথমবারের মতো বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়। মাত্র কয়েক বছর আগেও এই মাইলফলককে সুদূর বলে মনে হতো।
ব্যাটারি প্রযুক্তিতেও সমান বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যাটারি উৎপাদনে বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে ২৭৭ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। শুধু ২০২৫ সালেই ব্যাটারি সংরক্ষণ সক্ষমতা ৬৬ গিগাওয়াট বেড়েছে, যা বিশ্বজুড়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির ৪০ শতাংশেরও বেশি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করে রাখা সঞ্চালনব্যবস্থার বাধা দূর করতে গ্রিডে বিনিয়োগ বেড়ে রেকর্ড ৬৩৯.৫ বিলিয়ন ইউয়ানে (৯২ বিলিয়ন ডলার) পৌঁছেছে।
ভোক্তাদের কাছে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভবত বৈদ্যুতিক যানবাহন। ২০২৫ সালে চীন ১ কোটি ৬৬ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। এখন নতুন গাড়ি বিক্রির ৪৮ শতাংশই বৈদ্যুতিক যানবাহন; ২০২৫ সালের নভেম্বরে এ হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। বছর শেষে চীনের সড়কে চলা মোট গাড়ির ১২ শতাংশ ছিল বৈদ্যুতিক, পাঁচ বছর আগে যা ছিল মাত্র ২ শতাংশ। ভারী শিল্পেও বিদ্যুতায়ন হচ্ছে: ২০২৫ সালে বৈদ্যুতিক ট্রাকের বাজার অংশ বেড়ে ২৩ শতাংশে দাঁড়ায়, আগের বছর যা ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।
২০২৪ সালেই ২০৩০ সালের বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে চীন, নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর আগে। শুধু ২০২৫ সালেই দেশটি বাকি বিশ্বের সম্মিলিত পরিমাণের চেয়ে বেশি সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন করেছে। আগের বছরের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৩৩ শতাংশ এবং বায়ুবিদ্যুৎ ১৩ শতাংশ। ফলে ২০২৪ সালে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির ৮৪ শতাংশ মেটায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎসগুলো। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এগুলো মোট চাহিদা বৃদ্ধির চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ জুগিয়েছে, যার ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ২ শতাংশ কমেছে।
কয়লার বৈপরীত্য: চীন কেন এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাচ্ছে
নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই বিপ্লবের মধ্যেও ২০২৫ সালে চীন ৭৮ গিগাওয়াট নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা চালু করেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এক গিগাওয়াটের বেশি সক্ষমতাসম্পন্ন ৫০টিরও বেশি বড় কয়লাভিত্তিক ইউনিট চালু হয়েছে; আগের দশকে বছরে এ সংখ্যা ছিল ২০টিরও কম। আরও ১৬১ গিগাওয়াট নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব জমা পড়েছে। প্রায় ২৯০ গিগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন হয়েছে বা নির্মাণকাজ চলছে।
এই আপাত বৈপরীত্যের পেছনে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লা কোম্পানিগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব। ২০২১ ও ২০২২ সালে খরার সময় বিদ্যুৎ-সংকটে কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট আরোপ করা হয়। এতে গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আশঙ্কা জোরালো হয়। চীনা সরকারের উপদেষ্টারা এখন কয়লাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য ‘প্রশিক্ষণচাকা’ হিসেবে বর্ণনা করেন; পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি বিকল্প স্থিতিশীলতা জোগাবে।
350.org-এর রাজনৈতিক কৌশলবিষয়ক প্রধান আন্দ্রেয়াস জিবার এই সময়কে ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এটি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়: ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো চীনে সৌরবিদ্যুৎ কয়লাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি যে ব্যয়, পরিসর ও বায়ুর মানের দিক থেকে এগিয়ে গেছে, সম্ভবত এটিই তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।
সিএইচএন এনার্জি ও শানসি কোল অ্যান্ড কেমিক্যালের মতো বড় দেশীয় কয়লা কোম্পানির যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তারা কয়লাকে নির্ভরযোগ্যতা ও স্বনির্ভরতার জন্য অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরে। জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন বলেছে, অন্যান্য উৎস কয়লার জায়গা নিলেও আগামী বহু বছর বিদ্যুৎব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ অপরিহার্য থাকবে।
তবে এই সম্প্রসারণ অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের সতর্কতা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত থাকলে সেগুলো পরিত্যক্ত সম্পদে পরিণত হতে পারে এবং ব্যবস্থার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে সস্তা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। প্রশ্ন রয়ে গেছে, এসব নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র কি সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, নাকি কেবল চাহিদার শীর্ষ সময়ে বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব: চীনা প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিচ্ছে জ্বালানি খাত
চীনের অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উত্থান বিশ্বজুড়ে জ্বালানির অর্থনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনছে। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ সৌর প্যানেল এবং ৬০ শতাংশ বায়ু টারবাইন এখন চীনের কারখানায় তৈরি হয়। এই উৎপাদন আধিপত্যের কারণে ২০১০ সালের পর থেকে প্রযুক্তির ব্যয় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ কমেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ভাষায়, এর ফলে “ইতিহাসের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুৎ” পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের প্রতিবেদনের প্রধান লেখক লরি মাইলিভির্তা এসব প্রযুক্তির বৈশ্বিক বিস্তার তুলে ধরেছেন।
অনেক দেশেই গতি বাড়ছে। আফ্রিকার অনেক দেশ প্রচুর সৌর প্যানেল আমদানি করেছে। এমন জায়গাতেও বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনা শুরু হয়েছে, যেখানে গত বছর, এমনকি এই দশকেও কেউ ভাবেনি যে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার ঘটবে।
এর সুফল চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে চালু হওয়া বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯০ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে সবচেয়ে সস্তা জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্পের চেয়েও কম খরচে। আফ্রিকায় গত ১২ মাসে চীন থেকে সৌর প্যানেল আমদানি ৬০ শতাংশ বেড়েছে; ২০টি দেশ রেকর্ড পরিমাণ আমদানি করেছে। সাশ্রয়ী চীনা প্রযুক্তির সুবাদে মেক্সিকো, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ: উৎপাদন-উত্থান থেকে অবকাঠামোয় বিনিয়োগ
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় ২০২৫ সালে চীনের জ্বালানিসংশ্লিষ্ট সম্পৃক্ততা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে; শুধু বছরের প্রথমার্ধেই এর পরিমাণ ছিল ১২৪ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে বড় বাজার হয়ে উঠেছে আফ্রিকা; সেখানে ৬১.২ বিলিয়ন ডলারের সম্পৃক্ততা ছিল, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৮৩ শতাংশ বেশি। বিদেশে এই বিনিয়োগে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রকল্পের আধিপত্য থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সম্পৃক্ততাও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে: ২০২৪ সালের ১২.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২১.৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিশ্বজুড়ে পেটেন্ট আবেদনের ৭৫ শতাংশ এখন চীনা কোম্পানিগুলোর, ২০০০ সালে যা ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। উদ্ভাবন সক্ষমতার এই কেন্দ্রীভবন ইঙ্গিত দেয়, বৈশ্বিক ব্যয় হ্রাস ও প্রযুক্তি ব্যবহারের গতি নির্ধারণে চীন সামনে থাকবে।
উৎপাদন সক্ষমতার দ্রুত সম্প্রসারণ কাঠামোগত একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে: অতিরিক্ত সক্ষমতা। ২০২৫ সালের শেষ দিকে চীনের সৌর প্যানেল উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ১,২০০ গিগাওয়াটে পৌঁছায়, যেখানে বিশ্বজুড়ে চাহিদা ছিল প্রায় ৬৫০ গিগাওয়াট। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উৎপাদনকারীদের পরিচালন আয় ২০০ শতাংশ কমেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং উৎপাদন সক্ষমতার বদলে বিদ্যুৎ গ্রিডের অবকাঠামো ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা গ্রিডে বিনিয়োগ বাড়িয়ে পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি প্রদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অঞ্চলে সঞ্চালন সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো। পাম্প করে পানি উঁচুতে তুলে জলবিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং ব্যাটারি সংরক্ষণে বিনিয়োগও দ্রুত বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই নতুন ১৫ গিগাওয়াট পাম্পড-হাইড্রো প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিভক্ত জলবায়ু পরিস্থিতিতে ভূরাজনৈতিক প্রভাব
২০২৫ সালে নেওয়া নীতিগত পরিবর্তনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের অর্থনীতি বদলে গেছে। সরকার নির্দিষ্ট হারে বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তামূলক ফিড-ইন ট্যারিফ বাতিল করেছে। ফলে আংশিকভাবে উন্নত বিদ্যুৎবাজারে নতুন নবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোকে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। এ পরিবর্তনে নির্ধারিত সময়ের আগেই স্থাপনের হিড়িক পড়ে, তবে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।
এম্বার প্রতিবেদনের সম্পাদক রিচার্ড ব্ল্যাক বিশ্বে চীনের প্রভাব ব্যাখ্যা করেছেন।
চীনই চালিকাশক্তি। দেশটির ভেতরেই শুধু নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন আনছে তারা।
চীন যখন জ্বালানি রূপান্তরের গতি বাড়াচ্ছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র উল্টো পথে হাঁটছে: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা বন্ধ করে জীবাশ্ম জ্বালানির রপ্তানি উৎসাহিত করছে। এই ভিন্নমুখী অবস্থান বৈশ্বিক জলবায়ু নেতৃত্বে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে সরে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিলেও বেইজিং নিজেকে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছে।
২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ব্রাজিলে কপ৩০ সম্মেলনের আগে জলবায়ুনীতি সমন্বয় করতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে বেইজিং সফর করেন। চীন জানিয়েছে, জলবায়ু সম্মেলনে উচ্চাভিলাষী ফল অর্জনে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করবে। তবে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি রপ্তানি নিয়ে বাণিজ্যিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
এ বছর প্রত্যাশিত সংশোধিত জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানে চীন জলবায়ু প্রতিশ্রুতি আরও জোরদার করবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান নীতি বৈশ্বিক উষ্ণতাকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের দিকে ঠেলে দেবে। তবে ২০২৫ সালেই নির্গমন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে থাকতে পারে। প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনকে নির্গমন ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। বর্তমান প্রবণতা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
মূল তথ্য
- ২০২৫ সালে চীনের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ১৫.৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (২.১ ট্রিলিয়ন ডলার) ব্যবসা হয়েছে, যা জিডিপির ১১.৪ শতাংশ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ৯০ শতাংশেরও বেশি চালিয়েছে
- ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১,৪০৮ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে; ২০২৫ সালের শুরুতে তা কয়লাভিত্তিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়
- ২০২৫ সালে চীন ৩১৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ও ১১৯ গিগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন করেছে, যা বাকি বিশ্বের সম্মিলিত পরিমাণের চেয়েও বেশি
- ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা ২০২৪ সালেই পূরণ করেছে চীন, নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর আগে
- নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবৃদ্ধির পরও ২০২৫ সালে চীন ৭৮ গিগাওয়াট নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা চালু করেছে; আরও ২৯০ গিগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদিত বা নির্মাণাধীন
- বিশ্বের ৮০ শতাংশ সৌর প্যানেল ও ৬০ শতাংশ বায়ু টারবাইন তৈরি করেন চীনা উৎপাদনকারীরা; ২০১০ সালের পর থেকে এতে ব্যয় ৬০-৯০ শতাংশ কমেছে
- ২০২৪ সালে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ ৬২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে মোট বিনিয়োগের ৩১ শতাংশ
- পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রবৃদ্ধি না থাকলে ২০২৫ সালে চীনের জিডিপি ঘোষিত ৫.০ শতাংশের বদলে মাত্র ৩.৫ শতাংশ বাড়ত






