৬০ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য উধাও
বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডির হংকংয়ে তালিকাভুক্ত শেয়ারের দাম এ সপ্তাহে প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের বিপুল সম্পদ উবে গেছে। মে মাস থেকে এই ধসের ধারায় কোম্পানিটির বাজারমূলধন থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মুছে গেছে, যা চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়েছে। শেনজেনভিত্তিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির দরপতনে অন্য কোম্পানিগুলোর শেয়ারও কমেছে: জিলি অটো ৯.৫ শতাংশ, নিও ৩ থেকে ৮ শতাংশ এবং এক্সপেং প্রায় ৬ শতাংশ দর হারিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের সামনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে।
সূচিপত্র
বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে মুনাফা ধরে রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন এই বাজার-অস্থিরতা। অস্থিরতার সুযোগ নিয়েছেন শেয়ারের দরপতনের প্রত্যাশায় অবস্থান নেওয়া বিনিয়োগকারীরা। এস৩ পার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী, হ্যাং সেং টেক ইনডেক্সে বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানির শেয়ার নিয়ে নেতিবাচক অবস্থান নভেম্বরে তীব্রভাবে বেড়েছে, যা সামগ্রিক সূচকের প্রবণতা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা।
হংকংয়ে সিএলএসএর চীন শিল্প গবেষণা বিভাগের সহপ্রধান শিয়াও ফেং বলেন, “বিনিয়োগকারীদের মনোভাব অত্যন্ত নেতিবাচক।” তিনি বলেন, “আরও গভীর উদ্বেগ হলো, এ বছর বড় পরিসরে আয়-লাভের পূর্বাভাস কমানো হতে পারে। এতে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা করার বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।”
দীর্ঘমেয়াদে আশাবাদী বিশ্লেষকেরাও আপাতত অপেক্ষার অবস্থানে গেছেন। পিক্টেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক গ্যারেথ প্যান পুরো বছরের সতর্ক পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের জন্য “এখনও সময় আসেনি” বলে মন্তব্য করেছেন।
মূল্যায়নে বড় ধরনের সংশোধন হয়েছে। বিওয়াইডির শেয়ার এখন ভবিষ্যৎ আয়ের পূর্বাভাসের প্রায় ১৫ গুণ দামে লেনদেন হচ্ছে, যা তিন বছরের গড় ১৮ গুণের চেয়ে কম। তবু বিনিয়োগকারীরা সতর্ক। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর এই শেয়ার নিয়ে বিক্রির পরামর্শ এখন সবচেয়ে হতাশাবাদী পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ বিক্রির পরিমাণের হিসাবে বিওয়াইডি বিশ্বের শীর্ষ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রেতা। ২০২৪ সালে বিদেশে বিক্রি ১৫০.৭ শতাংশ বাড়িয়ে টেসলাকে পেছনে ফেলে এই অবস্থান অর্জন করে কোম্পানিটি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই সাফল্য কোম্পানির অভ্যন্তরীণ বাজার কৌশল নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ দূর করতে পারেনি। সেখানে আগ্রাসী মূল্যছাড় মুনাফার মার্জিনে সংকট তৈরি করেছে, যা পুরো খাতকে গ্রাস করার হুমকি দিচ্ছে।
দেশীয় চাহিদা কমছে
জানুয়ারিতে বিওয়াইডি টানা পঞ্চম মাসের মতো বিক্রি কমার খবর দিলে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে মন্দার গভীরতা স্পষ্ট হয়। বিশ্বজুড়ে কোম্পানিটি মাত্র ২১০,০৫১টি গাড়ি সরবরাহ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০.১ শতাংশ কম। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহের চিত্র ছিল আরও খারাপ: ২০২৪ সালের জানুয়ারির তুলনায় তা অর্ধেকে নেমে ১০৯,৫৬৯টিতে দাঁড়ায়। এর ঠিক আগে বেইজিং বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য এক দশক ধরে চালু করছাড়ের মেয়াদ শেষ হতে দেয়। ১ জানুয়ারি থেকে আবার ৫ শতাংশ গাড়ি কেনার কর চালু হয়, ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্যয় করতে অনিচ্ছুক ক্রেতাদের জন্য গাড়ির দাম কার্যত বেড়ে যায়।
সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রে এই নীতিগত পরিবর্তন মৌলিক রদবদলের ইঙ্গিত দেয়। বহু বছর ধরে চীনা কর্তৃপক্ষ উদার ভর্তুকি ও করছাড় দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পকে সহায়তা করেছে, যা দেশীয় নির্মাতাদের বিশ্ববাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। এখন বাজার পরিণত হওয়ায় এবং বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকায় কর্মকর্তারা সেই সহায়তা তুলে নিয়েছেন। মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ স্থানীয় গাড়ি নির্মাতা প্রথম প্রান্তিকে আগের বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমার আশঙ্কা করছে। এতে বোঝা যায়, জানুয়ারির পতন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদায় দীর্ঘস্থায়ী সংকোচনের শুরু হতে পারে। চন্দ্র নববর্ষের ছুটিতে প্রতি বছর মৌসুমি ওঠানামা থাকায় তথ্য বিশ্লেষণ জটিল হয়েছে, তবে আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দুর্বলতা স্পষ্ট।
চীনের আরেক উল্লেখযোগ্য বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা এক্সপেং জানিয়েছে, তাদের মোট সরবরাহ ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে। জানুয়ারিতে নিও, লি অটো ও এক্সপেং মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭৪,৮৬১টি গাড়ি। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ১ শতাংশ বেশি হলেও, ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর এই তিন কোম্পানির বিক্রিতে সবচেয়ে ধীর প্রবৃদ্ধি। লি অটো ২৭,৬৬৮টি গাড়ি সরবরাহ করেছে, যা প্রায় ৮ শতাংশ কম। এক্সপেং সরবরাহ করেছে মাত্র ২০,০১১টি গাড়ি, যা ২০২৫ সালে তাদের মাসিক গড় ৩৫,০০০টির অনেক নিচে। সম্প্রতি ২৭০,০০০টির বেশি জানুয়ারির বিক্রি নিয়ে বিওয়াইডির সঙ্গে ব্যবধান কমানো জিলির শেয়ারও পড়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পেরেছেন, খাতজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মন্দা থেকে কোনো নির্মাতাই মুক্ত নয়। বিওয়াইডির ব্যাটারিচালিত গাড়ির বিক্রি দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮৩,২৪৯টিতে নেমেছে। কোম্পানির মোট বিক্রির অর্ধেকের বেশি জুড়ে থাকা প্লাগ-ইন হাইব্রিডের বিক্রি কমেছে ২৮.৫ শতাংশ।
দামযুদ্ধ চরমে
মজুত গাড়ি কমাতে এবং শক্তিশালী প্রতিযোগীদের মোকাবিলায় বাজার অংশীদারত্ব ধরে রাখতে নেওয়া আগ্রাসী মূল্যনীতিই বিওয়াইডির সাম্প্রতিক বাজার-অস্থিরতার মূল কারণ। মে মাসের শেষ দিকে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওশান ও ডাইনেস্টি সিরিজসহ ২২টি বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড মডেলে সর্বোচ্চ ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ঘোষণা দেয়। এতে সিগাল হ্যাচব্যাকের প্রারম্ভিক দাম কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫৫,৮০০ ইউয়ান (প্রায় ৭,৭৬৫ ডলার), যা কোম্পানির আগে থেকেই সবচেয়ে সস্তা মডেলটির দামের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। সিল ০৭ ডিএম-আই মডেলে সবচেয়ে বেশি, ৫৩,০০০ ইউয়ান ছাড় দেওয়া হয়, অর্থাৎ দাম কমে ৩৪ শতাংশ।
এই ছাড় পেতে ক্রেতাদের পুরোনো গাড়ি বদলে দিতে হচ্ছে। এতে এমনিতেই রেকর্ড পরিমাণ মজুত নিয়ে হিমশিম খাওয়া ডিলারদের ওপর চাপ বেড়েছে। চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ডিলারদের কাছে মজুত গাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫ লাখে, যা ৫৭ দিনের বিক্রির সমান। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর এটাই সর্বোচ্চ। সিটির বিশ্লেষকদের হিসাবে, বিওয়াইডির সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ছাড়ের ঘোষণা ডিলারশিপে ক্রেতার যাতায়াত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িয়েছে। এতে লাভের মার্জিনে বড় আঘাত এলেও মূল্যছাড়ের কৌশল গাড়ি বিক্রিতে সফল হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, গাড়িশিল্প এখন “তলানিতে নামার প্রতিযোগিতায়” নেমেছে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে নির্মাতারা দাম কমাচ্ছে এবং স্মার্ট সহায়তাপ্রযুক্তির মতো উন্নত সুবিধা বিনা মূল্যে দিচ্ছে।
জুন প্রান্তিকে বিওয়াইডির মুনাফা ৩০ শতাংশ কমার খবরে আর্থিক চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটাই ছিল প্রথমবারের মতো আগের বছরের তুলনায় মুনাফা কমা। প্রচারণায় অর্থ ব্যয় এবং একই সঙ্গে বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগের কারণে বাজার অংশীদারত্ব ধরে রাখতে যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত কোম্পানির কৌশলটির স্থায়িত্ব নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে উঠেছেন। প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির মোট মুনাফার মার্জিন প্রায় ২০ শতাংশ থাকলেও মূল্যছাড় এবং উপকরণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এর ওপর চাপ বাড়ছে। বিওয়াইডি ২০২৫ সালের সরবরাহ লক্ষ্যমাত্রা ৫৫ লাখ থেকে কমিয়ে ৪৬ লাখে নামিয়েছে। এই কমানো লক্ষ্যও পূরণ করতে বছরের শেষ চার মাসে ১৭ লাখ গাড়ি সরবরাহ করতে হবে।
আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ
চীনের বর্তমান বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতের সঙ্গে ধসে পড়া আবাসন খাতের মিল দেখছেন শিল্পের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। সংকট নিয়ে তাঁদের কড়া সতর্কবার্তাও এসেছে। গ্রেট ওয়াল মোটরের চেয়ারম্যান ওয়েই জিয়ানজুন গাড়িশিল্পের সঙ্গে ঋণগ্রস্ত আবাসন নির্মাতা এভারগ্রান্ডের তুলনা করে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। চীনের আবাসন খাতের তারল্য সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল এভারগ্রান্ড।
সিনা ফাইন্যান্সকে মে মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়েই বলেন, “গাড়িশিল্পে এভারগ্রান্ডের মতো একটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই আছে, যদিও সেটি এখনও ধসে পড়েনি।”
নাম না করে কয়েকটি নির্মাতার বিরুদ্ধে মুনাফার বদলে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে পুঁজিবাজারের অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করার অভিযোগ আনেন তিনি। বাজার পরিস্থিতি বদলালে তাদের অর্থের প্রবাহ ভেঙে পড়বে বলেও সতর্ক করেন।
ওয়েইয়ের সতর্কবার্তায় আর্থিক পরিস্থিতির অস্বস্তিকর বাস্তবতা উঠে এসেছে। বিওয়াইডি বলছে, তাদের সম্পদের বিপরীতে ঋণের অনুপাত প্রায় ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ, যা সামাল দেওয়া সম্ভব এবং ফোর্ডের ৮৪ শতাংশ ও জেনারেল মোটরসের ৭৬ শতাংশের চেয়ে কম। তবে হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান জিএমটি রিসার্চ জানুয়ারিতে দাবি করেছে, বিওয়াইডির নিট ঋণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো ২৭৭০ কোটি ইউয়ান নয়, বরং ৩২৩ বিলিয়ন ইউয়ান হতে পারে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি কোম্পানির ডিলিংক সরবরাহ-শৃঙ্খল অর্থায়ন প্ল্যাটফর্মকে হিসাবের বাইরে থাকা দায়ের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সরবরাহকারীদের বিলম্বে পরিশোধ করা অর্থও রয়েছে, যা প্রকৃত তারল্যের চিত্রকে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী দেখাতে পারে। ২০২৪ সালে বিওয়াইডির মোট ঋণ ১০.৩ শতাংশ বেড়ে ৫৮৪ বিলিয়ন ইউয়ানে দাঁড়ায়। একই সময়ে মোট সম্পদ ১৫.৩ শতাংশ বেড়ে হয় ৭৮৩ বিলিয়ন ইউয়ান।
সরবরাহকারীদের ওপর চাপ এতটাই তীব্র হয়েছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। ১ জুন থেকে কার্যকর নতুন স্টেট কাউন্সিলের বিধিমালায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি সরবরাহকারীদের ৬০ দিনের মধ্যে পাওনা পরিশোধ করতে হবে। নিয়ম মেনে চলতে পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণের কথা বিওয়াইডি ১১ জুন জানিয়েছে। তবে শিল্প পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এসব দায় হিসাবের খাতায় অন্তর্ভুক্ত হলে আগামী কয়েক প্রান্তিকে গাড়ি নির্মাতাদের ঋণের অনুপাত বেড়ে দেখাতে পারে। টেকসই নয় এমন মূল্যছাড় চালু রাখতে কিছু নির্মাতা নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে আপস করছে বলে অভিযোগ করেছেন ওয়েই। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো শিল্পপণ্যের দাম ২২০,০০০ ইউয়ান থেকে কমিয়ে ১২০,০০০ ইউয়ান করা হলে তার মান কীভাবে অক্ষুণ্ন থাকতে পারে। বিওয়াইডির ব্র্যান্ড ও জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক লি ইউনফেই ওয়েইবোতে কোম্পানির পক্ষে সাফাই দিয়ে বলেন, বিওয়াইডির সুদবাহী ঋণ ও প্রদেয় বিল অনেক প্রতিযোগীর চেয়ে কম। এভারগ্রান্ডের সঙ্গে তুলনাকে তিনি “হাস্যকর” বলেও মন্তব্য করেন।
উপকরণ ব্যয় বৃদ্ধি
দামের চাপের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা ব্যয় বৃদ্ধির বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে। এতে প্রিমিয়াম মডেল তৈরির খরচ প্রায় ১,০০০ ডলার বা তারও বেশি বাড়তে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে ব্যবহৃত লিথিয়ামের দাম গত তিন মাসে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেমোরি চিপের সরবরাহ-সংকটে স্মার্ট গাড়ির যন্ত্রাংশের দাম অনেক বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উন্নত চালক-সহায়ক ব্যবস্থায়, যা পণ্যের স্বাতন্ত্র্য বাড়াতে চীনা নির্মাতারা এখন মানক সুবিধা হিসেবে দিতে শুরু করেছে। বাজারের হিসাব বলছে, কোনো কোনো প্রিমিয়াম মডেলের ক্ষেত্রে এসব অতিরিক্ত ব্যয় গাড়িপ্রতি প্রায় ১,০০০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।
বার্নস্টাইনের গবেষণায় বলা হয়েছে, এক্সপেং, লি অটো ও নিওর মতো কম মার্জিনের গণবাজারের ব্র্যান্ডগুলো এই ব্যয়বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। নিওর ঋণের অনুপাত ৮৭.৪৫ শতাংশ। এদিকে বাজারে অবস্থান তৈরি করতে নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা নগদ অর্থ ব্যয় করে চলেছে। বিওয়াইডি নিজস্ব ব্যাটারি এবং বহু সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় তৈরি করে, ফলে সরবরাহে আকস্মিক সংকটের প্রভাব কিছুটা কমে। তবু উপকরণ ব্যয় বাড়া ও বিক্রিমূল্য কমার যুগপৎ চাপে মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে, যা কোনো নির্মাতাই পুরোপুরি এড়াতে পারবে না।
অ্যাবারডিন ইনভেস্টমেন্টসের চীন-শেয়ার বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক জোয়ান চেং বলেন, “ব্যয় বৃদ্ধি এখন প্রধান ঝুঁকি।” তিনি বলেন, “প্রতিযোগিতা তীব্র থাকা অবস্থায় গাড়ির মূল নির্মাতারা এই ব্যয় ক্রেতাদের ওপর চাপাতে পারবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।”
বিদেশে সম্প্রসারণের গতি বেড়েছে
দেশের বাজারে বিপর্যয়ের মধ্যেও বিদেশে সম্প্রসারণ বিওয়াইডির জন্য বিরল এক আশার আলো। এপ্রিলে প্রথমবারের মতো ইউরোপে টেসলার চেয়ে বেশি গাড়ি বিক্রি করে ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করে কোম্পানিটি। তারা ৭,২৩১টি ব্যাটারিচালিত গাড়ি নিবন্ধন করায়, যেখানে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীটির আঞ্চলিক বিক্রি কমেছে। ইউরোপে বিওয়াইডির বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ১৬৯ শতাংশ বেড়েছে। এতে বিদেশে গাড়ি পাঠানোর ক্ষেত্রে টানা পঞ্চম মাসের রেকর্ড হয়েছে। জানুয়ারিতে বিওয়াইডি ১০০,৪৮২টি নতুন জ্বালানিচালিত গাড়ি রপ্তানি করে। ডিসেম্বরে পাঠানো ১৩৩,১৭২টির চেয়ে কম হলেও, দেশের বাজারে বিক্রি ধসে পড়ার মধ্যে এই রপ্তানি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। ২০২৬ সালে বিদেশে ১৩ লাখ গাড়ি পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে কোম্পানিটি। এতে ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত মিললেও, আগের ১৬ লাখ গাড়ির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তা কম।
আগামী কয়েক বছরে ইউরোপে কার্যক্রম সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোম্পানিটি। নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেলা লি জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইতালিকে অগ্রাধিকার বাজার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ইউরোপে বিক্রয়োত্তর সেবায় কোম্পানির অঙ্গীকার নিয়ে ব্লুমবার্গকে লি বলেন, “কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা এর পেছনে আমাদের সব সম্পদ নিয়োগ করি।”
হাঙ্গেরিতে উৎপাদনকেন্দ্রগুলো এ বছর চালু হওয়ার কথা। ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডের বর্তমান কারখানার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কে সংযোজনকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এভাবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করলে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরোপ করা ১৭ থেকে ৩৫.৩ শতাংশ শুল্ক এড়ানো সহজ হবে। তবে বাণিজ্য বাধার বিকল্প হিসেবে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে বেইজিং ও ব্রাসেলসের আলোচনা চলছে।
প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতেও উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে বিওয়াইডি। টেসলার ফুল সেলফ-ড্রাইভিং প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে—এমনটি প্রত্যাশা করা হচ্ছে ডিপসিকের আর১ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল গ্রহণের ক্ষেত্রে, যার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারে। তবে নতুন নকশা, উন্নত ব্যাটারি এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিডে বেশি দূরত্ব চলার সুবিধা দিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহ ফেরাতে কোম্পানিটি দেশের বাজারে কয়েকটি নতুন মডেল উন্মোচন ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পিছিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের প্রাধান্যের সময়ের পর থেকে বিওয়াইডির মডেলসম্ভারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ফলে জিলি ও লিপমোটরের মতো প্রতিযোগীরা নতুন নকশার গাড়ি দিয়ে ক্রেতা টানতে পেরেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ
খাতটির গতিপথ নিয়ে অস্বস্তির ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে বেইজিং। কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি “গাড়িশিল্পের ‘দামযুদ্ধের’ কোনো গন্তব্য নেই, ভবিষ্যৎও নেই” শিরোনামে কড়া সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। এতে সতর্ক করা হয়, বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলের মুনাফা কমিয়ে দেয় এবং শ্রমিকদের আয় হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করে। পত্রিকাটি সতর্ক করে বলে, “দীর্ঘমেয়াদে ‘তলানিতে নামার’ এই প্রতিযোগিতা টেকসই নয়।” অতিরিক্ত মূল্যছাড়ের সঙ্গে পণ্যের মানে আপস এবং বিক্রয়োত্তর সেবা কমে যাওয়ার সম্ভাবনার সরাসরি যোগও তুলে ধরা হয় সম্পাদকীয়তে। সেখানে বলা হয়, শিল্পে ২০২৪ সালে গড় নিট মুনাফার হার ৪.৩ শতাংশে নেমেছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৫ শতাংশ।
শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গাড়ি নির্মাতাদের বিশৃঙ্খল দামযুদ্ধ এড়িয়ে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। রাষ্ট্রের পরিকল্পনা সংস্থাও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা নিয়ে সতর্ক করেছে এবং বলেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করছে। বিওয়াইডির নেতৃত্বে দাম কমানোর উদ্যোগের veiled সমালোচনা করে চায়না অ্যাসোসিয়েশন অব অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স বলেছে, “একটি নির্দিষ্ট গাড়ি নির্মাতা বড় ধরনের মূল্যছাড় দেওয়ার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং অনেক কোম্পানি তা অনুসরণ করেছে। এতে নতুন করে ‘দামযুদ্ধের’ আতঙ্ক ছড়িয়েছে।” বিওয়াইডি এসব উদ্বেগকে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের পদক্ষেপকে ন্যায্য প্রতিযোগিতা হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, তাদের সুদবাহী ঋণ অনেক প্রতিযোগীর চেয়ে কম। সরকার গাড়িশিল্পে প্রায় ৩ কোটি মানুষকে নিয়োগ দেয়, যা নগরাঞ্চলের কর্মসংস্থানের দশ ভাগের এক ভাগেরও বেশি। এ কারণে শিল্পজুড়ে ধস ঠেকাতে কর্মকর্তাদের প্রবল আগ্রহ রয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- হংকংয়ে শেয়ারের দরপতনে মে মাস থেকে বিওয়াইডির বাজারমূল্য ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কমেছে। জিলি, নিও ও এক্সপেংসহ চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতের অন্য কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও পতন হয়েছে।
- জানুয়ারিতে বিওয়াইডির বিক্রি টানা পঞ্চম মাসের মতো কমেছে। এক দশকের বৈদ্যুতিক গাড়ি করছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং ৫ শতাংশ গাড়ি কেনার কর পুনর্বহালের পর দেশের বাজারে সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে ১০৯,৫৬৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
- ২২টি মডেলে সর্বোচ্চ ৩৪ শতাংশ মূল্যছাড় দিয়েছে কোম্পানিটি। এতে সিগাল হ্যাচব্যাকের দাম কমে প্রায় ৭,৭৬৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে ত্রৈমাসিক মুনাফা ৩০ শতাংশ কমায় মুনাফার মার্জিনে টেকসই নয় এমন চাপ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
- গ্রেট ওয়াল মোটরের চেয়ারম্যান ওয়েই জিয়ানজুন গাড়ি খাতে “এভারগ্রান্ডের মতো” আর্থিক সংকটের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি উচ্চ ঋণের অনুপাত, হিসাবের বাইরে থাকা সম্ভাব্য দায় এবং চরম মূল্যছাড়ের চাপে পণ্যের মানে আপসের কথা উল্লেখ করেছেন।
- কাঁচামালের ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। লিথিয়ামের দাম দ্বিগুণ হয়েছে এবং মেমোরি চিপের সংকটে কিছু প্রিমিয়াম মডেলের উৎপাদন খরচ আনুমানিক ১,০০০ ডলার বা তারও বেশি বাড়তে পারে।
- দেশীয় বাজারে সমস্যার মধ্যেও বিওয়াইডির রপ্তানি রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। এপ্রিলে ইউরোপে ৭,২৩১টি গাড়ি নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো টেসলাকে ছাড়িয়ে গেছে কোম্পানিটি; আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি ১৬৯ শতাংশ।
- চীনা নিয়ন্ত্রকেরা খাতটির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছেন। সরবরাহকারীদের ৬০ দিনের মধ্যে পাওনা পরিশোধের নিয়ম কার্যকর হয়েছে এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি না করার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।






