সর্বশেষ তথ্য: আরও ১ লাখ ৬৫ হাজার ব্যবহারকারী ক্ষতিগ্রস্ত
২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কুপাং নিশ্চিত করেছে, বিশাল তথ্য ফাঁসের ঘটনায় আরও ১ লাখ ৬৫ হাজার গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে। এই ঘটনা ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজ ও প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে আলোড়ন তুলেছে। সিয়াটলভিত্তিক ই-কমার্স জায়ান্টটি, যাকে প্রায়ই "দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যামাজন" বলা হয়, জানিয়েছে, নতুন শনাক্ত হওয়া এই ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আগে প্রকাশিত ৩ কোটি ৩৭ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্যও ফাঁস হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোরিয়ার ইতিহাসে বৃহত্তম করপোরেট তথ্য ফাঁস।
সূচিপত্র
- সর্বশেষ তথ্য: আরও ১ লাখ ৬৫ হাজার ব্যবহারকারী ক্ষতিগ্রস্ত
- করপোরেট কেলেঙ্কারি থেকে কূটনৈতিক উত্তেজনা
- মাসের পর মাস অজানা ছিল তথ্য ফাঁস
- ওয়াশিংটনের চাপ সৃষ্টির অভিযান
- বিনিয়োগকারীরা বাণিজ্য চুক্তির আশ্রয় নিলেন
- সিউলের স্পষ্ট অবস্থান
- নিয়ন্ত্রক নজরদারি আরও কঠোর
- ফেডারেল রিজার্ভের যোগসূত্র
- দেশীয় প্রতিক্রিয়া ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ
- মূল বিষয়গুলো
কোম্পানিটি জোর দিয়ে বলেছে, ফাঁস হওয়া তথ্যে নাম, ফোন নম্বর ও ঠিকানার মতো যোগাযোগের বিবরণ থাকলেও পেমেন্টের তথ্য ও লগইন-সংক্রান্ত তথ্য ছিল না। কুপাং জানিয়েছে, সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের অবহিত করেছে। তবে এই তথ্য ফাঁসের পরিণতি এখন আর শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সাইবার নিরাপত্তার ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নেই; তা পূর্ণমাত্রার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধে রূপ নিয়েছে।
করপোরেট কেলেঙ্কারি থেকে কূটনৈতিক উত্তেজনা
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে শুরু হওয়া এই ঘটনা দ্রুত সিউল ও ওয়াশিংটনের সাত দশকের জোটের জন্য হুমকিতে রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সুং-লাক ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত কিয়ংহিয়াং দৈনিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কুপাং-সংক্রান্ত বিষয়টি বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একাধিক ভিত্তিকে সক্রিয়ভাবে দুর্বল করছে।
সংবেদনশীল এক সময়ে এই বিতর্ক চুক্তিভিত্তিক মিত্রদের মধ্যে বিরল টানাপোড়েন তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি ও অন্যান্য আমদানিপণ্যের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে প্রভাবিত করা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক বিরোধের পাশাপাশি উই স্পষ্টভাবে এই শুল্ক বৃদ্ধির সঙ্গে কুপাং-বিতর্কের যোগসূত্র টেনেছেন। শুল্ক আরোপের হুমকিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের প্রশাসন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। বিদেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির ওপর নিয়ন্ত্রক নজরদারি কমানোর জন্য ওয়াশিংটনের চাপের মুখে দেশীয়ভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে সিউলকে।
মাসের পর মাস অজানা ছিল তথ্য ফাঁস
এই সংকটের সূত্রপাত ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যখন কুপাং জানায়, ৩ কোটি ৩৭ লাখ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে; যা দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। পরে কোম্পানিটি প্রকাশ করে, পাঁচ মাস ধরে তথ্য ফাঁসের ঘটনা শনাক্তই করা যায়নি। তথ্য ফাঁসের ব্যাপকতা এবং দেরিতে ব্যবস্থা নেওয়া, দুটো বিষয়ই জনরোষ আরও বাড়ায়।
পরে তদন্তকারীরা চীনে অবস্থানরত কুপাংয়ের এক সাবেক কর্মীকে এ ঘটনার জন্য দায়ী হিসেবে শনাক্ত করেন। অভিযোগ, ওই ব্যক্তি গ্রাহক-তথ্যের ডেটাবেসে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করে নাম, ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা ও ইমেইল ঠিকানায় হাত পান। কুপাংয়ের দাবি, ওই ব্যক্তি প্রায় ৩ হাজার রেকর্ডই কেবল পাঠিয়েছেন বা নিজের কাছে রেখেছেন এবং কোনো তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে দেননি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ তথ্য ফাঁসের পরিধি হিসেবে পুরো ৩ কোটি ৩৭ লাখের সংখ্যাই উল্লেখ করেছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত ব্যাপ্তি নিয়ে এতে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক ও তীব্র। জাতীয় পরিষদ একাধিক কমিটির মাধ্যমে তদন্ত শুরু করেছে, যেখানে তথ্য সুরক্ষার ব্যর্থতার পাশাপাশি কুপাংয়ের করপোরেট পরিচালনা ও শ্রমনীতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান কিম বম-সক, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, সংসদীয় শুনানিতে তলব করা হলেও হাজির হননি; তার বদলে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হ্যারল্ড রজার্সকে পাঠান। এতে আইনপ্রণেতারা কোম্পানিটির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অসম্মান করার অভিযোগ তোলেন। কুপাংয়ের রেকর্ড ১.৬৯ ট্রিলিয়ন ওন (১.১৭ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতিপূরণ প্যাকেজকে লোকদেখানো পদক্ষেপ বলে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে ক্ষোভের গভীরতা স্পষ্ট হয়। অনেক কোরীয়ের চোখে, বিপুল মুনাফা নিয়ে স্থানীয় গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট অবহেলার কারণেই এই ক্ষোভ।
ওয়াশিংটনের চাপ সৃষ্টির অভিযান
সিউলে নিয়ন্ত্রক চাপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনে ১ ট্রিলিয়ন ওন (৭৭০ মিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত জরিমানার সম্ভাবনার মুখে কুপাং ওয়াশিংটনে জোরালো প্রভাব বিস্তারের অভিযান শুরু করেছে। এতে বিরোধের চরিত্রই মৌলিকভাবে বদলে গেছে। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটি নির্বাহী বিভাগ ও কংগ্রেসকে লক্ষ্য করে লবিংয়ে ১০.৭৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তদন্তকে একটি মার্কিন কোম্পানির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে তুলে ধরাই এ প্রচেষ্টার লক্ষ্য।
লবিং অভিযানে শক্তিশালী মিত্র জুটেছে। ২৩ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সককে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে শাস্তি না দিতে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেন। দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা এড়াতে বিরোধটির ন্যায্য সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একটি করপোরেট নিয়ন্ত্রক বিষয় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যাওয়া অসাধারণ ঘটনা।
কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা ক্রমেই জোরালো ভাষায় কুপাংয়ের অভিযোগের প্রতিধ্বনি করেছেন। প্রতিনিধি অ্যাড্রিয়ান স্মিথ, প্রতিনিধি পরিষদের ওয়েজ অ্যান্ড মিন্স কমিটির বাণিজ্য উপকমিটির চেয়ার, ১৩ জানুয়ারি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া "মার্কিন কোম্পানিগুলোকে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে" এবং কুপাংকে এর প্রধান উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রতিনিধি স্কট ফিটজেরাল্ড কোরীয় সরকারের পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানিমূলক তদন্ত বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটির রিপাবলিকান সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, "কুপাংয়ের মতো মার্কিন কোম্পানিকে অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করলে এমনটাই হয়"। তারা সরাসরি বাণিজ্যিক পাল্টা ব্যবস্থার সঙ্গে তথ্য ফাঁসের তদন্তের যোগসূত্র টানেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমার পর্যবেক্ষণ হলো, কোরিয়া মার্কিন কোম্পানিগুলোকে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে... বৈষম্যমূলক নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের মাধ্যমে কুপাংকে লক্ষ্যবস্তু করাকে এর একটি উদাহরণ বলা যায়।
সিউলে মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জেমস হেলার দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি নিয়ে আরও চাপ দেন। ডিজিটাল সেবায় মার্কিন কোম্পানিগুলো যেন বৈষম্য বা অপ্রয়োজনীয় বাধার মুখে না পড়ে, এ কথা উল্লেখ করে যৌথ তথ্যপত্রের প্রতিশ্রুতি মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি। সরকারি পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে সিউলের অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দুই রাজধানী থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করা হলেও কুপাং তদন্তের সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই শুল্ক বাড়ানো হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা বাণিজ্য চুক্তির আশ্রয় নিলেন
যুক্তরাষ্ট্রের দুই বড় বিনিয়োগকারী গ্রিনওকস ক্যাপিটাল ও অল্টিমিটার ক্যাপিটাল যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (কোরাস) আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে সালিশি কার্যক্রম শুরুর অভিপ্রায় জানিয়ে নোটিশ দাখিল করলে বিরোধটি নতুন আইনি পর্যায়ে প্রবেশ করে। কুপাংয়ে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব থাকা এই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শুধু গ্রিনওকসের শেয়ারই ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তাদের অভিযোগ, সিউল ন্যায্য আচরণের মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে এবং নাভার ও চীনা কোম্পানির মতো দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুবিধা দিতে একটি মার্কিন কোম্পানির প্রতি বৈষম্য করেছে।
সালিশির আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, কোরীয় কর্তৃপক্ষ বারবার অভিযান চালিয়েছে, চুক্তি আটকে দিয়েছে এবং কুপাংয়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছে। সফল একটি মার্কিন কোম্পানির প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নির্মূলের চেষ্টার অজুহাত হিসেবে তদন্তকে তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনে সিউলের পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলা বা রাশিয়ার মতো সর্বাত্মকবাদী প্রতিপক্ষের আচরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমান ক্ষতির পরিমাণ শত শত মিলিয়ন ডলার এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা বিরোধটিকে স্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট লি ও ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ও চীনপন্থী অবস্থান নিয়েছে। তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন বাহিনী নিয়ে লির অতীতের বিতর্কিত মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেছেন। বিনিয়োগকারীদের দাবি, নাভারের সাবেক নির্বাহীদের সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভায় নিয়োগের ফলে কুপাংয়ের বাজার অবস্থান ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আক্রমণাত্মক কৌশল থেকে নিজেদের দূরে রাখতে কুপাং চেষ্টা করেছে। কোম্পানিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সালিশির আবেদনটি কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং তারা সরকারের সব তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। তবে কোম্পানিটি স্বীকার করেছে, সরকারের অবিরাম প্রচারণার মুখে চেয়ারম্যান কিম ক্ষমা চেয়েছেন। এতে বোঝা যায়, নির্বাহী পর্যায়ে চাপের কারণে ছাড় দিতে হয়েছে।
সিউলের স্পষ্ট অবস্থান
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা তাদের নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের পক্ষে সমন্বিতভাবে যুক্তি তুলে ধরে বলেছেন, এই তদন্ত অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ নয়, বরং নিয়মিত আইন প্রয়োগের অংশ। ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সক বৈষম্যের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বলেন, কুপাংয়ের প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য করা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্ক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে আলোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-গু একই বক্তব্য জোরালো করেন। তিনি বলেন, তদন্তটি বৈষম্যহীন ও স্বচ্ছভাবে এগোচ্ছে; তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটানো যেকোনো কোরীয় কোম্পানির ক্ষেত্রেও তারা একইভাবে ব্যবস্থা নিতেন। ইয়ো জোর দিয়ে বলেন, লাখো নাগরিককে প্রভাবিত করা গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পাশাপাশি দেরিতে তথ্য জানানো এবং জাতীয় নেতাদের উদ্দেশে যাচাইবিহীন দাবি তোলার বিষয়টিও তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোম্পানিটির জাতীয়তা যা-ই হোক, এসব কারণে তদন্ত শুরু হতো।
সরকার বর্তমানে বৈষম্যহীন ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত চালাচ্ছে। তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটানো যেকোনো কোরীয় কোম্পানির বিরুদ্ধেও আমরা একইভাবে ব্যবস্থা নিতাম; কোম্পানিটি মার্কিন বলে এই তদন্ত হচ্ছে না।
২৮ জানুয়ারি সিউলের এক সেমিনারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন কুপাং মামলার সঙ্গে ট্রাম্পের শুল্ক বৃদ্ধির যোগসূত্র নিয়ে জল্পনা নাকচ করে বলেন, বাণিজ্যিক পদক্ষেপকে তথ্য ফাঁসের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করা শুধু ভুলই নয়, এতে অযথা আমাদের নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হবে। দেশের ভেতরে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তথ্য ফাঁসে অবহেলার জন্য কঠোর শাস্তির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, করপোরেট জবাবদিহির ক্ষেত্রে এই ঘটনা সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। এতে বোঝা যায়, নিয়ন্ত্রক নজরদারি থেকে এখনই সরে আসার কোনো ইঙ্গিত নেই।
নিয়ন্ত্রক নজরদারি আরও কঠোর
তথ্য সুরক্ষার তদন্তের বাইরে দক্ষিণ কোরিয়ার ফেয়ার ট্রেড কমিশন কুপাংয়ের ব্যবসায়িক চর্চার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। তিনটি বিভাগে ৩০ জনের বেশি তদন্তকারী মোতায়েন করে তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানো তদন্ত চালানো হচ্ছে। কুপাং অংশীদার বিক্রেতাদের জনপ্রিয় পণ্য নিজেদের ব্র্যান্ডের পণ্যে রূপান্তর করতে চাপ দিয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের পণ্যের বদলে নিজেদের পণ্যকে অগ্রাধিকার দিতে অ্যালগরিদমে কারসাজি করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কমিশন।
কোরীয় একচেটিয়া-বিরোধী আইনের আওতায় চেয়ারম্যান কিমকে কোম্পানির "একক ব্যক্তি" হিসেবে মনোনীত করা উচিত কি না, তাও পর্যালোচনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। এটি নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি, যার ফলে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। এ ছাড়া ডেলিভারি ও স্ট্রিমিং সেবা একত্র করা কুপাংয়ের ওয়াও মেম্বারশিপ কর্মসূচি বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানের অপব্যবহার করছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে কমিশন। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আয়ের ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, আর্থিক সেবা কমিশন ও জাতীয় পুলিশ সংস্থাসহ সাতটি সংস্থাকে নিয়ে বিরল আন্তঃসরকারি টাস্কফোর্স গঠন থেকে বোঝা যায়, সিউল এই ঘটনাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। তথ্য সুরক্ষা আইনে সম্ভাব্য ১ ট্রিলিয়ন ওন জরিমানা কোরিয়ার ইতিহাসে এ ধরনের বৃহত্তম শাস্তি হবে। এই সম্ভাবনাই কুপাংয়ের মার্কিন বিনিয়োগকারীদের নজিরবিহীন সালিশি পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছে।
ফেডারেল রিজার্ভের যোগসূত্র
এই বিতর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব জড়িয়ে পড়েছেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। ফেডারেল রিজার্ভের নেতৃত্ব দিতে প্রেসিডেন্টের মনোনীত কেভিন ওয়ার্শ ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে কুপাংয়ের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। এ পদে তিনি ১ মিলিয়ন ডলারের বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছেন, যার মধ্যে ২০২২ সাল থেকে বছরে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার রয়েছে।
ফেডারেল রিজার্ভ আইনে বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্যদের সম্পূর্ণ সময় বোর্ডের কাজে নিয়োজিত থাকার শর্ত রয়েছে, যা কার্যত বাইরের কোনো চাকরি নিষিদ্ধ করে। নতুন সদস্যদের নিয়ম মেনে চলার জন্য ছয় মাস সময় থাকলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধের কেন্দ্রে থাকা একটি কোম্পানির সঙ্গে ওয়ার্শের বড় অঙ্কের আর্থিক সম্পর্ক স্বার্থের সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফেডারেল রিজার্ভের নিয়মে সদস্যদের ব্যাংক বা ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে পদ ধারণও নিষিদ্ধ, যদিও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো প্রথাগত ব্যাংকিং থেকে আলাদা, নিয়ন্ত্রণের ধূসর এলাকায় রয়েছে।
নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার আগে ওয়ার্শকে কুপাংয়ের শেয়ার বিক্রি করতে হবে কি না, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি। পরিচালনা পর্ষদের পদ নিয়ে তার পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হলেও ওয়ার্শ সাড়া দেননি। কোম্পানিটি সিউলের ওপর চাপ দিতে মার্কিন সরকারের কাছে লবিং চালানোর সময় কুপাংয়ের একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির শীর্ষ পদে মনোনীত করা হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কূটনীতি এক অস্বাভাবিকভাবে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে।
দেশীয় প্রতিক্রিয়া ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ
দক্ষিণ কোরিয়ায় নাগরিক গোষ্ঠীগুলো দেশের আইনি প্রক্রিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপ বলে তারা যা মনে করছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কোরিয়ান আমেরিকান পাবলিক অ্যাকশন কমিটি এক বিবৃতিতে কুপাংকে রাজনৈতিক লবিং ও মার্কিন কংগ্রেসের শুনানি ব্যবহার করে সত্য গোপন না করার আহ্বান জানিয়েছে। নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ তৈরি না করারও সতর্কতা দিয়েছে সংগঠনটি।
কমিটি তথ্য ফাঁসের ভুক্তভোগীদের যথাযথ ও দায়িত্বশীল ক্ষতিপূরণ এবং তথ্য ফাঁসের পূর্ণ পরিধি স্বচ্ছভাবে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের তথ্য ফাঁসের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কুপাংয়ের ১ বিলিয়ন ডলারের ভাউচার প্রস্তাবকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করে ব্যাপক জনমত; এই দাবির প্রতিফলন রয়েছে কমিটির বক্তব্যে। ভোক্তা অধিকারকর্মীরা ক্ষতিপূরণকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পদ্ধতিগত ব্যর্থতার প্রকৃত প্রতিকার না বলে সাময়িক জনসংযোগমূলক কৌশল হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
মার্কিন ও চীনা জায়ান্টদের আধিপত্যে থাকা প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদের যুগে এই বিরোধ দক্ষিণ কোরিয়ার ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য আলোচনার বদলে দেশের আইন মেনেই তদন্ত চলছে—সিউলের এই অবস্থান নিয়ন্ত্রক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরে। বিদেশে কার্যরত যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য অগ্রাধিকারমূলক আচরণ প্রত্যাশা করে ওয়াশিংটন; সিউলের অবস্থানের সঙ্গে তার সংঘাত রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় দ্বিপক্ষীয় সংকট সামলাতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট লি যেভাবে এগোবেন, তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, ভোক্তা অধিকার এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জাতীয় এখতিয়ারের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে ভারসাম্য রাখবে, সে বিষয়ে নজির তৈরি করতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- কুপাং ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নিশ্চিত করেছে, তথ্য ফাঁসে আরও ১ লাখ ৬৫ হাজার ব্যবহারকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এতে মোট আক্রান্ত গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩৯ লাখে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
- পাঁচ মাস ধরে শনাক্ত না হওয়া এই তথ্য ফাঁসের জন্য চীনে অবস্থানরত কুপাংয়ের এক সাবেক কর্মীকে দায়ী করা হয়েছে। তিনি নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা ও ইমেইল ঠিকানায় প্রবেশ করেছিলেন বলে অভিযোগ।
- তদন্তটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধে রূপ নিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স ও কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা সিউলকে নিয়ন্ত্রক নজরদারি শিথিল করার চাপ দিচ্ছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বৈষম্যের অভিযোগ নাকচ করে তদন্তকে নিয়মিত আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে সমর্থন করছেন।
- যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী গ্রিনওকস ক্যাপিটাল ও অল্টিমিটার ক্যাপিটাল কোরাস মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সালিশি দাবি দাখিল করেছে। তাদের অভিযোগ, কোম্পানিটির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে এবং তাদের কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এর সঙ্গে কুপাং-বিরোধের যোগসূত্র টেনেছেন, যদিও দুই সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে এই যোগসূত্র অস্বীকার করেছে।
- ফেডারেল রিজার্ভের মনোনীত প্রধান কেভিন ওয়ার্শ ২০১৯ সাল থেকে কুপাংয়ের পরিচালনা পর্ষদে থেকে ১ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছেন। হস্তক্ষেপের জন্য কোম্পানিটি ওয়াশিংটনে লবিং চালানোয় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- তথ্য ফাঁস তদন্তে দক্ষিণ কোরিয়া সাতটি সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করেছে। জরিমানা ১ ট্রিলিয়ন ওন (৭৭০ মিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত হতে পারে, যা কোরিয়ার ইতিহাসে তথ্য সুরক্ষা আইনে সবচেয়ে বড় জরিমানা হবে।






