দাম কমলে বিক্রির বদলে স্বর্ণ কিনতে ছুটছেন ভিয়েতনামিরা
২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি, শনিবার সকালে ভিয়েতনাজুড়ে স্বর্ণের দোকানগুলোর বাইরে দেখা গেল এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। বিশ্ববাজারে মূল্যবান ধাতুর দাম কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুই দিনের পতনের মুখে পড়ে। দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় ১০ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেলেও মানুষ আতঙ্কে নিজেদের সঞ্চিত ধাতু বিক্রি করেনি। বরং আরও কিনতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়েছে। বাজারের স্বাভাবিক আচরণের এই বিপরীত প্রবণতা—যেখানে বড় ধরনের দর সংশোধনে সাধারণত বিক্রির চাপ বাড়ে—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
- দাম কমলে বিক্রির বদলে স্বর্ণ কিনতে ছুটছেন ভিয়েতনামিরা
- সকাল গড়াতেই স্বর্ণের দোকানে মজুত শেষ
- দাম কমার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা
- এশিয়াজুড়ে স্বর্ণ কেনার বৃহত্তর ঢেউয়ের অংশ
- ভিয়েতনামের স্বর্ণের প্রতি আসক্তির পেছনে অর্থনৈতিক কারণ
- তামার বাজারে ছড়িয়ে পড়া উন্মাদনা: শিল্পধাতুও যখন মূল্যবান
- রুপার অস্থিরতা ও দ্বৈত ভূমিকা
- নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কবার্তা ও বিচক্ষণ বিনিয়োগ
- সারকথা
এর আগের ৪৮ ঘণ্টায় দেশের বাজারে প্রতি তােলে স্বর্ণের দাম প্রায় ২ কোটি ভিয়েতনামি ডং (৭৭১ মার্কিন ডলার) কমে সাম্প্রতিক উচ্চ অবস্থান থেকে নেমে আসে। রুপার দর আরও নাটকীয়ভাবে কমে, প্রতি কেজিতে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ ডং; সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ দরের তুলনায় পতন প্রায় ৩০ শতাংশ। তবু হ্যানয় ও হো চি মিন সিটির বড় বিক্রেতাদের কাছে কেনার চাহিদা বিক্রির চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ফলে পণ্যের সংকট দেখা দেয় এবং দোকানগুলো ক্রেতাদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
সকাল গড়াতেই স্বর্ণের দোকানে মজুত শেষ
হ্যানয়ে ভোর থেকেই কেনার হিড়িক শুরু হয়। ট্রান ন্যান তোং স্ট্রিটে ফু কুইয়ের শাখা ক্রেতা নেওয়া বন্ধ করে জানায়, সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে তাদের স্বর্ণের আংটি ও রুপার বারের সব মজুত শেষ। দোকান খোলার মাত্র এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই এমনটা ঘটে। রাস্তাজুড়ে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষারত ক্রেতাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া কর্মীদের আর কিছু করার ছিল না।
সারিতে অপেক্ষারত ক্রেতাদের এক দোকানকর্মী বলেন, “দয়া করে কাল আসুন।” তাঁদের অনেকেই খালি হাতে ফিরে যান।
কাছেই বাও তিন মিন চাউ সকাল ৯টা ২০ মিনিটের মধ্যে ১০০টিরও বেশি সিরিয়াল নম্বর দিয়েছিল। কর্মীরা প্রতি ক্রেতাকে সর্বোচ্চ এক তােলা সাধারণ স্বর্ণের আংটি কেনার সীমা বেঁধে দেন। রাজধানীর বাও তিন মান হাইসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত বিক্রেতার দোকানেও একই দৃশ্য দেখা যায়। হো চি মিন সিটিতে বুই হিউ নিয়া স্ট্রিটের মি হংয়ের দোকানের সামনে সকাল ৭টা থেকেই সারি তৈরি হয়। নিরাপত্তারক্ষীর ভাষ্য, দোকান খোলার সময় সেখানে অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা ছিল কয়েক ডজন। তিন ঘণ্টার মধ্যে সাধারণ স্বর্ণের আংটির মজুত শেষ হয়ে যায় এবং কেনার সীমা কমিয়ে জনপ্রতি এক মাচে করা হয়।
দক্ষিণের মহানগরীতে ফু কুইয়ের শাখায় ক্রেতারা বারবার রুপার বার ও বাটের খোঁজ নেন। তাঁদের জানানো হয়, কেনার জন্য কেবল কর্মদিবসে নিবন্ধন করা যাবে। দেশের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ ব্যবসায়ী সাইগন জুয়েলারি কোম্পানি শনিবার সকালে তাদের শাখাগুলো বন্ধ রাখে; চাহিদার এই ঢেউ সামাল দেওয়ার মতো পণ্য তাদের ছিল না।
দাম কমার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা
ভিড়ের মধ্যে ছিলেন অভিজ্ঞ সঞ্চয়কারী এবং প্রথমবারের মতো কেনা ক্রেতা—যাঁরা এটিকে ক্ষণস্থায়ী সুযোগ বলে মনে করেছেন। ৩৮ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্সার হোয়াং আগের লেনদেনের দিন বিশ্ববাজারে মূল্যবান ধাতুর দরপতন নজরে রাখার পর সকাল ৭টায় স্বর্ণের দোকানে পৌঁছান। কয়েক দিন আগেই তিনি প্রতি তােলা ১৭ কোটি ডংয়ের বেশি দামে স্বর্ণ কিনেছিলেন। তবু হঠাৎ দাম কমায় তিনি আরও কেনার সিদ্ধান্ত নেন।
সারিতে অপেক্ষা করতে করতে তিনি বলেন, “দাম আবার বেড়ে যেতে পারে, তখন আর কিনতে পারব না—এই চিন্তা হচ্ছে। তাই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে আরও কিনছি, কয়েকজন বন্ধুর হয়েও কিনছি।”
সব ক্রেতার দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য এমন ইতিবাচক ছিল না। প্রায় ৬০ বছর বয়সী নাগা ২০২৫ সালের মাঝামাঝি অবসরে যাওয়ার পর স্বর্ণ জমাতে শুরু করেন এবং কয়েক মাচের স্বর্ণ কিনেছিলেন। সকালে প্রতি তােলায় প্রায় ১ কোটি ডং দরপতনে তাঁর মধ্যে উচ্ছ্বাসের বদলে উদ্বেগ তৈরি হয়।
বিক্রি শেষ করার সময় তিনি বলেন, “আজ সকালে ছেলে বলল, দাম প্রায় ১ কোটি ডং কমেছে। অস্বস্তি লাগছিল, তাই বিক্রি করে অন্য কাজে টাকা লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
এই বিপরীত প্রতিক্রিয়াগুলো ভিয়েতনামের স্বর্ণবাজারে ভয় ও সুযোগের টানাপোড়েন তুলে ধরে। কেউ দর সংশোধনকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ হিসেবে দেখছেন, অন্যরা দেখছেন সতর্কসংকেত হিসেবে।
এশিয়াজুড়ে স্বর্ণ কেনার বৃহত্তর ঢেউয়ের অংশ
ভিয়েতনামের এই কেনাকাটার হিড়িক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সিঙ্গাপুর থেকে সিডনি পর্যন্ত খুচরা বিনিয়োগকারীরা ভোরের আগে থেকেই মূল্যবান ধাতুর বিক্রেতাদের বাইরে সারি দিচ্ছেন। সিঙ্গাপুরে বুলিয়নস্টারের ভাইরাল ভিডিওতে দোকান খোলার আগেই ক্রেতাদের সারি দেখা গেছে। সিডনিতে এবিসি বুলিয়নের বাইরে ক্রেতারা দুই ঘণ্টারও বেশি অপেক্ষার কথা জানিয়েছেন; তাঁদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি থেকে শুরু করে বিশের কোঠার তরুণ—সব বয়সের মানুষ ছিলেন।
আঞ্চলিক এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ। সিঙ্গাপুরভিত্তিক করপোরেট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এয়ারগাইড ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক মাইকেল ল্যাংফোর্ড এই সারিগুলোর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন।
ল্যাংফোর্ড বলেন, “তাঁরা স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছেন। জীবনে হাতে বেশি টাকা না থাকলে, কেনাবেচা করা সব পণ্যের দাম শেষ পর্যন্ত মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হলে আর আপনার স্থানীয় মুদ্রার দর কমতে থাকলে—সেটা স্বস্তিকর লাগে না। একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন—দুই দিক থেকেই চাপ আসছে।”
বাজারের কিছু অভিজ্ঞ ব্যক্তি খুচরা ক্রেতাদের এই সারিকে বিপরীতমুখী বাজার-সংকেত হিসেবে দেখেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভৌত স্বর্ণ কেনার প্রবণতা যখন তুঙ্গে ওঠে, তখন প্রায়ই সম্পদের দর সামষ্টিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি থাকে। সম্প্রতি স্বর্ণের মোট বাজারমূল্য ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমান দর সংশোধনের আগে প্রতি আউন্সের দাম ৪ হাজার ৩০০ ডলারের বেশি উঠে সর্বকালের রেকর্ড গড়েছিল। ট্রেডার মেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, “পিটার শিফ অসহনীয়তার চরম পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছেন, আর মানুষ ভৌত স্বর্ণ কিনতে সারি দিচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, সর্বোচ্চ দর খুব কাছেই।”
ভিয়েতনামের স্বর্ণের প্রতি আসক্তির পেছনে অর্থনৈতিক কারণ
স্বর্ণ জমাতে ভিয়েতনামের বিশেষ আগ্রহের পেছনে রয়েছে দেশটির নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক আগে জানিয়েছে, দেশের বাজারে স্বর্ণের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনে আংশিকভাবে জল্পনামূলক কেনাকাটা ও মজুতদারি দায়ী; বিকল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্র দুর্বল হওয়ায় পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। অতীতের ঋণখেলাপির ঘটনার পর করপোরেট বন্ড এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে, অনেক বিনিয়োগকারীর নাগালের বাইরে সম্পত্তির দাম এবং ব্যাংকে আমানতের সুদের হার ঐতিহাসিকভাবে নিচু।
এর ফলে সুযোগ হারানোর ভয় এমন এক প্রতিক্রিয়াচক্র তৈরি করেছে, যেখানে দাম বাড়লে আরও ক্রেতা আকৃষ্ট হচ্ছেন, যা আবার দাম আরও বাড়াচ্ছে। হো চি মিন সিটি অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অনুষদের আর্থিক বাজার বিভাগের প্রধান নুয়েন হিউ হুয়ান বলেন, মাসের শুরুতে প্রতি তােলা প্রায় ১০ কোটি ৩০ লাখ ডং দরে স্বর্ণ বিক্রি করা অনেক বিনিয়োগকারী দাম বেড়ে গেলে দ্রুত আবার বাজারে ফিরেছেন। এতে চাহিদার স্বয়ং-শক্তিবর্ধক চক্র তৈরি হয়েছে।
কখনো কখনো দেশের বাজার ও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ব্যবধান প্রতি তােলায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডং ছাড়িয়েছে। স্থানীয় স্বর্ণবাজারে নগদ লেনদেনের সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় তীব্র হওয়া জল্পনামূলক মানসিকতা—দুটিই এই অস্বাভাবিক বড় ব্যবধানের প্রতিফলন। এর অর্থ, ভিয়েতনামের বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক তাৎক্ষণিক দরের চেয়ে অনেক বেশি দাম দেন, ফলে তাঁদের ঝুঁকিও বাড়ে।
তামার বাজারে ছড়িয়ে পড়া উন্মাদনা: শিল্পধাতুও যখন মূল্যবান
স্বর্ণ ও রুপার দামে নাটকীয় উত্থানের জেরে তৈরি জল্পনামূলক উন্মাদনা অপ্রত্যাশিত ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। মূল্যবান ধাতুর দর বাড়ার পর অনেক ভিয়েতনামি বিনিয়োগকারী তামা কিনতে শুরু করেন—অনেকে কয়েক শ কেজি করে—একই রকম দরবৃদ্ধির আশায়। বিশ্ববাজারে তামার দাম প্রতি কেজি প্রায় ১৩ ডলারের কাছাকাছি থাকলেও ভিয়েতনামে খোদাই করা ফেং শুই তামার বারের খুচরা দাম এর দ্বিগুণ।
নিন বিন প্রদেশের বাসিন্দা হোয়া ১০ কোটি ডং (৩ হাজার ৮৫০ মার্কিন ডলার) দিয়ে ২০০ কেজি তামার বার কেনেন এবং হ্যানয়ের একটি দোকান থেকে পিকআপ ট্রাকে তুলে নেন। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “স্বর্ণ-রুপা এখন খুব দামি, তাই সেগুলোর বদলে তামার বার মজুত করার কথা অনলাইন গ্রুপগুলোতে দেখে আমিও চেষ্টা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সবচেয়ে খারাপ হলে, এগুলো দিয়ে পূর্বপুরুষের পূজার সামগ্রী বানাব।”
হ্যানয়ের একটি কারুশিল্প কর্মশালার মালিক দিন লাম তোই জানান, পণ্যটি বাজারে ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর এক টন তামার বার বিক্রি হয়ে গেছে। এই প্রবণতা করপোরেট উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। সম্পত্তি ব্যবসায়ী দিন ডাক নুয়েন ঐতিহ্যবাহী মদ বা মিষ্টির বদলে কর্মীদের চন্দ্র নববর্ষের উপহার হিসেবে ৬০ কেজি তামার বার অর্ডার দিয়েছেন।
তবে তামার ব্যবসায় এমন কিছু ঝুঁকি আছে, যা মূল্যবান ধাতুর ক্ষেত্রে নেই। পণ্যবিনিময় কেন্দ্রের বিশ্লেষক লে বিচ নগক সতর্ক করে বলেন, বাজারের মৌলিক বিষয়গুলো না বুঝেই অনেকে সুযোগ হারানোর ভয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
নগক বলেন, “স্বর্ণ ও রুপা মুদ্রার মতোই সহজে কেনাবেচা করা যায় এবং এগুলোর সরবরাহ সীমিত। অন্যদিকে তামা সহজলভ্য শিল্পধাতু, যার সরবরাহ প্রচুর। ভিয়েতনামের আবহাওয়ায় তামা সহজেই জারিত হয়; অল্প সময়েই ক্ষয় ধরে, রং মলিন হয় এবং এর মূল্য অনেক কমে যায়।”
হুং ইয়েন প্রদেশের ৪০ বছর বয়সী স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়ী হুই হোয়াং এই শিক্ষা কঠিনভাবে পেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা দেখে ১০০ কেজি তামার বিলেটের জন্য ৩ কোটি ৬০ লাখ ডং দেওয়ার পর পুনরায় বিক্রি করতে গিয়ে কোনো ক্রেতা পাননি।
মূল বিক্রেতার কাছে ২০ লাখ ডং লোকসানে বিক্রি করার পর তিনি বলেন, “বিক্রেতা অনেক, কিন্তু ক্রেতা কম। অনলাইনের পোস্টগুলোর বেশির ভাগই ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া, অনভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের টানার জন্য।” তিনি আরও বলেন, “মলিন হয়ে যাওয়া এক শ কেজি ভারী ধাতু ধরে রেখে পরে নামমাত্র দামে ভাঙারি হিসেবে বিক্রির চেয়ে ২০ লাখ ডং লোকসান মেনে নেওয়াই ভালো।”
রুপার অস্থিরতা ও দ্বৈত ভূমিকা
খবরে স্বর্ণের আধিপত্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে রুপার দর আরও নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। জানুয়ারির দর সংশোধনের আগে বছরের শুরু থেকে রুপার দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছিল, যা স্বর্ণের ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি। শিল্পে ব্যাপক ব্যবহার এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ভূমিকা—দুইয়ের সমন্বয়ই রুপার এই অস্থিরতার কারণ।
আর্থিক বাজারের কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, রুপার দরে শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি রয়েছে, তবে বড় ধরনের সংশোধনের ঝুঁকিও আছে। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস পণ্যে এই ধাতুর অপরিহার্য ব্যবহার রয়েছে, ফলে বিনিয়োগের প্রবাহের বাইরেও এর মৌলিক চাহিদা আছে। তবে শিল্পে ব্যবহারের এই সংশ্লিষ্টতার কারণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় স্বর্ণের তুলনায় রুপার দর বেশি অস্থির হয়।
২০২৫ সালের আর্থিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রুপার দাম প্রতি আউন্স ২৮ থেকে ৩২ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, শিল্পখাতের চাহিদা ও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে দাম ৩৫ ডলারে উঠতে পারে। স্বর্ণের এক আউন্সের সমান হতে কত আউন্স রুপা লাগে, তা নির্দেশ করে স্বর্ণ-রুপার অনুপাত। বর্তমান অনুপাত ইঙ্গিত দেয়, হলুদ ধাতু স্বর্ণের তুলনায় রুপার দর কম থাকতে পারে। দামে পতনের সময় ভিয়েতনামি বিনিয়োগকারীদের রুপার প্রতি বিশেষ আগ্রহের কারণ এটি হতে পারে।
বাজার বিশেষজ্ঞ হুয়িন ত্রুং খান সাম্প্রতিক দর সংশোধনকে দ্রুত উত্থানের পর স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, বড় বিনিয়োগকারী ও তহবিলগুলো প্রায়ই জানুয়ারির শেষ দিকে মুনাফা তুলে নেয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণকে স্বল্পমেয়াদি জল্পনার উপকরণ না ভেবে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ রক্ষার প্রতিরক্ষামূলক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্কবার্তা ও বিচক্ষণ বিনিয়োগ
লেনদেনের এই উন্মাদনার মধ্যে ভিয়েতনামের কর্তৃপক্ষ বারবার সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এখনো স্বর্ণকে অস্থির সম্পদশ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্ক করছে। বিশেষ করে দর দ্রুত ওঠানামার সময় কেবল অনুমোদিত বিক্রেতার মাধ্যমে লেনদেন করার পরামর্শ দিচ্ছে। বাজার কারসাজি ঠেকাতে এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় স্বর্ণের ব্যবসায় কঠোর নজরদারির নির্দেশ আগে দিয়েছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী হো ডাক ফোক।
আর্থিক উপদেষ্টারা যথাযথ বৈচিত্র্য বজায় রাখতে মোট বিনিয়োগের ১৫-২০ শতাংশের মধ্যে মূল্যবান ধাতুতে বিনিয়োগ সীমিত রাখার পরামর্শ দেন। অর্থনীতিবিদ নুয়েন ত্রি হিউ সতর্ক করেছেন, স্বর্ণের দাম এখনকার মতো উচ্চ পর্যায়ে থাকায় সীমিত ভৌত সরবরাহের কারণে বাজারে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে। জল্পনামূলক উত্থান শেষ হলে এর জেরে দর দ্রুত নেমে যেতে পারে।
হিউ পরামর্শ দেন, “কেনা ও বিক্রির দামের ব্যবধান সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে হবে এবং ঝুঁকি ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। শান্ত থাকতে হবে, অন্যদের দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া এড়াতে হবে এবং সুযোগ হারানোর ভয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।”
ভিয়েতনামের স্বর্ণের দোকানগুলোতে কেনা ও বেচার দামের ব্যবধান ছোট বিনিয়োগকারীদের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। দোকানগুলো যখন কেনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক মাচ বা এক তােলার সীমা আরোপ করে, অথচ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো সীমা রাখে না, তখন এই অসমতা বিশ্ববাজারের তুলনায় দেশের স্বর্ণের বাড়তি দামের পেছনে থাকা সরবরাহ-সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
সারকথা
- ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় ধরনের সংশোধনের সময় ভিয়েতনামের বিনিয়োগকারীরা প্রচলিত বাজারি ধারণার বিপরীতে নিজেদের স্বর্ণ-রুপা বিক্রির বদলে কিনতে ছুটেছেন।
- দুই দিনে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় ১০ শতাংশ (প্রতি তােলায় ২ কোটি ডং) এবং রুপার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ (প্রতি কেজিতে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডং) কমে যায়। এতে হ্যানয় ও হো চি মিন সিটির বড় বিক্রেতাদের বাইরে সারি তৈরি হয়।
- ফু কুই ও মি হংসহ কয়েকটি বড় বিক্রেতার মজুত সকাল গড়ানোর আগেই শেষ হয়ে যায়। কিছু দোকান সকাল সাড়ে ৯টার আগে ১০০টিরও বেশি সিরিয়াল নম্বর দেয়।
- কেনার এই হিড়িক এশিয়াজুড়ে বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা পেতে সিঙ্গাপুর, সিডনি ও থাইল্যান্ডেও একই ধরনের সারি দেখা গেছে।
- জল্পনামূলক কেনাকাটা তামার বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে। তারল্য-সংকট ও জারণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা কয়েক শ কেজি করে সাধারণ ধাতুর বার কিনছেন।
- বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগের পোর্টফোলিওতে স্বর্ণের অংশ ১৫-২০ শতাংশে সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের সতর্কবার্তা, দেশের বাজার ও আন্তর্জাতিক দামের বড় ব্যবধান ভিয়েতনামের ক্রেতাদের জন্য অস্থিরতার বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।
- নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। তারা জোর দিচ্ছে, স্বর্ণকে স্বল্পমেয়াদি জল্পনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষামূলক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।






