ইন্দোনেশিয়ায় চীনের নিকেল কৌশল: খনিজ আধিপত্যের মডেল বাজারের বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের মুখে

পড়তে 8 মিনিট
ইন্দোনেশিয়ায় চীনের নিকেল কৌশল: খনিজ আধিপত্যের মডেল বাজারের বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের মুখে

নিয়ন্ত্রণের কাঠামো: কীভাবে চীন নিকেলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলল

গত এক দশকে চীনা কোম্পানিগুলো ইন্দোনেশিয়ায় উল্লম্বভাবে সমন্বিত একটি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বজুড়ে খনিজ খাতে আধিপত্য বিস্তারের নকশা হিসেবে কাজ করছে। ২০১৪ সালে ইন্দোনেশিয়া নিকেল আকরিক রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পর এই কৌশল জোরেশোরে শুরু হয়। এ পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশেই খনিজ প্রক্রিয়াজাত করতে বাধ্য হতে হয়। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো দ্বিধায় থাকলেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। বেসরকারি ইস্পাত উৎপাদনকারী গোষ্ঠী সিংশান গ্রুপ ২০০৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার বিনতাং দেলাপান গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটিতে প্রবেশ করে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর দ্রুত কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে তারা।

সূচিপত্র
  1. নিয়ন্ত্রণের কাঠামো: কীভাবে চীন নিকেলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলল
  2. ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ-জাতীয়তাবাদ ও নির্ভরতার ফাঁদ
  3. বাজারের পালাবদল: গানবাস্টারে হিসাবের মুখোমুখি
  4. পরিবেশের অবক্ষয় ও জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ
  5. ওয়াশিংটনের কৌশলগত দ্বিধা
  6. মডেল রপ্তানি: জাকার্তা থেকে কিনশাসা
  7. মূল বিষয়গুলো
বিজ্ঞাপন

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় ইন্দোনেশিয়া মোরোওয়ালি শিল্পপার্ক (আইএমআইপি) প্রধান প্রকল্প হিসেবে গড়ে ওঠে। সাধারণ একটি গলনাগার কমপ্লেক্স থেকে এটি রূপ নেয় বিস্তৃত এক শিল্পনগরীতে, যেখানে রয়েছে নিজস্ব বন্দর, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরবরাহব্যবস্থা। এসব অবকাঠামোগত বিনিয়োগের পাশাপাশি চীনা অর্থায়নও বিকশিত হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের মতো নীতিভিত্তিক ব্যাংকগুলো প্রাথমিক পর্যায়ের অবকাঠামো অর্থায়ন দেয়। ২০১৩ সালের পর রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণঝুঁকি ভাগ করে নিতে সিন্ডিকেটেড ঋণ দেয়, যা শিল্পপার্কের ভেতরে ছোট প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করে।

পশ্চিমা প্রতিযোগীদের নাগালের বাইরে থাকা এই অর্থায়নব্যবস্থা দ্রুত মূলধন বিনিয়োগ এবং উচ্চ ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। চীনা কোম্পানিগুলো উচ্চচাপের অ্যাসিড লিচিং (এইচপিএএল) প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগায়। এই প্রযুক্তিতে ইন্দোনেশিয়ার বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের ল্যাটেরাইট আকরিক থেকে মিশ্র হাইড্রক্সাইড অবক্ষেপ (এমএইচপি) তৈরি হয়, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনিতে একই ধরনের প্রক্রিয়াকরণের পশ্চিমা উদ্যোগ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু চীনা প্রকৌশলীরা সফল হন। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার নিকেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ চীনা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে এবং বিশ্বে পরিশোধিত নিকেল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ তাদের মালিকানাধীন।

ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ-জাতীয়তাবাদ ও নির্ভরতার ফাঁদ

দেশটির বিপুল নিকেল মজুত থেকে আরও বেশি মূল্য অর্জনের লক্ষ্যেই জাকার্তা পরবর্তী ধাপে প্রক্রিয়াকরণে জোর দেয়। এই মজুত বৈশ্বিক সরবরাহের ৪২ শতাংশেরও বেশি। আগের বিধিনিষেধের ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে কাঁচা নিকেল আকরিক রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এতে সফলভাবে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়: ২০১৯ সালের ৩.৫৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২ সালে তা দাঁড়ায় ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারে। নিকেল রপ্তানি থেকে আয় ২০১৩ সালের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২ সালে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

তবে এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা। কাঁচামাল ইন্দোনেশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি, মূলধন ও বাজারে প্রবেশাধিকার চীনা কোম্পানিগুলোর দখলে। জাতীয়তাবাদী মালিকানা আইনের কারণে অধিকাংশ ইন্দোনেশীয় খনি স্থানীয় মালিকানাধীন। এসব খনিকে সরকারি নির্ধারিত দামে চীনা প্রক্রিয়াকরণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে আকরিক বিক্রি করতে হয়; এই দাম আন্তর্জাতিক দরের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অন্যদিকে, চীনা কোম্পানিগুলো ব্যাপক আর্থিক প্রণোদনা পায়। এর মধ্যে রয়েছে ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত আয়কর অবকাশ এবং দেশীয় বাজারে বাধ্যতামূলক সরবরাহ নীতির (ডিএমও) আওতায় ভর্তুকি দেওয়া কয়লা। এ নীতিতে কয়লার দাম প্রতি টন ৭৫ ডলারে সীমিত রাখা হয়, যেখানে ২০২৩ সালে বৈশ্বিক দাম প্রতি টন ৩৫০ ডলারে পৌঁছেছিল।

২০২০ সালের আগে নিকেল আকরিক রপ্তানিতে আংশিক নিষেধাজ্ঞা (যেসব কোম্পানি গলনাগার নির্মাণে অগ্রগতি দেখিয়েছিল, তাদের আকরিক রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল) এবং শিল্পপার্কের ভেতরে অনুমতি পাওয়াই নিকেল প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানিগুলোকে ইন্দোনেশিয়ায় বিনিয়োগে আগ্রহী করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

এর ফলে প্রায় একচেটিয়া বাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে মূল্য সংযোজনের অধিকাংশ সুবিধা পাচ্ছে চীনা কোম্পানিগুলো। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা স্বল্পমেয়াদে দর-কষাকষির ক্ষমতা অর্জন করেছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ক্ষমতা রয়ে গেছে বেইজিংয়ের হাতে। জাকার্তাভিত্তিক এক ব্যাংকারের ভাষ্য, ২০২০ সালের আগের আংশিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং শিল্পপার্কের অনুমতিই বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট হতো; বর্তমান ব্যয়বহুল প্রণোদনার দরকার ছিল না, যার প্রধান সুবিধাভোগী চীনা প্রক্রিয়াকরণকারীরা।

বাজারের পালাবদল: গানবাস্টারে হিসাবের মুখোমুখি

কৌশলগত পরিকল্পনাকে পাশ কাটিয়ে পণ্যের বাজারে পরিবর্তন আসায় ২০২৫ সালে এই মডেলের ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের জিয়াংসু দেলং নিকেল ইন্ডাস্ট্রির পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সুলাওয়েসির বিশাল গলনাগার কমপ্লেক্স পিটি গানবাস্টার নিকেল ইন্ডাস্ট্রি (জিএনআই) ধসের মুখে। বছরে ১.৮ থেকে ১.৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন নিকেল পিগ আয়রন উৎপাদনের জন্য তৈরি এই স্থাপনায় উৎপাদন লাইনের অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করতে ঋণদাতারা বৈঠকে বসেছেন। জিয়াংসু দেলং ইন্দোনেশিয়ার চারটি বড় প্রকল্পের মধ্যে তিনটি থেকে সরে গেছে, এতে বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন উৎপাদনের ঢল বিশ্ববাজারে নিকেলের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে লাভজনক বলে মনে হওয়া পূর্বাভাস লোকসানে পরিণত হয়। অসমাপ্ত অবকাঠামো, বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয় এবং সরবরাহের সময়সীমা না মানায় জরিমানাও জিএনআইয়ের সমস্যাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থাপনাটি ইন্দোনেশিয়ার মোট পরিশোধিত নিকেল উৎপাদনের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশের সমান। ফলে এটি বন্ধ হলে বৈশ্বিক সরবরাহের ৫ থেকে ৬ শতাংশ ব্যাহত হতে পারে।

চীনের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও এই চাপ বাড়াচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য নিকেলযুক্ত ব্যাটারির ওপর ইন্দোনেশিয়া ব্যাপকভাবে নির্ভর করলেও চীনা নির্মাতারা দ্রুত লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি গ্রহণ করছে, যাতে নিকেল নেই। ইন্দোনেশিয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন কারখানা গড়তে বিওয়াইডির ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে এলএফপি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জাকার্তার নিকেলনির্ভর শিল্পকৌশলের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। চীনে নিকেলভিত্তিক ব্যাটারির বাজারের অংশ কমে যাওয়ায়, বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, ঠিক তখনই ইন্দোনেশীয় উৎপাদকদের প্রধান ক্রেতার কাছ থেকে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

পরিবেশের অবক্ষয় ও জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ

নিকেল উৎপাদনের উত্থানে বিশেষ করে সুলাওয়েসি ও মালুকুতে পরিবেশ ও সমাজের ওপর বড় ধরনের মূল্য চাপানো হয়েছে। পিটি ভালে ইন্দোনেশিয়ার সরোওয়াকো ব্লক, নিকেল উত্তোলনের সবচেয়ে দীর্ঘদিনের ইজারাভুক্ত এলাকা, ব্যাপক বন উজাড়ের কারণ হয়েছে। মাইটি আর্থের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার নিকেল খনিগুলোর মধ্যে সরোওয়াকোতে গাছের আচ্ছাদন সবচেয়ে বেশি কমেছে। ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৪,৫৫৯ হেক্টর বন পরিষ্কার করা হয়েছে। খনিযোগ্য এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল হিসেবে ১৪,১৩৭ হেক্টর এলাকা চিহ্নিত করেছে কোম্পানিটি, যার মধ্যে তোউতি হ্রদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ ও দূষণের শিকার হচ্ছে। লোয়েহা রায়ায় পূর্বপুরুষদের জমিতে সাদা গোলমরিচ চাষ করা কৃষকেরা আগাম পরামর্শ ছাড়াই খননকাজের মুখে পড়েছেন। পলি জমে ঝরনার পানি দূষিত হওয়ায় কিছু কৃষিজমি আর ব্যবহারযোগ্য নেই।

এখানে কোম্পানি খনির এলাকা বাড়াচ্ছে বলে আমরা খুব উদ্বিগ্ন। অনুসন্ধানের জন্য খননকাজ শুরু হলে মানুষ চাষাবাদ করতে ভয় পায়।

আদিবাসীদের প্রথাগত বনের অধিকার স্বীকার করে ২০১৩ সালে সাংবিধানিক আদালত রায় দিলেও ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত দাবিগুলো যাচাই প্রক্রিয়ায় আটকে আছে। ফলে সম্প্রসারণের মুখে জনগোষ্ঠীগুলো অরক্ষিত রয়ে গেছে।

প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামো থেকেও ব্যাপক নির্গমন হয়। নিকেল গলনাগারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য তৈরি নিজস্ব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন ইন্দোনেশিয়ার মোট কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ২৩ শতাংশের জন্য দায়ী। বর্তমানে যতগুলো চালু আছে, তার চেয়ে বেশি কেন্দ্র নির্মাণাধীন। স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রক্রিয়াকরণ কর্মকাণ্ডের বায়ুদূষণে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা ২০২০ সালের ২১৫ থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে প্রায় ৫,০০০ হতে পারে। এ-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বছরে ৩.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ওয়াশিংটনের কৌশলগত দ্বিধা

ইন্দোনেশিয়ার নিকেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে। সম্পদ-জাতীয়তাবাদী নীতির কারণে মার্কিন খনি কোম্পানিগুলো মূলত দেশটি ছেড়ে গেছে। রপ্তানি বিধিনিষেধ নিয়ে বিরোধের পর ২০১৬ সালে নিউমন্ট মাইনিং পুরোপুরি সরে যায়। আর ২০১৮ সালে গ্রাসবার্গ তামার খনির সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ফ্রিপোর্ট-ম্যাকমোরান। বাধ্যতামূলক মালিকানা হস্তান্তরের আইন এবং অনিশ্চিত বিধিবিধান পশ্চিমা কোম্পানিগুলোকে নিরুৎসাহিত করে। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্র-সমর্থিত কোম্পানিগুলো বাজারের অস্থিরতা সামলাতে এবং কম মুনাফায় কাজ করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা সীমিত এবং কিছুটা অস্বস্তিকর। ২০২৩ সালে ফোর্ড মোটর কোম্পানি পিটি ভালে ইন্দোনেশিয়া ও চীনের হুয়ায়ো কোবাল্টের সঙ্গে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের অংশীদারত্ব ঘোষণা করে এইচপিএএল স্থাপনা নির্মাণের জন্য। এতে বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে: চীনা কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা ছাড়া পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতারা ইন্দোনেশিয়ার নিকেল নিশ্চিত করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি না থাকায় ইন্দোনেশীয় নিকেল মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইনের আওতায় পরিচ্ছন্ন যানবাহনের কর রেয়াতের যোগ্য হয় না। বিদেশি প্রভাবাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর বিধিনিষেধও বাজারে প্রবেশ আরও জটিল করে তুলেছে।

কিছু নীতিনির্ধারক ইন্দোনেশিয়ার বাইরে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ার পক্ষে মত দেন, তবে এর জন্য বিপুল বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি প্রয়োজন। অন্যরা সরাসরি ক্রয়চুক্তি এবং সংখ্যালঘু মালিকানা অংশীদারত্বের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। যেকোনো পথেই মার্কিন কোম্পানিগুলোকে নীতিগত স্বচ্ছতা ও অর্থায়নের সুযোগ দিতে সরকারের ধারাবাহিক সমন্বয় দরকার। অথচ বিশ্বের প্রধান নিকেল সরবরাহকারীর কাছে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের এখনো সুসংগত কৌশল নেই।

মডেল রপ্তানি: জাকার্তা থেকে কিনশাসা

ইন্দোনেশিয়ায় নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও চীন অন্যত্রও এই মডেল অনুসরণ করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। বেইজিংয়ের ২০২৩ সালের বৈদেশিক বিনিয়োগবিষয়ক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা অঞ্চলগুলোর কথা বলা হয়েছে। বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে অবকাঠামো ও শিল্প উন্নয়নকে কাজে লাগানো হচ্ছে। পেরুতে তামার খনি এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) কোবাল্ট প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগে ইতিমধ্যেই এই কৌশলের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ডিআরসিতে চীনা কোম্পানিগুলো কোবাল্ট রপ্তানির নতুন কোটা অনুযায়ী নিজেদের কৌশল বদলেছে। ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বছরে রপ্তানির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৬,৬০০ মেট্রিক টন, যা ২০২৪ সালের মাত্রার প্রায় অর্ধেক। সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের এই কৌশল ইন্দোনেশিয়ার পদ্ধতির অনুরূপ: নীতিগত পদক্ষেপ দিয়ে দেশে প্রক্রিয়াকরণে বাধ্য করা, আর পরবর্তী মূল্যশৃঙ্খল চীনা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রাখা। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে চীন উচ্চ বিশুদ্ধতার ক্লাস ১ নিকেলের মজুতও দ্বিগুণ করেছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেই অভ্যন্তরীণ শিল্পকে দামের অস্থিরতা থেকে সুরক্ষিত রাখার কৌশলগত মজুত তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে আরও দেশ ইন্দোনেশিয়ার মতো রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করছে। এদিকে চীনা কোম্পানিগুলো লক্ষ্যদেশগুলোতে মানিয়ে নিয়ে মূল্যশৃঙ্খলের উচ্চতর ধাপে ওঠার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তারা নিয়ে আসে মূলধন ও প্রযুক্তি, আর এমন পরিবেশেও কাজ করতে রাজি থাকে যা পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, শক্তিশালী সুশাসন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বহুমুখী অংশীদারত্ব না থাকলে সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলো এক ধরনের নির্ভরতা—কাঁচামাল রপ্তানি—বদলে আরেক ধরনের নির্ভরতা, নিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফাঁদে পড়তে পারে।

মূল বিষয়গুলো

  • মোরোওয়ালির মতো শিল্পপার্কের মাধ্যমে চীনা কোম্পানিগুলো ইন্দোনেশিয়ার নিকেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং বিশ্বে পরিশোধিত নিকেল উৎপাদনের ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় একচেটিয়া অবস্থান তৈরি করেছে।
  • ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং রপ্তানি আয় ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারে তুলেছে, তবে চীনা প্রযুক্তি, মূলধন ও বাজারের ওপর কাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি করেছে।
  • নিকেলের দাম ৪০ শতাংশ কমে যাওয়া এবং নিকেলবিহীন লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারির দিকে চাহিদা সরে যাওয়ায় চীনা পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বড় প্রকল্পগুলো সংকটে পড়েছে।
  • পরিবেশগত ক্ষতির মধ্যে রয়েছে সুলাওয়েসিতে ব্যাপক বন উজাড়, স্থানীয় কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা পানি দূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি; ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় ৫,০০০ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
  • ইন্দোনেশিয়ার নিকেল পাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সুসংগত কৌশল নেই। সম্পদ-জাতীয়তাবাদী নীতির কারণে মার্কিন খনি কোম্পানিগুলো দেশ ছেড়ে গেছে, আর চীনা কোম্পানিগুলো তাদের অবস্থান শক্ত করেছে।
  • শিল্পপার্ক ও রাষ্ট্র-সমর্থিত অর্থায়ন কাজে লাগিয়ে চীন ডিআরসিতে কোবাল্ট এবং পেরুতে তামার ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া মডেল অনুসরণ করছে, যার লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে