কূটনৈতিক সংকটে চীনা পর্যটকদের ব্যাপক প্রস্থান, বদলে যাচ্ছে জাপানের অর্থনীতি

পড়তে 10 মিনিট
কূটনৈতিক সংকটে চীনা পর্যটকদের ব্যাপক প্রস্থান, বদলে যাচ্ছে জাপানের অর্থনীতি

গুরুত্বপূর্ণ এক বাজারের আকস্মিক পতন

জাপানের পর্যটনশিল্প নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটির বিদেশি পর্যটন অর্থনীতির দীর্ঘদিনের মূল ভরসা চীনা পর্যটকেরা প্রায় রাতারাতি উধাও হয়ে গেছেন। জাপান ন্যাশনাল ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের (জেএনটিও) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে জাপানে আসা পর্যটকের সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজার ৪০০-তে নেমে আসে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বিস্ময়করভাবে ৪৫ শতাংশ কম।

সূচিপত্র
  1. গুরুত্বপূর্ণ এক বাজারের আকস্মিক পতন
  2. তাইওয়ান নিয়ে মন্তব্যে যেভাবে পর্যটন স্থবির হলো
  3. বুকিং থেকে বাতিল: ব্যবসায়িক ক্ষতির চিত্র
  4. দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে ঝোঁক: চীনা পর্যটকেরা এখন যেখানে যাচ্ছেন
  5. নিরাপত্তার দাবি ও টোকিওর ছিনতাই
  6. অতিরিক্ত পর্যটকে ক্লান্ত স্থানীয়দের জন্য কিছুটা স্বস্তি
  7. বৈচিত্র্য আনার কৌশল: চীনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাপানের পদক্ষেপ
  8. মূল বিষয়গুলো

এর চেয়ে খারাপ সময়ে এই পতন আর হতে পারত না। ঐতিহ্যগতভাবে চীনা পর্যটকদের বিদেশ ভ্রমণের অন্যতম ব্যস্ত সময় চন্দ্র নববর্ষের ছুটি শুরু হচ্ছে ১৫ ফেব্রুয়ারি। অথচ এই ভরা মৌসুমে জাপান এড়িয়ে চলতে বেইজিং স্পষ্টভাবে নাগরিকদের নির্দেশ দিয়েছে। নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে অপরাধ বেড়েছে—এমন দাবির উল্লেখ করে ২৬ জানুয়ারি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক মিশনগুলো এই সতর্কবার্তা জারি করে।

চীনা পর্যটকের সংখ্যা তীব্রভাবে কমলেও ডিসেম্বরে জাপানে মোট পর্যটকের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে স্থিতিশীল ছিল, প্রায় ৩৬ লাখ ২০ হাজার; আগের বছরের তুলনায় যা ৩.৭ শতাংশ বেশি। এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটকেরা দুর্বল ইয়েনের সুবিধা নেওয়ায় এই আপাত বৈপরীত্য দেখা গেছে। তবে এর আড়ালে রয়েছে আরও গভীর অর্থনৈতিক ঝুঁকি। ঐতিহাসিকভাবে বিদেশি পর্যটকদের প্রায় ২৩.৭ শতাংশই ছিলেন চীনা নাগরিক। বিলাসপণ্য ও উচ্চমানের অভিজ্ঞতার প্রতি তাঁদের আগ্রহের কারণে পর্যটন ব্যয়ে তাঁদের অংশ ছিল আরও বেশি।

তাইওয়ান নিয়ে মন্তব্যে যেভাবে পর্যটন স্থবির হলো

পর্যটন খাতের এই পতনের শিকড় ভ্রমণ ব্যবস্থাপনার বাইরেও ভূরাজনীতির অস্থির ক্ষেত্রে বিস্তৃত। সংকটের শুরু ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর, যখন জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সংসদে এমন মন্তব্য করেন, যা তাইওয়ান বিষয়ে জাপানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অস্পষ্টতার নীতির সঙ্গে মেলে না।

তাকাইচি ইঙ্গিত দেন, তাইওয়ানে চীনের সামরিক হামলা জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যার জেরে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী পদক্ষেপ নিতে পারে। পরে তিনি মন্তব্যগুলোকে কাল্পনিক এবং বিদ্যমান নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে বর্ণনা করলেও বেইজিং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়।

চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সুন ওয়েইদং বেইজিংয়ে জাপানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন, যা দুই বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এ ধরনের প্রথম কূটনৈতিক তলব। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও কর্মকর্তারা মন্তব্যগুলোকে ৮০ বছরের মধ্যে চীনের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের প্রথম স্পষ্ট হুমকি বলে নিন্দা জানান। কয়েকজন ভাষ্যকার এর সঙ্গে ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকের জাপানি সামরিকবাদের তুলনাও করেন।

বিজ্ঞাপন

কয়েক দিনের মধ্যেই চীন কূটনৈতিক ক্ষোভকে অর্থনৈতিক প্রভাব খাটানোর অস্ত্রে পরিণত করে। ১৪ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো নাগরিকদের জাপান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। পরে টোকিওতে চীনা দূতাবাসও সতর্কবার্তাটি পুনর্ব্যক্ত করে; এতে বিদেশিবিদ্বেষী মনোভাব বৃদ্ধি এবং চীনা নাগরিকদের ওপর হামলার খবরের কথা বলা হয়। ২৬ জানুয়ারি চন্দ্র নববর্ষ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেইজিং ছুটির সময় ভ্রমণ না করার আনুষ্ঠানিক সুপারিশ জারি করে সতর্কতা আরও জোরালো করে।

সম্প্রতি জাপানের নেতারা তাইওয়ান বিষয়ে প্রকাশ্যে স্পষ্ট উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। এতে চীন ও জাপানের জনগণের মধ্যে যোগাযোগের পরিবেশ গুরুতরভাবে অবনতি হয়েছে এবং জাপানে থাকা চীনা নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

জাপানে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের এই বিবৃতিতে ভ্রমণ সতর্কতার সঙ্গে তাকাইচির তাইওয়ানবিষয়ক মন্তব্যের সরাসরি যোগসূত্র স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, জাপানের কূটনৈতিক অবস্থানের শাস্তি হিসেবেই পর্যটনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

বুকিং থেকে বাতিল: ব্যবসায়িক ক্ষতির চিত্র

জাপানের পর্যটন অবকাঠামোতে খুব দ্রুত এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। চীনা পর্যটকদের নিয়ে কাজ করা টোকিওভিত্তিক বড় ভ্রমণ সংস্থা আরসিসি ইনকরপোরেটেড জানিয়েছে, নভেম্বরে সতর্কবার্তা জারির পর এক দিনেই তাদের প্রায় ৩০টি দলীয় ভ্রমণের বুকিং বাতিল হয়। এ বছর প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার চীনা পর্যটক সংস্থাটির সেবা নিয়েছেন; ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাসে প্রায় ৮০০।

বিমান চলাচলের বাজারও তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চীনের সাতটি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনাকারী বাজেট এয়ারলাইন স্প্রিং জাপান জানিয়েছে, সতর্কবার্তা জারির কয়েক দিনের মধ্যে বাতিলসংক্রান্ত ২০০টির বেশি জিজ্ঞাসা এসেছে। এয়ার চায়না, চায়না ইস্টার্ন ও চায়না সাউদার্নসহ চীনা এয়ারলাইনগুলো অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত জাপানগামী ফ্লাইটের টিকিট বিনা খরচে বাতিলের সুযোগ দিতে শুরু করে, কার্যত যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাদ দিতে উৎসাহিত করে।

বিজ্ঞাপন

সিচুয়ান এয়ারলাইনস চেংদু থেকে সাপ্পোরো যাওয়ার পরিকল্পিত রুটটি অন্তত ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাতিল করেছে। সিরিয়ামের ফ্লাইট তথ্য অনুযায়ী, চন্দ্র নববর্ষের সময়ে চীন থেকে জাপানগামী নির্ধারিত ফ্লাইট ৪৮ শতাংশ কমে ৮০০টির সামান্য ওপরে নেমেছে। অন্যদিকে, মূল ভূখণ্ড চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ফ্লাইট প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৩৩০টির বেশি হয়েছে।

জাপানজুড়ে হোটেলগুলো ক্ষতির ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার কথা জানিয়েছে। কানসাই অঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্র ওসাকায় কনভেনশন অ্যান্ড ট্যুরিজম ব্যুরো নিশ্চিত করেছে, প্রায় ২০টি হোটেলে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত চীনা পর্যটকদের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়েছে। চীনা পর্যটকদের দলীয় ভ্রমণের আরেক বড় গন্তব্য কিয়োটোর প্রধান হোটেলগুলোতে নভেম্বরে চীনা পর্যটকদের রাতযাপন আগের বছরের তুলনায় ১২.১ শতাংশ কমেছে। কোভিড-১৯ মহামারির পর এই প্রথম এমন পতন দেখা গেল।

খুচরা বিক্রয় খাতেও একই রকম বড় ধাক্কা লেগেছে। জাপানের চারটি বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে বিদেশি পর্যটকদের কাছে শুল্কমুক্ত পণ্যের বিক্রি ডিসেম্বরে আগের বছরের তুলনায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমে যায়। নভেম্বরের সতর্কবার্তার পর ইসেতান মিৎসুকোশির শেয়ারের দাম ১০.৭ শতাংশ পড়ে যায়। ওরিয়েন্টাল ল্যান্ডের শেয়ার ৫.৯ শতাংশ এবং জাপান এয়ারলাইনসের শেয়ার ৪.৪ শতাংশ কমে।

চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোমোকো আকো বলেন, বর্তমান সতর্কবার্তাটি বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা নয়, সুপারিশমাত্র। তবে সম্পর্কের আরও অবনতি হলে চীন ভ্রমণ সংস্থাগুলোকে সফর পুরোপুরি বন্ধ করতে বা দুই দেশের মধ্যে ফ্লাইটের সংখ্যা কমাতে বলতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে ঝোঁক: চীনা পর্যটকেরা এখন যেখানে যাচ্ছেন

জাপানের পর্যটন খাত যখন সবচেয়ে বড় বাজারের আকস্মিক অনুপস্থিতির সঙ্গে লড়ছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ায় পর্যটকের সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বেড়ে চলেছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান চায়না ট্রেডিং ডেস্কের পূর্বাভাস, ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া চন্দ্র নববর্ষের নয় দিনের ছুটিতে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার পর্যটক দক্ষিণ কোরিয়ায় যাবেন। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বেশি।

কোভিড-১৯ মহামারির পর এই প্রথম বসন্ত উৎসবের সময়ে চীনা পর্যটকদের প্রধান গন্তব্য হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে। বিপরীতে, একই ছুটিতে চীনা পর্যটকের সংখ্যা ৬০ শতাংশ কমবে বলে জাপানের পূর্বাভাস।

বিজ্ঞাপন

এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। জুন পর্যন্ত দলীয় পর্যটকদের ভিসামুক্ত প্রবেশের মেয়াদ বাড়িয়ে এবং একক ভ্রমণকারীদের ভিসার শর্ত সহজ করে দক্ষিণ কোরিয়া জোরালোভাবে চীনা পর্যটকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার দুর্বল ওন জাপানের দুর্বল ইয়েনের মতোই কেনাকাটায় সুবিধা দেয়, তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েন নেই।

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণ চীনা পর্যটকদের গন্তব্য বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার পপ সংস্কৃতি এখনো বড় প্রভাব রাখছে। সৌন্দর্যচর্চা, ফ্যাশন ও বিনোদনের অভিজ্ঞতা খুঁজতে যাওয়া পর্যটকদের কাছে সিউল, বুসান ও জেজু দ্বীপ আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের ত্বকের যত্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ক্লিনিকের সঙ্গে সংযোগ করিয়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠান সিউল মেডিক্যাল গাইডের কর্ণধার টনি মেদিনা জানিয়েছেন, ছুটির সময়ে মূল ভূখণ্ড চীনের গ্রাহকদের কাছ থেকে কয়েক শ জিজ্ঞাসা পেয়েছেন; আগের বছর পেয়েছিলেন মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি।

চায়না ট্রেডিং ডেস্কের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, চীনা পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্যের তালিকায় এশিয়ার দেশগুলোই এগিয়ে আছে। শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। পছন্দের গন্তব্যের তালিকায় জাপান দ্বিতীয় স্থান থেকে অনেকটা নেমে সপ্তম স্থানে এসেছে। এই পতন রাজনৈতিক ইঙ্গিতে ভ্রমণ চাহিদার সংবেদনশীলতাই তুলে ধরে।

গুয়াংশি প্রদেশের ২০ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রী, যাঁকে লিসা ঝাং নামে পরিচয় করানো হয়েছে, গণমাধ্যমকে বলেন, স্কিইং করতে তিনি প্রথমে জাপান যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু মুদ্রার বিনিময় হার অনুকূলে থাকা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ভাষ্য, চীনবিরোধী মনোভাবের আশঙ্কায় জাপানে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মা চিন্তিত হতেন।

নিরাপত্তার দাবি ও টোকিওর ছিনতাই

ভ্রমণ সতর্কতার পক্ষে চীনের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে জাপানে চীনা নাগরিকদের কথিত নিরাপত্তাঝুঁকি। বেইজিং নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি টোকিওর উএনো এলাকায় বড় ধরনের ছিনতাই। হামলাকারীরা মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ব্যবহার করে চীনা নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত একটি দলের ওপর হামলা চালায় এবং প্রায় ৪২ কোটি ইয়েন (প্রায় ২৭ লাখ মার্কিন ডলার) নিয়ে যায়।

কয়েক ঘণ্টা পর হানেদা বিমানবন্দরে আরেকটি ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা স্যুটকেসে ১৯ কোটি ইয়েন বহনকারী এক জাপানি ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে। এ ঘটনায় ছিনতাইকারীরা টাকা নিয়ে পালাতে না পারলেও, বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বহনকারী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে সমন্বিত অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

জাপানে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এসব ঘটনার পাশাপাশি বিদেশিবিদ্বেষী মনোভাব বৃদ্ধি এবং চীনা নাগরিকদের হয়রানির বিস্তৃত অভিযোগও তুলে ধরেছে। তবে জাপানি কর্মকর্তারা এসব বর্ণনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় জাপানে অপরাধের হার তুলনামূলক কম।

কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, নিরাপত্তার দাবিগুলো আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আড়াল করার অজুহাত। কূটনীতির বদলে নিরাপত্তাকে সতর্কবার্তার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করতে পারছে যে তারা নাগরিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে, জাপানকে শাস্তি দিচ্ছে না। তবে সময় ও বক্তব্যের ধরন থেকে সতর্কবার্তার সঙ্গে তাইওয়ান নিয়ে তাকাইচির মন্তব্যের যোগসূত্র স্পষ্ট।

অতিরিক্ত পর্যটকে ক্লান্ত স্থানীয়দের জন্য কিছুটা স্বস্তি

চীনা পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় আর্থিক চাপে থাকলেও জাপানের সমাজের কিছু অংশ পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ কমে যাওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে উঠেছে। কিয়োটো, টোকিওর আসাকুসা এলাকা ও হিরোশিমার মিয়াজিমা দ্বীপের বাসিন্দারা যানজট, শব্দদূষণ ও পরিবেশের অবনতি নিয়ে অভিযোগ করেছেন।

জাপানের অন্যতম বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান মিয়াজিমা থেকে পাওয়া প্রতিবেদন বলছে, পর্যটকের মোট সংখ্যা স্থিতিশীল থাকলেও তাঁদের জনমিতিক গঠনে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় ক্যাফের মালিকেরা জানিয়েছেন, এখন তাঁদের বেশির ভাগ অতিথি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও তাইওয়ান থেকে আসছেন; মূল ভূখণ্ড চীনের পর্যটক প্রায় দেখাই যাচ্ছে না।

দ্বীপটির এক ক্যাফে মালিক বলেন, চীন থেকে আসা বড় পর্যটক দলকে কখনো কখনো সামলানো কঠিন হতো। তাঁর মতে, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে একক ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ায় সবার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বরং উন্নত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

টোকিওর আসাকুসা এলাকায় রিকশাচালক কাই ইওয়াসাকি বলেন, একসময় তাঁর ব্যবসার প্রায় ৩০ শতাংশ গ্রাহক ছিলেন চীনা নাগরিক। এখন তাঁদের অনুপস্থিতি ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষিয়ে গেছে। রাজধানীর হোটেল ব্যবস্থাপকেরা জানিয়েছেন, চীনা পর্যটকদের বুকিং বাতিলের কারণে খালি হওয়া কক্ষগুলোতে দ্রুত অন্য অতিথি উঠছেন।

একটি মাত্র বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর সরকারি লক্ষ্যের সঙ্গে এই বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। জেএনটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশি পর্যটকদের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল চীন; তাঁদের অংশ ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। শুধু অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৩টি দেশ ও অঞ্চল থেকে জাপানে আসা পর্যটকের সংখ্যা রেকর্ড সর্বোচ্চ হয়।

বৈচিত্র্য আনার কৌশল: চীনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাপানের পদক্ষেপ

চীনা পর্যটকেরা হয়তো মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আগের সংখ্যায় ফিরবেন না—এই আশঙ্কায় জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকভিত্তি বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টা জোরদার করছে। বহুল আলোচিত ‘চীনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ কৌশলের আওতায় ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিপণন বাড়ানো হচ্ছে।

হোটেল চিনজানসো ও ওয়াশিংটন হোটেল চেইনের পরিচালনাকারী ফুজিতা কানকো জানিয়েছে, চীনা সতর্কবার্তার কারণে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়েনি। মহামারির পর থেকে চীনের বাইরের বাজারগুলোতে বিপণন বাড়ানোকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ইম্পেরিয়াল হোটেল টোকিওও জানিয়েছে, ভোজ অনুষ্ঠানের বুকিং সামান্যই বাতিল হয়েছে।

আঞ্চলিক গন্তব্যগুলোও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। দলীয় ভ্রমণে সাময়িক প্রভাব পড়লেও হোক্কাইডো অন্য বাজারের একক ভ্রমণকারীদের কাছে জনপ্রিয় রয়েছে। সাপ্পোরোর সুসুকিনো এলাকার হোটেলগুলো জানিয়েছে, চীনা পর্যটকদের প্রায় ২০ রাতের বুকিং বাতিল হয়েছে। তবে এশিয়ার অন্যান্য দেশ ও পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আসা পর্যটকেরা কক্ষগুলো পূর্ণ রাখছেন।

বিজ্ঞাপন

নোমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ তাকাহিদে কিউচির হিসাব, চীনের ভ্রমণ সতর্কতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জাপানের ২.২ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার) অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। তবে বিকল্প বাজারের ব্যয়সচেতন পর্যটকদের আকৃষ্ট করে চলা দুর্বল ইয়েন তাৎক্ষণিক প্রভাব কিছুটা কমিয়েছে।

বিমান চলাচল ও ভ্রমণ বিশ্লেষক কোতারো তোরিউমির পূর্বাভাস, এই প্রভাব বসন্তকাল পর্যন্ত গড়াতে পারে; অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর না গেলে পূর্ণ পুনরুদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে থাকা নগর এলাকাগুলো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের কারণে যাঁরা খরচের চাপে পড়েছিলেন বা ভিড়ে জায়গা পাননি, সেই জাপানি পর্যটকদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো অনিশ্চিত। বেইজিং ২০২৬ সালজুড়ে সতর্কবার্তা বহাল রাখলে পর্যটন আয় থেকে জাপানের আনুমানিক ৯৫৯ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হতে পারে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ০.২৯ শতাংশের সমান। পরিস্থিতিটি দেখিয়ে দিচ্ছে, পর্যটননির্ভর অর্থনীতি ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কাছে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং পর্যটকদের উৎসবাজার বৈচিত্র্যময় রাখার গুরুত্ব কতটা।

মূল বিষয়গুলো

  • ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাপানে চীনা পর্যটকের সংখ্যা ৪৫ শতাংশ কমে ৩ লাখ ৩০ হাজার ৪০০-তে নেমেছে
  • জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির তাইওয়ান নিরাপত্তাবিষয়ক মন্তব্যের পর বেইজিংয়ের ভ্রমণ সতর্কতা জারির পর এই পতন ঘটে
  • চীনা পর্যটকদের চন্দ্র নববর্ষের প্রধান গন্তব্য হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া জাপানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে; পর্যটকের সংখ্যা ৫২ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে
  • ওসাকার হোটেলগুলো চীনা পর্যটকদের বুকিংয়ের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বাতিল হওয়ার কথা জানিয়েছে; মহামারির পর প্রথমবার কিয়োটোতে চীনা পর্যটকদের রাতযাপন কমেছে
  • চীনা পর্যটকদের ব্যয় কমায় জাপানের বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে ডিসেম্বরে শুল্কমুক্ত পণ্যের বিক্রি ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে
  • ২০২৬ সালজুড়ে ভ্রমণ বিধিনিষেধ বহাল থাকলে জাপানের ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে
  • প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পর্যটকের ভিড় নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসিন্দা পর্যটকের সংখ্যা কমাকে স্বাগত জানিয়েছেন
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে