৩৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির পেছনে মুদ্রা সংকট
ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তির সূত্রে বিপুল পুঁজি বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ায় দক্ষিণ কোরীয় ওনের দর ডলারের বিপরীতে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সম্প্রতি প্রতি ডলারের বিপরীতে ওনের দর প্রায় ১,৪৭০-এ লেনদেন হয়েছে, যা ২০০৯ সালের পর দেখা যায়নি এমন নিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সিউলের ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাজার।
সূচিপত্র
- ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির পেছনে মুদ্রা সংকট
- দেশীয় বিনিয়োগের হিড়িকে মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়ছে
- বাস্তবায়নে বিলম্ব নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক বাড়ানোর হুমকি
- বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি স্থগিত সিউলের
- ওয়াশিংটনের বিরল মৌখিক হস্তক্ষেপ
- কোরীয় বন্ড থেকে সরে যাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা
- দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
- মূল বিষয়গুলো
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে মৌলিক চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যহীনতা থেকেই এই দুর্বলতার সূত্রপাত। কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব ফাইন্যান্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশটির বাসিন্দারা বিদেশি সিকিউরিটিজে ১২৯.৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন, যা একই সময়ে দেশটির ১০১.৮ বিলিয়ন ডলারের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্তের চেয়েও বেশি। ইনস্টিটিউটের গবেষক সং মিন-কি বলেন, বিদেশে বিনিয়োগের এই উল্লম্ফন দেশীয় মুদ্রার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে, যদিও ডলারের চাহিদায় সাম্প্রতিক বৃদ্ধির পুরোটা এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না।
প্রত্যাশিত পুঁজিপ্রবাহের সঙ্গে জড়িত ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি। চুক্তির আওতায় কোরীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর বিনিময়ে সিউল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রকল্পে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কাঠামো অনুযায়ী, ধাপে ধাপে কিস্তিতে নগদ ২০০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হবে, যার বার্ষিক সীমা ২০ বিলিয়ন ডলার। বাকি ১৫০ বিলিয়ন ডলার জাহাজ নির্মাণ ও অন্যান্য কৌশলগত খাতে বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ।
দেশীয় বিনিয়োগের হিড়িকে মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়ছে
সরকারের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দক্ষিণ কোরীয় বিনিয়োগকারীদের বিদেশি সম্পদের প্রতি তীব্র আগ্রহও ওনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব ফাইন্যান্সের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বিদেশি সিকিউরিটিজে এত দ্রুত অর্থ ঢেলেছেন যে তা দেশের মোট চলতি হিসাবের উদ্বৃত্তকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে স্থানীয় বাজারে ডলারের জোগানে কাঠামোগত ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
উচ্চ মুনাফার আশায় বিদেশে বিনিয়োগ এবং দেশীয় অর্থনীতির অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষা নেওয়া—দুটিই এই পুঁজিপ্রবাহের পেছনে কাজ করছে। ব্যাংক অব কোরিয়া প্রায় ৪২০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিচালনা করে। বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে এই অর্থের প্রায় ৯০ শতাংশ সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়। আগে এই মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করে রিজার্ভ বাড়ানো হতো। কিন্তু নতুন কাঠামোর আওতায় তা যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যবহার করা হবে।
সরকারের দাবি, রিজার্ভের মূল অর্থ সরাসরি তুলে না নিয়ে এই অর্থায়ন ব্যবস্থা দেশীয় ডলার-ওন বাজারে প্রভাব কমিয়ে রাখবে। তবে এর চূড়ান্ত প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকেরা সন্দিহান। শিনহান ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক হা গন-হ্যং বলেন, পুঁজি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাবে—এই বিষয়টিই ওনের মৌলিক অবস্থান দুর্বল করে। হানওয়া ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের অর্থনীতিবিদ লিম হ্যে-ইউন বলেন, দেশে বিনিয়োগ হতে পারত এমন অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ করা হবে, যা মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে ওনের দর বাড়ার সম্ভাবনা সীমিত করবে।
বাস্তবায়নে বিলম্ব নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক বাড়ানোর হুমকি
বিনিয়োগের সময়সূচি রাজনৈতিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে বাণিজ্য উত্তেজনা হঠাৎ বেড়েছে। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন, চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করতে সিউলের আইনসভা ব্যর্থ হয়েছে—এই অভিযোগে তিনি দক্ষিণ কোরীয় গাড়ি, কাঠ, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্যের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করবেন।
ঘোষণাটি দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তাদের বিস্মিত করে। বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু এর কয়েক দিন আগে দাভোসে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবায়নে বিলম্ব নিয়ে কোনো অভিযোগ শোনেননি। এই হুমকিতে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর কার্যকর হওয়া শুল্ক হ্রাস বাতিল হবে। তখন জাপানি প্রতিযোগীদের সঙ্গে সমতা আনতে কোরীয় গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের ব্লু হাউস দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, চুক্তি বাস্তবায়নে দেশটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। লির প্রধান নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা জরুরি বৈঠক ডাকেন। শিল্পমন্ত্রী বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে দেখা করতে ওয়াশিংটন যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি জানায়, বিনিয়োগ তহবিল ও তা পরিচালনাকারী করপোরেশন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচটি মুলতবি বিল বিরোধীদের সমর্থন পেলে ফেব্রুয়ারিতে পাস হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক বাণিজ্য আলোচক চোই সুক-ইয়ংয়ের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক বাড়ানোর হুমকি একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। অশুল্ক বাধা নিয়ে চলমান আলোচনায় ছাড় আদায়ে যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করছে। অনলাইন খুচরা বিক্রিতে সক্রিয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কুপাংয়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপসহ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে এমন দক্ষিণ কোরীয় বিধিবিধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ জানিয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি স্থগিত সিউলের
ওনের বড় ধরনের দরপতনের মুখে দক্ষিণ কোরীয় কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। অর্থমন্ত্রী কু ইউন-চল জানুয়ারির মাঝামাঝি নিশ্চিত করেন, প্রকল্প বাছাইয়ে সময় লাগা এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতার প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে পরিকল্পিত প্রথম ২০ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি বরাদ্দ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এই বিলম্ব আগের প্রত্যাশা থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন। দক্ষিণ কোরিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখা ও বাজারে অস্থিরতা ঠেকানোর জন্যই মূল কাঠামোতে বার্ষিক বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ২০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মুদ্রা পরিস্থিতিতে এই নিয়ন্ত্রিত গতিও অতিরিক্ত দ্রুত বলে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের অবস্থান সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানান, বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ অপেক্ষা করবে। তবে মুদ্রার জন্য কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যস্তর জানানো হয়নি।
সময়সূচি আরও পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, শিগগিরই ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার কথা। এ নিয়ে অনিশ্চয়তাও প্রক্রিয়াটিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই স্থগিতাদেশ কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে। সিউল ওনের আরও দরপতন ঠেকাতে চাইলেও ওয়াশিংটন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দ্রুত পূরণের প্রত্যাশা করছে।
ওয়াশিংটনের বিরল মৌখিক হস্তক্ষেপ
অস্বাভাবিক এক পদক্ষেপে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি কোরীয় মুদ্রার পক্ষে সরাসরি বক্তব্য দেন এবং সাম্প্রতিক দরপতনকে অতিরিক্ত বলে অভিহিত করেন। অর্থমন্ত্রী কুর সঙ্গে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রকাশিত তাঁর মন্তব্য ছিল কোনো বাণিজ্য অংশীদারের মুদ্রার বিনিময়মূল্য নিয়ে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার উদ্বেগ জানানোর বিরল দৃষ্টান্ত।
বেসেন্ট বলেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা কাম্য নয়। এতে বোঝা যায়, বিনিয়োগ চুক্তির সাফল্যের জন্য স্থিতিশীল ওন যে গুরুত্বপূর্ণ, তা ওয়াশিংটনও স্বীকার করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চোই জি-ইয়ং বলেন, সাম্প্রতিক বড় দরপতন নিয়ে দুই অর্থমন্ত্রী উদ্বেগ ভাগ করে নিয়েছেন এবং সম্মত হয়েছেন যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য মুদ্রার স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।
এই হস্তক্ষেপের পরও সিউল ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। চোই বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট দেখা দিলেই কেবল মুদ্রা বিনিময় চুক্তির কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ডলারের জোগান এখনো পর্যাপ্ত। এর বদলে দুই পক্ষই বিনিয়োগ কীভাবে করা হবে, তা এমনভাবে সাজানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে যাতে বাজারে ধাক্কা কম লাগে। কর্মকর্তারা এখন স্বীকার করছেন, শুরুতেই তহবিল ছেড়ে দিলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
কোরীয় বন্ড থেকে সরে যাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা
মুদ্রার অস্থিরতায় দক্ষিণ কোরিয়ার বন্ডবাজার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুঁজি বেরিয়ে গেছে, যা ওনের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মাত্র তিনটি লেনদেন পর্বে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১০.৪ ট্রিলিয়ন ওন (৭.৪ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের কোরীয় সরকারি বন্ড ফিউচার বিক্রি করেন। কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর কোনো এক সপ্তাহে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রত্যাহারগুলোর একটি।
লেনদেনকারীরা জানান, এসব বন্ড বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ ডলারে রূপান্তর করা হয়েছে, যা বিনিময় হারের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করেছে। তিন বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার বেড়ে ২.৫৬২ শতাংশে পৌঁছায়, যা এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের মুনাফার হার বছরের শুরু থেকে সর্বোচ্চ ২.৯৪৩ শতাংশে ওঠে।
সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক আন দং-হ্যনের পর্যবেক্ষণ, বিদেশি বন্ড বিনিয়োগকারীরা শুধু বিনিময় হার নিয়ে প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয়, মুদ্রাবাজারের ওঠানামার প্রতিও সাড়া দেন। ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিল নিয়ে আলোচনা অনিশ্চয়তায় ঢাকা থাকায় ওনের অস্থিরতা কোরীয় বন্ড থেকে তাঁদের সরে যাওয়া বাড়াচ্ছে। এতে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে: মুদ্রার দুর্বলতায় পুঁজিপ্রবাহ বেরিয়ে যাচ্ছে, আর তাতে মুদ্রা আরও দুর্বল হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এক দশকব্যাপী অঙ্গীকার, যা দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক সক্ষমতার পরীক্ষা নেবে। বার্ষিক পুঁজিপ্রবাহ ২০ বিলিয়ন ডলারে সীমিত থাকলে এই কর্মসূচির আকার যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সমান হবে। ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। ওনকে অস্থিতিশীল না করে এ ধরনের পুঁজিপ্রবাহ বজায় রাখতে হলে সময় ও বাজার পরিস্থিতি সতর্কভাবে সামলাতে হবে।
অর্থায়ন কাঠামোতে রিজার্ভের মূল অর্থ তোলা নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পাওয়া বিনিয়োগ মুনাফার ওপর নির্ভর করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সরাসরি প্রভাব সীমিত রাখার উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা। তবে এর অর্থ, বর্তমানে বিশ্বের দশম বৃহত্তম দক্ষিণ কোরিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সম্ভবত আর বাড়বে না, স্থবির হয়ে থাকবে। সম্ভাব্য বাজার অস্থিরতা সামলাতে বিশ্বজুড়ে আরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। ফলে একসময় কোরিয়ার অবস্থান অন্যদের পেছনে পড়ে যেতে পারে।
কোরিয়া ক্যাপিটাল মার্কেট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক লি হিয়ো-সপ সতর্ক করে বলেন, ডলারের চাহিদা বাড়বে—এমন প্রত্যাশার মধ্যে তীব্র অবমূল্যায়নের চাপ পড়লে প্রতি ডলারের বিপরীতে ওনের দর দ্রুত ১,৫০০-তে নেমে যেতে পারে। এই পর্যায়ে পৌঁছালে তা আধুনিক দক্ষিণ কোরীয় মুদ্রানীতির জন্য নজিরবিহীন হবে এবং আরও কঠোর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে গত সপ্তাহে দুই সরকারের অবস্থান কিছুটা নরম হতে দেখা গেছে। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া কোনো সমাধানে পৌঁছাবে। এদিকে বিনিয়োগ তহবিলের আইনি কাঠামো তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সিউল। এর সমাধান শুধু কোরীয় মুদ্রার গতিপথই নয়, এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্কের স্থিতিশীলতাও নির্ধারণ করতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির জন্য পুঁজি বিদেশে যাওয়ার আশঙ্কায় কোরীয় ওনের দর ২০০৯ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে প্রতি ডলারে প্রায় ১,৪৭০-এ লেনদেন হয়েছে।
- ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার বাসিন্দারা বিদেশি সিকিউরিটিজে ১২৯.৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন, যা দেশটির ১০১.৮ বিলিয়ন ডলারের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্তের চেয়েও বেশি।
- মুদ্রার অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে সিউল বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রথম ২০ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধের আগে দেওয়া স্থগিত করেছে।
- সিউলের আইনসভা বিনিয়োগ চুক্তি বাস্তবায়নে ধীরগতিতে এগোচ্ছে—এই অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোরীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার হুমকি দিয়েছেন।
- মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ওনের দরপতনকে অতিরিক্ত বলেছেন, যা বিরল মৌখিক হস্তক্ষেপ। তবে সিউল মুদ্রা বিনিময় চুক্তির প্রস্তাব নাকচ করেছে।
- সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তিনটি লেনদেন পর্বে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ৭.৪ বিলিয়ন ডলারের কোরীয় বন্ড ফিউচার বিক্রি করে অর্থ ডলারে রূপান্তর করেন, যা মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়ায়।
- ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিতে রয়েছে বছরে সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলারের কিস্তিতে নগদ ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। বাকি অর্থ জাহাজ নির্মাণ ও কৌশলগত খাতে যাবে।






