উত্তর থেকে আসা নতুন সমরাস্ত্র
রয়্যাল থাই আর্মি চীনে তৈরি আরও ২০টি ভিএন-১ সাঁজোয়া যান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা জোট থাকা সত্ত্বেও সামরিক সরঞ্জামের জন্য ব্যাংকক ক্রমেই বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে; এই ক্রয় সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। ১ বিলিয়ন বাত (প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার) মূল্যের চুক্তিটি ১২ জানুয়ারি বেইজিংয়ে চায়না নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ গ্রুপ করপোরেশনের (নরিনকো) সদর দপ্তরে স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে থাই সেনাবাহিনীর অস্ত্র বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাত্তাপর্ন খুয়ান-ইয়াম এবং চীনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সূচিপত্র
সর্বশেষ এই ক্রয়ের ফলে চীনের জেডবিএল-০৯ পদাতিক যুদ্ধযানের একটি সংস্করণ থাইল্যান্ডের ভিএন-১ বহরে যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা ১২০টির বেশি হবে। কম্বোডিয়ার সঙ্গে চলমান সীমান্ত উত্তেজনায় সম্মুখসারির পদাতিক বাহিনীর সক্ষমতা জোরদারের অগ্রাধিকার বেড়েছে। ব্যাংককের ২০২৫ সালের প্রতিরক্ষা বাজেটের বরাদ্দের অংশ হিসেবে এই কেনাকাটা করা হচ্ছে। সরকার-টু-সরকার কাঠামোর আওতায় চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে, যা চীন-থাইল্যান্ড সামরিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক রূপের প্রতিফলন।
এই লেনদেন বৃহত্তর এক প্রবণতার সর্বশেষ অধ্যায় মাত্র। সেই প্রবণতায় থাইল্যান্ডের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান নিয়েছে চীন। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীন থেকে ৩৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সামরিক সরঞ্জাম পেয়েছে ব্যাংকক; যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেয়েছে ২০ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সরঞ্জাম। ন্যাটোর বাইরের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র থাইল্যান্ডের সামরিক কাঠামোয় চীনা সরঞ্জাম যুক্ত হওয়ার কৌশলগত পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাবমেরিন নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েন
সাঁজোয়া যান কেনার খবর সম্প্রতি আলোচনায় এলেও, চীন-থাইল্যান্ড প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখনো এস২৬টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন কেনার দীর্ঘসূত্রতা। গত মাসে রয়্যাল থাই নেভির অ্যাডমিরাল নারেস ওংত্রাকুল সাবমেরিনটির নির্মাণকাজ দেখতে চীন সফর করেন। বেইজিংয়ের কাছ থেকে ব্যাংককের অর্ডার দেওয়া একক সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এটি। প্রথম সাবমেরিনটির জন্য প্রায় ৪১ কোটি ২০ লাখ ডলার (১৩.৫ বিলিয়ন বাত) মূল্যের এই প্রকল্পে বারবার বিলম্ব হয়েছে। ২০১৯ সালে উহানে সাবমেরিনটির হাল নির্মাণ শুরু হয়েছিল।
জার্মানি চীনে এমটিইউ৩৯৬ ডিজেল ইঞ্জিন রপ্তানি আটকে দিলে প্রকল্পটির কাজ থমকে যায়। ১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে দমন-পীড়নের পর আরোপিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে জার্মানি এই সিদ্ধান্ত নেয়। চীনে তৈরি বিকল্প ইঞ্জিন গ্রহণে প্রথমে আপত্তি জানায় ব্যাংকক এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কঠোর পরীক্ষা দাবি করে। ৬ হাজার ঘণ্টার বেশি ইঞ্জিন পরীক্ষা শেষে চীনা কর্তৃপক্ষ সনদ দিলে সংশোধিত চুক্তির আওতায় কাজ এগোয়। সংশোধিত চুক্তিতে নির্মাণকাজের সময় ৪০ মাস বাড়ানো হয়েছে। ফলে সরবরাহের সময় ২০২৮ সালের শেষ দিকে পিছিয়েছে; এতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও নৌসদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত মূল্য ছাড়াও এই সাবমেরিন চুক্তির প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। করাল বেল স্কুল অব এশিয়া প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক গ্রেগ রেমন্ড ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণে বলেন, থাইল্যান্ডের সাবমেরিন কেনা ভূরাজনৈতিক সংকেত দেওয়ার প্রচেষ্টা। ওয়াশিংটন বা বেইজিং—কোনো এক পক্ষের সঙ্গে এককভাবে জোটবদ্ধ হওয়ার বদলে প্রতিপক্ষের আধিপত্য ঠেকিয়ে স্বায়ত্তশাসন ও কৌশলগত অস্পষ্টতাকে অগ্রাধিকার দেয় ব্যাংকক।
শীতল যুদ্ধের অংশীদার থেকে জটিল সম্পর্কে
বর্তমান অস্ত্র কেনার ধারা যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড জোটের ঐতিহাসিক গতিপথ থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি। ১৯৫৪ সাল থেকে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। ওই বছর থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থায় (সিয়াটো) যোগ দেয় এবং ম্যানিলা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ব্যাংকক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য অংশীদার। মার্কিন অভিযানকে সহায়তা করতে ৩৭ হাজারের বেশি সেনা পাঠায় তারা এবং ইন্দোচীনজুড়ে যুদ্ধাভিযানের জন্য উ-তাপাও বিমানঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেয়। কমিউনিজমের বিস্তার নিয়ে শীতল যুদ্ধকালীন অভিন্ন উদ্বেগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে দৃঢ় করে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থাইল্যান্ডকে ন্যাটোর বাইরের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তবে ২০০৬ ও ২০১৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হওয়ার পর অংশীদারত্বে গুরুতর টানাপোড়েন দেখা দেয়। ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের জবাবে ওয়াশিংটন ৩৫ লাখ ডলারের সামরিক সহায়তা স্থগিত করে এবং যৌথ মহড়া কমিয়ে দেয়। এতে যে শূন্যতা তৈরি হয়, বেইজিং আগ্রহের সঙ্গে তা পূরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে কিছু সহযোগিতা পুনরায় চালু করলেও, ওই ঘটনাগুলো থাই সামরিক নেতৃত্বের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। তাদের ধারণা হয়, মানবাধিকার বা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই চীন আরও নির্ভরযোগ্য সহায়তা দেয়।
হুমকি সম্পর্কে দুই পক্ষের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও জোটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওয়াশিংটন চীনকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো একটি স্থিতাবস্থাবিরোধী শক্তি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে, বেইজিংকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে না ব্যাংকক। থাই সামরিক নেতারা বরং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও সীমান্ত নিরাপত্তায় মনোযোগ দিয়েছেন, যেসব অগ্রাধিকার ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যের সঙ্গে সব সময় মেলে না।
জোটের চেয়ে বাস্তববাদ
চীনা অস্ত্রের দিকে ঝোঁকার ব্যাখ্যায় থাই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক জোটের চেয়ে বাস্তব বিবেচনাকে গুরুত্ব দেন। প্রধান আকর্ষণ হলো সাশ্রয়ী দাম। চীনা সামরিক সরঞ্জামের দাম সাধারণত মার্কিন বা ইউরোপীয় সমমানের সরঞ্জামের তুলনায় অনেক কম। বাজেটের সীমাবদ্ধতা সামলে পুরোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করা বাহিনীকে আধুনিক করার সময় ব্যাংককের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা সমমানের ব্যবস্থার তুলনায় অনেক কম খরচে পদাতিক বাহিনীকে সহায়তার সক্ষমতা দেয় ভিএন-১ যানগুলো।
এ ছাড়া, চীনা অস্ত্র চুক্তিতে মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্ত বা অস্ত্রের ব্যবহার পর্যবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকে না, যা প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন মিলিটারি সেলসের সঙ্গে যুক্ত। কংগ্রেসের তদারকি বা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে উপদেশ ছাড়া সরল লেনদেন পছন্দ করেন—এমন থাই সামরিক নেতাদের কাছে এই নমনীয়তা আকর্ষণীয়। ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের পর ওয়াশিংটন সহায়তা স্থগিত করেছিল, অথচ একই সময়ে মিশরের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছিল। এতে মার্কিন নীতির অসংগতির ধারণা তৈরি হয় এবং শর্তহীন সহযোগিতা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
অস্ত্র কেনার এই কৌশল থাইল্যান্ডের বাঁশ-কূটনীতির ঐতিহ্যকেও প্রতিফলিত করে। নমনীয়তা ও শিকড়ের দৃঢ়তাই এই পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য। বাতাসে বাঁশ যেমন নুয়ে পড়ে, তেমনি ব্যাংককও দৃঢ় ভিত্তি বজায় রেখে পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চায়। সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়িয়ে থাইল্যান্ড কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখে এবং কোনো এক শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতা এড়ায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার বিগত শতাব্দীগুলোতে এই অবস্থান রাজ্যটির কাজে এসেছে।
সামরিক মহড়ার বিস্তার
অস্ত্র সরবরাহের বাইরেও চীন-থাইল্যান্ড প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ক্রমেই আরও উন্নত যৌথ সামরিক মহড়ায় বিস্তৃত হয়েছে। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া ফ্যালকন স্ট্রাইক মহড়া প্রাথমিক আকাশযুদ্ধের কৌশল থেকে এখন আগাম সতর্কীকরণ বিমান, বোমারু বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটের অংশগ্রহণে জটিল অভিযানে রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের মহড়ায় আগের বছরগুলোর তুলনায় আরও বিস্তৃত যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট উপাদান ছিল, যা দুই পক্ষের মধ্যে কার্যক্রমগত সমন্বয় আরও গভীর করার অঙ্গীকার দেখায়।
একইভাবে, দুই দেশের সামরিক বাহিনী এখন স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন ক্ষেত্রেই বার্ষিক মহড়া চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাইল্যান্ডের মহড়ার তুলনায় এগুলো এখনো কম উন্নত হলেও, নিছক প্রতীকী প্রদর্শনের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক নৌ-সহযোগিতায় সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল ও সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্থল মহড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।
তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতায় স্পষ্ট সীমারেখা বজায় রেখেছে থাইল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এফ-১৬ ও এফ-৫ যুদ্ধবিমান থাকা সত্ত্বেও, চীনের সঙ্গে মহড়ায় এই মার্কিন-উৎপত্তির সরঞ্জাম মোতায়েন নিষিদ্ধ করে এমন চুক্তি মেনে চলে থাই বাহিনী। প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় ওয়াশিংটন এই বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী অংশীদারদের মধ্যে ব্যাংকককে যে জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, এই নিষেধাজ্ঞা তারই দৃষ্টান্ত।
বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পথ চলা
থাইল্যান্ডের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী চাপের মধ্যে সতর্কভাবে পথ চলতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সাঁজোয়া যান কেনার তাৎক্ষণিক কারণ হলো কম্বোডিয়ার সঙ্গে চলমান সীমান্ত বিরোধ; বিরোধপূর্ণ মন্দির এলাকা ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে। ব্যাংকক ও নমপেন—দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে আগ্রাসনের অভিযোগ তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মালয়েশিয়ার তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে থাইল্যান্ড দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক নমনীয়তা ধরে রাখতে চায় থাইল্যান্ড। চীন দেশটির বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় তার সঙ্গে জোরালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে রাজ্যটি। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সহ-আয়োজনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বহুজাতিক সামরিক মহড়া কোবরা গোল্ডও আয়োজন করে থাইল্যান্ড। এই দ্বিমুখী পন্থায় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান না নিয়েই দুই সম্পর্ক থেকে সুবিধা নিতে পারে ব্যাংকক।
এই কৌশলে ঝুঁকিও রয়েছে। চীনে সম্ভাব্য প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিরাপত্তা-উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের মতো সবচেয়ে উন্নত সরঞ্জাম থাইল্যান্ডের কাছে বিক্রিতে অনীহা দেখিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, রিমে কথিত নৌঘাঁটিতে প্রবেশাধিকারসহ প্রতিবেশী কম্বোডিয়ায় বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, থাই সীমান্তের কাছাকাছি চীনের শক্তি প্রক্ষেপণের সক্ষমতা নিয়ে ব্যাংককের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। থাই ভূখণ্ডে প্রবেশ করে মেকং নদীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার টহল পরিচালনা নিয়ে চীনের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে থাইল্যান্ড। এতে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমঝোতার সীমা স্পষ্ট হয়েছে।
ওয়াশিংটনের অব্যাহত সম্পৃক্ততা
চীনা সরঞ্জামের দিকে ঝোঁকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ডের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা-সম্পৃক্ততা বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রাইকার পদাতিক বাহক, ব্ল্যাক হক ও লাকোটা হেলিকপ্টার, এফ-১৬ আধুনিকায়ন প্যাকেজ এবং হারপুন ক্ষেপণাস্ত্রসহ সক্রিয় ফরেন মিলিটারি সেলস চুক্তির আওতায় ব্যাংককের কাছে ৩০০ কোটির বেশি ডলারের সরঞ্জাম রয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২১ অর্থবছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থাইল্যান্ডে ৬০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি সরাসরি বাণিজ্যিক প্রতিরক্ষা রপ্তানির অনুমোদন দেয়।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শুধু সরঞ্জাম বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে পেশাগত সামরিক শিক্ষাও রয়েছে। শুধু ২০২২ সালেই থাইল্যান্ডের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ২৪৪টি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেন। এর মধ্যে মার্কিন সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনাও ছিল। এই শিক্ষাসংযোগ রয়্যাল থাই আর্মড ফোর্সেসের ভবিষ্যৎ নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ায়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগ ও মানবিক সহায়তার সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও অর্থায়ন করে যুক্তরাষ্ট্র।
উচ্চপর্যায়ের সাম্প্রতিক সফরগুলো সম্পর্কটির গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াশিংটনের উপলব্ধির ইঙ্গিত দেয়। ২০২২ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন—দুজনই ব্যাংকক সফর করেন এবং সামরিক আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় সহায়তার অঙ্গীকার করেন। থাইল্যান্ডে গণতন্ত্রের অবনমন নিয়ে চলমান উদ্বেগ সত্ত্বেও, নতুন করে অঙ্গীকারের সংকেত দিয়ে বাইডেন প্রশাসন ২০২৩ সালের কোবরা গোল্ড মহড়ায় অংশ নিতে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন দল পাঠানোর অনুমোদন দেয়।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আরও ২০টি চীনা ভিএন-১ সাঁজোয়া যান কেনার জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের চুক্তি করে থাইল্যান্ড; এতে দেশটির বহরে যানসংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে
- ৪০ কোটির বেশি ডলারের এস২৬টি সাবমেরিন চুক্তির কাজ জার্মান ইঞ্জিন রপ্তানি নিষেধাজনিত কয়েক বছরের বিলম্বের পর আবার শুরু হয়েছে; সরবরাহের সময় নির্ধারিত হয়েছে ২০২৮ সাল
- ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৩৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সরঞ্জাম সরবরাহ করে চীন থাইল্যান্ডের শীর্ষ অস্ত্র সরবরাহকারী হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে ২০ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সরঞ্জাম
- কোবরা গোল্ড মহড়া, সক্রিয় ৩০০ কোটি ডলারের ফরেন মিলিটারি সেলস চুক্তি এবং বিস্তৃত পেশাগত সামরিক শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে ঐতিহ্যগত যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে
- কম্বোডিয়ার সঙ্গে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা সামলানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটন বা বেইজিং—কোনো এক পক্ষের সঙ্গে এককভাবে জোটবদ্ধ না হয়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে থাইল্যান্ড






