মার্চে গওয়াংহামুন স্কয়ারে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় কে-পপ তারকা বিটিএসের প্রত্যাবর্তন এরই মধ্যে সিউলের আবাসনচিত্র বদলে দিচ্ছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটির কাছের হোটেলগুলোর ভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ভক্তদের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বহুল প্রতীক্ষিত কনসার্ট যত এগিয়ে আসছে, ২১ মার্চের অনুষ্ঠানকে ঘিরে আগের ও পরের দিনগুলোর জন্য জংনো ও জুং জেলার আবাসনগুলোর ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। গওয়াংহামুন স্টেশনের কাছে চার তারকা কোরিয়ানা হোটেলে ফেব্রুয়ারির কোনো শনিবার রাতে একটি কক্ষের ভাড়া সাধারণত ২ লাখ ২৫ হাজার ওন (১৫৬ ডলার)। কিন্তু ২১ মার্চের জন্য একই কক্ষের ভাড়া রাখা হয়েছে অবিশ্বাস্য ১৩ লাখ ৫০ হাজার ওন, যা প্রায় ৫০০ শতাংশ বেশি। একই তারিখে প্রেসিডেন্ট হোটেলও ভাড়া ২ লাখ ৫ হাজার ওন থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ওন করেছে।
ভাড়া বৃদ্ধি বড় হোটেলেই সীমাবদ্ধ নেই, ছোট আবাসনগুলোতেও একই চিত্র। এলাকার মোটেলগুলোতেও ভাড়া বেড়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানে শনিবারের সাধারণ ভাড়া প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ওন থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৮০ হাজার ওন করা হয়েছে, আরেকটি প্রতিষ্ঠান তাদের ২ লাখ ১০ হাজার ওনের কক্ষের ভাড়া বাড়িয়ে করেছে ৬ লাখ ৩০ হাজার ওন। বিলাসবহুল ফোর সিজনসসহ কিছু পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির দিনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও সব কক্ষ ইতিমধ্যে বুক হয়ে গেছে।
বিটিএসের প্রত্যাবর্তনে অর্থনৈতিক প্রভাব
বিটিএসের প্রত্যাবর্তনের অভূতপূর্ব ব্যাপকতা বিবেচনায় নিলে ভাড়ার এই নাটকীয় বৃদ্ধি বিস্ময়কর নয়। তিন বছর নয় মাস পর সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ দল হিসেবে গওয়াংহামুনে এটিই তাদের প্রথম পরিবেশনা। সব সদস্যের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা শেষ হওয়ার পর এই বিনা মূল্যের অনুষ্ঠানটি দলটির পঞ্চম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যালবাম “আরিরাং” প্রকাশের সূচনা হিসেবেও কাজ করবে। অ্যালবামটি ২০ মার্চ প্রকাশের কথা রয়েছে।
বুকিংয়ের ব্যাপক চাপের কথা জানিয়ে নাইন ট্রি বাই পারনাস সিউল ইনসাদংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “বিটিএস গওয়াংহামুন স্কয়ারে পরিবেশনা করবে—এই খবর ছড়ানোর পর থেকে আমরা ধীরে ধীরে বেশি বুকিং পেতে শুরু করেছি।”
আবাসনের বাইরেও অর্থনৈতিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য ব্যবসার আশা করছে। গওয়াংহামুনের কাছে একটি রেস্তোরাঁ চালান ৫৫ বছর বয়সী পাক উন-হো। তিনি বলেন, “আগে বিশ্বকাপের সময় রাস্তায় সমর্থকদের উল্লাস বা কনসার্ট হলে অনেক বিদেশি আসতেন, বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যেত। বিটিএসের এই কনসার্টেও আমরা বিদেশি পর্যটকের বড় ঢল আশা করছি।”
এই অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি বিশাল। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিটিএসের প্রত্যাবর্তন দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনুমানিক ২ লাখ ভক্ত সিউলের কেন্দ্রস্থলে আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে অনুষ্ঠান ঘিরে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য শহরের পর্যটনচিত্র বদলে যাবে।
সিউলের বাইরেও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ
ভাড়া বৃদ্ধির ঘটনা শুধু সিউলের গওয়াংহামুন এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। ১২ ও ১৩ জুন বুসানে বিটিএসের ওয়ার্ল্ড ট্যুরের কনসার্ট হওয়ার কথা। সেখানেও আবাসনগুলোর ভাড়া দশ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। দোংনে জেলায় একটি আবাসনে ১০ জুন যে কক্ষের ভাড়া ছিল ৬৮ হাজার ওন, কনসার্টের দিনগুলোর জন্য তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৬৯ হাজার ওন। গিজাং কাউন্টির আরেকটি আবাসনে ১০ জুনের ৯৯ হাজার ওনের ভাড়া ১২ ও ১৩ জুনের জন্য বাড়িয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার ওন করা হয়েছে।
বিটিএসের কনসার্ট হওয়ার কথা এমন শহরগুলোতে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল মাসে ট্যুরের উদ্বোধনী পরিবেশনার আয়োজন করবে গিয়ংগি প্রদেশের গোয়াং। সেখানকার স্টেডিয়ামের কাছের বড় হোটেলগুলো ইতিমধ্যে পুরোপুরি বুক হয়ে গেছে। সোনো ক্যালম ও গ্লোস্টার হোটেলে যথাক্রমে ৮২৬ ও ৪২২টি কক্ষ রয়েছে। ৯, ১১ ও ১২ এপ্রিলের কনসার্টের তারিখগুলোতে সব কক্ষ বুক করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বুকিংয়ের বিপুল অনুরোধ আসায় ছোট আবাসনগুলোতেও নজিরবিহীন চাহিদা দেখা যাচ্ছে। বুসানের দোংনে জেলার এক হোটেল কর্মকর্তা বলেন, “জুনের মাঝামাঝি সময়টা সাধারণত ভরা মৌসুম নয়, কিন্তু হঠাৎ করে বুকিংয়ের ঢল নেমেছে। বিটিএসের কনসার্টের খবর ছড়ানোর পরপরই আমাদের বাকি ১০০টি কক্ষ পুরোপুরি বুক হয়ে যায়।”
সরকারি পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ
বাড়তে থাকা সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলো অতিরিক্ত দাম নেওয়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে, যদিও সেগুলোর কার্যকারিতা সীমিত।
সিউল মেট্রোপলিটন সরকার এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সক্রিয়। সিউল সিটির এক কর্মকর্তা বলেন, “আজ থেকে আমরা পর্যটন বিভাগ ও জেলা কার্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে জংনো ও জুং জেলার আবাসনগুলো পরিদর্শন করছি।” জংনোর প্রায় ২৮০টি এবং জুংয়ের ৪১১টি আবাসন এই পরিদর্শনের আওতায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ঘোষিত মূল্যশ্রেণি অনুযায়ী কক্ষভাড়া যথাযথভাবে প্রকাশ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আবাসন পরিচালনাকারীদের নির্ধারিত মূল্য প্রকাশ্যে টাঙিয়ে রাখতে হয়। ঘোষিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার শাস্তি হিসেবে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া থেকে শুরু করে বারবার নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থার প্রভাব সীমিত, কারণ আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো ঘোষিত ভাড়া সংশোধন করতে পারে।
এই পরিদর্শনের উদ্দেশ্য হলো স্বেচ্ছায় সংযত থাকার আহ্বান জানানো। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং আবাসন পরিচালনাকারীদের অতিরিক্ত উচ্চ ভাড়া নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত—এই বার্তাও দেওয়া হচ্ছে।
এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও সরকারি কর্মকর্তারা আইনি সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। সিউলের এক কর্মকর্তা বলেন, “কক্ষভাড়ার কোনো আইনি সর্বোচ্চ সীমা নেই। তাই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রকাশ করা মূল্যশ্রেণির মধ্যে ভাড়া রাখলে, তা স্বাভাবিকের তুলনায় তিন বা পাঁচ গুণ বেড়ে গেলেও শাস্তি দেওয়া কঠিন।”
বুসানে পরিস্থিতি আরও জোরালো পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বুসানের মেয়র পাক হিয়ং-জুন জানিয়েছেন, ‘সাশ্রয়ী মূল্যের’ আবাসনগুলোর জন্য প্রণোদনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে তাঁর শহর। স্বরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের পরিচালিত এই কর্মসূচিতে যুক্তিসংগত ভাড়া নেওয়া আবাসনগুলোকে করছাড় ও প্রচারের সহায়তার মতো সুবিধা দেওয়া হয়। বর্তমানে বুসানে মাত্র পাঁচটি আবাসন এই কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত।
বুসানের পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রেসিডেন্ট ই জে-মিয়ংও। তিনি ভাড়া বৃদ্ধিকে “বিদ্বেষপূর্ণ শোষণ” বলে আখ্যা দিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ই লেখেন, “এটি বিদ্বেষপূর্ণ শোষণ, যা পুরো বাজারের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এবং সবার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে। এর অবসান ঘটাতেই হবে।” তিনি কর্তৃপক্ষকে আরও নির্দেশ দিয়েছেন, “অন্যায্যভাবে অর্জিত লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়—এমন ব্যবস্থা নিতে।”
অতিরিক্ত বুকিং ও জোর করে বুকিং বাতিল
ভক্তদের হতাশা আরও বাড়িয়েছে অতিরিক্ত বুকিং ও জোর করে বুকিং বাতিলের অভিযোগ। শুধু বুসানেই অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়ে কোরিয়া ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের কিউআর কোডভিত্তিক অভিযোগব্যবস্থায় ৯০টির বেশি অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
দেগুর এক ভক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, একটি হোটেল তাঁকে আগে থেকে নিশ্চিত করা বুকিং বাতিল করতে বলেছে। তিনি লেখেন, “এটা আনন্দের সময় হওয়ার কথা। তার বদলে কোথায় থাকব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ছি।” নিশ্চিত বুকিং বাতিল করে বেশি ভাড়ায় কক্ষ আবার বিক্রি করার সন্দেহজনক ঘটনা এতটাই ছড়িয়েছে যে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
বিশ্বজুড়েও বিটিএসের ভক্তরা একই সমস্যায় পড়ছেন। ফিলিপাইনের এক ভক্ত লিখেছেন, ট্যুরের সূচি ঘোষণার পর তাঁর নিশ্চিত করা দুটি বুকিং বাতিল করা হয়েছে। তিনি লেখেন, “চার রাতের জন্য ৪ লাখ ৫৬ হাজার ওনে একটি কক্ষ বুক করেছিলাম, কিন্তু হোটেলটি আমাকে নিশ্চিত বুকিং বাতিল করতে বলছে। আজ আবার খোঁজ নিয়ে দেখলাম, ঠিক একই কক্ষটি এখনো পাওয়া যাচ্ছে, তবে ভাড়া দেখাচ্ছে ৩০ লাখ ওনের বেশি।”
বাজারের গতিপ্রকৃতি ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
ভাড়ার এই উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে অর্থনীতির মৌলিক নীতি—চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যে সাময়িকভাবে বিপুল চাপ তৈরি হওয়া। বিটিএসের কনসার্টে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজিরবিহীন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, অথচ বড় অনুষ্ঠানস্থলগুলোর কাছাকাছি আবাসনের সংখ্যা সীমিত। তাই স্বল্পতার প্রতিফলন হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ভাড়া বাড়ছে।
তবে ভাড়া বৃদ্ধির মাত্রা ও গতি ন্যায্যতা এবং বাজারে কারসাজি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু আবাসন হয়তো পরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত বুকিং নিচ্ছে, নিশ্চিত বুকিং বাতিল করে বেশি ভাড়ায় কক্ষ আবার বিক্রি করছে, অথবা তারিখগুলো আগে থেকেই বন্ধ রেখে পরে বেশি দামে আবার বুকিংয়ের জন্য খুলছে।
বুসানের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, “কোনো নির্দিষ্ট ভাড়া অন্যায্য—এটি আইনি পথে প্রমাণ করা খুবই কঠিন। ধরা পড়লেও প্রায়ই শুধু জরিমানা করা যায়, যা বাস্তবে অপরাধ ঠেকানোর মতো কার্যকর নয়।”
বুসান কর্তৃপক্ষ ‘অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ জানাতে কিউআর কোড ব্যবস্থা’ চালু করেছে। অন্যায্য মূল্য নির্ধারণের প্রমাণ মিললে হোটেলের রেটিং মূল্যায়নে সেই লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার মতো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে বুসান মেট্রোপলিটন সরকার জেলা প্রশাসন, ভোক্তা সংগঠন ও আতিথেয়তা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ বৈঠকও করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি আবাসনে থাকার সুযোগ বাড়ানো এবং বড় অনুষ্ঠানের সময় সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস খুলে দেওয়া।
কোরিয়া ফেয়ার ট্রেড কমিশন বুকিংয়ের তারিখের ১০ দিনের মধ্যে বাতিলের ক্ষতিপূরণ নিয়ে শুধু বাধ্যতামূলক নয় এমন নির্দেশিকা দেয়। ফলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় যে ঘাটতি রয়ে গেছে, তা দূর করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেক সমালোচক।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রভাব
ভাড়া নিয়ে বিতর্ক বিটিএসের প্রত্যাবর্তনের অনন্য সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেছে। ২০১০ সালে অভিষেকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে দলটি, যার নামের অর্থ Beyond the Scene। বিশ্বজুড়ে সম্মিলিতভাবে ‘আর্মি’ নামে পরিচিত লাখো ভক্তকে সংগঠিত করার ক্ষমতা তাদের এমন এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে, যার প্রভাব সংগীত বিক্রির বাইরেও পর্যটন, ফ্যাশন ও ভোগ্যপণ্য পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই প্রত্যাবর্তনের বিশেষ সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। অ্যালবামের নাম “আরিরাং” একটি ঐতিহ্যবাহী কোরীয় লোকগানের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা ২০১২ সালে ইউনেস্কোর মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো বলেছে, বিরতির পর নিজেদের কোরীয় শিকড়ে ফিরে যাওয়া এবং বিশ্বজুড়ে কোরীয় সংস্কৃতি তুলে ধরার লক্ষ্যকে আরও এগিয়ে নেওয়ারই ইঙ্গিত এই নাম।
ফোর্বস লিখেছে, “বিটিএস সব সময় তাদের সংগীতের কেন্দ্রে কোরীয় পরিচয়কে রেখেছে।” বিবিসির পূর্বাভাস, “পুনর্মিলনের কাহিনি তুলে ধরা এই অ্যালবাম বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের কাছে ‘হান’ ও ‘আশা’র অনন্য কোরীয় অনুভূতি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হবে।”
অর্থনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি বিটিএস কনসার্ট থেকে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ওনের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হয় বলে অনুমান করা হয়। বিবিসির পূর্বাভাস, এই ওয়ার্ল্ড ট্যুর থেকে মোট আয় ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ওন) ছাড়িয়ে যাবে।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব, বিশ্বজুড়ে ভক্তগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিক প্রভাবের সম্মিলনে আবাসনগুলোকে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে সুপারস্টারদের বিপুল জনপ্রিয়তার যুগে বাজারের নৈতিকতা ও ভোক্তা সুরক্ষা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন উঠছে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও সম্ভাব্য সমাধান
২১ মার্চ গওয়াংহামুন কনসার্টের দিন যত এগিয়ে আসছে, বাজারের শক্তির সঙ্গে ভোক্তা সুরক্ষার ভারসাম্য রাখতে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজছে কর্তৃপক্ষ।
এ পর্যন্ত বুসানের তুলনায় বেশি সতর্ক অবস্থান নেওয়া সিউল জানিয়েছে, সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনগুলোর জন্য সহায়তা বাড়ানো নিয়ে আলোচনা “চলছে”, যদিও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে জংনো জেলায় এ ধরনের মাত্র দুটি আবাসন রয়েছে।
বিকল্প আবাসনের সুযোগ বাড়ানো একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বুসানে বড় অনুষ্ঠানের সময় আবাসনের জোগান বাড়াতে এবং হোটেলবাজারের ওপর চাপ কমাতে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও সরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলে দেওয়ার কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য ভাড়া, জোগান ও ভোক্তা সুরক্ষা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠানভিত্তিক পর্যটননীতি প্রণয়ন করতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে:
- অনুষ্ঠানের আগেই পরিকল্পনা করে বিকল্প আবাসন চিহ্নিত করা ও সেগুলোর প্রচার
- বিটিএসের অনুষ্ঠানস্থল রয়েছে এমন এলাকায় কৌশলগতভাবে আরও হোটেল নির্মাণ
- বড় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে ভোক্তা সুরক্ষার ব্যবস্থা উন্নত করা
- ভাড়া ও বুকিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো
- অসৎ উদ্দেশ্যে বুকিং বাতিলের জন্য কঠোরতর শাস্তি
এই বিতর্ক সুপারস্টার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ এবং স্থানীয় বাজারে এর অসম প্রভাবের একটি দৃষ্টান্ত। গাড়িতে ঘুমানোর কথা মজা করে বলা দেগুর সেই উদ্বিগ্ন ভক্তের মতো অনেকের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, জীবনে একবার আসা এমন একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উত্তেজনা বাস্তব সমস্যা ও বাজারে শোষণের কারণে ম্লান হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব যখন বিটিএসের প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং তা থেকে ওঠা নৈতিক প্রশ্নগুলো নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। আপাতত থাকার জায়গা খুঁজতে থাকা ভক্তদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত—অতিরিক্ত চড়া ভাড়া দেওয়া, নাকি বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা; সবই সংগীতের ইতিহাসের অংশ হওয়ার জন্য।
অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলে মনে করলে অতিথিরা কোরিয়া ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন পরিচালিত কিউআর কোডভিত্তিক অভিযোগব্যবস্থায় অভিযোগ জানাতে পারেন। আধুনিক কনসার্টের অভিজ্ঞতার অনিবার্য অংশ বলে অনেকে যা মনে করেন, তার বিরুদ্ধে এটুকুই প্রতিকারের সুযোগ।
মূল বিষয়গুলো
- ২১ মার্চ বিটিএসের কনসার্ট ঘিরে সিউলের গওয়াংহামুন স্কয়ারের কাছের হোটেলভাড়া স্বাভাবিকের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে
- কোরিয়ানা হোটেলে ভাড়া ২ লাখ ২৫ হাজার ওন থেকে বেড়ে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ওন হয়েছে; প্রেসিডেন্ট হোটেলে ২ লাখ ৫ হাজার থেকে বেড়ে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ওন
- জুনে বুসানের কনসার্ট ঘিরেও একইভাবে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে, ভাড়া বেড়েছে দশ গুণ পর্যন্ত
- বুসানে ৯০টির বেশি অভিযোগ এসেছে; সিউলে ভাড়া বৃদ্ধি ও জোর করে বুকিং বাতিলের বিষয়ে ৩টি অভিযোগ পাওয়া গেছে
- সরকারগুলো পরিদর্শন চালালেও অতিরিক্ত ভাড়ার জন্য শাস্তি দেওয়ার আইনি ক্ষমতা সীমিত
- সামরিক সেবা শেষ করার পর প্রায় চার বছরে এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ দল হিসেবে পরিবেশনা করবে বিটিএস
- অনুষ্ঠানের জন্য ২ লাখের বেশি ভক্ত সিউলে আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে
- সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন সমাধান খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ






