ব্যাংককে অপূর্ণ এক স্বপ্ন
ব্যাংককে বসবাসরত ইংরেজি শিক্ষক ২৭ বছর বয়সী খাওচাত মানখংয়ের জন্য ২০২৬ সালটি নতুন জীবনের সূচনা হওয়ার কথা ছিল। কয়েক মাস ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সামলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর, মার্কিন স্বামীর সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন থাইল্যান্ডসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ায় মুহূর্তেই ভেস্তে যায় সেই পরিকল্পনা।
সূচিপত্র
নীতিতে আকস্মিক এই পরিবর্তনে থাই সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ ও স্থিতিশীলতার গন্তব্য হিসেবে দেখা হাজারো পরিবার, কর্মী ও শিক্ষার্থী এর প্রভাবে পড়েছেন। এ ঘোষণায় শুধু ব্যক্তিগত জীবনই ব্যাহত হয়নি, থাইল্যান্ডের জন্য কূটনৈতিক সংকটও তৈরি হয়েছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক চুক্তিভিত্তিক মিত্র, অথচ এখন তাকে গুরুতর অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে একই তালিকায় রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশের অভিবাসীরা "অগ্রহণযোগ্য হারে" কল্যাণ-সুবিধা দাবি করেন, তাদের লক্ষ্য করেই এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক সচ্ছল প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং দেশটির সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকা থাইল্যান্ডের অনেকেই এ ব্যাখ্যায় বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ।
আমি হতবাক; ভাবিনি তারা স্থায়ী ভিসা বা বিয়ের ভিসায় হস্তক্ষেপ করবে," আল জাজিরাকে বলেন খাওচাত। "কিন্তু এখন সবকিছু কত বছরের জন্য স্থগিত থাকবে, তা কে জানে।
এই অনিশ্চয়তায় আটকে পড়া অনেকের মতো খাওচাতও মনে করেন, এ যুক্তি তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি নিজের আর্থিক স্বনির্ভরতা ও ভাষাগত দক্ষতার কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করেন, স্বামীর সঙ্গে বসবাসের পথে তাঁকে বাধা দেওয়া হবে কেন।
"তারা যদি যাচাই করতে চায়, তাহলে ভাষাগত দক্ষতা পরীক্ষা করুক, আর্থিক হিসাব দেখুক," তিনি বলেন। "আমার ভাষাগত দক্ষতা আছে, টাকা আছে। যাকে ভালোবাসি তার সঙ্গে বসবাসে আমাকে বাধা দেওয়া হবে কেন?"
স্থগিতাদেশের পরিধি
২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়া এই স্থগিতাদেশ সাম্প্রতিক মার্কিন ইতিহাসে বৈধ অভিবাসনের ওপর আরোপিত সবচেয়ে ব্যাপক বিধিনিষেধগুলোর একটি। সরকারি বিবৃতি এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি স্মারক অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর সব ধরনের অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া এতে স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি কর্মীদের কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানভিত্তিক ইবি-শ্রেণির ভিসা এবং পরিবারকে একত্র করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের কে-শ্রেণির ভিসা।
এই নীতির ভিত্তি হলো অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের "সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা" সংক্রান্ত বিধান। এ আইনি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এমন কাউকে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানাতে পারে, যিনি সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। কয়েক দশক ধরে এই নিয়ম চালু থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসন এর সংজ্ঞা ও প্রয়োগের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো আবেদনকারী কখনো সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন কি না, তা নির্ধারণে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বয়স, স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা ও ইংরেজিতে দক্ষতাসহ নানা বিষয় বিবেচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ সুরক্ষায় এই পদক্ষেপকে প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরকারি সহায়তার বোঝা হয়ে উঠবেন, এমন সম্ভাব্য অভিবাসীদের অযোগ্য ঘোষণা করতে পররাষ্ট্র দপ্তর তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। এর মাধ্যমে তারা মার্কিন জনগণের উদারতার সুযোগ নেবেন," এক বিবৃতিতে বলেন পিগট। "এই ৭৫টি দেশ থেকে অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। এ সময় পররাষ্ট্র দপ্তর অভিবাসন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করবে, যাতে কল্যাণ-সহায়তা ও সরকারি সুবিধা নেবেন এমন বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ঠেকানো যায়।
উল্লেখ্য, পর্যটক (বি-১/বি-২), শিক্ষার্থী (এফ/এম) বা অস্থায়ী কর্মীদের (এইচ-১বি) মতো অভিবাসী নন—এমন ভিসার ক্ষেত্রে এই স্থগিতাদেশ প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, থাই নাগরিকেরা স্বল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারলেও স্থগিতাদেশ চলাকালে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস বা জীবন গড়ে তুলতে পারবেন না।
অপ্রত্যাশিত অন্তর্ভুক্তি
৭৫টি দেশের তালিকায় থাইল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি ব্যাপক বিভ্রান্তি ও বিতর্ক তৈরি করেছে। তালিকায় রয়েছে আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও ইউক্রেনের মতো সংঘাতপূর্ণ দেশ এবং হাইতির মতো গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশ। অন্যদিকে, থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
পরিসংখ্যান দেখে মনে হয়, থাইল্যান্ডকে লক্ষ্য করার পক্ষে প্রশাসনের যুক্তির সঙ্গে এর তথ্য মেলে না। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে থাই-প্রধান পরিবারের ২০২৩ সালের গড় মধ্যম বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৮২ হাজার ডলার। সব মার্কিন পরিবারের জাতীয় গড় ৭৫ হাজার ডলারের চেয়ে এ অঙ্ক বেশি। এ ছাড়া, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য বলছে, অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় থাইল্যান্ডের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে অবস্থানের হার বেশ কম। এতে বোঝা যায়, থাই পর্যটক ও অভিবাসীরা সাধারণত অবস্থানের শর্ত মেনে চলেন।
পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, থাই প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সফলভাবে সমাজে মিশে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে। তাঁদের অনেকেই রেস্তোরাঁ বা কারখানায় কম বেতনের কাজ দিয়ে শুরু করে পরে লাভজনক ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। থাই-আমেরিকানদের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে "কল্যাণ-সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা"র বয়ানের এই স্পষ্ট অমিল তালিকা তৈরির প্রকৃত মানদণ্ড নিয়ে জল্পনা বাড়িয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র দুই চুক্তিভিত্তিক মিত্রের একটি থাইল্যান্ড। ১৮৩৩ সালে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে। শীতল যুদ্ধের সময় কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রভাব মোকাবিলা—সব ক্ষেত্রেই ছিল তাদের সহযোগিতা। এই প্রেক্ষাপটে কালো তালিকায় থাইল্যান্ডের নাম থাকায় ব্যাংককের কর্মকর্তারা বিশেষভাবে আহত হয়েছেন।
পররাষ্ট্রবিষয়ক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট বলেছে, চুক্তিভিত্তিক মিত্র হওয়া এবং অনিয়মিত অভিবাসনের জন্য কুখ্যাতি না থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ডকে তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত "একেবারেই দুর্বোধ্য"। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না আসায় অন্য ভূরাজনৈতিক বিষয় এতে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিয়ে জল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাস্তুচ্যুতির মানবিক গল্প
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্কের বাইরেও ভিসা স্থগিতের প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনে—যা বাস্তব এবং প্রায়ই বিধ্বংসী। ভেস্তে যাওয়া স্বপ্নের গল্পে ভরে উঠেছে থাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; নীতির পরিবর্তনের চড়া মূল্য সেখানে স্পষ্ট।
২৬ বছর বয়সী থাই নাগরিক সংথম আর্টসমজিতের আমেরিকান স্বপ্নের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। অদক্ষ কর্মীদের জন্য ইবি-৩ ভিসার কাগজপত্র শুরু করতে একটি থাই এজেন্সিকে ৮০০ ডলার দেওয়ার পর উইসকনসিনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। ফ্ল্যাটবেড ট্রেলার তৈরির সংযোজন লাইনে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কাজটিকে তিনি জীবনের "মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সুযোগ" হিসেবে দেখেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ খুলে দিতে পারত।
যুক্তরাষ্ট্রের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্টসমজিতকে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প বেছে নিতে হয়েছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, "তার বদলে ইসরায়েলের একটি সুপারমার্কেটে চাকরি নিয়েছি।" তাঁর কথায় অনেকের হতাশা ফুটে উঠেছে। তিনি স্বীকার করেন, মধ্যপ্রাচ্যে "যুদ্ধের ঝুঁকির" চেয়ে দারিদ্র্য তাঁকে বেশি ভয় দেখায়।
পরিবারগুলোর জন্য ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি। বিবাহিত দম্পতিরা অনির্দিষ্টকাল আলাদা হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন; কেউ কেউ ভয় পাচ্ছেন, তাঁদের সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অধিকার অস্বীকার করা হতে পারে। স্থগিতাদেশের অনির্দিষ্ট মেয়াদ এমন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা অসম্ভব। আবেদনকারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ফরম জমা দিতে ও সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে পারবেন। তবে পররাষ্ট্র দপ্তর কনস্যুলার কর্মকর্তাদের অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের ২২১(জি) ধারায় ভিসা ইস্যু না করার নির্দেশ দিয়েছে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণ বা তথ্য প্রয়োজন এমন আবেদন এই ধারার আওতায় পড়ে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও আঞ্চলিক প্রভাব
এই পরিস্থিতিতে থাই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হতাশা প্রকাশ করেছে। থাইল্যান্ডের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এলিজাবেথ জে. কোনিকের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তালিকায় থাইল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফুয়াংকেতকেও। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে থাই নাগরিকদের অবদান এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ঘটনা সুস্থ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য সহায়ক নয়। কূটনৈতিক মনোভাবের সারসংক্ষেপ টেনে তিনি বলেন, "এ ধরনের প্রশ্ন সম্পর্কের জন্য ভালো নয়।"
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড একা নয়, অন্যরাও এ সিদ্ধান্তে হতাশ। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টি দেশ এই স্থগিতাদেশের আওতায় পড়েছে: আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, লাওস, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও উজবেকিস্তান। অধিকারকর্মী সংগঠন স্টপ এএএপিআই হেটের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইস্যু করা এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের অভিবাসী ভিসার ৪০ শতাংশের বেশি এই দেশগুলোর নাগরিকদের দেওয়া হয়েছে।
প্রভাবিত অন্য দেশগুলোও উদ্বেগ জানিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তারা এই পদক্ষেপকে প্রক্রিয়াগত পর্যালোচনা হিসেবে বর্ণনা করে দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরুর আশা প্রকাশ করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপক পরিধি থেকে বোঝা যায়, এটি সাময়িক কোনো ত্রুটি নয়; বরং প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন কৌশলের মূল অংশ।
থাইল্যান্ডে বসবাসরত মার্কিন নাগরিক এবং এশিয়া হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার অ্যাডভোকেটসের পরিচালক ফিল রবার্টসন বিদেশি সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন।
"ট্রাম্প প্রশাসন সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়; তারা সবকিছুকে লেনদেনের দৃষ্টিতে দেখে," আল জাজিরাকে বলেন রবার্টসন। তিনি নীতিটিকে "নির্দয় ও নিষ্ঠুর" আখ্যা দিয়ে বলেন, প্রশাসন এত বাধা তৈরি করবে যে এসব দেশের মানুষের পক্ষে অভিবাসন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দেশের ভেতরের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক বিভাজন
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলো ভিসা স্থগিতের তীব্র সমালোচনা করেছে। স্টপ এএএপিআই হেট নীতিটির বিরোধিতা করে জোরালো বিবৃতি দিয়েছে এবং একে বর্ণবৈষম্যের শিকার শ্রমজীবী মানুষের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংগঠনটির ভাষ্য, এই স্থগিতাদেশের লক্ষ্য "তাদের দূরে ঠেলে দিয়ে আমেরিকাকে এমন একটি দেশে রূপান্তর করা, যেখানে শুধু শ্বেতাঙ্গ ও ধনীদেরই যোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে।"
সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, তালিকাভুক্ত দেশের ৯০ শতাংশই ইউরোপের বাইরের, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বর্ণবৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর। তাদের যুক্তি, "সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা" সংক্রান্ত বিধানের আগ্রাসী সম্প্রসারণ নিম্ন আয়ের পরিবারকে শাস্তি দেয় এবং জাতি, জাতিগত পরিচয় বা ভাষাগত দক্ষতার ভিত্তিতে খামখেয়ালি পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি করে।
সমালোচকেরা ক্যাটো ইনস্টিটিউট ও আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিলের মতো সংস্থার গবেষণার কথাও তুলে ধরেন। এসব গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের তুলনায় অভিবাসীরা সরকারি সুবিধা কম ব্যবহার করেন। সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজ উল্লেখ করেছে, ফেডারেল আইন অনুযায়ী অধিকাংশ অভিবাসী বসবাসের প্রথম পাঁচ বছর আয়-ভিত্তিক সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। এতে স্থগিতাদেশের যুক্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে এই নীতির সমর্থকও আছেন। ফ্লোরিডার নাইসভিলে বসবাসরত গ্রিন কার্ডধারী থাই নাগরিক নয়ি কল্যাণ-সুবিধার দাবি সীমিত করতে প্রশাসনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছেন। তিনি প্রশাসনের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেন, নতুন অভিবাসীদের পেছনে করদাতাদের অর্থ ব্যয় করা উচিত নয়।
ট্রাম্প প্রশাসন আসার পর থেকেই বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের সহায়তায় আমাদের করের অর্থ ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা চলছে," আল জাজিরাকে বলেন নয়ি। "অবশ্যই, এতে নিষিদ্ধ হওয়া বিভিন্ন দেশ প্রভাবিত হচ্ছে। কিন্তু মানুষ জেগে উঠছে এবং কী ঘটছে তা দেখতে পাচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতির লেনদেননির্ভর যুগ
ভিসার তালিকায় থাইল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের বৃহত্তর ধারারই অংশ এটি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য রপ্তানিনির্ভর দেশের মতো থাইল্যান্ডও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে থাইল্যান্ডের রপ্তানি পণ্যে ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা বাণিজ্যিক সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে, সমন্বিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা থমকে আছে। এর বড় কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—থাইল্যান্ডকে মার্কিন কৃষি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজার খুলে দিতে হবে। ভিসা স্থগিতের সিদ্ধান্তে উত্তেজনার আরেকটি স্তর যোগ হয়েছে। এতে ইঙ্গিত মিলছে, "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতির অধীনে ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক মিত্রতার কারণে আর অগ্রাধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না।
খাওচাত মানখংয়ের কাছে তাঁর পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার মধ্যে তিক্ত পরিহাস রয়েছে। মূল সাক্ষাৎকারে তিনি এমন একটি জটিলতার কথা জানান, যা রাজনীতি ও ব্যক্তিগত জীবনের জটিল মেলবন্ধন তুলে ধরে। "আমার সঙ্গী ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন," তিনি বলেন। এই স্বীকারোক্তি দেখায়, নীতিটির বিস্তৃত প্রয়োগ প্রশাসনের নিজস্ব সমর্থকদের ঘরেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় অনিচ্ছাকৃত ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
অনির্দিষ্টকালের স্থগিতাদেশ চলতে থাকায় ব্যাংকক ও ওয়াশিংটনের পরিবারগুলো অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। পর্যালোচনা শেষের কোনো সময়সীমা জানায়নি পররাষ্ট্র দপ্তর। ফলে হাজারো আবেদনকারীকে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আপাতত বহু থাই নাগরিকের আমেরিকান স্বপ্ন স্থবির হয়ে আছে—তাদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতির বাইরেও বিস্তৃত এক নীতিগত বিতর্কের হাতে জিম্মি।
মূল কথা
- ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে থাইল্যান্ডসহ ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে।
- যেসব দেশের অভিবাসীরা সরকারি কল্যাণ-সুবিধা ব্যবহারের "উচ্চ ঝুঁকিতে" রয়েছেন বলে মনে করা হয়, তাদের লক্ষ্য করা হয়েছে; যদিও তথ্য বলছে, থাই-আমেরিকানদের গড় মধ্যম আয় যুক্তরাষ্ট্রের গড় আয়ের চেয়ে বেশি।
- ১৮৩৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র থাইল্যান্ড আফগানিস্তান ও সোমালিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ দেশের সঙ্গে একই তালিকায় থাকায় হতাশা ও বিভ্রান্তি প্রকাশ করেছে।
- এই স্থগিতাদেশ পরিবারভিত্তিক ভিসা (কে-শ্রেণি) ও কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসাকে (ইবি-শ্রেণি) প্রভাবিত করে, তবে পর্যটক বা শিক্ষার্থীদের মতো অভিবাসী নন—এমন ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
- নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই স্থগিতাদেশ বর্ণবাদী ও শ্রেণিবৈষম্যমূলক; অন্যদিকে সমর্থকেরা বলেন, এতে করদাতাদের অর্থ সুরক্ষিত হবে।
- যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর ইতোমধ্যে ১৯ শতাংশ শুল্কের মুখে থাকা থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে এই নীতি।






