ভাইরাল কুকি ও কে-পপ কার্ড দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রক্তসংকট মোকাবিলা করছে দক্ষিণ কোরিয়া

পড়তে 9 মিনিট
ভাইরাল কুকি ও কে-পপ কার্ড দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রক্তসংকট মোকাবিলা করছে দক্ষিণ কোরিয়া

গুরুতর সমস্যার মিষ্টি সমাধান

দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য সিউলের এক ব্যস্ত এলাকায় ২১ বছর বয়সী অফিসকর্মী চোই সাং-হুন সম্প্রতি এমন একটি কাজ করেছেন, যা দেশটির অনেক মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি দীর্ঘ লাইনে না দাঁড়িয়েই দেশটির বহুল কাঙ্ক্ষিত একটি খাবার পেয়েছেন—স্থানীয়ভাবে “দুজ্জনকু” নামে পরিচিত দুবাই-ধাঁচের চিবোনো কুকি। সাধারণত বেকারির বাইরে এই কুকির জন্য দীর্ঘ লাইন থাকে। এই দুর্লভ খাবার পাওয়ার বিনিময়ে তিনি কেনাকাটা করেননি; বরং গওয়াংহোয়ামুন রক্তদান কেন্দ্রে নিজের রক্ত দান করেছেন।

সূচিপত্র
  1. গুরুতর সমস্যার মিষ্টি সমাধান
  2. জনসংখ্যাগত চাপ সংকটকে আরও তীব্র করছে
  3. সংকট কীভাবে তৈরি হয়
  4. ভাইরাল প্রবণতার শক্তি
  5. তারকাসংস্কৃতিও বিনিময়ের মাধ্যম
  6. কার্যকারিতা ও সংশয়
  7. প্রণোদনার ব্যয়
  8. স্বাস্থ্যগত বিবেচনা
  9. রক্তের নিরাপত্তায় ভবিষ্যৎ কৌশল
  10. মূল বিষয়গুলো

ভাইরাল মিষ্টান্নের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-সহায়তা পাওয়ার এই উদ্যোগ কোরিয়ান রেড ক্রসের নেওয়া এক অভিনব কৌশলকে তুলে ধরেছে। রক্তের তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে সংস্থাটি দাতাদের ক্লিনিকে আনতে পপ সংস্কৃতির প্রবণতা ও ভাইরাল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাচ্ছে। জনসেবামূলক প্রচলিত আবেদন থেকে সরে এসে এই পদ্ধতিতে বর্তমান সময়ের নির্দিষ্ট খাবার ও তারকাদের পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে এক ধরনের বিনিময়ভিত্তিক মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

কৌশলটি তাৎক্ষণিক ফল দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সীমিত সংস্করণের এসব খাবার যেদিন দেওয়া হয়, সেদিন রক্তদান কেন্দ্রগুলোতে ভোরেই ভিড় দেখা যায় এবং দাতার সংখ্যা স্বাভাবিকের দ্বিগুণ, এমনকি তিন গুণও হয়। এ ধরনের প্রণোদনার দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও দাতার সংখ্যা কমে যাওয়ার চাপে থাকা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য তাৎক্ষণিক প্রভাব সাময়িক স্বস্তি এনে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জনসংখ্যাগত চাপ সংকটকে আরও তীব্র করছে

কুকি ও ফটোকার্ড দেওয়ার উদ্যোগটি নিছক সৃজনশীল বিপণন কৌশল নয়। এর পেছনে রয়েছে গুরুতর ও ক্রমাবনতিশীল পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা। দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে জনসংখ্যাগত দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে, যা দেশটির রক্ত সরবরাহের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। দেশটি এখন “অতিবৃদ্ধ সমাজে” পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো দেশের জনসংখ্যার ২১ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বা তার বেশি হলে তাকে অতিবৃদ্ধ সমাজ বলা হয়। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার প্রয়োজন বেশি; এর মধ্যে অস্ত্রোপচার ও রক্ত সঞ্চালন প্রয়োজন এমন চিকিৎসাও রয়েছে।

একই সময়ে, তরুণ ও সুস্থ রক্তদাতার সংখ্যা কমছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রজনন হার বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন, যা ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ০.৭৫। জনসংখ্যার এই পতনের অর্থ, যোগ্যতার বয়স পেরিয়ে যাওয়া বয়স্ক দাতাদের জায়গায় রক্তদাতা হিসেবে যোগ দেওয়ার মতো তরুণের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পরিসংখ্যানে পতনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। কোরিয়ান রেড ক্রস ও তথ্য ও পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বছরে অন্তত একবার রক্তদান করেছেন এমন মানুষের সংখ্যা গত দশকে ২৫.৪ শতাংশ কমেছে।

২০১৪ সালে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন মানুষ রক্ত দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ১.২৬ মিলিয়নে দাঁড়ায়, যা ২০০৫ সালে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর সর্বনিম্ন। ফলে জাতীয় রক্তের মজুত নিরাপদ মাত্রায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত বছর মাত্র ২৪৮ দিন রক্ত সরবরাহ পর্যাপ্ত মাত্রায় ছিল; বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় মজুত প্রয়োজনীয় লক্ষ্যমাত্রার নিচে ছিল। প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে অন্তত পাঁচ দিনের রক্ত মজুত রাখার মানদণ্ড পূরণে সংস্থাটি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশটি ধারাবাহিকভাবে “সতর্ক পর্যবেক্ষণ” পর্যায়ে রয়েছে।

সংকট কীভাবে তৈরি হয়

পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে রক্ত তৈরি করা যায় না। স্বেচ্ছাসেবীদের সদিচ্ছার ওপরই এটি পুরোপুরি নির্ভরশীল। রক্তের বিভিন্ন উপাদান নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সংরক্ষণ করা যায় না। লোহিত রক্তকণিকা সর্বোচ্চ ৪২ দিন সংরক্ষণ করা সম্ভব, আর অণুচক্রিকা থাকে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন। ঘাটতি এড়াতে প্রতিদিন নিয়মিত রক্তদানের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে দাতার সংখ্যা কমে গেলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যকার ব্যবধান দ্রুত সংকুচিত হয়। তখন হাসপাতালগুলোকে পরিকল্পিত অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দিতে হয়, অথবা জরুরি আঘাতের চিকিৎসায় রক্ত জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়।

গওয়াংহোয়ামুন রক্তদান কেন্দ্রে তিন দশক ধরে কাজ করছেন নার্স শিন গুম-ওক। তিনি সংকটের চাপ সরাসরি দেখেছেন। তাঁর কথায়, রক্তের মজুত প্রায়ই টানাটানিতে থাকে, কখনো কখনো রক্ত সঞ্চালনও পিছিয়ে যায়। এই নাজুক ভারসাম্যই রেড ক্রসকে কেন্দ্রগুলোতে মানুষের আনাগোনা বাড়ানোর অভিনব উপায় খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে সামাজিকভাবে আকর্ষণীয় জিনিসের মাধ্যমে প্রচলিত ভাউচার ও নাশতার গণ্ডি পেরিয়ে যেতে চাইছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

ভাইরাল প্রবণতার শক্তি

দুবাই-ধাঁচের কুকি বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল বাজারের প্রবণতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে “দুবাই চকলেট” নিয়ে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনার ঢেউয়ে দক্ষিণ কোরিয়াতেও এই কুকির প্রতি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মার্শম্যালো গলিয়ে চিবোনো টেক্সচার তৈরি করে, তার সঙ্গে চকলেট মিশিয়ে এবং পেস্তা ক্রিম ও কাদাইফ নামে পরিচিত মিহি ছেঁড়া পেস্ট্রি ভরে বানানো এই মিষ্টান্ন এখন রীতিমতো আলোড়ন তুলেছে।

এর চাহিদা ছিল অভাবনীয়। দেশটির সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন নেভারের তথ্য অনুযায়ী, প্রচারণার আগের তিন মাসে এই মিষ্টান্নটি নিয়ে অনলাইন অনুসন্ধান বিশ গুণেরও বেশি বেড়েছিল। খাবার সরবরাহের অ্যাপে এক মাসে অনুসন্ধান বেড়েছিল ১,৫০০ গুণ। খাবারটির অপ্রতুলতার কারণে বেকারির বাইরে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। শীতের হিমশীতল সকালে মানুষ ভোর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছে।

দুর্লভ এই কুকি সংগ্রহ করে কোরিয়ান রেড ক্রস মানুষের একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রেরণাকে কাজে লাগিয়েছে। রক্তদানের পুরস্কারটির অনুভূত মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। চোই সাং-হুনের মতো দাতার কাছে অন্য কোথাও সহজে না পাওয়া একটি খাবার পাওয়ার সুযোগ তাৎক্ষণিক ও বাস্তব তৃপ্তি দিয়েছে, যা সাধারণ জুসের বাক্স বা ধন্যবাদ কার্ড দিতে পারত না। কৌশলটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর প্রমাণিত হয়। ১৬ জানুয়ারি সিউলের আটটি কেন্দ্রে কুকি দেওয়ার দিন ৬৬৮ জন রক্ত দেন, যা আগের শুক্রবারের তুলনায় ১১৬ শতাংশ বেশি।

“সাধারণত সকাল ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত আমরা চার-পাঁচজন দাতাকে দেখি, কিন্তু আজ এসেছেন ১৪ জন—দ্বিগুণেরও বেশি,” প্রথম দিনেই কুকি বিতরণের তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখে বলেন শিন গুম-ওক।

তারকাসংস্কৃতিও বিনিময়ের মাধ্যম

খাবারের বাইরেও কোরিয়ার পপ সংস্কৃতির বিপুল জনপ্রিয়তার কথা স্বীকার করেছে রেড ক্রস। কে-পপ দলের ফটোকার্ড সংগ্রহযোগ্য জিনিস; ভক্তরা প্রায়ই এগুলো বিনিময় করেন বা বিক্রি করেন। নির্বাচিত রক্তদান কেন্দ্রগুলোতে জনপ্রিয় দল ENHYPEN-এর ফটোকার্ড দিয়ে সংস্থাটি এমন একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেছে, যারা তরুণ দাতার প্রয়োজনের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে।

তারকাদের প্রভাব এই কুকি-উন্মাদনার পেছনে এই প্রথম কাজ করেনি। কে-পপ তারকাদের প্রচারণা এই প্রবণতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে উসকে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, গার্ল গ্রুপ IVE-এর জাং ওন-ইয়ং ইনস্টাগ্রামে এমন একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তাঁর ঠোঁটে চকলেটের গুঁড়া লেগে ছিল। এতে “দুজ্জনকু লিপ” নামে আরেকটি প্রবণতা তৈরি হয়। তারকাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়, এমন বিদ্যমান প্রভাববলয়ের সঙ্গে কৌশলে যুক্ত হয়েছে রেড ক্রস।

বিজ্ঞাপন

কার্যকারিতা ও সংশয়

দাতার সংখ্যা যে বেড়েছে, তা অনস্বীকার্য। তবে রক্তদানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। যারা প্রথমবার রক্ত দিচ্ছেন বা এত দিন দ্বিধায় ছিলেন, তাঁদের জন্য প্রণোদনা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ধাক্কা দিচ্ছে। ২১ বছর বয়সী কলেজছাত্রী কিম জো-উন স্বীকার করেছেন, কুকিটিই ছিল তাঁর আসার প্রধান কারণ।

এর আগে রক্তদানের ব্যাপারে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না, তাই শুধু দুজ্জনকুর জন্য আসতে একটু লজ্জা লাগছিল,” বলেন কিম জো-উন। তবে তিনি আরও বলেন, “দুজ্জনকুর ব্যাপার না থাকলেও আমার আরও নিয়মিত রক্তদান করা উচিত।

এতে বোঝা যায়, প্রণোদনা মানুষকে কেন্দ্রে নিয়ে এলেও রক্তদানের অভিজ্ঞতা তাঁদের মধ্যে পরোপকারের মনোভাব গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে আবার রক্ত দিতে উৎসাহ জোগাবে। রেড ক্রসের আশা, প্রথমবার রক্তদানের অভিজ্ঞতা একবারের জন্য কুকি নিতে আসা ব্যক্তিদের নিয়মিত, আজীবন রক্তদাতায় রূপান্তর করবে। ৩৪ বছর বয়সী অফিসকর্মী হোয়াং দে-ইয়ংও এ সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি দাতাকে আকৃষ্ট করে। অণুচক্রিকা ও প্লাজমা সংগ্রহে বেশি সময় লাগে বলে সেগুলোর চাহিদা আছে এমন এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিকভাবে আয়োজন করলে তা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত রক্তদাতারা এসব প্রচারণায় তেমন প্রভাবিত হন না। ৫৯ বছর বয়সী ইয়াং চুং-মো বহু বছর ধরে নিয়মিত রক্ত দিচ্ছেন। নিবন্ধন করার পরই তিনি কুকি দেওয়ার খবর জানতে পারেন। এ ধরনের কৌশলের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

“এ ধরনের প্রচারণা রক্তদানের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলে বলে আমার মনে হয় না,” বলেন ইয়াং চুং-মো। তাঁর মতে, অধিকাংশ নিয়মিত দাতা বাইরের কোনো পুরস্কারের কথা না ভেবেই রক্ত দেন।

এই বিভাজন রক্তদান ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে: অল্পসংখ্যক নিবেদিতপ্রাণ ও নিয়মিত দাতার ওপর নির্ভরতা, পাশাপাশি দাতার সংখ্যা কমে যাওয়া ঠেকাতে ক্রমাগত নতুন দাতা যুক্ত করার প্রয়োজন। প্রণোদনা নতুন দাতার সংখ্যা বাড়াতে সফল হলেও, অভ্যাস বা নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকে যাঁরা আগেই রক্ত দেন, তাঁদের উৎসাহিত করতে খুব একটা ভূমিকা রাখে না।

বিজ্ঞাপন

প্রণোদনার ব্যয়

ভোক্তাদের কাছে উচ্চমূল্যের পণ্য দিয়ে প্রণোদনা দেওয়ার কৌশলে লজিস্টিক ও আর্থিক বিবেচনার বিষয় রয়েছে। দুবাই-ধাঁচের কুকি সস্তা নয়। ওজন মাত্র ৫০ গ্রাম হলেও, এই মিষ্টান্নের গড় দাম প্রায় ৬,৫০০ ওন, অর্থাৎ প্রায় ৪.৪০ ডলার। প্রতিটি কেন্দ্রে দিনে সাধারণত কয়েক শ কুকি দেওয়া হয় বলে, প্রচলিত নাশতার তুলনায় সংগৃহীত প্রতি একক রক্তের পেছনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

এ ছাড়া, এই কুকি নিয়ে উন্মাদনার অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়েছে। কাঁচামালের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। দাম পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, খোসাসহ পেস্তার দাম এক মাসে চার গুণ বেড়েছে, আর কাদাইফের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এই মূল্যস্ফীতির অর্থ, রেড ক্রসকে হয় বাড়তি দামে বিপুল পরিমাণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো খোলা বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এতে খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে, কিংবা ভবিষ্যতের প্রচারণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য জোগাড় করা কঠিন হতে পারে।

এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি বাড়ানো ও টেকসই করার বিষয়টিও রয়েছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী, ভাইরাল প্রবণতা ক্ষণস্থায়ী। পরবর্তী খাবারের প্রবণতা এলে দুবাই কুকির উন্মাদনাও একসময় স্তিমিত হবে। বর্তমানের “আকর্ষণীয়” পণ্যের ওপরই রেড ক্রস নির্ভর করলে, তাদের ক্রমাগত নতুন ও আকর্ষণীয় পণ্য সংগ্রহ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম সরবরাহকারী দল এবং খাবার থেকে পণ্যসামগ্রী—বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনায় দ্রুত পরিবর্তনের উপযোগী নমনীয় বাজেট।

স্বাস্থ্যগত বিবেচনা

স্বাস্থ্যসেবার প্রণোদনা হিসেবে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত, চিনিসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়ার মধ্যে কিছুটা বিদ্রূপও রয়েছে। দুবাই কুকি নিয়ে স্বাস্থ্য সতর্কতা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা; তাঁদের মতে, একেকটি কুকিতে ৫০০ ক্যালরি পর্যন্ত থাকতে পারে। কোরিয়া ইউনিভার্সিটি গুরো হাসপাতাল সতর্ক করেছে, এই মিষ্টান্ন “শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্য তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাহত” করতে পারে এবং “শুধু ওজন বাড়ার বাইরেও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি” হতে পারে। রক্তদান সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর কাজ হলেও, বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় চাপ ফেলে এমন পুরস্কারের সঙ্গে সেটিকে যুক্ত করা পরস্পরবিরোধী বার্তা দিতে পারে। তবে সংকটের সময় রেড ক্রস সম্ভবত এটিকে প্রয়োজনীয় সমঝোতা হিসেবেই দেখছে।

বিজ্ঞাপন

রক্তের নিরাপত্তায় ভবিষ্যৎ কৌশল

কোরিয়ান রেড ক্রস জানিয়েছে, রক্তদানে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন ধরনের পুরস্কারভিত্তিক প্রচারণা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থাটি এসব আয়োজনের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরী ও বিশের কোঠায় বয়স এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করছে। রক্ত সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এই জনগোষ্ঠী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রচলিত আবেদন দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছানো ঐতিহাসিকভাবেই কঠিন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। ভাইরাল প্রণোদনা তাৎক্ষণিক ঘাটতি মেটাতে পারে, কিন্তু কম জন্মহার ও বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করে না। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা একই সঙ্গে শিক্ষা, রক্তদানের বাধা দূর করা এবং তরুণদের মধ্যে নিয়মিত রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

কুকি ও কে-পপ কার্ডের প্রচারণার সাফল্য আধুনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তরুণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হতে স্বাস্থ্যসংস্থাগুলোকে তাদের ভাষায় কথা বলতে হবে—তাদের যোগাযোগমাধ্যম, প্রবণতা ও একসঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে। একই ধরনের দাতা-সংকটে থাকা অন্য দেশগুলোতে এই মডেল কাজে লাগানো যাবে কি না, তা এখনও দেখার বিষয়। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার এই পরীক্ষা জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা সংস্কৃতি ও জনসংখ্যাগত প্রয়োজনের সংযোগস্থলে এক আকর্ষণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

দেশটি সামনে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশা করা হচ্ছে, আজ যারা কুকির জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছে, বছর কয়েক পর তারা আবার ফিরবে—ফটোকার্ডের জন্য নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করে। তত দিন পর্যন্ত রক্তের প্রবাহ সচল রাখতে পরবর্তী ভাইরাল জনপ্রিয়তার সন্ধানে নতুন নতুন উদ্যোগ চালিয়ে যাবে রেড ক্রস।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • দীর্ঘস্থায়ী রক্তসংকটের মধ্যে রক্তদানে উৎসাহ দিতে দক্ষিণ কোরিয়া ভাইরাল দুবাই-ধাঁচের কুকি ও কে-পপ ফটোকার্ড ব্যবহার করছে।
  • দেশটি অতিবৃদ্ধ সমাজে পরিণত হয়েছে এবং তরুণ দাতার সংখ্যা কমছে; ২০১৪ সালের পর থেকে বছরে রক্তদাতার সংখ্যা ২৫.৪% কমেছে।
  • গত বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় রক্তের মজুত লক্ষ্যমাত্রার নিচে ছিল; ফলে দেশটি প্রায়ই “সতর্ক পর্যবেক্ষণ” পর্যায়ে ছিল।
  • কৌশলটি তাৎক্ষণিক সাফল্য দেখিয়েছে; কুকি দেওয়ার দিন কিছু কেন্দ্রে দাতার সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ হয়েছে।
  • প্রথমবারের দাতাদের আকৃষ্ট করতে প্রণোদনা কার্যকর হলেও, অভ্যাস বা পরোপকারবোধ থেকে রক্ত দেন এমন দীর্ঘদিনের নিয়মিত দাতাদের উৎসাহিত করতে তা তেমন কাজে আসে না।
  • কিশোর-কিশোরী ও বিশের কোঠায় বয়স এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে কোরিয়ান রেড ক্রস।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে