স্বর্ণবাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তারে সাহসী পদক্ষেপ হংকংয়ের
সীমান্তপারের স্বর্ণবাণিজ্যের নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে আগামী সপ্তাহে সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জের সঙ্গে একটি যুগান্তকারী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে হংকং। রোববার অর্থসচিব পল চ্যান মো-পো জানান, ২৬-২৭ জানুয়ারি এশিয়ান ফিন্যান্সিয়াল ফোরামের সময় চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হবে। এর ফলে এশিয়ার দুই প্রধান আর্থিক বাজারের মধ্যে আরও সংযোগ স্থাপনের পথ তৈরি হবে।
সূচিপত্র
- স্বর্ণবাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তারে সাহসী পদক্ষেপ হংকংয়ের
- কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা
- হংকংয়ের স্বর্ণবাজারের বিবর্তন
- চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কৌশলগত সংযোগ
- ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাজারের গতিপ্রকৃতি
- বৃহত্তর আর্থিক পরিষেবা কৌশল
- বিনিয়োগপণ্য ও উদ্ভাবন
- প্রতিযোগিতার চিত্র ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
- বাস্তবায়নের সময়সীমা ও চ্যালেঞ্জ
- দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
- মূল কথা
এই উদ্যোগের লক্ষ্য এমন একটি কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে এবং হংকংয়ে স্বর্ণের বাণিজ্য ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়াবে। চ্যান বলেন, চলতি বছরের মধ্যেই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা এবং ব্যবস্থাটিতে অংশ নিতে সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জকে আমন্ত্রণ জানানোর লক্ষ্য রয়েছে।
স্বর্ণবাজারে নজিরবিহীন তৎপরতার সময়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি। চ্যানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মূল্যবান এই ধাতুর বৈশ্বিক চাহিদার মোট মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
হংকংয়ে স্বর্ণের বাণিজ্য ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়াতে, লেনদেনের খরচ কমাতে এবং বাজারের তারল্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অবকাঠামো হিসেবে একটি কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ আমরা জোরদার করছি।
হংকংয়ের আর্থিক পরিষেবা ও কোষাগারবিষয়ক সচিব ক্রিস্টোফার হুই বলেন, সাংহাইয়ের বাজারের পরিপূরক হিসেবে শহরটি তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাজে লাগাবে, যা জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। এই অংশীদারত্বে হংকংয়ের বৈশ্বিক সংযোগের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডের বিশাল বাজারসম্পদের কৌশলগত সমন্বয় ঘটবে।
কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা
আর্থিক অবকাঠামো সম্পর্কে যাঁদের ধারণা কম, তাঁদের জন্য বলা যায়, আর্থিক লেনদেনে কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। দুই পক্ষ সরাসরি একে অপরের সঙ্গে লেনদেন না করে নিষ্পত্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিটি বিক্রেতার কাছে ক্রেতা এবং প্রতিটি ক্রেতার কাছে বিক্রেতা হয়ে ওঠে। এতে প্রতিপক্ষজনিত ঝুঁকি অনেক কমে যায়। কোনো লেনদেনের এক পক্ষ দায় পালনে ব্যর্থ হওয়া বা চুক্তি মেনে না চলার আশঙ্কাই হলো প্রতিপক্ষজনিত ঝুঁকি।
বর্তমানে হংকংয়ের স্বর্ণবাজারে ওভার-দ্য-কাউন্টার স্পট লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি নিষ্পত্তি হয়। কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু হলে লেনদেনের দুই পক্ষের মাঝখানে একটি নিষ্পত্তি প্রতিষ্ঠান বসিয়ে এই প্রক্রিয়া আধুনিক করা হবে। এতে লেনদেন আরও নিরাপদ ও দক্ষ হবে এবং শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন এমন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে।
নিষ্পত্তি ব্যবস্থা লেনদেনের খরচ কমাতেও এবং বাজারের তারল্য বাড়াতেও সহায়তা করবে। খরচ কমলে আরও বেশি ধরনের অংশগ্রহণকারীর জন্য লেনদেন সহজলভ্য হয়। আর তারল্য বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত না করেই তা কিনতে বা বিক্রি করতে পারেন। লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো প্রতিষ্ঠিত স্বর্ণবাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হংকংয়ের জন্য এসব উন্নতি জরুরি।
হংকংয়ের স্বর্ণবাজারের বিবর্তন
মূল্যবান ধাতুর বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। চীনে প্রবেশ করা স্বর্ণের প্রবেশদ্বার হিসেবেও শহরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পণ্যবাজার কৌশল আধুনিক করার অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি শহরটি ১১৪ বছরের পুরোনো বুলিয়ন এক্সচেঞ্জ পুনর্গঠন করে হংকং গোল্ড এক্সচেঞ্জে রূপান্তর করে।
স্বর্ণের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেনদেনের তৎপরতাও বেড়েছে। চ্যানের তথ্য অনুযায়ী, হংকংয়ে ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধতার স্বর্ণের প্রচলিত বাণিজ্যমান ‘৯৯ গোল্ড’-এর দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২.৯ বিলিয়ন হংকং ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। লেনদেনের এই উল্লম্ফন নিরাপদ বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা—দুই হিসেবেই স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহের প্রতিফলন।
এই লেনদেনের প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা দেওয়ার ভৌত অবকাঠামোও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে হংকংয়ের ব্যস্ত বিমানবন্দরের ভেতরে লুকানো একটি ভল্টে প্রায় ১৫০ টন স্বর্ণ রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। আগামী তিন বছরে এই ধারণক্ষমতা প্রায় সাত গুণে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরের কাছে থাকা মজুতের দ্বিগুণ পরিমাণ স্বর্ণ রাখা যাবে।
তিন বছরের মধ্যে স্বর্ণ সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা ২,০০০ টনের বেশি করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে হংকং সরকার। এ সম্প্রসারণে হংকং আঞ্চলিক স্বর্ণ মজুতের কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ভৌত ভিত্তি পাবে।
চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কৌশলগত সংযোগ
সাংহাইয়ের সঙ্গে অংশীদারত্ব দুই শহরের বিদ্যমান সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে। সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জের আন্তর্জাতিক বোর্ড হংকংয়ে তাদের প্রথম অফশোর সরবরাহ ভল্ট স্থাপন করেছে এবং শহরটিতে সরবরাহের জন্য নতুন চুক্তি চালু করেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য ইউয়ানে স্বর্ণের লেনদেন ও সংরক্ষণের সুবিধা দিতে সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জ ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংক অব চায়না (হংকং) পরিচালিত তাদের প্রথম অফশোর ভল্ট হংকংয়ে চালু করে।
এই ভৌত অবকাঠামো বাজারের আরও গভীর সংযোগের ভিত্তি তৈরি করছে। আসন্ন সমঝোতা স্মারকটি হংকং ও চীনের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে পারস্পরিক বাজারে প্রবেশাধিকারের কাঠামো আনুষ্ঠানিক করবে। ভবিষ্যতে এর ফলে সীমান্তপারের লেনদেন নির্বিঘ্ন হতে পারে। এ ধরনের সংযোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চীনের বিশাল স্বর্ণবাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার দেবে। মূল্যবান এই ধাতুর বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা চীন।
একটি পূর্ণাঙ্গ স্বর্ণ অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলতে হংকং সরকার সক্রিয়ভাবে সহায়তা দিচ্ছে। সংরক্ষণ ও লেনদেনের বাইরেও উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের হংকংয়ে শোধনাগার স্থাপন বা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করা, চীনের মূল ভূখণ্ডে সরবরাহ করা উপকরণ প্রক্রিয়াজাত করে পরিশোধিত স্বর্ণ তৈরি এবং তা হংকংয়ে এনে বাণিজ্যের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা, আর টোকেনভিত্তিক স্বর্ণের মতো নতুন বিনিয়োগপণ্য বিকাশে সহায়তা করা।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাজারের গতিপ্রকৃতি
বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই মার্কিন ডলারে মূল্যায়িত সম্পদ থেকে সরে যাচ্ছেন। এর ফলে বিকল্প মূল্য সংরক্ষণের উপায়ের চাহিদা বেড়েছে। অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণ ঐতিহ্যগতভাবেই এর সুবিধাভোগী।
আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজার ও চীনের মূল ভূখণ্ডের বাণিজ্য অবকাঠামোর মধ্যে সেতু হিসেবে কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে হংকং। শহরটির নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং অফশোর রেনমিনবি তারল্য একে এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার জন্য আদর্শ করে তুলেছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা মার্কিন-কেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে চাইলে, চীনের মূল ভূখণ্ডের বাজারে সরাসরি প্রবেশের মুদ্রা ও নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই হংকং এশীয় স্বর্ণবাজারে প্রবেশের পথ দেয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অর্থসচিব পল চ্যানের নেতৃত্বে পণ্য কৌশল কমিটি গঠন এটাই ইঙ্গিত দেয় যে প্রচলিত আর্থিক পরিষেবার বাইরেও হংকংয়ের পণ্যবাজারের পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এই উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় স্বর্ণবাণিজ্যসহ বিভিন্ন উদ্যোগে সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নিয়ন্ত্রক মনোযোগ নিশ্চিত করবে।
বৃহত্তর আর্থিক পরিষেবা কৌশল
স্বর্ণবাণিজ্যের উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের অবস্থান আরও সুসংহত ও সম্প্রসারণের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। প্রধান নির্বাহী জন লি ২০২৫ সালের নীতিনির্ধারণী ভাষণে একাধিক আর্থিক খাতে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে স্বর্ণবাণিজ্যকে প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
স্বর্ণবাজারের উন্নয়নে কাজ করা ওয়ার্কিং গ্রুপের সুপারিশ গ্রহণ করে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে হংকং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বর্ণ সংরক্ষণাগার স্থাপনে সহায়তা করা, স্বর্ণ তহবিল ইস্যুতে ইস্যুকারীদের সহায়তা করে বিনিয়োগের জন্য আরও নানা ধরনের স্বর্ণপণ্য তৈরি করা এবং স্বর্ণশিল্পের জন্য একটি বাণিজ্য সমিতি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।
সাম্প্রতিক সময়ে হংকংয়ের আর্থিক পরিষেবা খাতে জোরালো গতি দেখা গেছে। হ্যাং সেং সূচক চলতি বছরে এ পর্যন্ত ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫০ বিলিয়ন হংকং ডলারে, যা আগের বছরের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালের আগস্টের শেষে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের মোট পরিমাণ ১৩০ বিলিয়ন হংকং ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। আইপিওর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহে হংকং বিশ্বে প্রথম স্থানে ছিল।
এই সাফল্য পণ্যবাণিজ্যে সম্প্রসারণের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। শহরটির সুপ্রতিষ্ঠিত সুনাম, আইনি কাঠামো এবং আর্থিক অবকাঠামো সেবার পরিসর বাড়াতে এবং বৈশ্বিক স্বর্ণবাণিজ্যের আরও বড় অংশ অর্জনে একে ভালো অবস্থানে রেখেছে।
বিনিয়োগপণ্য ও উদ্ভাবন
ভৌত স্বর্ণের বাণিজ্য ও সংরক্ষণের পাশাপাশি, স্বর্ণবাজারে পুঁজি আকৃষ্ট করতে হংকং উদ্ভাবনী বিনিয়োগপণ্য তৈরি করছে। সরকার টোকেনভিত্তিক স্বর্ণের বিকাশে সহায়তার পরিকল্পনা করছে। এতে ব্লকচেইনে ভৌত স্বর্ণের মালিকানা ডিজিটালভাবে তুলে ধরা হবে, ফলে স্বর্ণের ভগ্নাংশের মালিকানা এবং সহজে লেনদেন সম্ভব হবে।
টোকেনায়ন এমন খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রবেশের বাধা অনেক কমাতে পারে, যাঁরা স্বর্ণে বিনিয়োগের সুযোগ চান, কিন্তু ভৌত বুলিয়ন কেনার সামর্থ্য নেই। এর মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয় এবং ভৌত স্বর্ণ সংরক্ষণ ও বিমার খরচ কমে। এ ধরনের আর্থিক উদ্ভাবন প্রচলিত পণ্যবাণিজ্যের সঙ্গে আধুনিক আর্থিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে হংকংয়ের আগ্রহের পরিচয় দেয়।
হংকং মনিটারি অথরিটি (এইচকেএমএ) সক্রিয়ভাবে ‘প্রজেক্ট এনসেম্বল’-এর প্রচার করছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য টোকেনায়ন বাজারের বিকাশে সহায়তা করা। পরীক্ষামূলক স্যান্ডবক্সের মাধ্যমে প্রকল্পটি খাতের অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতিতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরবর্তী প্রজন্মের আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। এসব উদ্ভাবনের পরীক্ষার জন্য স্বর্ণবাজার আদর্শ ক্ষেত্র হতে পারে।
প্রতিযোগিতার চিত্র ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
স্বর্ণবাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ার উদ্যোগে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে হংকং। বিশেষ করে সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের গ্রাহকদের জন্য সিঙ্গাপুর মূল্যবান ধাতু সংরক্ষণ ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হংকংয়ের সংরক্ষণক্ষমতা বাড়িয়ে সিঙ্গাপুরের সুবিধাগুলো ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা এ বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতারই ইঙ্গিত দেয়।
তবে হংকংয়ের কয়েকটি অনন্য সুবিধা রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণ ভোক্তা চীনের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ‘কানেক্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাজারের সঙ্গে সংযুক্তি বিনিয়োগকারীদের এমন প্রবেশাধিকার দেয়, যা সিঙ্গাপুর দিতে পারে না। এশীয় ও ইউরোপীয়—উভয় বাজারের সময়ের সঙ্গে হংকংয়ের সময় অঞ্চলের মিল থাকায় বিশ্বজুড়ে অংশগ্রহণকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে লেনদেনের সুবিধা পান।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হংকং লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জের অনুমোদিত গুদামস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা পণ্যবাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে তার অবস্থানকে আরও জোরালো করে। একটি বড় আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জের এই স্বীকৃতি হংকংয়ের অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক মানের সত্যতা প্রমাণ করে।
বাস্তবায়নের সময়সীমা ও চ্যালেঞ্জ
লক্ষ্য স্পষ্ট হলেও বিশ্বমানের স্বর্ণবাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তুলতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিষ্পত্তি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ২০২৬ সালের মধ্যে শুরু করার লক্ষ্য থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও বাজারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সতর্ক সমন্বয় দরকার হবে।
সীমান্তপারের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে হংকং ও চীনের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সমন্বয় জরুরি। দুই অঞ্চল ভিন্ন আইনি ব্যবস্থায় পরিচালিত হলেও ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ কাঠামোর আওতায় স্টক কানেক্টের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে এর আগে কার্যকর আর্থিক সহযোগিতা হয়েছে। স্বর্ণবাণিজ্যেও একই ধরনের মডেল কাজ করতে পারে।
বাজার সম্পর্কে সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। হংকংয়ের স্বর্ণবাজারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যেমন ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যে ব্যবহৃত ‘৯৯ তাইয়েল’ মান, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বুঝতে হবে। স্থানীয় বাজারের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের আকৃষ্ট করতে আরও আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
হংকংয়ের স্বর্ণবাণিজ্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষা লেনদেনের বাইরেও পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে অন্তর্ভুক্ত করে। সরকার শোধনাগার স্থাপন, চীনের মূল ভূখণ্ডের শোধনাগারগুলোর সঙ্গে প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা এবং সরবরাহব্যবস্থার অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করছে। এই সমন্বিত উদ্যোগের লক্ষ্য এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
স্বর্ণশিল্পের জন্য একটি বাণিজ্য সমিতি গড়ে উঠলে খাতটির উদ্যোগগুলো সমন্বয়, উত্তম চর্চার প্রসার এবং নিয়ন্ত্রকদের কাছে শিল্পের স্বার্থ তুলে ধরা সহজ হবে। অন্যান্য সফল আর্থিক বাজারের বিকাশে এ ধরনের সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শেষ পর্যন্ত হংকং বিশ্বের বৃহত্তম অফশোর রেনমিনবি ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে তার অবস্থান কাজে লাগিয়ে ইউয়ানে স্বর্ণবাণিজ্য সহজ করতে চায়। এর মধ্যে রেনমিনবিতে মূল্য নির্ধারিত স্বর্ণপণ্য ও পরিষেবা চালু করা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বজায় রেখেই চীনের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ আরও গভীর হবে।
মূল কথা
সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বৈশ্বিক স্বর্ণবাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে হংকং। ভৌত অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, আর্থিক উদ্ভাবন ও বাজারের সংযোগ—এই তিনের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বর্ণবাজার গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
- সীমান্তপারের স্বর্ণবাণিজ্যের নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এশিয়ান ফিন্যান্সিয়াল ফোরামে (২৬-২৭ জানুয়ারি ২০২৬) সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করবে হংকং
- কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ২০২৬ সালের মধ্যে শুরুর লক্ষ্য রয়েছে; এতে অংশ নিতে সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে
- ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ বার্ষিক বৃদ্ধি; তৃতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক চাহিদার মূল্য দাঁড়ায় ১৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- তিন বছরের মধ্যে হংকংয়ে স্বর্ণ সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা ১৫০ টন থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টনের বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে
- ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত হংকংয়ে ৯৯ গোল্ডের দৈনিক গড় লেনদেন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২.৯ বিলিয়ন হংকং ডলারে পৌঁছেছে
- কেন্দ্রীয় নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষজনিত ঝুঁকি ও লেনদেনের খরচ কমানো এবং বাজারের তারল্য বাড়ানো এ উদ্যোগের লক্ষ্য
- ব্যাংক অব চায়না (হংকং) পরিচালিত সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জের প্রথম অফশোর ভল্ট ২০২৫ সালের জুনে হংকংয়ে চালু হয়
- হংকংয়ের পণ্যবাজারের পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পণ্য কৌশল কমিটি গঠন করে
- টোকেনভিত্তিক স্বর্ণ ও ইউয়ানে স্বর্ণবাণিজ্যসহ উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে কাজ করছে হংকং
- বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে শোধনাগার স্থাপন, বিনিয়োগপণ্য বিকাশ এবং স্বর্ণশিল্পের বাণিজ্য সমিতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে






