মাংস আমদানির বরাদ্দে বড় পরিবর্তন আনল ইন্দোনেশিয়া
২০২৬ সালের জন্য মাংস আমদানির কোটা বড় আকারে পুনর্বিন্যাস করেছে ইন্দোনেশিয়া, যা ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার চলতি বছরের জন্য মোট প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার টন মাংস আমদানির বরাদ্দ ঘোষণা করেছে। তবে এই কোটা বণ্টনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) পক্ষে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে আগের বরাদ্দের সামান্য অংশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্যবিষয়ক সমন্বয় মন্ত্রণালয় বেরদিকারি এবং পেরুসাহান পেরদাগাঙ্গান ইন্দোনেশিয়া (পিপিআই)-এর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৫০ হাজার টন বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় মহিষের মাংস ১ লাখ টন, ব্রাজিলের গরুর মাংস ৭৫ হাজার টন এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৭৫ হাজার টন। শিল্পে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার টন।
সূচিপত্র
এর বিপরীতে বেসরকারি খাতের বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমেছে। ১০৮টি বেসরকারি আমদানিকারককে ভাগ করে নিতে হবে মাত্র ৩০ হাজার টনের কোটা। আগের বছর বেসরকারি আমদানিকারকদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার টন। এই আকস্মিক হ্রাসে শিল্প খাতের নেতারা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন। কারণ, অনেক প্রতিষ্ঠান আগের বছরগুলোর বেশি আমদানি পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও আর্থিক হিসাব তৈরি করেছিল।
গণছাঁটাইয়ের আশঙ্কা ব্যবসায়ী নেতাদের
এই সিদ্ধান্তের পর শিল্প সমিতিগুলো তাদের কার্যক্রমের টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ান মিট এন্টারপ্রেনার্স অ্যান্ড প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (এপিপিডিআই) এবং ইন্দোনেশিয়ান মিট ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইকেডিআইএন) বলেছে, এ সিদ্ধান্ত সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। এপিপিডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক তেগুহ বোদিয়ানা অনেক প্রতিষ্ঠানের নাজুক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন।
কোটা কমানোর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তেগুহ বলেন, "উদ্যোক্তারা হয়তো কর্মী ছাঁটাইকেই সবচেয়ে সহজ সমাধান হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।"
ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির জন্য সংবেদনশীল এক সময়ে এই সতর্কবার্তা এল। শ্রীটেক্স ও সানকেন ইলেকট্রিকের মতো বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক ব্যাপক ছাঁটাই কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মাংস খাতে আরও চাপ সৃষ্টি হলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তীব্র হতে পারে। এপিপিডিআই বলেছে, কোটা কম হলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং টিকে থাকার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে হয়।
বাজারে ধর্মঘট, ঊর্ধ্বমুখী দাম
নীতিটি নিয়ে ক্ষোভ বোর্ডরুম ছাড়িয়ে রাস্তায় গড়িয়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে বৃহত্তর জাকার্তার মাংস বিক্রেতারা কোটা কমানো ও এর ফলে দামের অস্থিরতার প্রতিবাদে সমন্বিতভাবে তিন দিনের ধর্মঘট করেন। ইন্দোনেশিয়ান মিট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এপিডিআই) জাকার্তা শাখা জাকার্তা, বগর, দেপক, তাঙ্গেরাং ও বেকাসির বাজার এবং কসাইখানায় বিক্রি বন্ধ রাখে। ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানির বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং সরবরাহের প্রাথমিক পর্যায়ে খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
জাকার্তার গরুর মাংস ব্যবসায়ী দারসা বিক্রেতাদের ওপর আর্থিক চাপের কথা জানান।
দারসা বলেন, "পাইকারি গরুর মাংসের দাম এখন প্রতি কেজি প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার রুপিয়া (৬.৮ ডলার), যা গত বছরের ঈদ মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার রুপিয়া ছিল।"
তিনি জানান, খুচরা দাম বেড়ে প্রতি কেজি ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার রুপিয়ায় দাঁড়িয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়েছেন ছোট বিক্রেতারা, যাঁদের পক্ষে ক্রেতাদের ওপর এই বাড়তি খরচ চাপানো কঠিন। ধর্মঘটের কারণে বাসিন্দাদের তাৎক্ষণিকভাবে মাংসের সংকটে পড়তে হয়। কেউ কেউ জানান, মাংস কেনার বদলে বন্ধ দোকান দেখতে তাঁদের একাধিক বাজারে যেতে হয়েছে।
খাদ্যসেবা শিল্পে প্রভাব
প্রচলিত বাজারের বাইরেও রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা খাত চাপের মুখে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ান অ্যানিম্যাল প্রোটিন এন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন (এপিপিএইচআই) সতর্ক করেছে, এই সীমাবদ্ধতা স্থানীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁ শিল্পের জন্য মারাত্মক আঘাত হতে পারে। এপিপিএইচআইয়ের প্রতিনিধি মারিনা রত্না ডিকে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের মাংসের চাহিদা নির্দিষ্ট ধরনের, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় পূরণ করতে নাও পারে।
মারিনা বলেন, "[হোটেল ও রেস্তোরাঁর] মাংসের নির্দিষ্ট চাহিদা রয়েছে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় পূরণ করতে পারে না। অন্যদিকে, বাস্তব অর্থনীতির অন্যান্য খাত যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন আমাদের অর্থনীতিতে এ খাতের ভূমিকা বড়।"
ধর্মঘটে খাদ্যসেবা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। পাদাং-ধাঁচের রেস্তোরাঁর মালিকেরা জানান, গরুর মাংস ছাড়া স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। আর মিটবল উৎপাদকদের সংগঠন পাপমিসো ইন্দোনেশিয়ার হিসাব, বৃহত্তর জাকারিয়ার ২০ হাজার বিক্রেতা তাঁদের প্রধান কাঁচামাল হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে খাতটির দৈনিক ২০ বিলিয়ন রুপিয়া ক্ষতি হতে পারে।
সরকারের যুক্তি ও নীতির পক্ষে অবস্থান
সমালোচনা সত্ত্বেও সরকারি কর্মকর্তারা খাদ্যনিরাপত্তা ও রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই পুনর্বিন্যাসকে প্রয়োজনীয় বলে সমর্থন করেছেন। খাদ্যবিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী জুলকিফলি হাসান বলেন, আমদানির দায়িত্ব এসওইগুলোর হাতে দিলে তদারকি আরও ভালোভাবে করা যায়। তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি তৈরি করা ক্ষুরা রোগের প্রবেশ ও বিস্তার ঠেকানো এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য।
জুলকিফলি হাসান বলেন, "আমদানির দায়িত্ব এসওইগুলোর হাতে দিয়ে আমরা ক্ষুরা রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা আগেভাগে মোকাবিলার চেষ্টা করছি। এই পদ্ধতিতে সরকার আমদানি প্রক্রিয়া আরও নিবিড়ভাবে তদারকি করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।"
খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর নির্দেশনার কথাও বলেছে সরকার। কর্মকর্তাদের যুক্তি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি কেন্দ্রীভূত করলে দাম স্থিতিশীল রাখা এবং পণ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সহজ হয়। তবে এ অবস্থানের সঙ্গে কৃষি উপমন্ত্রী সুদারিয়োনোর সাম্প্রতিক বক্তব্যের অমিল রয়েছে। তিনি একচেটিয়া ব্যবসা ঠেকাতে এবং পশুপালন খাতকে সহায়তা করতে জীবিত গবাদিপশু আমদানির কোটায় ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব
নীতির এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদেরও নজর কেড়েছে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার, যা ইন্দোনেশিয়ায় গরুর মাংসের বড় সরবরাহকারী। অস্ট্রেলিয়ার শিল্প সংগঠনগুলো আমদানির পরিমাণ কমানো এবং এসওইগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে কার্যকর বাণিজ্যব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান মিট ইন্ডাস্ট্রি কাউন্সিল বলেছে, আমদানি অনুমতিপত্র নিয়ে বিলম্ব ও বিধিনিষেধমূলক সিদ্ধান্ত ইন্দোনেশিয়ার খাদ্যনিরাপত্তায় অবদান রাখার অস্ট্রেলিয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার গরুর মাংস ও ভেলের রপ্তানি মূল্য ছিল ৫০ কোটি ডলারের বেশি। তবে আমদানি বিধিনিষেধ ইতিমধ্যে অন্যান্য প্রাণিজ আমদানিতেও প্রভাব ফেলেছে। ভেড়ার মাংস আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানি ২ কোটি ডলারের বেশি কমেছে। মানসম্মত পণ্য সংগ্রহ করতে না পারায় বালির মাইকোনোস গ্রিক রেস্তোরাঁর মতো কিছু রেস্তোরাঁ মেনু থেকে ভেড়ার মাংসের পদ বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে। এতে কোটা পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
বাজারের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ
থিংক ট্যাংক ও নীতিবিশ্লেষকেরা কোটা ব্যবস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখেছেন। সেন্টার ফর ইন্দোনেশিয়ান পলিসি স্টাডিজ (সিআইপিএস) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে গরুর মাংসের দাম বছরওয়ারি ১.৯৩ শতাংশ বেড়েছিল। এর পেছনে আমদানির বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং রমজানে চাহিদা বৃদ্ধির আংশিক ভূমিকা ছিল। সংস্থাটির মতে, বাজার ও বিতরণব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি সক্ষম।
বর্তমান কোটা বিধিনিষেধের সঙ্গে জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে এমন পণ্যে আমদানিসীমা তুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট প্রবোওর নির্বাচনী অঙ্গীকারেরও অমিল রয়েছে। তেগুহ বোদিয়ানার মতো শিল্প খাতের নেতারা গরুর মাংসের আমদানি কোটা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, মাংস সরবরাহ করা বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ দায়িত্ব। তাঁদের মতে, উন্মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত সরবরাহ ও স্থিতিশীল দাম বজায় রেখে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদেরই উপকৃত করবে।
মূল তথ্য
- ২০২৬ সালের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৩০ হাজার টন মাংস আমদানির কোটা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া; আগের বছর এই বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার টন।
- মোট ২ লাখ ৯৭ হাজার টন কোটার মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় মহিষের মাংস ১ লাখ টন এবং ব্রাজিলের গরুর মাংস ৭৫ হাজার টন।
- ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, ব্যবসা চালু রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে।
- পাইকারি দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে বিঘ্নের কারণে জানুয়ারিতে বৃহত্তর জাকার্তার মাংস বিক্রেতারা তিন দিনের ধর্মঘট করেন।
- কর্মকর্তারা বলেছেন, এসওইগুলোর মাধ্যমে আমদানি কেন্দ্রীভূত করলে ক্ষুরা রোগের বিস্তার ঠেকানো এবং দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
- অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানিকারকেরা ভেড়ার মাংসের বাণিজ্য কমার কথা জানিয়েছেন এবং ৫০ কোটি ডলারের গরুর মাংস রপ্তানিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।






