বিপুল বিনিয়োগের অনুমোদন
বিশ্বের ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে ওঠার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে থাইল্যান্ড। তাইওয়ানের ঝেন ডিং টেকনোলজি (জেডডিটি) নেতৃত্বাধীন একটি যৌথ উদ্যোগের ৬৫ বিলিয়ন বাথ (২.০৮ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগে অনুমোদন দিয়েছে দেশটি। প্রাচিন বুরি প্রদেশে পরপর চারটি প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (পিসিবি) উৎপাদন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই)। উন্নত ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতে এটি থাইল্যান্ডের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ।
সূচিপত্র
- বিপুল বিনিয়োগের অনুমোদন
- ঝেন ডিং টেকনোলজি: বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট
- যৌথ উদ্যোগ ও প্রকল্পের বিবরণ
- থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কৌশল
- প্রাচিন বুরির কৌশলগত গুরুত্ব
- কর্মী উন্নয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব
- ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে থাইল্যান্ডের উত্থান
- অঞ্চলজুড়ে বৃহত্তর প্রভাব
- যা জানা প্রয়োজন
পেং শেন টেকনোলজি (থাইল্যান্ড) কোম্পানি লিমিটেড নামে পরিচালিত এই যৌথ উদ্যোগে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম পিসিবি প্রস্তুতকারক জেডডিটি এবং থাইল্যান্ডের সাহা পাথানা ইন্টার-হোল্ডিং পিএলসি। উচ্চমূল্যের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার লক্ষ্যে থাইল্যান্ডের কৌশলগত পদক্ষেপ এই সহযোগিতা।
বিনিয়োগ বোর্ডের মহাসচিব নারিত থের্ডস্টিরাসুকদি থাইল্যান্ডের শিল্প খাতের জন্য এই অগ্রগতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন এবং উন্নত ইলেকট্রনিক উপকরণের চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যে বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস শিল্পে থাইল্যান্ডের গুরুত্ব বাড়ছে, এই বিনিয়োগ তারই ইঙ্গিত।
ঝেন ডিং টেকনোলজি: বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট
২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের বৃহত্তম পিসিবি প্রস্তুতকারকের অবস্থান ধরে রেখেছে ঝেন ডিং টেকনোলজি হোল্ডিং লিমিটেড। বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাইওয়ান, চীন এবং এখন থাইল্যান্ডে কার্যক্রমসহ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটিতে ৪৮ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করেন; বার্ষিক আয় ১৮০ বিলিয়ন বাথেরও বেশি।
প্রায় সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভিত্তি হলো পিসিবি। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগমাধ্যম, যার সাহায্যে ইলেকট্রনিক উপাদানগুলো পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং একসঙ্গে কাজ করে। স্মার্টফোন ও ল্যাপটপ থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি অবকাঠামো—আধুনিক প্রযুক্তির সর্বত্র পিসিবির ব্যবহার রয়েছে। পিসিবির জটিলতা ও মান সরাসরি চূড়ান্ত ইলেকট্রনিক পণ্যের কার্যক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা ও সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
জেডডিটির দক্ষতার মধ্যে রয়েছে উন্নত পিসিবি প্রযুক্তি—মাল্টিলেয়ার পিসিবি, ফ্লেক্সিবল পিসিবি, সাবস্ট্রেট-সদৃশ পিসিবি এবং হাই-ডেনসিটি ইন্টারকানেক্ট (এইচডিআই) পিসিবি। ৫জি স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সার্ভার, ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং অন্যান্য উন্নত ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মতো উচ্চ প্রক্রিয়াকরণক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক প্রযুক্তিতে এসব জটিল উপাদান অপরিহার্য।
তাইওয়ান ও চীনে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি বড় উৎপাদন ক্যাম্পাস রয়েছে। বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক ব্যবসায়িক ও কারিগরি সেবা দিতে ২০টিরও বেশি বিক্রয় কার্যালয় পরিচালনা করে এটি। থাইল্যান্ডের কারখানাটি প্রচলিত কর্মক্ষেত্রগুলোর বাইরে জেডডিটির প্রথম এবং একমাত্র উৎপাদনকেন্দ্র। এই সম্প্রসারণকে প্রতিষ্ঠানটি কতটা কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে, তা এতে স্পষ্ট।
যৌথ উদ্যোগ ও প্রকল্পের বিবরণ
জেডডিটি ও সাহা পাথানা ইন্টার-হোল্ডিংয়ের যৌথ উদ্যোগটি কয়েকটি পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রথম প্রকল্পটি ২০২৩ সালে অনুমোদন পায় এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। সফলভাবে উৎপাদন চালুর পর প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রসারণের জন্য আরও তিনটি প্রকল্পের আবেদন করে, যেগুলো এখন বিওআইয়ের অনুমোদন পেয়েছে।
চারটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন বাথের বেশি। উৎপাদনকেন্দ্রটি প্রাচিন বুরি প্রদেশে অবস্থিত। এই উৎপাদন কমপ্লেক্সে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানির জন্য উচ্চ জটিলতাসম্পন্ন পিসিবি তৈরি করা হবে, যা উন্নত ইলেকট্রনিকসের বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে থাইল্যান্ডের অবস্থানকে আরও মজবুত করবে।
এই বিনিয়োগে ৫ হাজার ৬০০ জনের বেশি থাই কর্মীর কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উৎপাদনকাজ থেকে শুরু করে কারিগরি ও প্রকৌশল পদ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের চাকরির সুযোগ তৈরি হবে, যা থাই কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও জ্ঞান হস্তান্তরে অবদান রাখবে।
এআই সার্ভার, যোগাযোগ অবকাঠামো ও অপটিক্যাল মডিউলের মতো চাহিদাসম্পন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত জটিল পিসিবি তৈরির উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে থাইল্যান্ডকে গড়ে তোলার লক্ষ্য জেডডিটির। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে একটি কারখানা নির্মাণ করা হবে। সেখানে এসএলপি (সাবস্ট্রেট-সদৃশ পিসিবি), থিক এইচডিআই (হাই-ডেনসিটি ইন্টারকানেক্ট) এবং আরপিসিবি (রিজিড প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড) প্রযুক্তির উৎপাদন লাইন থাকবে।
থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও কৌশল
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি থাইল্যান্ড সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মন্থর প্রবৃদ্ধির মুখে অর্থনীতি চাঙা করার চ্যালেঞ্জে রয়েছে। ব্যাংক অব থাইল্যান্ড ২০২৫ সালে ২.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ও কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি এতে স্পষ্ট হয়েছে।
উচ্চমানের বিনিয়োগ আকর্ষণে থাই সরকার করছাড়, নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত নির্দিষ্ট শিল্পে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তাসহ নানা কৌশল নিয়েছে। ইলেকট্রনিকস খাত, বিশেষ করে পিসিবির মতো উন্নত উপাদান, উন্নয়নের অগ্রাধিকার খাত হয়ে উঠেছে।
এই বিনিয়োগের অনুমোদন থাইল্যান্ডের বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তর কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রচলিত উৎপাদন ও সংযোজন কার্যক্রম ছাড়িয়ে উন্নত উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং নকশার মতো উচ্চমূল্যের কর্মকাণ্ডে এগিয়ে যাওয়াই এ কৌশলের লক্ষ্য। দক্ষ কর্মী, কৌশলগত অবস্থান ও প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনতে আগ্রহী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকর্ষণ করতে চায় দেশটি।
বিনিয়োগ পরিস্থিতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নারিত থের্ডস্টিরাসুকদি বলেন, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিসিবি-সংশ্লিষ্ট খাতে—পিসিবি উৎপাদন, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড সংযোজন (পিসিবিএ) এবং পিসিবির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালসহ—বিওআইয়ের বিনিয়োগ সুবিধার জন্য থাইল্যান্ডে ২১৪টি প্রকল্পের আবেদন এসেছে। এসব প্রকল্পে সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন বাথের বেশি। বিনিয়োগের এই প্রবাহ থাইল্যান্ডকে আসিয়ানের প্রধান পিসিবি উৎপাদনকেন্দ্র এবং বিশ্বের শীর্ষ পাঁচের একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।
প্রাচিন বুরির কৌশলগত গুরুত্ব
এ বিপুল বিনিয়োগের জন্য প্রাচিন বুরি প্রদেশকে বেছে নেওয়া হয়েছে সতর্ক কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে। সেখানে শিল্পকারখানার জন্য জমি পাওয়া যায়; ব্যাংকক ও অন্যান্য বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে অবকাঠামোগত যোগাযোগ রয়েছে; পাশাপাশি দক্ষ শ্রমিক সরবরাহে সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কাছাকাছি।
পেং শেন টেকনোলজি (থাইল্যান্ড) ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রাচিন বুরি প্রদেশে ৪০ হেক্টরের বেশি জমি কিনে বড় পিসিবি উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করে। উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে কারখানাটির নকশা করা হয়েছে। এর ফলে আধুনিক ইলেকট্রনিকস উৎপাদন সক্ষমতায় থাইল্যান্ড অগ্রভাগে থাকবে।
কর্মী উন্নয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব
উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগটি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জ্ঞান হস্তান্তরেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পিসিবি শিল্প ও উন্নত ইলেকট্রনিকস-সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান ও প্রকৌশল পাঠ্যক্রম তৈরি এবং গবেষণা পরিচালনার লক্ষ্যে পেং শেন টেকনোলজি (থাইল্যান্ড) শীর্ষস্থানীয় থাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করেছে।
অংশীদার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে কিং মংকুতস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি লাতক্রাবাং, কিং মংকুতস ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি নর্থ ব্যাংকক, কাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নিডা) এবং থাম্মাসাত ইউনিভার্সিটির সিরিনধর্ন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এসআইআইটি)।
দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমানের কর্মী তৈরি এবং থাইল্যান্ডের সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকস খাতের সক্ষমতা জোরদার করাই এসব অংশীদারত্বের লক্ষ্য। শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সামঞ্জস্য রেখে এ উদ্যোগ নিশ্চিত করবে যে উন্নত উৎপাদন খাতের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ দক্ষতা থাই কর্মীদের থাকবে। এতে ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিকস খাতের জন্য দক্ষ কর্মীর ধারাবাহিক সরবরাহ তৈরি হবে।
বিনিয়োগের এ দিকটি নিয়ে নারিত থের্ডস্টিরাসুকদি বলেন, এ ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির বিনিয়োগ মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করে, থাইদের দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়ায় এবং উন্নত প্রযুক্তির দিকে এগোনোর পথে থাইল্যান্ডের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। এর মধ্যে পরবর্তী পর্যায়ে দেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নয়নও রয়েছে।
ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে থাইল্যান্ডের উত্থান
জেডডিটির এই বিনিয়োগ কেবল একটি উৎপাদনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চেয়েও বেশি কিছু। এটি আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতি সংস্থা) এবং বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে থাইল্যান্ডের উত্থানের ইঙ্গিত। গত তিন বছরে দেশটি পিসিবি খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে, যা তার শিল্প খাতের চিত্র বদলে দিয়েছে।
পিসিবি উৎপাদনের এই ঘনত্ব বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস সরবরাহ শৃঙ্খলে থাইল্যান্ডের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং, ইলেকট্রনিকস সংযোজন এবং শেষ পর্যন্ত আরও উন্নত ইলেকট্রনিক পণ্যসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিকাশের ভিত্তি তৈরি করছে। জেডডিটির মতো বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি শিল্প-পরিবেশেও সুফল আনছে; সরবরাহকারী ও সহায়ক শিল্পগুলোকে থাইল্যান্ডে কার্যক্রম স্থাপনে আকৃষ্ট করছে।
বিশ্বের ইলেকট্রনিকস শিল্পের বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে এ বিনিয়োগের সময়ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব প্রবণতার মধ্যে রয়েছে সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনা, উন্নত ইলেকট্রনিকসের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ভূরাজনৈতিক বিবেচনা। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের মতো প্রচলিত উৎপাদনকেন্দ্রের বাইরে কারখানা স্থাপন করছে। থাইল্যান্ডের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন সংস্কৃতি এবং উন্নত অবকাঠামো একে আকর্ষণীয় বিকল্প করে তুলেছে।
২০২৫ সাল থেকে বড় পিসিবি কারখানাগুলো ধীরে ধীরে উৎপাদন শুরু করলে বৈশ্বিক পিসিবি উৎপাদনে থাইল্যান্ডের অংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পের আধুনিকায়নে এই অগ্রগতি সরাসরি অবদান রাখবে এবং দেশটিকে উচ্চমূল্যের উৎপাদন কার্যক্রমে রূপান্তরে সহায়তা করবে।
অঞ্চলজুড়ে বৃহত্তর প্রভাব
এই বিনিয়োগ সফলভাবে আকর্ষণ করার প্রভাব থাইল্যান্ডের সীমানা ছাড়িয়ে যাবে। কৌশলগত সুবিধা, দক্ষ কর্মী এবং সহায়ক সরকারি নীতির মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো উচ্চমূল্যের উৎপাদন বিনিয়োগের জন্য কীভাবে সফলভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে, তা এটি দেখায়। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে এই অঞ্চলের গুরুত্বও বাড়ছে।
এই বিনিয়োগ সরবরাহ শৃঙ্খলের আঞ্চলিকীকরণের প্রবণতাকেও জোরদার করছে। ঝুঁকি কমাতে প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ বাজারের কাছাকাছি অথবা ভূরাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল স্থানে উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করছে। আসিয়ান দেশগুলোর জন্য এটি ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে মূল্যশৃঙ্খলে আরও ওপরে ওঠার সুযোগ তৈরি করে—সাধারণ সংযোজনের বাইরে গিয়ে আরও জটিল উৎপাদন কার্যক্রমে প্রবেশের সুযোগ।
এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের সাফল্য আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে নিজেদের আকর্ষণীয় দিকগুলো জোরদার করতে উৎসাহিত করতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বিনিয়োগ প্রণোদনা বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার হতে পারে। এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত শিল্পের বিকাশ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে পুরো অঞ্চলের উপকার করতে পারে।
সামনে উন্নত পিসিবি উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিষ্ঠার ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা, উন্নত টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এবং এআই কম্পিউটিং হার্ডওয়্যারসহ উদীয়মান প্রযুক্তি খাতের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে থাইল্যান্ড। এসব ক্ষেত্রেই জটিল পিসিবি প্রযুক্তির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে।
যা জানা প্রয়োজন
- তাইওয়ানের ঝেন ডিং টেকনোলজি (জেডডিটি) ও থাইল্যান্ডের সাহা পাথানা ইন্টার-হোল্ডিংয়ের যৌথ উদ্যোগের ৬৫ বিলিয়ন বাথ (২.০৮ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগে অনুমোদন দিয়েছে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ বোর্ড
- ঝেন ডিং টেকনোলজি বিশ্বের বৃহত্তম প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (পিসিবি) প্রস্তুতকারক; ২০১৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি এ অবস্থান ধরে রেখেছে
- প্রাচিন বুরি প্রদেশে পিসিবি উৎপাদনের পরপর চারটি প্রকল্পে এই বিনিয়োগ করা হচ্ছে; এতে ৫ হাজার ৬০০ কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে
- স্মার্টফোন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানি অবকাঠামো—প্রায় সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রেই পিসিবি অপরিহার্য উপাদান
- চীন ও তাইওয়ানের বাইরে থাইল্যান্ডের কারখানাটিই জেডডিটির প্রথম এবং একমাত্র উৎপাদনকেন্দ্র
- ২০২৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিসিবি-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের জন্য থাইল্যান্ডে ২১৪টি আবেদন এসেছে; মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন বাথের বেশি
- পিসিবি প্রযুক্তি ও উন্নত ইলেকট্রনিকস বিষয়ে পাঠ্যক্রম এবং গবেষণা উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগটি পাঁচটি থাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে
- থাইল্যান্ডের লক্ষ্য আসিয়ানের প্রধান পিসিবি উৎপাদনকেন্দ্র হওয়া এবং বিশ্বে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে স্থান করে নেওয়া
- উৎপাদনের প্রথম পর্যায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়েছে; সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলো এখন অনুমোদন পেয়েছে
- উচ্চমূল্যের উৎপাদন ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে এগিয়ে যাওয়ার থাইল্যান্ডের কৌশলে এই বিনিয়োগ সহায়তা করবে






