মেরু অভিযানে এক ঐতিহাসিক প্রথম
চীনা ডুবোজাহাজ ফেনদৌঝেতে থাকা বিজ্ঞানীরা এমন এক কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, যা অনেকের কাছেই অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। আর্কটিকের পুরু সামুদ্রিক বরফের পাঁচ কিলোমিটারেরও বেশি নিচে ডুব দিয়ে তাঁরা গাক্কেল শৈলশিরার আগে কখনো অনুসন্ধান না করা একটি অংশ ঘুরে দেখেছেন। গ্রিনল্যান্ড ও সাইবেরিয়ার মধ্যে বিস্তৃত এই পানির নিচের আগ্নেয় পর্বতমালা বৈশ্বিক মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা ব্যবস্থার অংশ। এখানে টেকটোনিক প্লেট ধীরে ধীরে পরস্পর থেকে সরে যায় এবং নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরি হয়। অভিযানে সর্বোচ্চ ৫,২৭৭ মিটার গভীরে পৌঁছানো হয়। এই প্রথম মানুষ সরাসরি এই দুর্গম ও ভূতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটি পর্যবেক্ষণ করল।
সূচিপত্র
গবেষণা জাহাজ তান সু-ও সান হাও থেকে পরিচালিত এই অভিযানে প্রায় তিন মাসের সমুদ্রযাত্রায় ৪৩টি ডুব সম্পন্ন হয়, যা মেরু অনুসন্ধানের সীমা আরও প্রসারিত করেছে। গাক্কেল শৈলশিরা দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, এটি অত্যন্ত ধীরগতিতে বিস্তৃত হয়, ফলে এখানে তৈরি হয়েছে অনন্য ভূতাত্ত্বিক ও জৈবিক পরিবেশ। এসব পরিবেশ চরম পরিস্থিতিতে প্রাণ কীভাবে টিকে থাকে, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে। ইনস্টিটিউট অব ডিপ-সি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সামুদ্রিক ভূ-পদার্থবিজ্ঞানী এবং অভিযানের প্রধান বিজ্ঞানী শিয়াওশিয়া হুয়াং শৈলশিরার পূর্ব অংশকে আর্কটিকের ভূতাত্ত্বিক গবেষণার ধাঁধার শেষ টুকরো বলে বর্ণনা করেছেন।
হুয়াং বলেন, “গভীর সমুদ্রকে সরাসরি গিয়ে গবেষণা করার এমন সুযোগ পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়।” অভিযানের নজিরবিহীন বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বলেন।
আগের অভিযানগুলোতে সোনার ও চালকবিহীন যান ব্যবহার করে শৈলশিরার কিছু অংশ জরিপ করা হলেও, কোনো মানুষবাহী ডুবোজাহাজ কখনো পূর্ব গাক্কেল শৈলশিরায় পৌঁছায়নি। ২০০৩ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় পশ্চিম পাশে হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলটি সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত ছিল। এই অভিযানের সাফল্য পৃথিবীর সমুদ্রতলের শেষ অনাবিষ্কৃত এলাকাগুলোর একটিকে জানার বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। এতে অস্বাভাবিক গভীর-সমুদ্রের প্রাণের সন্ধান মিলতে পারে এবং দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা আর্কটিক কীভাবে বদলাচ্ছে, সে বিষয়েও নতুন ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
আর্কটিকের বরফে চলাচলের চ্যালেঞ্জ
আর্কটিকের ভাসমান সামুদ্রিক বরফের নিচে মানুষবাহী ডুবোজাহাজ চালাতে হলে এমন অসাধারণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়, যার জন্য উদ্ভাবনী সমাধান দরকার। অভিযানের দল একটি অগ্রণী “জাহাজ-ডুবোজাহাজ সমন্বয়” পদ্ধতি তৈরি করে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের ৮০ শতাংশেরও বেশি বরফে ঢাকা জলেও অভিযান চালানো সম্ভব হয়। এমন পরিস্থিতিতে ডুবোজাহাজ যেকোনো জায়গায় সহজে পানির ওপরে উঠতে পারে না। পুরু বরফের ঠিক নিচে উঠে এলে ভেতরের লোকজন আটকা পড়তে পারেন; বের হওয়া বা জরুরি সহায়তা পাওয়ার কোনো উপায় নাও থাকতে পারে।
প্রতিটি ডুবের আগে বরফভাঙা গবেষণা জাহাজ তান সু-ও সান হাওকে ভাসমান বরফে সাময়িক ফাঁক তৈরি করতে হতো। কার্যত, জমাট সাগরে একটি জলাশয় কেটে তৈরি করা হতো, যেখানে ডুবোজাহাজ নিরাপদে নামতে ও উঠতে পারে। এ কাজে সতর্ক সমন্বয় ও সময়জ্ঞান প্রয়োজন ছিল, কারণ সমুদ্রস্রোত ও বাতাসে বরফ ক্রমাগত সরে যায়। লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে দলটি আর্কটিক মহাসাগরে ৫৬ দিন অভিযান চালায় এবং বরফে ঢাকা জলপথে প্রায় ২,০০০ নটিক্যাল মাইল অতিক্রম করে।
গভীর সমুদ্র থেকে ফেরার পথটি ছিল বিশেষভাবে কঠিন। সমুদ্রতলে কাজ শেষ করার পর ফেনদৌঝে পানির নিচে থেমে সোনার ও ক্যামেরা দিয়ে খোলা পানি বা তুলনামূলক পাতলা বরফের খোঁজ করত, যেখানে নিরাপদে পানির ওপরে ওঠা সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে সহায়ক জাহাজ বরফ কেটে পথ তৈরি করা পর্যন্ত ডুবোজাহাজকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। বরফভাঙা জাহাজ ও ডুবোজাহাজের এই সূক্ষ্ম সমন্বয় মেরু অনুসন্ধানে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সাফল্য।
অভিযানে অংশ না নেওয়া উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশনের সামুদ্রিক ভূ-রসায়নবিদ ক্রিস্টোফার জার্মান এত দুর্গম স্থানে পৌঁছানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন।
জার্মান বলেন, “সেখানে পৌঁছানো এত কঠিন যে, সেখানে কেউ যা-ই করুক, তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই হবে উত্তেজনাপূর্ণ, ভিন্নধর্মী ও নতুন কিছু।”
চরম পরিবেশের জন্য উন্নত প্রযুক্তি
ফেনদৌঝে ডুবোজাহাজের নামের অর্থ “সংগ্রামী”। এটি গভীর সমুদ্রের চরম পরিবেশে অনুসন্ধানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এক অসাধারণ প্রকৌশল নিদর্শন। চীনে নির্মিত এই ডুবোজাহাজ অন্তত ৭,০০০ মিটার গভীরতায় যেতে পারে। এর আগে মারিয়ানা খাতের চ্যালেঞ্জার ডিপে ১০,৯০৯ মিটার গভীরে নেমে এটি নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এটি পৃথিবীর মহাসাগরের জানা সবচেয়ে গভীর স্থান। আর্কটিক অভিযানের জন্য ডুবোজাহাজটিকে হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় এবং ক্রমাগত সরে যাওয়া সামুদ্রিক বরফের হুমকির মধ্যে কাজ করার উপযোগী করে নেওয়া হয়েছিল।
গবেষণা জাহাজ তান সু-ও সান হাও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আরেকটি মাইলফলক। চীনের দাবি, বরফ ভাঙার সক্ষমতাসহ বৈশ্বিক গভীর-সমুদ্র অনুসন্ধানের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা জাহাজ এটি। বরফভাঙা জাহাজ ও গভীর সমুদ্রে সহায়তা দেওয়ার জাহাজের এই সমন্বয়ের ফলে মেরু অঞ্চলে বছরজুড়ে অভিযান চালানো সম্ভব হয়। আগে বরফ কম থাকে এমন সংক্ষিপ্ত গ্রীষ্মকালেই কেবল এসব অঞ্চলে যাওয়া যেত।
জার্মানির আলফ্রেড ভেগেনার ইনস্টিটিউটের সামুদ্রিক ভূ-বিজ্ঞানী এলমার আলবার্স বলেন, অভিযানের প্রযুক্তিগত সাফল্য কেবল যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
আলবার্স বলেন, “চীনা অভিযানের মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে চরম পানির নিচের আবাসস্থলগুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
এই অভিযানে চীনের দুটি মানুষবাহী ডুবোজাহাজের মধ্যে প্রথম যৌথ পানির নিচের কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। ফেনদৌঝে জিয়াওলং ডুবোজাহাজের সঙ্গে কাজ করে। দুই যান অবস্থান নির্ধারণ, চিহ্নিত বস্তু বিনিময় এবং পানির নিচে ভিডিও ধারণের কাজে সমন্বয় করে। দুটি ডুবোজাহাজ একসঙ্গে ব্যবহার করলে আরও পূর্ণাঙ্গ জরিপ করা যায় এবং নিরাপত্তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও থাকে। অভিযানে জিয়াওলং আর্কটিকের বরফের নিচে চীনের প্রথম মানুষবাহী ডুবও সম্পন্ন করে। এতে মেরু অঞ্চলে গভীর-সমুদ্র অভিযান পরিচালনায় দেশটির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রমাণ মেলে।
গাক্কেল শৈলশিরার ভূতাত্ত্বিক গুরুত্ব
ভূতাত্ত্বিকদের কাছে গাক্কেল শৈলশিরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অতি ধীরগতিতে বিস্তৃত মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরাগুলোর চরম উদাহরণ এটি। অধিকাংশ মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা বছরে কয়েক সেন্টিমিটার হারে বিস্তৃত হয়। গাক্কেল শৈলশিরা এত ধীরে বিস্তৃত হয় যে এখানে নতুন ভূত্বক তৈরি হওয়ার গতি মানুষের নখ বাড়ার গতির চেয়েও কম। এই অত্যন্ত ধীর বিস্তারের ফলে অনন্য ভূতাত্ত্বিক গঠন তৈরি হয় এবং শৈলশিরা বরাবর কী ধরনের হাইড্রোথার্মাল ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, তাও প্রভাবিত হতে পারে।
বৈশ্বিক মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গাক্কেল শৈলশিরা প্লেট টেকটোনিকস এবং পৃথিবীর অভ্যন্তর ও পৃষ্ঠের মধ্যে বিভিন্ন উপাদানের আবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উত্তর আমেরিকান প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেট পরস্পর থেকে সরে যাওয়ার স্থানে এই শৈলশিরা তৈরি হয়েছে। এতে ম্যাগমা ওপরে উঠে নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক গঠন করে। এই প্রক্রিয়া বোঝার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ থেকে শুরু করে ভূতাত্ত্বিক সময়ে মহাসাগরীয় অববাহিকার বিবর্তন পর্যন্ত নানা বিষয়ের মডেল তৈরি করতে পারেন।
অভিযান দল সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরি, খাড়া ঢাল, পানির নিচের পাহাড় এবং গিরিখাতসহ ভূতাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে। ক্যামেরা ও সোনার ব্যবহার করে আগের মানচিত্রের অস্পষ্ট রেখার বদলে সমুদ্রতলের প্রকৃত চিত্রের বিস্তারিত ধারণ করা হয়। উচ্চ-রেজল্যুশনের এসব ছবি গবেষকদের এই অস্বাভাবিক শৈলশিরা ব্যবস্থার গঠন ও সৃষ্টি বুঝতে সহায়তা করবে।
পূর্ব গাক্কেল শৈলশিরায় হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আছে কি না, তা নির্ধারণ করা ছিল অভিযানের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য। এসব পানির নিচের উষ্ণ প্রস্রবণ তৈরি হয় যখন সমুদ্রের পানি নতুন আগ্নেয় শিলার ভেতর দিয়ে চলাচল করে, নিচের ম্যাগমার তাপে উত্তপ্ত হয় এবং দ্রবীভূত খনিজ বহন করে আবার মহাসাগরে বেরিয়ে আসে। ২০০৩ সালে আবিষ্কৃত পশ্চিম গাক্কেল শৈলশিরার ভেন্টগুলোতে অস্বাভাবিক প্রাণীর এমন কিছু গোষ্ঠী পাওয়া গেছে, যারা সূর্যালোকের বদলে রাসায়নিক শক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অন্ধকারে বেঁচে থাকে।
চরম পরিবেশে প্রাণের সন্ধান
পূর্ব গাক্কেল শৈলশিরায় হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের খোঁজ কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়। এসব ভেন্টে অনন্য বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে, যা অন্য জগতে প্রাণ কীভাবে থাকতে পারে সে সম্পর্কে সূত্র দিতে পারে। হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের আশপাশের প্রাণীরা হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো খনিজের রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে শক্তি পায়, যা সূর্যালোকের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। এই বিপাকপ্রক্রিয়ার সঙ্গে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণকারী ইউরোপা এবং শনিকে প্রদক্ষিণকারী এনসেলাডাসের মতো চাঁদের বরফাবৃত পৃষ্ঠের নিচে থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা করা প্রাণের মিল রয়েছে।
প্রায় এক শ দিন সমুদ্রে থাকার সময় অভিযানের দল শৈলশিরা বরাবর থেকে পলির নমুনা, শিলা, সমুদ্রের পানি ও জৈব নমুনা সংগ্রহ করে। এসব নমুনার এখন পরীক্ষাগারে বিস্তারিত বিশ্লেষণের অপেক্ষা। বিজ্ঞানীরা সেখানে হাইড্রোথার্মাল কার্যকলাপের রাসায়নিক চিহ্ন এবং চরম পরিবেশে অভিযোজিত অনন্য প্রাণের প্রমাণ খুঁজবেন। হুয়াং ও তাঁর দল সক্রিয় ভেন্ট ব্যবস্থা পেয়েছেন কি না, সে বিষয়ে মুখ খোলেননি। তাঁদের ইঙ্গিত, নিশ্চিত উত্তর পেতে কয়েক মাস ধরে সতর্কভাবে পরীক্ষাগারে কাজ করতে হবে।
অভিযানে সংগৃহীত জৈব নমুনা থেকে নতুন প্রজাতি বা গভীর, ঠান্ডা ও অন্ধকার পরিবেশে বেঁচে থাকার অস্বাভাবিক অভিযোজন সম্পর্কে জানা যেতে পারে। হুয়াংয়ের বর্ণনায়, দলটি অন্ধকার, শীত, চাপ ও পাথরের মধ্যে বসবাসকারী বিভিন্ন মাছ ও গভীর-সমুদ্রের প্রাণী দেখেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশগুলোর একটিতে টিকে থাকতে এসব প্রাণী অসাধারণ কৌশল বিবর্তিত করেছে। এগুলো বুঝতে পারলে চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে জৈবপ্রযুক্তি পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতি হতে পারে।
চরম পরিবেশে প্রাণের অধ্যয়নকে অ্যাস্ট্রোবায়োলজি বলা হয়। এ গবেষণায় গভীর-সমুদ্র অনুসন্ধান ও পৃথিবীর বাইরের প্রাণের খোঁজের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। আর্কটিক মহাসাগরের হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের আশপাশে প্রাণী বেঁচে থাকতে পারলে, আমাদের সৌরজগতের বরফাবৃত উপগ্রহগুলোর ভূগর্ভস্থ মহাসাগরেও একই ধরনের প্রাণ থাকতে পারে। গাক্কেল শৈলশিরার নমুনা থেকে এমন ভিনগ্রহের বাস্তুতন্ত্র দেখতে কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে মডেল আরও নিখুঁত করা সম্ভব।
গভীর আর্কটিকে জলবায়ুর যোগসূত্র
অভিযানটি সমুদ্রপৃষ্ঠের হাজার হাজার মিটার নিচে এবং মানববসতি থেকে অনেক দূরে পরিচালিত হলেও এর ফল জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসমাজের ওপর তার প্রভাবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় আর্কটিক দুই থেকে তিন গুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এর আবহাওয়ার ধরন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং সারা বিশ্বের বাস্তুতন্ত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। আর্কটিকের সমুদ্রতলে যা ঘটে, তা একই জলবায়ু ব্যবস্থার অংশ, যা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বা অস্বাভাবিক মৃদু শীতের মতো ঘটনাকে প্রভাবিত করে।
গাক্কেল শৈলশিরার মতো মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা গভীর সমুদ্রে তাপ ও রাসায়নিক উপাদান চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব শৈলশিরার কাছে সমুদ্রের ভূত্বকের ভেতর দিয়ে পানি চলাচলের সময় আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে তাপ ও খনিজের আদান-প্রদান হয়। এই প্রক্রিয়া সমুদ্রের রসায়ন ও সঞ্চালন-পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে, যা আবার বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে। গাক্কেল শৈলশিরা থেকে পাওয়া বিস্তারিত তথ্য বিজ্ঞানীদের জলবায়ুর মডেল আরও নিখুঁত করতে সাহায্য করতে পারে। এসব মডেল উপকূলীয় জনপদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে দিকনির্দেশনা দেয়।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস পেতেও আর্কটিক অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। আর্কটিকের সমুদ্রের তাপমাত্রা, রসায়ন ও বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন প্রায়ই বৃহত্তর রূপান্তরের সংকেত দেয়, যা শেষ পর্যন্ত অন্য অঞ্চলকেও প্রভাবিত করবে। এখনই গভীর আর্কটিকের পরিবেশ সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভিত্তি তৈরি করছেন, যার সঙ্গে তুলনা করে ভবিষ্যতের পরিবর্তন মাপা যাবে। অব্যাহত উষ্ণায়নে পুরো পৃথিবীব্যবস্থা কীভাবে সাড়া দেবে, তা বুঝতে এই তথ্য অপরিহার্য।
দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় সহায়তার জন্য অভিযানের দল ব্যাপক পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে পুরো জলস্তরজুড়ে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, রাসায়নিক গঠন ও জীবগোষ্ঠীর তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন আর্কটিক মহাসাগর কীভাবে বদলাচ্ছে এবং এই পরিবর্তনগুলো কীভাবে বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চীনের ক্রমবর্ধমান মেরু-আকাঙ্ক্ষা
এই অভিযান কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়। মেরু অঞ্চলে গবেষণায় চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত সক্ষমতা এবং আর্কটিক অঞ্চলে দেশটির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিও এতে স্পষ্ট হয়েছে। চীন নিজেকে “আর্কটিকের কাছাকাছি রাষ্ট্র” বলে বর্ণনা করে এবং গত এক দশকে বরফভাঙা জাহাজ, গবেষণা জাহাজ ও চালকবিহীন ডুবোজাহাজ পাঠিয়ে সেখানে মেরু কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে। বেইজিং তাদের আর্কটিক উদ্যোগকে “শান্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন” কৌশলের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। জলবায়ু গবেষণা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য অধ্যয়ন ও সমুদ্রতলের সম্পদের মানচিত্র তৈরি এই কৌশলের লক্ষ্য।
পুরু বরফের নিচে গভীর-সমুদ্র অভিযান এবং উন্নত বরফভাঙা সহায়ক জাহাজসহ এই অভিযানে প্রদর্শিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফের আচ্ছাদন কমে যাওয়ায় আর্কটিকে যাওয়া ক্রমে সহজ হচ্ছে। এতে নতুন নৌপথ খুলছে এবং সম্ভাব্য সম্পদও উন্মুক্ত হচ্ছে। এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভবিষ্যতের উন্নয়ন-সুযোগ ও গড়ে ওঠা আর্কটিক বাণিজ্যপথে অংশ নেওয়ার অবস্থান তৈরি করছে।
গত গ্রীষ্মে চীন একটি বরফভাঙা জাহাজসহ পাঁচটি গবেষণা জাহাজ আর্কটিকে পাঠায়। এই উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি মেরু গবেষণায় দেশটির অঙ্গীকার এবং আর্কটিক বিষয়ক কর্মকাণ্ডে বড় ভূমিকা নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে। বরফে ঢাকা জলপথে ৪৩টি মানুষবাহী ডুব সফলভাবে সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে চীন বর্তমানে একমাত্র দেশ হয়ে উঠেছে, যারা পুরু বরফে আচ্ছাদিত আর্কটিক মহাসাগরে ধারাবাহিকভাবে মানুষবাহী গভীর-সমুদ্র ডুব পরিচালনা করতে সক্ষম।
চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযান মেরু অঞ্চলের বরফে ফেনদৌঝে ও তান সু-ও সান হাও—দুই যানেরই পরিচালনাগত সক্ষমতা যাচাই করেছে। চরম মেরু পরিস্থিতিতে কাজের নিয়মকানুন তৈরি করার পাশাপাশি এই অভিযানে ভ্রাম্যমাণ বরফ-ডুব মডেলের সূচনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের অনুসন্ধানের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। এই ক্ষেত্রে চীনের নেতৃত্ব আর্কটিক শাসনব্যবস্থা, গবেষণা সহযোগিতা ও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দীর্ঘ পথ
অভিযান শেষ হলেও বৈজ্ঞানিক কাজ কেবল শুরু হয়েছে। সংগৃহীত কাঁচা নমুনা ও ভিডিও ফুটেজের পূর্ণ তাৎপর্য স্পষ্ট হতে বিস্তারিত বিশ্লেষণে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। শিলার খনিজ গঠন ও বয়স পরীক্ষা করা হবে, পলির নমুনায় রাসায়নিক ও জৈবিক চিহ্ন বিশ্লেষণ করা হবে এবং অন্য পরিচিত প্রজাতির সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণে জৈব নমুনা নিয়ে গবেষণা হবে।
পূর্ব গাক্কেল শৈলশিরায় হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের কার্যকলাপের কোনো প্রমাণ আছে কি না, বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে তা খতিয়ে দেখবেন। নির্দিষ্ট কিছু খনিজ, পানির অস্বাভাবিক রাসায়নিক গঠন বা বিশেষ জীবগোষ্ঠীর উপস্থিতি এলাকাটিতে সক্রিয় ভেন্ট থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে। এমন আবিষ্কার গাক্কেল শৈলশিরা সম্পর্কে পূর্ণ চিত্র পেতে সাহায্য করবে এবং গভীর-সমুদ্রে প্রাণ কীভাবে ছড়ায় ও বিবর্তিত হয়, সে সম্পর্কেও নতুন ধারণা দেবে।
অভিযানে সংগৃহীত ভূতাত্ত্বিক তথ্য থেকে গবেষকেরা বুঝতে পারবেন অতি ধীরগতিতে বিস্তৃত শৈলশিরাগুলো দ্রুত বিস্তৃত শৈলশিরা থেকে কীভাবে আলাদা। এই তথ্য প্লেট টেকটোনিকসের মডেল উন্নত করতে এবং পৃথিবীর ভূত্বক কীভাবে তৈরি ও বিবর্তিত হয়, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। সমুদ্রতলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বিস্তারিত মানচিত্র এ অঞ্চলে ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত্তিও তৈরি করবে।
বিজ্ঞানীরা এই ঐতিহাসিক অভিযানের তথ্য ও নমুনা বিশ্লেষণ করতে গেলে অনিবার্যভাবেই নতুন প্রশ্ন উঠবে। প্রতিটি আবিষ্কারই নতুন রহস্যের সন্ধান দেয়, যা আরও অনুসন্ধান ও গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একসময় বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা এবং বিজ্ঞানের কাছে অজানা পূর্ব গাক্কেল শৈলশিরা এখন বৈজ্ঞানিক মানচিত্রের অংশ। এর রহস্য হয়তো ধীরে ধীরে পৃথিবীর গভীর সমুদ্র এবং তার ওপরের পরিবর্তনশীল আর্কটিক সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনা বদলে দেবে।
মূল বিষয়গুলো
- চীনা ডুবোজাহাজ ফেনদৌঝে ৯৮ দিনের আর্কটিক অভিযানে ৪৩টি ডুব সম্পন্ন করে এবং সর্বোচ্চ ৫,২৭৭ মিটার গভীরতায় পৌঁছায়।
- গ্রিনল্যান্ড ও সাইবেরিয়ার মধ্যবর্তী পানির নিচের আগ্নেয় পর্বতমালা পূর্ব গাক্কেল শৈলশিরায় প্রথম মানুষবাহী অনুসন্ধান চালানো হয়।
- অভিযানে “জাহাজ-ডুবোজাহাজ সমন্বয়” পদ্ধতির সূচনা হয়, যার মাধ্যমে ৮০ শতাংশ বরফে ঢাকা জলেও অভিযান চালানো সম্ভব হয়।
- পুরু বরফে ঢাকা আর্কটিক মহাসাগরে ধারাবাহিক মানুষবাহী গভীর-সমুদ্র ডুব চালানো প্রথম দেশ হয়েছে চীন।
- দলটি আগে কখনো অনুসন্ধান না করা গভীর অঞ্চল থেকে পলির নমুনা, শিলা, সমুদ্রের পানি ও জৈব নমুনা সংগ্রহ করে।
- অভিযানে চীনের মানুষবাহী ডুবোজাহাজ ফেনদৌঝে ও জিয়াওলংয়ের মধ্যে প্রথম যৌথ পানির নিচের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- গবেষণায় হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট ও অনন্য বাস্তুতন্ত্রের সন্ধান মিলতে পারে, যা অ্যাস্ট্রোবায়োলজি ও জলবায়ুবিজ্ঞানের জন্য প্রাসঙ্গিক।
- এই অভিযান মেরু গবেষণায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উপস্থিতির প্রমাণ।
- নমুনা ও তথ্যের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য পুরোপুরি বুঝতে কয়েক বছরের বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে।






