বিদেশিদের প্রতি বাড়তে থাকা বৈরিতার প্রতিবাদে জাপানের এক শহরে ১,২০০ মানুষের পদযাত্রা
টোকিওর ঠিক উত্তরে অবস্থিত কাওয়াগুচি শহরে বৈষম্যবিরোধী পদযাত্রায় প্রায় ১,২০০ মানুষ অংশ নেন। শহরটির জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ বিদেশি নাগরিক। ১১ জানুয়ারি সাইতামা প্রিফেকচারের বিভিন্ন এলাকা ও এর বাইরের স্থান থেকে আসা বিক্ষোভকারীদের নিয়ে দুই ঘণ্টার ‘গোচামাজে কাওয়াগুচি নো হেইত মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। তাঁরা জেআর কাওয়াগুচি স্টেশন থেকে নিশি-কাওয়াগুচি স্টেশনের দিকে হাঁটার সময় ‘বৈষম্য বন্ধ করুন’ এবং ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে স্লোগান দেন।
সূচিপত্র
- বিদেশিদের প্রতি বাড়তে থাকা বৈরিতার প্রতিবাদে জাপানের এক শহরে ১,২০০ মানুষের পদযাত্রা
- কুর্দিরা কারা, আর কেন তাঁরা জাপানে এসেছেন?
- সহাবস্থান থেকে সংঘাত: বৈরিতার বিস্তার
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষের বিস্তার
- রাজনৈতিক বক্তব্য ও নির্বাচনী সমীকরণ
- বক্তব্যের আড়ালের বাস্তবতা
- সমাজের প্রতিক্রিয়া: অবস্থান কর্মসূচি থেকে পদযাত্রা
- আইনি লড়াই ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ
- মানবিক মূল্য: ভয়ে দিন কাটাচ্ছে কুর্দি পরিবারগুলো
- জাপানের ভবিষ্যতের জন্য বৃহত্তর তাৎপর্য
- সামনের পথ: আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া
- মূল কথা
জাপানি ভাষায় ‘গোচামাজে’ শব্দের অর্থ ‘মিশ্রণ’, যা বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনস্থল হিসেবে শহরটির পরিচয়কে তুলে ধরে। আয়োজনটি ‘সাউন্ড র্যালি’ হিসেবে করা হয়; আন্তর্জাতিক সংগীত বাজাতে থাকা ডিজেসহ একটি ট্রাকের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা এগিয়ে যান। আয়োজকেরা জানান, পদযাত্রার জন্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সংগঠিত করা হয়নি। এতে আয়োজনটির তৃণমূল চরিত্র ও সমাজের বিস্তৃত সমর্থন প্রতিফলিত হয়েছে।
আয়োজক দলের সদস্য মায়ুকো নাকাজিমা এ আয়োজনের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, গত বছরের উচ্চকক্ষ নির্বাচনের প্রচারসহ নির্বাচনী প্রচারের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্যমূলক বক্তব্যের প্রবণতা বেড়েছে।
আসন্ন কাওয়াগুচি মেয়র নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে নাকাজিমা বলেন, “২৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার আগেই আমি কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম।”
শহরের নিশি-কাওয়াগুচি এলাকায় বসবাসকারী ৩৬ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিক আয়োজনের দিনই র্যালিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জাপানে ১৫ বছর ধরে বসবাস করা এই ব্যক্তি বিদেশিদের নিয়ে আলোচনার ধরনে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বাড়ায় কেউ কেউ অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। তবে যাঁরা র্যালিটি দেখেছেন, তাঁরা কেমন সমাজ চান, তা নিয়ে ভাববেন বলে আশা করি।”
কুর্দিরা কারা, আর কেন তাঁরা জাপানে এসেছেন?
কুর্দিরা স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারী একটি জাতিগোষ্ঠী, তবে তাঁদের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র নেই। বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এই জনগোষ্ঠীর মানুষ মূলত তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান ও ইরাকজুড়ে বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করেন। কয়েক দশক ধরে তাঁরা বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে তুরস্কে সরকার কঠোর আত্মীকরণ নীতি নিয়েছিল, যাতে জাতিগোষ্ঠী হিসেবে কুর্দিদের অস্তিত্বই অস্বীকার করা হয়।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে তুরস্কের সামরিক বাহিনী ও স্বাধীনতাকামী কুর্দি অধিকার সংগঠন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) মধ্যে সশস্ত্র সংঘাতের সময় নিপীড়ন আরও তীব্র হয়। এই সংঘাতের কারণে বহু কুর্দি নিরাপত্তার খোঁজে বিদেশে যেতে বাধ্য হন। তাঁদের কেউ কেউ ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে জাপানে আসেন।
সাইতামা প্রিফেকচারের কাওয়াগুচি ও ওয়ারাবি এলাকায় কুর্দি অভিবাসীদের আসার পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে জাপানের ভাবমূর্তি তাঁদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। পাশাপাশি, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী তুরস্কের নাগরিকেরা ভিসা ছাড়াই সর্বোচ্চ ৯০ দিন জাপানে প্রবেশ করতে পারতেন। কেউ কেউ স্বল্পমেয়াদি দর্শনার্থী হিসেবে এসে অনুমোদিত সময়ের বেশি থেকে যান, অন্যরা নিপীড়ন থেকে বাঁচতে আশ্রয়ের সন্ধানে আসেন।
কাওয়াগুচিতে বসতি গড়া প্রথম কুর্দি হিসেবে পরিচিত তাস মেহমেত ১৯৯৩ সালে তুরস্কে নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নতুন জীবন গড়তে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন এবং নর্দমার কাজ, নির্মাণকাজ ও ভবন ভাঙার মতো যেসব কাজ জাপানিরা সাধারণত এড়িয়ে চলেন, সেগুলো করেছেন।
মেহমেত বলেন, “তারপর থেকে এখানে নতুন জীবন গড়তে আমি নিরলস পরিশ্রম করেছি। জাপানিরা করতে চান না, এমন কাজ করেছি—নর্দমায় কাজ, নির্মাণকাজ ও ভবন ভাঙার কাজ।”
সময়ের সঙ্গে আরও কুর্দি ওই এলাকায় বসতি গড়লে তাঁরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং একটি সমৃদ্ধশালী কমিউনিটি তৈরি করেন। বর্তমানে দক্ষিণ সাইতামায় প্রায় ২০০টি কুর্দি মালিকানাধীন ভবন ভাঙার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জাপানের অনেক ঠিকাদার উত্তরসূরি ছাড়াই অবসর নেওয়ায় এই শিল্প এখন এসব শ্রমিকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সহাবস্থান থেকে সংঘাত: বৈরিতার বিস্তার
প্রায় তিন দশক ধরে কাওয়াগুচি এলাকায় কুর্দি বাসিন্দারা তুলনামূলক শান্তিতে বসবাস করেছেন। আবর্জনা ফেলা ও শব্দের মতো বিষয় নিয়ে সামান্য সাংস্কৃতিক মতবিরোধ ছাড়া বড় কোনো সমস্যা ছিল না। তবে ২০২৩ সালের দিকে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। অনলাইনে ও বাস্তব জীবনে কুর্দি বাসিন্দারা ক্রমেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে কুর্দি পুরুষদের দুটি দলের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন ছুরিকাহত হলে পরিস্থিতির মোড় ঘোরে। আহতদের চিকিৎসার জন্য কাওয়াগুচি মিউনিসিপ্যাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হলে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের স্বজনসহ প্রায় ১০০ জন সেখানে জড়ো হন। ভিড়টি এতটাই ভীতিকর হয়ে ওঠে যে মেডিকেল সেন্টারটি প্রায় ছয় ঘণ্টা জরুরি রোগী নেওয়া বন্ধ রাখে।
ঘটনাটি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঢল নামে। বিভিন্ন পোস্টে সব কুর্দিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কাওয়াগুচি নগর প্রশাসন প্রায় ৪০০টি ক্ষুব্ধ ফোনকল পায়। ফোনকারীদের অনেকে সাইতামা প্রিফেকচারে থাকতেন না; অনলাইনে পোস্টগুলো দেখেই তাঁরা ফোন করেছিলেন।
জাপান কুর্দিশ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ভাক্কাস চিকান স্বীকার করেন, ঘটনাটি দুঃখজনক ছিল। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ দিয়ে পুরো জনগোষ্ঠীকে বিচার করা উচিত নয়।
চিকান বলেন, “ঘটনাটি ঘটিয়ে হাসপাতাল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমস্যায় ফেলা ঠিক হয়নি। তবে সব কুর্দিকে অপরাধী বলা বৈষম্যমূলক বলে আমি মনে করি।”
বাড়তে থাকা উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে কাওয়াগুচি নগর পরিষদ ২০২৩ সালের জুনে একটি লিখিত প্রস্তাব অনুমোদন করে। এতে কুর্দিদের নাম উল্লেখ না করে “নির্দিষ্ট কিছু বিদেশির অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার” আহ্বান জানানো হয়। এই প্রস্তাবের কারণে কাওয়াগুচিতে আইনশৃঙ্খলাহীন কুর্দিদের দাপট চলছে—এমন ধারণা ছড়াতে বিদেশিবিদ্বেষীরা আরও উৎসাহ পেয়ে থাকতে পারেন।
কুর্দিদের বসবাস বেশি এমন একটি এলাকার প্রতিনিধিত্বকারী নগর পরিষদ সদস্য সেইচি ওকুতোমি পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেন।
ওকুতোমি বলেন, “অনিরাপদ গাড়ি চালানো ও সহিংসতা নিয়ে আমি অভিযোগ পেয়েছি। তুরস্কের ভূমিকম্পের পর জাপানে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষের বিস্তার
স্থানীয় কিছু ঘটনা উত্তেজনা বাড়ালেও কুর্দিবিরোধী মনোভাবের বড় অংশের উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারাভিযান, যার অনেকগুলোই জাপানের বাইরে থেকে শুরু হয়। অনলাইন কার্যক্রমের বিশ্লেষণে কুর্দিদের লক্ষ্য করে পোস্টের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে বলে দেখা যায়, যা নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ সফটওয়্যার ব্যবহার করে আসাহি শিম্বুনের করা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চে জাপানের কুর্দিদের নিয়ে এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট ও পুনঃপোস্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। অভিবাসন আইন সংশোধনের একটি বিল নিয়ে আলোচনার সময় এপ্রিলে সংখ্যাটি বেড়ে ২ লাখ ৪০ হাজারে দাঁড়ায়। ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর জুলাইয়ে তা ১০ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায় এবং ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ বেড়ে হয় ২৪ লাখ ২০ হাজার।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভাইরাল হওয়া কুর্দিবিরোধী অনেক বার্তাই এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসে, যাঁরা কুর্দি বাসিন্দা সেজে থাকেন। ৩৪ বছর বয়সী তুর্কি তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী, যিনি নিজেকে তায়ফুন বলে পরিচয় দিয়েছেন, আসাহি শিম্বুনকে স্বীকার করেন যে তিনি কখনো জাপানে যাননি, অথচ এক্সে কুর্দি বাসিন্দা সেজেছিলেন। গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করে বিদ্বেষ উসকে দিতে তিনি জাপানি ভাষায় অন্তত ১৮০টি পোস্ট লেখেন।
প্ল্যাটফর্মটিতে তুর্কি ভাষায় তায়ফুন লিখেছিলেন বলে জানা গেছে, “জাপানিরা এতটাই সরল যে সবকিছু বিশ্বাস করে। এক্সের প্রভাবশালী অ্যাকাউন্টগুলো চাইলে জাপানের আলোচ্যসূচি ঠিক করে দিতে পারে।”
দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসকারী আরেক তুর্কি কর্মীও “মিথ্যাবাদী কুর্দিদের জাপান থেকে বেরিয়ে যেতে” বলে পোস্ট করেছেন। তাঁর দাবি, কুর্দি বাসিন্দারা “তুরস্কের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।”
এই ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো জাপানে কুর্দিদের জীবন নিয়ে বিকৃত বয়ান তৈরিতে সহায়তা করেছে। পোস্টগুলোতে কুর্দিদের “খুনি” এবং “জাপান দখলের” চেষ্টা করছে বলে আখ্যা দেওয়া হয়। কিছু ট্রল সমর্থকদের “ওদের মেরে ফেলতে” বা “কুর্দি শিকারে যেতে” উৎসাহিত করে।
ইন্টারনেট ও দেশপ্রেম নিয়ে বই লেখা সাংবাদিক কোইচি ইয়াসুদা বলেন, কুর্দি হুমকির বয়ানটি যে নজিরবিহীন দ্রুততায় তৈরি করা হয়েছে, তা লক্ষণীয়।
ইয়াসুদা বলেন, “এক বছরেরও কম সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুর্দি হুমকির বয়ান তৈরি করা হয়েছে। এর বিস্তারের গতি ছিল নজিরবিহীন।”
রাজনৈতিক বক্তব্য ও নির্বাচনী সমীকরণ
জাপানে বিদেশি জনসংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসন একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। ২০ জুলাইয়ের উচ্চকক্ষ নির্বাচনের আগে সাইতামা প্রিফেকচারের প্রার্থীরা প্রচারমূলক বক্তৃতায় বিদেশিদের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ক্রমেই বেশি তুলে ধরেছেন।
বিরোধী দল সানসেইতোর এক প্রার্থীকে জেআর ওয়ারাবি স্টেশনে গলা চড়িয়ে বলতে দেখা যায়, “বিদেশির সংখ্যা অত্যধিক বাড়লে জননিরাপত্তার অবনতি হবে এবং সমাজ ভেঙে পড়বে।” দলটির কর্মসূচিতে ‘জাপান ফার্স্ট’ নীতি রয়েছে, যা বিদেশি জনসংখ্যা বেশি এমন এলাকার কিছু ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।
কাওয়াগুচির জনসংখ্যার ৮.৪ শতাংশ এবং ওয়ারাবির ১৩.৩ শতাংশ বিদেশি। এসব এলাকায় অনেক প্রার্থী বিদেশিদের বিষয়ে বিধিনিয়ম নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। বিরোধী দল নিপ্পন ইশিন (জাপান ইনোভেশন পার্টি) “বিদেশি সমস্যা: নিরাপদ সাইতামা ফিরিয়ে আনুন” শিরোনামে প্রচারপত্র বিলি করেছে।
এক প্রচার কর্মকর্তা বলেন, এসব বার্তার প্রতি সাড়া ভৌগোলিক অবস্থানভেদে ভিন্ন।
কর্মকর্তাটি বলেন, “প্রিফেকচারের উত্তরাঞ্চলে বিদেশি কম থাকায় সাড়া মৃদু। কিন্তু এখানে ভোটারদের কাছে এসব কথা আবেদন তৈরি করে।”
একই স্টেশনে বিদেশিদের সুবিধা দেয় এমন নীতি বাতিলের আহ্বান জানানো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রার্থী এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছিলেন, যেগুলোকে বিদ্বেষমূলক বলা যায়। এর মধ্যে ছিল “কোরীয়রা কোরিয়ায় ফিরে যাও” এবং “জাপানবিরোধী কোরীয়দের কাছে আমাদের হারলে চলবে না।”
৫ জুলাই কাওয়াগুচি সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা তাঁর বক্তৃতায় তুলনামূলক সংযত সুরে কথা বলেন।
ইশিবা বলেন, “মানুষের নিয়মকানুন যথাযথভাবে মেনে চলা এবং জাপানি সমাজে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করা গুরুত্বপূর্ণ।”
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ঘনিষ্ঠ এক স্থানীয় সূত্র প্রধানমন্ত্রীর সংযত অবস্থানে হতাশা প্রকাশ করেন।
সূত্রটি বলেন, “এমন দুর্বল ভাষা মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। একটা উদ্বেগ আছে যে, বিধিনিয়ম কঠোর করার মতো জোরালো কথা ভোটারদের কাছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শব্দদূষণের মতো সমস্যা নিয়ে কাজ করা স্থানীয় পরিষদ সদস্যদের অর্জনের চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে পৌঁছায়।”
বক্তব্যের আড়ালের বাস্তবতা
বিদেশিদের অপরাধ নিয়ে উদ্বেগজনক বক্তব্য থাকলেও পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সাইতামা প্রিফেকচারে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ৮.৮ শতাংশ বিদেশি। তবে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদেশি জনসংখ্যা ২৭ শতাংশ বাড়লেও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁদের অনুপাত প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে ২০১৯ সালের পর থেকে স্বীকৃত দণ্ডবিধির অপরাধের সংখ্যা কমেছে।
কাওয়াগুচিতে গত ২০ বছরে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে; ২০০৪ সালের ১৪ হাজার ৬৭৯ থেকে ২০২৩ সালে হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৫৩। অথচ একই সময়ে বছরে নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা ১৬ হাজার ৩১৪ থেকে কমে ৪ হাজার ৪৩৭ হয়েছে। গত বছর কাওয়াগুচি পুলিশের গ্রেপ্তার করা ১ হাজার ৩১৩ জনের মধ্যে ১ হাজার ১২৯ জনই জাপানি নাগরিক ছিলেন।
বিদেশিরা বিশেষ সুবিধা পান—এমন দাবির ক্ষেত্রে তথ্য বলছে, জনকল্যাণমূলক সুবিধায় তাঁদের অংশ আনুপাতিক হারে কম। ২০২৩ সালে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমার গ্রাহকদের ৪ শতাংশ ছিলেন বিদেশি, কিন্তু তাঁদের জন্য পরিশোধিত চিকিৎসা ব্যয় ছিল মোট ব্যয়ের মাত্র ১.৩৯ শতাংশ। গত দশকে বিদেশি জনসংখ্যা ৬৫ শতাংশ বাড়লেও ২০২৩ সালে জীবিকা নির্বাহে সরকারি সহায়তা পাওয়া বিদেশি পরিবার ছিল প্রায় ৪৬ হাজার, যা মোট পরিবারের ২.৮ শতাংশ।
সমাজের প্রতিক্রিয়া: অবস্থান কর্মসূচি থেকে পদযাত্রা
১১ জানুয়ারির বিদ্বেষবিরোধী পদযাত্রা কোনো বিচ্ছিন্ন আয়োজন ছিল না; বরং এ অঞ্চলে বিদেশিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে একটি বিদ্বেষবিরোধী গোষ্ঠী ওয়ারাবি স্টেশনের বাইরে নিয়মিত ‘অবস্থান কর্মসূচি’ পালন করছে। প্রতিবার এতে প্রায় ১০ জন অংশ নেন, যাঁদের অনেকে দূরের শহর থেকে আসেন।
ইয়োকোহামা থেকে আসা চল্লিশোর্ধ্ব এক অংশগ্রহণকারী কেন এসব অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেন, তা ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, “কুর্দিদের প্রতি করুণা থেকে আমরা এটা করি না। ২০০৯ সাল থেকে চলা বিদ্বেষবিরোধী ধারারই অংশ এটি, যার প্রথম লক্ষ্য ছিল শহরের ফিলিপিনো বাসিন্দারা। লক্ষ্য বদলায়, কিন্তু যারা বিদ্বেষ ছড়ায় তারা একই থাকে। আমি দেখেও না দেখার ভান করতে পারি না। সমাজের অন্য সদস্যদের যাতে বৈষম্যের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর সমাধান করতে পারে কেবল জাপানি সংখ্যাগরিষ্ঠরাই।”
বিদ্বেষের বিষয়টি জনসমক্ষে আসার অনেক আগে থেকেই স্থানীয় উদ্যোগগুলো কুর্দি কমিউনিটির সদস্যদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাতসুহিরো নুকুই ও তাঁর স্ত্রী মাদোকা ‘হেভাল’ নামের একটি অলাভজনক সংস্থা পরিচালনা করেন। কুর্দি ভাষায় ‘হেভাল’ শব্দের অর্থ ‘বন্ধু’। সংস্থাটি কুর্দি বাসিন্দাদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে সহায়তা করে এবং শিশুদের সরকারি স্কুলে পড়ার সুযোগ করে দেয়।
২০২০ সাল থেকে হেভাল ওয়ারাবি স্টেশনের কাছে প্রতি রোববার স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচালনায় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জাপানি ভাষার ক্লাস নিচ্ছে। নুকুই এসব ক্লাসের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন।
নুকুই বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম কুর্দি অভিভাবকেরা জাপানি ভাষার সঙ্গে আরও পরিচিত হোন। স্কুলগুলো থেকে অনেক ফোন আসত, তারা বলত অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমস্যায় পড়ছে।”
২০২৩ সালের মে থেকে প্রায় ১২০টি বিদ্বেষমূলক চিঠি পেলেও নুকুই বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে বিরোধকে প্রায়ই বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। বিদ্বেষ ছড়ানোর বদলে অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলোর সমাধানের গুরুত্বের ওপর তিনি জোর দেন।
নুকুই বলেন, “কুর্দিবিরোধী কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির কিছু উদ্বেগের সঙ্গে আমারও মিল আছে বলে মনে হয়েছে। তবে আমাদের পার্থক্য হলো, সেই মতপার্থক্য মেটানোর পদ্ধতিতে। উদাহরণ হিসেবে, জাপানে আসা বিদেশিদের জন্য জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রায় পুরোপুরি স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সমাজ হিসেবে অন্য গোষ্ঠীগুলোকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা আমাদের ভাবতে হবে।”
আইনি লড়াই ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ
বিদ্বেষমূলক বক্তব্য থেকে কুর্দিদের সুরক্ষা দিতে জাপানের আইনজীবী সমাজও তৎপরতা বাড়িয়েছে। ৮৩ সদস্যের এক আইনজীবী দল কানাগাওয়া প্রিফেকচারের এক বাসিন্দার কাছ থেকে ৫৫ লাখ ইয়েন (৩৬ হাজার ডলার) ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছে। ওই ব্যক্তি প্রায় প্রতি সপ্তাহে শহরে এসে কুর্দি অ্যাসোসিয়েশনকে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ করতেন।
সাইতামা জেলা আদালতের নভেম্বরে দেওয়া এক আদেশের ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে। ওই আদেশে কুর্দিবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত এক বিক্ষোভকারীকে অ্যাসোসিয়েশনের ৬০০ মিটারের মধ্যে বিক্ষোভ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। মামলার প্রথম শুনানির তারিখ ছিল ২৩ এপ্রিল।
মামলার সঙ্গে যুক্ত টোকিওভিত্তিক আইনজীবী ইয়াসুকো মোরোকা এ আইনি পদক্ষেপের বৃহত্তর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন।
মোরোকা বলেন, “আমরা দেশকে দেখাতে চাই, এটি অগ্রহণযোগ্য এবং শুধু আসামির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; কুর্দিবিদ্বেষ সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা আশা করি, এর ফলে পৌর সরকারগুলো শুধু একটি গোষ্ঠীকে ঘিরে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বৈষম্যবিরোধী স্থানীয় বিধি প্রণয়নে উৎসাহিত হবে।”
বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিরুৎসাহিত করার আইন জাপানের অন্যান্য পৌরসভায় ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২০২০ সালে টোকিওর কাছে কাওয়াসাকিতে চালু হওয়া আইন, যেখানে শহরটির কোরীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ব্যাপক ছিল।
কাওয়াগুচি নগর প্রশাসনও উত্তেজনা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ে অভিযোগের জবাবে ২০২২ সালের জুলাইয়ে শহরটি একটি বিধি কার্যকর করে। এর আওতায় ভবন ভাঙার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরঞ্জাম ও উপকরণ রাখার জন্য বড় জায়গা ব্যবহারের আগে অনুমোদন নিতে হয়।
কাওয়াগুচির মেয়র নোবুও ওকুকি পরিস্থিতি সামলাতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছেন।
ওকুকি বলেন, “যাঁরা আইন ভাঙবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে আরও আহ্বান জানান, অস্থায়ী মুক্তিতে থাকা অন্যদের কাজ করার অনুমতি দিতে, যাতে তাঁরা ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে পারেন।
মানবিক মূল্য: ভয়ে দিন কাটাচ্ছে কুর্দি পরিবারগুলো
পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে রয়েছে বাস্তব পরিবারগুলো, যাদের দৈনন্দিন জীবন বাড়তে থাকা বৈরিতায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এক দশকেরও বেশি আগে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে জাপানে আসা কুর্দি বাবা আলি পরিবেশ কীভাবে বদলে গেছে, তা বর্ণনা করেন।
আলি বলেন, “তুরস্কে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আমি মরে যেতে রাজি। কিন্তু এখানেও জীবন খারাপ হচ্ছে। দেখতে পাচ্ছি, জাপানি প্রতিবেশীরা এখন আমাদের সঙ্গে অনেক বেশি শীতল আচরণ করেন। কেউ কেউ অভিবাদন জানাতেও অস্বীকার করেন।”
জুলাইয়ে আলির ছেলেরা বাড়ির কাছের একটি পার্কে খেলছিল। তখন এক ব্যক্তি তাদের কাছে আসেন। পুলিশের কাছে দেওয়া আলির বিবৃতি অনুযায়ী, লোকটি তাঁর ছোট ছেলের—যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী—মুখে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেন। একই সঙ্গে জাপানি ভাষায় চিৎকার করেন, “বিদেশিরা, তোমাদের দেশে ফিরে যাও!”
কয়েক সপ্তাহ পর আলি হামলার বিষয়ে ওই ব্যক্তির মুখোমুখি হলে তিনি শিশুটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার কথা অস্বীকার করেন, তবে ভয়ংকর এক হুমকি দেন।
লোকটি বলেন, “আইন না থাকলে আমি তোমাদের মেরে ফেলতাম।”
কুর্দি শিশুদের ওপর এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুতর। আলি জানান, তাঁর সন্তানদের স্কুলে গালমন্দ করা হয়েছে এবং অন্য শিশুরা তাদের সঙ্গে খেলতে চায় না।
আক্রমণের পর মানসিক আঘাত পাওয়া ১১ বছর বয়সী ছেলের বিষয়ে আলি বলেন, “আমার বাচ্চারা বাইরে যেতে খুব ভয় পায়। হামলার পর ওর ঠোঁট দিয়ে রক্ত পড়ছিল। রাতে ঘুম ভেঙে যায়, আর ওর মনে হয় লোকটি এসে ওকে মেরে ফেলবে।”
আলি শরণার্থী মর্যাদার জন্য তাঁর তৃতীয় আবেদনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি ও তাঁর পরিবার আর তুরস্কে নিরাপদে থাকতে পারতেন না। তবে জাপান মাত্র একজন কুর্দি অভিবাসীকে শরণার্থী মর্যাদা দিয়েছে। গত বছর দেশটি মোট ১৯০ জনকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যাঁদের অধিকাংশই আফগানিস্তানের।
জাপানের ভবিষ্যতের জন্য বৃহত্তর তাৎপর্য
কাওয়াগুচির উত্তেজনা জনসংখ্যা হ্রাস ও কর্মীসংকট মোকাবিলায় জাপানের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। ২০২৫ সালের শুরুতে দেশটিতে বিদেশি জনসংখ্যা রেকর্ড ৩৮ লাখে পৌঁছায়, যদিও তা মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও কম। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিউরিটি রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৭ সালের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে অভিবাসন এখন অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। এটি জাপানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা প্রভাবিত করতে পারে। গত এক বছরে দুটি কঠিন নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অবৈধ অভিবাসন শূন্যে নামানো, নতুন আগমনে সীমা নির্ধারণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।
চরম ডানপন্থী ইয়ামাতো পার্টির সভাপতি এবং তোদার স্বঘোষিত ‘জোকার’ নগর পরিষদ সদস্য ইউসুকে কাওয়াই অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। জাপানি পতাকা গায়ে জড়িয়ে এবং “নিহোনজিন ফার্স্ট” (জাপানিরা প্রথম) স্লোগান লেখা প্রচার ট্রাক থেকে নাটকীয় বক্তৃতা দিয়ে কাওয়াই প্রায় ২০০ জনের ভিড় টানেন। তাঁদের অধিকাংশ নারী ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক।
ওয়ারাবি স্টেশনের বাইরে সাম্প্রতিক এক সমাবেশে কাওয়াই বলেন, “নারীরা যেন আবার রাতে শহরে একা হাঁটতে পারেন, সে জন্য আমি লড়ছি।”
এ ধরনের নেতার উত্থান যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাওয়া বিদেশিবিদ্বেষী আন্দোলনের প্রতিফলন। তবে কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ঐতিহ্যগতভাবে একজাতিক জাপানি সমাজ অভিবাসন নিয়ে ভয় ছড়ানো বক্তব্যের কাছে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মহামারির পর বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আগস্টে রেকর্ড ৩৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ জাপান সফর করেন। এ প্রবণতা “নীরব আগ্রাসন” নিয়ে ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণীকেও উসকে দিয়েছে। এই মাসে বাসিন্দাদের বিদেশিবিদ্বেষী প্রতিক্রিয়ার মুখে সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া একটি নিজ শহর অংশীদারত্ব কর্মসূচি বাতিল করেছে।
সামনের পথ: আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া
চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আশার লক্ষণ রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে নওরোজ উৎসবে ইউসুকে কাওয়াই কুর্দি নববর্ষ উদ্যাপনকে “বন্ধ করা উচিত এমন একটি সন্ত্রাসী আয়োজন” বলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে, ভিড়ের অধিকাংশ জাপানি অংশগ্রহণকারী তাঁকে তাড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসেন। তাঁদের কেউ কেউ বৈষম্যের নিন্দা জানানো ব্যানার তুলে ধরেন।
উৎসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত মেহমেত চোলাক অনুষ্ঠান শেষে আশাবাদী সুরে কথা বলেন।
চোলাক বলেন, “যা-ই ঘটুক, ওই ধরনের লোকজন আসবেই। তবে এ বছর আমরা উৎসব উপভোগ করতে পেরেছি এবং আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ জাপানিকে স্বাগত জানিয়েছি। আশা করি, আগামী বছরও এটি করতে পারব।”
হেভালের জাপানি ভাষার ক্লাসে আসা বয়স্ক কুর্দিদের কেউ কেউ অনলাইন আলোচনার গুরুত্ব খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছেন। তুরস্কের আত্মীকরণ নীতির বিরোধী কুর্দি ভাষার লেখা প্রকাশের পর দেশটি থেকে পালিয়ে আসা চল্লিশোর্ধ্ব এক লেখক দৃঢ়তার পরিচয় দেন।
অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে তিনি বলেন, “যাদের হৃদয় বিদ্বেষে ভরা, তারা কাপুরুষ। আমি সত্যিকারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি, আর ভয় পাওয়ার অর্থই ভুলে গেছি। ওরা আমাকে ভয় দেখাতে পারবে না।”
জাপানে তিন দশক ধরে শান্তিতে বসবাস করা তাস মেহমেত এখন কাওয়াগুচিতে ফেরার সময় আগের মতো স্বস্তি নয়, বরং প্রতিদিন উদ্বেগ অনুভব করেন।
মেহমেত বলেন, “ইদানীং কাজ শেষে কাওয়াগুচিতে ফিরতে মন খারাপ লাগে। আগে গাছঘেরা রাস্তা চোখে পড়লেই স্বস্তি পেতাম, কারণ জানতাম পরিবার ও বন্ধুরা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। এখন শুধু খুব উদ্বিগ্ন লাগে। বাড়ি ফেরার সময় কুর্দি পরিচয় নিয়ে অস্বস্তি বোধ করি। কুর্দিরা কি এতটাই ভয়ংকর? আমাকে যা ভয় দেখায়, তা হলো বৈষম্য।”
জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে জাপানের সামনের পথ এখনো অনিশ্চিত। সহাবস্থান ও বৈচিত্র্য উদ্যাপনের বার্তা নিয়ে ১১ জানুয়ারির পদযাত্রা ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য রূপ তুলে ধরেছে।
মূল কথা
- জাপানের কাওয়াগুচিতে বিদেশি বাসিন্দাদের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদে ১১ জানুয়ারি “গোচামাজে কাওয়াগুচি নো হেইত মার্চে” প্রায় ১,২০০ মানুষ অংশ নেন।
- ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে কাওয়াগুচি এলাকায় বসতি গড়তে শুরু করা কুর্দি বাসিন্দারা ২০২৩ সাল থেকে বাড়তে থাকা বৈরিতার মুখে পড়েছেন; এ সময় অভিবাসন আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও জোরালো হয়।
- ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কুর্দি পুরুষদের মধ্যে ছুরিকাঘাতের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঢেউ তোলে এবং নগর কর্মকর্তাদের কাছে শত শত ক্ষুব্ধ ফোনকল আসে।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুর্দিবিরোধী অনেক বার্তার উৎস জাপানের বাইরে। বিদ্বেষ উসকে দিতে কেউ কেউ কুর্দি বাসিন্দা সেজেছেন।
- নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থীরা ক্রমেই বিদেশিবিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করছেন, যদিও পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিদেশি জনসংখ্যা বাড়ার অনুপাতে বিদেশিদের সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়েনি।
- কাওয়াগুচিতে ২০ বছরে বিদেশি জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, অথচ সামগ্রিক অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
- কুর্দিদের সমাজে অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তাকারী অলাভজনক সংস্থা হেভালের মতো স্থানীয় উদ্যোগ এবং ওয়ারাবি স্টেশনে নিয়মিত বিদ্বেষবিরোধী অবস্থান কর্মসূচি বৈষম্য মোকাবিলায় সমাজের প্রচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে।
- বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে মামলা এবং কুর্দি কমিউনিটি কেন্দ্রের কাছে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে আদালতের আদেশসহ আইনি পদক্ষেপও প্রতিক্রিয়ার আরেকটি পথ।
- কুর্দি পরিবারগুলো বাড়তে থাকা ভয়ের কথা জানিয়েছে। শিশুরা বিদ্যালয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং অভিভাবকেরা জনসমক্ষে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
- জনসংখ্যা হ্রাস ও কর্মীসংকটের মুখে ২০২৫ সালে জাপানের বিদেশি জনসংখ্যা রেকর্ড ৩৮ লাখে পৌঁছেছে।






