ধানখেত থেকে শিল্পাঞ্চল
বাক নিনের রূপান্তর চোখে পড়ে চারদিকে। হ্যানয়ের ঠিক উত্তরে অবস্থিত এই শহর একসময় পরিচিত ছিল সবুজ ধানখেত আর কোয়ান হো লোকগানের মায়াবী প্রেমের দ্বৈত সংগীতের জন্য। আজ এখানকার দৃশ্যপটে আধিপত্য বিস্তার করেছে বিস্তীর্ণ কারখানা কমপ্লেক্স, চীনা ও কোরীয় ভাষায় সেবার বিজ্ঞাপন দেওয়া বিলবোর্ড এবং এশিয়ার বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে দোকান। এই দ্রুত রূপান্তর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নতুনভাবে গড়ে তোলা বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে নতুন জায়গায় গড়ে উঠছে। এই পরিবর্তনে ভিয়েতনাম অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শুল্ক বৃদ্ধি এবং চীনের বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খোঁজার কারণে বিদেশি বিনিয়োগের যে ঢেউ ত্বরান্বিত হয়েছে, তা শোষণ করছে দেশটি।
সূচিপত্র
প্রাথমিক উত্থানের পেছনে ছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার আগাম বিনিয়োগ, যা ভিয়েতনামকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে। তবে বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধরন আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এড়াতে উৎপাদন ঘাঁটি বৈচিত্র্যময় করছে এমন চীনা কোম্পানিগুলোই মূলত এই প্রবৃদ্ধির জ্বালানি। এই বিনিয়োগের ঢল অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এনেছে, তবে একই সঙ্গে ভিয়েতনামের দ্রুত উত্থানের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। ক্রমবর্ধমান শ্রমব্যয়, শ্রমিকের ঘাটতি এবং চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাওয়া অবকাঠামোসহ নানা জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে এখন দেশটি।
বাক নিন কারুশিল্পের কেন্দ্র থেকে উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামের বৃহত্তর অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবন্ধকতার ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। দেশটি মূল্যশৃঙ্খলের উচ্চতর ধাপে উঠতে চাইছে—কম ব্যয়ের সংযোজনশিল্প থেকে উন্নত উৎপাদনে যেতে চাইছে। তবে সামনে এগোনোর পথ প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতায় ভরা।
<বড় স্থানান্তরের চালিকাশক্তি
চীন থেকে উৎপাদনশিল্পের প্রস্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং আগে থেকেই চলা প্রবণতার গতি বেড়েছে। কয়েক দশক ধরে চীন ছিল বিশ্বের কারখানা, যেখানে ছিল কম শ্রমব্যয়, বিস্তৃত অবকাঠামো ও বিপুল কর্মশক্তি। কিন্তু হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। চীনে মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ব্যয়ের দিক থেকে দেশটির সুবিধা কমেছে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধ, উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একক দেশের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে কোম্পানিগুলো ক্রমেই উৎপাদন কার্যক্রম বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিয়ে "চীন প্লাস ওয়ান" কৌশল গ্রহণ করছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ নিয়ে উদ্বেগ এবং কোভিড-১৯ মহামারিতে প্রকাশ পাওয়া সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাও স্থানান্তরের প্রণোদনা বাড়িয়েছে। স্যামসাং ও অ্যাপলের মতো বড় করপোরেশনগুলো এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছে। স্যামসাং স্মার্টফোন উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ চীনের বাইরে সরিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভিয়েতনামে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অ্যাপলও উৎপাদন বৈচিত্র্যময় করতে শুরু করেছে; আইফোনের কিছু উৎপাদন ভারত ও ভিয়েতনামে সরিয়ে নিচ্ছে। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য শুধু সস্তা শ্রম খুঁজে পাওয়া নয়। ভূরাজনৈতিক ধাক্কা ও বাণিজ্য বিঘ্ন সামাল দিতে সক্ষম, স্থিতিস্থাপক ও নমনীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য।
এইচএসবিসির এশিয়াবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডরিক নিউম্যানের মতে, বাণিজ্য উত্তেজনা কমলেও উৎপাদন বৈচিত্র্যময় করার গতি জোরালো থাকবে। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো শুধু কারখানা চীন থেকে সরানোর চেষ্টা করছে না; বিকল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্রিয়ভাবে কয়েকটি দেশে উৎপাদন ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের অর্থ হলো, স্বল্পমেয়াদি শুল্ক ওঠানামা যা-ই হোক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন সক্ষমতার চাহিদা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
<দুই ভিয়েতনামের গল্প
উত্তরের শিল্পকেন্দ্র
ভিয়েতনামের উৎপাদনশিল্পের চিত্র একরকম নয়। বিশ্লেষকেরা প্রায়ই উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে পার্থক্য করেন, কারণ এই দুই অঞ্চল উৎপাদনের সম্পূর্ণ ভিন্ন মডেলে কাজ করে। বাক নিন, হাই ফং ও থাই নুয়েনের মতো প্রদেশকে কেন্দ্র করে উত্তর ভিয়েতনাম উচ্চ-নির্ভুলতার উৎপাদনের একটি ঘনীভূত করিডরে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চল পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে, গভীরভাবে যুক্ত। এখানে রয়েছে ইলেকট্রনিকস খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান এবং ভারী শিল্পের সংযোজন কারখানা, যেগুলো নিবিড় সরবরাহব্যবস্থা ও সমন্বিত উৎপাদনচক্রের ওপর নির্ভরশীল।
বাক নিনের উত্থান এই বিশেষায়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। শহরটির প্রথম বড় উত্থান শুরু হয় ২০০৮ সালের দিকে, যখন স্যামসাং সেখানে তাদের প্রথম ফোন কারখানা গড়ে তোলে। এতে ভিয়েতনাম কোম্পানিটির বৃহত্তম বিদেশি উৎপাদন ঘাঁটিতে পরিণত হয়। স্যামসাংয়ের উপস্থিতি অন্যদের আকৃষ্ট করে; সরবরাহকারী ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোও সেখানে আসে। এখন চীনা কোম্পানিগুলো একই সরবরাহব্যবস্থার অবকাঠামো ও শ্রমশক্তি কাজে লাগাতে সেখানে ভিড় করছে। চীনা সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এই অঞ্চল থেকে দ্রুত যন্ত্রাংশ আনা-নেওয়া যায়। ঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহের মডেলে কাজ করা ইলেকট্রনিকস নির্মাতাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণের রপ্তানি প্ল্যাটফর্ম
এর বিপরীতে, হো চি মিন সিটি এবং বিন দুয়ং ও দোং নাইয়ের মতো আশপাশের প্রদেশকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ভিয়েতনাম বহুমুখী উৎপাদন ও রপ্তানি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। দ্রুত বিক্রিত ভোগ্যপণ্য ও পোশাক থেকে শুরু করে জুতা ও আসবাব—বিভিন্ন শিল্পকে সহায়তা করার নমনীয়তার জন্য অঞ্চলটি পরিচিত। উত্তর যেখানে কারিগরি দক্ষতা ও এশীয় সরবরাহকারীদের সঙ্গে সংযোগের ওপর গুরুত্ব দেয়, দক্ষিণ সেখানে বিস্তৃত সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক ও অভিযোজনক্ষমতার জন্য পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে নির্দিষ্ট সরবরাহসূচির ওপর যেসব নির্মাতার আয় নির্ভরশীল, তাদের জন্য দক্ষিণে রয়েছে সরবরাহব্যবস্থাগত সুবিধা। কাই মেপ-থি ভাই গভীর সমুদ্রবন্দর কমপ্লেক্স থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে সরাসরি জাহাজ চলাচলের সুবিধা রয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের পথের তুলনায় পরিবহন সময় কম লাগে। এই ভৌগোলিক বিভাজন ভিয়েতনামের বাজারে প্রবেশের সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব তুলে ধরে: উত্তরে কারিগরি সংযোগ, নাকি দক্ষিণে পরিবহনগত নমনীয়তা।
<দ্রুত প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা
আশাবাদের পাশাপাশি এই প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য চাপও তৈরি করছে। সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ শ্রমবাজার। কারখানাগুলো শ্রমিকের জন্য প্রতিযোগিতা করায় মজুরি বাড়ছে এবং কর্মী নিয়োগ কঠিন হয়ে উঠছে। শেনঝেন থেকে স্থানান্তরিত একটি টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম কোম্পানির কর্মী পেং শ্রমবাজারের সংকোচনের কথা তুলে ধরেন। তার মতে, ২০২৪ সাল থেকে শ্রমব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে এবং আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্মী আকৃষ্ট করতে বাক নিনের কোম্পানিগুলো বেশি মজুরি, যোগদান বোনাস এবং এমনকি ইনস্ট্যান্ট নুডলসের প্যাকেটের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিংবা যাতায়াতকারীদের বিনা মূল্যে বাসভাড়ার সুবিধা দিচ্ছে।
মজুরির এই চাপ ভিয়েতনামের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা—কম শ্রমব্যয়—ক্ষুণ্ন করছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ন্যূনতম মজুরি ৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, শ্রমিকেরা উন্নত জীবনযাত্রার মান দাবি করায় এই প্রবণতা চলবে। তাছাড়া, কর্মশক্তি তরুণ ও প্রাণবন্ত হলেও উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ দক্ষতা অনেকের নেই। হিলি কনসাল্টিং গ্রুপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিয়েতনামের কর্মশক্তির বড় একটি অংশের সনদ বা কারিগরি প্রশিক্ষণ নেই। ফলে এই ঘাটতি পূরণে কোম্পানিগুলোকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিপুল বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেকো লজিস্টিকসের বৈশ্বিক প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা ব্রায়ান বোর্ক বলেন, জুতা, আসবাব ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য ভিয়েতনাম এখনো শীর্ষ গন্তব্য হলেও অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতায় দেশটি চীনের চেয়ে পিছিয়ে। বাক নিনের মতো দ্রুত বেড়ে ওঠা শিল্পনগরীতে এসব সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে, যেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দ্রুত আগমন সহায়ক পরিষেবা ও পরিবহন নেটওয়ার্কের উন্নয়নকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
<সরবরাহব্যবস্থার দ্বিধা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো আমদানি করা উপকরণের ওপর ভিয়েতনামের নির্ভরতা, বিশেষ করে চীন থেকে আসা উপকরণের ক্ষেত্রে। চীনভিত্তিক ভেলং এন্টারপ্রাইজেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যাকব রথম্যান জোর দিয়ে বলেন, সরকারি সহায়তা ও বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন কয়েক দশক ধরে "সেরা উৎপাদনব্যবস্থা" গড়ে তুলেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "এটা রাতারাতি পুনর্গঠন করা যায় না।" ভিয়েতনামের নির্মাতারা প্রায়ই চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা মধ্যবর্তী পণ্য, আংশিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং মূলধনী পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। এই নির্ভরতার ফলে ওই দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয় এবং সরবরাহব্যবস্থায় একের পর এক সমস্যা ছড়িয়ে পড়ে।
কারখানা বন্ধ বা বন্দরে জটের মতো কারণে চীনে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব দ্রুত ভিয়েতনামে পড়ে। সীমান্তের ওপার থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে না পারলে ভিয়েতনামের কারখানায় উৎপাদন লাইন থেমে যায়, পণ্য সরবরাহে দেরি হয়। এই নির্ভরতা পুরোপুরি স্বনির্ভর উৎপাদনশক্তি হয়ে ওঠার লক্ষ্যকে জটিল করে তোলে। এর অর্থ, ভিয়েতনাম চীনের সরবরাহব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন না করে মূলত তার জন্য সংযোজনের কাজই করছে।
পশ্চিমা বাজারকে লক্ষ্য করা কোম্পানিগুলোর জন্য সরবরাহব্যবস্থা এখনো বড় বাধা। ভিয়েতনাম প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে কয়েক সপ্তাহ লাগে এবং মেক্সিকোর মতো কাছাকাছি দেশে উৎপাদনের বিকল্পের তুলনায় ব্যয়ও অনেক বেশি। এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর খরচ আকাশছোঁয়া হয়েছে। দীর্ঘ পরিবহন সময়ের কারণে দেরি ও মজুত ঘাটতির ঝুঁকিও বাড়ে। এ ছাড়া, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন অবকাঠামোর মান দুর্বল বলে বিবেচিত। সড়ক পরিবহন অবকাঠামোর বৈশ্বিক অবস্থান ১০৩তম, আর জাতীয় মহাসড়ক ব্যবস্থার মাত্র সামান্য অংশ পাকা। ফলে কারখানা থেকে বন্দরে পণ্য নেওয়ার পথে জট তৈরি হয়।
<বাণিজ্য সম্পর্ক ও প্রতিযোগিতা সামলানো
ভিয়েতনামের সাফল্য রাজনৈতিক নজরদারিও টেনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে এমন দেশ খুব কম। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ১২৩.৫ বিলিয়ন ডলার, যা চীন ও মেক্সিকোর পর তৃতীয় সর্বোচ্চ। এই বিপুল উদ্বৃত্তে ট্রাম্প প্রশাসন অসন্তুষ্ট হয়েছিল। ভিয়েতনামি পণ্যে ৪৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তা ২০ শতাংশে নির্ধারিত হয়। দুই দেশ এই পর্যায়ে শুল্ক বজায় রাখার চেষ্টা করলেও আরও বেশি শুল্ক আরোপের আশঙ্কা বড় হয়ে আছে। শুল্ক এড়াতে ভিয়েতনামকে পণ্য পুনঃরপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় কিছু নির্মাতাও সতর্ক হয়েছে।
এই ঝুঁকি কমাতে কোম্পানিগুলো নিজেদের বিনিয়োগ ও কার্যক্রমও বৈচিত্র্যময় করছে। ব্রায়ান বোর্ক জানান, সেকো লজিস্টিকসের এক গ্রাহক আসবাবের কিছু উৎপাদন ভারতে সরিয়ে নিয়েছে, কারণ তারা "সব ডিম ভিয়েতনামে রাখতে" চায়নি। এই মনোভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়তে থাকা সতর্কতার প্রতিফলন, কারণ তারা বুঝতে পারছেন যে ভিয়েতনাম সম্ভাবনাময় হলেও সীমাহীন উৎপাদন সক্ষমতা গ্রহণ করতে পারবে না।
এ ছাড়া, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। ভিয়েতনামের প্রাথমিক সাফল্যের সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ফিলিপাইন সম্প্রতি এমন একটি আইন পাস করেছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ৯৯ বছর পর্যন্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ইজারা নেওয়ার সুযোগ দেয়। এদিকে, অভ্যন্তরীণ বড় বাজার ও দক্ষ কর্মশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অ্যাপলের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করছে ভারত; দেশটি প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। সরবরাহব্যবস্থার দৈর্ঘ্য কমাতে চাওয়া নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের নিকটবর্তী অবস্থান ও ইউএসএমসিএর মতো অনুকূল বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা নিয়ে মেক্সিকোও এগিয়ে যাচ্ছে।
<২০৪৫-এর লক্ষ্য
এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সচেতন ভিয়েতনাম সরকার অর্থনীতির উন্নয়নে দেশজুড়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে। ২০৪৫ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ভিয়েতনাম। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো এশিয়ার "টাইগার অর্থনীতির" কাতারে ওঠার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে দেশটির। এই লক্ষ্য অর্জনে কম ব্যয়ের সংযোজনশিল্প পেরিয়ে ইলেকট্রনিকস, ওষুধ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সরঞ্জামের মতো উচ্চমূল্যের উৎপাদনে যেতে হবে।
অবকাঠামো উন্নয়ন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। চীনা সীমান্তে যাতায়াতের সময় কমাতে নতুন মহাসড়ক নির্মিত হচ্ছে। পরিকল্পিত একটি রেলপথ হ্যানয়কে বন্দরনগরী হাই ফং ও সীমান্ত শহর লাও কাইয়ের সঙ্গে যুক্ত করবে। ডিসেম্বরে বাক নিনে উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদনে নিবেদিত একটি শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে, বড় রাজনৈতিক সম্মেলনের আগে অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকাশ হিসেবে সরকার ১২৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ২৩৪টি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
এই রূপান্তরে সহায়তা করতে যন্ত্রপাতি আমদানিতে করছাড় ও কম ভাড়ার মতো প্রণোদনা দিচ্ছে ভিয়েতনাম, যাতে সরবরাহকারীরা উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও ভারতে রপ্তানি বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোরও চেষ্টা করছে দেশটি। প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন দেশটির প্রভাব ও সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তবে বাস্তবতা হলো, ভিয়েতনামের অর্থনীতি চীনের তুলনায় ৪০ গুণ ছোট হওয়ায় দেশটির পক্ষে চীনকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। কৌশলটি প্রতিস্থাপন নয়; বরং বৈচিত্র্যময় বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হওয়া এবং সেই ব্যবস্থার মধ্যে নিজেদের অবস্থান উন্নত করা।
<মূল বিষয়গুলো
- বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ এবং "চীন প্লাস ওয়ান" কৌশলের কারণে ভিয়েতনাম, বিশেষ করে বাক নিন, কৃষিপ্রধান অঞ্চল থেকে বড় উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে এবং সরবরাহব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করতে স্যামসাং ও অ্যাপলের মতো বড় করপোরেশন উৎপাদন ভিয়েতনামে সরিয়ে নিচ্ছে।
দ্রুত শিল্পোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শ্রমব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকের ঘাটতি এবং দুর্বল সড়ক নেটওয়ার্ক ও বন্দরে জটসহ অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে।
কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের জন্য দেশটি চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এতে সরবরাহব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যকে ব্যাহত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দেশটির ওপর নজরদারি ও শুল্কের হুমকি বাড়িয়েছে। ফলে কিছু কোম্পানি ভারত ও মেক্সিকোর মতো অন্য দেশে কার্যক্রম বাড়িয়ে ঝুঁকি সামলাচ্ছে।
মূল্যশৃঙ্খলের উচ্চতর ধাপে উঠতে এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর "টাইগার অর্থনীতি" হয়ে উঠতে ভিয়েতনাম অবকাঠামো ও প্রণোদনায় শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়েছে।






