মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে চিকিৎসা গ্রহণের ঢেউ
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা শিশু-কিশোরের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিমা পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন পরিষেবার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ১৮ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা নেওয়ার হার বেড়েছে ৭৬.৬ শতাংশ। শুধু ২০২৪ সালেই মনোরোগ চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়া তরুণ রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে; ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৮৪। এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধারাবাহিক ছিল। ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়ায়, যা দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
- মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে চিকিৎসা গ্রহণের ঢেউ
- এডিএইচডি থেকে বিষণ্নতা: বদলে যাচ্ছে চিত্র
- শিক্ষাগত প্রত্যাশার চাপ
- ডিজিটাল দ্বিধা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পর্দা
- মানবিক মূল্য: ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা ও আত্মহত্যা
- চিকিৎসা অবকাঠামোর বড় চ্যালেঞ্জ
- চিকিৎসকের কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক
- নীতিগত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ সমাধান
- মূল কথা
চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে একাধিক জটিল কারণ। এতে তরুণদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকৃত বৃদ্ধির প্রতিফলন ঘটলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ কোরীয় সমাজে মনোরোগ-সংক্রান্ত সহায়তা নেওয়ার সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা বা পারিবারিক সুনাম হারানোর আশঙ্কা জড়িয়ে ছিল। তবে বর্তমান তথ্য বলছে, সেই বাধা কমছে এবং আরও বেশি পরিবার প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারছে। বিশ্বজুড়েও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার বাড়ছে, যার তীব্রতা কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বব্যাপী ব্যবহারে বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, মহামারির পর উদ্বেগ ও বিষণ্নতাজনিত রোগের হার বিশ্বজুড়ে অন্তত ২৫ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবাদাতা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে। এসব পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা এবং সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে মানসিক স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর জোরালো আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এডিএইচডি থেকে বিষণ্নতা: বদলে যাচ্ছে চিত্র
রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে বিভিন্ন বয়সী গোষ্ঠীর মানসিক রোগ নির্ণয়ে স্বতন্ত্র কিছু প্রবণতা দেখা যায়। ১২ বছর ও তার কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি) সবচেয়ে বেশি দেখা যায়; ২০২৪ সালে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯৮ হাজার ৩১৮। এ বয়সী শিশুদের মধ্যে বিকাশজনিত বিলম্ব দ্বিতীয় সর্বাধিক নির্ণীত সমস্যা। অন্যদিকে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের চিত্র বেশ আলাদা। এ বয়সী গোষ্ঠীতে বিষণ্নতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়; আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ হাজার ৮৯৫। এরপর রয়েছে এডিএইচডি, যার রোগী ৫৪ হাজার ৩১১ জন। রোগ নির্ণয়ের এই পরিবর্তন দেখায়, শিশুরা কৈশোরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওপর চাপ ও বিকাশগত চ্যালেঞ্জও কীভাবে বদলে যায়।
লিঙ্গভিত্তিক তথ্যও সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট করে। ছেলেদের মধ্যে মনোরোগের রোগী সবচেয়ে বেশি সাত থেকে ১২ বছর বয়সীদের দলে; এ সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজারের বেশি। অন্যদিকে, মেয়েদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা নেওয়ার হার ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সে সর্বোচ্চ; এই দলে রোগী প্রায় ৯৫ হাজার। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকাশের সময়ের পার্থক্য এবং বেড়ে ওঠার সময় ছেলে ও মেয়েদের মুখোমুখি হওয়া সামাজিক চাপের ভিন্নতা এ ব্যবধানের কারণ। বিশেষ করে কিশোরীদের মধ্যে বিষণ্নতার উচ্চ হার গবেষক ও চিকিৎসকদের বিশেষ নজর কেড়েছে।
শিক্ষাগত প্রত্যাশার চাপ
দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো খুব অল্প বয়স থেকেই তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তীব্র শিক্ষাগত চাপ। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। নিয়মিত স্কুল শেষে অনেক শিক্ষার্থী সন্ধ্যা পর্যন্ত বেসরকারি কোচিং সেন্টারে পড়ে; এসব সেন্টার ‘হাগওন’ নামে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ভালো ফলের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব এমন পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার চেয়ে পড়াশোনায় সাফল্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। স্যামসাং মেডিকেল সেন্টারের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক জং ইউ-সুক বলেন, শিশুরা এখন আগের চেয়ে অনেক কম বয়সেই পড়াশোনা ও সামাজিক জীবনের চাপের মুখে পড়ছে; আগে সাধারণত এ ধরনের সমস্যা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উঠলে দেখা দিত।
সাফল্যের পেছনে অবিরাম ছুটতে গিয়ে অবসর ও বিশ্রামের সুযোগ কমে যায়, যা মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ বাড়ায়। এ চাপ শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পুরো পরিবারকে প্রভাবিত করে, কারণ সন্তানের শিক্ষায় অভিভাবকেরা অর্থ ও আবেগ—দুই দিক থেকেই বিপুল বিনিয়োগ করেন। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক সমাজে পিছিয়ে পড়ার ভয় তরুণদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে, যার ফলে হতাশা ও তীব্র মানসিক সংকট দেখা দেয়। চাপ বাড়ছে এবং আরও কম বয়স থেকে শুরু হচ্ছে; রোগ নির্ণয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কম বয়সে মনোরোগ-সংক্রান্ত সহায়তা নেওয়ার প্রবণতায় এর প্রভাব স্পষ্ট।
ডিজিটাল দ্বিধা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পর্দা
পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি ডিজিটাল পরিবেশও দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাড়তি ব্যবহারকে এর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে তথ্যের অবিরাম প্রবাহ, সাইবার বুলিং এবং সমবয়সীদের সঙ্গে অবাস্তব তুলনার মুখে পড়ে। মোবাইল বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আইজিএওয়ার্কসের তথ্য অনুযায়ী, কোরীয় কিশোর-কিশোরীরা দিনে গড়ে ৯৮ মিনিট ইউটিউব ভিডিও দেখে এবং ৪৯ মিনিট ইনস্টাগ্রামের কনটেন্ট দেখে। পর্দার সামনে কাটানো এতটা সময় বিকাশমান মনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে অভিভাবক ও স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সায়েন্সডাইরেক্টে প্রকাশিত বিশেষজ্ঞ-পর্যালোচিত গবেষণায় স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে লিঙ্গের সম্পর্ক নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে মেয়েদের বিষণ্নতার উপসর্গ ও আত্মহত্যার চিন্তা বাড়ে; ছেলেদের ক্ষেত্রে একই মাত্রায় এ প্রবণতা দেখা যায়নি। গবেষণায় বলা হয়েছে, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মতো সামাজিক ও সক্রিয় স্মার্টফোন ব্যবহার বিষণ্নতার উপসর্গ কম থাকার পূর্বাভাস দিতে পারে। তবে সামগ্রিক ব্যবহারের মাত্রা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। এসব ফলাফলে লিঙ্গভেদে পার্থক্য থাকায় ডিজিটাল মাধ্যম বিভিন্ন গোষ্ঠীকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা বিবেচনায় রেখে লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
“আগের তুলনায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া নিয়ে কোরীয় সমাজে পক্ষপাত ও ভয় কমেছে, ফলে চিকিৎসা নেওয়ার বাধাও হ্রাস পেয়েছে,” বলেন সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিনের শিশু ও কিশোর মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক হং সুন-বম।
অধ্যাপক আরও বলেন, টেলিভিশন ও ইউটিউবে শিশু মনোরোগ-সংক্রান্ত কনটেন্ট দেখার পর অভিভাবকেরা পেশাদার সহায়তা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন; রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে এটিও একটি কারণ। এতে বোঝা যায়, গণমাধ্যমের ভূমিকা দ্বিমুখী: সামাজিক তুলনার মাধ্যমে এটি উদ্বেগ বাড়াতে পারে, আবার সচেতনতা ও শিক্ষা ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। ফলে অভিভাবকেরা এমন উপসর্গ চিনতে পারেন, যা অন্যথায় তাঁদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারত।
মানবিক মূল্য: ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা ও আত্মহত্যা
পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাওয়া তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা। কোরিয়া জুংআং ডেইলিতে প্রকাশিত একটি ঘটনা এসব চ্যালেঞ্জের জটিলতা তুলে ধরে। সিউলের নয় বছর বয়সী এক ছেলে তার বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর বিষণ্নতার চিকিৎসা নিতে শুরু করে। তার মা জানান, অস্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশ ছেলের আবেগীয় বিকাশে প্রভাব ফেলে; সে খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ায়। এ ঘটনা দেখায়, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার মিলেও অল্পবয়সী শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে। শিশুদের বিষণ্নতা প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্কদের বিষণ্নতার চেয়ে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। খিটখিটে মেজাজ বা অতিসংবেদনশীলতার মতো উপসর্গকে অনেক সময় স্বাভাবিক অবাধ্য আচরণ বলে ভুল করা হয়।
চিকিৎসা না করা বা যথাযথভাবে সামাল না দেওয়া মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি হলো আত্মহত্যা। ২০১১ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা। ‘নীরব ধরনের’ আত্মহত্যার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে; এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো দৃশ্যমান সমস্যা বা পরিবেশগত ঝুঁকির স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার প্রায় অর্ধেক এ ধরনের, যা অন্য অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে বোঝা যায়, অনেক তরুণ নীরবে কষ্ট পাচ্ছে; তারা হয়তো নিজেদের সমস্যার কথা জানে না, অথবা সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে সহায়তা চাইতে সাহস পায় না।
আত্মহত্যার প্রভাব ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছায়। একটি আত্মহত্যা ওই ব্যক্তির সামাজিক পরিসরের প্রায় ৬০ জনকে প্রভাবিত করে, যার ফলে শোক ও মানসিক আঘাত ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যায় মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের মানসিক অসুস্থতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি অনেক বেশি। ২০২১ সালে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ১০.১ শতাংশ বেড়েছিল, যা সব বয়সী গোষ্ঠীর মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব মর্মান্তিক ঘটনা সংকট চরমে পৌঁছানোর আগেই তরুণদের কাছে পৌঁছাতে পারে—এমন আগাম পদক্ষেপ ও সহায়তা-ব্যবস্থা গড়ে তোলার জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরে।
চিকিৎসা অবকাঠামোর বড় চ্যালেঞ্জ
চিকিৎসা নেওয়ার হার বৃদ্ধিতে সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ার ইঙ্গিত মিললেও দক্ষিণ কোরিয়ার মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের জন্য অবকাঠামোর ঘাটতি বড় উদ্বেগের বিষয়। হাল্লিম ইউনিভার্সিটি সেক্রেড হার্ট হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক হং হিউন-জু বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করা শিশুদের হাসপাতালে রাখার মতো শয্যা যথেষ্ট নেই। তাঁর ভাষ্য, বিষণ্নতার কারণে ১০ বছর বয়সী শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো গুরুতর উপসর্গের ঘটনা বাড়ছে; অতীতে যা খুব কম দেখা যেত। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য শয্যা ও কর্মীর ঘাটতি তীব্র সংকট সামাল দেওয়ার ব্যবস্থার সক্ষমতা সীমিত করছে।
আরেকটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হলো ওষুধের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার আশঙ্কা। মনোযোগ বাড়ায়—এমন ধারণা থেকে এডিএইচডির ওষুধকে প্রায়ই “পড়াশোনার ওষুধ” বলা হয়; এসব ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৯ বছর ও তার কম বয়সী রোগীদের জন্য এডিএইচডির ওষুধের প্রেসক্রিপশনের সংখ্যা ৩৩ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছায়। শুধু ২০২৪ সালেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১৩ লাখ ৭০ হাজার প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৯ শতাংশ বেশি। এ বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে—এসব ওষুধ প্রকৃত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি পড়াশোনায় এগিয়ে থাকার জন্য নেওয়া হচ্ছে। কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ সেফটি অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ব্যবহার পর্যবেক্ষণে এডিএইচডির ওষুধের ক্ষেত্রে ওষুধ-ব্যবহারের ইতিহাস যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করেছে। তবু প্রেসক্রিপশনের উচ্চ সংখ্যা বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে।
চিকিৎসকের কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক
কিছু চিকিৎসা পেশাজীবীসহ সমালোচকদের মতে, এ ব্যবস্থায় চিকিৎসার জৈব-চিকিৎসাভিত্তিক মডেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা হয়। কোরীয় সংস্কৃতিতে চিকিৎসকদের প্রায়ই প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ওষুধ লিখে দিলে রোগী ও তাঁদের পরিবার সাধারণত এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না বা বিকল্প খোঁজেন না। এ সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধাবোধের সঙ্গে ১০ মিনিটেরও কম স্থায়ী সংক্ষিপ্ত পরামর্শের সময় যোগ হয়ে অন্তর্নিহিত মানসিক বা সামাজিক কারণের সমাধান না করেই দীর্ঘমেয়াদি ওষুধনির্ভরতা তৈরি করতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে মনোচিকিৎসা, সামাজিক সহায়তা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনসহ আরও সামগ্রিক পদ্ধতি গ্রহণের পক্ষে মত দিয়েছেন।
নীতিগত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ সমাধান
ক্রমবর্ধমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। কোরিয়া মিডিয়া কমিউনিকেশনস কমিশনের চেয়ারম্যান কিম জং-চল বলেছেন, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আরও কঠোর বিধিনিষেধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো অন্য দেশগুলোর পদক্ষেপের সঙ্গে এর মিল রয়েছে; দেশটি সম্প্রতি ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করেছে। তবে নিয়ন্ত্রণই একমাত্র সমাধান নয়। বিশেষজ্ঞরা শিক্ষা, প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক সহায়তাসহ সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন।
প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা (এমএইচএল) বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘স্কুল মানসিক স্বাস্থ্য সম্পদ ও গবেষণা কেন্দ্র’ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে শিক্ষকদের ব্যবহারের জন্য কর্মসূচি তৈরি করেছে। এসব কর্মসূচির লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখা, উপসর্গ চিনতে পারা এবং লজ্জা ছাড়াই সহায়তা চাওয়া শেখানো। গবেষণায় দেখা গেছে, কৈশোরে ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য-সাক্ষরতার মাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত পাঠ্যক্রমে এসব পাঠ অন্তর্ভুক্ত করলে আধুনিক জীবনের চাপ সামলানোর দক্ষতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ছাড়া ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে বিশেষায়িত সেবার জন্য পাঠাতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও পরামর্শদাতাদের ‘গেটকিপার’ হিসেবে ভূমিকা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। স্কুলে বর্তমানে চালু মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে ইতিবাচক প্রভাব দেখালেও অর্থের অভাবে সেগুলোর পরিসর প্রায়ই সীমিত থাকে। বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৩ শতাংশেরও কম মানসিক স্বাস্থ্যে ব্যয় করা হয়; এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ১৫ থেকে ৫০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। দেশের তরুণদের জন্য টেকসই সহায়তা-ব্যবস্থা গড়তে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
মূল কথা
দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বৃদ্ধি একটি বহুমাত্রিক সংকট; এর মোকাবিলায় পরিবার, স্কুল, স্বাস্থ্যসেবাদাতা ও সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি উদ্বেগজনক হলেও, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অসুস্থতাকে ঘিরে থাকা সামাজিক কলঙ্ক ভাঙার পথে এটি অগ্রগতিরও ইঙ্গিত। মানসিক সংকটের মূল কারণ—যেমন পড়াশোনার চাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব—মোকাবিলা করে এবং আরও শক্তিশালী ও সহানুভূতিশীল সেবাব্যবস্থা গড়ে দক্ষিণ কোরিয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা রক্ষায় এগিয়ে যেতে পারে।
- দক্ষিণ কোরিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা নেওয়া ১৮ বছরের কম বয়সী তরুণদের সংখ্যা ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৭৬.৬ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে।
- ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এডিএইচডি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়; ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে বিষণ্নতাই প্রধান সমস্যা।
- শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও উদ্বেগের বড় কারণ হিসেবে শিক্ষাগত চাপ এবং প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে।
- ৯ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা; ‘নীরব ধরনের’ আত্মহত্যার হারও বেশি, যেখানে আগে থেকে সতর্কসংকেত দেখা যায় না।
- বিশেষজ্ঞরা স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা বাড়ানো এবং মানসিক স্বাস্থ্য অবকাঠামোয় সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার বিষণ্নতার উপসর্গ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত, বিশেষ করে কিশোরীদের ক্ষেত্রে।
এডিএইচডির ওষুধের প্রেসক্রিপশন বেড়েছে, যা পড়াশোনায় ভালো ফলের জন্য “পড়াশোনার ওষুধ” অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করেছে।






