এশিয়ার আকাশে বিশৃঙ্খলার এক দিন
পরিচালনাগত নানা চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় আজ এশিয়াজুড়ে হাজারো যাত্রী আটকা পড়েন এবং ব্যাপকভাবে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়। বিমান চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনেই ১,৬৮০টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ২২৭টি বাতিল হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে অঞ্চলটির আন্তঃসংযুক্ত আকাশপথের পুরো নেটওয়ার্কে। টোকিও থেকে ম্যানিলা পর্যন্ত প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে এই বিঘ্ন আঘাত হেনেছে, ব্যাহত হয়েছে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের ফ্লাইট। অনিশ্চিত যাত্রার মুখে পড়েছেন লাখো যাত্রী।
সূচিপত্র
- এশিয়ার আকাশে বিশৃঙ্খলার এক দিন
- সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর
- চাপে প্রধান বিমানবন্দরগুলো
- কার্যক্রম সচল রাখতে বিমান সংস্থাগুলোর তৎপরতা
- আরও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলো
- বিশৃঙ্খলার কারণ অনুসন্ধান
- আবহাওয়া ও প্রযুক্তির বাইরেও
- বিমান চলাচলের বিশৃঙ্খলার মানবিক মূল্য
- অস্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা
- দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার পেছনের কারণ
- যাত্রী হিসেবে নিজের অধিকার জানুন
- ক্ষতিপূরণ দাবি করার প্রক্রিয়া
- এশিয়ার যাত্রীদের সামনে কী অপেক্ষা করছে
- নির্ভরযোগ্য ভ্রমণের কৌশল
- মূল কথা
- মূল তথ্য
আজকের বিশৃঙ্খলার ব্যাপ্তি সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার বিমান চলাচলে এক দিনে ঘটা সবচেয়ে বড় বিঘ্নগুলোর একটি। ব্যস্ত এই অঞ্চলে ফ্লাইট বিলম্ব অস্বাভাবিক নয়। তবে একাধিক বড় বিমানবন্দরে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিলের পাশাপাশি ব্যাপক বিলম্বের ঘটনা থেকে বোঝা যায়, একাধিক কারণ একসঙ্গে মিলে ব্যবস্থাটির ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতাকে ছাপিয়ে গেছে।
বিমান চলাচল খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আজকের বিঘ্ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এতে প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার এবং আঞ্চলিক বিমানবন্দর—দুই ধরনের স্থাপনাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি নির্দিষ্ট কোনো স্থানে বিচ্ছিন্ন ঘটনার বদলে পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপের ইঙ্গিত দেয়। সমস্যার বিস্তৃতি বিবেচনায়, বিমান সংস্থাগুলো জমে থাকা সূচি সামাল দেওয়ার সময় এশিয়াজুড়ে যাত্রীদের আরও কিছুদিন অস্থিতিশীলতার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর
ফ্লাইট বিলম্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর। সেখানে ৩৪১টি ফ্লাইট বিলম্বিত হলেও বাতিল হয়েছে মাত্র দুটি। ব্যাপকভাবে ফ্লাইট বাতিল না করে বরং বিলম্বের এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, সময়সূচি বিঘ্নিত হলেও থাই কর্তৃপক্ষ ও বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট চালু রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারটিতে তীব্র যানজটের প্রতিফলন এই বিপুল বিলম্বের সংখ্যা। সীমিত গেট ও রানওয়ে ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে সেখানে অবতরণ ও উড্ডয়নের অপেক্ষায় থাকা উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলেছে।
এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, পশ্চিম চীনের উরুমচি দিয়াওপু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ওঠে ফ্লাইট বাতিলের কেন্দ্র। দিনের মোট ২২৭টি বাতিলের মধ্যে ১৫১টিই ছিল এই বিমানবন্দরে। এশিয়ার পুরো তথ্যসেটের অর্ধেকেরও বেশি বাতিল হয়েছে সেখানে। ২৫৮টি বিলম্বের সঙ্গে এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, উরুমচিতে পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ ছিল আরও গুরুতর। এর পেছনে ওই অঞ্চলের বিশেষ আবহাওয়া বা দ্রুত সমাধান করা যায়নি এমন কারিগরি সমস্যা থাকতে পারে।
পরিচালনাগত দক্ষতার জন্য প্রায়ই প্রশংসিত সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে ২৪২টি ফ্লাইট বিলম্বিত হলেও বাতিলের সংখ্যা ছিল খুব কম। চাপের মধ্যেও সেবা চালু রাখার অগ্রাধিকার দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হাব হিসেবে চাঙ্গির ভূমিকা এই সক্ষমতায় স্পষ্ট। একইভাবে, হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২১৬টি ফ্লাইট বিলম্বিত হলেও একটিও বাতিল হয়নি। এতে দেখা যায়, ফ্লাইট পুরোপুরি সচল রেখে গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
চাপে প্রধান বিমানবন্দরগুলো
টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরে ২০০টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং আটটি বাতিল হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় ধরনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। জাপানের প্রধান অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক উপস্থিতির কারণে হানেদার বিঘ্ন দেশটির বিমান চলাচল নেটওয়ার্কজুড়ে ধারাবাহিক প্রভাব ফেলে। বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাঝারি মাত্রার চাপ ছিল; সেখানে ১২৭টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ১৪টি বাতিল হয়েছে। ম্যানিলার নিনয় অ্যাকুইনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিলম্বিত হয়েছে ১৩৮টি ফ্লাইট, বাতিল হয়েছে দুটি।
এই বিঘ্নগুলোর ভৌগোলিক বিস্তৃতি দেখায়, এশিয়ার বিমান চলাচল নেটওয়ার্ক কীভাবে একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে বিলম্ব হলে তার প্রভাব সংযোগকারী ফ্লাইট ও উড়োজাহাজের সময়সূচিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মূল সমস্যার সরাসরি শিকার নয়, এমন বিমানবন্দরেও পরোক্ষ বিঘ্ন তৈরি হয়। এই আন্তঃসংযোগই ব্যাখ্যা করে, উরুমচিতে শুরু হওয়া বিঘ্ন শেষ পর্যন্ত সিঙ্গাপুর বা হংকং হয়ে যাত্রা করা যাত্রীদেরও কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কার্যক্রম সচল রাখতে বিমান সংস্থাগুলোর তৎপরতা
আজকের বিঘ্নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনস। সংস্থাটির ১২২টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ৩৮টি বাতিল হয়েছে। চীনের অন্যতম বৃহৎ বিমান সংস্থা হিসেবে এর বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক থাকায়, তাদের পরিচালনাগত সমস্যায় চীনের বিমান চলাচল খাতের সামগ্রিক চ্যালেঞ্জও প্রতিফলিত হয়েছে। এয়ার চায়নার ৭২টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ১২টি বাতিল হয়েছে। বেইজিং ক্যাপিটালে বিঘ্নের পরিসংখ্যানে সংস্থাটি শীর্ষে ছিল এবং পশ্চিম চীনজুড়েও বিলম্বে ভূমিকা রেখেছে।
পশ্চিম চীনকেন্দ্রিক বড় বিমান সংস্থা সিচুয়ান এয়ারলাইনসের ৫২টি ফ্লাইট বিলম্বিত হলেও বাতিল হয়েছে মাত্র তিনটি। বিলম্বের তুলনায় সংস্থাটির বাতিলের হার কম হওয়া থেকে বোঝা যায়, তারা সম্ভবত ব্যাংককের মতো কৌশল নিয়েছিল: সময়সূচি মেনে চলার চেয়ে ফ্লাইট সম্পন্ন করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। জাপানের অল নিপ্পন এয়ারওয়েজের (এএনএ) ৯১টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং দুটি বাতিল হয়েছে। টোকিওর হানেদায় বিলম্বের বেশির ভাগই এই সংস্থার কারণে হয়েছে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নেটওয়ার্ক পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যাপক কার্যক্রমের প্রভাবও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
হংকংয়ে বিলম্বের সংখ্যায় এগিয়ে থাকা ক্যাথে প্যাসিফিক উল্লেখযোগ্য পরিচালনাগত শৃঙ্খলা দেখিয়েছে। সংস্থাটির ৬৫টি বা তার বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হলেও একটিও বাতিল হয়নি। চাপের মধ্যেও পুরো নেটওয়ার্ক সচল রাখার প্রতি হংকংভিত্তিক বিমান সংস্থাটির অঙ্গীকার এ শূন্য বাতিলের চিত্রে স্পষ্ট। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, জাপান এয়ারলাইনস, থাই এয়ারওয়েজ, সেবু প্যাসিফিক এয়ার এবং মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসসহ অন্যান্য বড় বিমান সংস্থারও সীমিতসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হলেও উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হয়েছে। এতে বোঝা যায়, নেটওয়ার্কভিত্তিক বিমান সংস্থাগুলো সাধারণত ব্যাপকভাবে ফ্লাইট বাতিল না করে বিলম্বের মাধ্যমে বিঘ্ন সামাল দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিমান চলাচল পরামর্শক জন স্ট্রিকল্যান্ড হঠাৎ বড় ধরনের বিঘ্নের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “স্বল্প সময়ের নোটিশে কোনো পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ দেখা দিলে এবং তা কার্যক্রমের বড় অংশকে প্রভাবিত করলে, সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
আরও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলো
বড় নেটওয়ার্কভিত্তিক বিমান সংস্থাগুলোর বিলম্ব সামাল দেওয়ার মতো সম্পদ ও পরিচালনাগত নমনীয়তা থাকলেও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে বাতিলের হার ছিল বেশি। এসব ছোট বিমান সংস্থা প্রায়ই কম মুনাফার ব্যবধানে কাজ করে এবং তাদের হাতে বিকল্প উড়োজাহাজও কম থাকে। ফলে ফ্লাইট পুরোপুরি বাতিল না করে বিলম্ব সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে বা ক্রু সংকট তৈরি হলে, বড় প্রতিযোগীদের তুলনায় সময়সূচি বজায় রাখার বিকল্পও তাদের কম থাকে।
নেটওয়ার্কভিত্তিক ও আঞ্চলিক বিমান সংস্থার বিঘ্ন সামাল দেওয়ার কৌশলের এই পার্থক্য এশিয়ার বিমান চলাচলে একটি মৌলিক অসমতা তুলে ধরে। বড় সংস্থাগুলো প্রায়ই বিকল্প বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী পাঠাতে বা পরের ফ্লাইটে নতুন করে বুকিং দিতে পারে। কিন্তু আঞ্চলিক সংস্থাগুলো হয়তো কেবল ফ্লাইট বাতিল করে অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে; তখন বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা যাত্রীদের নিজেদেরই করতে হয়।
বিশৃঙ্খলার কারণ অনুসন্ধান
আজকের বিঘ্নের পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না। বরং একাধিক কারণ একসঙ্গে মিলে ব্যবস্থাটির সামাল দেওয়ার সক্ষমতাকে ছাপিয়ে যায়। এশিয়াজুড়ে আবহাওয়ার পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়া ও প্রবল বাতাসের কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে রানওয়ের সক্ষমতা কমে যায়। চীনে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিশেষ করে উরুমচি ও বেইজিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; জাপানের বিমানবন্দরগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
কারিগরি সমস্যাও আজকের বিশৃঙ্খলায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এয়ারবাস এ৩২০ উড়োজাহাজের সফটওয়্যারে বিশ্বব্যাপী ত্রুটির কারণে বিমান সংস্থাগুলোকে অপ্রত্যাশিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এ৩২০ পরিবারের কিছু উড়োজাহাজ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি শিল্পে সবচেয়ে বেশি সরবরাহ করা মডেল হিসেবে এটি বোয়িং ৭৩৭-কে ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজের নাকের কোণ নির্ধারণে সহায়ক কম্পিউটার ব্যবস্থার সফটওয়্যার আগের সংস্করণে ফিরিয়ে নিতে বিমান সংস্থাগুলো রাতভর কাজ করেছে। কিছু পুরোনো উড়োজাহাজে হার্ডওয়্যারও পরিবর্তন করতে হবে; প্রতিটি উড়োজাহাজে এ কাজ শেষ করতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে।
বিশ্বব্যাপী এ৩২০ পরিবারের অর্ধেকেরও বেশি উড়োজাহাজকে প্রভাবিত করা এই বিঘ্নের জন্য এয়ারবাসের প্রধান নির্বাহী গিয়োম ফোরি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ফোরি লিংকডইনে লেখেন, “এতে ক্ষতিগ্রস্ত আমাদের বিমান সংস্থার গ্রাহক ও যাত্রীদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে চাই।”
গত ৩০ অক্টোবর কানকুন থেকে নেওয়ার্কগামী জেটব্লুর একটি ফ্লাইট হঠাৎ উচ্চতা হারানোর পর এই প্রত্যাহার ঘোষণার ঘটনা ঘটে। এতে ১০ যাত্রী আহত হন এবং ফ্রান্সের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থা বিইএ তদন্ত শুরু করে। ইউরোপ ও এশিয়ার বিমান সংস্থাগুলো রাতের সময় সমস্যাটি সমাধানের সুযোগ পেলেও, সময়ের এই নির্ধারণ আজকের বিঘ্নে অবদান রাখা বড় পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আবহাওয়া ও প্রযুক্তির বাইরেও
অন্য কিছু কারণও আজকের বিঘ্নকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ছুটির মৌসুমের ভ্রমণের শীর্ষ সময়ে আসন চাহিদা ছিল তীব্র; ফলে ফ্লাইট বাতিল হলে যাত্রীদের বিকল্প ফ্লাইটে বুকিং দেওয়ার সুযোগ বিমান সংস্থাগুলোর হাতে কম ছিল। প্রধান বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিলম্ব থেকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়েছে, কারণ বিমানবন্দরগুলো প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চলেছে। আগের দিনের বিঘ্ন সামাল দেওয়ার জটিলতায় ক্রুর প্রাপ্যতার সমস্যাও বেড়েছে; ফলে বিমান সংস্থাগুলো তাদের পূর্ণ সময়সূচি অনুযায়ী ফ্লাইট চালাতে পারেনি।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও এশিয়ার বিমান চলাচলে সূক্ষ্মভাবে প্রভাব ফেলেছে। আগের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন ও জাপানের সম্পর্কে অবনতির কারণে প্রায় ১,৯০০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এয়ার চায়না ও চায়না ইস্টার্নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমান সংস্থা বেইজিং-টোকিও ও সাংহাই-ওসাকা রুটে ফ্লাইট কমিয়েছে। আজকের নির্দিষ্ট বিঘ্নের সরাসরি কারণ না হলেও, এসব ভূরাজনৈতিক বিষয় নেটওয়ার্কের অন্তর্নিহিত ভঙ্গুরতা তৈরি করে, যা অন্য বিঘ্নের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাকে আরও কঠিন করে তোলে।
বিমান চলাচলের বিশৃঙ্খলার মানবিক মূল্য
বিলম্ব ও বাতিলের পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে বিমান চলাচলের বিঘ্নের মানবিক মূল্য। প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে হাজারো যাত্রীর সংযোগের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। অনেকে পরবর্তী ফ্লাইট ধরতে পারেননি এবং নতুন বুকিংয়ের অপেক্ষায় টার্মিনালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। বিঘ্নের শিকার যাত্রীর বিপুল সংখ্যা বিমান সংস্থাগুলোর গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলে দিয়েছে। সেবা কাউন্টারে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে, ফোনে সহায়তা পেতেও অপেক্ষার সময় বেড়েছে।
ব্যবসায়িক যাত্রীরা বৈঠক হারিয়েছেন এবং পেশাগত কাজের সময়সূচি বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। ছুটির মৌসুমে ভ্রমণরত পরিবারগুলোর পুনর্মিলন বিলম্বিত বা বাতিল হয়েছে, যা মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। অবকাশযাত্রীদের যত্নে পরিকল্পনা করা ভ্রমণসূচি ফ্লাইট বাতিল বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্বের কারণে ভেস্তে গেছে। এতে ছুটি সংক্ষিপ্ত হওয়ার পাশাপাশি থাকা ও খাবারের জন্য বাড়তি খরচের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থলপথের পরিবহনের সঙ্গে সংযোগের ওপর নির্ভরশীল যাত্রীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়েছেন। দেরিতে পৌঁছানো অনেকে আগে থেকে বুক করা ট্রেন, বাস বা গাড়ি ধরতে পারেননি। ফলে প্রায়ই উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত খরচে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়েছে। রাতভর আটকে পড়া যাত্রীরা থাকার জায়গা খুঁজতে থাকায় বিমানবন্দর এলাকার হোটেলগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে গেছে। কিছু যাত্রীর টার্মিনালে রাত কাটানো ছাড়া উপায় ছিল না।
দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মানসিক চাপও কম ছিল না। ফ্লাইটের অবস্থা সম্পর্কে বিমান সংস্থাগুলোর বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং বারবার বদলে যাওয়া ছাড়ার সময় যাত্রীদের উদ্বিগ্ন ও চাপে ফেলেছে। তারা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়েই অনিশ্চয়তায় ছিলেন। ক্রুজ, ট্যুর বা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাঁদের সময়মতো পৌঁছানো জরুরি, তাঁদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নিতে না পারার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
অস্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা
আজকের বিঘ্ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এশিয়ার বিমান চলাচলে দেখা দেওয়া বৃহত্তর অস্থিতিশীলতার ধারাবাহিক অংশ। অতীতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষভাগজুড়ে চ্যালেঞ্জ অব্যাহত ছিল। ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর এএনএ উইংস, আকাসা এয়ার ও স্কাই আংকরের মতো বিমান সংস্থার কারণে ১৮টি ফ্লাইট বাতিল এবং ৮৩৬টি বিলম্বিত হয়। এতে জাপান, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার বিমানবন্দরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। এশিয়ার বিমানবন্দরগুলোতে ৮৮৭টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ৬২টি বাতিল হয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝির এই বিঘ্নে চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রধান বিমানবন্দরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সাংহাই হংকিয়াও বিমানবন্দরে (৮২টি বিলম্ব, পাঁচটি বাতিল), বেইজিং ক্যাপিটালে (৬৫টি বিলম্ব, নয়টি বাতিল) এবং হোক্কাইডোর নিউ চিতোসে বিমানবন্দরে (আটটি বাতিল, ১৪৪টি বিলম্ব)।
ডিসেম্বরের শুরুর দিকের প্রতিবেদনে ৮৫৮টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ৯৪টি বাতিলের কথা বলা হয়েছিল। শেনঝেন, সাংহাই ও বেইজিংয়ের পাশাপাশি জাপানের নারিতা ও ফুকুওকা এবং মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের মতো বিমানবন্দরেও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা যায়। বারবার বিঘ্নের এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, এশিয়ার বিমান চলাচলে এমন কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন আবহাওয়া বা কারিগরি সমস্যার বাইরেও বিস্তৃত।
এশিয়াভিত্তিক বিমান চলাচল বিশ্লেষক ব্রেন্ডন সোবি বারবার দেখা দেওয়া এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাঁর মতামত তুলে ধরেছেন।
এয়ারবাসের সফটওয়্যার সমস্যাটি নিয়ে সোবি বলেন, “হালনাগাদটি ‘কিছু মানুষের ধারণার মতো বিশৃঙ্খল ছিল না’, যদিও ‘এটি স্বল্পমেয়াদে কার্যক্রমে কিছু সমস্যা তৈরি করেছে’।”
দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার পেছনের কারণ
ফ্লাইট চলাচলে বারবার বিঘ্নের ঘটনা এশিয়ার বিমান চলাচলে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। যাত্রী চাহিদা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু অনেক বিমানবন্দরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে এমন সংকট তৈরি হয়েছে, যা স্বাভাবিক পরিচালন পরিস্থিতিতেও বিলম্ব ঘটায়। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর আশপাশের ব্যস্ত আকাশপথে ক্রমবর্ধমান যান চলাচল সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।
মহামারির সময় কমে যাওয়া সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে বিমান সংস্থাগুলো কর্মী সংকটেও পড়েছে। নতুন পাইলট, ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের প্রশিক্ষণে সময় লাগে। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘাটতি থাকায় বিঘ্নের পর দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হয়। ফ্লাইট পরিচালনায় অনিয়ম দেখা দিলে বিকল্প ফ্লাইট চালানো বা অনুপস্থিত সহকর্মীদের জায়গায় কাজ করার জন্য হাতে কম ক্রু থাকে।
পরিবেশগত বিষয়গুলোও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে, যার ধরন ঐতিহাসিক পরিকল্পনা মডেলে আগে থেকে অনুমান করা হয়নি। আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের মেঘ থেকে শুরু করে অমৌসুমি ঝড়—এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে সক্ষম পরিচালনাব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে এবং পুরো নেটওয়ার্কে ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করে।
যাত্রী হিসেবে নিজের অধিকার জানুন
ফ্লাইটে বিঘ্ন ঘটলে হতাশা তৈরি হতে পারে, তবে যাত্রীদের এমন অধিকার রয়েছে যা বিমান সংস্থাগুলোকে মানতে হয়। ফ্লাইট বাতিল বা উল্লেখযোগ্যভাবে বিলম্বিত হলে, কারণ যা-ই হোক, বিমান সংস্থাগুলোকে যাত্রীদের যত্ন ও সহায়তা দিতে হয়। বিলম্ব দুই থেকে চার ঘণ্টার বেশি হলে দীর্ঘ অপেক্ষায় যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে খাবার ও পানীয়ের ভাউচার দিতে হবে।
রাতভর বিলম্ব হলে বিমান সংস্থাগুলোকে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা এবং হোটেলে যাতায়াতের পরিবহন দিতে হবে। যাত্রী শেষ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য হন কি না, তা নির্বিশেষে এই দায়বদ্ধতা প্রযোজ্য। ফলে মৌলিক সহায়তা ছাড়া যাত্রীদের আটকে থাকতে হয় না। দীর্ঘ অপেক্ষার সময় যাত্রীরা দুটি ফোন কল করতে বা দুটি ইমেইল পাঠাতেও পারেন। এতে পরিবার, নিয়োগকর্তা বা বুকিং সেবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সহজ হয়।
ফ্লাইট বাতিল হলে যাত্রীরা টিকিটের অব্যবহৃত অংশের মূল্য ফেরত নেওয়া অথবা গন্তব্যে যাওয়ার পরবর্তী উপলভ্য ফ্লাইটে নতুন করে বুকিং—এই দুই বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নিতে পারেন। বিমান সংস্থাগুলোকে দ্রুত এসব অনুরোধের ব্যবস্থা করতে হবে; যাত্রীদের কম সুবিধাজনক বিকল্প নিতে চাপ অনুভব করা উচিত নয়। নতুন বুকিং সম্ভব হলে একই বিমান সংস্থায় হওয়াই ভালো। তবে উপযুক্ত বিকল্প না থাকলে সংস্থাগুলো সহযোগী বিমান সংস্থা, এমনকি চরম পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থার ফ্লাইটেও যাত্রার ব্যবস্থা করতে পারে।
ক্ষতিপূরণ দাবি করার প্রক্রিয়া
আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে কি না, তা বিঘ্নের কারণের ওপর নির্ভর করে। বিমান সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন কারিগরি ত্রুটি, ক্রুদের সময়সূচি-সংক্রান্ত সমস্যা ও পরিচালনাগত ভুলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে সাধারণত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি হয়। তবে আবহাওয়া, নিরাপত্তা হুমকি, এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ এবং অন্যান্য অসাধারণ পরিস্থিতিতে বিমান সংস্থাগুলো প্রায়ই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকে না।
ইসি ২৬১ ও ইউকে ২৬১-এর মতো বিধিমালার পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত পারস্য উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য যোগ্য বিঘ্নে নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণব্যবস্থা রয়েছে। এসব বিধিমালায় ফ্লাইটের দূরত্ব ও বিলম্বের সময় অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। যাত্রীদের সব ভ্রমণ নথি ও খরচের রসিদ সংরক্ষণ করা উচিত, কারণ পরে ক্ষতিপূরণ দাবি প্রমাণে এগুলো দরকার হতে পারে।
যোগ্যতা নির্ধারণে সময় লাগতে পারে, কারণ বিঘ্নের নির্দিষ্ট কারণ কর্তৃপক্ষ বা বিমান সংস্থাগুলোকে তদন্ত করে দেখতে হয়। যাত্রীদের তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ সিদ্ধান্ত আশা করা উচিত নয়। বৈধ দাবি রয়েছে বলে মনে হলে বিমান সংস্থা বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার প্রস্তুতিও রাখা উচিত। পুরো প্রক্রিয়ায় নথিপত্র গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে বোর্ডিং পাস, বিলম্বের বিজ্ঞপ্তি এবং বিঘ্নের কারণে হওয়া খরচের রসিদ।
এশিয়ার যাত্রীদের সামনে কী অপেক্ষা করছে
এশিয়ার যাত্রীদের জন্য নিকট ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকবে, কারণ বিমান সংস্থাগুলো বিঘ্নিত ফ্লাইটের জমে থাকা সূচি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন লাগবে; একাধিক সংযোগসহ জটিল ভ্রমণসূচির যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বেশি সময় লাগতে পারে। বিমান সংস্থাগুলো সাধারণত যাত্রীর মর্যাদা ও ভাড়ার শ্রেণি অনুযায়ী নতুন বুকিংকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে ছাড়ের টিকিটে ভ্রমণ করা অবকাশযাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থা পেতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এর পরের দিকে তাকালে, সাম্প্রতিক বিঘ্নে উন্মোচিত কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলা করা বিমান চলাচল খাতের জন্য জরুরি। চাপে থাকা বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষ করে রানওয়ে ও গেটের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ অব্যাহত চাহিদা সামাল দেওয়ার জন্য অপরিহার্য। এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে আকাশপথের ব্যবহার আরও দক্ষ করা এবং শহরগুলোর মধ্যে আরও সরাসরি রুট চালু করার মাধ্যমে বিলম্ব কমানো সম্ভব।
বিঘ্ন ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে বিমান সংস্থাগুলো ডিজিটাল রূপান্তরেও বিনিয়োগ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের সরঞ্জাম সম্ভাব্য সমস্যা ঘটার আগেই অনুমান করতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের আগেভাগে নতুন বুকিং ও তথ্য দেওয়া সম্ভব হয়। উন্নত মোবাইল অ্যাপ ও স্বয়ংক্রিয় সেবার সরঞ্জাম যাত্রীদের বিকল্প ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে। পরিচালনায় অনিয়মের সময় এতে বিমান সংস্থার গ্রাহকসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমতে পারে।
এয়ারবাসের সফটওয়্যার হালনাগাদ প্রসঙ্গে পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন বিমান সংস্থাগুলো ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছে এবং কাজ শেষ করার জন্য রোববার মধ্যরাতের সময়সীমা পূরণের পথে রয়েছে’।”
বিমান চলাচলের বিঘ্নের বৈশ্বিক চরিত্র আরও উন্নত আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে। আজকের ঘটনা শুরু হয়েছিল ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকদের জারি করা কারিগরি নির্দেশনা থেকে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশীয় বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দর, আর এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থার ওপর। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমান সংস্থা ও এয়ার নেভিগেশন সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ালে ভবিষ্যতে আন্তঃআঞ্চলিক বিঘ্নের প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে।
নির্ভরযোগ্য ভ্রমণের কৌশল
এশিয়ায়, এশিয়া থেকে বা এশিয়ার ভেতরে আসন্ন ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন যাঁরা, ভ্রমণসূচিতে নমনীয়তা রাখলে সম্ভাব্য বিঘ্নের প্রভাব কমানো যেতে পারে। সম্ভব হলে সরাসরি ফ্লাইট বুক করলে সংযোগের সংখ্যা কমে, ফলে সংকটের ঝুঁকিও কম থাকে। সংযোগ দরকার হলে যাত্রাবিরতির সময় বেশি রাখলে প্রথম ফ্লাইটের বিলম্ব সামলে পরের ফ্লাইট ধরার সুযোগ বাড়ে।
ভ্রমণ বিঘ্ন ও বিলম্বের জন্য প্রযোজ্য ভ্রমণবিমা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সময় আর্থিক সুরক্ষা এবং সহায়তা দিতে পারে। এ ধরনের বিমায় সাধারণত অতিরিক্ত থাকার ও খাবারের খরচের পাশাপাশি ফ্লাইট বাতিল বা উল্লেখযোগ্যভাবে বিলম্বিত হলে বিকল্প পরিবহনের খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কেনার আগে বিমার শর্ত যাচাই করলে তা পরিকল্পিত ভ্রমণের নির্দিষ্ট ঝুঁকির সঙ্গে মেলে কি না নিশ্চিত হওয়া যায়।
বিমান সংস্থার মোবাইল অ্যাপ ও ফ্লাইট-ট্র্যাকিং সেবার মাধ্যমে তথ্য রাখলে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই সম্ভাব্য সমস্যা সম্পর্কে জানা যায়। আগে থেকে সতর্কবার্তা পেলে, সমস্যা ব্যাপক হওয়ার পর বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা না করে আগেভাগে বিকল্প বুকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া যায়। বিমান সংস্থার সঙ্গে ফোন নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ও বিমানবন্দরের সেবা কাউন্টারসহ একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকলে ব্যস্ত সময়ে গ্রাহকসেবা প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা বাড়ে।
চেক-ইন করা ব্যাগের বদলে জরুরি জিনিসপত্র হাতব্যাগে রাখলে লাগেজ বিলম্বিত বা ফ্লাইট বাতিল হলেও ওষুধ, প্রসাধনসামগ্রী ও বদলানোর কাপড়ের মতো প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে থাকে। ইলেকট্রনিক যন্ত্র চার্জ রাখা এবং সঙ্গে বহনযোগ্য পাওয়ার ব্যাংক থাকলে দীর্ঘ বিলম্বেও তথ্য ও যোগাযোগের সরঞ্জাম ব্যবহার করা যায়।
মূল কথা
এশিয়াজুড়ে আজকের ব্যাপক ফ্লাইট বিঘ্ন দেখিয়ে দিয়েছে, একাধিক চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে দেখা দিলে সবচেয়ে আধুনিক বিমান চলাচল নেটওয়ার্কও কতটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অঞ্চলজুড়ে প্রধান বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থাগুলোতে ১,৬৮০টি বিলম্ব এবং ২২৭টি বাতিলের কারণে যাত্রীরা বড় ধরনের অসুবিধা ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। আবহাওয়া, কারিগরি সমস্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও পরিচালনাগত চাপ একত্র হয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা স্বাভাবিক উপায়ে সামাল দেওয়ার সক্ষমতাকে ছাপিয়ে গেছে।
আজকের দিনটি বিশেষভাবে কঠিন হলেও, ২০২৫ সালের শেষভাগজুড়ে এশিয়ার বিমান চলাচলে দেখা দেওয়া অস্থিতিশীলতার বৃহত্তর ধারাবাহিকতার অংশ এই বিঘ্ন। বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দরগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। তবে ছুটির মৌসুমে ভ্রমণ চলতে থাকায় এবং খাতটি অন্তর্নিহিত কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলা করায় যাত্রীদের আরও অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।
আজকের বিঘ্নে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য যাত্রী-অধিকার এবং নতুন বুকিং ও ক্ষতিপূরণের বিকল্পগুলো বোঝা জরুরি। ভবিষ্যৎ ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন যাঁরা, ভ্রমণসূচিতে নমনীয়তা রাখা এবং বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করলে সম্ভাব্য বিঘ্নের প্রভাব কমানো যায়। বিমান চলাচল খাত তার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও, এশিয়া ও বিশ্বজুড়ে আধুনিক বিমান ভ্রমণে বিঘ্ন এখন একটি নিয়মিত বাস্তবতা; যাত্রীদের সেই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
মূল তথ্য
- এক দিনের ব্যাপক বিঘ্নে এশিয়ার বিমান চলাচলে ১,৬৮০টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ২২৭টি বাতিল হয়েছে
- ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ ৩৪১টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে
- উরুমচি দিয়াওপু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে; সংখ্যা ১৫১
- চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের ১২২টি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ৩৮টি বাতিল হয়েছে, যা সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ বিঘ্ন
- এয়ারবাস এ৩২০-এর বৈশ্বিক সফটওয়্যার প্রত্যাহার ঘোষণায় অঞ্চলজুড়ে কারিগরি বিঘ্ন বেড়েছে
- আবহাওয়া, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ক্রুর প্রাপ্যতার ঘাটতি পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়েছে
- বিঘ্নের কারণের ওপর নির্ভর করে যাত্রীরা যত্ন, নতুন বুকিং এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী
- অতীতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে এশিয়ার বিমান চলাচলে বারবার বিঘ্ন ঘটেছে
- জমে থাকা ফ্লাইটের সূচি সামাল দেওয়ায় আজকের বিঘ্ন কাটিয়ে উঠতে কয়েক দিন লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে
- ভবিষ্যৎ ভ্রমণে যাত্রীদের ভ্রমণসূচিতে নমনীয়তা রাখা এবং বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত






