মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বিচ্ছিন্ন জোটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিয়ানমারের সামরিক শাসকগোষ্ঠী আবারও গতি ফিরে পেয়েছে। তারা কিছু এলাকা পুনর্দখল করেছে এবং ব্যাপকভাবে নিন্দিত একটি নির্বাচন এগিয়ে নিচ্ছে, যা রোববার শুরু হচ্ছে। এই পালাবদল পাঁচ বছর ধরে চলা সংঘাতের গতিপথে বড় পরিবর্তন। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর এ সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, যখন সামরিক বাহিনী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো চীনের ভূমিকা ও সমর্থনের পরিবর্তন।
সূচিপত্র
- মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই
- নির্বাচনে সমর্থনের পেছনে চীনের কৌশলগত হিসাব
- বেইজিংয়ের হিসাবের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ
- সামরিক সহায়তা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে বদলাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি
- ড্রোন যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে সংঘাতের ধরন
- সীমান্তে চাপ ও কূটনৈতিক তৎপরতা
- প্রতারণা চক্রের ভূমিকা
- ঝুঁকির মুখে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর
- পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য
- আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
- ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব
- রাজনৈতিক চালের মানবিক মূল্য
- মিয়ানমারের সামনের পথ
- মূল বিষয়
মিয়ানমার নিয়ে কাজ করা ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমবিরোধী গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ জেসন টাওয়ার বলেন, “সামরিক শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে চীনের ভূমিকাই এখানে মূল বিষয়।” দেশের উত্তরে শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে এবং এমনকি সামরিক বাহিনীর কাছে এলাকা ফিরিয়ে দিতে চাপ প্রয়োগের জন্য বেইজিং সীমান্ত বন্ধ করেছে। একই সঙ্গে তারা কূটনৈতিক সমর্থন বাড়িয়েছে এবং অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
মিয়ানমার নিয়ে চীনের নীতি এক জটিল ভূরাজনৈতিক হিসাবের প্রতিফলন, যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক প্রভাব এমনভাবে মিলেছে, যার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য গভীর তাৎপর্য রয়েছে। চীন প্রকাশ্যে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি ঘোষণা করলেও, মিয়ানমারে তাদের কর্মকাণ্ড দেখায় কীভাবে তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পরিস্থিতি নীরবে, কিন্তু নির্ণায়কভাবে গড়ে দেয়।
নির্বাচনে সমর্থনের পেছনে চীনের কৌশলগত হিসাব
মিয়ানমারের ব্যাপকভাবে নিন্দিত নির্বাচনকে চীনের সমর্থন একদলীয় রাষ্ট্রটির ক্ষেত্রে আপাতবিরোধী মনে হতে পারে, কারণ চীনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয় না। তবে বেইজিংয়ের মূল্যায়ন হলো, নিজেদের মূল স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি স্থিতিশীলতা ফেরানোর সবচেয়ে ভালো পথ হলো নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। চীনের কাছে মিয়ানমার ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। দেশটিতে মহাসড়ক ও গভীর সমুদ্রবন্দরসহ উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে, যা চলমান সংঘাতে হুমকির মুখে পড়েছে।
এ বছরের শুরুতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই আশা প্রকাশ করেন, ভোটের মধ্য দিয়ে “দলগুলোর মধ্যে সংঘাত বন্ধ করে দেশের ভেতরে শান্তি এবং জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে জাতীয় শাসনব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠিত হবে; পাশাপাশি জাতীয় পুনর্মিলন ও “সামাজিক সম্প্রীতি” অর্জিত হবে। রাশিয়া ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনও নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠাবে। পর্যবেক্ষক ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা যে প্রক্রিয়াকে প্রহসন বলে নিন্দা করেছেন, তাতে এতে আন্তর্জাতিক বৈধতার আবরণ যুক্ত হবে।
নির্বাচনে প্রকৃত বিরোধী পক্ষের অংশগ্রহণ নেই। সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি পুরো প্রক্রিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করছে। ২০২০ সালের শেষ অবাধ নির্বাচনে জয়ী ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে জোরপূর্বক বিলুপ্ত করা হয়েছে। প্রকৃত বিরোধী দলগুলোর অনেককে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়েছে, আবার অনেকে পুরো প্রক্রিয়াই বর্জন করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, “চীন নির্বাচনকে সমর্থন করছে, কারণ তারা বর্তমান জরুরি শাসনের বদলে ২০০৮ সালের সংবিধানের অধীনে মিয়ানমারে আরও পূর্বানুমানযোগ্য শাসনব্যবস্থা ফিরে আসতে দেখতে চায়।” বেইজিংয়ের ধারণা, বর্তমান অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো কাঠামোবদ্ধ নির্বাচন। তাদের মূল্যায়ন, সম্পূর্ণ বিপ্লবের চেয়ে ধাপে ধাপে সংস্কারই স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা বাড়াবে।
বেইজিংয়ের হিসাবের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ
মিয়ানমারে চীনের প্রধান স্বার্থ অর্থনৈতিক। দেশটির বৃহত্তম বিনিয়োগকারী হিসেবে বেইজিং অবকাঠামো প্রকল্পে কয়েক শ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (CMEC), যা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সরাসরি বাণিজ্যপথ তৈরি করবে। এই করিডর জ্বালানি পরিবহনের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ মালাক্কা প্রণালি এড়াতে চীনকে সহায়তা করবে এবং বাণিজ্যপথের কৌশলগত বিকল্প দেবে।
চীনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কিয়াউকফিউ থেকে ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন। অভ্যুত্থানের পরের লড়াইয়ে এসব প্রকল্প মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি বড় শহর দখল করেছে আরাকান আর্মি, ফলে চীনের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে। চীনের হস্তক্ষেপ না থাকলে এ অঞ্চলে বেইজিংয়ের বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কোভিড-পরবর্তী বছরগুলোতে চীনের অর্থনীতির গতি কমেছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্পে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে মনোযোগ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো বেইজিংয়ের কাছে কম অগ্রাধিকার পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সীমিত থাকায় মিয়ানমার মূলত চীনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বদলে ইউনান প্রাদেশিক সরকারের উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
সামরিক সহায়তা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে বদলাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি
মিয়ানমারের জান্তার প্রতি সামরিক সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে চীন। উন্নত অস্ত্র সরবরাহের ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য বদলাতে সহায়তা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন ধরনের ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে চীন। এতে সামরিক বাহিনী নিজেদের সেনাদের ঝুঁকি কমিয়ে আরও নিখুঁতভাবে বিরোধী বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারছে।
জেসন টাওয়ার বলেন, “চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন ড্রোন প্রযুক্তি, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ওপর চাপ এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে চীনের ভূমিকা রয়েছে।” সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনের মতো মঞ্চে সামরিক বাহিনীর অন্তর্ভুক্তিও সহজ করেছে চীন, যা তাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান জোরদার করেছে।
স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চীন ছয়টি যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। মিয়ানমার বিমানবাহিনী এফটিসি-২০০০জি প্রশিক্ষণ বিমান পেয়েছে। উন্নত বিমানের তুলনায় এগুলো হালকা ও পরিচালনায় সস্তা, তবে মূলত বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু বা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র নেই এমন সামরিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কার্যকর। বিমানবাহিনী চীনে তৈরি আরও বেশি ড্রোনও পেয়েছে, যার মধ্যে নজরদারি ড্রোন এবং অস্ত্র বহনে সক্ষম সশস্ত্র ড্রোন রয়েছে।
মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ এলাকায় গৃহযুদ্ধ চলছে। সামরিক বাহিনী এখনো বিশাল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি, তবে চীনের সমর্থনে অন্তত কিছু এলাকা পুনর্দখল করতে পেরেছে। চীনা সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলে যাওয়ার প্রধান বাণিজ্যপথের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিয়াউকমে ও শিপাওয়ের মতো শহর পুনর্দখল করেছে শাসকগোষ্ঠী। ২০২৩ সালে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এসব এলাকা দখল করেছিল।
ড্রোন যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে সংঘাতের ধরন
মনুষ্যবিহীন আকাশযানের (UAV) ব্যবহার মিয়ানমারে যুদ্ধের ধরন নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। শুরুতে বিরোধী বাহিনী কম খরচের বাণিজ্যিক ড্রোনকে সামরিক কাজে ব্যবহার উপযোগী করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। অপারেশন ১০২৭ চলাকালে ড্রোনের সাহায্যে ২৫ হাজার গোলাবারুদ নিক্ষেপ করে তারা এবং দূরবর্তী সামরিক চৌকিগুলো অকার্যকর করে দেয়। জবাবে জান্তা ছোট আকারের বিভিন্ন কোয়াডকপ্টার ও হেক্সাকপ্টার আমদানি, উৎপাদন এবং মোতায়েন করেছে, যেগুলো থেকে গোলাবারুদ ফেলা যায়। রাশিয়া ও চীনে তৈরি কামিকাজে ড্রোনও ব্যবহার করছে তারা।
স্থানীয় পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (PDF) কমান্ডাররা সামরিক বাহিনীর ড্রোন ব্যবহারের বর্ণনা দিয়েছেন “দিনরাত” বলে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিরোধী বাহিনী স্বীকার করে, “সামরিক জান্তা তাদের প্রায় সব লড়াইয়েই ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করেছে।” বিরোধী বাহিনীর হাতে পাল্টা ব্যবস্থা বা জ্যামিং ডিভাইস প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে প্রতিরোধ বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করতে সামরিক বাহিনী তাদের সবচেয়ে নির্ভুল অস্ত্রগুলোর কয়েকটি ব্যবহার করতে পারছে।
দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী পণ্যের জন্য নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিধিও কার্যকর করেছে চীন। এসব বিধিতে বিরোধী গোষ্ঠীর কাছে ড্রোনের যন্ত্রাংশ রপ্তানি বিশেষভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিরোধ বাহিনীর ড্রোন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। দক্ষিণ শান ও কারেন্নি রাজ্যের নেতারা ইউএভির যন্ত্রাংশ সংগ্রহের খরচ বাড়ার কথা জানিয়েছেন।
বিরোধী পক্ষের সূত্র জানায়, মিয়ানমারের বিরোধী বাহিনীর ড্রোন ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় থাইল্যান্ডও দমনমূলক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো জান্তার পাল্টা ব্যবস্থার মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। তবে ড্রোনকে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো বিরোধী বাহিনীকে দুর্বল করার বেইজিংয়ের সুস্পষ্ট অভিপ্রায়ই প্রতিফলিত হয়েছে তাদের বিধিনিষেধে।
সীমান্তে চাপ ও কূটনৈতিক তৎপরতা
সীমান্তবর্তী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে অভিযান বন্ধ করতে এবং কিছু ক্ষেত্রে জান্তার নিয়ন্ত্রণে এলাকা ফিরিয়ে দিতে তীব্র চাপ দিয়েছে চীন। সীমান্তে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং সব ধরনের সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার মতো নানা উপায়ে এই চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে স্থানীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য এক ঘটনায়, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (MNDAA) ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুনমিংয়ে জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করে। চুক্তিতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে লাশিও শহর জান্তার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। শান্তি আলোচনায় বাধ্য করতে চীন এমএনডিএএ কমান্ডার পেং দেরেনকে আটক করেছে বলে খবর প্রকাশের কয়েক মাস পর চুক্তিটি হয়। উত্তর শান রাজ্যের রাজধানী ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র লাশিও হস্তান্তর বেইজিংয়ের এ পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হস্তক্ষেপ।
কেন্দ্রীয় শান রাজ্যে এমএনডিএএ ও টিএনএলএর দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা থামাতে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (UWSA)-কেও তাদের চীনা সীমান্তের ছিটমহল থেকে পশ্চিমে সরে যেতে উৎসাহিত করেছে চীন। একই সঙ্গে ওয়াদের বিরোধী বাহিনীর কাছে গোলাবারুদ ও অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি জানিয়েছে বেইজিং। সীমান্তনির্ভর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে চীনের এসব পদক্ষেপের দৃষ্টান্ত রয়েছে।
কাচিন রাজ্যের ১৮টি টাউনশিপের মধ্যে প্রায় ১৩টি নিয়ন্ত্রণকারী কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মিকেও (KIA) অভিযান বন্ধে চাপ দিয়েছে চীন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এমএনডিএএ ও এসএসি-র মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর চীন তিনটি প্রধান সীমান্ত ফটক খুলে দেয়। তবে টিএনএলএ ও এমএনডিএএর নিয়ন্ত্রণে থাকা আরও তিনটি ফটকে অবরোধ বহাল রাখে।
প্রতারণা চক্রের ভূমিকা
সীমান্ত এলাকায় সংগঠিত অপরাধ ও প্রতারণা চক্রের আস্তানা নিয়ে চীনের অসন্তোষ মিয়ানমার সম্পর্কে দেশটির বদলে যাওয়া নীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে। চীনা নেতৃত্বাধীন অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো এসব আস্তানা গড়ে তুলেছে। অনলাইন প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করতে চীনা নাগরিকদের পাচার করে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে মিয়ানমারে প্রতারণা চক্রে কাজ করা মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়ায়। তাদের বার্ষিক মোট আয় আনুমানিক ১৫.৩ বিলিয়ন ডলার, যা মিয়ানমারের জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।
জান্তা বড় পরিসরে প্রতারণাবিরোধী অভিযান শুরু করতে অনিচ্ছুক থাকায় প্রতিরোধ বাহিনীর জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে অপারেশন ১০২৭-এ চীন নীরব সম্মতি দেয়। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স স্পষ্টভাবে জানায়, সাইবার প্রতারণার আস্তানা নির্মূল করাও অভিযান শুরুর অন্যতম প্রধান কারণ। অপারেশন ১০২৭-এর সাফল্যের পর প্রতারণা চক্রের আস্তানাগুলো মিয়ানমারের অন্য অঞ্চলে এবং আশপাশের দেশগুলোতে, বিশেষত থাই-মিয়ানমার সীমান্তের শুয়ে কোক্কো এলাকায় সরে যায়।
অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রতারণা চক্রের আস্তানা বেড়েছে, কারণ সামরিক বাহিনী তাদের দেখেও না দেখার ভান করেছে। মিলিশিয়াদের নিজেদের পক্ষে রাখতে এই অবস্থান নিয়েছিল তারা। প্রতারণার রমরমা ব্যবসা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। এসব আস্তানা পুরোপুরি নির্মূল করতে চীনা সরকার জান্তা ও থাই সরকার, উভয়ের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। এর জেরে ২০২৪ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের দিক থেকে শুয়ে কোক্কোর ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে কুখ্যাত কে কে পার্ক কম্পাউন্ডের কিছু অংশে বোমা হামলার পরই কেবল জান্তা প্রতারণা চক্রের কর্মকাণ্ড দমনে সক্রিয় হয়েছে। সামরিক বাহিনী চীনকে আশ্বস্ত করেছে, অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো এগিয়ে যাবে, এবং প্রতারণা চক্রের আস্তানায় অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে সামরিক বাহিনী এসব প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ঝুঁকির মুখে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (CMEC) মিয়ানমারে বেইজিংয়ের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্প। মহাসড়ক, রেলপথ, পাইপলাইন ও বন্দরের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করাই এই করিডরের লক্ষ্য। এর ফলে জ্বালানি পরিবহনে মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা কমবে।
অভ্যুত্থানের পরের লড়াইয়ে সিএমইসি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, ফলে চীনের কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়েছে। রাখাইন রাজ্যের বড় শহর কিয়াউকফিউতে চীনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে আছে বড় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কিয়াউকফিউ থেকে কুনমিং পর্যন্ত তেল পাইপলাইন। গৃহযুদ্ধের সময় রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি বড় শহর দখল করে আরাকান আর্মি। চীনের হস্তক্ষেপ না থাকলে এতে বেইজিংয়ের স্বার্থ বিপন্ন হতে পারে।
এ ছাড়া, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যদি আরও এলাকা হারাতে থাকে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সামরিক বাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী—উভয়েরই অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে লাভের আশায় সব পক্ষই নীরবে আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্রগুলোকে আরও প্রতারণা আস্তানা গড়তে দিতে পারে। টেলিযোগাযোগভিত্তিক প্রতারণা এমন পর্যায়ে ছড়িয়েছে যে রিচার্ড হর্সির ভাষায়, এটি “আন্তর্জাতিক অপরাধের এক জেদি ক্যানসারে” পরিণত হয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর বিঘ্নে বেইজিং হতাশ হয়েছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসনকে শুরুতে সমর্থন করেনি চীন। তাদের দৃষ্টিতে অভ্যুত্থান কৌশলগত স্বার্থের ক্ষতি এবং বিপুল বিনিয়োগের জন্য হুমকি তৈরি করেছিল। সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের প্রতিও চীন অসন্তুষ্ট ছিল। বেইজিংয়ের ধারণা ছিল, তিনি অদক্ষ, চীনবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন এবং চীনের প্রধান উদ্বেগ—বিশেষ করে প্রতারণা চক্রের আস্তানা—সমাধানে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন না।
পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য
মিয়ানমার নিয়ে চীনের নীতি পরস্পরবিরোধী স্বার্থ ও পক্ষগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার দৃষ্টান্ত। সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—সব দিক থেকেই জান্তার প্রধান সমর্থক চীন, কিন্তু সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও দেশটির সম্পর্ক রয়েছে। এই দ্বিমুখী যোগাযোগের ফলে রাজনৈতিক পরিসরের সব পক্ষের ওপর প্রভাব খাটানো এবং কার হাতে এলাকা থাকুক না কেন, নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা বেইজিংয়ের পক্ষে সম্ভব হয়।
রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কূটনীতির প্রতি চীনের ঝোঁকের কারণে অনেক এলাকায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও জান্তার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রেখেছে তারা। জান্তার নিয়ন্ত্রণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো রয়েছে, যার মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ইয়াঙ্গুনে অধিকাংশ বিদেশি দূতাবাস অবস্থিত।
অন্যদিকে, অভ্যুত্থানের আগে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন ছিল—এমন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিরোধ বাহিনী। তবে আগে সমৃদ্ধ চীন-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যপথও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপারেশন ১০২৭-এর পর থেকে এসব পথে বাণিজ্য খুব সামান্যই হয়েছে। বাণিজ্য পুনরায় চালু করতে চীনের আগ্রহ থাকলেও পুরোপুরি খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
বিশেষ দূতদের মাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ করেছে চীন, তবে তা প্রকাশ্য সমর্থনের সমতুল্য নয়। বেইজিং আলাদাভাবে মিয়ানমারের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউ থেইন সেইন, স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের উপনেতা সোয়ে উইন এবং পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে মিন অং হ্লাইংয়ের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক মনোভাব দেখিয়েছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
মিয়ানমারে চীনের হস্তক্ষেপের উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক প্রভাব রয়েছে এবং সংকট মোকাবিলায় অন্য দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিও এতে প্রভাবিত হচ্ছে। চীন ও মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠতায় আসিয়ানের প্রান্তিক হয়ে পড়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে—অথবা বলা যায়, মিয়ানমার সংকট মোকাবিলায় আসিয়ানের অসহায়ত্ব সামনে এসেছে।
২০২১ সালের এপ্রিলে মিয়ানমার নিয়ে পাঁচ দফা ঐকমত্য প্রস্তাব করে আসিয়ান। কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময় পরও তা কাগজে-কলমেই আটকে আছে। মিয়ানমার সংকট সমাধানে আসিয়ানের প্রচেষ্টা থমকে গেছে, যা সামরিক জান্তার ওপর তাদের কার্যকর প্রভাবের অভাব প্রকাশ করেছে। নির্বাচনে চীনের সমর্থন শুধু মিয়ানমারের অন্তর্ভুক্তিহীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বৈধতার আবরণই দিতে পারে না, বরং আসিয়ানের অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবিলার সক্ষমতাও আরও দুর্বল করতে পারে।
মিয়ানমার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা স্বাধীন বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন বলেন, “আঞ্চলিক সংস্থার চেয়ে চীন যদি বেশি ‘অগ্রগতি’ করে, তাহলে ক্ষোভ দেখিয়ে আসিয়ান প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। তাদের আঞ্চলিক প্রচেষ্টা ফলহীন হয়েছে।” আসিয়ানভুক্ত অধিকাংশ দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কই মিয়ানমার বিষয়ে হস্তক্ষেপে চীনের আত্মবিশ্বাসের প্রধান ভিত্তি; একই সম্পর্ক চীনের রাজনৈতিক প্রভাবেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এ ছাড়া, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো সাধারণত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অনুসরণ করে। তাই বেইজিংয়ের বিশ্বাস, আসিয়ান সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে না ফেলেই মিয়ানমারে আরও পরীক্ষামূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আশা থাকলেও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কার্যকর পথ আসিয়ানের নেই। বিপরীতে, জান্তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ও ঘন ঘন যোগাযোগ যেমন রয়েছে চীনের, তেমনি জান্তাবিরোধী কয়েকটি শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছে তারা। জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপরও তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব
মিয়ানমারের পরিস্থিতির পরিবর্তন বুঝতে হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের শিক্ষা ও নাগরিক সমাজকে সমর্থনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাত্রা কমিয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় উল্লেখযোগ্য বাধা ছাড়াই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে চীন।
পাঁচ বছর আগে, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র জোরদার এবং এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। অভ্যুত্থানের পর সেই প্রচেষ্টাগুলো ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। ফলে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎকে অর্থবহভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্রধান বহিরাগত পক্ষ হয়ে উঠেছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে ওয়াশিংটনের সম্পৃক্ততা আরও কমেছে। শুল্কের প্রসঙ্গ ছাড়া মিয়ানমার নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি। শাসকগোষ্ঠীর নেতা হিসেবে মিন অং হ্লাইংকে চিঠি পাঠিয়েছে তারা, যা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জান্তাকে প্রকাশ্যে প্রথম স্বীকৃতি। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিন অং হ্লাইং দীর্ঘ জবাব লিখেছেন। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে উচ্চপর্যায়ের শুল্ক আলোচনায় অংশ নিতে ওয়াশিংটনে প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
ইউএসএআইডি বিলুপ্ত করা এবং গণতন্ত্র প্রসারের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেপিদোতে স্বাগত জানানো হয়েছে। এতে শাসকগোষ্ঠীর ধারণা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না বা নেপিদো ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। এদিকে, আর্থিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং তাদের সংগ্রামকে বিপুল শক্তিশালী সমর্থন দিচ্ছে—এমন আদর্শিক অবলম্বন হারানো, দুই কারণেই ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট ও অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থী শক্তি বিপর্যস্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক চালের মানবিক মূল্য
ভূরাজনৈতিক কৌশল ও অর্থনৈতিক হিসাব মিয়ানমার নিয়ে চীনের নীতিকে চালিত করলেও, এই সংঘাতের মানবিক মূল্য ভয়াবহ। অভ্যুত্থানের চার বছরেরও বেশি সময় পরও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বিশেষত দেশের বড় কয়েকটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে এলাকা হারাচ্ছে। সীমিত পাল্টা অভিযান চালালেও শাসকগোষ্ঠীর বাহিনী এখনো ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন রণাঙ্গনে চাপের মুখে রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দেশের সর্বত্র মানবিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু শুষ্ক অঞ্চলেই সামরিক বাহিনী ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। সহিংসতার ব্যাপকতা এত বেশি যে মিয়ানমারে খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা এর প্রভাবের শিকার হননি।
যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের জবাবে সামরিক বাহিনী জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ অভিযান শুরু করেছে। হাজার হাজার তরুণ বার্মিজ পুরুষ পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেউ আত্মগোপনে গেছেন, কেউ বিদেশে নির্বাসিত হয়েছেন, আবার কেউ প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তবে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, ফলে ক্লান্ত বাহিনীর জনবল আবার বেড়েছে। বিদ্রোহীদের সূত্রের মতে, অনভিজ্ঞ হলেও এই নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছেন।
২০ বছরের কোঠার শুরুর দিকে থাকা এক তরুণ, মু মু (ছদ্মনাম)-এর গল্পে সাধারণ মানুষের চরম অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে ওঠে। সামরিক বাহিনী সক্ষম পুরুষদের ধরে নিয়ে যেতে তার গ্রামে হামলা চালালে মু মু কাঠের বাড়ির নিচে একটি গর্তে লুকিয়ে পড়েন। তার পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপছিল। পরিবারের সদস্যরা তার মাথা কামিয়ে সন্ন্যাসীর পোশাক তৈরি করে দেওয়ার পর চেকপোস্টের কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে তিনি ইয়াঙ্গুনে পালাতে সক্ষম হন। তার গ্রামের প্রায় ৩৫ জন এতটা ভাগ্যবান ছিলেন না; সামরিক বাহিনী তাঁদের ধরে নিয়ে যায়।
মিয়ানমারের সামনের পথ
চীনের সমর্থন এবং সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক ভূখণ্ড পুনর্দখল সত্ত্বেও মিয়ানমারের ভবিষ্যতের মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান হয়নি। পরিকল্পিত নির্বাচন রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করবে না কিংবা সশস্ত্র সংঘাতের তীব্রতা কমাবে না। বরং এতে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভোটের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে শাসকগোষ্ঠীর চেষ্টা এবং প্রতিরোধ বাহিনীর পাল্টা লড়াই নতুন করে সহিংসতার ঢেউও তুলতে পারে।
মিয়ানমারের মানুষের ওপর সামরিক বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া ধ্বংসযজ্ঞ ও দুর্ভোগ জেনারেলদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের যে উত্তরাধিকার তৈরি করেছে, তা কয়েক প্রজন্ম ধরে থাকতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক মরগান মাইকেলস বলেন, “সহিংসতার ব্যাপকতা এত বেশি যে খুব কম মানুষই এর প্রভাব থেকে রেহাই পেয়েছেন। তাই এই মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কথা ভাবা কঠিন। নিজেদের সম্মুখসারির অবস্থান ধরে রাখতে না পেরে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হওয়া এক বিষয়, কিন্তু শান্তির জন্য রাজনৈতিক দর-কষাকষি এখনো অনেক দূরের ব্যাপার।”
প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি করার সুযোগ নষ্ট করছে বলে মনে হলে, অথবা দুই বছর পরও অবকাঠামো প্রকল্পে অগ্রগতি না হলে, চীন আবারও সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে সমর্থন সরিয়ে নিতে পারে। আপাতত বেইজিংয়ের সিদ্ধান্ত, জান্তার নির্বাচনী পরিকল্পনায় সমর্থন দেওয়াই তাদের মূল স্বার্থ—স্থিতিশীলতা, সীমান্তের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা—অর্জনের সেরা পথ।
মিয়ানমারে চীনবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে দেশটির ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চীন সংঘাত উসকে দিচ্ছে। তবে স্টিমসন সেন্টারের চীন কর্মসূচির পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউন সান এই অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “দেশের কোনো রাজনৈতিক পক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চীনের যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। আমার মনে হয়, চীনারা বলবে তারা পরিস্থিতিকে গতিশীল হিসেবে দেখছে এবং শক্তির ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা আনবে।”
মূল বিষয়
- বহুল নিন্দিত নির্বাচনকে কূটনৈতিক সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ করে মিয়ানমারের সামরিক শাসনকে নির্ণায়ক সহায়তা দিয়েছে চীন।
- মিয়ানমারে চীনের প্রধান স্বার্থের মধ্যে রয়েছে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর সুরক্ষা এবং চীনা নাগরিকদের শিকার করা প্রতারণা চক্রের আস্তানা দমন।
- সীমান্ত বন্ধ ও বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করে সীমান্তবর্তী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লড়াই বন্ধ ও এলাকা ফিরিয়ে দিতে চাপ দিয়েছে চীন।
- চীনের সমর্থনে কৌশলগত এলাকায় ভূখণ্ড পুনর্দখল করেছে জান্তা, যদিও দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
- মিয়ানমারে চীনের হস্তক্ষেপ আসিয়ানকে প্রান্তিক করেছে এবং সংকট সমাধানে আঞ্চলিক জোটটির অক্ষমতা তুলে ধরেছে।
- সংঘাতে ব্যাপক মানবিক দুর্ভোগ হয়েছে; ১ লাখের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ চলছে।
- জান্তা ও বিরোধী গোষ্ঠী—উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে চীন, যা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তাদের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
- পরিকল্পিত নির্বাচনে প্রকৃত বিরোধী পক্ষের অংশগ্রহণ নেই এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা একে প্রহসন বলে নিন্দা করেছেন।
- অর্থনৈতিক প্রকল্প ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পূরণে জান্তার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বেইজিং তাদের সমর্থনে পরিবর্তন আনতে পারে।
- মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, ফলে চীনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।






