দক্ষিণ কোরিয়ার নুরি কর্মসূচিতে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে বড় অগ্রগতি
মহাকাশ অভিযানের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশন সম্পন্ন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। প্রথমবারের মতো উৎপাদন ও সংযোজনের নেতৃত্বে ছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আর তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি নুরি রকেটকে কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে। নুরির চতুর্থ এই উড্ডয়ন সরকারি উদ্যোগনির্ভর কর্মসূচি থেকে শিল্পখাতের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থায় স্পষ্ট উত্তরণের ইঙ্গিত দিয়েছে। তিন ধাপের উৎক্ষেপণযানটি একটি মাঝারি আকারের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপগ্রহ এবং কয়েকটি ছোট কিউবস্যাটকে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে স্থাপন করেছে। মহাকাশে প্রবেশাধিকার তৈরি, পরিচালনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে দেশটির নতুন পরিকল্পনার প্রতিফলন এই মডেল।
সূচিপত্র
- দক্ষিণ কোরিয়ার নুরি কর্মসূচিতে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে বড় অগ্রগতি
- কী উৎক্ষেপণ করা হয়েছে এবং কখন
- এখন রকেটের নেতৃত্বে কারা এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
- হানওয়ার হাতে নেতৃত্ব
- কেএআই ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রের দল
- পেলোডগুলো এবং সেগুলোর কাজ
- রাষ্ট্রের নেতৃত্ব থেকে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে: নীতিগত পরিবর্তন
- নুরি যেভাবে এখানে পৌঁছাল: সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
- বর্ধমান বাজার ও প্রতিযোগিতা
- ঝুঁকি এবং যেসব ক্ষেত্রে উন্নতি দরকার
- নুরি ও পরবর্তী কর্মসূচিতে সামনে যা আছে
- জেনে নিন
রাতের এই উৎক্ষেপণে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি নতুন পরিচালন কাঠামোরও পরিচয় মিলেছে। আম্বিলিক্যালের চাপ-সংবেদকে শেষ মুহূর্তে সমস্যা দেখা দিলে প্রকৌশলীরা কাউন্টডাউন থামিয়ে তা সামাল দেন। এরপর স্থানীয় সময় রাত ১টা ১৩ মিনিটে গোহিউংয়ের নারো মহাকাশকেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় রকেটটি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রকেটটি পরিকল্পনামাফিক ধাপ বিচ্ছিন্ন করে এবং পেলোডগুলোকে পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার উঁচুতে নির্ধারিত কক্ষপথের দিকে নিয়ে যায়। এই মিশনে প্রমাণ হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া রাষ্ট্রের নকশা করা যানটির সঙ্গে বেসরকারি খাতের উৎপাদন ও উৎক্ষেপণ কার্যক্রম যুক্ত করতে পারে।
নীতিনির্ধারক ও শিল্পনেতাদের কাছে এই মিশনের তাৎপর্য একক সাফল্যের চেয়েও বেশি। জাতীয় কর্মসূচি থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের আওতায়, পুরো নির্মাণ ও সংযোজন প্রক্রিয়ার দায়িত্বে কোনো বেসরকারি সিস্টেম ইন্টিগ্রেটর থাকা নুরির এটাই প্রথম অভিযান। এর ফলে এমন একটি পথ তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সরবরাহব্যবস্থা ধরে রাখতে, বিনিয়োগ আনতে এবং উপগ্রহ উৎক্ষেপণসেবার বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
কী উৎক্ষেপণ করা হয়েছে এবং কখন
সংবেদকের পাঠ নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ১৮ মিনিট দেরির পর দক্ষিণ জিওল্লা প্রদেশের উপকূলীয় উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে উড্ডয়ন করে নুরি। দলগুলো তথ্য যাচাই করে কাউন্টডাউন আবার শুরু করে এবং পরিষ্কার রাতের আকাশে উঠে যায় রকেটটি। উড্ডয়নের প্রায় দুই মিনিট পর প্রথম ধাপের ইঞ্জিন বন্ধ করে সেটি বিচ্ছিন্ন হয়। এরপর প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় দ্বিতীয় ধাপ বিচ্ছিন্ন হয়। প্রায় সাত মিনিটের সময় যানটি ৫০০ কিলোমিটারের বেশি উচ্চতায় পৌঁছায়। ১২ মিনিটের কাছাকাছি তৃতীয় ধাপের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায় এবং নির্ধারিত পথে পেলোড ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
প্রধান উপগ্রহ কমপ্যাক্ট অ্যাডভান্সড স্যাটেলাইট ৩-এর ওজন ৫১৬ কিলোগ্রাম। এটি নির্বিঘ্নে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিছুক্ষণ পরই সংকেত পাঠায়। নিয়ন্ত্রকেরা রাত ১টা ৫৫ মিনিটে অ্যান্টার্কটিকার কিং সেজং স্টেশন থেকে প্রথম যোগাযোগ নিশ্চিত করেন। পরে দেজন ও স্বালবার্ডের ভূকেন্দ্রের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়। এসব সংযোগে উপগ্রহটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সৌর প্যানেল খোলার বিষয়টিও রয়েছে।
প্রধান উপগ্রহটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরের কয়েক মিনিটে রকেটটি প্রায় ২০ সেকেন্ড বিরতিতে আরও ১২টি কিউবস্যাটকে একই ধরনের ৬০০ কিলোমিটার কক্ষপথে স্থাপন করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষক দলগুলো জানিয়েছে, কয়েকটি ক্ষুদ্র উপগ্রহ নির্ধারিত সময়ে সংকেত পাঠিয়েছে। অন্যগুলো দিনের পরে নির্দিষ্ট ভূকেন্দ্রের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় যোগাযোগ করার জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছিল। ছোট উপগ্রহের ক্ষেত্রে এ ধরনের ধাপে ধাপে যোগাযোগ স্বাভাবিক, কারণ উপগ্রহের অবস্থান ও ভূকেন্দ্রের যোগাযোগ-সময় মেলাতে হয়।
এখন রকেটের নেতৃত্বে কারা এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
এত দিন কোরিয়া অ্যারোস্পেস রিসার্চ ইনস্টিটিউট নুরির নকশা ও উন্নয়নকাজের নেতৃত্ব দিয়েছে। এই উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব শিল্পখাতের হাতে গেছে। হানওয়া অ্যারোস্পেস সিস্টেম ইন্টিগ্রেটর হিসেবে কাজ করেছে। তারা পুরো সংযোজনকাজ পরিচালনা করেছে এবং সারা দেশের ৩০০টির বেশি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছে। জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে নিবিড় সহযোগিতায় ২০৩২ সাল পর্যন্ত হানওয়াকে কে-এস-এল-ভি টু, অর্থাৎ নুরির আনুষ্ঠানিক নামের রকেটটি উৎপাদন ও উৎক্ষেপণের সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ হস্তান্তর একটি বিস্তৃত প্রযুক্তি স্থানান্তর চুক্তির ফল।
হানওয়ার হাতে নেতৃত্ব
সরকারের কাছ থেকে নকশার তথ্য ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া হস্তান্তরিত হওয়ায় এখন উৎক্ষেপণযানটি নির্মাণ ও পরিচালনার অধিকার হানওয়া অ্যারোস্পেসের হাতে। নুরির সব ধাপে ব্যবহৃত ছয়টি তরল জ্বালানির ইঞ্জিনই কোম্পানিটি সংযোজন করেছে। এর মধ্যে ছিল ৭৫ টন শ্রেণির পাঁচটি এবং ৭ টন শ্রেণির একটি ইঞ্জিন। প্রতিটি ইঞ্জিনে হাজার হাজার নিখুঁত যন্ত্রাংশ ও শত শত পৃথক উৎপাদন ধাপ রয়েছে। এত জটিল কাজের জন্য নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা ও কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ দরকার। বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে: উৎক্ষেপণের পর হানওয়া অ্যারোস্পেসের শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা কোম্পানিটির আরও বাণিজ্যিক ভূমিকা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত।
হানওয়া জানিয়েছে, হানওয়া সিস্টেমস ও স্যাটরেক ইনিশিয়েটিভের মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে উৎক্ষেপণ, উপগ্রহ ও পরবর্তী ধাপের সেবাকে যুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ ব্যবসা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। লক্ষ্য হলো এমন একটি দেশীয় পরিবেশ তৈরি করা, যা সরকারি মিশন পরিচালনার পাশাপাশি বাণিজ্যিক কাজেও প্রতিযোগিতা করতে পারে। প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির আওতায়, বারবার উৎক্ষেপণের জন্য যানটিকে আরও উন্নত করার পাশাপাশি পরিচালন-সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জনে কোম্পানিটি জাতীয় কর্মসূচির দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
কেএআই ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রের দল
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ এড়াতে নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ও বাছাই করা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে প্রধান উপগ্রহটি তৈরি করেছে কোরিয়া অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ। সিএএস৫০০-৩-তে অরোরা পর্যবেক্ষণ, প্লাজমা ও চৌম্বকক্ষেত্র পরিমাপ এবং কক্ষপথে ত্রিমাত্রিক কোষ-চাষসহ জীববিজ্ঞান পরীক্ষা চালানোর যন্ত্রপাতি রয়েছে। নুরির মাধ্যমে কক্ষপথে পাঠানো বৈজ্ঞানিক পেলোডগুলোর মধ্যে এটিই বৃহত্তম। এটি গবেষণার প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি স্থানীয় উপগ্রহ উৎপাদনের সক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবেও কাজ করছে।
ভূমিতে, নুরির সব উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত নারো মহাকাশকেন্দ্রের উৎক্ষেপণকেন্দ্রের ব্যবস্থা নকশা, নির্মাণ ও পরিচালনা করেছে এইচডি হুন্দাই হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ। শক্ত কাঠামো ও জ্বালানি ভরার ব্যবস্থা থেকে আম্বিলিক্যাল ও নিরাপত্তা বাহু-ব্যবস্থা পর্যন্ত অবকাঠামোটি সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে তৈরি। এতে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমে এবং আরও ঘন ঘন উৎক্ষেপণের জন্য উৎক্ষেপণকেন্দ্রকে প্রস্তুত করতে দলগুলোর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়।
পেলোডগুলো এবং সেগুলোর কাজ
পৃথিবীর ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলের সূক্ষ্ম গঠন নিয়ে গবেষণার জন্য তৈরি করা হয়েছে সিএএস৫০০-৩। বিস্তৃত দৃশ্যক্ষেত্রের একটি এয়ারগ্লো ক্যামেরা সূর্য ও পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত অরোরা ও এয়ারগ্লোর সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করবে। পৃথক যন্ত্র প্লাজমার ঘনত্ব ও চৌম্বক ভেক্টর পরিমাপ করে মহাকাশ আবহাওয়ার গতিবিধি মানচিত্রায়নে সহায়তা করবে। উপগ্রহটিতে অণুজীববৈজ্ঞানিক পরীক্ষার যন্ত্রপাতিও রয়েছে, যা মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে কোষের আচরণ পরীক্ষা করবে। এ গবেষণা চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের মহাকাশভিত্তিক জৈব উৎপাদনে কাজে আসতে পারে। মিশনের তথ্য বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করা হবে এবং মহাকাশ আবহাওয়া কীভাবে পৃথিবীর যোগাযোগ ও নেভিগেশন সেবাকে প্রভাবিত করে, তা বুঝতে সহায়তা করতে পারে।
ডজনখানেক কিউবস্যাট মিশনের পরিধি বাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারের তৈরি কয়েকটি উপগ্রহ যোগাযোগের পেলোড পরীক্ষা করবে, জিপিএস সংকেত ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করবে অথবা সমুদ্রে ভাসমান প্লাস্টিক শনাক্ত করতে সক্ষম ইনফ্রারেড সেন্সর যাচাই করবে। অন্যগুলো বিকিরণ পরিমাপ করবে বা নতুন সৌরকোষ প্রযুক্তি পরীক্ষা করবে। এসব ক্ষুদ্র উপগ্রহ গবেষক দলগুলোকে সময়মতো কক্ষপথে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পেলোড একত্র করা ও কক্ষপথে ছাড়ার পদ্ধতির বাস্তব পরীক্ষা হচ্ছে উৎক্ষেপণব্যবস্থাটির।
রাষ্ট্রের নেতৃত্ব থেকে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে: নীতিগত পরিবর্তন
জাতীয় উৎক্ষেপণযানকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়ার মহাকাশনীতি বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দিকে এগোচ্ছে। নুরির চতুর্থ উড্ডয়নে চূড়ান্ত উৎক্ষেপণ অনুমোদন ও মিশন ব্যবস্থাপনা করেছে রাষ্ট্র। অন্যদিকে নির্মাণ ও পরিচালনার নেতৃত্বে ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, নির্ভরযোগ্যতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার সরকারি মিশনের ব্যয় বহনের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সেবাও যুক্ত করবে। ২০২৬ ও ২০২৭ সালে পঞ্চম ও ষষ্ঠ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৮ সালের সপ্তম উৎক্ষেপণও বিবেচনাধীন। কর্মসংস্থান, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও ব্যয় হ্রাসে সহায়তার জন্য নিয়মিত উৎক্ষেপণ নিশ্চিত করতে বছরে অন্তত একবার উৎক্ষেপণের পথও খতিয়ে দেখছেন কর্মকর্তারা।
নেতারা রাতের এই উৎক্ষেপণকে মোড় ঘোরানো ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং শিল্পখাতের নেতৃত্ব ও বৈজ্ঞানিক স্বনির্ভরতার পথে এই পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এই প্রথম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্বনির্ভরতা প্রমাণ করাই হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি।
কোরিয়া অ্যারোস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (কাসা) প্রশাসক ইউন ইয়ং বিন নিয়মিত উৎক্ষেপণের ধারা গড়ে তোলা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সাফল্যের হার ৯০ শতাংশের বেশি করতে আমরা ২০৩২ সাল পর্যন্ত বছরে অন্তত একটি করে উৎক্ষেপণ করব।
বিজ্ঞান ও আইসিটি মন্ত্রী বে কিয়ং হুন এই মিশনকে গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানসহ আরও বিস্তৃত কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেন।
আজকের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের উৎক্ষেপণযান, চন্দ্র অনুসন্ধান ও গভীর মহাকাশ মিশন নিয়ে এগোব।
হানওয়া অ্যারোস্পেসের প্রধান নির্বাহী সন জে ইল দীর্ঘমেয়াদে মহাকাশে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে শিল্পখাতের নেতৃত্বে জাতীয় উৎক্ষেপণযান থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আমরা বিদেশি উৎক্ষেপণযানের ওপর নির্ভর করতে পারি না।
নুরি যেভাবে এখানে পৌঁছাল: সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
কে-এস-এল-ভি টু নামেও পরিচিত নুরি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় কক্ষপথে উৎক্ষেপণযান। কোরিয়া অ্যারোস্পেস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে এবং শিল্পখাতের ব্যাপক অংশগ্রহণে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ কর্মসূচি গড়ে উঠেছে। ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রথম উড্ডয়নে যানটি মহাকাশে পৌঁছালেও ডামি পেলোডকে কক্ষপথে স্থাপন করতে পারেনি। ২০২২ সালের জুনে দ্বিতীয় উড্ডয়নে ছয়টি উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানো হয়, যা নকশার মৌলিক সক্ষমতা নিশ্চিত করে। ২০২৩ সালের মে মাসে তৃতীয় মিশনে রাডার পরীক্ষামূলক উপগ্রহ ও গবেষণার কিউবস্যাটসহ আটটি ছোট উপগ্রহ বহন করা হয়। সেগুলো সফলভাবে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়।
উৎক্ষেপণযানটি তিন ধাপের। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ৭৫ টন শ্রেণির পাঁচটি ইঞ্জিন এবং তৃতীয় ধাপে ৭ টন শ্রেণির একটি ইঞ্জিন রয়েছে। সম্পূর্ণ জ্বালানিভর্তি অবস্থায় রকেটটির ওজন প্রায় ২০০ মেট্রিক টন। এটি মূলত দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। এর আগে নারো রকেটে বিদেশে তৈরি প্রথম ধাপ ব্যবহার করা হয়েছিল, নুরি সেই পথ থেকে সরে আসার নিদর্শন। নুরি দক্ষিণ কোরিয়াকে স্বাধীনভাবে কক্ষপথে পৌঁছানোর সুযোগ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণবাজার সংকুচিত হওয়ার পর এবং বিদেশি রকেটে উৎক্ষেপণের জন্য বুক করা পেলোডের বিকল্প বাহনের প্রয়োজন দেখা দিলে এই সক্ষমতার মূল্য স্পষ্ট হয়।
বর্ধমান বাজার ও প্রতিযোগিতা
এই উৎক্ষেপণের পেছনে রয়েছে আরও বিস্তৃত শিল্পকৌশল। শত শত স্থানীয় কোম্পানি ইঞ্জিন, এভিওনিকস, কাঠামো ও ভূমিভিত্তিক ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো মহাকাশযানের যন্ত্রাংশ ও পেলোড নির্মাণে প্রবেশ করছে। নেভিগেশন-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান ডুকসান নেপকোরস নুরির চারটি উড্ডয়নেই উপগ্রহ নেভিগেশন রিসিভার সরবরাহ করেছে। তারা ছোট উপগ্রহের জন্য জ্যামিং প্রতিরোধী যন্ত্র ও ক্ষুদ্র আকারের রিসিভারও তৈরি করছে। এম অ্যান্ড সি সলিউশন কঠিন ও তরল জ্বালানির প্রপালশন ব্যবস্থার অ্যাকচুয়েটর নিয়ে কাজ করছে। জেনোকো তৈরি করছে উপগ্রহের পেলোডের জন্য এক্স-ব্যান্ড ট্রান্সমিটার। এসব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথের ক্রমবর্ধমান কনস্টেলেশন বাজারের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে ঘন ঘন ও নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণের চাহিদা থাকবে।
পূর্বাভাসে সুযোগ সম্প্রসারণের ইঙ্গিত মিলছে। একটি বাজার গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার উৎক্ষেপণসেবার বাজার ২০২৪ সালের প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৩ সাল নাগাদ ৮১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। অন্য এক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস, আগামী দশকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় এক হাজার ছোট উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানো হবে। দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বে ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বাজারের মূল্য দাঁড়াতে পারে কয়েক হাজার কোটি ডলারে। জাতীয় উৎক্ষেপণযান থাকা একটি দেশীয় বাজার এই চাহিদার অংশ পূরণ করতে পারে এবং দেশীয় উপগ্রহ নির্মাতা ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারীদের সহায়তা করতে পারে।
শিল্পনেতারা সতর্ক করে বলেছেন, নিয়মিত উৎক্ষেপণ না হলে সরবরাহব্যবস্থা চাপে পড়বে। নুরির তৃতীয় ও চতুর্থ উড্ডয়নের মধ্যে আড়াই বছরের ব্যবধান কিছু কোম্পানির জন্য বিশেষজ্ঞ কর্মী ধরে রাখা এবং উৎপাদন লাইন সচল রাখা কঠিন করে তুলেছিল। এ কারণেই কাসা ও সরকার বছরে অন্তত একটি উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নিচ্ছে। সর্বশেষ মিশনের পর বিনিয়োগকারীদের সাড়া মিলেছে: হানওয়া অ্যারোস্পেস ও এইচডি হুন্দাই হেভির শেয়ারের দাম বেড়েছে। উড্ডয়নের পূর্বানুমেয় হার সরবরাহকারীদের যন্ত্রপাতি, মজুত ও কর্মীসংখ্যা বাড়াতে বিনিয়োগের আত্মবিশ্বাস দেবে।
ঝুঁকি এবং যেসব ক্ষেত্রে উন্নতি দরকার
উৎসাহের মধ্যেও নুরির সাফল্যের ধারাকে আরও পরিণত হতে হবে। উৎক্ষেপণযানটির সাফল্যের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ। বারবার উড্ডয়ন ও ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মাধ্যমেই এ হার বাড়বে। ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে সাফল্যের হার ৯০ শতাংশের বেশি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন কাসার কর্মকর্তারা। এ লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করছে নিয়মিত উৎক্ষেপণ, দ্রুত ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং প্রতি উৎক্ষেপণের ব্যয় কমানোর ওপর। বর্তমানে প্রতি মিশনের ব্যয় প্রায় ১২০ বিলিয়ন ওন বলে ধারণা করা হয়। প্রক্রিয়া সহজ করা, ভূমিতে ব্যবহৃত সরঞ্জামের পুনর্ব্যবহার বাড়ানো এবং নকশায় ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করবে দলগুলো। পুনর্ব্যবহারের জন্য নকশা করা কিছু বিদেশি উৎক্ষেপণযানের বিপরীতে নুরি একবার ব্যবহারযোগ্য। তাই এর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ উৎপাদন দক্ষতা ও পরিমাণ বাড়ানোর ওপর নির্ভর করবে।
কর্মসূচি পরিচালনাসংক্রান্ত ঝুঁকিও রয়েছে। মিশনের মধ্যে দীর্ঘ বিরতি হলে দক্ষ কর্মী হারানোর ঝুঁকি থাকে এবং সরবরাহকারীরা অগ্রাধিকার বদলাতে বাধ্য হতে পারেন। এসব সমস্যা এড়ানোর জন্য স্থিতিশীল বাজেট, স্পষ্ট সময়সূচি ও আগে থেকে নির্ধারিত উৎক্ষেপণতালিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, নিকট ভবিষ্যতে বেসরকারি চাহিদা যথেষ্ট না হলে পরিবেশটিকে সক্রিয় রাখতে সরকার বছরে অন্তত একটি উৎক্ষেপণের ব্যয় বহন করবে। উৎক্ষেপণের পরপরই যেসব কিউবস্যাট যোগাযোগ করেনি, সেগুলোর ক্ষেত্রে দলগুলো সম্ভাব্য যোগাযোগের সময় ও কক্ষপথে যাওয়ার সুযোগ পর্যবেক্ষণ করছে। দেরিতে যোগাযোগ হওয়া মানেই ব্যর্থতা নয়; সাধারণত কয়েক দিনের একাধিক কক্ষপথ অতিক্রমের পর যাচাই সম্পন্ন হয়।
নুরি ও পরবর্তী কর্মসূচিতে সামনে যা আছে
পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর সময়সূচি ইতিমধ্যে নির্ধারিত। নুরির পঞ্চম উড্ডয়ন ২০২৬ সালে এবং ষষ্ঠটি ২০২৭ সালে করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৮ সালের সপ্তম উড্ডয়নের জন্য বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুত করছে কাসা। এরপর থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বছরে অন্তত একবার উৎক্ষেপণের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। হানওয়া অ্যারোস্পেস সংযোজন ও পরিচালনার নেতৃত্বে থাকবে। যান ও ভূমিভিত্তিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে থাকবে কেএআই, এইচডি হুন্দাই হেভি এবং শত শত অংশীদার প্রতিষ্ঠান। নিয়মিত উৎক্ষেপণের ফলে শিল্পখাত প্রক্রিয়া পরিমার্জন এবং সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
নুরির পাশাপাশি প্রকৌশলীরা পরবর্তী প্রজন্মের একটি উৎক্ষেপণযানের নকশা তৈরি করছেন, যেটি আরও ভারী পেলোড বহন করতে পারবে এবং কক্ষপথে প্রতি কিলোগ্রাম পাঠানোর ব্যয় কমাতে পারে। পরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক মিশন, চন্দ্র অনুসন্ধান ও গভীর মহাকাশ অভিযানে সহায়তা করবে যানটি। উপগ্রহের ক্ষেত্রে, দেশেই তৈরি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ ও মহাকাশবিজ্ঞানের পেলোড অন্তর্ভুক্ত করে একটি রোডম্যাপে সরকার ও শিল্পখাত একমত হয়েছে। নিয়মিত কক্ষপথে যাওয়ার সুযোগ থাকলে কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টার্টআপগুলো মহাকাশে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে ও বিদেশে উপগ্রহসেবা সম্প্রসারণ করতে পারবে।
জেনে নিন
- দক্ষিণ কোরিয়ার নুরির চতুর্থ উড্ডয়নে ৫১৬ কিলোগ্রামের একটি বৈজ্ঞানিক উপগ্রহ ও ১২টি কিউবস্যাটকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার উঁচু কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে।
- প্রথমবারের মতো হানওয়া অ্যারোস্পেস উৎপাদন ও সংযোজনের নেতৃত্ব দিয়েছে। সরকারের সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তিটি ২০৩২ সাল পর্যন্ত কার্যকর।
- আম্বিলিক্যালের একটি সংবেদকের পাঠ নিয়ে সমস্যার কারণে ১৮ মিনিট দেরির পর স্থানীয় সময় রাত ১টা ১৩ মিনিটে উৎক্ষেপণ হয়।
- সিএএস৫০০-৩ রাত ১টা ৫৫ মিনিটে অ্যান্টার্কটিকার কিং সেজং স্টেশনের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগ স্থাপন করে। পরে দেজন ও স্বালবার্ডের মাধ্যমেও যোগাযোগ হয়।
- প্রধান উপগ্রহটি তৈরি করেছে কেএআই। সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে তৈরি উৎক্ষেপণকেন্দ্রের ব্যবস্থাগুলো সরবরাহ ও পরিচালনা করেছে এইচডি হুন্দাই হেভি।
- সরকার ২০২৬ ও ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছে এবং ২০২৮ সালে সপ্তম উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্ভরযোগ্যতা ৯০ শতাংশের বেশি করতে বছরে একটি করে উৎক্ষেপণের লক্ষ্য রয়েছে।
- শিল্পখাতের অংশগ্রহণে ৩০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ খাতের সরবরাহকারীরা মহাকাশযানের যন্ত্রাংশ ও পেলোড নির্মাণে যুক্ত হচ্ছে।
- সরবরাহব্যবস্থা ও কর্মীসংখ্যার ওপর চাপ সৃষ্টিকারী দীর্ঘ বিরতি এড়াতে কর্মকর্তারা স্থিতিশীল সময়সূচি ও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।






