চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কেন ইউরোপের সরবরাহব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ছে
গাড়ি, টারবাইন, ইলেকট্রনিকস ও শিল্প সরঞ্জাম তৈরি করে—এমন ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কীভাবে এবং কোথা থেকে সংগ্রহ করবে, তা নতুন করে ভাবছে। চীনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্সের ১৩১ সদস্যের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চীন থেকে সরবরাহের উৎস সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এর পেছনে রয়েছে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, দীর্ঘ সময়ে পণ্য পৌঁছানো এবং বেইজিংয়ের সম্প্রসারিত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়া নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ।
সূচিপত্র
- চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কেন ইউরোপের সরবরাহব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ছে
- চীনের রপ্তানি বিধিতে কী পরিবর্তন এসেছে
- বিরল মৃত্তিকা ও কৌশলগত উপকরণ সম্পর্কে
- সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা
- ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পদক্ষেপ
- কার্যক্রম সচল রাখার ব্যয়
- ব্রাসেলস ও বেইজিংয়ের নীতিগত প্রেক্ষাপট
- স্থগিতাদেশে কি বাজার শান্ত হবে
- প্রতিষ্ঠানগুলোর পরবর্তী নজরদারির বিষয়
- মূল বিষয়গুলো
জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান মনে করে, বর্তমান বা প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণ তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। প্রায় ৭০ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের বিদেশের কারখানাগুলো চীনা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো ইতিমধ্যে রপ্তানি বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে বা আসতে পারে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অর্ধেক জানিয়েছে, তাদের সরবরাহকারী বা গ্রাহকেরা নিয়মের আওতাভুক্ত পণ্য তৈরি করে। এসব পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা মেলে এ কারণে যে, চীনে বিক্রি ও পণ্য সংগ্রহের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদগুলো চীনের বাইরে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এ বছর বিরল মৃত্তিকা নিয়ে একের পর এক পদক্ষেপের পর চাপ আরও বেড়েছে। এপ্রিলে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ও চুম্বকের চালানে বিধিনিষেধ ইউরোপের উৎপাদন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা উৎপাদন লাইন থামিয়ে দেয়। অক্টোবরে বেইজিং আবারও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর হুমকি দেয়, যার মধ্যে চীনা বিরল মৃত্তিকার সামান্য পরিমাণও রয়েছে—এমন পণ্যের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়ও ছিল। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বুসান শীর্ষ বৈঠকের পর চীন নতুন পদক্ষেপ চালু করা এক বছরের জন্য স্থগিত করে। প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিরতিকে স্বাগত জানালেও বলছে, লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণের আওতা নিয়ে আলোচনা চলায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
লাইসেন্স কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরিপে অংশ নেওয়া ৪০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিশ্রুত ৪৫ দিনের চেয়ে বেশি সময় নিয়ে রপ্তানির অনুমোদন প্রক্রিয়া করছে। এতে পণ্য সরবরাহের সময়সূচিতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস যোগ হচ্ছে। ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এমন তথ্য প্রকাশের শর্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে, যা সংবেদনশীল মেধাস্বত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আর্থিক ক্ষতির চিত্র ইতিমধ্যে স্পষ্ট। এক উত্তরদাতা ২৫ কোটি ইউরোর বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন। আরেকজনের পূর্বাভাস, ২০২৫ সালে ব্যয় বাড়বে বৈশ্বিক আয়ের ২০ শতাংশের সমান। তবে সব খাত একইভাবে ঝুঁকিতে নেই। ১৩১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৬টি বলেছে, তারা নিয়ন্ত্রণের কারণে কোনো প্রভাব আশা করছে না।
চীনের রপ্তানি বিধিতে কী পরিবর্তন এসেছে
চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো আরও বিস্তৃত ও বিস্তারিত হয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। বিরল মৃত্তিকা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খনন ও পরিশোধন সক্ষমতায় চীন আধিপত্য বিস্তার করে আছে। এ বছর দেশটি বিস্তৃত পরিসরের আকরিক, অক্সাইড, ধাতু ও তৈরি চুম্বকজাত পণ্যের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থার কাছে আবেদন করতে হয়, পণ্যের শেষ ব্যবহার ও ব্যবহারকারীর তথ্য নথিবদ্ধ করতে হয় এবং তথ্য ও বিধি-অনুবর্তিতা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, অনুমোদনে প্রকাশিত সময়সীমার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে এবং তথ্যের অনুরোধও ব্যাপক। এতে পরিকল্পনা ও মজুত ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে পড়ে।
বিরল মৃত্তিকা ও কৌশলগত উপকরণ সম্পর্কে
বিরল মৃত্তিকার মৌল হলো ১৭টি ধাতুর একটি গোষ্ঠী, যা স্থায়ী চুম্বক, অনুঘটক, ব্যাটারি, সেন্সর ও উন্নত কাচে ব্যবহৃত হয়। নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়াম দিয়ে তৈরি চুম্বক বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর ও বায়ু টারবাইন চালাতে সহায়তা করে। এগুলো উড়োজাহাজ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্মার্টফোন, অডিও সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা স্ক্যানারেও ব্যবহৃত হয়। ভূতাত্ত্বিকভাবে ধাতুগুলো দুর্লভ নয়, তবে এগুলোর প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তিগতভাবে জটিল ও পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং। কয়েক দশক ধরে চীন উত্তোলন ও পরিশোধনে বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার বড় অংশ দেশটির নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সীমিত এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। চীন থেকে রপ্তানি করা বিরল মৃত্তিকার চুম্বকের একক বৃহত্তম ক্রেতা জার্মানি। চালানের ধরনে পরিবর্তন ইউরোপের শিল্পচক্রে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা
বিরল মৃত্তিকা ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত পণ্যে বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উড়োজাহাজ নির্মাণ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে সংবেদনশীল। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই ইউরোপে চূড়ান্ত পণ্য সংযোজন করে, কিন্তু চীন থেকে বিশেষায়িত উপকরণ বা সাব-অ্যাসেম্বলি সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। জরিপে দেখা গেছে, প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ২৪ শতাংশ চীনে এমন পণ্য তৈরি করে, যেগুলো রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আছে বা আসবে। এতে একটি অস্বাভাবিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে: বিদেশের কারখানায় ব্যবহারের জন্য চীনের ভেতরে তৈরি যন্ত্রাংশ লাইসেন্স ছাড়া দেশটি থেকে বের হতে বাধা পেতে পারে।
এ বছর কয়েক দফা চাপের পরীক্ষা হয়েছে। বসন্তে বিধিনিষেধের কারণে চুম্বকের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং ইউরোপের গাড়ি কারখানায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। পরে চিপ নির্মাতা নেক্সপেরিয়া নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির নেদারল্যান্ডসের কার্যক্রম দেশটির সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসার পর চীনে থাকা কারখানাগুলো থেকে চালানে চীন বিধিনিষেধ আরোপ করে বলে শিল্প সংগঠনগুলো জানিয়েছে। এ ঘটনা ভূরাজনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার যোগসূত্র তুলে ধরে। এর প্রভাবে যানবাহন ও শিল্পব্যবস্থায় ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর, সেন্সর ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার যন্ত্রাংশের সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে।
টেলিযোগাযোগ ও শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ খাতও ঝুঁকিতে রয়েছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভো, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ গ্রিডের সরঞ্জামে প্রায়ই এমন চুম্বক ও সংকর ধাতু ব্যবহৃত হয়, যেগুলো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ তালিকার আওতায় পড়ে। তবে ঝুঁকির মাত্রা একেক ক্ষেত্রে একেক রকম। অনেক ভোগ্যপণ্য সরবরাহকারী ও পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি খুব সামান্য বা কোনো প্রভাবের মুখেই পড়ে না। চেম্বারের সদস্যদের মধ্যে বিএমডব্লিউ ও ভক্সওয়াগেন থেকে নকিয়া ও টোটালএনার্জিসের মতো বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তবে পণ্যের ধরন এবং চীনা প্রাথমিক উপকরণের ওপর নির্ভরতার মাত্রা অনুযায়ী ঝুঁকির তীব্রতা বদলে যায়।
ইউরোপীয় গাড়ি যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের প্রধান সংগঠন সিএলইপিএর প্রধান নির্বাহী ম্যাথিয়াস জিঙ্ক বলেন, রাজনৈতিক ঝুঁকি ও সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকটের কথা বিবেচনায় রেখে গাড়ি নির্মাতা এবং তাদের প্রথম ধাপের সরবরাহকারীরা পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করছেন।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে যন্ত্রাংশ সংগ্রহের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনার কথা ভাবছে গাড়ি শিল্প,
ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পদক্ষেপ
প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহকারীদের মধ্যে ঝুঁকি ভাগ করে দিচ্ছে, নিয়ন্ত্রিত উপকরণের ব্যবহার কমাতে পণ্যের নকশা বদলাচ্ছে এবং মজুত বাড়াচ্ছে। চেম্বারের জরিপ অনুযায়ী, প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৩৬ শতাংশ চীনের বাইরে উৎপাদন সক্ষমতা গড়তে সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। প্রায় ৩২ শতাংশ অন্য বাজার থেকে প্রভাবিত পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অঞ্চলের যন্ত্রাংশ যেন ন্যূনতম প্রকৌশলগত পরিবর্তনে একটির বদলে আরেকটি ব্যবহার করা যায়, সে জন্য একাধিক সরবরাহকারীর পণ্য যাচাইয়ের কর্মসূচি চালাচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান এমন ক্ষেত্রে চুম্বক পুনর্ব্যবহার ও বিকল্প উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে, যেখানে কার্যক্ষমতায় কিছুটা ছাড় দেওয়া সম্ভব।
চীনের বাইরে উৎপাদন সক্ষমতা গড়া জটিল, কারণ পরিশোধন ও চুম্বক উৎপাদন এখনো সেখানেই কেন্দ্রীভূত। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে নতুন প্রকল্প বাড়ছে, তবে সেগুলোকে বড় পরিসরে নিতে সময় লাগবে। ইউরোপীয় নির্মাতারা নিয়ম আরও স্পষ্ট করারও দাবি জানাচ্ছেন, যাতে বিধি-অনুবর্তিতার কাজ দ্রুত করা যায়। যাচাই করা শেষ ব্যবহারকারীদের কাছে মানসম্মত যন্ত্রাংশের নিয়মিত চালানের জন্য প্রযোজ্য একটি সাধারণ লাইসেন্সব্যবস্থা—এমন একটি প্রস্তাব ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমর্থন পাচ্ছে।
চীনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ইয়েন্স এস্কেলুন্ড বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেক সদস্যের পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে।
চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে দেশটিতে ব্যবসা পরিচালনাকারী ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিশ্চয়তা বেড়েছে। উৎপাদন ধীর হয়ে যাওয়া, এমনকি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো,
কার্যক্রম সচল রাখার ব্যয়
সরবরাহকারী বদলানো এবং উপকরণের পুনঃঅনুমোদন পাওয়া ব্যয়বহুল। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান বলেছে, এসব পদক্ষেপের ফলে ২৫ কোটি ইউরোর বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হবে। আরেকটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যয় বাড়তে পারে বৈশ্বিক আয়ের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। লাইসেন্স অনুমোদনে ধীরগতিও এই চাপ বাড়াচ্ছে। প্রতি ১০ জন উত্তরদাতার ৪ জন বলেছেন, কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুত ৪৫ দিনের চেয়ে আবেদন প্রক্রিয়ায় বেশি সময় লাগে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, পণ্য সরবরাহের সময়সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে দুই মাস পর্যন্ত। এসব বিলম্ব সংযোজন লাইন, বিক্রয়োত্তর সেবা ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ব্যবস্থাপকদের বেশি মজুত রাখতে হয়, নতুবা গ্রাহকদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে আরও বেশি সময় লাগার বিষয়টি মেনে নিতে হয়।
ব্রাসেলস ও বেইজিংয়ের নীতিগত প্রেক্ষাপট
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের বাণিজ্য গভীর ও জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের পর পণ্য বাণিজ্যে চীন হলো ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার। ২০২৪ সালে দুই পক্ষের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৩২ বিলিয়ন ইউরো এবং ইইউর উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল। ব্রাসেলস চীনকে একই সঙ্গে অংশীদার, প্রতিযোগী ও কাঠামোগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। ইউরোপের নীতিতে এখন বিচ্ছিন্ন হওয়ার বদলে ঝুঁকি কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প সরবরাহপথ তৈরি করা, পাশাপাশি যেখানে বাণিজ্য যুক্তিযুক্ত সেখানে তা বজায় রাখা। ২০২৩ সালে গৃহীত ইইউর গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আইন অভ্যন্তরীণ খনন, পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহার বাড়ানোর এবং চীনের বাইরের দেশগুলো থেকে নির্ভরযোগ্য আমদানি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণের সময় প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্সের অনুরোধ নথিভুক্ত করতে, শুল্ক ছাড়ের অগ্রগতি দেখতে এবং সমস্যার কথা জানাতে পারে—এমন একটি পোর্টালও কমিশন পরিচালনা করে।
ব্যবসায়ী নেতারা পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ দিচ্ছেন। নিয়মিত যন্ত্রাংশের লেনদেন এবং মেরামতের জন্য ফেরত পাঠানো পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে—এমন একটি সাধারণ লাইসেন্সের প্রস্তাব বারবার সামনে আসছে। এর সঙ্গে থাকতে পারে স্পষ্ট মানদণ্ড ও সময়সীমা। এতে প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে তৈরি হওয়া জটিলতা কমবে, বিধি-অনুবর্তিতার ব্যয় হ্রাস পাবে এবং ইউরোপীয় ক্রেতা ও চীনা সরবরাহকারী—উভয়ের পরিকল্পনা স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে।
ইউরোপীয় চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্তেফান বার্নহার্ট বলেন, একটি সাধারণ ব্যবস্থা ব্যবসার আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।
অদূর ভবিষ্যতে একটি সাধারণ লাইসেন্সব্যবস্থা চালু হলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা আসবে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যবসায়িক আস্থার যে অবনতি হচ্ছে, তা ঠেকাতেও এটি সহায়তা করতে পারে,
স্থগিতাদেশে কি বাজার শান্ত হবে
বুসান শীর্ষ বৈঠকের পর চীন নতুনতম বিরল মৃত্তিকা বিধিনিষেধ চালুর পরিকল্পনা এক বছরের জন্য স্থগিত করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনো বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বেইজিং ও ওয়াশিংটনের আলোচকেরা এখনো নিয়ন্ত্রণের আওতা ও সাধারণ লাইসেন্সের খুঁটিনাটি নির্ধারণ করছেন, আর ইউরোপীয় ইউনিয়নও এসব ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হতে চাইছে। সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণকারী আঙ্কুরা কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলফ্রেদো মন্টুফার এলু বলেন, রাজনৈতিক বার্তা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান ঝুঁকি উঁচুতে রেখেছে।
বাস্তবতা হলো, চুক্তিতে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়নি। বাস্তবায়নে সময় লাগছে, আর এই ব্যবধানের মূল্য দিচ্ছে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা,
প্রতিষ্ঠানগুলোর পরবর্তী নজরদারির বিষয়
পণ্য সংগ্রহ ও বিধি-অনুবর্তিতা দলের নজর থাকবে তিনটি পরিবর্তনশীল বিষয়ে। প্রথমত, নিয়ন্ত্রণ তালিকার আওতা ও সংজ্ঞা—বিশেষ করে চুম্বক, সংকর ধাতু এবং সামান্য পরিমাণ বিরল মৃত্তিকাসমৃদ্ধ মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স প্রক্রিয়া—এর মধ্যে রয়েছে আবেদন প্রক্রিয়ার সময়, তথ্যের অনুরোধ এবং সংবেদনশীল তথ্যের ব্যবস্থাপনা। তৃতীয়ত, সাধারণ লাইসেন্স নিয়ে আলোচনার ফলাফল এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সরলীকৃত ব্যবস্থার সুযোগ পাবে কি না।
সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার পরিকল্পনা চলবে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিরল মৃত্তিকা-সংশ্লিষ্ট নয়—এমন যন্ত্রাংশ, যেমন তারের সংযোগব্যবস্থা, ঢালাইয়ের পণ্য ও যান্ত্রিক যন্ত্রাংশের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও উত্তর আমেরিকার সরবরাহকারীদের যাচাই করছে। চুম্বক ও বিশেষায়িত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর উৎপাদকদের সঙ্গে প্রকল্প এবং ইউরোপে পরীক্ষামূলক উৎপাদন লাইন গড়ার বিষয় খতিয়ে দেখছে। মেয়াদোত্তীর্ণ মোটর ও ইলেকট্রনিকস পুনর্ব্যবহারও আরেকটি পথ। ইউরোপের কয়েকটি কনসোর্টিয়াম এমন প্রক্রিয়া পরীক্ষা করছে, যাতে বড় পরিসরে নিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়াম পুনরুদ্ধার করা যায়। নিয়ন্ত্রিত উপকরণের ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রকৌশলীরা কম কার্যক্ষমতার প্রয়োজন হয়—এমন কাজে ফেরাইট চুম্বক বা বিকল্প ধরনের মোটর ব্যবহারের নকশাও নতুন করে পর্যালোচনা করছেন।
এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও চীন গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবেই থাকবে। স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করার পাশাপাশি ইউরোপের অনেক নির্মাতা চীনা অংশীদারদের কাছ থেকে কেনাকাটা চালিয়ে যাবে। এই ভারসাম্য ইউরোপের নীতিতে বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন: সরবরাহ নেটওয়ার্কে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ডিজিটাল অনুসরণযোগ্যতার সরঞ্জামে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং যেসব ক্ষেত্রে নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে সেখানে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া।
মূল বিষয়গুলো
- চীনে থাকা ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তিনটিতে একটি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশটি থেকে সরবরাহের উৎস সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
- উত্তরদাতাদের ৪০ শতাংশের ভাষ্য, লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুত ৪৫ দিনের বেশি সময় লাগছে; এতে পণ্য সরবরাহে দুই মাস পর্যন্ত বিলম্ব হতে পারে।
- প্রায় ৭০ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের বিদেশের কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত চীনা উপকরণের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকের সরবরাহকারী বা গ্রাহকও প্রভাবিত।
- এপ্রিলে বিরল মৃত্তিকার ওপর বিধিনিষেধে চুম্বকের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং ইইউর কয়েকটি গাড়ি কারখানায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।
- অক্টোবরে বেইজিং নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের হুমকি দেয়। পরে বুসানে ট্রাম্প-শি শীর্ষ বৈঠকের পর তা এক বছরের জন্য স্থগিত করে। নিয়ন্ত্রণের আওতা ও লাইসেন্স নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
- কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ছে। একটির হিসাবে অতিরিক্ত ব্যয় ২৫ কোটি ইউরোর বেশি, আরেকটির হিসাবে ২০২৫ সালে ব্যয় বাড়বে বৈশ্বিক আয়ের ২০ শতাংশের সমান।
- প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানের ৩৬ শতাংশ চীনের বাইরে সরবরাহকারীদের সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ার পরিকল্পনা করছে, আর ৩২ শতাংশ অন্য বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করছে।
- গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আইন এবং রপ্তানি লাইসেন্সের অগ্রগতি জানার জন্য কমিশনের পোর্টালের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে ইইউ ঝুঁকি কমানোর নীতি অনুসরণ করছে।
- ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমর্থনপুষ্ট একটি সাধারণ লাইসেন্সব্যবস্থাকে পূর্বানুমানযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- ১৩১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৬টি কোনো প্রভাব আশা করছে না। এতে খাত ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী ঝুঁকির ব্যাপক তারতম্য স্পষ্ট হয়।






