বিপজ্জনক প্রতিবেশের জন্য নতুন প্রতিরক্ষা বলয়
তাইওয়ান দ্বীপজুড়ে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আট বছর মেয়াদি ৪০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা সামনে এনেছে। টি-ডোম নামে পরিচিত এই নেটওয়ার্কের লক্ষ্য ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং চালকসহ উড়োজাহাজ শনাক্ত, অনুসরণ ও প্রতিহত করা। জাতীয় দিবসের উদ্যাপনে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে পরিকল্পনাটি উন্মোচন করেন। তাইওয়ানের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে সেগুলোকে আরও দ্রুত ও সহনশীল সমন্বিত কাঠামোয় যুক্ত করবে এই প্রকল্প। লক্ষ্য সহজ, তবে উচ্চাভিলাষী: আকস্মিক হামলার সুবিধা থেকে আক্রমণকারীকে বঞ্চিত করা এবং চাপের মধ্যেও তাইওয়ানের সরকার, সামরিক বাহিনী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কার্যক্রম সচল রাখা।
সূচিপত্র
- বিপজ্জনক প্রতিবেশের জন্য নতুন প্রতিরক্ষা বলয়
- টি-ডোম কী এবং কীভাবে কাজ করবে
- কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের মেরুদণ্ড
- প্রতিহতকারী অস্ত্রের স্তর
- সেন্সর থেকে অস্ত্র পর্যন্ত সমন্বয়ের ধারণা
- অর্থায়ন, কেনাকাটা ও সময়সূচি
- তাইওয়ান কী কিনতে চায়
- বাজেট নিয়ে রাজনীতি ও সরবরাহের বাধা
- ইসরায়েলের আয়রন ডোমের সঙ্গে তুলনা
- ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা ও পিএলএর হুমকি
- সময়মতো কি এটি গড়ে তুলতে পারবে তাইওয়ান
- আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
- যা জানা জরুরি
দ্বীপটির আশপাশে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) নিয়মিত সামরিক মহড়া এবং তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে (এডিআইজেড) ঘন ঘন উড্ডয়নের মধ্যে এই পরিকল্পনা এসেছে। তাইপের কৌশলে নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম কেনার পাশাপাশি বিদ্যমান সক্ষমতাগুলোর আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট লাই প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোরও অঙ্গীকার করেছেন। আগামী বছর প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশের বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে; পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। টি-ডোম ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক অর্থায়নে বিশেষ বাজেটটি বছরের শেষ দিকে আইনসভায় পর্যালোচনার জন্য তোলা হবে।
জাতীয় দিবসের ভাষণে পরিকল্পনাটি তুলে ধরে লাই এই নেটওয়ার্ককে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের জন্য দেশব্যাপী নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি দ্রুততা, শনাক্তকরণ এবং বহুস্তরীয় সুরক্ষার ওপর জোর দেন।
প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেন, এই ব্যবস্থা "বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা, উচ্চ পর্যায়ের শনাক্তকরণ এবং কার্যকর প্রতিহত করার সক্ষমতা" দেবে এবং তাইওয়ানের জনগণকে সুরক্ষায় "একটি নিরাপত্তা জাল বুনবে"।
টি-ডোমের মূল ভিত্তি হলো সেন্সর থেকে অস্ত্র পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থা। এতে রাডার, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক যুক্ত থাকে, যাতে সিদ্ধান্ত নিতে মিনিট নয়, কয়েক সেকেন্ড লাগে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এর লক্ষ্য হলো আসন্ন হুমকি ধ্বংসের সম্ভাবনা বাড়ানো এবং একসঙ্গে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে সীমিত সংখ্যক প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র আরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করা।
টি-ডোম কী এবং কীভাবে কাজ করবে
টি-ডোম কোনো একক অস্ত্র নয়। এটি এমন একটি নেটওয়ার্ক, যা তাইওয়ানের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোকে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে প্রতিরক্ষার আওতা বাড়াবে। একে পরস্পর-সংযুক্ত দুটি স্তর হিসেবে ভাবা যায়। প্রথমটি হলো কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ স্তর, যা তথ্য একত্র করে এবং কোথায় গুলি চালানো হবে তা নির্দেশ দেয়। দ্বিতীয়টি হলো প্রতিহতকারী অস্ত্রের বিভিন্ন স্তর, যেগুলো স্বল্প, মাঝারি ও উচ্চতায় থাকা হুমকি মোকাবিলা করে। প্যাট্রিয়ট ও দেশীয়ভাবে তৈরি স্কাই বো পরিবারের মতো ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে শিগগিরই যুক্ত হবে অর্ডার করা ন্যাশনাল অ্যাডভান্সড সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম (নাসামস) ইউনিট। এগুলোর সঙ্গে থাকবে নিচু স্তরের স্টিঙ্গার দল ও চলমান কামানের মতো ব্যবস্থা। উচ্চতায় অভিযানের জন্য তাইওয়ান চিয়াং কং প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করছে, যার লক্ষ্য দ্রুতগতির ও খাড়া পথে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের মেরুদণ্ড
এর কেন্দ্রে থাকবে একটি কমান্ড ব্যবস্থা, যা ভূমিভিত্তিক রাডার, আকাশপথের সেন্সর ও বেসামরিক বিমান চলাচলের তথ্য থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করবে। এরপর লক্ষ্যবস্তুর গতিপথ শনাক্ত ও হুমকির ধরন নির্ধারণ করে উপযুক্ত অস্ত্র বরাদ্দ করবে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ এবং একাধিক বিকল্প যোগাযোগপথ কাজে লাগিয়ে শনাক্তকরণ থেকে আঘাত হানার সময় কমিয়ে আনাই এর উদ্দেশ্য। নকশায় চলনক্ষমতা ও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকার বিষয়টিও রাখা হয়েছে, যাতে প্রথম হামলার পরও কমান্ড কেন্দ্রগুলো টিকে থাকতে পারে, দ্রুত স্থান বদলাতে পারে এবং ছড়িয়ে থাকা উৎক্ষেপকগুলোকে নির্দেশনা দিতে পারে। মন্ত্রণালয় একে সত্যিকার অর্থে সমন্বিত সেন্সর-থেকে-অস্ত্র শৃঙ্খলের দিকে অগ্রসর হওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা সফলভাবে প্রতিহত করার সম্ভাবনা বাড়াবে এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক লক্ষ্যবস্তুর জন্য প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণে সহায়তা করবে।
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, কেনাকাটার পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পাবে চলমান উৎক্ষেপক, প্রতারণামূলক লক্ষ্যবস্তু এবং দ্রুত স্থাপনযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, যা আঘাতের পর আবার সচল করা যাবে। কমান্ড ব্যবস্থা ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্রভাবও সামলাবে, যার মধ্যে যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি ও বিভ্রান্তি ছড়ানো রয়েছে। ফলে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর পথে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনকে প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি অন্যান্য বাধারও মুখে পড়তে হবে।
প্রতিহতকারী অস্ত্রের স্তর
বহুস্তরীয় কাঠামো প্রতিরক্ষাকারীদের একটি হুমকির বিরুদ্ধে একাধিকবার আঘাত হানার সুযোগ দেয়। নিচু স্তরে কাঁধে বহনযোগ্য স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্র দল, চলমান কামান ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বিমানঘাঁটি, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেনা সমাবেশস্থল রক্ষা করবে। মাঝারি উচ্চতার হুমকি মোকাবিলা করবে নাসামস উৎক্ষেপক এবং তাইওয়ানের স্কাই বো পরিবারের উন্নত সংস্করণ। উচ্চতায়, প্যাট্রিয়ট ইউনিট ও তাইওয়ানের তিয়েন কুং ৩ ক্ষেপণাস্ত্র শেষ ধাপে উড়োজাহাজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করবে। পরিকল্পিত চিয়াং কং ক্ষেপণাস্ত্র উচ্চতায় প্রতিরক্ষার আওতা আরও বাড়ানোর জন্য তৈরি হচ্ছে, যাতে দ্রুতগতির ও উঁচু পথে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে আরেকটি প্রতিরক্ষা রেখা যুক্ত হয়।
সেন্সর থেকে অস্ত্র পর্যন্ত সমন্বয়ের ধারণা
সেন্সর থেকে অস্ত্র পর্যন্ত সমন্বয় বলতে ধীরগতির হাতবদল ছাড়াই শনাক্তকরণ, সিদ্ধান্ত এবং গুলি চালানোর ধাপগুলোকে যুক্ত করাকে বোঝায়। বাস্তবে, উপকূলীয় একটি রাডার নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক শনাক্ত করতে পারে। লক্ষ্যবস্তু কী এবং সেগুলো কোন দিকে যাচ্ছে তা নিশ্চিত করতে ওই রাডারের তথ্য অন্য সেন্সরের তথ্যের সঙ্গে মেলানো হয়। কমান্ড ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি থাকা উপযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্রসহ উৎক্ষেপকগুলোকে নির্দেশ দেয়, ঝুঁকিতে থাকা স্থানের বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে আশ্রয় নিতে সতর্ক করে এবং অন্য ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলোকে অবস্থান বদলাতে বলে, যাতে সেগুলোকে চিহ্নিত করে পরবর্তী হামলায় আঘাত করা না যায়। প্রতারণামূলক লক্ষ্য শনাক্ত হলে বা যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় কোনো উৎক্ষেপক নিরাপদে গুলি চালাতে না পারলে অন্য উৎক্ষেপকটি আঘাত হানে, আর নেটওয়ার্কজুড়ে তথ্য হালনাগাদ হয় তাৎক্ষণিকভাবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও একই ধরনের ধারণা এগিয়ে নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে প্রতিটি সেন্সরকে প্রতিটি অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করা। তাইওয়ানের সংস্করণটি এই ধারণাকে এমন এক দ্বীপের জন্য মানিয়ে নেয়, যার ভূখণ্ডে গভীরতা কম, শহর ঘনবসতিপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অল্প এলাকায় কেন্দ্রীভূত। তাইপের জন্য এর সুফল হলো আক্রমণ শনাক্ত করে ধ্বংস করার শৃঙ্খল আরও সংক্ষিপ্ত হওয়া এবং চাপের মুখে প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সামলানোর নমনীয়তা। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বা বড় ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক প্রতিরক্ষাকে পরাস্ত করতে চাইলে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থায়ন, কেনাকাটা ও সময়সূচি
সরকারের ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ বাজেট ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চলার কথা। এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তারা এই বরাদ্দকে প্রতিরক্ষা সহনশীলতা ও অসম যুদ্ধ সক্ষমতা জোরদারের বৃহত্তর বিশেষ বাজেটের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই কর্মসূচিতে এমন প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে, যা ছোট সামরিক বাহিনীকে আরও টেকসই এবং আক্রমণকারীর জন্য আরও বিপজ্জনক করে তুলবে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে এবং উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার কাজে ৯০ হাজার পর্যন্ত কর্মসংস্থান হতে পারে।
তাইওয়ান কী কিনতে চায়
টি-ডোম-সংশ্লিষ্ট কেনাকাটার মধ্যে রয়েছে নির্ভুল নিশানার কামান, দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষেপণাস্ত্র, যা শত্রুর উৎক্ষেপক ও সমাবেশস্থলকে ঝুঁকিতে রাখবে, এবং অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ফায়ার ইউনিট। তাইওয়ান নাসামস সরবরাহের অপেক্ষায় আছে, প্যাট্রিয়ট প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়াতে চায় এবং স্কাই বো ব্যবস্থার ব্যাপক উৎপাদন চালিয়ে যাবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তালিকায় চালকবিহীন ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশযান ড্রোন, ড্রোন নৌকা ও চালকবিহীন জলযান; পাশাপাশি এমন উন্নত কমান্ড ব্যবস্থা, যা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ ও আরও কার্যকরভাবে কাজ বণ্টন করবে। খুচরা যন্ত্রাংশ এবং যুদ্ধকালীন মজুতের গোলাবারুদও পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রথম দফার হামলার পর চালু রাখতে পর্যাপ্ত পুনরায় লোড করার সরঞ্জাম না থাকলে কোনো বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষাই কার্যকর হতে পারে না।
বাজেট নিয়ে রাজনীতি ও সরবরাহের বাধা
বিশেষ বাজেটের জন্য এখনো আইনসভার অনুমোদন প্রয়োজন, আর তাইওয়ানের পার্লামেন্টে বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এ বছর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বিরোধ হয়েছে, যা অর্থ ছাড়ের গতি ধীর করতে পারে। সরবরাহের সময়সূচি যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানির অনুমোদনের ওপরও নির্ভরশীল, কারণ ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডারের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে, যেখানে উৎপাদনকারীরা ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক অর্ডার সামলাচ্ছে। তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী ২০২৭ সালের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের যৌথ যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে আরও পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে পুরো টি-ডোম কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কারণ নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি না বাড়িয়ে সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন দ্রুত করা যাবে না।
ইসরায়েলের আয়রন ডোমের সঙ্গে তুলনা
নামটি ইসরায়েলের আয়রন ডোমের সঙ্গে তুলনার সুযোগ তৈরি করে। অনুপ্রেরণাটি সত্যি, তবে দুই ব্যবস্থার লক্ষ্য এক নয়। বিপুলসংখ্যক স্বল্পপাল্লার রকেট, যেগুলো প্রায়ই কম খরচে ব্যালিস্টিক পথে ছোড়া হয়, সেগুলো ঠেকানোর প্রয়োজন থেকে আয়রন ডোমের উদ্ভব। তাইওয়ানের সমস্যা আরও বিস্তৃত: পিএলএর যুদ্ধবিমান ও বোমারু উড়োজাহাজের অভিযান থেকে শুরু করে নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দ্রুতগতিতে খাড়া পথে নেমে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত। তাইওয়ানকেন্দ্রিক নেটওয়ার্ককে বিভিন্ন ধরনের হুমকি সামলাতে, ভিন্ন ভিন্ন উড্ডয়নপথের লক্ষ্যবস্তুর দিকে অস্ত্র তাক করতে এবং সমুদ্র ও মূল ভূখণ্ড থেকে সমন্বিত হামলার প্রথম মুহূর্তগুলোতে টিকে থাকতে হবে।
ভূগোলও গুরুত্বপূর্ণ। তাইওয়ানের আয়তন ছোট এবং জনবসতি ঘন, ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছড়িয়ে রাখা ও চলনক্ষম হওয়া জরুরি। সতর্কবার্তার প্রতিটি মিনিট এবং সিদ্ধান্তের সময় থেকে বাঁচানো প্রতিটি সেকেন্ডই মূল্যবান। খরচও বড় বিবেচ্য বিষয়। উন্নত প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয়বহুল, আর আক্রমণকারীরা প্রতিরক্ষাকারীদের গুলি করে নামানোর চেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক থেকে ছোড়ার আগেই আক্রমণকারীর পরিকল্পনা জটিল করে তুলতে একটি সহনশীল প্রতিরক্ষার দরকার বুদ্ধিদীপ্ত অগ্নিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রতারণামূলক লক্ষ্যবস্তু এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের। টি-ডোমের প্রতিশ্রুতি হলো এসব উপায় একসঙ্গে কাজে লাগানো, যাতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র কেবল সেসব লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, যেগুলোকে প্রতিহত করা সত্যিই জরুরি।
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা ও পিএলএর হুমকি
আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে তাইওয়ানের ভাবনায় ইউক্রেনের অভিজ্ঞতার প্রভাব রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঢেউয়ের মধ্যেও বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা, নেতৃত্বকে সুরক্ষিত করা এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিয়েভের সক্ষমতার পেছনে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা, দ্রুত স্থান বদলাতে সক্ষম উৎক্ষেপক এবং কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে রক্ষা করতে হবে তা নির্ধারণ করতে পারা কমান্ড ব্যবস্থার বড় ভূমিকা ছিল। তাইওয়ানের পরিকল্পনাকারীরাও একই শিক্ষা নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে একাধিক স্তরে সুরক্ষিত করতে হবে, উৎক্ষেপকগুলোকে লুকিয়ে রাখতে, সরাতে ও তাদের অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা দিতে হবে। পাশাপাশি একসঙ্গে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঢেউ এলে দ্রুত এক লক্ষ্য থেকে অন্য লক্ষ্যে মনোযোগ সরানোর প্রশিক্ষণ দিতে হবে পরিচালকদের।
যেকোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার মতো সংখ্যক অস্ত্র পিএলএর রয়েছে। যুদ্ধজাহাজ ও উপকূলীয় উৎক্ষেপক কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে, আর উড়োজাহাজ ভূমিভিত্তিক অনেক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার বাইরে থেকেই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, সামরিক মহড়া অল্প সময়ের নোটিশে বাস্তব অভিযানে রূপ নিতে পারে। সে কারণেই তাইপে এমন একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক চায়, যা প্রথম আঘাতগুলো সামলে নিতে পারবে, পর্যাপ্ত উৎক্ষেপক ও কমান্ড কেন্দ্র সচল রাখবে এবং এরপর কোথায় আঘাত হানবে, সে বিষয়ে আক্রমণকারীকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।
সময়মতো কি এটি গড়ে তুলতে পারবে তাইওয়ান
কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট সরবরাহ এবং বিদ্যমান ইউনিটগুলোর আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে নিকট ভবিষ্যতে টি-ডোমের প্রাথমিক অংশগুলো চালু হবে। পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েক বছর লাগবে। বিভিন্ন বাহিনীতে কার্যকর একটি কমান্ড ব্যবস্থা তৈরি, মানুষের বিচার-বিবেচনার সক্ষমতা বজায় রেখে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পরিচালকদের প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত পুনরায় লোড করার সরঞ্জাম মজুত করা—সবই সময়সাপেক্ষ কাজ। তাইওয়ানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প দেশে প্রয়োজনীয় আরও সরঞ্জাম উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে, তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিদেশি অংশীদারদের কাছ থেকেই আসবে, যাঁদেরও নিজস্ব সরবরাহের জট রয়েছে।
জাতীয় দিবসের ভাষণে প্রেসিডেন্ট লাই প্রকল্পটিকে প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন, যার লক্ষ্য বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা ও আগ্রাসন ঠেকানো। তিনি বলেন, তাইওয়ান সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতা চায় এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ হলো শক্তি।
প্রেসিডেন্ট লাই বলেন, তাইওয়ান "শক্তির মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ" এবং বেইজিংকে তাইওয়ান প্রণালিতে শক্তি প্রয়োগের হুমকি ত্যাগ করার আহ্বান জানান।
বেইজিং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। চীনা কর্মকর্তারা বলেন, তাইওয়ান চীনের অংশ এবং লাইকে উসকানিদাতা বলে অভিযুক্ত করেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তাঁর ভাষণ পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে এবং উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
মুখপাত্র বলেন, "লাইয়ের মন্তব্য বাস্তবতাকে বিকৃত করে এবং জনমতকে বিভ্রান্ত করে"; তিনি লাইকে "ঝামেলাবাজ" ও "যুদ্ধবাজ" বলেও আখ্যা দেন।
আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জামের বাইরে, টি-ডোম গড়ে তোলার লক্ষ্য হলো তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও গভীর করা, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিকস ও মহাকাশশিল্পে দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সরকারি পূর্বাভাসে পরিকল্পনাটিকে কয়েক দশ হাজার নতুন কর্মসংস্থান ও বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। রসদ সরবরাহের দায়ও বড়। রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও চলমান কমান্ড কেন্দ্র সচল রাখতে প্রশিক্ষিত কারিগর, খুচরা যন্ত্রাংশের নিয়মিত সরবরাহ এবং সংকটের সময় ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম কারখানা দরকার।
মিত্ররা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী ও অংশীদার। অন্যদিকে, স্থিতিশীল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বজায় রাখতে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় অংশীদারদেরও স্বার্থ রয়েছে। তাইওয়ানের আরও বহুস্তরীয় ও দ্রুত অভিযোজনক্ষম আকাশ প্রতিরক্ষা আক্রমণকারীর পক্ষে দ্রুত ও চূড়ান্ত ফল অর্জন কঠিন করে তোলে। তত্ত্বগতভাবে, এতে ভুল হিসাবের ঝুঁকি কমে এবং সংকট দেখা দিলে কূটনীতির জন্য সময় পাওয়া যায়। আধুনিক নির্ভুল হামলার মুখে টিকে থাকতে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও উন্নতভাবে সংযুক্ত নেটওয়ার্ক এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করায় আঞ্চলিক সামরিক বাহিনীগুলোও নিজেদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় একই ধরনের সেন্সর-থেকে-অস্ত্র সমন্বয় নিয়ে কাজ করছে।
যা জানা জরুরি
- দ্বীপজুড়ে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক টি-ডোম গড়ে তুলতে তাইওয়ান আট বছর মেয়াদি ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ বাজেট প্রস্তাব করেছে।
- টি-ডোম প্যাট্রিয়ট ও স্কাই বোয়ের মতো বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে নাসামসের মতো নতুন ইউনিট যুক্ত করবে; এর সহায়তায় থাকবে আরও দ্রুত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক।
- সেন্সর থেকে অস্ত্র পর্যন্ত সমন্বয়ের মাধ্যমে শনাক্তকরণ থেকে প্রতিহত করার সময় কমানো এবং লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের সম্ভাবনা বাড়ানো হবে।
- কেনাকাটার মধ্যে রয়েছে নির্ভুল নিশানার কামান, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ফায়ার ইউনিট এবং ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমর্থিত কমান্ড ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ।
- তাইপে আগামী বছর জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি প্রতিরক্ষায় ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়েছে এবং আইনসভার অনুমোদন সাপেক্ষে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৫ শতাংশে নিতে চায়।
- পরিকল্পনাটি ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চলবে। এর আগে প্রাথমিক সমন্বয়ের কাজ শুরু হতে পারে, তবে পূর্ণ বাস্তবায়ন ২০২৭ সালের অনেক পর হবে।
- কর্মকর্তাদের মতে, হামলার মুখে উৎক্ষেপক ও কমান্ড কেন্দ্র সচল রাখতে চলনক্ষমতা, বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা, প্রতারণামূলক লক্ষ্যবস্তু এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ।
- বেইজিং পরিকল্পনাটির নিন্দা করেছে এবং প্রেসিডেন্ট লাইকে ঝামেলাবাজ বলেছে। লাই বলেছেন, শক্তির মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখাই তাইওয়ানের লক্ষ্য।
- সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৯০ হাজার পর্যন্ত কর্মসংস্থান এবং প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে।
- ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা এই কৌশলকে প্রভাবিত করেছে। ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সেনা, অবকাঠামো ও বেসামরিক নাগরিকদের বহুস্তরীয় সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।






