কক্ষপথে স্বয়ংসম্পূর্ণ মহাকাশযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি সহজ পরীক্ষা
মহাকাশে সম্পদ উৎপাদনে প্রথমবারের দাবি করেছে চীন। তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে শেনঝৌ-১৯-এর নভোচারীরা একটি ছোট কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ ইউনিট ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি থেকে দুটি জরুরি উপাদান তৈরি করেছেন—শ্বাস নেওয়ার উপযোগী অক্সিজেন এবং ইথিলিন। ইথিলিন একটি হাইড্রোকার্বন, যা রকেটের জ্বালানি তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। ড্রয়ারের মতো দেখতে যন্ত্রে ১২টি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রদর্শনী সম্পন্ন হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পৃথিবীতে উদ্ভিদ যে মৌলিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, সেগুলোকে কক্ষপথে কাজ করার উপযোগী করে প্রকৌশলগতভাবে তৈরি করা সম্ভব।
সূচিপত্র
- কক্ষপথে স্বয়ংসম্পূর্ণ মহাকাশযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি সহজ পরীক্ষা
- ব্যবস্থাটি যেভাবে কাজ করে
- সহজ ভাষায় রসায়ন
- তিয়ানগংয়ের নভোচারীরা আসলে যা করেছেন
- মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি
- জীবনধারণ ও প্রপালশনের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
- ইথিলিন কি সত্যিই মহাকাশযানের জ্বালানি হতে পারে
- মহাকাশ স্টেশন থেকে চাঁদে
- ভবিষ্যতের কক্ষপথীয় সরবরাহব্যবস্থা
- এরপর যা করতে হবে
- বিশ্বজুড়ে উদ্যোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক
- মূল বিষয়গুলো
এই ফলকে উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে শুধু উৎপন্ন পদার্থ নয়, যে পরিবেশে তা তৈরি হয়েছে সেটিও। অনেক রাসায়নিক কারখানায় চরম পরিবেশের প্রয়োজন হলেও এই ব্যবস্থা কাজ করেছে ঘরের তাপমাত্রা ও স্বাভাবিক চাপে। মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে নভোচারীরা গ্যাস ও তরলের চলাচলও নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন। বুদ্বুদ ওপরে না ওঠা এবং তরল থিতিয়ে না পড়ার কারণে এটি একটি পরিচিত চ্যালেঞ্জ। দলটি তাৎক্ষণিকভাবে উৎপন্ন পদার্থের তথ্য রেকর্ড করেছে, যা অক্সিজেন উৎপাদন ও হাইড্রোকার্বন তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
চীনে ২০১৫ সাল থেকে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন চলছে। মহাকাশে এর কার্যকারিতা দেখা যাওয়া এমন যেকোনো পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যার লক্ষ্য নিয়মিত সরবরাহ ছাড়াই নভোচারীদের সহায়তা করা। মহাকাশযান যদি উড়ন্ত অবস্থাতেই বাতাস ও জ্বালানি তৈরি করতে পারে, তাহলে অভিযান আরও হালকা, নিরাপদ ও নমনীয় হবে। একই প্রযুক্তি চাঁদ বা মঙ্গলের ঘাঁটিতেও কাজে লাগতে পারে, যেখানে পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বরফ বা বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থায় রয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, অনুঘটক বদলে ব্যবস্থাটিকে মিথেন ও ফর্মিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন পদার্থ তৈরির জন্য সমন্বয় করা যায়। মিথেন ইতিমধ্যেই পছন্দের রকেট জ্বালানিগুলোর একটি। অন্যদিকে, ফর্মিক অ্যাসিড আরও জটিল রাসায়নিক পদার্থ তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে; এর মধ্যে খাদ্য উৎপাদন গবেষণায় চিনি তৈরির প্রাথমিক ধাপও রয়েছে। এই নমনীয়তা এমন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একটি যন্ত্রই জীবনধারণে সহায়তা থেকে শুরু করে প্রপালশন জ্বালানি সরবরাহ পর্যন্ত একাধিক কাজ করবে।
ব্যবস্থাটি যেভাবে কাজ করে
কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ উদ্ভিদের প্রক্রিয়ার অনুকরণ করে, তবে এতে পাতার বদলে প্রকৌশলগতভাবে তৈরি উপাদান ব্যবহৃত হয়। সহজভাবে বললে, প্রক্রিয়াটির দুটি অংশ রয়েছে। এক অংশে পানি ভেঙে অক্সিজেন তৈরি হয়, যা কেবিনে পাঠানো হয়। অন্য অংশে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে ইলেকট্রন ও হাইড্রোজেন যুক্ত করে ইথিলিন, মিথেন বা ফরমেটের মতো অণু তৈরি করা হয়। সৌর প্যানেলে রূপান্তরিত সূর্যালোক থেকে, অথবা যন্ত্রের ভেতরে অর্ধপরিবাহী অনুঘটককে সরাসরি সক্রিয় করে এমন আলো থেকে শক্তি আসে।
সহজ ভাষায় রসায়ন
তিয়ানগংয়ের ইউনিটের ভেতরে একটি অর্ধপরিবাহী অনুঘটক এমন একটি পৃষ্ঠ তৈরি করে, যেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি পরস্পরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে। শক্তি এলে অনুঘটক পরমাণুগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে সাহায্য করে। পানি থেকে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন আলাদা হয়। কার্বন আসে কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে। অনুঘটকের ধরন অনুযায়ী কার্বন পরমাণুগুলো ভিন্নভাবে যুক্ত হয়। তামাভিত্তিক অনুঘটক সাধারণত কার্বনগুলোকে জুড়ে ইথিলিন তৈরি করে। অন্য উপাদান মিথেন বা কার্বন মনোক্সাইড তৈরিতে বেশি সহায়ক। কাঙ্ক্ষিত মিশ্রণ পেতে প্রকৌশলীরা অনুঘটক বেছে নেন।
তিয়ানগংয়ে পাঠানো ইউনিটটি ঘরের তাপমাত্রায় কাজ করে এমন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বলে মনে হয়, যেখানে উচ্চচাপের ট্যাংক বা বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় না। এতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে, যা প্রতিটি ওয়াট হিসাব করে ব্যবহার করা মহাকাশযানের জন্য জরুরি। যন্ত্রটিকে বায়ু ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করাও সহজ হয়, কারণ অক্সিজেন কেবিনের চাপে প্রবাহিত হতে পারে এবং হাইড্রোকার্বন ভারী কম্প্রেসর ছাড়াই সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াকরণের জন্য পাঠানো যায়।
তিয়ানগংয়ের নভোচারীরা আসলে যা করেছেন
২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে অভিযান শুরু করা শেনঝৌ-১৯-এর নভোচারীরা ড্রয়ারের মতো একটি মডিউলের ভেতরে ১২টি পরীক্ষা চালিয়েছেন। যন্ত্রটিতে তিনটি পর্যায়—গ্যাস, তরল ও কঠিন উপাদান—নিয়ে বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুঘটক, তরল চলাচলের পথ ও সেন্সর ছিল। দলটি অক্সিজেন উৎপাদন যাচাই করেছে এবং প্রপালশন গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যপণ্য ইথিলিনের উপস্থিতি পরিমাপ করেছে।
মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে তরল নিয়ন্ত্রণ ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীতে গ্যাস ও তরল স্বাভাবিকভাবেই আলাদা হয়ে যায়। কক্ষপথে পৃষ্ঠটানের প্রভাব বেশি। তিয়ানগংয়ের যন্ত্রে এমন চ্যানেল, ঝিল্লি ও প্রবাহ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল, যা বিক্রিয়কগুলোকে অনুঘটকের সংস্পর্শে রেখেছে এবং উৎপন্ন পদার্থ সরিয়ে নিয়েছে, যাতে বিক্রিয়া চলতে পারে। ভবিষ্যতের নকশা উন্নত করতে পরীক্ষায় গ্যাসের চলাচল ও পৃথক হওয়ার আচরণ রেকর্ড করা হয়েছে।
মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি
বুদ্বুদ অনুঘটকের গায়ে আটকে গেলে উৎপাদন কমে যায়। তরল যদি সমানভাবে বিক্রিয়ার পৃষ্ঠে না পৌঁছায়, তাহলে কোথাও অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়, আবার কোথাও শুকনো অংশ থেকে যায়। নির্ভুল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণই পরীক্ষাগারের প্রমাণ আর সংরক্ষণ ট্যাংকে পাঠানোর মতো উৎপাদিত পদার্থের ধারার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। তিয়ানগংয়ে সংগৃহীত তথ্য প্রক্রিয়াটি বড় পরিসরে চালু করতে প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় নকশাগত ধারণা দেবে।
মাধ্যাকর্ষণ ছাড়া দৈনন্দিন প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে কাজ করে, তা যাচাইয়ের জন্য মহাকাশ স্টেশনে চলমান পরীক্ষার তালিকায় এই পরীক্ষা আরেকটি সংযোজন। তিয়ানগংয়ে এর আগে লেটুস ও টমেটো চাষ এবং আগুনের আচরণ পর্যবেক্ষণে দেশলাই জ্বালানোর মতো কাজ হয়েছে। পৃথিবীর বাইরে কারখানা ও খামার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব জ্ঞান গড়ে তুলতে এসব গবেষণা সহায়তা করে।
জীবনধারণ ও প্রপালশনের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
রকেটে করে পৃথিবী থেকে যে প্রতিটি কিলোগ্রাম কম পাঠাতে হয়, তাতে খরচ ও ঝুঁকি কমে। অক্সিজেন এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন সৌর প্যানেলের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তড়িৎ বিশ্লেষণ ইউনিটে পানি ভেঙে অক্সিজেন তৈরি করে। গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে, স্টেশনের জীবনধারণ ব্যবস্থার মোট শক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লাগে অক্সিজেন উৎপাদনে। এই পদ্ধতি কাজ করলেও বিদ্যুতের খরচ বেশি এবং পানি ও ব্যবহার্য উপকরণ নিয়মিত সরবরাহের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।
কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ আরেকটি পথ খুলে দেয়। নভোচারীদের নিঃশ্বাস থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে এটি আবার অক্সিজেনে রূপান্তর করতে পারে, পাশাপাশি একই যন্ত্রে জ্বালানির জন্য হাইড্রোকার্বন অণুও তৈরি করতে পারে। বিক্রিয়াগুলো ঘরের তাপমাত্রা ও কেবিনের চাপে চলতে পারে, ফলে বিদ্যুতের চাহিদা কমে। নিজেদের অক্সিজেন ও প্রপেলান্ট তৈরি করতে পারা স্টেশন বা ঘাঁটিতে সরবরাহের বিরতি বাড়ানো যাবে এবং বিজ্ঞান ও পরিচালনার কাজে বেশি বিদ্যুৎ রাখা যাবে।
উৎপাদনযোগ্য পদার্থের বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক আধুনিক ইঞ্জিনে, পুনর্ব্যবহারের উপযোগী নকশাসহ, মিথেনের সঙ্গে তরল অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়। ফর্মিক অ্যাসিড হাইড্রোজেনকে রাসায়নিকভাবে ধরে রেখে পরে কাজে লাগাতে পারে। ইথিলিন সরাসরি পোড়ানো যায়, অথবা পরিশোধন করে অন্য জ্বালানি ও উপকরণ তৈরি করা যায়। বর্জ্য কার্বনকে দরকারি অণুতে রূপান্তর করতে পারা কোনো ব্যবস্থা স্টেশনে থাকা প্রতিটি লিটার পানি ও সূর্যালোকের প্রতিটি ওয়াটের কার্যকারিতা বাড়ায়।
ইথিলিন কি সত্যিই মহাকাশযানের জ্বালানি হতে পারে
ইথিলিন একটি সরল হাইড্রোকার্বন, যার দুটি কার্বন পরমাণু রয়েছে। তরল অক্সিজেনের সঙ্গে এটি সহজেই জ্বলে এবং ইঞ্জিন বা থ্রাস্টারে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গবেষণার ইঞ্জিন ও পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। কার্যক্ষমতা ইঞ্জিনের নকশার ওপর নির্ভর করে, তবে এটি মিথেন ও প্রোপেনের একই শ্রেণির পদার্থ। কক্ষপথে এর সুবিধা হলো, তামাভিত্তিক অনুঘটক ব্যবহার করলে কার্বন ডাই-অক্সাইড হ্রাসের প্রক্রিয়া থেকেই সরাসরি ইথিলিন তৈরি হতে পারে।
তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ঘরের তাপমাত্রায় ইথিলিন গ্যাসীয়, তাই সংরক্ষণের জন্য একে সংকুচিত বা ঠান্ডা করতে হয়। অনেক অভিযানে মিথেনকে বেশি পছন্দ করা হয়, কারণ তরল অক্সিজেনের সঙ্গে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় এটি সামলানো সহজ। ইথিলিন কাঁচামাল হিসেবেও কাজে লাগতে পারে। আরও প্রক্রিয়াজাত করলে একে তরল বা উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকে রূপান্তর করা যায়। তিয়ানগংয়ের পরীক্ষা দেখিয়েছে, দলটি লক্ষ্যপণ্য হিসেবে ইথিলিন তৈরি করতে পারে। তবে প্রয়োগ অনুযায়ী ভবিষ্যতের অভিযানে অনুঘটক বদলে মিথেন বা ফরমেট তৈরির দিকে জোর দেওয়া হতে পারে।
প্রপেলান্ট বেছে নেওয়াই পুরো বিষয় নয়। প্রায় সব রাসায়নিক রকেটেই প্রপেলান্টের ভরের বড় অংশ জুড়ে থাকে অক্সিজেন। মহাকাশে কম খরচে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে এমন যেকোনো যন্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য প্রয়োজনীয় ভর কমায়। শুরুতে হাইড্রোকার্বন পৃথিবী থেকে পাঠানো হলেও, স্থানীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে এমন স্টেশন অভিযানের হিসাবকে অনুকূলভাবে বদলে দেবে।
মহাকাশ স্টেশন থেকে চাঁদে
২০৩০ সালের আগে নভোচারীসহ চাঁদে অবতরণ এবং ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে বা মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ্যে নির্ধারণ করেছে চীন। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রোবট দিয়ে একটি ছোট পারমাণবিক চুল্লি সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ এর একটি অংশ। পরের প্রয়োজন হলো বাতাস ও জ্বালানির অবিচ্ছিন্ন সরবরাহ, যা পণ্যবাহী মহাকাশযানের ওপর নির্ভর করবে না। তিয়ানগংয়ের পরীক্ষাকে এই লক্ষ্যের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের কক্ষপথীয় সরবরাহব্যবস্থা
কক্ষপথে প্রপেলান্ট সরানো ও ভাগ করে নেওয়ার সক্ষমতাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জ্বালানি পুনরায় ভরার প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য শিজিয়ান-২৫ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে চীন। মহাকাশ স্টেশনে উৎপাদনের সঙ্গে এই পুনরায় জ্বালানি ভরার পরীক্ষা যুক্ত হলে এমন সরবরাহব্যবস্থার পথ তৈরি হতে পারে, যেখানে একটি প্ল্যাটফর্ম জ্বালানির উপাদান তৈরি করবে এবং অন্যটি সেগুলো উপগ্রহ বা স্থানান্তরযানে পৌঁছে দেবে। বাস্তবসম্মত একটি ব্যবস্থা এমন হতে পারে: নভোচারীসহ বা রোবটচালিত প্ল্যাটফর্ম কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণ ব্যবহার করে CO2 ও পানিকে অক্সিজেন ও মিথেনে রূপান্তর করবে। ট্যাংকার উপগ্রহগুলো কাছে এসে জ্বালানি সংগ্রহ করে গতি বাড়ানোর জন্য তা মহাকাশযানে পৌঁছে দেবে। চাঁদের পৃষ্ঠে একই ধরনের ইউনিট আবাসস্থলে অক্সিজেন সরবরাহ করবে এবং কক্ষপথে ফিরে যাওয়ার জন্য মিথেন সংরক্ষণ করবে। প্রতিটি স্থানে সূর্যালোক বা পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে রাসায়নিক প্রক্রিয়া চালানো হবে।
এরপর যা করতে হবে
তিয়ানগংয়ের যন্ত্রটি সম্ভাব্যতার প্রমাণ, এখনো কারখানা নয়। নভোচারীদের সহায়তা বা যানবাহনে পুনরায় জ্বালানি ভরার জন্য উৎপাদন বহুগুণ বাড়াতে হবে। এর জন্য বড় বিক্রিয়া-পৃষ্ঠ, উন্নত তাপ ব্যবস্থাপনা এবং কর্মক্ষমতা না হারিয়ে কয়েক মাস টিকে থাকে এমন অনুঘটক দরকার। মহাকাশের বিকিরণ ও তাপমাত্রার ওঠানামায় উপাদানের কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। ভারী যন্ত্রাংশ পাঠানো ছাড়াই দীর্ঘস্থায়িত্ব পরীক্ষা ও যন্ত্রাংশ বদলের উপায় প্রকৌশলীদের বের করতে হবে।
পৃথকীকরণ ও সংরক্ষণও সমান কঠিন। শ্বাস নেওয়া ও ইঞ্জিনে ব্যবহারের জন্য উচ্চ বিশুদ্ধতার অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে। উপজাত থেকে হাইড্রোকার্বন আলাদা করে নিরাপদে সংকুচিত বা তরল করতে হবে। মহাকাশযানের ভেতরে অক্সিজেন ও জ্বালানি সামলালে আগুনের ঝুঁকি বাড়ে। ভালভ, সেন্সর ও কঠোরভাবে পৃথক রাখার ব্যবস্থা দিয়ে নকশাকারীদের সেই ঝুঁকি কমাতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য সতর্ক প্রকৌশল ও বারবার পরীক্ষা দরকার।
জীবনধারণ ব্যবস্থার চক্রের সঙ্গে একীভূত করার ওপরই প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে। আইএসএসে তড়িৎ বিশ্লেষণের সঙ্গে এমন একটি রিঅ্যাক্টর যুক্ত, যা CO2 ও হাইড্রোজেনকে বিক্রিয়া করিয়ে পানি ও মিথেন তৈরি করে; এতে চক্রটির একাংশ সম্পূর্ণ হয়। ভবিষ্যতের কোনো স্টেশন একাধিক প্রক্রিয়ার মধ্যে বেছে নিতে বা সেগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারে। সবচেয়ে কার্যকর নকশায় বাতাস থেকে CO2 সংগ্রহ করে অবিরাম অক্সিজেন তৈরি করা যেতে পারে, আর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থাকার সময় জ্বালানি সংরক্ষণে পাঠানো যেতে পারে। নিয়মিত ব্যবহারের জন্য রোবটের মাধ্যমে পরিচালনা অপরিহার্য হবে।
বিশ্বজুড়ে উদ্যোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক
পৃথিবীর বাইরে সম্পদ উৎপাদন মহাকাশ সংস্থাগুলোর অভিন্ন অগ্রাধিকার। নাসা পারসিভিয়ারেন্স রোভারে MOXIE পরীক্ষা চালিয়েছিল মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন আহরণের জন্য। এতে প্রমাণ হয়, একটি ছোট যন্ত্র মঙ্গলে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এবং বহু গবেষণাগার সূর্যালোক বা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে CO2 রূপান্তর করতে পারে এমন আলোক-অনুঘটক নিয়ে গবেষণা করছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঘটনাস্থলে তৈরি অক্সিজেনের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য মিথেন ইঞ্জিন নকশা করছে। এসব প্রকল্পের ভাবনা একই: স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে উৎক্ষেপণের ভর কমানো।
এত দিন কক্ষপথে জীবনধারণ নিয়ে বেশির ভাগ পরীক্ষায় উদ্ভিদ উৎপাদন, জীববিজ্ঞান ও তড়িৎ বিশ্লেষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ঘরের তাপমাত্রা ও স্বাভাবিক চাপে কক্ষপথে কার্বন ডাই-অক্সাইড হ্রাস করে হাইড্রোকার্বন ও অক্সিজেন তৈরির কোনো ব্যবস্থার বিষয়ে তিয়ানগংয়ের পরীক্ষাই প্রথম প্রতিবেদন। এতে একটি যন্ত্রের মধ্যেই জীবনধারণে সহায়তা ও প্রপালশন জ্বালানি সরবরাহ যুক্ত হয়েছে। নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথ, চন্দ্র-পৃথিবী মধ্যবর্তী মহাকাশ কিংবা চাঁদের পৃষ্ঠ—ভবিষ্যতের প্ল্যাটফর্মগুলো কী করার চেষ্টা করবে, তার মানদণ্ড আরও উঁচু করেছে এই পদক্ষেপ।
প্রতিযোগিতা অগ্রগতির গতি বাড়াতে পারে। চন্দ্রঘাঁটি ও গভীর মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা থাকায় চীন এই প্রযুক্তিকে বড় পরিসরে নিতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপানসহ অন্যদেরও নিজস্ব স্থানে সম্পদ ব্যবহারের সক্রিয় কর্মসূচি রয়েছে এবং শিগগির তারাও নিজস্ব প্রদর্শনী চালাতে পারে। প্রকৌশলীদের লক্ষ্য হলো এমন কার্যকর সরঞ্জাম তৈরি করা, যা কোনো ঝামেলা ছাড়াই কয়েক মাস কাজ করবে।
মূল বিষয়গুলো
- শেনঝৌ-১৯-এর নভোচারীরা তিয়ানগংয়ে কৃত্রিম সালোকসংশ্লেষণের ১২টি পরীক্ষা চালিয়েছেন।
- যন্ত্রটি ঘরের তাপমাত্রা ও স্বাভাবিক চাপে CO2 ও পানিকে অক্সিজেন ও ইথিলিনে রূপান্তর করেছে।
- পরীক্ষাগুলোতে মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে তরল নিয়ন্ত্রণ ও তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণের কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে।
- অনুঘটক বদলে বিভিন্ন ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থাটিকে মিথেন বা ফর্মিক অ্যাসিড তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।
- আইএসএসে পানি তড়িৎ বিশ্লেষণের তুলনায় এই পদ্ধতিতে বিদ্যুতের চাহিদা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
- ইথিলিন প্রপেলান্ট হিসেবে বা অন্য জ্বালানি ও উপকরণ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
- কক্ষপথে উৎপাদন ও পুনরায় জ্বালানি ভরার পরীক্ষা একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে চীন; ২০৩০ সালের আগে নভোচারীসহ চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
- সামনের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন বাড়ানো, দীর্ঘ সময়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবহার।






