প্রতিভার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে সিঙ্গাপুর
২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিভা প্রতিযোগিতা সূচকে সুইজারল্যান্ডকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান দখল করেছে সিঙ্গাপুর। এক দশক ধরে শীর্ষে থাকার পর এবার সুইজারল্যান্ডের অবস্থান দ্বিতীয়। ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইনসিড ও পোরতুলানস ইনস্টিটিউটের তৈরি এই সূচকে ৭৭টি নির্দেশকের ভিত্তিতে ১৩৫টি অর্থনীতির মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে দেশগুলো কীভাবে প্রতিভাকে কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরি, আকর্ষণ, বিকাশ ও ধরে রাখে, সেই সঙ্গে কারিগরি ও সাধারণ দক্ষতার শক্তিও পরিমাপ করা হয়। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তনের যুগে সহনশীলতা’ এমন এক বিশ্বের প্রতিফলন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূরাজনীতি ও সামাজিক পরিবর্তন মানুষের শেখা ও কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- প্রতিভার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে সিঙ্গাপুর
- সূচকে কী পরিমাপ করা হয় এবং ২০২৫ সালে কী বদলেছে
- ছয়টি স্তম্ভ
- এআই যুগের নতুন চলক
- কেন শীর্ষে উঠল সিঙ্গাপুর
- শিক্ষা ও দক্ষতা
- প্রতিভা ধরে রাখা ও জীবনযাত্রার মান
- নীতির সমন্বয় ও উন্মুক্ততা
- শীর্ষে ওঠা, পিছিয়ে পড়া ও আঞ্চলিক পরিবর্তন
- দক্ষতায় এগিয়ে থাকা দেশ ও মধ্যম আয়ের স্থবিরতা
- নিয়োগদাতা ও কর্মীদের জন্য এর তাৎপর্য
- নিয়োগদাতাদের জন্য
- কর্মীদের জন্য
- অন্যান্য সূচকের সঙ্গে জিটিসিআইয়ের তুলনা
- মূল বিষয়গুলো
২০১৩ সালে সূচকটি চালু হওয়ার পর এই প্রথম সুইজারল্যান্ড শীর্ষে নেই। তৃতীয় স্থানে ডেনমার্ক, এরপর ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। শীর্ষ ২৫টি অবস্থানের অধিকাংশই ইউরোপের দেশগুলোর দখলে। পদ্ধতি আরও শক্তিশালী করার জন্য ২০২৪ সালে প্রতিবেদন প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালে নতুন চলক ও আরও গভীর মডেল নিয়ে এটি আবার প্রকাশ করা হয়। নতুন চলকগুলোতে কোমল দক্ষতা, এআই গ্রহণ এবং কর্মীদের সুস্থতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সংস্করণ ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টার নিরীক্ষা করে। সূচকে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের জিডিপির ৯৭ শতাংশের বেশি এবং জনসংখ্যার ৯৩ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
সিঙ্গাপুরের উত্থানে সক্ষমতা ও ফলাফল—দুই ক্ষেত্রেই অগ্রগতি প্রতিফলিত হয়েছে। সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতায় দেশটি বিশ্বে শীর্ষে, যে সূচকে কোমল দক্ষতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়। প্রতিভা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর সাত ধাপ এগিয়ে ৩১তম হয়েছে। ব্যক্তিগত অধিকার ও চিকিৎসকের ঘনত্বের উন্নতি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় ধারাবাহিক নেতৃত্ব এ অগ্রগতিতে সহায়তা করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান ও সহায়ক নিয়ন্ত্রক পরিবেশও অভিযোজনক্ষম, উদ্ভাবননির্ভর কর্মী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশটির সুবিধা বাড়িয়েছে।
সূচকে কী পরিমাপ করা হয় এবং ২০২৫ সালে কী বদলেছে
প্রতিভা-ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও কোথায় বিনিয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যাবে, তা বুঝতে নেতাদের সহায়তা করার জন্য বৈশ্বিক প্রতিভা প্রতিযোগিতা সূচক তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও জরিপ একত্র করে প্রতিভা বিকাশের পুরো পথটি এতে অনুসরণ করা হয়—সহায়ক পরিবেশ থেকে শুরু করে দক্ষতার ফলাফল ও পেশাগত অগ্রগতি পর্যন্ত।
ছয়টি স্তম্ভ
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, বাজারের উন্মুক্ততা ও অবকাঠামো মূল্যায়ন করে ‘সহায়ক পরিবেশ’ স্তম্ভ। স্থানীয় ও বিদেশি প্রতিভাকে একটি দেশ কতটা আকর্ষণ করে, তা পরিমাপ করে ‘আকর্ষণ’। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও জীবনব্যাপী শেখার অগ্রগতি বিবেচনা করে ‘বিকাশ’। জীবনযাত্রার মান, অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মূল্যায়ন করে ‘ধরে রাখা’। ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা’য় চাকরির জন্য প্রস্তুত সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর ‘সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতা’য় যোগাযোগ, সহযোগিতা, সমস্যা সমাধান ও ডিজিটাল সাবলীলতার মতো বিস্তৃত সক্ষমতা পরিমাপ করা হয়।
এআই যুগের নতুন চলক
২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটাতে সূচকে এআই সক্ষমতা ও ব্যবহার, কোমল দক্ষতা, কর্মীদের সুস্থতা এবং কর্মশক্তির সহনশীলতা পরিমাপের বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। বুদ্ধিমান প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দেশগুলো মানুষকে কীভাবে প্রস্তুত করছে, তা এসব চলকের মাধ্যমে বোঝা যায়। পোরতুলানস ইনস্টিটিউটের সঙ্গে তৈরি হালনাগাদ মডেলটি বিশ্লেষণের গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি আগের ধারাবাহিকতাও বজায় রেখেছে। পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি ও ফলাফল ইনসিডের আনুষ্ঠানিক জিটিসিআই পেজে পাওয়া যাবে এখানে।
কেন শীর্ষে উঠল সিঙ্গাপুর
শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের সঙ্গে দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ এবং সরকার, শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্রিয় সহযোগিতার সমন্বয় ঘটিয়েছে সিঙ্গাপুর। দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেশটি চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পাঠ্যক্রম ও কর্মসূচি নিয়মিত হালনাগাদ করে। এ পদ্ধতির লক্ষ্য মানুষকে গভীর ও বিস্তৃত—দুই ধরনের জ্ঞান দেওয়া, যাতে তারা বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করতে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে এবং গতি না হারিয়ে সংকট মোকাবিলা করতে পারে।
শিক্ষা ও দক্ষতা
সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতায় বিশ্বে প্রথম সিঙ্গাপুর। এ স্তম্ভে বিভিন্ন পেশায় কাজে লাগে এমন বিস্তৃত সক্ষমতা—যেমন যোগাযোগ, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান ও ডিজিটাল সাক্ষরতা—বিবেচনা করা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মানেও দেশটির অবস্থান সেরাদের মধ্যে। এর পেছনে রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষায় ভালো ফল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্নাতকদের উচ্চ অনুপাত এবং শিল্প খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত পলিটেকনিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেটওয়ার্ক। প্রাপ্তবয়স্কদের শেখার সুযোগ এ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। স্কিলসফিউচার ক্রেডিটের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা বাড়ানো যায়, আর কর্মক্ষেত্রভিত্তিক কর্মসূচি মধ্য-ক্যারিয়ারের কর্মীদের তথ্য, সফটওয়্যার, উন্নত উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্ট প্রবৃদ্ধিমুখী পেশায় যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
প্রতিভা ধরে রাখা ও জীবনযাত্রার মান
দ্রুত বর্ধনশীল কর্মকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রতিভা ধরে রাখা দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর সাত ধাপ এগিয়ে ৩১তম হয়েছে। ব্যক্তিগত অধিকার ও চিকিৎসকের ঘনত্বে অগ্রগতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় বিশ্বসেরা অবস্থান দেশটির স্কোর জোরদার করেছে। সরকারি সেবার মান, যাতায়াতের সুবিধা এবং ঘন চাকরিবাজারও সহায়ক। তবে কিছু কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো চ্যালেঞ্জ। সূচকে প্রতিভা ধরে রাখার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অবস্থান সিঙ্গাপুরের চেয়ে ভালো। তা সত্ত্বেও অগ্রগতির ধারা ইতিবাচক, যা সুস্থতা, পরিবারের সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতার প্রতি বাড়তি মনোযোগের ইঙ্গিত দেয়।
নীতির সমন্বয় ও উন্মুক্ততা
শিক্ষা ও সেবার বাইরেও পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক পরিবেশ সিঙ্গাপুরের সুবিধা বাড়িয়েছে, যা নিয়োগদাতাদের বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণে আস্থা দেয়। প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করেছে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মপথ। বিভিন্ন খাতে দক্ষতা স্থানান্তরে সহায়তা করে প্রেষণে কাজ এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিময় কর্মসূচি। এর ফলে এমন এক প্রতিভা-ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা একই সঙ্গে উন্মুক্ত ও সুশৃঙ্খল; আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সঙ্গে স্থানীয় সক্ষমতা বিকাশের সমন্বয় ঘটেছে এতে।
শীর্ষে ওঠা, পিছিয়ে পড়া ও আঞ্চলিক পরিবর্তন
তালিকার শীর্ষে এখনো উচ্চ আয়ের ইউরোপীয় অর্থনীতিগুলোর আধিপত্য। সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডের পর রয়েছে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। দক্ষতা উন্নয়ন ও চলাচলের সুযোগ তৈরি করা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রমবাজারের সুবাদে শীর্ষ ২৫টি অবস্থানের ১৮টিই ইউরোপের দেশগুলোর।
২০২৩ সালে তৃতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র নেমে নবম হয়েছে। সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতায় দেশটির দুর্বল ফল এ পতনের কারণ; এ ক্ষেত্রে দেশটি পঞ্চম থেকে ১৩তম হয়েছে। আকর্ষণ ও সহায়ক পরিবেশের ফলও কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে প্রতিভা বিকাশ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর এখনো ভালো। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র এবং নিয়োগদাতাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এ ক্ষেত্রে সহায়ক। এ ফল থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তিগত দক্ষতার গভীরতার মতোই দক্ষতার বিস্তৃতি ও উন্মুক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ৪০তম স্থান থেকে নেমে ৫৩তম হয়েছে। সূচকে এ পরিবর্তনের সঙ্গে কম অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ ও শ্রমবাজার পরিস্থিতির যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা মূল্যায়নকে প্রভাবিত করেছে; স্বচ্ছতা বাড়লে ভবিষ্যতের পরিমাপে পরিবর্তন আসতে পারে। এশিয়া ও ওশেনিয়ার অন্য দেশগুলোর চিত্র মিশ্র। প্রতিভা ধরে রাখায় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সিঙ্গাপুরের চেয়ে এগিয়ে, তবে সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতায় তারা সিঙ্গাপুরের পেছনে।
অঞ্চলভেদে কয়েকটি দেশ সীমিত উপকরণ কাজে লাগিয়ে ভালো ফল অর্জনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ইসরায়েল ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি সিঙ্গাপুরও এ দলে রয়েছে। তাজিকিস্তান, কেনিয়া, উজবেকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোও দেখিয়েছে, শিক্ষা, শ্রম ও উদ্ভাবন খাতে নীতির সমন্বয় ঘটলে দক্ষতার কার্যকর ব্যবহার সম্ভব। উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েল শীর্ষে, আর প্রতিভা আকর্ষণ ও দক্ষতা বিকাশে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভালো করেছে। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চিলি শীর্ষে, এরপর উরুগুয়ে ও কোস্টারিকা।
দক্ষতায় এগিয়ে থাকা দেশ ও মধ্যম আয়ের স্থবিরতা
২০২৫ সালের প্রতিবেদনে আয়ের দুই প্রান্তেই প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলের একটি প্রবণতা দেখা গেছে। কিছু ছোট অর্থনীতি লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষতা ও উন্মুক্ততায় দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সময়ে অনেক উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর তালিকায় নেই। প্রতিবেদকেরা একে প্রতিভা বিকাশের স্থবিরতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা আয় প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত সংস্কারের চেয়ে দ্রুত বাড়লে দেখা দিতে পারে। এ ব্যবধান কমাতে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন, যাতে নতুন সম্পদ কর্মশক্তির প্রকৃত সক্ষমতায় রূপ নেয়।
নিয়োগদাতা ও কর্মীদের জন্য এর তাৎপর্য
ব্যবসায়িক নেতাদের কাছে সিঙ্গাপুরের নতুন অবস্থান মানে অভিযোজনক্ষম প্রতিভার বড় ভান্ডার এবং পরিকল্পনার জন্য স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ। কর্মীদের জন্য এটি চাহিদার দিকনির্দেশনা দেয়। এখন বহুমুখী দক্ষতার মূল্য বেশি। দলগুলোর এমন মানুষ প্রয়োজন, যারা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য-সাক্ষরতা এবং দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহারের বিচক্ষণতার সমন্বয় করতে পারেন। নগররাষ্ট্রটির প্রাপ্তবয়স্কদের শেখার অবকাঠামো পেশা বদলকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে, আর বাজারে ধারাবাহিকভাবে শেখা মানুষের কদর রয়েছে।
নিয়োগদাতাদের জন্য
- এআই সরঞ্জামের সঙ্গে সমস্যা সমাধান, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ ও নীতিবোধের মতো মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে বিভিন্ন বিভাগের যৌথ প্রশিক্ষণ গড়ে তুলুন।
- মধ্য-ক্যারিয়ারের পদে শুধু ডিগ্রিনির্ভর বাছাই নয়, দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগ করুন।
- ব্যবস্থাপক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করুন। ভালো ব্যবস্থাপনা দলগত উৎপাদনশীলতা ও কর্মী ধরে রাখার অন্যতম শক্তিশালী পূর্বাভাসক।
- শিক্ষার্থী ও পুনঃদক্ষতা অর্জনকারী কর্মীদের চাকরির উপযোগী অভিজ্ঞতা দিতে পলিটেকনিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ব্যবহারিক প্রকল্পে অংশীদার হন।
- সম্ভব হলে নমনীয় কাজের সুযোগ দিন, যাতে নিয়োগের পরিধি বাড়ে এবং কর্মী ধরে রাখা যায়।
কর্মীদের জন্য
- সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতা বাড়ান। যোগাযোগ, সহযোগিতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বিভিন্ন পেশায় আপনার মূল্য বাড়ায়।
- এআই-সাক্ষরতা গড়ে তুলুন। এআই থেকে উপকৃত হতে মডেল তৈরি করা জরুরি নয়, তবে কীভাবে ব্যবহার ও যাচাই করতে হয় এবং এর কার্যকারিতা কীভাবে মাপতে হয়, তা জানতে হবে।
- শেখার অভ্যাস ধরে রাখুন। প্রতি বছর একটি নতুন সরঞ্জাম বা যোগ্যতা অর্জনে স্কিলসফিউচার ক্রেডিট অথবা নিয়োগদাতার কর্মসূচি ব্যবহার করুন।
- পাশাপাশি অন্য ধরনের ভূমিকায় যাওয়ার সুযোগ বিবেচনা করুন। বিভিন্ন বিভাগে কাজ করলে অগ্রগতি ত্বরান্বিত হতে পারে এবং বাজার বদলালে বিকল্প বাড়ে।
অন্যান্য সূচকের সঙ্গে জিটিসিআইয়ের তুলনা
জিটিসিআই প্রতিভা-ব্যবস্থার ওপর বিশেষভাবে নজর দেয়, আর অন্য সূচকগুলো অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করে। আইএমডি বিশ্ব প্রতিযোগিতা র্যাঙ্কিং ২০২৫-এ সুইজারল্যান্ডের পর দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিঙ্গাপুর। ব্যবসায়িক পরিবেশ ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে দুই অর্থনীতিই যে শীর্ষ পর্যায়ের কাছাকাছি, এ অবস্থান তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইএমডি ভিন্ন পদ্ধতি ও দেশের পরিধি ব্যবহার করে বিশ্ব প্রতিভা র্যাঙ্কিংও প্রকাশ করে। বিভিন্ন সূচকে ফল আলাদা হতে পারে, কারণ সেগুলো ভিন্ন নির্দেশক ও সংজ্ঞা অনুসরণ করে। তবে সব সূচকের অভিন্ন বার্তা হলো, জাতীয় অগ্রগতির জন্য প্রতিভা, দক্ষতা ও সহনশীলতা এখন কেন্দ্রীয় বিষয়।
ভবিষ্যতে প্রতিবেদনটিকে ‘ট্যালেন্ট অ্যান্ড কমপিটিটিভনেস মনিটর’ নামে ধারাবাহিক তথ্যব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে জিটিসিআই দল। এতে আরও ঘন ঘন হালনাগাদ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য উন্নত সরঞ্জাম পাওয়া যাবে। আপাতত ২০২৫ সালের সংস্করণটি একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যেসব দেশ অধিকার সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগের পাশাপাশি অভিযোজনক্ষম, এআই-সাক্ষর কর্মশক্তি গড়ে তুলবে, তারা পরিবর্তনকে সুযোগে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিভা প্রতিযোগিতা সূচকে প্রথমবারের মতো শীর্ষে উঠেছে সিঙ্গাপুর।
- দ্বিতীয় সুইজারল্যান্ডের পর রয়েছে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া।
- সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতায় সিঙ্গাপুর বিশ্বে শীর্ষে এবং প্রতিভা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ৩১তম স্থানে উঠেছে।
- ছয়টি স্তম্ভের অধীনে ৭৭টি নির্দেশকের মাধ্যমে ১৩৫টি অর্থনীতিকে মূল্যায়ন করা হয়েছে; এআই, কোমল দক্ষতা ও সুস্থতা পরিমাপের নতুন বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।
- শীর্ষ ২৫টি অবস্থানের ১৮টিই ইউরোপের দেশগুলোর।
- সাধারণ অভিযোজনমূলক দক্ষতা ও উন্মুক্ততায় স্কোর কমে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় থেকে নবম স্থানে নেমেছে; তবে প্রতিভা বিকাশ ও বৃত্তিমূলক দক্ষতায় দেশটি ভালো করেছে।
- ব্যবসায়িক পরিবেশ কম অনুকূল হওয়া ও তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতার মধ্যে চীন ৫৩তম স্থানে নেমেছে।
- দক্ষতার কার্যকর ব্যবহারে ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া ও কয়েকটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ সীমিত উপকরণ কাজে লাগিয়ে ভালো ফল করেছে।
- প্রতিভা ধরে রাখায় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সিঙ্গাপুরের চেয়ে এগিয়ে, তবে অভিযোজনমূলক দক্ষতায় পিছিয়ে।
- জিটিসিআই ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য সহনশীলতা; এতে এআই সক্ষমতা, কোমল দক্ষতা ও কর্মশক্তির সুস্থতার ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।






