টেকসই বিমান জ্বালানির উদ্যোগ জোরদার করছে ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পাম তেলভিত্তিক টেকসই বিমান জ্বালানি বাজারে আনবে তারা। অর্থনৈতিক বিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হারতার্তো এ সময়সীমার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি পেরতামিনা পেলিতা এয়ার, গারুদা ইন্দোনেশিয়া ও সিটিলিংকের সঙ্গে বিমান ও ইঞ্জিনের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য বিমান চলাচলের কার্বন নিঃসরণ কমানো, টেকসই জ্বালানির অভ্যন্তরীণ বাজার গড়ে তোলা এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জেট জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
সূচিপত্র
- টেকসই বিমান জ্বালানির উদ্যোগ জোরদার করছে ইন্দোনেশিয়া
- পাম তেলভিত্তিক SAF কী এবং কীভাবে তৈরি হয়
- HEFA পদ্ধতি যেভাবে কাজ করে
- পরীক্ষামূলক ফ্লাইট থেকে নিয়মিত পরিষেবা
- পাম তেলভিত্তিক জ্বালানি কি বিমান চলাচলের নিঃসরণ কমাতে পারে
- সরবরাহ, উৎপাদনক্ষমতা ও খরচ
- ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে বাণিজ্যিকীকরণ হলে তা কেমন হবে
- পরিবেশগত ও বাণিজ্যিক বাধা
- ইন্দোনেশিয়ার অংশীদারত্ব ও নীতিগত উপকরণ
- বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের জন্য এর অর্থ
- মূল কথা
বিশ্বে পাম তেলের সবচেয়ে বড় উৎপাদক ইন্দোনেশিয়া। এই বিপুল উৎপাদনক্ষমতা কঠোর টেকসই মানদণ্ড নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বালানি তৈরির কাঁচামাল নিশ্চিত করার সুযোগ দিচ্ছে দেশটিকে। আরও বেশি জৈব জ্বালানি, নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের সঙ্গে অংশীদারত্বসহ বৃহত্তর জ্বালানি রূপান্তর কর্মসূচির অংশ এই উদ্যোগ। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিক পরিসরে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, তারপর নির্ধারিত ফ্লাইটে ধীরে ধীরে মিশ্রণের পরিমাণ বাড়ানো।
ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যে একটি প্রাথমিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গারুদা ইন্দোনেশিয়ার একটি বোয়িং ৭৩৭ ৮০০ এনজি উড়োজাহাজ জাকার্তা থেকে সুরাকার্তায় যাত্রী নিয়ে উড়ে যায়। এর আগে ধারাবাহিক ইঞ্জিন গ্রাউন্ড টেস্ট ও একটি বিশেষ পরীক্ষামূলক ফ্লাইটের পর উড়োজাহাজটিতে পাম তেল মেশানো জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ওই পথে ১০০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন। এতে দেখা গেছে, বর্তমান উড়োজাহাজ ও বিমানবন্দর ব্যবস্থায় নিরাপদে এই জ্বালানি ব্যবহার করা সম্ভব।
পাম তেলভিত্তিক SAF কী এবং কীভাবে তৈরি হয়
টেকসই বিমান জ্বালানি হলো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে তৈরি জেট জ্বালানি, যা বিদ্যমান উড়োজাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যবহার করা যায়। অনুমোদিত সীমার মধ্যে মেশালে এটি প্রচলিত জেট এ-১ জ্বালানির মতো একই মানদণ্ড পূরণকারী বিকল্প জেট জ্বালানি হয়ে ওঠে। পার্থক্যটি জীবনচক্রের নিঃসরণে। কাঁচামাল টেকসই হলে এবং ভূমি ব্যবহারের প্রভাব এড়ানো গেলে উৎপাদন থেকে দহন পর্যন্ত মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ জীবাশ্ম জেট জ্বালানির চেয়ে কম হতে পারে।
HEFA পদ্ধতি যেভাবে কাজ করে
প্রাথমিক পর্যায়ের বেশির ভাগ টেকসই বিমান জ্বালানি তৈরি হয় HEFA নামের একটি প্রক্রিয়ায়। এর পূর্ণরূপ হাইড্রোপ্রসেসড এস্টারস অ্যান্ড ফ্যাটি অ্যাসিডস। এ পদ্ধতিতে পাম কার্নেল তেল ও ব্যবহৃত রান্নার তেলের মতো প্রাকৃতিক তেল পরিষ্কার করে উচ্চচাপে হাইড্রোজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করানো হয়, যাতে প্যারাফিনিক জ্বালানি তৈরি হয়। এরপর উড়োজাহাজ ও ইঞ্জিনের কঠোর মানদণ্ড পূরণে সেই জ্বালানি প্রচলিত জেট জ্বালানির সঙ্গে মেশানো হয়।
মধ্য জাভার চিলাচাপ শোধনাগারে এ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন করে পেরতামিনা। কোম্পানিটি কো-প্রসেসিং পদ্ধতিও দেখিয়েছে, যেখানে একই ইউনিটে অল্প পরিমাণ জৈব উৎসের তেল পেট্রোলিয়ামজাত উপাদানের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কোম্পানির বিবৃতিতে চিলাচাপে দৈনিক প্রায় ১,৩৫০ কিলোলিটার সক্ষমতার একটি কো-প্রসেসিং লাইন থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকৃত উৎপাদন নির্ভর করে সময়ের সঙ্গে ইউনিটটি কীভাবে সাজানো ও পরিচালনা করা হয় তার ওপর।
পরীক্ষামূলক ফ্লাইট থেকে নিয়মিত পরিষেবা
বাণিজ্যিক ব্যবহারের লক্ষ্যে ইন্দোনেশিয়া কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২১ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাতা দিরগান্তারা ইন্দোনেশিয়ার তৈরি একটি সিএন ২৩৫ উড়োজাহাজ পাম তেলভিত্তিক মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার করে বান্দুং থেকে জাকার্তা পরীক্ষামূলক ফ্লাইট সম্পন্ন করে। দুই বছর পর গারুদা ইন্দোনেশিয়া একই ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করে যাত্রী নিয়ে জাকার্তা-সুরাকার্তা রুটে উড়ে যায়। ওই ফ্লাইটের আগে প্রযুক্তিবিদেরা ইঞ্জিনের গ্রাউন্ড টেস্ট সম্পন্ন করেন, যাতে কর্মক্ষমতা, নিঃসরণ ও জ্বালানি ব্যবস্থার আচরণ স্বাভাবিক সীমার মধ্যে আছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়।
দেশটির অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল খাতজুড়ে পরীক্ষা সম্প্রসারিত হয়েছে। শোধনাগার থেকে বিমানবন্দরের সংরক্ষণাগার পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা করতে পেরতামিনা পেলিতা এয়ার, গারুদা ইন্দোনেশিয়া এবং স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা সিটিলিংকের সঙ্গে কাজ করেছে। গারুদার কর্মকর্তারা বলেছেন, নিয়মিত পরিচালনায় জ্বালানিটি ব্যবহার উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ও পূর্বানুমানযোগ্য মূল্য।
২০২০ সালের মধ্যে জেট জ্বালানিতে ৩ শতাংশ মিশ্রণের নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ইন্দোনেশিয়া। শিল্প খাত পরীক্ষা ও সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলায় মনোযোগ দেওয়ায় তা বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়। বর্তমান দুই থেকে তিন বছরের বাণিজ্যিকীকরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরুতে সীমিত পরিমাণে নির্বাচিত রুটে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। খরচ ও নির্ভরযোগ্যতার উন্নতি হলে পরে এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত করা হবে।
পাম তেলভিত্তিক জ্বালানি কি বিমান চলাচলের নিঃসরণ কমাতে পারে
টেকসই বিমান জ্বালানির জলবায়ুগত সুফল নির্ধারণে জীবনচক্রভিত্তিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। বন ও পিটভূমি সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা রেখে বিদ্যমান বাগানে পাম তেল উৎপাদন করা হলে এই জ্বালানি জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নিঃসরণ কমাতে পারে। ব্যবহৃত রান্নার তেলের মতো বর্জ্য কাঁচামাল হলে সুফল বাড়ে, কারণ এতে নতুন জমির প্রয়োজন হয় না। প্রধান ঝুঁকি হলো পরোক্ষ ভূমি-ব্যবহার পরিবর্তন, যেখানে নতুন চাহিদার কারণে উচ্চ কার্বনসমৃদ্ধ এলাকায় চাষাবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবেশগত উদ্বেগ বাজারে প্রবেশের সুযোগকে প্রভাবিত করেছে। বন উজাড়ের ঝুঁকির কারণে পরিবহন জ্বালানিতে পাম তেল ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অনেক অঞ্চলের বিমান জ্বালানি ক্রেতারাও শ্রম ও ভূমি ব্যবহারের বিষয় যাচাই করতে টেকসইতার সনদ ও সরবরাহের উৎস শনাক্তের নিয়ম গ্রহণ করছে। ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ মানদণ্ড ও নজরদারির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যে বিমান চলাচলের জ্বালানি এসব প্রত্যাশা পূরণ করে।
দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইট থেকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে টেকসই বিমান জ্বালানিকে প্রধান উপায় হিসেবে দেখছে বিমান সংস্থাগুলো; এ ক্ষেত্রে ব্যাটারি ও হাইড্রোজেন এখনো বাস্তবসম্মত নয়। শিল্প খাতের সংগঠনগুলোর হিসাব, নিট শূন্য নিঃসরণের লক্ষ্য পূরণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিমান চলাচলে বছরে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন লিটার টেকসই জ্বালানি প্রয়োজন হবে। বর্তমান উৎপাদনের তুলনায় এ পরিমাণ অনেক বেশি। অর্থাৎ কৃষি অবশিষ্টাংশ, পৌর বর্জ্য এবং সবুজ হাইড্রোজেন ও সংগৃহীত কার্বন থেকে তৈরি পাওয়ার-টু-লিকুইড জ্বালানিসহ নানা কাঁচামাল ও প্রযুক্তি দরকার হবে।
সরবরাহ, উৎপাদনক্ষমতা ও খরচ
সরবরাহ বাড়ানো প্রকৌশলগত ও সরবরাহ-ব্যবস্থাপনার—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ। পেরতামিনা চিলাচাপে উৎপাদন শুরু করেছে এবং ব্যবহৃত রান্নার তেল থেকে বিমান জ্বালানি তৈরির উদ্যোগ সম্প্রসারণ করছে। রিয়াউয়ের দুমাই ও পশ্চিম জাভার বালোগানে প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বাগান বা সংগ্রাহক থেকে শোধনাগার, তারপর বিমানবন্দরের ট্যাংক পর্যন্ত সরবরাহের নির্ভরযোগ্য হেফাজত-শৃঙ্খল গড়ে তোলা জরুরি, যাতে ক্রেতারা টেকসইতার দাবি যাচাই করতে পারেন।
খরচই এখনো সবচেয়ে বড় বাধা। অঞ্চল ও উৎপাদনপদ্ধতি অনুযায়ী, টেকসই বিমান জ্বালানির দাম বর্তমানে প্রায়ই প্রচলিত জেট জ্বালানির দামের দুই থেকে পাঁচ গুণ। বাধ্যতামূলক মিশ্রণের নিয়ম, কর রেয়াত, ক্রয়চুক্তি এবং বুক-অ্যান্ড-ক্লেইম সনদের সমন্বয়ে বিমান সংস্থাগুলো এ ব্যবধান কমাতে পারে। বুক-অ্যান্ড-ক্লেইম সনদের মাধ্যমে এক জায়গার ক্রেতা অন্য জায়গায় উৎপাদিত ও ব্যবহৃত জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। CORSIA-এর মতো আন্তর্জাতিক কর্মসূচি নিঃসরণ বৃদ্ধির ক্ষতিপূরণ দিতে বিমান সংস্থাগুলোকে বাধ্য করে কম কার্বনযুক্ত জ্বালানির চাহিদা তৈরি করে।
বিনিয়োগ দ্রুত আনতেও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব কাজে লাগাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি কাঠামোর আওতায় জাকার্তা ও টোকিও জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের সঙ্গে টেকসই বিমান জ্বালানিসহ একগুচ্ছ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা SAF-কে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বলে বিবেচিত প্রকল্পগুলোর দলে রেখেছেন। এতে বোঝা যায়, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তারা আশাবাদী।
২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে বাণিজ্যিকীকরণ হলে তা কেমন হবে
বাস্তবসম্মতভাবে চালু হলে জাকার্তা ও সুরাবায়ার মতো বড় কেন্দ্র থেকে বেছে নেওয়া রুটে শুরু হবে পরিষেবা। পেরতামিনার শোধনাগার থেকে নির্দিষ্ট বিরতিতে জ্বালানির চালান সরবরাহ করা হবে। বিমান সংস্থাগুলো কয়েক বছরের জন্য পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণী সূত্র স্থির করে ক্রয়চুক্তি করবে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলাররা সনদপ্রাপ্ত মাত্রায় জ্বালানি মিশিয়ে মান নিয়ন্ত্রণ করবেন। বিমান সংস্থাগুলো তাদের টেকসইতা প্রতিবেদন ও করপোরেট গ্রাহকদের জন্য নিঃসরণ হ্রাসের হিসাব রাখবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে উৎপাদকদের জেট জ্বালানির বিকল্পগুলোর জন্য নির্ধারিত ASTM মানদণ্ড অনুযায়ী জ্বালানির গুণমান বজায় রাখতে হবে। বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রকেরা নিরাপত্তা অনুমোদন তদারক করবেন। ইঞ্জিন নির্মাতারাও নিয়মিত পরীক্ষা চালিয়ে নিশ্চিত করবেন, কর্মক্ষমতা ও রক্ষণাবেক্ষণের সময়সূচিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। জ্বালানিটি প্রচলিত জ্বালানির সরাসরি বিকল্প হওয়ায় পাইলট ও যাত্রীরা পরিচালনাগত কোনো পার্থক্য বুঝতে পারবেন না।
প্রাথমিক পর্যায়ে চাহিদা নিশ্চিত করতে সরকার সীমিত মাত্রায় মিশ্রণের বাধ্যবাধকতা আবার চালু করতে পারে। দামের ব্যবধান কমাতে এর সঙ্গে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হতে পারে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে বিমান সংস্থাগুলো নির্বাচিত ফ্লাইটে মাঝে মাঝে ব্যবহার থেকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের কিছু অংশে নিয়মিত ব্যবহারের দিকে এগোতে পারবে।
পরিবেশগত ও বাণিজ্যিক বাধা
এ পথে ঝুঁকিও রয়েছে। ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগকারী বিমান সংস্থাগুলো কাঁচামালের টেকসইতা নিয়ে কঠোর নিয়মের মুখে পড়ে। ওই বাজারে সনদের সুবিধা পাওয়া যায় না—এমন জ্বালানি ব্যবহার করতে তারা দ্বিধা করতে পারে। কিছু দেশে পাম তেল নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগও প্রবল। ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদকদের দেখাতে হবে, বিমান চলাচলে জ্বালানির চাহিদা যেন নতুন করে বন উজাড়ের কারণ না হয়, শ্রমমান যেন মানা হয় এবং বিদ্যমান জমিতে উৎপাদন বাড়লে ক্ষুদ্র চাষিরাও যেন উপকৃত হন।
শিল্প খাতের নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক পরীক্ষামূলক ফ্লাইটগুলো বাস্তব অগ্রগতির প্রমাণ। পেরতামিনার সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিলাং পেরতামিনা ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক তৌফিক আদিত্যওয়ারমান বলেছেন, ব্যবহৃত রান্নার তেলের কর্মসূচি এবং এর আগে পাম কার্নেল তেল দিয়ে চালানো পরীক্ষা প্রমাণ করে যে দেশে টেকসই জ্বালানি তৈরি সম্ভব। তাঁর ভাষ্য, ২০২১ সালের সিএন ২৩৫ ফ্লাইট ও ২০২৩ সালের গারুদা ফ্লাইটসহ জনসমক্ষে চালানো দুটি পরীক্ষা ধারণাটিকে পরীক্ষাগার থেকে রানওয়েতে নিয়ে এসেছে।
এই USAF প্রকল্পটি টেকসই ও কম কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানির পোর্টফোলিও গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রমাণ।' তিনি আরও বলেন, 'দুটি পরীক্ষা প্রমাণ করেছে যে উদ্ভিদভিত্তিক বিমান জ্বালানি আর নিছক ধারণা নয়। এটি এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
একই সময়ে পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো আরও জোরালো সুরক্ষাব্যবস্থার আহ্বান জানাচ্ছে। RSPO-এর মতো স্বাধীন সনদ ও জাতীয় ISPO মানদণ্ড, ভূমির আচ্ছাদন পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইটের ব্যবহার এবং স্বচ্ছ মিল-পর্যায়ের প্রতিবেদন ক্রেতাদের আশ্বস্ত করতে পারে যে টেকসই বিমান জ্বালানির জলবায়ুগত সুফল বাস্তব। ব্যবহৃত রান্নার তেলের মতো কাঁচামালের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও রপ্তানি চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করতে হবে।
ইন্দোনেশিয়ার অংশীদারত্ব ও নীতিগত উপকরণ
জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা ব্যবহৃত রান্নার তেলকে সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হিসেবে তুলে ধরেছেন, কারণ এটি বর্জ্য এবং এর জন্য ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে হয় না। তাঁদের ভাষ্য, বর্তমানে সংগৃহীত তেলের বড় অংশ রপ্তানি হয়। উৎপাদনকেন্দ্রগুলো সম্প্রসারিত হলে এর আরও বেশি অংশ দেশে ব্যবহারের পরিকল্পনা জাকার্তার। বোয়িং ৭৩৭ ৮০০ বহরে ব্যবহৃত CFM56 7B ইঞ্জিনেও পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যা দৈনন্দিন পরিচালনা নিয়ে আস্থা বাড়ায়।
কর্মকর্তারা বলেছেন, বালি এয়ার শোর মতো অনুষ্ঠানে অগ্রগতি তুলে ধরার লক্ষ্য রয়েছে দেশটির। প্রচারের বাইরেও নীতিগত সহায়তার মধ্যে উৎপাদকদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা, টেকসইতা সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং অ্যালকোহল-টু-জেট ও পাওয়ার-টু-লিকুইড সিনথেটিক কেরোসিনের মতো বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় সহায়তা থাকতে পারে। নতুন উৎপাদনক্ষমতা কোথায় গড়ে তুলবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিটি পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাবে।
বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের জন্য এর অর্থ
যাত্রীদের কাছে টেকসই জ্বালানির মিশ্রণ ব্যবহার করা ফ্লাইট অন্য যেকোনো ভ্রমণের মতোই মনে হবে। নিরাপত্তা পদ্ধতি বা ফ্লাইটের কর্মক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন হবে না। পার্থক্য থাকবে জ্বালানি সরবরাহ-শৃঙ্খলে এবং অগ্রগতি পরিমাপের জন্য বিমান সংস্থাগুলোর নিঃসরণ হিসাবের পদ্ধতিতে।
স্বল্প মেয়াদে কম কার্বনযুক্ত জ্বালানির বেশি খরচের কিছুটা ভাড়ায় প্রতিফলিত হতে পারে। বিমান সংস্থাগুলো প্রায়ই সনদভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে করপোরেট গ্রাহকদের ওপর অথবা নির্দিষ্ট পরিবেশবান্ধব ভাড়ায় সেই খরচ চাপায়। সরকার প্রণোদনা দিয়ে এর প্রভাব কমাতে পারে। সময়ের সঙ্গে নতুন শোধনাগার, উন্নত উৎপাদনহার ও উৎপাদকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা দামের ব্যবধান কমাতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার বিমান চলাচল খাতে নির্ভরযোগ্য অভ্যন্তরীণ সরবরাহ থাকলে বহর নবায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিমান সংস্থাগুলো সহায়তা পাবে। বৈশ্বিক বাজারে ইন্দোনেশিয়ার নতুন সরবরাহ জলবায়ু লক্ষ্যে পৌঁছাতে নানা উৎসের জ্বালানি দরকার—এমন একটি খাতে আরেকটি বিকল্প যোগ করবে।
মূল কথা
- আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পাম তেলভিত্তিক টেকসই বিমান জ্বালানি বাণিজ্যিকভাবে চালুর লক্ষ্য নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া।
- পেরতামিনা পেলিতা এয়ার, গারুদা ইন্দোনেশিয়া ও সিটিলিংকের সঙ্গে পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে পাম তেল মেশানো জ্বালানিতে যাত্রী নিয়ে গারুদার ফ্লাইটও রয়েছে।
- চিলাচাপ শোধনাগারে পাম কার্নেল তেল ও ব্যবহৃত রান্নার তেল থেকে HEFA পদ্ধতিতে জ্বালানি তৈরি হয়। সেখানে দৈনিক প্রায় ১,৩৫০ কিলোলিটার সক্ষমতার একটি কো-প্রসেসিং লাইন থাকার কথা জানানো হয়েছে।
- ২০২০ সালের জন্য নির্ধারিত জেট জ্বালানিতে ৩ শতাংশ মিশ্রণের আগের লক্ষ্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নতুন পর্যায়ে নির্বাচিত রুট ও সীমিত পরিমাণে জ্বালানি দিয়ে শুরু হতে পারে।
- জীবনচক্রে নিঃসরণ কমার সুফল কাঁচামাল ও ভূমি ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। বন উজাড়ের উদ্বেগে পাম তেলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
- AZEC কাঠামোর আওতায় জাপানের সঙ্গে কাজ করছে ইন্দোনেশিয়া। পেরতামিনা দুমাই ও বালোগানে উদ্যোগ সম্প্রসারণ করছে।
- বিমান সংস্থাগুলো কত দ্রুত এ জ্বালানি গ্রহণ করবে, তা নির্ভর করবে মূল্য সহায়তা, ক্রয়চুক্তি ও সনদব্যবস্থার ওপর।
- বিশেষজ্ঞদের হিসাব, নিট শূন্য নিঃসরণের লক্ষ্য পূরণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিমান চলাচলে বছরে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন লিটার টেকসই জ্বালানি দরকার হবে।






