টোকিও ও বেইজিংয়ে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু
তাইওয়ানকে ঘিরে এমন কোনো সংকট, যাতে যুদ্ধজাহাজ ও শক্তি প্রয়োগ জড়িত, জাপানের জন্য অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে—প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ কথা বলার পর বেইজিংয়ে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে চীন। এ নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে তীব্র বক্তব্য, কূটনৈতিক প্রতিবাদ ও প্রকাশ্য হুমকি বিনিময় হয়েছে। এ ঘটনা এশিয়ার দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে তাইওয়ান ইস্যুর স্পর্শকাতরতা এবং দীর্ঘদিনের জটিল ইতিহাসকে সামনে এনেছে।
সূচিপত্র
- টোকিও ও বেইজিংয়ে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু
- তাকাইচি কী বলেছেন এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
- জাপানের ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইন
- চীনের প্রতিক্রিয়া ও ওসাকায় কনসালের পোস্ট
- জাপানের আইনি ও কৌশলগত হিসাব
- জাপানের নিরাপত্তার জন্য তাইওয়ান কেন গুরুত্বপূর্ণ
- তাইওয়ানের অবস্থান ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
- বর্তমান পরিস্থিতিকে এখনো প্রভাবিত করে ইতিহাস
- ভুল হিসাব ও সামরিক পরিস্থিতির ঝুঁকি
- নিরাপত্তা-সংক্রান্ত টানাপোড়েনের বিপরীতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক
- কূটনীতিতে এরপর কী
- মূল বিষয়গুলো
টোকিও ও বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে। তাকাইচির মন্তব্যকে চীন তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্থূল হস্তক্ষেপ বলে নিন্দা করেছে এবং তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। জাপান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পাশাপাশি তারা আবারও বলেছে, তাইওয়ান প্রণালিসংক্রান্ত সব বিষয় সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা উচিত। ওসাকায় চীনের কনসাল জেনারেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি বার্তা পোস্ট করার পর কথার লড়াই আরও বেড়ে যায়, যেটিকে জাপানি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দেখেছেন। পরে পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
তাকাইচি তার অবস্থানকে বিদ্যমান নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমর্থন জানালেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় আরও সতর্ক থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। চীনা কর্মকর্তারা আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। এক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যকে অত্যন্ত ভুল ও বিপজ্জনক বলেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান সংঘাতে জাপানের অংশগ্রহণকে আগ্রাসন হিসেবে দেখা হবে। দুই দেশের কূটনৈতিক দূরত্ব এখনো অনেক।
তাকাইচি কী বলেছেন এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
টোকিওতে সংসদীয় অধিবেশনে বিরোধী দলের এক আইনপ্রণেতা তাকাইচিকে প্রশ্ন করেন, তাইওয়ানকে ঘিরে কী ধরনের পরিস্থিতি অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ অবস্থার সীমায় পড়তে পারে। তাকাইচি জবাবে বলেন, সামরিক জাহাজ ও শক্তি প্রয়োগ করা হলে জাপান এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। এই শব্দবন্ধটি জাপানের ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইনে অন্তর্ভুক্ত একটি আইনি পরিভাষা। কোনো ঘনিষ্ঠ অংশীদারের ওপর সশস্ত্র হামলা জাপানের অস্তিত্ব ও নাগরিকদের অধিকারকে হুমকির মুখে ফেললে এটি আত্মরক্ষা বাহিনীকে (এসডিএফ) সীমিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেয়।
জাপানের ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইন
জাপানের যুদ্ধোত্তর সংবিধানে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে শক্তি প্রয়োগ বর্জনের কথা বলা হয়েছে। ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইন সেই নীতি পরিত্যাগ করেনি। তবে তিনটি কঠোর শর্ত পূরণ হলে সম্মিলিত আত্মরক্ষার জন্য সীমিত সুযোগ তৈরি করেছে। পরিস্থিতিটি জাপানের অস্তিত্ব ও নাগরিকদের অধিকারকে হুমকিতে ফেলতে হবে। বিপদ দূর করার অন্য কোনো উপযুক্ত উপায় থাকা চলবে না। যেকোনো পদক্ষেপ জাপানকে রক্ষার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সীমার মধ্যে থাকতে হবে। বাস্তবে এর অর্থ হতে পারে সমুদ্রপথ পাহারা দেওয়া, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানে রসদ সহায়তা, কিংবা জাপানের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ ও উড়োজাহাজ সুরক্ষা। এই পদক্ষেপ নেওয়ার মানদণ্ড ইচ্ছাকৃতভাবেই কঠোর রাখা হয়েছে; এতে মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং সংসদকে অবহিত করা প্রয়োজন হবে।
আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বক্তব্যে তাকাইচি তার মন্তব্যকে ওই আইনি প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সরকারি অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির কথা বলছিলেন। কোন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম হতে পারে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণও দেন তিনি।
তাকাইচি বলেন: "যদি যুদ্ধজাহাজ থাকে এবং শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।"
চীনের প্রতিক্রিয়া ও ওসাকায় কনসালের পোস্ট
দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং। চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইদং আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে এবং মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানাতে জাপানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন। তিনি তাকাইচির অবস্থানকে অত্যন্ত ভুল ও বিপজ্জনক বলে বর্ণনা করেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলে, তাইওয়ান সংকটে জাপানের হস্তক্ষেপকে বৈরী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে। কর্মকর্তারা আরও বলেন, জাপান এমন অবস্থান অব্যাহত রাখলে তার পরিণতি তাকে বহন করতে হবে।
সানের বার্তায় বোঝা যায়, তাইওয়ানের পক্ষে মিত্রদের সহায়তার সম্ভাবনাকে বেইজিং কতটা গুরুতরভাবে দেখে। চীনের সতর্কবার্তায় টোকিওর বক্তব্যকে নিছক কাল্পনিক আইনি বিশ্লেষণ হিসেবে নয়, বরং দ্বীপটির ওপর চীনের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মন্তব্যগুলোকে "অত্যন্ত ভুল ও বিপজ্জনক" বলার পর উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সান জাপানকে সেগুলো প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছে। মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, তাইওয়ান প্রণালির সংঘাতে জাপান অংশ নিতে গেলে তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
লিন বলেন: "তাইওয়ান প্রণালির পরিস্থিতিতে জাপান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করলে তা আগ্রাসনের শামিল হবে এবং চীন দৃঢ়ভাবে পাল্টা জবাব দেবে।"
বাগ্যুদ্ধ তীব্র হওয়ার মধ্যে ওসাকায় চীনের কনসাল জেনারেল শুয়ে জিয়ানের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট উত্তেজনায় ইন্ধন জোগায়। তাকাইচির মন্তব্য নিয়ে একটি সংবাদ পুনঃপ্রচার করে পোস্টটিতে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়, যেটিকে টোকিওর অনেকেই সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখেছেন। জাপান প্রতিবাদ জানানোর পর পোস্টটি মুছে ফেলা হয়।
জাপানের ভূমিকার প্রসঙ্গে শুয়ে লেখেন: "যে নোংরা মাথা নিজেকে এর মধ্যে ঢোকায়, সেটি কেটে ফেলতে হবে।"
জাপানের মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা ওই বার্তাকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন এবং জানান, বেইজিংয়ের কাছে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে টোকিও।
কিহারা বলেন, পোস্টটি ছিল "অত্যন্ত অনুপযুক্ত"।
জাপানের আইনি ও কৌশলগত হিসাব
টোকিওর এই বিতর্ক দূর ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণ নিয়ে কোনো বিমূর্ত প্রশ্ন নয়। তাইওয়ান জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোর কাছে অবস্থিত। এর মধ্যে সবচেয়ে কাছের ইয়োনাগুনি তাইওয়ানের উপকূল থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটারের কিছু বেশি দূরে। তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাত জাপানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনকারী সমুদ্রপথ ব্যাহত করতে পারে। ওকিনাওয়ায় মোতায়েন মার্কিন বাহিনী যেকোনো আঞ্চলিক সংকটে সম্ভবত কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো জরুরি পরিস্থিতি জাপানের নিরাপত্তার জন্য কী অর্থ বহন করবে, তা নিয়ে জাপানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।
তাকাইচির অবস্থান দেশে পরিবর্তনশীল রাজনীতিরও প্রতিফলন। চীনের প্রতি কঠোর অবস্থানের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অধীনে কাটানো বছরগুলোতে এই অবস্থান আরও গড়ে ওঠে। আবে এসডিএফের বৃহত্তর ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের পক্ষে ছিলেন। পরপর কয়েকটি সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার বাইরে থেকে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র, পাল্টা হামলার সক্ষমতা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘাঁটিগুলোর সহনশীলতা বাড়াতে বিনিয়োগ করেছে। চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণসহ কঠিনতর নিরাপত্তা পরিস্থিতির জবাব হিসেবে মন্ত্রিসভা এসব পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিয়েছে।
জাপানের নিরাপত্তার জন্য তাইওয়ান কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভৌগোলিক অবস্থানের বাইরেও তাইওয়ান বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। উন্নত প্রযুক্তি ও উপকরণের ক্ষেত্রে জাপান ও তাইওয়ানের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তাইওয়ান প্রণালিতে বড় ধরনের বিঘ্ন জাপানের নির্ভরশীল উৎপাদন, জাহাজ চলাচল, বিমা ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলবে। এটি যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোটের সক্ষমতারও পরীক্ষা নেবে; এই জোটের পরিকল্পনায় রসদ, নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রে জাপানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। এসব সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে, কেন জাপানি নেতারা কখনো কখনো বলেন, তাইওয়ানের জরুরি পরিস্থিতি জাপানেরও জরুরি পরিস্থিতিতে পরিণত হতে পারে।
তাইওয়ানের অবস্থান ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে তাইওয়ান বলে, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ কেবল সেখানকার মানুষই নির্ধারণ করতে পারে। চীনা কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক মন্তব্যের হুমকিমূলক ভাষার সমালোচনা করেছে তাইপে এবং সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন’ নীতি অনুসরণ করে এবং আইনগতভাবে তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; দ্বীপটির কাছে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি। টোকিওতে নিযুক্ত ওয়াশিংটনের দূত চীনা কনসালের হুমকিমূলক ভাষার সমালোচনা করেছেন। জাপানও আবার বলেছে, তারা তাইওয়ানকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, তবে স্থিতাবস্থায় একতরফা পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়।
এই অবস্থানগুলো কয়েক দশকের সতর্ক ভারসাম্যের প্রতিফলন। চীন তার ‘এক চীন’ নীতিতে অটল, যেখানে তাইওয়ানকে চীনের অংশ বলে দাবি করা হয়। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশ ‘এক চীন’ নীতি অনুসরণ করে। এই নীতি বেইজিংয়ের অবস্থানকে সমর্থন না করেই স্বীকার করে, বেইজিংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তাইপের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের সুযোগ দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিকে এখনো প্রভাবিত করে ইতিহাস
চীন-জাপান সম্পর্কের ওপর ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রভাব গভীর। প্রথম ও দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ, চীনের বিভিন্ন অংশে জাপানের দখলদারত্ব এবং যুদ্ধকালীন নৃশংসতার স্মৃতি এখনো তাজা। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু দুই দেশের জনমত জরিপে প্রায়ই নেতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। পূর্ব চীন সাগরের সেনকাকু বা দিয়াওয়ু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিশেষ করে আঞ্চলিক বিরোধ মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দেয়। অতীতের সংঘাত নিয়ে চীনা কর্মকর্তাদের উল্লেখ কিংবা জাপান হস্তক্ষেপ করলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে—এমন সতর্কবার্তা বর্তমান হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সেই অতীতকেও প্রতিফলিত করে।
তা সত্ত্বেও দুই দেশের সরকারই স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি এশিয়া-প্যাসিফিক শীর্ষ সম্মেলনে দুই দেশের নেতারা বৈঠক করেন এবং আরও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। তাকাইচির মন্তব্য ঘিরে নতুন বিরোধ দেখিয়ে দিয়েছে, আলোচনার কেন্দ্রে তাইওয়ান এলে সেই লক্ষ্য কত দ্রুত আড়ালে চলে যেতে পারে।
ভুল হিসাব ও সামরিক পরিস্থিতির ঝুঁকি
ভবিষ্যতে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরীক্ষা হয়তো আকস্মিক আক্রমণ হবে না। চীনা বাহিনী বছরের পর বছর ধরে তাইওয়ানকে ঘিরে ‘গ্রে জোন’ কৌশল ব্যবহার করেছে; এর মধ্যে রয়েছে দ্বীপটির আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলের কাছে উড্ডয়ন এবং আশপাশের জলসীমায় নৌ টহল। অবরোধ, সাইবার হামলা বা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আগেই সংকট তৈরি হতে পারে। এসবের যেকোনোটি দক্ষিণাঞ্চলে জাপানের জাহাজ চলাচল, আকাশপথ ও ঘাঁটিগুলোকে হুমকিতে ফেলতে পারে।
মন্ত্রিসভা যদি মনে করে এমন সংকট অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতির মানদণ্ড পূরণ করেছে, তবে জাপান সহায়তামূলক অভিযানের অনুমোদন দিতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে জাহাজ পাহারা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা। আইন অনুযায়ী জাপানের সরাসরি যুদ্ধ অভিযান সীমাবদ্ধই থাকবে। এমনকি রসদ সহায়তাও জাপানের ভূখণ্ডকে পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ভুল হিসাবের সম্ভাবনা কমাতে টোকিও ও ওয়াশিংটন—দুই পক্ষই সুরক্ষিত স্থাপনা, সম্পদ ছড়িয়ে মোতায়েন এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে উন্নত সংকট-যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছে।
নিরাপত্তা-সংক্রান্ত টানাপোড়েনের বিপরীতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক
জাপান ও চীন অর্থনৈতিকভাবে এখনো গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। সরবরাহ শৃঙ্খল ইলেকট্রনিকস, গাড়ি ও ভোগ্যপণ্য খাতকে একসূত্রে বেঁধেছে। পর্যটন ও শিক্ষাসংযোগ দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিনিময়কে জোরদার করেছে। একই সময়ে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত টানাপোড়েন বেড়েছে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কোম্পানিগুলো উদ্বিগ্ন। বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ যে পথে চলাচল করে, সেই তাইওয়ান প্রণালির ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে বিমা ও জাহাজ পরিবহন সংস্থাগুলো। জাপান ও তাইওয়ানের মধ্যেও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য রয়েছে, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও উপকরণের ক্ষেত্রে; দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলার। দীর্ঘস্থায়ী যেকোনো সংকট পুরো অঞ্চলের কারখানা ও বাজারে প্রভাব ফেলবে।
টোকিওর নীতিনির্ধারকেরা সরবরাহ শৃঙ্খল বহুমুখী করে এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মজুত গড়ে তুলে সংকটের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করেছেন। তারা দেশে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ দিয়েছেন এবং মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শ বাড়িয়েছেন। এসব পদক্ষেপের কোনোটি তাইওয়ান সংকট তীব্র হলে জাপানের সামনে থাকা মূল দ্বিধা দূর করতে পারে না। সংঘাত এড়াতে চাইলেও ভৌগোলিক অবস্থান ও জোটের অঙ্গীকার জাপানকে এই সমস্যার আরও কাছে টেনে আনে।
কূটনীতিতে এরপর কী
নিকট ভবিষ্যতে দুই রাজধানী আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ বিনিময় চালিয়ে যেতে পারে, তবে বিরোধ যাতে বাণিজ্য বা কনস্যুলার কার্যক্রমে ছড়িয়ে না পড়ে, সে চেষ্টা করবে। ওসাকায় চীনা কনসালের মুছে ফেলা পোস্টটির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে এবং জাপানি নেতাদের হুমকি দেয় এমন ভাষা এড়াতে বেইজিংকে অনুরোধ করেছে টোকিও। বেইজিং মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে এবং তাইওয়ান-সম্পর্কিত অভিযানে জাপান অংশ নিলে পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করছে। তাকাইচি তার অবস্থানে অনড় থেকে বলেছেন, জাপানের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। শক্তি প্রয়োগের যেকোনো সিদ্ধান্ত আইন ও পরিস্থিতির সীমার মধ্যে থাকবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
দুই পক্ষের মধ্যে নীরব যোগাযোগের পথ উত্তেজনা বাড়তে না দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। আপাতত দুই পক্ষের সীমারেখা যথেষ্ট স্পষ্ট। জাপান প্রণালিজুড়ে শান্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী জোট চায়। চীন তাইওয়ানে যেকোনো বহিঃশক্তির ভূমিকাকে সার্বভৌমত্বের বিষয় হিসেবে দেখে। সমুদ্র বা আকাশপথে ঘটনা এড়ানোর এবং বাণিজ্য সচল রাখার কার্যকর উপায় খুঁজে বের করাই আগামী কয়েক সপ্তাহে দুই সরকারের জন্য পরীক্ষা হবে।
মূল বিষয়গুলো
- যুদ্ধজাহাজ ও শক্তি প্রয়োগ জড়িত তাইওয়ান সংকট জাপানের অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি মন্তব্য করার পর জাপানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে চীন।
- জাপানের ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইনে কঠোর শর্তসাপেক্ষে জাপানকে রক্ষায় অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতিতে সীমিত সম্মিলিত আত্মরক্ষার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
- বেইজিং মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে এবং সতর্ক করেছে, তাইওয়ান সংঘাতে জাপানের অংশগ্রহণকে আগ্রাসন হিসেবে দেখা হবে; তারা দৃঢ় জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
- ওসাকায় চীনের কনসাল জেনারেল হুমকিমূলক একটি বার্তা পোস্ট করার পর তা মুছে দেন; এ ঘটনায় টোকিও প্রতিবাদ জানায়।
- জাপান বলেছে, তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং তাইওয়ান প্রণালিসংক্রান্ত বিষয় সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে তারা আবারও মত দিয়েছে।
- তাইওয়ান দ্বীপটির ওপর বেইজিংয়ের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের ভবিষ্যৎ সেখানকার মানুষই নির্ধারণ করবে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে সমর্থন করে।
- ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও আঞ্চলিক বিরোধ বিষয়টিকে স্পর্শকাতর করে তুলেছে; জাপানের কাছাকাছি তাইওয়ানের অবস্থান সরাসরি নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করে।
- নিরাপত্তা-সংক্রান্ত টানাপোড়েন বাড়লেও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা যেকোনো সংকটের মূল্য বাড়িয়ে দেয়।






