চাপে উপকূল
মধ্য জাভার ডেমাক রিজেন্সির শিল্পাঞ্চল সায়ুংয়ে এক শান্ত বিকেলে কারখানার একটানা গুঞ্জন মিলিয়ে গেছে কংক্রিটে সমুদ্রের পানির ছলাৎছল শব্দে। মরিচা ধরা ফটক, বন্ধ দোকান আর হাঁটুসমান পানিতে ডোবা গলিগুলো এমন এক উপকূলের গল্প বলে, যা ক্রমে হারাচ্ছে তার ভূমি। জোয়ার এখন নিয়মমাফিক আসে, রাস্তার ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তারপর সরে গিয়ে পরদিন আবার ফিরে আসে। অনেক পরিবারের কাছে দেয়াল মেরামত আর মেঝে উঁচু করা এখন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ।
সূচিপত্র
তাদেরই একজন মুহাম্মদ খারিস, ৫২, ডেমাকের আজীবন বাসিন্দা। তিনি বলেন, আগে বন্যা মৌসুমি ছিল, কিন্তু বছর পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে তা ঘন ঘন হচ্ছে এবং পানিও বাড়ছে।
মনে হয় প্রতিদিন সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করছি। শুধু টিকে থাকতেই টাকা খরচ করতে হয়। আমরা থামলেই পানি সব দখল করে নেয়।
শুধু ডেমাকেই গত এক দশকে তিনটি গ্রাম হারিয়ে গেছে; গত বছর একটি জনবসতি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ১০০টিরও বেশি পরিবারকে ভেতরের দিকে সরে যেতে হয়েছে। জাভার উত্তর উপকূলজুড়ে জোয়ারের বন্যা ও ভূমি দেবে যাওয়ায় কর্মশালা আর বাড়িঘর জোয়ারের পানির পুকুরে পরিণত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া সরকার বলছে, এই অর্থনৈতিক করিডর সচল রাখার একমাত্র উপায় হলো উপকূলজুড়ে অবিচ্ছিন্ন প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা।
পরিকল্পনাটি হলো শত শত কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত একটি বিশাল সমুদ্রপ্রাচীর। এর লক্ষ্য, লাখ লাখ মানুষ এবং জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি বন্দর, শিল্প ও লজিস্টিকস কেন্দ্রগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া। উপকূলে ভূমি দেবে যাওয়ার কারণগুলো মোকাবিলায় দেশটির প্রচেষ্টার পাশাপাশি জাভা সাগরের পানি ঠেকিয়ে রাখারও চেষ্টা এটি।
প্রকল্পের লক্ষ্য
জাতীয় পরিকল্পনায় জাভার উত্তর উপকূল বরাবর একটি প্রতিরোধক নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, যা পশ্চিমে বানতেন থেকে পূর্ব জাভার গ্রেসিক পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি একটানা কোনো একক দেয়াল হবে না। বরং উঁচু বাঁধ, উন্নত উপকূলীয় সড়ক, জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণের ফটক, পাম্প স্টেশন এবং নদী ও নিষ্কাশনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত শক্তিশালী বাঁধসহ প্রকৌশলভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি শৃঙ্খল হবে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, অর্থনৈতিক সম্পদ ও স্থানীয় ভূতত্ত্বের ওপর নির্ভর করে স্থানভেদে নকশা বদলাবে।
পরিসর ও সময়সীমা
কর্মকর্তারা এর দৈর্ঘ্য অন্তত ৫০০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও কিছু পরিকল্পনা নথিতে প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের কথা বলা হয়েছে। আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে কয়েক ধাপে নির্মাণকাজ চলবে। সরকারি পরিকল্পনাকারীরা বলছেন, উত্তর উপকূলের বন্যাপ্রবণ জেলাগুলোতে বসবাস ও কর্মরত প্রায় ২ কোটি মানুষকে সুরক্ষা দেওয়াই এই প্রতিরোধক নির্মাণের উদ্দেশ্য।
জাকার্তা উপসাগর এলাকার অংশটি প্রথম বড় ধাপ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। এ অংশের জন্য প্রেসিডেন্সি ৮ বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেটের কথা বলেছে। নির্মাণ ও চালু করতে আনুমানিক আট থেকে ১০ বছর লাগবে।
প্রথমে যেখানে নির্মাণ হবে
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে জাকার্তা উপসাগর, মধ্য জাভার সেমারাং, পেকালংগান ও ব্রেবেসের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা এবং এমন অন্যান্য উপকূলীয় এলাকা, যেখানে মাসে কয়েকবার জোয়ারের বন্যায় পাড়া-মহল্লা ডুবে যায়। দেয়ালের পেছনে পানি জমে যাওয়া ঠেকাতে প্রতিটি অংশকে বিদ্যমান নদীর বাঁধ ও নগর নিষ্কাশনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্য জাভায় সেমারাং থেকে ডেমাক পর্যন্ত অংশটি একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ একই সঙ্গে টোল সড়ক হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। ২০২৩ সালে কাজ শুরু হয়, আর অক্টোবরের শুরুতে প্রকল্পটির প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নকশাটি দুর্গের মতো, অন্যদিকে কম জনবসতিপূর্ণ প্রান্তে ম্যানগ্রোভ বেষ্টনী ও পেছনের দিকে নির্ধারিত সুরক্ষিত এলাকার মতো তুলনামূলক কোমল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
জাভার কিছু এলাকা কেন দেবে যাচ্ছে
জাভার উত্তর উপকূল একই সঙ্গে দুটি শক্তির মুখে—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ভূমি দেবে যাওয়া। উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের পানি প্রসারিত হওয়া এবং স্থলভাগের বরফ গলে যাওয়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ। আর উপকূলে মানুষের কর্মকাণ্ডে ভূমি দেবে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় পূরণ হওয়ার চেয়ে দ্রুত পানি তোলা হলে শহর ও কারখানার নিচের নরম এঁটেল মাটির স্তর চাপে সংকুচিত হয়। ধীরে ধীরে বসে যায় সড়ক, পাইপ ও ভবনের ভিত্তি। একসময় জোয়ারের পানির ঠিক ওপরে থাকা নিচু এলাকাগুলো পানির স্তরের নিচে চলে যায়।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা জানিয়েছে, ১৯৯২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দ্বীপপুঞ্জটির আশপাশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে প্রায় ৪.২৫ মিলিমিটার বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ বৃদ্ধির গতি বাড়ার লক্ষণও দেখা গেছে। উত্তর জাভার কিছু এলাকায় ভূমি দেবে যাওয়ার গতি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি। জরিপে কয়েকটি পাড়ায় ভূমির পৃষ্ঠে মোট কয়েক দশক সেন্টিমিটার পর্যন্ত অবনমন পাওয়া গেছে; সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় তা দুই মিটার পর্যন্ত, যা বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
উপকূলজুড়ে কেন্দ্রীভূত দ্রুত নগরায়ণ ও পানিনির্ভর শিল্পকারখানা দীর্ঘদিন ধরে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। অনেক শহরে নির্ভরযোগ্য চাপে পাইপের পানির নেটওয়ার্ক এখনো প্রতিটি এলাকায় পৌঁছায়নি, তাই পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প হিসেবে পানি তোলার পাম্প ব্যবহার করে। পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারে রূপান্তর এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ না আনলে এসব এলাকায় আপেক্ষিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যেকোনো প্রাকৃতিক উপকূলের অভিযোজনক্ষমতার চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকবে।
এসব প্রক্রিয়া নদীর প্রবাহও বদলে দেয়। উপকূলের পেছনের ভূমি দেবে গেলে মাধ্যাকর্ষণনির্ভর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা কম কার্যকর হয়, সমুদ্রে পানি বের হওয়ার মুখগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় নিচু হয়ে যায় এবং বৃষ্টির পানি আটকে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাই জোয়ারের পানি ঠেকানোর যেকোনো দেয়ালের সঙ্গে নতুন পাম্প, পানি ধরে রাখার পুকুর এবং খাল থাকতে হবে, যাতে ভেতরের পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ পায়।
নেতৃত্ব, অর্থায়ন ও অংশীদার
পরিকল্পনা, চুক্তি ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্সি নর্থ জাভা কোস্ট ম্যানেজমেন্ট অথরিটি নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেছে। নৌবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং সামুদ্রিক বিষয় ও মৎস্যবিষয়ক উপমন্ত্রী দিদিত হারদিয়াওয়ান আশাফকে সংস্থাটির নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁকে সহায়তা করবেন দুই উপপ্রধান—রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ খাতে অভিজ্ঞতা থাকা দারউইন ত্রিসনা জাজাউইনাতা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুহাজার দিয়ান্তোরো।
প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো সমুদ্রপ্রাচীরকে অপরিহার্য জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন, এ উদ্যোগ আর বিলম্ব করা যাবে না।
সমুদ্রের পানি আমাদের মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। উত্তর জাভার উপকূলজুড়ে বিশাল সমুদ্রপ্রাচীর নির্মাণ আমাদের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে—এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি।
এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন অংশীদারের প্রয়োজন হবে। ইন্দোনেশিয়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে বিনিয়োগ চাইছে এবং উপকূলীয় প্রকৌশলে অভিজ্ঞ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সমর্থন চেয়েছে। বিভিন্ন বিনিয়োগকারীকে দিয়ে নির্মাণকাজের ধাপগুলো কীভাবে ভাগ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। জাকার্তায় পোল্ডার ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছে নেদারল্যান্ডস; ২০১১ সালের সুনামির পর জাপান অনেক সমুদ্রপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ করেছে; আর এশিয়ার দীর্ঘতম সমুদ্রপ্রাচীরগুলোর একটি রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়।
নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন চলবে বলে পরিচালনাগত সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সমর্থকেরা বলছেন, একটি একক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবে। সমালোচকদের আশঙ্কা, পরস্পরবিরোধী অনুমতি ও একাধিক পরিকল্পনার জট খুলতে না পারলে আরেকটি প্রশাসনিক স্তর বিলম্ব বাড়াতে পারে। তবে শুরু থেকেই স্থিতিশীল অর্থায়ন, বাস্তবসম্মত সময়সূচি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি—এ বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত।
স্থানীয় লাভ ও ক্ষতি
পানিতে ডোবা এলাকার বাসিন্দাদের জন্য পাম্পসহ সুপরিকল্পিত প্রতিরক্ষা বাঁধের অর্থ হতে পারে শুকনো মেঝে, বিশুদ্ধ কলের পানি এবং ব্যবসার জন্য আবার চালু হওয়া সড়ক। বছরের পর বছর গোড়ালি-সমান জোয়ারের পানির সঙ্গে বসবাস করা পরিবারগুলোর কাছে যেকোনো সুরক্ষাই জীবনরক্ষাকারী। ডেমাকের কাছে বেদোনো গ্রামের মতো জায়গায় রান্না ও যাতায়াতের মতো দৈনন্দিন কাজ প্রায় এক দশক ধরে পানির মধ্যেই চলছে। বাসিন্দারা বলছেন, বন্যা কিছুটা কমলেও স্বস্তি মিলবে।
ছোট মাপের জেলে ও উপকূলীয় কৃষকদের কাছে চিত্রটি ভিন্ন। প্রাথমিক পর্যায়ের নির্মাণকাজে স্রোত ও পলি জমার ধরন ইতোমধ্যেই বদলে গেছে। নির্মাণ এলাকাগুলোর কাছে মাছ, কাঁকড়া ও ঝিনুকের পরিমাণ কমেছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। কিছু পল্লিতে মাছচাষিরা বলছেন, নতুন বাঁধ ও সংযোগ সড়কের কারণে তাদের পুকুরনির্ভর লোনা-মিঠা পানির প্রবাহ বদলে গেছে। জোয়ারের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করা সম্প্রদায়গুলোর আশঙ্কা, দেয়াল তাদের কর্মক্ষেত্রের পথ বন্ধ করে দিতে পারে বা খোলা সমুদ্রে যেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য করতে পারে, ফলে জ্বালানি ও নিরাপত্তা ব্যয় বাড়বে।
বাস্তুচ্যুতিও আরেকটি চাপের বিষয়। ডেমাকে অন্তত তিনটি গ্রাম ইতোমধ্যে সমুদ্রে বিলীন হয়েছে, আর আরও অনেক পরিবারকে ভেতরের দিকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। স্থানীয় নেতারা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, উঁচু জমিতে নতুন আবাসন এবং উপকূলে যাতায়াতের ওপর নির্ভরশীল কাজ হারানো শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণের সহায়তা দাবি করেছেন। সামাজিক পরিকল্পনা না থাকলে বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দেয়াল তাদের সুরক্ষা দেবে ঠিকই, কিন্তু যে অর্থনীতিকে বাঁচাতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তার সুফল থেকে তারা বঞ্চিত হবেন।
পরিবেশগত ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠী ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, পরিবর্তনশীল বদ্বীপে শক্ত দেয়াল একটি ভোঁতা হাতিয়ার। তাদের সতর্কতা, অবিচ্ছিন্ন দেয়াল বালি ও কাদার চলাচল বদলে দেবে, মোহনাকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রাখে এমন জোয়ারের পানির প্রবাহ কমাবে এবং সমুদ্র এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ম্যানগ্রোভের ভেতরের দিকে সরে যাওয়া কঠিন করবে। তাদের উদ্বেগ, বাঁধ দিয়ে ঘেরা নদী জোয়ারের সময় উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় মুখে আটকে গেলে উজানে আরও বেশি দূষিত পানি জমা হবে।
গবেষকেরা বন্দর ও উপকূলের কাছের খালগুলোতে খননকাজের কথাও তুলে ধরেছেন, যেখান থেকে নির্মাণস্থলে ভরাটের উপকরণ নেওয়া হয়। আলোড়িত পলি প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক ঘাসের তৃণভূমিতে জমলে ছোট মাছের প্রয়োজনীয় আবাসস্থল ঢেকে যেতে পারে। সামুদ্রিক বিষয় ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় জাকার্তা উপকূলীয় পরিকল্পনার কয়েকটি অংশের সঙ্গে স্থানীয় জেলে পরিবারের পরিমাপযোগ্য বার্ষিক ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া যায়। নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া এ প্রকল্পের পরিসর বাড়ালে সেই ক্ষতি আরও বেড়ে যেতে পারে।
পিপলস কোয়ালিশন ফর ফিশারিজ জাস্টিসের এরউইন সুরিয়ানা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিকল্পনা বন্যার গভীর কারণ—ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ভূমি দেবে যাওয়া—উপেক্ষা করে কেবল উপসর্গের সমাধান করছে। তিনি বলেন, এই অসামঞ্জস্যের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে।
বিশাল প্রাচীরটি একটি ভ্রান্ত সমাধান, যা মানুষের জন্য নতুন দুর্ভোগ তৈরি করে।
রুজাক সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের এলিসা সুতানুদজা একটি বিশাল অবকাঠামোকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছেন। তিনি সরকারকে জলবিদ্যাগত দিকগুলো মেনে চলতে এবং নকশায় নদীর মোহনা, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ বেষ্টনী রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
দেয়াল যদি নদীর মোহনা ও উপসাগরের মুখ বন্ধ করে দেয়, তবে সমুদ্রে পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে, পলি জমার গতি বাড়তে পারে এবং যেসব জেলাকে সহায়তা করাই প্রকল্পের উদ্দেশ্য, সেখানেই বন্যা আরও ভয়াবহ হতে পারে।
পরীক্ষাক্ষেত্র জাকার্তা
জাকার্তা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত ভূমি দেবে যাওয়া বড় শহরগুলোর একটি। সে কারণেই রাজধানীর উপসাগর এলাকায় প্রথম বড় নির্মাণকাজের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, সেখানে নতুন সমুদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত পানি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে, যাতে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা কমে; খালে নতুন পাম্প হাউস বসানো হবে এবং পানি সংরক্ষণকারী হ্রদগুলোর চারপাশে বাঁধ উঁচু করা হবে। পলিমাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শহরটির জন্য সময় বের করাই এর উদ্দেশ্য; শহরটির উপকূলের কিছু অংশ বছরে কয়েক সেন্টিমিটার করে নেমে যাচ্ছে।
জাকার্তার স্থানীয় সমুদ্রপ্রাচীর অতীতেও ব্যর্থ হয়েছে। বাঁধ ভেঙে নিচু ওয়ার্ড ও শিল্পাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব ঘটনা নেদারল্যান্ডস ও অন্যান্য নিচু এলাকার অভিজ্ঞতা থেকে একটি শিক্ষা দেয়: সুরক্ষা কোনো একক বাঁধ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। পাম্পের বিকল্প বিদ্যুৎ থাকতে হবে, পলি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং পরিচালকদের জোয়ার ও ঝড়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জাকার্তার অংশটির নির্মাণে আট থেকে ১০ বছর লাগবে এবং আনুমানিক ব্যয় হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার। এটি যদি জোয়ারের পানি ঠেকাতে, পানি নিষ্কাশন উন্নত করতে এবং একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা কমাতে পারে, তবে বৃহত্তর পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনার জোরালো ইঙ্গিত মিলবে। ব্যর্থ হলে তা হবে ব্যয়বহুল এক সতর্কবার্তা।
সমুদ্রপ্রাচীরের সঙ্গে আর যা দরকার
প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদেরা প্রায়ই উপকূলীয় সুরক্ষাকে তিনটি বিষয়ের সমন্বয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন: পানি ঢোকা ঠেকানো, পানিকে প্রবাহিত রাখা এবং ভূমি দেবে যাওয়া ঠেকানো। জাভার উত্তর উপকূলে এর শুরু হবে অভ্যন্তরীণ এলাকায়। নির্ভরযোগ্য পাইপের পানি সরবরাহ সম্প্রসারণ এবং পৃষ্ঠের পানিশোধন বাড়ালে গভীর নলকূপের প্রয়োজন কমবে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের অনুমতি কার্যকর করা, পানি তোলার জন্য মূল্য নির্ধারণ এবং অবৈধ সংযোগ বন্ধ করলে ভূমি দেবে যাওয়ার গতি কমানো যাবে। বন্যাপ্রবণ এলাকার শিল্পকারখানাগুলোকে পুনর্ব্যবহৃত পানি ও বদ্ধ-চক্র শীতলীকরণ ব্যবস্থার দিকে নেওয়া হলে পানির চাহিদা কমবে।
প্রকৃতি ঢেউয়ের শক্তি শোষণ করতে এবং পলি আটকে রাখতে সাহায্য করতে পারে। ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার এবং যেখানে সম্ভব সেগুলোকে ভেতরের দিকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিলে যেকোনো দেয়ালের সামনে একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক প্রতিরোধক তৈরি হবে। উজানের অববাহিকায় নদীকে প্লাবনভূমির সঙ্গে আবার যুক্ত করলে পানি উপকূলে পৌঁছানোর আগেই ঝড়ের পানির সর্বোচ্চ প্রবাহ কমানো যাবে। ড্রেজিং নীতি সংশোধন করে পলির বিস্তার কমানো এবং সামুদ্রিক ঘাস ও প্রবালের প্রজননস্থল রক্ষা করা সম্ভব।
কিছু জেলায় পরিকল্পিতভাবে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন থেকেই যাবে। এর অর্থ হলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা, ভেতরের দিকে জমি কেনা এবং পরিবারগুলো স্থানান্তরের আগেই নতুন বাড়ি, স্কুল ও ক্লিনিক নির্মাণ করা। জেলে সম্প্রদায়গুলোকে নিরাপদ বন্দরে নতুন জেটি ও হিমাগারের সুবিধা দেওয়া যেতে পারে, যাতে সমুদ্রে যাতায়াত ও তাদের আয় ভেঙে না পড়ে।
বিদেশের সফল উদাহরণগুলো আস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রকল্প কার্যালয় চুক্তি ও সাপ্তাহিক অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করতে পারে, দেয়ালের অবস্থান নির্ধারণে নাগরিকদের মতামত নিতে পারে এবং পরিবেশগত কার্যকারিতার জন্য স্বাধীন নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে। জেলে, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি বিরোধকে সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে।
শিল্প ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি
জাভার উত্তর উপকূলে রয়েছে কয়েক ডজন শিল্পাঞ্চল, পাঁচটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা, বন্দর, জ্বালানি ডিপো ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসবের অনেকগুলোই উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে। জোয়ারের বন্যায় কাজের পালা ব্যাহত হয়, মজুত পণ্যের ক্ষতি হয় এবং যন্ত্রপাতিতে ক্ষয় ধরে। লজিস্টিকস করিডরগুলো টোল সড়ক, কনটেইনার টার্মিনাল ও রপ্তানিমুখী কারখানাকে যুক্ত করে; এসব প্রতিষ্ঠান দিনের নয়, ঘণ্টার হিসাবে সময়সূচি মেনে চলে। বারবার প্লাবিত হওয়ায় সেই ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে।
উপকূলের প্রতিটি অংশের উপযোগী করে গড়া কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়মিত ক্ষয়ক্ষতি কমাবে এবং প্রতিটি ঝড়ের জোয়ারের পর জরুরি খরচ এড়াতে সাহায্য করবে। এতে গুদাম শুকনো রাখা, ট্রাক চলাচলের জন্য সড়ক খোলা রাখা এবং পানি শোধনাগারে লবণাক্ত পানি ঢোকা সীমিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই দেয়াল জেলেদের ও মৎস্যচাষিদের কর্মক্ষেত্রের সমুদ্র বদলে দেবে। পরিবর্তনের সম্মুখসারিতে থাকা মানুষদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ, স্পষ্ট তথ্য এবং নিরাপদ ভূমির সুফলে অংশীদার হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
যা জানা দরকার
- ইন্দোনেশিয়া জাভার উত্তর উপকূলজুড়ে বিশাল সমুদ্রপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে; এর দৈর্ঘ্য ৫০০ থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
- আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; কয়েক ধাপে নির্মাণে ১৫ থেকে ২০ বছর লাগবে বলে আশা করা হচ্ছে।
- জাকার্তা উপসাগর প্রথম বড় অংশ; এর বাজেট আনুমানিক ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সময়সীমা আট থেকে ১০ বছর।
- পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন তদারকির জন্য নর্থ জাভা কোস্ট ম্যানেজমেন্ট অথরিটি নামে নতুন সংস্থা গঠন করা হয়েছে।
- ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে ইন্দোনেশিয়ার আশপাশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৪.২৫ মিলিমিটার বেড়েছে; আর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে উত্তর জাভার কিছু অংশ এর চেয়ে অনেক দ্রুত দেবে গেছে।
- সেমারাং থেকে ডেমাক পর্যন্ত ৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশটি টোল সড়ক হিসেবেও ব্যবহৃত হবে এবং এর নির্মাণকাজ চলছে।
- পিপিপি মডেলে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছ থেকে বিনিয়োগ চাইছে ইন্দোনেশিয়া।
- নদী, প্রবালপ্রাচীর ও মৎস্যসম্পদের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী সতর্ক করেছে এবং ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ন্ত্রণ ও ম্যানগ্রোভ সুরক্ষায় জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
- কিছু উপকূলীয় সম্প্রদায় সুরক্ষার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও নির্মাণ এলাকার কাছে জেলে ও মাছচাষিরা প্রাথমিক ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।
- উপকূলীয় প্রতিরক্ষার সঙ্গে পানি সরবরাহের উন্নতি, পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে, মানুষ ও শিল্পের জন্য পরিকল্পনাটি কতটা কার্যকর হবে।






