দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সম্পদ সরানোর রেকর্ড গতি
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ব্যক্তিগত সম্পদ বিদেশে সরানোর গতি রেকর্ড মাত্রায় বাড়ছে। ২০২৫ সালে আনুমানিক ২,৪০০ জন কোটিপতি দেশ ছাড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তিন বছরে ছয় গুণ বৃদ্ধি। সম্পদ স্থানান্তরবিষয়ক গবেষণায়, বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ ১ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং অন্য দেশে গিয়ে অন্তত ছয় মাস বসবাস করেন—এমন ব্যক্তিদের এ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে বৈশ্বিক সম্পদের মানচিত্রে দেশটির অবস্থান বদলে দিচ্ছে এবং করনীতি, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সম্পদ সরানোর রেকর্ড গতি
- কেন সচ্ছল কোরীয়রা দেশ ছাড়ছেন
- উত্তরাধিকার কর যেভাবে পারিবারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে
- তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন এবং কী খুঁজছেন
- সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দুবাই
- গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুর
- থাইল্যান্ড ও ব্যাংককের বাড়তি আকর্ষণ
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ
- সিউল ও দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব
- সচ্ছলরা কীভাবে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেন ও সম্পদ সুরক্ষিত রাখেন
- সম্পদ কৌশল হিসেবে একাধিক দেশে বসবাস
- নীতিগত পরিবর্তনে কি দেশত্যাগের ঢল কমানো সম্ভব
- অভিজাতদের বাইরে তরুণদের মিতব্যয়ী হয়ে ওঠা
- মূল বিষয়গুলো
এর তাৎক্ষণিক প্রভাব দৃশ্যমান। সর্বশেষ কোটিপতির সংখ্যার ভিত্তিতে শহরগুলোর র্যাঙ্কিংয়ে সিউল পাঁচ ধাপ নেমে ২৪তম হয়েছে, যা শীর্ষ বৈশ্বিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। ধারণা করা হচ্ছে, দেশত্যাগের ফলে প্রায় ১৫.২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিদেশে চলে যাবে। এই উল্লেখযোগ্য অঙ্কের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, দাতব্য অনুদান এবং নতুন উদ্যোগের ঝুঁকিপুঁজি কমতে পারে। সামগ্রিক সমৃদ্ধির সঙ্গে এই প্রবণতার স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে প্রায় ১৩ লাখ কোটিপতি ছিলেন, বৈশ্বিক তালিকায় যার অবস্থান ছিল দশম। অন্যদিকে, বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি কোটিপতির মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২২৬.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া একা নয়। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সম্পদ স্থানান্তর সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে; পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১ লাখ ৪২ হাজার কোটিপতি সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে যাবেন। নিট সম্পদ আগমনে সংযুক্ত আরব আমিরাত শীর্ষে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি নিট সম্পদ বাইরে যাবে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে কারণগুলো স্পষ্ট: উচ্চ উত্তরাধিকার ও উপহার কর, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নিয়ে উদ্বেগ এবং শিক্ষা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও কম করের মতো জীবনযাপনের পছন্দ। এই স্থানান্তরকে দেশে কথ্য ভাষায় ‘তাল জোসন’ (জোসন থেকে পালানো) বলা হয়—সচ্ছল ব্যক্তিদের মধ্যে দেশ ছাড়ার মনোভাবকে তুলে ধরে এই শব্দবন্ধ।
কেন সচ্ছল কোরীয়রা দেশ ছাড়ছেন
অধিকাংশ স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে করই প্রধান বিষয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১০ কোটি ওনের (প্রায় ৬৮ হাজার ডলার) কম মূল্যের সম্পত্তির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার করের হার ১০ শতাংশ থেকে শুরু হয় এবং ৩০০ কোটি ওনের বেশি সম্পত্তির জন্য তা বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়। মৃত ব্যক্তি কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির বড় অংশীদার হলে, নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারির জন্য প্রযোজ্য অতিরিক্ত মূল্য এবং মূল্যায়নবিধি যোগ হওয়ায় কার্যকর করের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সর্বোচ্চ আয়কর হার ৪৫ শতাংশ; উপহারের ওপরও আলাদা কর রয়েছে। বিপরীতে, পছন্দের অনেক গন্তব্যে উত্তরাধিকার বা উপহার কর নেই, কিংবা নতুন বাসিন্দাদের জন্য স্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কর অব্যাহতি রয়েছে। ওইসিডির বেশ কয়েকটি সদস্যদেশে উত্তরাধিকার কর একেবারেই নেই, যা প্রজন্মান্তরে সম্পদ হস্তান্তরের পরিকল্পনাকারী পরিবারগুলোর কাছে এসব দেশের আকর্ষণ বাড়ায়।
উচ্চ সম্পদশালী গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করা পরামর্শকেরা বলছেন, তাঁদের অনেক আলোচনাই সম্পত্তির পরিকল্পনাকে ঘিরে। পারিবারিক ব্যবসা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরের সময় এর সঙ্গে জড়িত ব্যয় নিয়ে উদ্যোক্তারা উদ্বিগ্ন থাকেন। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা হস্তান্তরের সময় এমন মূল্যায়ন পদ্ধতির মুখে পড়েন, যাতে করযোগ্য ভিত্তিমূল্য অনেক বেশি নির্ধারিত হতে পারে। অন্যদিকে, বেসরকারি কোম্পানির মালিকেরা ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ নিয়ে প্রায়ই অনিশ্চিত থাকেন। ফলে সম্পদ বিক্রি না করে বড় অঙ্কের কর পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিকেরা প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানি বিক্রি করে নগদ অর্থ হাতে নেন, এরপর সম্পদ সংরক্ষণের জন্য অধিক অনুকূল বিধিব্যবস্থা রয়েছে এমন দেশে পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
উত্তরাধিকার কর যেভাবে পারিবারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে
সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি আলোচিত স্থানান্তর দেখায়, কর কীভাবে কৌশলকে প্রভাবিত করে। কিছু সচ্ছল কোরীয় নাগরিক সিঙ্গাপুরে বসবাস শুরু করেছেন, যেখানে উত্তরাধিকার ও উপহারের ওপর কর নেই এবং ব্যক্তিপর্যায়ে লভ্যাংশ আয়ও করমুক্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণকারী সচ্ছল ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন, যেখানে উত্তরাধিকার বা উপহার কর এবং ব্যক্তিগত আয়কর নেই; পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বসবাসে সহায়ক বিনিয়োগকারী ভিসার সুযোগ রয়েছে। আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় খুব তাড়াতাড়ি ফিরে এলে কর ফাঁকির সন্দেহে অতিরিক্ত কর নির্ধারিত হতে পারে। তাই দেশে ফেরার আগে পরিবারগুলো প্রায়ই পাঁচ থেকে দশ বছর বিদেশে থাকে। সম্পদ হস্তান্তর, ট্রাস্ট কাঠামো এবং সন্তানদের শিক্ষার সিদ্ধান্তসহ আরও বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ এই সময়সীমা।
করের বাইরেও অন্য কারণ রয়েছে। গ্রাহকেরা রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যবসার অনিশ্চয়তার ধারণার কথা বলেন। নীতির আকস্মিক পরিবর্তন, বিধিবিধানের বদল বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা উত্তেজনার মতো ধাক্কা সামাল দিতে তাঁরা ভৌগোলিক বৈচিত্র্য চান। জীবনযাপনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দশকের জন্য কোথায় বসবাস করবেন, তা বিবেচনার সময় আন্তর্জাতিক স্কুল, নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয় এমন পরিবেশ প্রায়ই সিদ্ধান্তের পাল্লা ভারী করে।
তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন এবং কী খুঁজছেন
গন্তব্য বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কর, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবনযাপনের নানা বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। দেশ ছাড়া কোরীয়দের কাছে কয়েকটি কেন্দ্র বিশেষভাবে আকর্ষণীয়: সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইতালি ও সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ। ব্যক্তিগত আয়করে শূন্য হার থেকে শুরু করে পূর্বানুমানযোগ্য বসবাসের কর্মসূচি ও প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—প্রতিটি গন্তব্যেই রয়েছে আলাদা সুবিধা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দুবাই
বিদেশ থেকে আসা কোটিপতিদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাত। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সেখানে নিট ৬,৭০০ জন কোটিপতি এসেছেন; ২০২৫ সালে এ সংখ্যা রেকর্ড ৯,৮০০-তে পৌঁছাতে পারে। দুবাইয়ের আকর্ষণ স্পষ্ট: ব্যক্তিগত আয়কর নেই, উত্তরাধিকার বা উপহার কর নেই, বিনিয়োগবান্ধব বসবাসের সুযোগ রয়েছে এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার শক্তিশালী পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পরিচালনাকারী পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শহরটি এখন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার সঙ্গে এর যোগাযোগও বেশ শক্তিশালী। সম্পদ সুরক্ষা, স্পষ্ট নিয়ম এবং স্থানান্তরযোগ্য বসবাসের অধিকার চান—এমন সচ্ছল কোরীয়দের জন্য দুবাই দ্রুত ও ভালো সেবাসম্পন্ন একটি কেন্দ্র। উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরবও গন্তব্য হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বৃহৎ বিনিয়োগ কর্মসূচি ও নতুন আর্থিক জেলার হাত ধরে ২০২৫ সালে সেখানে প্রায় ২,৪০০ জন কোটিপতি আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুর
সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরে সম্পদ আগমনের গতি কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সচ্ছলদের কাছে এশিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অবস্থানগুলোর একটি হিসেবে শহরটি টিকে আছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সেখানে নিট প্রায় ১,৬০০ জন কোটিপতি যোগ হবেন। স্থিতিশীলতা, আইনের কঠোর শাসন, কর চুক্তির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং উন্নত আর্থিক খাতের কারণে পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়ের পছন্দের কেন্দ্র সিঙ্গাপুর। সেখানে উত্তরাধিকার বা উপহার কর নেই এবং ব্যক্তিগত লভ্যাংশ আয়ও করমুক্ত। অনেক কোরীয় পরিবারের কাছে শিক্ষা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও নিজ দেশের নৈকট্য—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়ে যাওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন করের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি ব্যাংক ও বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা শহরটিতে কার্যক্রম বাড়াচ্ছেন, ফলে পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের পরিমণ্ডল আরও সমৃদ্ধ ও তারল্যপূর্ণ হচ্ছে।
থাইল্যান্ড ও ব্যাংককের বাড়তি আকর্ষণ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে উঠে আসছে ব্যাংকক। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৫ সালে প্রায় ৪৫০ জন কোটিপতি সেখানে যাবেন। চীন, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার সচ্ছল পরিবারসহ গোটা অঞ্চল থেকেই এ চাহিদা আসছে। থাইল্যান্ডের আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক স্কুল, উন্নতিশীল আর্থিক সেবা এবং সক্রিয় অভিজাত আবাসন বাজার। সেখানে ব্যক্তিগত কর থাকলেও জীবনযাত্রার খরচ, সহজ জীবনযাপন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ—বিশেষ করে কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে—ব্যাংকককে এমন পরিবারগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত কেন্দ্র করে তুলেছে, যারা বিনিয়োগের সুযোগের পাশাপাশি আরাম ও সুবিধাকেও অগ্রাধিকার দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ
যুক্তরাষ্ট্র এখনো বড় আকর্ষণ। ২০২৪ সালে সেখানে নিট ৩,৮০০ জন কোটিপতি এসেছেন বলে ধারণা করা হয়; ২০২৫ সালে এ সংখ্যা প্রায় ৭,৫০০ হতে পারে। কোরীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে গভীর পুঁজিবাজার, বিস্তৃত অর্থনীতি এবং লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্কের মতো শহরে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী সম্প্রদায় দেশটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ইউরোপে রয়েছে লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা। নতুন বাসিন্দাদের জন্য ইতালির অনুকূল করব্যবস্থা, সুইজারল্যান্ডের কিছু ক্যান্টনে দীর্ঘদিনের নির্দিষ্ট অঙ্কের কর, পর্তুগাল ও গ্রিসের বিনিয়োগের বিনিময়ে বসবাসের সুযোগ এবং মাল্টার বিনিয়োগ কর্মসূচি—এসব দেশ এমন পরিবারকে আকর্ষণ করেছে যারা ইউরোপে চলাচলের সুযোগ ও করব্যবস্থার স্পষ্টতা দুটোই চান। এশিয়ায় জাপান ও হংকংয়েও আবার গতি ফিরেছে। স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আস্থার কারণে প্রতিটি গন্তব্যে কয়েক শ করে নিট সম্পদ আগমনের পূর্বাভাস রয়েছে।
সিউল ও দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক খবর হলো, কোটিপতির সংখ্যার ভিত্তিতে শহরের তালিকায় সিউল ২৪তম স্থানে নেমে গেছে। কিছু উপাত্তে শহরটিতে কোটিপতির সংখ্যা ২০২২ সালের প্রায় ৯৭ হাজার থেকে ২০২৩ সালে প্রায় ৬৬ হাজারে নেমে আসার চিত্রও দেখা যায়। বিভিন্ন সূত্রে সংজ্ঞা ও পরিমাপের পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। তবু এই দিকনির্দেশনা বৃহত্তর স্থানান্তরের প্রবণতা এবং দেশে সম্পদ সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নিট ২,৪০০ জন কোটিপতি দেশ ছাড়ার অর্থ বাস্তবে কী? মোট ১৩ লাখ কোটিপতির তুলনায় সংখ্যাটি খুবই সামান্য। কিন্তু তাঁদের অনেকেই প্রবৃদ্ধিমুখী ব্যবসার মালিক ও অর্থায়নকারী, দাতব্য উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষক কিংবা প্রাথমিক পর্যায়ের স্টার্টআপের প্রধান বিনিয়োগকারী হওয়ায় প্রভাব হতে পারে অনেক বেশি। তাঁদের সিদ্ধান্তে ঝুঁকিপুঁজি বিদেশে চলে যেতে পারে, এমনকি পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের পুরো দল অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী শহরে স্থানান্তরিত হতে পারে। আবাসন বাজারে উচ্চমূল্যের লেনদেন কমে গেলে তারল্য কমতে পারে এবং নতুন প্রকল্পের দৃশ্যমানতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর্থিক খাতে, দেশীয় সম্পদ ব্যবস্থাপক বা সেবাদাতাদের দায়িত্ব কমে গেলে সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পরিমণ্ডল সংকুচিত হতে পারে।
দেশের বৃহত্তর অর্থনীতিও অভিবাসন থেকে স্বতন্ত্র কাঠামোগত চাপের মুখে রয়েছে। পরিবারের ঋণ অনেক বেশি, কিছু খাতে আবাসন বাজার শীতল হয়েছে এবং অর্থনীতি দ্রুত বার্ধক্যের সঙ্গে লড়ছে। বিদেশমুখী সম্পদের ঢেউ প্রান্তিক পর্যায়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে আগ্রহ কমিয়ে এসব চাপ আরও বাড়াতে পারে। স্থানীয় শেয়ারবাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা তালিকাভুক্তির পরিকল্পনাকারী উদ্যোক্তাদের কাছে এই প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা উদ্বিগ্ন।
সচ্ছলরা কীভাবে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেন ও সম্পদ সুরক্ষিত রাখেন
স্থানান্তর সচরাচর একবারের কোনো পদক্ষেপ নয়। বসবাসের অধিকার, পারিবারিক পরিচালনা, ব্যবসার মালিকানা ও বিনিয়োগ পোর্টফোলিও বণ্টন নিয়ে এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। অধিকাংশ পরিবার বিনিয়োগকারী ভিসা, উদ্যোক্তা অনুমতি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি মেধাভিত্তিক কর্মসূচি পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বসবাসের সুযোগ যাচাই করে। বসবাসের সিদ্ধান্তের পর আসে ব্যাংকিং ও সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা। পরিবারগুলো প্রায়ই পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, বিনিয়োগ পেশাদার নিয়োগ করে এবং এক বা দুটি কেন্দ্র থেকে বৈশ্বিক পোর্টফোলিও পরিচালনা করে। শিশুদের শিক্ষা ও ভাষাগত সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনার তালিকায় থাকে।
সম্পদ কৌশল হিসেবে একাধিক দেশে বসবাস
ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সচ্ছল পরিবার বসবাসের স্থানকে বিনিয়োগ পোর্টফোলিও গঠনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় সম্পদ সুরক্ষিত রাখা এবং চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখতে তারা একাধিক দেশে বসবাসের ব্যবস্থা করে। এ পরিকল্পনার ভিত্তি প্রায়ই আবাসন সম্পদ। গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর বাড়ি জীবনযাপনের কেন্দ্রের পাশাপাশি আইনি অবস্থানও নিশ্চিত করে। পরামর্শকেরা বলেন, এসব সিদ্ধান্তে তিনটি বিষয় প্রধান ভূমিকা রাখে: স্থিতিশীলতা, প্রবেশগম্যতা ও করদক্ষতা। স্থিতিশীলতা বলতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ম বোঝায়। প্রবেশগম্যতা বলতে বসবাসের কর্মসূচি ও ব্যবসা পরিচালনার সহজতা বোঝায়। করদক্ষতার মধ্যে রয়েছে আয়, মূলধনি মুনাফা, উত্তরাধিকার ও উপহারের ওপর ব্যক্তিগত কর এবং বিদেশি উৎসের আয়ের করব্যবস্থা।
দুবাই, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কিছু অংশের মতো এ বিবেচনায় ভালো অবস্থানে থাকা দেশগুলো বৈশ্বিক সম্পদ কাঠামোর কৌশলগত কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নিয়ম স্পষ্ট এবং সেবার মানের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে—এমন জায়গায় পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম বাড়ায়। কোরীয় পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এর অর্থ প্রায়ই হলো, ব্যবসা কোরিয়ায় রেখেই পারিবারিক সম্পদের একাংশ এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার পরিকল্পনা বিদেশে রাখা। এতে দেশের বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করেই নীতিগত ঝুঁকি সামাল দেওয়া যায়।
নীতিগত পরিবর্তনে কি দেশত্যাগের ঢল কমানো সম্ভব
নীতিগত বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। সংস্কারের পক্ষের লোকজন বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তরাধিকার ও উপহার কর প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতিগুলোর তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ব্যবসার উত্তরাধিকার হস্তান্তরে নিরুৎসাহিত করে। তাঁদের প্রস্তাব হলো, ঘোষিত করের হার কমানো, পারিবারিক ব্যবসা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আরও উদার করছাড় এবং বড় শেয়ারধারীদের জন্য সহজ মূল্যায়নবিধি চালু করা। অন্যরা সতর্ক করছেন, দ্রুত কর কমালে রাজস্বের ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে এবং বৈষম্য বাড়তে পারে। তাঁদের পছন্দ হলো, প্রগতিশীল করব্যবস্থা বজায় রেখে উত্তরাধিকার হস্তান্তরে লক্ষ্যভিত্তিক করছাড় দেওয়া।
বিদেশের সাম্প্রতিক উদাহরণগুলো দেখায়, নীতিগত পরিবর্তনে সচ্ছল বাসিন্দারা কত দ্রুত সাড়া দিতে পারেন। যুক্তরাজ্য তাদের ‘নন-ডমিসাইল্ড’ করব্যবস্থা বাতিল করেছে। দীর্ঘদিন চালু থাকা এ ব্যবস্থায় বিদেশি বাসিন্দারা বিদেশে অর্জিত আয় ও মুনাফা দেশে না আনলে তার ওপর কর এড়াতে পারতেন। এ পরিবর্তনের পাশাপাশি ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে কোটিপতিদের রেকর্ডসংখ্যক নিট দেশত্যাগের পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে। সম্পদশালী গ্রাহকদের স্থানান্তর বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া আইনজীবী ও মিশকন দে রেয়ার সদস্য চার্লি সোসনা বলেন, লন্ডনের নীতিনির্ধারকেরা আকস্মিক সম্পদ প্রস্থানের ঝুঁকিকে ভুলভাবে বুঝেছিলেন।
সরকার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল যে আন্তর্জাতিক সচ্ছল ব্যক্তিরা লন্ডনকে এতটাই ভালোবাসেন যে তাঁরা চলে যাবেন না।
দক্ষিণ কোরিয়ায় অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন, নীতিতে পরিবর্তন না এলে সম্পদ বহির্গমন অব্যাহত থাকতে পারে। কারণ, তরুণ সচ্ছল পরিবারগুলো সীমান্ত পেরিয়ে চলাচল ও ব্যবসা পরিচালনায় আরও অভ্যস্ত এবং তাদের চলাচলের সুযোগও বেশি। কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ সহায়ক হতে পারে। পারিবারিক ব্যবসা হস্তান্তরে স্পষ্ট নিয়ম, পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানকে দেশে রাখার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দাদের জন্য আরও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যক্তিগত করব্যবস্থা আস্থা বাড়াতে পারে। বিদেশি প্রতিষ্ঠাতা ও জ্যেষ্ঠ অর্থায়ন পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করার ভিসার সুযোগ সিউলকে আঞ্চলিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করবে, যদিও দেশের কিছু সম্পদ বিদেশ থেকে পরিচালিত হতে থাকবে।
অভিজাতদের বাইরে তরুণদের মিতব্যয়ী হয়ে ওঠা
সচ্ছল ব্যক্তিরা যখন বৈশ্বিক চলাচলের সুযোগ খুঁজছেন, তখন অনেক তরুণ কোরীয়র মধ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশ ও ত্রিশের কোঠার মানুষের মধ্যে মিতব্যয়ী জীবনযাপনের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। জরিপে দেখা যায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় নয়—এমন খরচ কমিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা খাবারে খরচ বাঁচানো, পাতালরেলে যাতায়াত এবং পুরোনো জিনিস কেনাকে স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে বর্ণনা করেন। আবাসনের উচ্চ ব্যয়, মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি এবং অনেক নতুন স্নাতকের অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে কর্মজীবন শুরু করার মতো শ্রমবাজারের বাস্তবতা এ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে।
সচ্ছলদের দেশত্যাগ এবং পরিবারের ব্যয় সংকোচনের এ সমান্তরাল চিত্রে একটি অভিন্ন উদ্বেগ ফুটে ওঠে: অনিশ্চিত সময়ে নিরাপত্তার সন্ধান। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের জন্য হতাশা কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ধরে রাখতে হলে সম্পদের দুই প্রান্তের মানুষের আস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় ২,৪০০ জন কোটিপতি দেশ ছাড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তিন বছরে ছয় গুণ বৃদ্ধি।
- পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ১৫.২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিদেশে চলে যাবে।
- কোটিপতির সংখ্যার ভিত্তিতে বৈশ্বিক শহরের তালিকায় সিউল পাঁচ ধাপ নেমে ২৪তম হয়েছে, যা সম্পদ ও মনোভাবের পরিবর্তন তুলে ধরে।
- উচ্চ উত্তরাধিকার ও উপহার কর, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাপনের পছন্দকে দেশত্যাগের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- কোরীয় কোটিপতিদের প্রধান গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু অংশ।
- ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড ১ লাখ ৪২ হাজার কোটিপতি অন্য দেশে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- লক্ষ্যভিত্তিক কর ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত সংস্কার না হলে সম্পদ বহির্গমন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
- তরুণ কোরীয়দের মধ্যে মিতব্যয়িতা বাড়ছে, যা বৃহত্তর ব্যয়চাপ ও অর্থনীতি নিয়ে সতর্ক প্রত্যাশার ইঙ্গিত দেয়।






