বোমাবর্ষণ ও অভিযানে থামছে না মিয়ানমার সীমান্তের প্রতারণা চক্র

পড়তে 12 মিনিট
বোমাবর্ষণ ও অভিযানে থামছে না মিয়ানমার সীমান্তের প্রতারণা চক্র

মায়ে সট ও মিয়াওয়াদ্দিতে তোলপাড় সৃষ্টিকারী সীমান্ত অভিযান

২৪ অক্টোবর সূর্যাস্তের পর, মোয়ে নদীর তীরে থাইল্যান্ডের একটি গ্রামের বাসিন্দারা নদীর ওপার থেকে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী মিয়াওয়াদ্দির বাইরে বিস্তৃত কমপ্লেক্স কেকে পার্কে বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল। সেখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাইবার প্রতারণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েক রাত ধরে বিস্ফোরণ ও পরবর্তী বিস্ফোরণে বনঘেরা নদীতীরের ওপরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে থাকে। ধ্বংসাবশেষ থাইল্যান্ডের দিকে এসে পড়ে এবং মায়ে সটে বাড়িঘরের ক্ষতি করে। কম্পাউন্ডগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কর্মীরা পালাতে শুরু করেন।

সূচিপত্র
  1. মায়ে সট ও মিয়াওয়াদ্দিতে তোলপাড় সৃষ্টিকারী সীমান্ত অভিযান
  2. প্রতারণার কম্পাউন্ডগুলো যেভাবে চলে, আর সেগুলো ধ্বংস করা কঠিন কেন
  3. কারা লাভবান হয়, আর কলকাঠি কারা নাড়ে
  4. গ্রেপ্তার, ভবন ধ্বংস এবং সংখ্যার হিসাব
  5. ভুক্তভোগী, স্বেচ্ছায় কাজ করা ব্যক্তি এবং ধূসর এলাকা
  6. আঞ্চলিক প্রতিরোধ ও আইনি লড়াই
  7. যেভাবে এই ব্যবসা কমানো যেতে পারে
  8. জেনে রাখুন

পরবর্তী দিনগুলোতে ১,৫০০ জনেরও বেশি মানুষ অগভীর নদী পেরিয়ে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যান। কেউ ফোমের বাক্সে ভেসে আসেন, কেউ মাথার ওপর ব্যাগ তুলে হেঁটে নদী পার হন। থাই সেনা ও সীমান্ত পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তাঁদের কাছে অন্তত ২৮টি দেশের পাসপোর্ট ছিল। তাঁদের অনেকেই ভারতীয়, চীনা ও ফিলিপিনো। অন্যরা ভিয়েতনাম, পাকিস্তান এবং ইথিওপিয়া ও কেনিয়ার মতো আফ্রিকার দেশ থেকে এসেছিলেন। কারা মানবপাচারের শিকার হয়েছেন আর কারা কাজের জন্য অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়েছেন, তা নির্ধারণে থাই কর্তৃপক্ষ আগতদের যাচাই করে। পালানোর চেষ্টায় কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

দূরবর্তী সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা বিশাল অপরাধ অর্থনীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে কেকে পার্ক। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যকার ২,৪০০ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে ৪০টিরও বেশি সুরক্ষিত কম্পাউন্ড থেকে অনলাইনে প্রতারণা চালানো হয়, যার শিকার হন সারা বিশ্বের মানুষ। এসব প্রতারণা থেকে বছরে কয়েক শ কোটি ডলার আয় হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থপাচার, অবৈধ জুয়া এবং হুমকি দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ ও স্থানান্তরের নেটওয়ার্ক। জাতিসংঘের গবেষকেরা ২০২৩ সালে অনুমান করেছিলেন, ভুয়া চাকরির প্রস্তাবে ফাঁদে পড়ে মিয়ানমারে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ প্রতারণার কাজে আটকে আছেন। থাই পুলিশ ও চীনা কর্মকর্তাদের ধারণা, শুধু মিয়াওয়াদ্দির আশপাশের কেন্দ্রগুলোতেই এখনো ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ কাজ করছেন।

মিয়ানমারের জেনারেলরা গ্রেপ্তারের ঘোষণা ও উড়িয়ে দেওয়া ভবনের ছবি প্রকাশ করলেও ব্যবসা থেমে নেই। এই অপরাধী চক্রগুলো নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, কেকে পার্কে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার কর্মী থাকতে পারেন। সীমান্ত শহরগুলো থেকে কয়েক হাজার মানুষকে সরিয়ে নিলে দৃশ্যমান কেন্দ্রগুলো কিছু সময়ের জন্য দুর্বল হয়। কিন্তু শ্রমিক নিয়োগ, স্থানান্তর ও শোষণকারী নেটওয়ার্কগুলোর পতন ঘটে না। চাপ বাড়লে কম্পাউন্ডগুলো কর্মীদের দেশের ভেতরের দিকে সরিয়ে নেয়, প্রধান সড়ক থেকে দূরে নতুন ভবন তোলে, অথবা সীমান্ত পেরিয়ে অন্যত্র চলে যায়। কাজের ফোন ও প্রতারণার স্ক্রিপ্ট চালু থাকে।

প্রতারণার কম্পাউন্ডগুলো যেভাবে চলে, আর সেগুলো ধ্বংস করা কঠিন কেন

বাইরে থেকে সবচেয়ে বড় কম্পাউন্ডগুলোকে প্রযুক্তি পার্কের মতো দেখায়। কেকে পার্ক কয়েক শ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত। সেখানে আছে ছাত্রাবাস, ভিলা, রেস্তোরাঁ, একটি ক্লিনিক, এমনকি একটি ব্যাংকও। দেয়ালের ভেতরে সারি সারি কলরুম ও খোলা অফিসে কর্মীদের দল বিনিয়োগের নামে প্রতারণা, প্রেমের ফাঁদ এবং ভুয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগের কৌশল চালায়। সবচেয়ে প্রচলিত কৌশলটির নাম ‘পিগ বুচারিং’। নিয়োগকারীরা চ্যাট অ্যাপে আকর্ষণীয় প্রোফাইলের আড়ালে থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষ্য ব্যক্তির আস্থা অর্জন করেন। এরপর তাঁকে চকচকে দেখতে একটি ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যান, যেখান থেকে জমা দেওয়া অর্থ চক্রের নিয়ন্ত্রণাধীন অ্যাকাউন্টে চলে যায়।

চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে কর্মীদের প্রায়ই জরিমানা করা হয় বা মারধর করা হয়। পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের বর্ণনায় বৈদ্যুতিক লাঠি দিয়ে নির্যাতন, জোর করে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো এবং একই শহরের এক পরিচালনাকারীর কাছ থেকে আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। বেশি আয় করা কর্মীদের বোনাস ও নানা সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে সহিংসতার ঝুঁকি থাকে। পাহারাদারেরা চলাফেরা সীমিত করে এবং পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। প্রতিটি করিডরে নজরদারি ক্যামেরা রয়েছে। কম্পাউন্ডের চারপাশে আছে ওয়াচটাওয়ার ও বেড়া।

প্রতারণার কার্যক্রম সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য। সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ লাইন ও ইন্টারনেট সেবা থাই কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিলে কম্পাউন্ডগুলো স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের দিকে ঝুঁকে পড়ে। থাই পুলিশের ভাষ্য, সাইটগুলোতে নেওয়ার পথে স্টারলিংকের টার্মিনালের চালান তারা আটক করেছে। পরে অভিযানে মিয়ানমারের সেনারা কয়েক ডজন টার্মিনাল জব্দ করে। স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোর ভাষ্য, সন্দেহভাজন প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর কাছে হাজার হাজার যন্ত্র তারা অচল করে দিয়েছে। তারের সংযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও যোগাযোগ সচল রাখতে কমপ্লেক্সগুলো ছাদে স্যাটেলাইট ডিশ বসায়।

ফিলিপাইনের এক জীবিত ফিরে আসা নারী জানান, গ্রাহকসেবা পদে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে তাঁকে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল। তিনি প্রতিদিনের কাজের কোটা ও হুমকির কথা স্মরণ করেন। নিরাপত্তার কারণে তিনি নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

প্রতিদিন আমাকে শত শত মানুষকে বার্তা পাঠাতে হতো। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে তারা আমাকে চড় মারত ও বৈদ্যুতিক শক দিত। কাজ ছাড়ার জন্য অনুরোধ করলে তারা আমাকে আরেকটি দলের কাছে বিক্রি করে দেয় এবং বলে, আমার ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে।

আধুনিক সাজসজ্জা ও জবরদস্তির এই মিশ্রণ কম্পাউন্ডগুলোকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এগুলো এমনভাবে তৈরি, যেন দেয়ালঘেরা শহর—যেখানে খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা আছে, আর নিজস্ব যোগাযোগ নেটওয়ার্কও রয়েছে। ফলে অভিযানের পরও পরিচালনাকারীরা দ্রুত কার্যক্রম আবার শুরু করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কারা লাভবান হয়, আর কলকাঠি কারা নাড়ে

মিয়ানমারের সীমান্তে প্রতারণার অর্থনীতি আপনা-আপনি গড়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয় সরকার ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেখানে ভূখণ্ড ও রাজস্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, সেই যুদ্ধাঞ্চলের ভেতরেই এর বিস্তার ঘটেছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর ভূখণ্ড ধরে রাখতে সামরিক বাহিনী ক্রমেই মিত্র মিলিশিয়া ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। স্থানীয় ক্ষমতাধরেরা নগদ অর্থ, কর্মসংস্থান ও আয়ের ভাগের বিনিময়ে অপরাধমূলক ব্যবসার অনুমতি দেন। থাই সীমান্তে এর ফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনা বিনিয়োগকারী ও পরিচালকদের নিয়ে বড় কম্পাউন্ডগুলো যুদ্ধবিরতি অঞ্চলে বা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়কারী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় চালু হয়।

অপরাধের এই কেন্দ্রগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দায় চাপিয়েছে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন ও অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর ওপর। এক জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র বলেছেন, মিয়াওয়াদ্দির আশপাশের প্রতারণামূলক প্রকল্পে কারেন গোষ্ঠীর নেতারা জড়িত। গবেষকেরা পাল্টা যুক্তি দেন, সবচেয়ে বড় কেন্দ্রগুলো সাধারণত এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে সেনাবাহিনীর মিত্র মিলিশিয়া বা যুদ্ধবিরতিতে থাকা গোষ্ঠীগুলো বাধাহীনভাবে কাজ করে। মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার কম্পাউন্ডগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিচালনাকারীদের একটি তালিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমা সরকারগুলো।

বছরের পর বছর ধরে এই শিল্পের ওপর নজর রাখা বিশ্লেষক জেসন টাওয়ারের মতে, বহুল প্রচারিত অভিযানগুলো এখনো সেই অর্থদাতা ও সুরক্ষা চক্রকে নিশানা করতে পারেনি, যাদের কারণে এই ব্যবসার মডেল টিকে আছে। তাঁর যুক্তি, আংশিকভাবে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া ও প্রকাশ্যে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্য বিদেশি চাপ সামাল দেওয়া, অথচ রাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠদের অর্থ জোগানো ব্যবসায়িক সম্পর্ক অটুট রাখা।

এই মাসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন,

এই অভিযান রাজনৈতিক নাটক। কম্পাউন্ডগুলো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, আর সেগুলো যারা চালায় তাদের বিচারের আওতায় আনার কোনো বাস্তব প্রচেষ্টা নেই।

মাঠপর্যায়ের তথ্যও এই বক্তব্যের পক্ষে যায়। সেনারা হাজার হাজার মানুষকে আটক এবং সরঞ্জাম জব্দ করলেও পরিচালনাকারীরা প্রায়ই কাছের অন্য ভবনে চলে যান। দেশজুড়ে একসঙ্গে এক কোটি নয়, মাত্র ১০ হাজার কর্মী সরালেও কয়েক লাখের কাছাকাছি শ্রমশক্তিতে তার প্রভাব সামান্য। ফলে কার্যক্রম বন্ধ হয় না, শুধু স্থান বদলায়।

বিজ্ঞাপন

গ্রেপ্তার, ভবন ধ্বংস এবং সংখ্যার হিসাব

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, অক্টোবরে সেনারা কেকে পার্কে অভিযান চালিয়ে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে আটক করেছে। কর্মকর্তারা কমপ্লেক্সের ভেতরে ১৪৮টি ভবনের তালিকা দিয়েছেন—ছাত্রাবাস থেকে শুরু করে জিম ও কারাওকে হল পর্যন্ত। তাঁদের দাবি, এক শতাধিক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাকিগুলো ধ্বংসের প্রস্তুতি চলছে। সেনারা স্যাটেলাইট যন্ত্র, ফোন ও কম্পিউটারের স্তূপ প্রদর্শন করেছে। নদীতে থাকা থাই ইউনিটগুলো জানিয়েছে, ধ্বংসকাজের দল বিস্ফোরক স্থাপন করায় কয়েক দিন ধরে বিস্ফোরণ চলেছে।

স্বাধীন বিশ্লেষকদের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট ছবিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলক কম দেখা যায়। অভিযানের পর তোলা ছবিতে দেখা গেছে, এলাকাটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধ্বংস হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হয়। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ কেন্দ্রীয় অংশ অক্ষত রয়েছে। সম্পত্তির বড় অংশজুড়ে এখনো বেড়া ও ফটক রয়েছে। কাছাকাছি অন্য কম্পাউন্ডগুলোও বিস্তৃত হয়েছে; নদীর ধারে যুক্ত হয়েছে নৌঘাট ও নতুন গুদাম।

সীমান্ত পারাপারের স্থানগুলোতে মানুষের চলাচলও নিজস্ব গল্প বলে। থাই কর্মকর্তারা জানান, দেশত্যাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিন দিনে এক হাজারেরও বেশি মানুষ মায়ে সটে প্রবেশ করেন। ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতারণা কেন্দ্রগুলো থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নিয়েছে থাইল্যান্ড এবং তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে নিজ দেশে ফেরাতে সহায়তা করেছে। চীনা, ভারতীয় ও ফিলিপিনো নাগরিকেরা সবচেয়ে বড় দলগুলোর মধ্যে রয়েছেন। নথিপত্র ও ফ্লাইটের অপেক্ষায় আরও অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন।

বিজ্ঞাপন

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল জাও মিন তুন অভিযানগুলোকে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি কারেন নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন ও আঞ্চলিক গবেষকেরা এই অভিযানের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরছেন। তাঁদের মতে, এতে বাছাই করা কিছু ভবন ও নিম্নপর্যায়ের কর্মীদের নিশানা করা হলেও বড় পরিচালনাকারীরা অক্ষত থাকছেন।

ভুক্তভোগী, স্বেচ্ছায় কাজ করা ব্যক্তি এবং ধূসর এলাকা

সীমান্ত অভিযানগুলো এক কঠিন বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে: কম্পাউন্ডের ভেতরে কারা ভুক্তভোগী, আর কারা অপরাধে অংশগ্রহণকারী? থাই তদন্তকারীরা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইঙ্গিত মিলেছে, শত শত মানুষ ভালো বেতনের আশায় স্বেচ্ছায় মিয়াওয়াদ্দিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরে প্রতারণামূলক কাজে আটকে পড়েন। অন্যরা অনলাইন জুয়া বা প্রযুক্তি সহায়তার চাকরির জন্য গিয়ে জোর করে প্রতারণার দলে স্থানান্তরিত হন।

মায়ে সট এলাকার অভিযানের নেতৃত্বদানকারী থাই পুলিশ জেনারেল ঠাচাই পিতানিলাবুট একাধিক দেশের সহকর্মীদের মামলাগুলো সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে সহায়তার অনুরোধ করেছেন। প্রকৃত ভুক্তভোগীদের সহায়তার জন্য চিহ্নিত করা এবং অপরাধে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা, তারপর দ্রুত প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে স্থানীয় ইউনিটগুলোকে কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ বজায় রাখতে সহায়তা করাই তাঁর লক্ষ্য।

তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট।

"অপরাধী ও ভুক্তভোগীদের আলাদা করতে আমাদের সতর্ক তদন্ত দরকার, আর মানুষকে দ্রুত দেশে ফেরাতে হবে, যাতে আমরা চক্রগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে পারি," তিনি বলেন।

কেকে পার্ক ও আশপাশের কম্পাউন্ড থেকে পালিয়ে আসা শত শত নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারত। বিমানবাহিনীর একটি ফ্লাইটে ২৭০ জন ছিলেন, কয়েক দিন পর আরও অনেকে ফেরেন। ওই সপ্তাহে মায়ে সট থেকে মোট প্রায় ৪৬৫ জন ভারতীয়কে দেশে ফেরানো হয়। প্রথম দফার অভিযানের পর সামনে আসা আরও প্রায় ২০০ জনকে পরবর্তী ফ্লাইটগুলোতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফেরত আসা ব্যক্তিদের নিয়োগকারী ও পরিচালনাকারীদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের অনেকেই পাচারের শিকার হিসেবে সহায়তা পাবেন।

তাঁদের পরিচয় ও পটভূমি বিচিত্র। এশিয়া ও আফ্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের থাইল্যান্ডে গ্রাহকসেবা পদে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীদের আকৃষ্ট করা হয়েছিল উচ্চ বেতন, আবাসন ও ভিসার প্রস্তাবে। কেউ কেউ ভিসা ছাড়াই থাইল্যান্ডে প্রবেশের পর রাতে নদী পেরিয়ে পাঠানো হন। পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হয়। প্রথম কয়েক সপ্তাহে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হতো, আর সামান্য ভুলেও জরিমানা হতো। পরের সপ্তাহগুলোতে নতুন লক্ষ্য ব্যক্তিদের বার্তা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি দেওয়া হতো।

বিজ্ঞাপন

আঞ্চলিক প্রতিরোধ ও আইনি লড়াই

এই অবৈধ বাণিজ্যে বাধা দিতে অঞ্চলের সরকারগুলো নতুন নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে। মিয়ানমার অংশের কম্পাউন্ডগুলোতে নীরবে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করেছে থাইল্যান্ড। পুলিশ চেকপয়েন্ট ও সীমান্তের গুদামে স্যাটেলাইট টার্মিনাল জব্দ করেছে। স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোর ভাষ্য, অপব্যবহারের খবর জানার পর সন্দেহভাজন সাইটের আশপাশে দুই হাজারের বেশি স্যাটেলাইট যন্ত্র তারা অচল করে দিয়েছে।

চীনা নাগরিকেরা ক্রমেই প্রতারণার শিকার হওয়ায় দেশটি জোরালোভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। জানুয়ারিতে এক চীনা অভিনেতাকে অপহরণের পর চীনা কর্মকর্তারা থাই পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা কেন্দ্রগুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এরপর থেকে কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার চীনা নাগরিককে মিয়ানমার থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে—সন্দেহভাজন হিসেবে অথবা কম্পাউন্ড থেকে সরিয়ে নেওয়া কর্মী হিসেবে।

আদালতেও আইনি মামলা পৌঁছাতে শুরু করেছে। থাইল্যান্ডে বিচারকেরা মিয়ানমারের সীমান্ত শহরগুলো থেকে বড় আকারের প্রতারণা ও পাচার কার্যক্রম চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত চীনা ব্যবসায়ী শে ঝিজিয়াংকে প্রত্যর্পণের অনুমোদন দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য কেন্দ্রগুলোকে সহায়তাকারী কোম্পানি ও ব্যক্তিদের ওপর সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তদন্তকারীরা অর্থের গতিপথ অনুসরণ করারও চেষ্টা করছেন। প্রেম ও বিনিয়োগের নামে প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্টরা। অর্থ স্থানান্তরসেবা প্রদানকারী ও বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে তহবিল কোথায় গেছে, তা অনুসরণ করছেন তাঁরা।

এসব উদ্যোগ অপরাধী চক্রগুলোর জন্য বাধা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তাদের কৌশল বদলাতেও বাধ্য করেছে। পরিচালনাকারীরা কিছু সময়ের জন্য মানুষকে লাওস বা কম্বোডিয়ায় সরিয়ে নেন, তারপর স্থানীয় চাপ কমলে মিয়ানমারে ফিরে আসেন। কেউ কেউ নদীর ওপার থেকে সহজে নজরদারি এড়াতে কারেন রাজ্যের আরও ভেতরে নতুন কেন্দ্র গড়েন। অন্যরা দলগুলোকে ছোট ছোট সাইটে ভাগ করে সরঞ্জাম ঘন ঘন সরিয়ে নেন। এক স্থানে গ্রেপ্তারের ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা দ্রুত অন্য কোথাও পূরণ হয়ে যায়।

যেভাবে এই ব্যবসা কমানো যেতে পারে

দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবসা কমাতে একই সঙ্গে মানুষ ও অর্থের ওপর টেকসই চাপ প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হলো কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে তাঁরা ভয় ছাড়াই সামনে আসতে পারেন। এর অর্থ অস্থায়ী আশ্রয়, দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দেশে ফেরার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি যাঁরা সত্যিই প্রতারণা চালিয়েছেন বা কর্মীদের ওপর নির্যাতন করেছেন, তাঁদের জন্য ন্যায্য বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো কেন্দ্রগুলোতে অর্থ ও যোগাযোগের সরবরাহ বন্ধ করা। টেলিযোগাযোগ ও স্যাটেলাইট সেবাদাতারা নিয়ম মেনে চলার ব্যবস্থা জোরদার করতে পারেন, সন্দেহজনকভাবে এক জায়গায় জড়ো হওয়া টার্মিনাল শনাক্ত করতে পারেন এবং অপব্যবহারের স্পষ্ট প্রমাণ থাকলে সেবা বন্ধ করতে পারেন। পেমেন্ট কোম্পানি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জগুলো গ্রাহক পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা বাড়াতে পারে, ‘পিগ বুচারিং’-এর ধরন দ্রুত শনাক্ত করতে পারে এবং পরিচিত প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন আটকে দিতে পারে। অঞ্চলের ব্যাংকগুলো বেনামি অর্থ স্থানান্তরের অ্যাকাউন্ট এবং ঘন ঘন টাকা তোলার তথ্য ভাগাভাগি করতে পারে। ভারত, চীন, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের কাছে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব সম্পর্কে জনসতর্কতা পৌঁছানো জরুরি।

সবশেষে, তদারককারীদের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের ওপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নজর দিতে হবে। অর্থদাতা, নিয়োগকারী, পরিবহনকারী এবং লাভের ভাগ নেওয়া নিরাপত্তা রক্ষাকারীরাই এই ব্যবসা চালু রাখতে সহায়তা করেন। লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ এবং মিয়ানমারের প্রতিবেশীদের নিয়ে যৌথ তদন্তের মাধ্যমে এসব ব্যক্তির জন্য ঝুঁকি বাড়ানো সম্ভব। এই লক্ষ্যবস্তুতে নজর না দিলে সীমান্তে প্রকাশ্যে ভবন ধ্বংসের ঘটনা শিরোনাম হতে থাকবে, আর প্রতারণার স্ক্রিপ্ট ও অর্থের লেনদেন চলতে থাকবে অন্য কোথাও।

জেনে রাখুন

  • ২৪ অক্টোবরের পর মিয়ানমার মিয়াওয়াদ্দির কাছে কেকে পার্কের কিছু অংশে বোমাবর্ষণ করে। এতে ১,৫০০ জনেরও বেশি মানুষ পালিয়ে থাইল্যান্ডে যান। ধ্বংসাবশেষে মায়ে সটের বাড়িঘরের ক্ষতি হয় এবং নদী পার হতে গিয়ে কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
  • থাই কর্মকর্তারা অন্তত ২৮টি দেশ থেকে আসা মানুষদের প্রক্রিয়াকরণ করেন। দেশত্যাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে তিন দিনে এক হাজারেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পার হন।
  • রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, কেকে পার্কে ২,১৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৪৮টি ভবন ধ্বংসের পরিকল্পনা রয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, কমপ্লেক্সটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধ্বংস হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
  • অনুমান অনুযায়ী, মিয়াওয়াদ্দি এলাকায় এখনো ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ কাজ করছেন। ২০২৩ সালের জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে বলা হয়, পুরো মিয়ানমারে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ প্রতারণার কাজে আটকে আছেন।
  • বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় কেন্দ্রগুলো যুদ্ধবিরতি অঞ্চল বা সেনাবাহিনীর মিত্র মিলিশিয়াদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থিত। জেসন টাওয়ারের মতে, এই অভিযানগুলো রাজনৈতিক নাটক, যাতে নেটওয়ার্কগুলো অক্ষত থাকে।
  • থাইল্যান্ড সীমান্ত পেরিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করেছে। কর্তৃপক্ষ স্যাটেলাইট টার্মিনাল জব্দ করেছে এবং কোম্পানিগুলো সন্দেহভাজন সাইটের আশপাশে হাজার হাজার যন্ত্র অচল করে দিয়েছে।
  • এক সপ্তাহে ভারত আকাশপথে প্রায় ৪৬৫ জন নাগরিককে দেশে ফিরিয়েছে এবং পরে আরও প্রায় ২০০ জনকে ফিরিয়ে এনেছে। উচ্চপর্যায়ে আলোচিত কয়েকটি ঘটনার পর চীন তার নাগরিকদের ব্যাপক প্রত্যাবাসনে সমন্বয় করেছে।
  • আদালত ও সরকারগুলো এই ব্যবসার সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। থাই আদালত ব্যবসায়ী শে ঝিজিয়াংকে প্রত্যর্পণের অনুমোদন দিয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দের পদক্ষেপ পরিচালনাকারী ও অর্থের প্রবাহকে লক্ষ্য করছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে