ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য এই সম্ভাব্য চুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ভোক্তাপ্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর দুটি, গ্র্যাব ও গোটোকে একীভূত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে ইন্দোনেশিয়া। কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকার সম্ভাব্য একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করছে। দ্বীপপুঞ্জজুড়ে শহর ও জনপদের দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রে রয়েছে এই খাত। মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকেরা প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ও খাবার পরিবহন করেন, আর ডেলিভারি কর্মীরা ছোট ব্যবসা ও রেস্তোরাঁকে গ্রাহকদের সঙ্গে যুক্ত রাখেন। কর্মকর্তারা এ শিল্পকে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির জন্য কৌশলগত বলে বর্ণনা করেছেন। গোটোর রাইড-হেইলিং শাখা গোজেকের অনলাইন চালকের সংখ্যা ৩১ লাখের বেশি। বিশ্লেষকদের ধারণা, গ্র্যাব ও গোটো এক হলে ইন্দোনেশিয়ার রাইড-হেইলিং বাজারের ৯১ শতাংশেরও বেশি তাদের দখলে থাকতে পারে, যা যেকোনো বড় অর্থনীতিতে বিরল মাত্রার বাজার-ঘনত্ব।
সূচিপত্র
- ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য এই সম্ভাব্য চুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ
- গ্র্যাব ও গোটো কারা
- বাজারে অবস্থান
- সরকার কীভাবে আলোচনাটি এগোচ্ছে
- বাজারক্ষমতা ও একচেটিয়া-বিরোধী ঝুঁকি
- চুক্তির রূপ কেমন হতে পারে
- চালক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ওপর প্রভাব
- বিদেশি মালিকানা নিয়ে সংবেদনশীলতা ও রাজনীতি
- আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও ডিজিটাল বাজারের প্রেক্ষাপট
- সময়রেখা ও নজরে রাখার বিষয়
- নিয়ন্ত্রকেরা যেসব শর্ত দিতে পারেন
- মূল বিষয়গুলো
আলোচনাটি সংবেদনশীল, কারণ এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, দাম এবং জাতীয় গৌরবের বিষয় জড়িত। একীভূতকরণের সুফল-অসুবিধা বিবেচনার সময় ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্ব দুই কোম্পানির সঙ্গেই বৈঠক করেছে। একদিকে, বড় প্ল্যাটফর্মের ব্যাপকতা ও ব্যয় সাশ্রয় আরও বেশি এলাকায় সেবা সম্প্রসারণ এবং চালক ও ডেলিভারি কর্মীদের আয় স্থিতিশীল করতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, একটি একক প্রভাবশালী কোম্পানি প্রতিযোগিতা দুর্বল করতে পারে, প্রণোদনা ও ছাড় কমিয়ে দিতে পারে এবং চালকদের বিকল্প সীমিত করতে পারে। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কঠোর নজরদারিতে থাকবে।
কয়েক মাস ধরেই বাজারে গুঞ্জন, প্রায় ৭০০ কোটি ডলার মূল্যায়নে গোটোকে কিনে নিতে পারে গ্র্যাব। এ বছরের শুরুতে সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। প্রকাশ্যে দুই প্রতিষ্ঠানই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কোনো চুক্তির রূপরেখা নিয়ে তারা বিস্তারিত মন্তব্য করেনি, যদিও কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিগগিরই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
গ্র্যাব ও গোটো কারা
সিঙ্গাপুরভিত্তিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত গ্র্যাব একটি রাইড-হেইলিং অ্যাপ থেকে পরিবহন, খাবার ডেলিভারি, ডিজিটাল পেমেন্ট ও আর্থিক সেবার আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যার হিসাবে ইন্দোনেশিয়া তাদের সবচেয়ে বড় বাজার। দেশটির প্রধান শহর ও অপেক্ষাকৃত ছোট জনপদগুলোতে বাজারের অংশীদারত্ব বাড়াতে চালকদের প্রণোদনা, ব্যবসায়ীদের সেবা এবং মানচিত্র প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে কোম্পানিটি।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম নিজস্ব ভোক্তাপ্রযুক্তি গোষ্ঠী গোটো গঠিত হয় ২০২১ সালে। সে বছর মোটরসাইকেল রাইড-হেইলিং ও কুরিয়ার সেবার পথিকৃৎ গোজেক এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় অনলাইন বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি টোকোপিডিয়া একীভূত হয়। বিদেশি পুঁজি এর উত্থানে সহায়তা করলেও গোটো দেশটির ডিজিটাল উচ্চাকাঙ্ক্ষার জাতীয় প্রতীক হয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোটোর ৭৩.৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের মধ্যে রয়েছে সফটব্যাংক গ্রুপ ও আলিবাবা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান তাওবাও চায়না হোল্ডিং। বাকি শেয়ার ইন্দোনেশীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে।
বাজারে অবস্থান
ইন্দোনেশিয়াজুড়ে শহরে শহরে প্রতিযোগিতায় বছর পার করেছে দুই কোম্পানি। পরিবহন, খাবার ডেলিভারি ও পেমেন্ট সেবার মাধ্যমে উভয়ই দৈনন্দিন অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা বলছে, ইন্দোনেশিয়ার রাইড-হেইলিং বাজারের ৯১ শতাংশের বেশি এই দুই কোম্পানির দখলে। প্রত্যেকেরই বিস্তৃত ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক, চালকগোষ্ঠী ও অংশীদার রয়েছে। তাদের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ ছোট রেস্তোরাঁ, নিত্যপণ্যের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা।
সরকার কীভাবে আলোচনাটি এগোচ্ছে
কর্মকর্তারা এ খাতকে কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। এক জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র জানান, সরকার বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো চুক্তিতে কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং সেবার দাম সাশ্রয়ী রাখতে হবে। চালক ও কুরিয়ার কর্মীদের ওপর এই গুরুত্বের কারণ, যানজটপূর্ণ এবং গণপরিবহনের সীমিত সুবিধার শহরগুলোতে লাখ লাখ পরিবার প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়া নমনীয় আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র প্রসেত্যো হাদি চালকদের ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধির গল্পের কেন্দ্রে রেখেছেন এবং প্রক্রিয়াটিতে জরুরিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অনলাইন চালকেরা অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া অর্থনৈতিক নায়ক।
এই বার্তা থেকে বোঝা যায়, যেকোনো সমাধানে চাকরির নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা এবং ভোক্তা সুরক্ষা-সংক্রান্ত শর্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় মালিকানা নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে কর্মকর্তারা ও বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও বলেছে, একীভূত প্রতিষ্ঠানে ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারা সংখ্যালঘু অংশীদারত্ব নিতে পারে। এমন ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবে এবং দেশীয় কোনো শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে একীভূত হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ কমাতে পারে।
বাজারক্ষমতা ও একচেটিয়া-বিরোধী ঝুঁকি
প্রতি ১০টি রাইডের ৯টির বেশি একটি প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে ইন্দোনেশিয়ার একচেটিয়া-বিরোধী কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা তদারকি কমিশনের (কেপিপিইউ) কঠোর পর্যালোচনার মুখে পড়বে চুক্তিটি। ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর কোম্পানিগুলোকে কেপিপিইউকে জানাতে হয়। তবে আগাম অনানুষ্ঠানিক দিকনির্দেশনা চাইতে কোম্পানিগুলোর জন্য প্রাথমিক মূল্যায়নের একটি পথ রয়েছে। প্রতিযোগিতাবিরোধী প্রভাব রয়েছে বলে মনে করলে কেপিপিইউ তদন্ত করতে এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এর মধ্যে জরিমানা, সম্পদ বিক্রির নির্দেশ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিবর্তন, অথবা অংশীদার ও ব্যবহারকারীদের জন্য ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার নিয়ম থাকতে পারে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই উদ্বেগ জানিয়েছে। অ্যাপভিত্তিক অনেক চালক ও কুরিয়ার কর্মীর প্রতিনিধিত্বকারী ইন্দোনেশিয়ান ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সতর্কতা, একীভূত হলে প্রণোদনা কমতে পারে এবং দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। ইউনিয়ন নেতাদের ভাষ্য, একীভূত প্ল্যাটফর্ম ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ৯১ শতাংশ রাইড এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার খাবার ডেলিভারির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করবে। এতে শ্রমিক ও ভোক্তাদের হাতে কার্যকর বিকল্প কম থাকবে। বাজারে আগের একীভবনের কথাও কিছু চালকের মনে আছে। তাঁদের দাবি, অতীতে বড় চুক্তির পর প্রচারের বাজেট কমেছিল এবং গড় আয়ও নেমে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আবার ঘটবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। আর এ কারণেই সরকার তার বক্তব্যে চালকদের গুরুত্ব দিয়েছে।
নিয়ন্ত্রকদের উদ্বেগ মোকাবিলায় কোম্পানিগুলো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা প্রস্তাব করতে পারে। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চালক ও ভোক্তাদের মূল্য নির্ধারণের নীতি আলাদা রাখা, রেস্তোরাঁ বা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একচেটিয়া চুক্তিতে সীমা আরোপ, সংবেদনশীল ব্যবসায়িক শাখাগুলোর মধ্যে তথ্যের দেয়াল তৈরি এবং প্ল্যাটফর্মে চালক, কুরিয়ার ও বিক্রেতাদের বিরোধ নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট পদ্ধতি রাখা। এসব ব্যবস্থা প্রতিযোগিতা অক্ষুণ্ন রাখে এবং ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দেয় কি না, কেপিপিইউ তা মূল্যায়ন করবে। বাজারের ন্যায্যতার জন্য ঝুঁকি অতিরিক্ত বলে মনে করলে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরও ব্যবস্থা নিতে পারে কমিশন।
চুক্তির রূপ কেমন হতে পারে
দুটি প্রধান পথ আলোচনায় রয়েছে। একটিতে সরাসরি অধিগ্রহণের মাধ্যমে গ্র্যাব গোটোর নিয়ন্ত্রণ নেবে; সে ক্ষেত্রে মূল ব্যবসার অংশ নয়, এমন কিছু শাখা চুক্তির বাইরে থাকতে পারে। অন্য পথে, একীভূতকরণের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় একই ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম একটি প্ল্যাটফর্মে এনে পরিচালনায় সম্মত কাঠামো গড়া হবে। এ বছরের শুরুর দিকের বাজারি আলোচনায় গোটোর সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি ডলার ধরা হয়েছিল। কেনার অর্থায়নে নতুন ঋণ হিসেবে প্রায় ২০০ কোটি ডলারসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনার কথাও বলা হয়। দুই কোম্পানিই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি।
আলোচনায় উঠে আসা একটি ধারণা হলো, ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারা এতে ভূমিকা রাখতে পারে এবং সংখ্যালঘু অংশীদারত্ব কিনতে পারে। একীভূত কোম্পানিতে দেশীয় অংশীদার নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে ইন্দোনেশিয়ার স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার ইঙ্গিত দেওয়াই এর লক্ষ্য। উদীয়মান বাজারে বড় কৌশলগত লেনদেনে এ ধরনের পন্থা অস্বাভাবিক নয়। সেখানে সরকারগুলো বেসরকারি পুঁজি ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে।
চুক্তির শর্তে সম্মতি হলেও একীভূতকরণ নিয়ে জটিল প্রশ্ন থাকবে। দুটি অ্যাপ চালু রাখা হবে, নাকি একটিতে একীভূত হবে; চালক ও কুরিয়ারদের প্রণোদনা কীভাবে সমন্বয় করা হবে; এবং পরিবহন, খাবার ডেলিভারি, পেমেন্ট ও মার্কেটপ্লেস সেবার ব্র্যান্ড কীভাবে পরিচালিত হবে, তা ব্যবস্থাপনাকে ঠিক করতে হবে। দুই পক্ষকে এগোনোর অনুমতি দেওয়ার আগে নিয়ন্ত্রকেরা দাম, চুক্তি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইতে পারেন।
চালক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ওপর প্রভাব
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন চালক ও কুরিয়ার কর্মীরা। তাঁদের অনেকেই এখন দুই প্ল্যাটফর্মেই কাজ করেন। নির্দিষ্ট এলাকায় যে অ্যাপে ভালো প্রণোদনা ও অপেক্ষার সময় কম, সেটিই বেছে নেন তাঁরা। প্রতিযোগিতা কমে গেলে কোম্পানিগুলো বোনাস কমানোর কারণে চালকদের হাতে পাওয়া আয় কমতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, একীভূত প্ল্যাটফর্ম পরিচালন ব্যয় কমিয়ে সেই সাশ্রয় দিয়ে আয়ের একটি স্থিতিশীল ন্যূনতম সীমা, উন্নত বিমা অথবা প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কর্মসূচি দিতে পারে। পরিণতি নির্ভর করবে একীভূত গোষ্ঠীর নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রকদের আরোপিত শর্তের ওপর।
ব্যবসায়ীদের জন্য, বিশেষত ডেলিভারি অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল ছোট রেস্তোরাঁগুলোর ক্ষেত্রে, ফি ও প্রচার কর্মসূচির ধরন গুরুত্বপূর্ণ। বেশি কমিশন বা বিপণন সহায়তা কমে গেলে অল্প মুনাফায় চলা ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে, নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি ও অ্যাপে সহজে চোখে পড়ার সুযোগ বিক্রি বাড়াতে পারে। একটি প্ল্যাটফর্ম অনেক শহরে অনলাইন চাহিদায় পৌঁছানোর প্রধান পথ হয়ে উঠলে রেস্তোরাঁ সমিতিগুলো স্পষ্ট ও ন্যায্য চুক্তি, স্বচ্ছ র্যাঙ্কিংয়ের নিয়ম এবং দ্রুত সাড়াদানকারী গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানাতে পারে।
ভোক্তারা দৈনন্দিন খরচে সরাসরি পরিবর্তন দেখতে পারেন। অ্যাপগুলোর প্রতিযোগিতা প্রায়ই বড় ছাড় ও বিনা মূল্যে ডেলিভারির প্রস্তাবে দেখা যায়। একক প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম প্রচারে কম উদার হতে পারে। তবে বড় নেটওয়ার্কে পিকআপের সময় কমানো, যাত্রীদের কাছে চালকদের আরও দক্ষভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং বর্তমানে কম সেবাপ্রাপ্ত শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকায় সেবা বাড়ানো সম্ভব। চুক্তি এগোলে দাম, অপেক্ষার সময় ও সেবার মানের ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখা হবে।
বিদেশি মালিকানা নিয়ে সংবেদনশীলতা ও রাজনীতি
ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব ডিজিটাল অগ্রদূতদের নিয়ে গর্ব প্রবল। ইন্দোনেশিয়ার দুই শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একীভবনে গড়া গোটোর প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিদেশিদের হাতে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক গ্র্যাবের সঙ্গে একীভূত হলে দেশীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনপ্রণেতা ও জনপরিচিত ব্যক্তিরা ডিজিটাল খাতে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন, বিশেষত যেসব বাজারে প্ল্যাটফর্মগুলো দাম, কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রবাহকে প্রভাবিত করে।
অনুমোদন পেতে যেকোনো চুক্তিতে নীতিনির্ধারক ও জনগণের আস্থা অর্জনের মতো কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে ইন্দোনেশিয়ায় কর্মসংস্থান বজায় রাখা ও বাড়ানোর অঙ্গীকার, চালক ও কুরিয়ারদের উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষা, তথ্য স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ ও গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা এবং ইন্দোনেশীয় পুঁজি ও পরিচালনা কাঠামোর ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখার ব্যবস্থা। মন্ত্রীরা চালক ও কুরিয়ার কর্মীদের ভূমিকা যে কেন্দ্রীয়, তা স্পষ্ট করেছেন। এতে বোঝা যায়, চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যায্য আয় শর্তগুলোর তালিকায় থাকবে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও ডিজিটাল বাজারের প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতিতে পরিবহন, খাবার ডেলিভারি, অনলাইন বাণিজ্য ও পেমেন্টের প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এর খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে গ্র্যাব, গোটো, সি গ্রুপের শোপি, আলিবাবার লাজাদা এবং টিকটক শপ; পাশাপাশি রয়েছে ব্যাংক ও পেমেন্ট স্টার্টআপগুলো। জনসংখ্যা ও ব্যয়ের হিসাবে ইন্দোনেশিয়া এই অঞ্চলের বৃহত্তম বাজার। তাই জাকার্তার কৌশলগত পদক্ষেপের প্রভাব গোটা অঞ্চলে ছড়ায়। গ্র্যাব ও গোটো এক হলে পরিবহন ও খাবার ডেলিভারিতে অতুলনীয় বিস্তৃতির আঞ্চলিক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অনলাইন বাণিজ্য ও পেমেন্টে পুঁজি ও অংশীদারত্বের প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষমতা মোকাবিলায় এশিয়াজুড়ে নিয়ন্ত্রকদের মনোভাব কঠোর হচ্ছে। অন্য বিচারব্যবস্থায় সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিয়েছে, বাজারে একচেটিয়াকরণের ঝুঁকি থাকলে ডিজিটাল খাতের চুক্তিতে অনুমোদনের মানদণ্ড আরও কঠোর হয়। তাই ইন্দোনেশিয়ার পর্যালোচনা প্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় নিয়ন্ত্রকেরা শুধু বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রের শেয়ারধারী ও ঋণদাতাদের নয়, মেদান থেকে মাকাসার পর্যন্ত শহরগুলোর চালক, ছোট ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর চুক্তির প্রভাব মূল্যায়ন করবেন।
সময়রেখা ও নজরে রাখার বিষয়
দুই পক্ষ এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব যাবে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও প্রধান শেয়ারধারীদের কাছে। ইন্দোনেশিয়ায় কোম্পানিগুলো সাধারণত নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর কেপিপিইউকে জানায়। তবে প্রাথমিক মতামতের জন্য আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারে। এ আকারের আন্তসীমান্ত চুক্তিতে পরিবহন, যোগাযোগ, বিনিয়োগ, শ্রম ও ভোক্তা সুরক্ষাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চুক্তির ব্যাপকতা ও জনস্বার্থের কারণে নিয়ন্ত্রকদের সন্তুষ্ট করে এমন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়ে দুই পক্ষ কত দ্রুত একমত হতে পারে, তার ওপর সময়সীমা নির্ভর করবে।
নিয়ন্ত্রকেরা যেসব শর্ত দিতে পারেন
চুক্তি এগোলে বাজারে ন্যায্যতা বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষের হাতে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পিক আওয়ারে হঠাৎ ভাড়া বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে মূল্য ও সারচার্জের নিয়ম, চালকদের আয় ও বিমার ন্যূনতম মান, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একচেটিয়াবিহীন চুক্তি এবং চালক, রেস্তোরাঁ ও সার্চ ফলাফল অ্যাপে কীভাবে র্যাঙ্ক করা হয় তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার শর্ত দিতে পারে তারা। তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তার সুরক্ষাও পর্যালোচনার অংশ হবে। পাশাপাশি কম লাভজনক এলাকায় সেবা চালু রাখার অঙ্গীকারও চাওয়া হতে পারে, যাতে কোনো এলাকা ডিজিটাল সেবাবঞ্চিত হয়ে না পড়ে।
মূল বিষয়গুলো
- কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির জন্য কৌশলগত বলে বিবেচিত একটি খাতে গ্র্যাব ও গোটোর সম্ভাব্য একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ পর্যালোচনা করছে ইন্দোনেশিয়া।
- গোজেকের অনলাইন চালকের সংখ্যা ৩১ লাখের বেশি। হিসাব অনুযায়ী, গ্র্যাব ও গোটো এক হলে ইন্দোনেশিয়ার রাইড-হেইলিং বাজারের ৯১ শতাংশেরও বেশি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
- কর্মকর্তারা বলেছেন, শিগগিরই সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যেকোনো সমাধানে চালক ও কুরিয়ার কর্মীদের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রেখেছেন তাঁরা।
- সম্ভাব্য চুক্তিতে গোটোর মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি ডলার ধরা হয়েছে বলে বাজারে আলোচনা রয়েছে। নতুন ঋণসহ বিভিন্ন অর্থায়নের বিকল্প নিয়েও কথা হয়েছে।
- ইন্দোনেশিয়ার একচেটিয়া-বিরোধী কর্তৃপক্ষ কেপিপিইউ সম্পন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করতে পারে। প্রতিযোগিতার ক্ষতি হয়েছে মনে করলে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে।
- শ্রমিক সংগঠনগুলোর সতর্কতা, একীভূত হলে চালকদের প্রণোদনা কমতে এবং দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, বড় পরিসরে কাজ করলে আয় স্থিতিশীল হতে এবং সেবার পরিধি বাড়তে পারে।
- একীভূত প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় অংশীদারত্ব বজায় রাখতে ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারার সম্ভাব্য সংখ্যালঘু বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
- দুই কোম্পানিই প্রকাশ্যে সীমিত বক্তব্য দিয়েছে। কর্মকর্তারা জোর দিচ্ছেন কর্মসংস্থান সুরক্ষা, ন্যায্য দাম ও ভোক্তা সুরক্ষার ওপর।






