বৈশ্বিক বিজ্ঞানশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং ইউরোপের প্রতিক্রিয়া

পড়তে 11 মিনিট
বৈশ্বিক বিজ্ঞানশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং ইউরোপের প্রতিক্রিয়া

বৈশ্বিক বিজ্ঞানে এক সন্ধিক্ষণ

বিশ্বের গবেষণা দ্রুত পরিবর্তনের এক বিরল সময় পার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের মতো শীর্ষ অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতায় এখন নিয়মিত নেতৃত্ব দিচ্ছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। বিশ্বমানের সাময়িকীতে অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে চীন শীর্ষস্থানেও উঠে এসেছে। রসায়ন, উপকরণবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান এবং জীবনবিজ্ঞানের কয়েকটি শাখাসহ নানা ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্ট। বিপুল পরিসর, বিনিয়োগ এবং বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিশিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পিত কৌশল এই অগ্রগতির পেছনে কাজ করছে। একসময় নিজেদের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ইউরোপ এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। কীভাবে প্রতিযোগিতা করবে, কখন সহযোগিতা করবে এবং কোথায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে, সে সিদ্ধান্তও নিতে হবে তাদের।

সূচিপত্র
  1. বৈশ্বিক বিজ্ঞানে এক সন্ধিক্ষণ
  2. গত এক দশকে কী বদলেছে?
  3. যেভাবে শীর্ষে উঠে এল চীন
  4. প্রকাশনার সংখ্যা কেন পুরো চিত্র দেখায় না
  5. কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোতে নেতৃত্ব
  6. সহযোগিতার ধরন বদলাচ্ছে
  7. ইউরোপ সম্পর্কে উপাত্ত কী বলছে
  8. ইউরোপের নীতিগত প্রতিক্রিয়া
  9. চীন কী ভাবছে এবং সহযোগিতার সুযোগ
  10. যেভাবে ইউরোপ আবার এগিয়ে যেতে পারে
  11. চীনের সঙ্গে সহযোগিতায় সুরক্ষাব্যবস্থা
  12. যা জানা জরুরি

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের সঙ্গে যৌথ গবেষণাপত্রের আনুমানিক ৪৫ শতাংশে নেতৃত্ব দিয়েছেন চীনা গবেষকেরা; ২০১০ সালে এই হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। চীন প্রকাশ করেছে প্রায় ৯ লাখ বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ, যা ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। স্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ১৪৫টি উচ্চমানের সাময়িকীতে অবদান পরিমাপকারী নেচার ইনডেক্সের রিসার্চ লিডার্স তালিকায় চীন যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলেছে; ২০২৪ সালে ব্যবধান আরও বেড়েছে। বিষয়টি শুধু সংখ্যার নয়। কোন সমস্যাগুলো গুরুত্ব পাবে, কোন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হবে এবং নতুন ধারণা কত দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে—এসবের ওপর প্রভাবের ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি।

গত এক দশকে কী বদলেছে?

চীন বিপুলসংখ্যক বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী তৈরি করেছে, গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে এবং দ্রুত অগ্রসরমান শিল্পভিত্তির সঙ্গে গবেষণাগারগুলোকে যুক্ত করেছে। ২০২৫ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরে প্রায় ৭৭ হাজার STEM বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী তৈরি করবে; যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিলিয়েও যত গবেষক আছে, চীনে কর্মরত গবেষকের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। ফলে গবেষক দল ও গবেষণাগারের সংখ্যা বেড়েছে এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্ষেত্রে কাজের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বেইজিং কৌশলগত গবেষণা অংশীদারত্বে উৎসাহ দিয়েছে, আন্তসীমান্ত মেধা নেটওয়ার্ক গড়েছে এবং এশিয়া থেকে ইউরোপ ও আফ্রিকার গবেষণাগারগুলোকে যুক্ত করতে বিজ্ঞান কূটনীতি ব্যবহার করেছে।

চীনের ভেতরে কাজের গতি ও সমন্বয় এমন ক্ষেত্রগুলোতে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে, যেখানে বৃহৎ পরিসর ও প্রকৌশলগত শৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম এবং উন্নত কম্পিউটিংয়ের কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি এসেছে। কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনা ঝুঁকিপূর্ণ বা প্রচলিত ধারার বাইরের ধারণাকে সীমিত করতে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তৃণমূল থেকে উঠে আসা অনুসন্ধান ও উদ্যোক্তানির্ভর বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ—এমন ক্ষেত্রগুলোতে দেশটি এখনও এগিয়ে। তবে প্রবণতাগুলো বলছে, ব্যবধান কমছে।

যেভাবে শীর্ষে উঠে এল চীন

শীর্ষ পর্যায়ে চীনের উত্থানের পেছনে কয়েকটি ভিত্তি রয়েছে। প্রথমত, ধারাবাহিক অর্থায়ন। দুই দশক ধরে সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বেড়েছে, যার ফলে বড় গবেষণাগার, জাতীয় গবেষণা কর্মসূচি এবং বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, মেধা। বিদেশের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরা গবেষকেরা এবং ক্রমবর্ধমান দেশীয় প্রতিভার জোগান এখন অনেক প্রতিষ্ঠান ও বড় গবেষক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তৃতীয়ত, শিল্পখাতের চাহিদা। জ্বালানি, পরিবহন, ইলেকট্রনিকস ও রাসায়নিক খাতের কোম্পানিগুলো বাস্তব সমস্যার পাশাপাশি অর্থায়ন ও বৃহৎ পরিসরে কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। চতুর্থত, বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক। বেল্ট অ্যান্ড রোডের অংশীদার দেশগুলোর গবেষকদের প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বীজ বুনেছে এবং বৈজ্ঞানিক মিত্রদের পরিসর বাড়িয়েছে।

নেতৃত্বের প্রকাশ এখন নতুন নতুনভাবে দেখা যাচ্ছে। লাখ লাখ গবেষণাপত্রে লেখকদের অবদানের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষক দলের নেতৃত্ব নির্ণয় করা এক গবেষণায় গত ২৫ বছরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় চীনের নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গেছে। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে ২০২০-এর দশকের শেষ নাগাদ রসায়ন, উপকরণবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা অর্জন সম্ভব। এর কিছু পরেই গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশলেও সমতা আসতে পারে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অংশীদারত্বে বহু বছর আগেই নেতৃত্বের সমতা এসেছে, আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তা এখনই অর্জিত হওয়ার কথা। এই প্রবণতাগুলোই নির্ধারণ করে দেয় পদ্ধতি, উপাত্তসমষ্টি ও মানদণ্ডের সূচনা কোথায় হবে।

প্রকাশনার সংখ্যা কেন পুরো চিত্র দেখায় না

প্রকাশনার মোট সংখ্যা থেকে প্রভাব সম্পর্কে সামান্যই জানা যায়। নেচার ইনডেক্স ‘শেয়ার’ নামে একটি পরিমাপক ব্যবহার করে, যা নির্বাচিত কিছু সাময়িকীতে প্রকাশিত নিবন্ধে প্রতিষ্ঠান ও দেশগুলোর অবদানকে গুরুত্ব অনুযায়ী হিসাব করে। ২০২৪ সালে চীনের সমন্বিত শেয়ার বেড়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের কমেছে—দীর্ঘদিনের ধারার বিপরীত এই পরিবর্তন। রসায়ন ও ভৌতবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অবদান কমায় যুক্তরাষ্ট্রের মোট স্কোর নেমেছে, যদিও জীববিজ্ঞানে দেশটি এখনও এগিয়ে। শেয়ার নিখুঁত কোনো পরিমাপক নয়, তবে উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন গবেষণা বৃহৎ পরিসরে কোথায় হচ্ছে, সেদিকে মনোযোগ দেয়।

কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোতে নেতৃত্ব

অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রতিযোগিতাকেও সংজ্ঞায়িত করে—এমন ক্ষেত্রগুলোতে চীনের সক্ষমতা সবচেয়ে দৃশ্যমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় শীর্ষ পর্যায়ের মডেল ও গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র এখনও এগিয়ে, তবে চীন দ্রুত ব্যবধান কমাচ্ছে এবং পেটেন্ট আবেদনে আধিপত্য করছে। সেমিকন্ডাক্টর খাতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে অত্যাধুনিক লিথোগ্রাফি ও উচ্চক্ষমতার চিপে চীনের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও পুরোনো প্রযুক্তির নোড, চিপ নকশার সরঞ্জাম ও প্যাকেজিংয়ে দেশীয় প্রকৌশল এগিয়েছে। উপকরণবিজ্ঞান ও রসায়নে চীনা গবেষণাগারগুলো উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন গবেষণার ক্রমবর্ধমান অংশ তৈরি করছে, যা ব্যাটারি, সৌরকোষ ও উন্নত সংকর ধাতু তৈরিতে কাজে লাগছে। জ্বালানি প্রযুক্তিতে চীনা কোম্পানিগুলো নতুন নকশার উৎপাদন যে গতিতে বাড়াচ্ছে, তা খুব কম দেশই পারে।

উন্নত শিল্প খাতের মূল্যায়নে দেখা যায়, বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারিতে চীন বৈশ্বিক অগ্রভাগে বা তার কাছাকাছি রয়েছে। বাণিজ্যিক পারমাণবিক শক্তি, রোবোটিকস, রাসায়নিক শিল্প, ডিসপ্লে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি ক্ষেত্রেও দেশটির অবস্থান শক্তিশালী। যেসব ক্ষেত্রে চীন এখনও পিছিয়ে, সেগুলো সাধারণত অত্যন্ত বিশেষায়িত সরঞ্জাম, নির্দিষ্ট পণ্যের সরবরাহকারী বা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই তালিকা ছোট হচ্ছে। এর দুটি কৌশলগত ফল রয়েছে: চীনের স্বনির্ভরতা বাড়ছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা চীনা মানদণ্ড ও উৎপাদনব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।

বিজ্ঞাপন

সহযোগিতার ধরন বদলাচ্ছে

গবেষণা সহযোগিতাও ভূরাজনীতির প্রভাবমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয় দেশেই বৈজ্ঞানিক জাতীয়তাবাদ বাড়ায় যৌথ প্রকল্প জটিল হয়েছে, ভিসা যাচাই কঠোর হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিধিবিধান মেনে চলার স্তর বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কম ঝুঁকির ক্ষেত্রগুলো, যেখানে সহযোগিতা এখনও স্বাগত, সেগুলোকে সংবেদনশীল ক্ষেত্র থেকে আলাদা করছে; সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বা বাড়তি তদারকি দরকার। চীনের নীতিতেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা এবং সহনশীলতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ফলে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে পশ্চিমা সহযোগিতার ওপর দেশটির নির্ভরতা কমেছে।

সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার চাপ থাকলেও চীনের গবেষণা উৎপাদন ও প্রভাব বাড়ছে। ওয়াশিংটন ও ইউরোপের রাজধানীগুলোতে আরও কার্যকর একটি কাঠামো গড়ে উঠছে, যেখানে সুবিধা স্পষ্ট এমন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথ খোলা রাখা হচ্ছে, আর নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণা সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা, পারস্পরিকতা, মেধাস্বত্বের প্রচলিত সুরক্ষা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনার মাধ্যমে ঝুঁকি সামলানো হয়, যাতে বৈজ্ঞানিক বিনিময় পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়। দ্রুত বদলে যাওয়া ক্ষেত্রগুলোর ওপর নজর রাখা, গবেষণার সততা বজায় রাখা এবং আবিষ্কারের গতি কমিয়ে দেয় এমন খণ্ডিত মানদণ্ড এড়ানোই এর লক্ষ্য।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপ সম্পর্কে উপাত্ত কী বলছে

ইউরোপের সক্ষমতা বাস্তব, তবে সবখানে সমান নয়। ২০২৪ সালের বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে শীর্ষে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্য। বিশ্বের অনেক উদ্ভাবনী নেতার আবাস এখনও ইউরোপ, তবে মহাদেশজুড়ে ফলাফলে বড় পার্থক্য আছে। উন্নত প্রযুক্তি ও মৌলিক চিকিৎসা গবেষণার বিস্তারিত গ্রন্থপঞ্জিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা করছে। অন্যদিকে উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন গবেষণার উৎপাদনে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন বৈশ্বিক গড়ের নিচে। ইউরোপীয় গবেষণা পরিষদ (ERC) সর্বত্র গবেষণার মান বাড়াতে সহায়তা করে। তবে এই দেশগুলোতে ERC-এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোও সাধারণত প্রথম দলের দেশগুলোর প্রকল্পের তুলনায় কম উদ্ধৃতি পায়।

এই ব্যবধানের কারণ শুধু অর্থ নয়। গবেষণার পরিবেশ, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা, ঝুঁকি নেওয়ার প্রণোদনা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ—সবই ফলাফলকে প্রভাবিত করে। মহাদেশের কয়েকটি ব্যবস্থায় এখনও অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রয়েছে, পেশাজীবনের কাঠামো অনমনীয়, কিংবা মানের চেয়ে সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইউরোপের গবেষণা পরিসরে উৎকর্ষের চমৎকার কিছু দ্বীপ রয়েছে, তবে সেগুলোর মাঝের সমুদ্র উত্তাল। এদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বিভিন্ন র‌্যাঙ্কিংয়ে ওপরে উঠেছে। নেচার ইনডেক্সের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক র‌্যাঙ্কিংয়ে এখন শীর্ষ দশের সাতটি প্রতিষ্ঠান চীনের; পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি ওই পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

ইউরোপের নীতিগত প্রতিক্রিয়া

২০১৯ সাল থেকে চীন সম্পর্কে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট করেছে ব্রাসেলস। ইউরোপীয় কমিশন এই সম্পর্ককে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মিশ্রণ হিসেবে তুলে ধরেছে। নতুন নীতিগত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগ যাচাই, সংবেদনশীল প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি ভর্তুকি-সংক্রান্ত বিধি, অর্থনৈতিক জবরদস্তি মোকাবিলার ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ সুরক্ষার পরিকল্পনা। লক্ষ্য হলো উন্মুক্ত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন—অর্থাৎ যেখানে সম্ভব উন্মুক্ত থাকা, পাশাপাশি নিরাপত্তা বা সহনশীলতাকে প্রভাবিত করে এমন ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো।

সদস্যদেশগুলোও একই পথে এগোচ্ছে, যদিও গতি এক নয়। নতুন পদক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও গবেষণাকে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তান্তর থেকে রক্ষায় সহায়তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, ডিজিটাল খাত ও প্রতিরক্ষা শিল্পে দেশীয় উৎপাদনেও সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। আন্তমহাদেশীয় ফোরামের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার হয়েছে, তবে মানদণ্ড ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায় ইইউ। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধরন ভিন্ন—এমন ২৭টি সরকারের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে এই ভারসাম্য আনা কঠিন।

কমিশনের ২০১৯ সালের কৌশলগত নথিতে এমন একটি অবস্থানের সারসংক্ষেপ দেওয়া হয়েছিল, যা এখন বেশির ভাগ সিদ্ধান্তের পথনির্দেশক। নথিটিতে চীনকে তিনটি ভূমিকায় বর্ণনা করা হয়েছে, যেগুলো কখনও একে অপরকে জোরদার করে, আবার প্রায়ই সংঘাতে জড়ায়। সরকারি দিকনির্দেশনা হিসেবে এটি বেছে বেছে সহযোগিতা এবং সতর্ক প্রতিযোগিতার একটি কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়।

২০১৯ সালের ইইউ কৌশলগত নথিতে চীনকে সহযোগিতার অংশীদার, অর্থনৈতিক প্রতিযোগী এবং ব্যবস্থাগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

চীন কী ভাবছে এবং সহযোগিতার সুযোগ

চীনা কর্মকর্তারা স্থিতিশীলতা, বহুপক্ষবাদ ও যৌথ উন্নয়নের বয়ান তুলে ধরেন, পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রবাহে বিধিনিষেধের বিরোধিতা করেন। ২০২৫ সালের মার্চে এক বিস্তৃত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই উদ্ভাবন ও সহযোগিতাকে বিশ্বের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সামলাতে পারস্পরিক সম্মানের আহ্বানও জানান তিনি এবং বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে অনুমানযোগ্য নিয়মের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার সুযোগ এখনও রয়েছে। স্বাস্থ্য গবেষণা, জলবায়ু ও জ্বালানি, দুর্যোগ মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়নে ব্যবহৃত উপকরণ এবং উন্মুক্ত উপাত্ত প্রকল্প—এসব থেকে সীমিত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সুফল পাওয়া সম্ভব। বৈশ্বিক দক্ষিণের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করে এমন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সুসম্পর্ক গড়তে এবং যেসব ক্ষেত্রে বিশ্বের আরও সক্ষমতা দরকার, সেখানে প্রতিভার ভাণ্ডার বাড়াতে পারে। তবে এসব বিনিময়ের মাত্রা নির্ধারণে ইউরোপকে সতর্ক হতে হবে, কারণ সহযোগিতার ফলে চীনের শিল্প অবস্থান এমনভাবে শক্তিশালী হতে পারে, যা পরে ইউরোপের জন্য অনুশোচনার কারণ হবে। স্পষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থা, প্রণোদনা এবং পারস্পরিকতার শর্ত এসব ঝুঁকি কমাতে পারে।

যেভাবে ইউরোপ আবার এগিয়ে যেতে পারে

নিজেদের মূল্যবোধ ও উন্মুক্ততা বজায় রেখে পুরো ব্যবস্থায় গবেষণার মান ও গতি বাড়ানোই ইউরোপের চ্যালেঞ্জ। এর শুরু গবেষণার পরিবেশ দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় আরও স্বায়ত্তশাসন, নিয়োগে নমনীয়তা এবং মান ও মৌলিকত্বকে পুরস্কৃত করার প্রণোদনা দরকার। আবিষ্কারমূলক গবেষণার অনুদানে ইউরোপীয় গবেষণা পরিষদ এখনও স্বর্ণমান; এর পরিসর আরও বাড়ানো উচিত। ইউরোপীয় উদ্ভাবন পরিষদ (EIC) তুলনামূলক নতুন। ধৈর্যশীল মূলধন ও পূর্বানুমানযোগ্য পরবর্তী অর্থায়ন বাড়িয়ে গবেষণাগার থেকে বাজারে যাওয়ার পথে আরও কার্যকর সেতু হিসেবে এটি গড়ে উঠতে পারে। সরকারি ক্রয়বিধিতে উদ্ভাবনী সমাধানকে আরও বেশি পুরস্কৃত করার সুযোগ আছে, যা নতুন প্রতিষ্ঠানকে প্রথম গ্রাহক পেতে এবং ইউরোপে থেকে যাওয়ার কারণ জোগাতে পারে।

পরবর্তী ভিত্তি হলো মেধা। গবেষক ও তাঁদের পরিবারের জন্য দ্রুত বসবাসের অনুমতি দেওয়ার সুবিধাসহ মহাদেশব্যাপী একটি মেধাবী কর্মী ভিসা চালু করলে অন্যত্র রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়া বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করা যাবে। যৌথ অবকাঠামো ও পর্যায়ক্রমিক নেতৃত্বসহ আন্তসীমান্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ইউরোপ নিজেদের বৈচিত্র্যকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে। কোয়ান্টাম গবেষণা, ফিউশন, কণা পদার্থবিজ্ঞান এবং জৈবচিকিৎসা প্ল্যাটফর্মে মহাদেশটির ইতিমধ্যেই শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। এসব সক্ষমতাকে উৎপাদন ও বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণের সহায়তাসহ গভীর প্রযুক্তির ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত করলে আরও বেশি মূল্য সংযোজন ইউরোপেই থাকবে।

অংশীদারত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সেমিকন্ডাক্টর, এআই নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উপকরণ এবং জৈবপ্রযুক্তির মানদণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক নেটওয়ার্ক বাড়ানো উচিত ইউরোপের। যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে উন্মুক্ত মানদণ্ড নির্ধারণ, ব্যয়বহুল অবকাঠামো ভাগাভাগি এবং সরবরাহের সংকটমুখগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে চীনা গবেষক দলের সঙ্গে লক্ষ্যভিত্তিক সহযোগিতাও চালানো উচিত, যেখানে উপাত্ত ভাগাভাগি ও ফল পুনরুৎপাদনের সুযোগ সবার জন্য বিজ্ঞানের মান বাড়ায়। এ জন্য মেধাস্বত্বের স্পষ্ট শর্ত, সংশ্লিষ্টতার যাচাই এবং দ্বৈত ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকির সতর্ক পর্যালোচনা দরকার।

বিজ্ঞাপন

চীনের সঙ্গে সহযোগিতায় সুরক্ষাব্যবস্থা

স্বচ্ছ নিয়ম থাকলেই কৌশলগত সম্পৃক্ততা কার্যকর হয়। একটি বাস্তবসম্মত মডেলে ঝুঁকি ও সুফলের ভিত্তিতে গবেষণাকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়, কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথ খোলা থাকে এবং সংবেদনশীল ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়। নিচের বিষয়গুলো এই পদ্ধতির ভিত্তি হতে পারে।

  • ঝুঁকির স্তর ও অনুমোদন। কম, মাঝারি ও উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্র নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী পর্যালোচনার প্রক্রিয়া তৈরি করুন। উচ্চতর ঝুঁকির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন প্যানেল গঠন করুন।
  • স্বচ্ছতা ও পারস্পরিকতা। অর্থায়নের উৎস, সংশ্লিষ্টতা এবং উপাত্তে প্রবেশাধিকারের শর্ত সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করুন। অংশীদারদের কাছ থেকেও একই প্রত্যাশা রাখুন।
  • মেধাস্বত্বের মানসম্মত শর্ত। প্রাথমিক ও প্রকল্পে সৃষ্ট মেধাস্বত্ব, লাইসেন্স এবং নিরপেক্ষ স্থানে বিরোধ নিষ্পত্তিসহ স্পষ্ট মেধাস্বত্ব চুক্তি ব্যবহার করুন।
  • উপাত্তের সুরক্ষা ও অখণ্ডতা। উপাত্ত সংরক্ষণ, নিরীক্ষার নথি এবং ফল পুনরুৎপাদন যাচাই বাধ্যতামূলক করুন। কম ঝুঁকির প্রকল্পে সম্ভব হলে প্রিপ্রিন্ট ও কোড ভাগাভাগি করুন।
  • গবেষণা নিরাপত্তা পর্যালোচনা। উচ্চতর ঝুঁকির সহযোগিতায় যুক্ত গবেষণাগারগুলোতে বার্ষিক নিরীক্ষা করুন এবং প্রযুক্তির বিবর্তনের সঙ্গে ঝুঁকির মূল্যায়ন হালনাগাদ করুন।
  • অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ। নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষায়িত সরঞ্জাম ও উপকরণে প্রবেশাধিকার পর্যবেক্ষণ করুন। আস্থাভাজন সরবরাহকারী এবং সেবা চুক্তি ব্যবহার করুন।
  • গবেষকের চলাচলে সুরক্ষাব্যবস্থা। অনিয়ম প্রকাশকারীদের সহায়তা, স্বার্থের সংঘাত ঘোষণা এবং অতিথি গবেষকদের জন্য গবেষণা নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন।

এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান সুরক্ষিত রেখে বৈজ্ঞানিক বিনিময় থেকে সুফল পেতে ইউরোপকে সহায়তা করবে। আন্তসীমান্ত গবেষণায় সহজ ও স্থিতিশীল নিয়ম দরকার—এমন বিশ্ববিদ্যালয় ও কোম্পানিগুলোকেও এগুলো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবে।

বিজ্ঞাপন

যা জানা জরুরি

  • চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ গবেষণার প্রায় ৪৫ শতাংশে ২০২৩ সালে নেতৃত্ব দিয়েছেন চীনা গবেষকেরা; ২০১০ সালে এই হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ।
  • নেচার ইনডেক্সের রিসার্চ লিডার্স তালিকায় এখন শীর্ষে চীন; যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত শেয়ার কমলেও চীনেরটি বেড়েছে।
  • ২০২০-এর দশকের শেষ নাগাদ রসায়ন, উপকরণবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা অর্জন চীনের পক্ষে সম্ভব।
  • চীন বিপুলসংখ্যক STEM পিএইচডি ডিগ্রিধারী তৈরি করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিলিয়েও যত গবেষক আছে তার চেয়ে বেশি গবেষক নিয়োগ করেছে এবং এআই পেটেন্ট আবেদনে এগিয়ে রয়েছে।
  • ইউরোপের ফলাফল অসম। যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক; আর উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন গবেষণার উৎপাদনে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন পিছিয়ে।
  • ইইউ চীনকে সহযোগিতার অংশীদার, অর্থনৈতিক প্রতিযোগী ও ব্যবস্থাগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে এবং বিনিয়োগ যাচাই ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে নতুন সরঞ্জাম চালু করেছে।
  • আরও কার্যকর সম্পৃক্ততার মডেলে কম ঝুঁকির সহযোগিতা চালু রাখা হয়, আর সংবেদনশীল গবেষণায় কঠোর সুরক্ষাব্যবস্থা আরোপ করা হয়।
  • গবেষণার পরিবেশ সংস্কার, ERC ও EIC কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো, বৈশ্বিক মেধা আকৃষ্ট করা, গভীর প্রযুক্তির ক্লাস্টার গড়া এবং আস্থাভাজন অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ইউরোপ আবার এগিয়ে যেতে পারে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে