গাড়ি উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে ভারত কেন এগিয়ে আসছে
জাপানের বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতারা বহু বছর ধরে চলা একটি পরিবর্তনের গতি বাড়াচ্ছে। টয়োটা, হোন্ডা ও সুজুকি নতুন পুঁজি, নতুন পণ্য এবং সরবরাহব্যবস্থা ভারতে নিয়ে আসছে। এতে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে, পাশাপাশি চীনের ওপর তাদের নির্ভরতাও কমছে। বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। টয়োটা ও সুজুকি মিলে নতুন কারখানা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং রপ্তানি কার্যক্রম বিস্তারের লক্ষ্যে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছে। হোন্ডা জানিয়েছে, তাদের আসন্ন বৈদ্যুতিক মডেলগুলোর একটি ভারতে তৈরি ও রপ্তানি করা হবে, যা বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে দেশটির অবস্থান দৃঢ় করবে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বিপুল শ্রমশক্তি ও ব্যয়সাশ্রয়ের সুবিধা দিয়ে আসছে। তবে প্রতিযোগিতা, নীতি এবং বিদ্যুতায়নের পরবর্তী ধাপের প্রভাবে বর্তমান ঢেউটি আরও গভীর কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- গাড়ি উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে ভারত কেন এগিয়ে আসছে
- ভারতে টয়োটার কৌশল
- রপ্তানি ও বাজার হিস্যা বাড়াতে সুজুকি ও মারুতির সম্প্রসারণ
- হোন্ডার পুনর্গঠনে উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্র হচ্ছে ভারত
- চীনের প্রভাব ও আঞ্চলিক কৌশলের পরিবর্তন
- নীতিগত সহায়তা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
- কর্মসংস্থান, সরবরাহকারী ও প্রযুক্তি হস্তান্তর
- মূল বিষয়
এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের তীব্র মূল্যযুদ্ধ সেখানে মুনাফা ধরে রাখা কঠিন করে তুলেছে। একই সময়ে, ভারত চীনা বিনিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে এবং নতুন চীনা গাড়ি ব্র্যান্ডের জন্য বাজারটি অনেকটাই বন্ধ রেখেছে। এই পরিস্থিতি জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের কৌশল পুনর্বিন্যাসের সুযোগ করে দিয়েছে। পরিসংখ্যানেও পরিবর্তনটি স্পষ্ট। ভারতের পরিবহন খাতে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সাত গুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ২৯৪ বিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে। একই সময়ে চীনের পরিবহন খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ইয়েনে নেমেছে। গত বছর ভারতে প্রায় ৫০ লাখ যাত্রীবাহী গাড়ি উৎপাদিত হয়েছে এবং প্রায় ৮ লাখ গাড়ি রপ্তানি হয়েছে। স্থানীয় বিক্রির চেয়ে দ্রুত রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত যে ভারত রপ্তানির প্রবেশদ্বারে পরিণত হচ্ছে।
এই পরিবর্তন সরবরাহব্যবস্থার আরও বিস্তৃত পুনর্বিন্যাসের অংশ। জাপানি ব্র্যান্ডগুলো এমন স্থিতিস্থাপক ও বহুমুখী উৎপাদনব্যবস্থা চায়, যা একক দেশের ঝুঁকির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে সরবরাহ করতে পারে। ভারতের উৎপাদনের মান উন্নত হয়েছে, স্থানীয় সরবরাহকারীদের ভিত্তি পরিণত হচ্ছে এবং হাইব্রিড, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও উন্নত যন্ত্রাংশের পূর্ণাঙ্গ শিল্পব্যবস্থা গড়তে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। টাটা মোটরস ও মাহিন্দ্রার মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনও বাড়ছে। ফলে ভারত প্রতিযোগিতাপূর্ণ, আবার সম্ভাবনাময় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। টয়োটা, হোন্ডা ও সুজুকির পরবর্তী অধ্যায় লেখা হবে ভারতের কারখানায়, সরবরাহকারীদের শিল্পাঞ্চলে এবং সম্প্রসারিত বন্দর করিডরজুড়ে।
ভারতে টয়োটার কৌশল
ভারতে টয়োটার পরিকল্পনায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্যের পরিসর বিস্তৃত করা এবং স্থানীয়করণ গভীর করার সমন্বয় রয়েছে। দক্ষিণ ভারতের বিদ্যমান শিল্প কমপ্লেক্সে উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং মহারাষ্ট্রে নতুন কারখানা নির্মাণে কোম্পানিটি ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। দশকের শেষ নাগাদ ভারতে ১৫টি নতুন ও নবায়িত মডেল বাজারে আনার লক্ষ্য টয়োটার; বাজারে প্রায় ১০ শতাংশ হিস্যা পাওয়ারও লক্ষ্য রয়েছে। সম্প্রসারণের ফলে ভারতে টয়োটার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১০ লাখ গাড়ি ছাড়িয়ে যাবে। কৌশলটি বড় শহরের বাইরেও বিস্তৃত। গ্রামীণ বাজারে প্রবৃদ্ধির জন্য টয়োটা কম খরচের বিক্রয়কেন্দ্র ও ছোট ওয়ার্কশপ খুলছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি মাঝারি ও প্রিমিয়াম এসইউভি বাজারে তাদের শক্ত অবস্থান বজায় রাখছে।
স্বল্পমেয়াদি পণ্য পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে হাইব্রিড গাড়ি। আরবান ক্রুজার হাইরাইডার ও ইনোভা হাইক্রসের মতো মডেল বর্তমান অবকাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই জ্বালানিসাশ্রয়ী বিকল্প নিয়ে আলোচনায় ব্র্যান্ডটিকে এগিয়ে রেখেছে। খরচ কমাতে এবং সরবরাহকারীর ভিত্তি বিস্তৃত করতে ভারতীয় ও জাপানি সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করে হাইব্রিডের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ওপরও কোম্পানির কর্মকর্তারা জোর দিয়েছেন। মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদের কাছে নতুন স্থাপনায় টয়োটা পেট্রল, হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক—তিন ধরনের সংস্করণে একটি এসইউভি উৎপাদন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গাড়িটি দেশের ক্রেতাদের পাশাপাশি রপ্তানি বাজারের জন্যও তৈরি হবে। পণ্যের বৈচিত্র্যকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও গুণমাননির্ভর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখার কোম্পানির উৎপাদন দর্শনের সঙ্গে এই পদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
টয়োটার উৎপাদন দর্শন থেকে বোঝা যায়, ভারতে উৎপাদন কীভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা তাদের। জিদোকা ও জাস্ট ইন টাইমের ওপর প্রতিষ্ঠিত টয়োটা প্রোডাকশন সিস্টেম উৎপাদনের উৎসেই গুণমান নিশ্চিত করা, অপচয় কমানো এবং ধারাবাহিক উন্নতির ওপর জোর দেয়।
উৎপাদননীতির এক বিবরণে টয়োটা এই ব্যবস্থার মূলে থাকা মানবকেন্দ্রিক চেতনার কথা তুলে ধরেছে। কোম্পানির ভাষ্য, উৎপাদন লাইনে কর্মরত মানুষের শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রক্রিয়া ও নিরন্তর সমস্যা সমাধানের মাধ্যমেই গুণমান ও দক্ষতা আসে।
গ্রাহকদের কাছে ক্রমাগত আরও ভালো গাড়ি পৌঁছে দিতে মানুষের প্রজ্ঞা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা অপরিহার্য,” টয়োটা প্রোডাকশন সিস্টেম সম্পর্কে টয়োটার আনুষ্ঠানিক বিবরণে বলা হয়েছে। “প্রতিদিনের ছোট ছোট উন্নতির মাধ্যমে এবং যখন যা প্রয়োজন, শুধু তা-ই উৎপাদন করে কাজের ধারাবাহিক উন্নতিতে আমরা অবিচল থাকব।
ভারতে এসব ধারণা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আনা ও সরবরাহকারী উন্নয়নের কাজ পাশাপাশি চলতে হবে। জিদোকা বা মানবিক তত্ত্বাবধানযুক্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রতিটি ধাপে গুণমান নিশ্চিত করে। আর জাস্ট ইন টাইম যন্ত্রাংশের সরবরাহ সমন্বয় করে, যাতে মজুত কম থাকে এবং উৎপাদন নমনীয় থাকে। হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক সংস্করণ যুক্ত করার সময় এই শৃঙ্খলা কাজে আসে, কারণ ব্যাটারি, পাওয়ার ইলেকট্রনিকস ও সফটওয়্যারের জন্য স্থানীয় সরবরাহকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় দরকার।
রপ্তানি ও বাজার হিস্যা বাড়াতে সুজুকি ও মারুতির সম্প্রসারণ
সুজুকির ভারতীয় ইউনিট মারুতি সুজুকির দখলে ইতিমধ্যেই দেশের সবচেয়ে বড় বাজার হিস্যা রয়েছে, আর এখন উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ লাখ গাড়িতে উন্নীত করতে সুজুকি প্রায় ৭০,০০০ কোটি রুপি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ গাড়ি দেশের বাজারের জন্য এবং প্রায় ১০ লাখ রপ্তানির জন্য বরাদ্দ থাকবে। এতে স্পষ্ট যে ভারত সুজুকির বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। মহামারির আগে থাকা ৫০ শতাংশ বাজার হিস্যা পুনরুদ্ধার করতে চায় কোম্পানিটি। প্রতিযোগিতা বেড়েছে; টাটা মোটরস ও মাহিন্দ্রা, বিশেষ করে এসইউভি বাজারে, এগিয়ে যাওয়ায় মারুতির বাজার হিস্যা প্রায় ৪০ শতাংশে নেমেছে।
প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে সুজুকি এখন পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে আগ্রাসী নতুন পণ্য আনার পরিকল্পনা করছে। এসইউভিনির্ভর আটটি নতুন মডেল দিয়ে পণ্যের পরিসর বাড়ানো হবে, যার মধ্যে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়িও থাকবে। আলোচিত মডেলগুলোর একটি হতে পারে ই-ভিটারা, যার আত্মপ্রকাশ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দিকে হওয়ার কথা। মারুতির বর্তমান মডেল তালিকায় প্রাথমিক পর্যায়ের হ্যাচব্যাক থেকে শক্তিশালী হাইব্রিড—সবই রয়েছে। পরবর্তী ধাপে সাশ্রয়ী দাম, উন্নত বৈশিষ্ট্য ও বিদ্যুতায়িত গাড়ির সমন্বয় করা হবে, যা জায়গা, দক্ষতা ও কম পরিচালন ব্যয়ের বিষয়ে ভারতীয় ক্রেতাদের পছন্দের সঙ্গে মানানসই।
সুজুকির পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও উল্লেখযোগ্য। আমুল, বানাস ডেইরি ও ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের মতো অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে গুজরাটে নয়টি সংকুচিত বায়োগ্যাস কারখানা স্থাপন করবে কোম্পানিটি। ২০৩১ অর্থবছরের মধ্যে সুজুকির ধারণা, সিএনজি ও সংকুচিত বায়োগ্যাসচালিত গাড়ি তাদের মোট পাওয়ারট্রেনের প্রায় ৩৫ শতাংশ হতে পারে। হাইব্রিড ও অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত গাড়ি থাকবে প্রায় ২৫ শতাংশ করে, আর বাকি অংশ হবে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি। জ্বালানি ও চার্জিং অবকাঠামো বাড়ার সঙ্গে ভারতের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নির্গমন কমানোই এই বহু-পথের কৌশলের লক্ষ্য।
হোন্ডার পুনর্গঠনে উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্র হচ্ছে ভারত
বছরের পর বছর সীমিত মডেল নিয়ে ব্যবসা চালানোর পর ভারতে গাড়ির ব্যবসা নতুন করে সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে হোন্ডা। ২০৩০ সালের মধ্যে দশটি মডেল বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির, যার সাতটিই হবে এসইউভি। এতে ভারতের ক্রেতাদের এসইউভির দিকে ঝোঁকার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। দেশের বাজারে হিস্যা পুনর্গঠন এবং ভারতকে এশিয়ার অন্যান্য বাজারে প্রবেশের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে। দক্ষ ও সংযুক্ত গাড়ির আঞ্চলিক চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের পরিসর মেলাতে আসন্ন একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে ভারতকে বেছে নিচ্ছে হোন্ডা।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে হোন্ডা ০ সিরিজ। প্রথম মডেল ০ আলফা এসইউভি ২০২৬ সালে বাজারে আসার কথা। এটি ভারতে তৈরি হবে এবং ২০২৭ সাল থেকে জাপান ও এশিয়ার বাজারে রপ্তানি করা হবে। নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি হোন্ডা হাইব্রিড মডেলের পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে চার্জিং নেটওয়ার্ক পরিণত হওয়ার সময় ক্রেতারা একটি মধ্যবর্তী বিকল্প পান। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এশিয়া থেকেই সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় সিএটিএলসহ বিভিন্ন সরবরাহকারীর কাছ থেকে সেল নেওয়া হবে। খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা।
সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবেও ভারতকে বিবেচনা করছে হোন্ডা। সংযুক্ত সেবা, গাড়ির বুদ্ধিমত্তা এবং পরবর্তী প্রজন্মের মানব-যন্ত্র ইন্টারফেস নিয়ে কাজের জন্য কোম্পানিটি দল গড়ছে। সফটওয়্যারনির্ভর পদ্ধতিতে দ্রুত বৈশিষ্ট্য হালনাগাদ করা এবং বৈশ্বিক মানের সঙ্গে রপ্তানি সংস্করণের সামঞ্জস্য বজায় রেখে ভারতীয় বাজারের উপযোগী গাড়ি তৈরি করা সহজ হবে। পরিকল্পনাটি ভারতের উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতগুলোতে বৃহত্তর অংশগ্রহণে ফেরার ইঙ্গিত দেয়; পাশাপাশি দেশের প্রকৌশল ও উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সীমান্তের বাইরের বাজারেও সেবা দেওয়া হবে।
চীনের প্রভাব ও আঞ্চলিক কৌশলের পরিবর্তন
চীন এখনো বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ির বাজার, তবে প্রতিযোগিতার হিসাব বদলে গেছে। দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতায় মুনাফার হার কমেছে। চীনা ব্র্যান্ডগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের চেয়ে কম দাম রাখছে। এর ফলে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বাজারে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর বাজার হিস্যা চাপে পড়েছে। ভারত এই পরিস্থিতিতে ভারসাম্য এনে দিচ্ছে। নীতিগত অবস্থানের কারণে নতুন চীনা গাড়ি নির্মাতাদের জন্য প্রবেশ কঠিন হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয়করণ ও সম্প্রসারণের সময় পাচ্ছে এবং শুধু ব্যাপক মূল্যছাড়ের ওপর নির্ভর না করে বৈশিষ্ট্য ও নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে পারছে।
অন্যান্য অঞ্চলের শুল্ক ও নীতিগত পরিবর্তনও দেখায়, বিশ্বজুড়ে উৎপাদন কীভাবে নতুন করে বিন্যস্ত হচ্ছে। শুল্ক বাড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য হাইব্রিড সিভিক মডেল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে হোন্ডা। নীতির সঙ্গে উৎপাদন সামঞ্জস্য করার আরেকটি উদাহরণ এটি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাণিজ্য-সংক্রান্ত আকস্মিক ধাক্কার ঝুঁকি কমায় এবং সরবরাহব্যবস্থা সহজ করে। ভারতের ক্ষেত্রে রপ্তানির হিসাব উন্নত হচ্ছে। গত বছর যাত্রীবাহী গাড়ির রপ্তানি প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে দেশের বাজারে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২ শতাংশ। ভারতে তৈরি গাড়ি ক্রমেই দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে যাচ্ছে।
নীতিগত সহায়তা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
ভারতের উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগে প্রণোদনা, স্থানীয়করণের নিয়ম এবং ব্যাটারি, পাওয়ার ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের যন্ত্রাংশের দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগের স্পষ্ট বার্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমদানি বিধি কোম্পানিগুলোকে স্থানীয়ভাবে সংযোজনে উৎসাহিত করেছে। উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা উন্নত প্রযুক্তির উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করছে। চীনা পুঁজির ওপর বিধিনিষেধও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছে। জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নীতিগত সহায়তা, বাজারের আকার এবং পরিণত হতে থাকা সরবরাহকারী নেটওয়ার্কের সমন্বয় বহু বছরের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সহজ করেছে।
এখন কাজের বড় অংশ বাস্তবায়নের পর্যায়ে। হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির যন্ত্রাংশ, যেমন মোটর, ব্যাটারি প্যাক ও সফটওয়্যারের জন্য গাড়ি নির্মাতাদের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক দরকার। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন এবং খরচ কমাতে টয়োটা ও সুজুকি ভারতীয় ও জাপানি সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করছে। ব্যাপক উৎপাদনেও একই মান বজায় রাখতে প্রশিক্ষণ, নিরীক্ষা ও কঠোর উৎপাদনশৃঙ্খলা দরকার হবে। অপচয় দূর করা এবং প্রতিটি প্রক্রিয়ার ধাপে গুণমান নিশ্চিত করার ওপর টয়োটা প্রোডাকশন সিস্টেমের যে জোর, তা এ কাজে উপযোগী।
বাজারের চ্যালেঞ্জ এখনো কম নয়। দামের প্রতি সংবেদনশীলতা বেশি, চার্জিং অবকাঠামো সর্বত্র সমান নয় এবং এসইউভির দিকে ঝোঁকের মতো ক্রেতাদের পছন্দ দ্রুত বদলাতে পারে। বৈশ্বিক গাড়ি নির্মাতারা অতীতেও ভারতে হোঁচট খেয়েছে। ফোর্ড ও জেনারেল মোটরস প্রয়োজনীয় উৎপাদন পরিসর অর্জনে ব্যর্থ হয়ে যাত্রীবাহী গাড়ির ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছিল। তবে ২০২৯ সাল থেকে রপ্তানির লক্ষ্যে চেন্নাই কারখানায় ইঞ্জিন উৎপাদন আবার শুরু করছে ফোর্ড। নীতিগত পরিবেশ অনুকূল হলেও সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক পণ্য, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সময়মতো সরবরাহের ওপর।
কর্মসংস্থান, সরবরাহকারী ও প্রযুক্তি হস্তান্তর
জাপানি কোম্পানিগুলোর এই পরিবর্তনে ধাতু, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকস ও সফটওয়্যার খাতের ভারতীয় সরবরাহকারীদের জন্য কাজের সুযোগ বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি হলে ব্যাটারি প্যাক সংযোজন, পাওয়ার ইলেকট্রনিকস ও তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় বিনিয়োগ দ্রুত বাড়তে পারে। জাপান ও ভারতের শিল্পমহলে প্রচলিত আলোচনায় পুরোনো প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টর, এলসিডি ও ব্যাটারি সরবরাহে সহযোগিতা বাড়ার কথা উঠে এসেছে। এতে গাড়ি উৎপাদন যে যন্ত্রাংশের শিল্পব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, তা আরও শক্তিশালী হবে। আরও বেশি যন্ত্রাংশ নির্মাতা কারখানা স্থাপন করলে সরবরাহব্যবস্থা থেকে শুরু করে পরীক্ষা ও সনদায়নের মতো সহায়ক সেবাও বিস্তৃত হবে।
এসব বিনিয়োগের সঙ্গে দক্ষতা হস্তান্তরের বিষয়ও যুক্ত। টয়োটার জিদোকা ও জাস্ট ইন টাইম পদ্ধতিতে কর্মক্ষেত্রে সমস্যা সমাধান এবং কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন লাইন সম্প্রসারিত হলে প্রকৌশলী ও কারিগরেরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, তা সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। ভারতে সফটওয়্যার সক্ষমতা গড়ার হোন্ডার পরিকল্পনা কোডের মাধ্যমে হালনাগাদ করা যায়—এমন গাড়ির দিকে শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব কার্যক্রম ভারতে যত বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে, উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন নকশার কাজ, পরীক্ষা ও যাচাইও এখানে হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
প্রতিযোগিতা তীব্রই থাকবে। টাটা মোটরস ও মাহিন্দ্রা বৈদ্যুতিক গাড়িসহ এসইউভির বিস্তৃত মডেল তালিকা গড়ছে। হুন্দাই ও কিয়াও শক্তিশালী পণ্যসম্ভার নিয়ে বাজারে প্রতিষ্ঠিত। সুজুকির সাম্প্রতিক বাজার হিস্যা কমে যাওয়া দেখায়, বাজার কত দ্রুত বদলাচ্ছে। জাপানি ব্র্যান্ডগুলোকে নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে আরও প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং দ্রুত মডেল নবায়নের ভারসাম্য রাখতে হবে। ভারতের সাফল্য রপ্তানির ওপরও নির্ভর করবে। এর মাধ্যমে ভারতে তৈরি মডেল এশিয়া ও আফ্রিকার এমন বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারে, যেগুলো আগে চীন বা থাইল্যান্ডের কারখানার ওপর নির্ভর করত।
মূল বিষয়
- চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বড় উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র গড়তে টয়োটা, হোন্ডা ও সুজুকি ভারতে বিনিয়োগের গতি বাড়াচ্ছে।
- টয়োটা ও সুজুকির সম্মিলিত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে টয়োটা ১৫টি নতুন মডেল আনা এবং বছরে ১০ লাখের বেশি গাড়ি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে।
- হোন্ডা ভারতের একটি আসন্ন ০ সিরিজের বৈদ্যুতিক এসইউভি তৈরি ও রপ্তানির পরিকল্পনা করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দশটি মডেল আনার বৃহত্তর পরিকল্পনায় এসইউভি ও হাইব্রিডের ওপর জোর থাকবে।
- ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ লাখ গাড়িতে উন্নীত করা, ৫০ শতাংশ বাজার হিস্যা ফিরে পাওয়া এবং বার্ষিক রপ্তানি প্রায় ১০ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য সুজুকির।
- গত বছর ভারতে প্রায় ৫০ লাখ যাত্রীবাহী গাড়ি তৈরি হয়েছে এবং প্রায় ৮ লাখ রপ্তানি হয়েছে; রপ্তানি বেড়েছে আনুমানিক ১৫ শতাংশ।
- ২০২১ সালের পর থেকে ভারতের পরিবহন খাতে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সাত গুণেরও বেশি বেড়েছে, আর চীনের পরিবহন খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
- ভারতের নীতিতে নতুন চীনা গাড়ি নির্মাতাদের প্রবেশ সীমিত এবং স্থানীয় উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যা জাপানি ব্র্যান্ডগুলোকে স্থানীয়করণ ও উৎপাদন বাড়ানোর সময় দিচ্ছে।
- জিদোকা ও জাস্ট ইন টাইমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা টয়োটার উৎপাদন দর্শন স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থায় গুণমান ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে।
- টাটা, মাহিন্দ্রা, হুন্দাই ও কিয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা, দামের প্রতি ক্রেতাদের সংবেদনশীলতা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির সরবরাহব্যবস্থা ও চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ—এসবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।






