কেন সামাজিক বিমার নিয়ম কঠোর করছে জাপান
অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে সামাজিক বিমার নিয়ম মেনে চলার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে যাচ্ছে জাপান। স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অভিবাসন পরিষেবা সংস্থা আবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার নবায়ন বা পরিবর্তনের আবেদন করার সময় বিদেশি বাসিন্দারা জাতীয় পেনশন ও জাতীয় স্বাস্থ্যবিমার চাঁদা দিচ্ছেন কি না, তা যাচাই করার পরিকল্পনা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লক্ষ্য, অর্থ পরিশোধের নথি ভাগাভাগির ব্যবস্থা করে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যাচাই শুরু করা। বিদেশি বাসিন্দাদের মধ্যে বছরের পর বছর কম হারে চাঁদা দেওয়া এবং দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় চিকিৎসার বিল বকেয়া রেখে যাওয়ার বারবার ঘটনার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সূচিপত্র
জাপানের আইন অনুযায়ী, তিন মাস বা তার বেশি সময় দেশটিতে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের সরকারি বিমায় অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এর মধ্যে ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের জন্য জাতীয় পেনশন এবং নিয়োগকর্তার স্বাস্থ্যবিমায় অন্তর্ভুক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা রয়েছে। সরকারি তথ্য বলছে, নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে বিদেশি বাসিন্দারা বকেয়া পেনশন চাঁদার মাত্র ৪৯.৭ শতাংশ পরিশোধ করেছেন। ১৫০টি স্থানীয় সরকারের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিদেশিরা স্বাস্থ্যবিমার ধার্য করা প্রিমিয়ামের ৬৩ শতাংশ পরিশোধ করেছেন; সব বাসিন্দার ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ।
নীতিনির্ধারকদের যুক্তি, কঠোর যাচাই চাঁদাদাতাদের প্রতি ন্যায্যতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে এবং বকেয়া প্রিমিয়াম ও চিকিৎসার বিলের কারণে সৃষ্ট ঘাটতি স্থানীয় সরকারগুলোকে বহন করা থেকে রক্ষা করবে। বয়স্ক জনসংখ্যার সমাজে বাড়তে থাকা চিকিৎসা ব্যয় এবং বিদেশি কর্মী ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির মোকাবিলায় নেওয়া বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ এটি। একই সঙ্গে, জাপান যে শ্রমশক্তি ও দক্ষতা আকৃষ্ট করতে চায়, তাদের ফিরিয়ে না দিয়েই বহুল আলোচিত বকেয়া পরিশোধ না করার ঘটনাগুলোর সমাধানে রাজনৈতিক চাপের প্রতিফলনও এ উদ্যোগে রয়েছে।
২০২৭ সালের মধ্যে কী পরিবর্তন হবে
অভিবাসন-সংক্রান্ত আবেদন পর্যালোচনার সময় যাচাইকৃত পরিশোধের নথি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সরকার। বকেয়া পরিশোধের অনুরোধ উপেক্ষা করা বিদেশি বাসিন্দাদের অবস্থানের মেয়াদ নবায়ন বা অবস্থার ধরন পরিবর্তনের আবেদন সাধারণত নাকচ করা হবে। কর্তৃপক্ষ বলছে, যারা পরিশোধের নোটিশে সাড়া দেবেন, অনুমোদিত অব্যাহতি পাবেন অথবা স্থানীয় কার্যালয়ের সঙ্গে কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন, তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর ফলে, নির্দিষ্ট কিছু ভিসা শ্রেণির জন্য সীমিত পরিসরে চালু থাকা যাচাই অনেক ধরনের অবস্থার ক্ষেত্রে নিয়মিত যাচাইয়ের অংশ হয়ে উঠবে।
এই প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অভিবাসন পরিষেবা সংস্থার সঙ্গে পরিশোধের তথ্য ভাগাভাগির ব্যবস্থা তৈরি করছে। স্থানীয় সরকারগুলো এমন ডেটাবেস হালনাগাদ করবে, যেগুলোতে প্রায়ই জাতীয়তা বা আবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার তথ্য রাখার ঘর নেই। এ-সংক্রান্ত কারিগরি কাজ ২০২৬ সালে নির্ধারিত হয়েছে। সমন্বিত যাচাই ২০২৭ সালের জুনে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু কর্মভিসার বাইরেও শিক্ষার্থী, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্য এবং মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ও পেনশন যেভাবে কাজ করে
জাপানের সরকারি বিমাব্যবস্থা সর্বজনীন। অধিকাংশ বেতনভোগী কর্মী নিয়োগকর্তার মাধ্যমে কোম্পানির সামাজিক বিমায় অন্তর্ভুক্ত হন, যার মধ্যে স্বাস্থ্যবিমা ও কর্মচারী পেনশন রয়েছে। স্বনিযুক্ত ব্যক্তি, খণ্ডকালীন বা অনিয়মিত চুক্তিতে কর্মরত ব্যক্তি, চাকরিপ্রার্থী এবং অনেক শিক্ষার্থী নিজ শহর বা ওয়ার্ড কার্যালয়ে গিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ও জাতীয় পেনশন—এই দুটি কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হন। শর্ত পূরণকারী বিদেশি বাসিন্দাদেরও নাগরিকদের মতোই বিমায় যোগ দিয়ে চাঁদা দেওয়ার কথা, এবং তারা একই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।
কারা অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং চাঁদা দেবেন
জাতীয় পেনশনের আওতায় জাপানে ঠিকানাসহ ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী সব বাসিন্দা পড়েন, তাদের জাতীয়তা যা-ই হোক। ব্যক্তিদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়; এর মধ্যে রয়েছেন পৌর কার্যালয়ে গিয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ব্যক্তি এবং নিয়োগকর্তার পরিকল্পনার আওতাভুক্ত ব্যক্তি। কিছু ধরনের ভিসায় স্বেচ্ছায় বিমায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা স্থানীয় সরকার পরিচালনা করে এবং নিয়োগকর্তার স্বাস্থ্যবিমায় অন্তর্ভুক্ত নন—এমন বাসিন্দাদের আওতায় আনে। তিন মাসের বেশি সময় থাকা এবং অন্য কোনো বিমার আওতায় না থাকা বিদেশিদের এতে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। পরে কোম্পানির বিমাসহ কোনো চাকরি পেলে দ্বৈত বিল এড়াতে পৌর স্বাস্থ্যবিমা থেকে নাম প্রত্যাহার করা উচিত।
চাঁদার খরচ ও বিমার সুবিধা
২০২৫ সালে জাতীয় পেনশনের মাসিক প্রিমিয়াম ১৭,৫১০ ইয়েন। স্বল্প আয়ের বাসিন্দাদের জন্য সম্পূর্ণ ও আংশিক অব্যাহতির ব্যবস্থা রয়েছে, আর শিক্ষার্থীরা বিশেষ পরিশোধব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারেন। অব্যাহতি পাওয়া অতীতের চাঁদা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত বকেয়াভাবে পরিশোধ করা যায়। জাতীয় স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম পৌরসভা ও পরিবারের আয়ের ভিত্তিতে ভিন্ন হয়। বিমায় অন্তর্ভুক্ত থাকলে সাধারণত চিকিৎসাসেবার সময় রোগীকে ৩০ শতাংশ দিতে হয়, আর বাকি খরচ বিমা বহন করে; উচ্চ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে। জাপানি নন—এমন ব্যক্তিরা স্থায়ীভাবে জাপান ছাড়লে পেনশন চাঁদার বিপরীতে এককালীন প্রত্যাহার সুবিধা দাবি করতে পারেন। অবসরের পর কাজে লাগবে না—এমন বিমায় চাঁদা দেওয়ার উদ্বেগ দূর করতে এটি সহায়তা করে। বিস্তারিত তথ্য জাপান পেনশন সার্ভিস ও পৌর কার্যালয়গুলোতে পাওয়া যাবে।
নতুনদের কাছ থেকে আগাম প্রিমিয়াম
বিদেশ থেকে আসা নতুন বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম আগাম দিতে বলার সুযোগ পৌরসভাগুলোকে দেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকেই এক বছরের প্রিমিয়াম একসঙ্গে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা চালু হতে পারে। চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পর প্রিমিয়াম না দিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনা কমানোই এই ব্যবস্থার লক্ষ্য। আগাম পরিশোধ চালু করা হবে কি না, তা প্রতিটি স্থানীয় সরকার নিজস্ব বিধির মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। পৌরসভাভেদে প্রিমিয়াম ও বিল দেওয়ার সময়সীমা আলাদা হওয়ায়, কোনো বাসিন্দা স্থানান্তরিত হলে অর্থ ফেরতের বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকতে হবে।
পরিশোধের ইতিহাস কীভাবে নথিভুক্ত ও ভাগাভাগি করা হয়, সেটিও উন্নত করতে চান কর্মকর্তারা। অনেক শহর ও ওয়ার্ড কার্যালয় বিমায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের জাতীয়তা বা আবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করে না। তথ্যের ঘরগুলোকে মানসম্মত করলে ২০২৭ সালে অভিবাসন যাচাই শুরু হওয়ার আগে নিয়ম মেনে চলার আরও নির্ভুল চিত্র পাওয়া যাবে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত পৌর স্বাস্থ্যবিমায় প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার বিদেশি বাসিন্দা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যা মোট বিমাভুক্ত ব্যক্তির প্রায় ৪ শতাংশ।
ভিসার পরিণতি ও আইন প্রয়োগ
আগের সফরে চিকিৎসার বিল বকেয়া রেখে যাওয়া পর্যটকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার পদক্ষেপে মন্ত্রিসভা সমর্থন জানিয়েছে। বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা বা পেনশনের প্রিমিয়াম না দিলে অবস্থার মেয়াদ নবায়নের আবেদন নাকচ হতে পারে অথবা অবস্থার ধরন পরিবর্তনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। নির্দিষ্ট দক্ষতা ভিসায় কর্মরত ব্যক্তিদের সামাজিক বিমার চাঁদা পরিশোধের অবস্থা নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করবে মন্ত্রণালয়গুলো। আর বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা কোম্পানিগুলোকে বিদেশি কর্মী নিয়োগে বাধা দেওয়া হতে পারে।
আরও বেশি আবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার ক্ষেত্রে, শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদেরসহ, এই কঠোর যাচাই চালু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থায়ী বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই বাড়তি নজরদারির মুখে রয়েছেন। সংশোধিত আইনের অধীনে, ইচ্ছাকৃতভাবে কর ও সামাজিক বিমার চাঁদা না দিলে কিছু ক্ষেত্রে আবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার অধিকার হারাতে পারেন। কর্মকর্তারা বলছেন, লক্ষ্য দীর্ঘদিনের এবং এড়ানো সম্ভব—এমন বকেয়া; বেকার ব্যক্তি বা স্থানীয় কার্যালয়ের সঙ্গে যাচাইকৃত কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থায় থাকা ব্যক্তিরা নন।
সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে বিচারমন্ত্রী কেইসুকে সুজুকি নিয়ম মেনে চলার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই লক্ষ্য তুলে ধরেন। মন্ত্রীর মতে, অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় জনসাধারণের আস্থা নির্ভর করে মৌলিক বাধ্যবাধকতা নিয়মমাফিক প্রয়োগের ওপর।






